📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ রহ.

📄 ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ রহ.


ইসলামের ইতিহাসে যে ক'জন মনীষী মুসলিম উম্মাহর ওপর অভাবনীয় প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন এবং উম্মাহর সেবায় বহুমাত্রিক অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তাদের অন্যতম শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. (৬৬১-৭২৮ হি.)। মৃত্যুর প্রায় সাত শতাধিক বছর পরেও আজ তিনি প্রাসঙ্গিক। তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য গ্রন্থ আজও পঠিত হচ্ছে। তাঁর চিন্তা পূর্বে ও পশ্চিমে চর্চিত হচ্ছে।
বিভিন্ন ভাষায় ইবনু তাইমিয়া রহ. এর জীবনের ওপর লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা অগণিত। তাঁর জীবন ও কর্মের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। ফলে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা নিজেরা তার জীবনী আলোচনা না করে তাঁর ব্যাপারে বিখ্যাত কিছু ইমামের বক্তব্য উল্লেখ করবো। এতে একদিকে যেমন মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে তাঁর অবস্থান জানা যাবে অপরদিকে অন্যান্য ইমামগণ তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখতেন সেটাও স্পষ্ট হবে।
• আল্লামা ইবনু দাকীক-আল-ঈদ (৭০২ হি.) বলেন, 'আমি ইবনু তাইমিয়াকে দেখেছি। আমার মনে হয়েছে জগতের সকল ইলম তাঁর সামনে রাখা। তিনি সেখান থেকে ইচ্ছামতো গ্রহণ করছেন, বলছেন, লিখছেন।' (আর-রাদ্দুল ওয়াফির পৃ. ৫৯)
• আল্লামা ইবনু সাইয়্যিদিন নাস (৭৩৪ হি.) বলেন, 'জ্ঞানের সকল শাখায় তাঁর দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। তিনি যখন তাফসীর শাস্ত্রে কথা বলতেন মনে হতো তিনি বিখ্যাত মুফাসসির। ফিকহ নিয়ে কথা বললে মনে হতো তিনি একজন মুহাক্কিক ফকীহ। হাদীস শাস্ত্রে কথা বললে মনে হতো হাদীসে তাঁর মতো দ্বিতীয় কেউ নেই। বিভিন্ন ধর্ম ও মাযহাব সম্পর্কে তাঁর মতো গভীর জ্ঞানের অধিকারী কেউ ছিল না। সমকালীন সবাইকে তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। যে চোখ তাঁকে দেখেছে তাঁর মতো আর কাউকে দেখেনি। সম্ভবত তাঁর চোখও তাঁর নিজের মতো কাউকে দেখেনি'! (যায়ল-তাবাকাতে হানাবিলাহ ৪/৫০০)
• আলামুদ্দীন বিরযালী (মৃ. ৭৩৯ হি.) লেখেন, 'ফিকহ, উসূলুল ফিকহ, তাফসীর, হাদীসসহ জ্ঞানের সকল শাস্ত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। ইজতিহাদের সকল শর্ত তাঁর মাঝে বিদ্যমান ছিল, ফলে তিনি ছিলেন সে যুগের মুজতাহিদ। তিনি যখন তাফসীর করতেন, মানুষ হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো! ইলমের পাশাপাশি ইবাদাত, তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। জীবনের ভোগবিলাসের পরিবর্তে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকাই ছিল তাঁর জীবনের ব্যস্ততা। (আল-উকূদুদ-দুররিয়্যাহ পৃ. ১৩-১৪)
• হাফিয যাহাবী (৭৪৮ হি.) লিখেছেন, 'আমাদের শাইখ শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. ছিলেন নিজ যুগের বিরল ব্যক্তিত্ব। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তিনি কুরআন-হাদীসে ব্যাপক পাণ্ডিত্য লাভ করেন। নিজ শাইখদের জীবদ্দশাতেই তিনি বড় আলিম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাফসীর ও হাদীসের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রবাদপুরুষ। ফিকহ এবং বিভিন্ন মাযহাবের ইমামদের উসূল ও বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর মতো কেউ ছিল না। আকীদা, ধর্ম ও বিভিন্ন মতাদর্শ সম্পর্কে তাঁর মতো বিদগ্ধ মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। আরবী ভাষার ক্ষেত্রেও তিনি অগাধ জ্ঞান রাখতেন। ইতিহাস ও জীবনীশাস্ত্রে তিনি ছিলেন ঋদ্ধ। বীরত্ব এবং ময়দানে জিহাদের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। দানশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর খ্যাতি ছিল। অথচ ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন দুনিয়াবিমুখ মানুষ।' (আর-রাদ্দুল ওয়াফির পৃ. ৬৯, যায়ল-তাবাকাতে হানাবিলাহ ৪/৪৯২-৪৯৩)
• ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (৮৫২ হি.) লিখেছেন, 'ফিকহ, হাদীস, উলূমুল হাদীসসহ প্রত্যেকটি শাস্ত্রে তিনি নিজ যুগের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পাণ্ডিত্য, বাগ্মিতা ও লেখনিশক্তিতে তিনি ছিলেন বিস্ময়পুরুষ। সালাফ ও খালাফের বক্তব্য আত্মস্থ এবং বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি ছিল না।' (আদ-দুরারুল কামিনাহ ১/১৬৮-১৬৯)
• ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৯১১ হি.) লিখেছেন, 'তিনি জ্ঞানের সাগর ছিলেন। তাঁর মতো মেধাবী মানুষ খুব কমই জন্ম নেয়। দুনিয়াবিমুখতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তি। তাঁর লেখা গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় তিনশত খণ্ড। দীনের জন্য তিনি একাধিকবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।' (তাবাকাতুল হুফফায, পৃ. ৫১৬-৫১৭)
• মোল্লা আলী ক্বারী (১০১৪ হি.) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইবনুল কাইয়্যিমের মাদারিজুস সালিকীন পড়বে, সে অবশ্যই বুঝতে পারবে যে ইবনু তাইমিয়া এবং ইবনুল কাইয়্যিম রহ. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর প্রথম পর্যায়ের আকাবির আলিম হিসেবে গণ্য এবং তারা আল্লাহর অলীদের অন্তর্ভুক্ত।' (মিরকাতুল মাফাতীহ, ৮/১৪৮)
এভাবে যুগে যুগে উম্মাহর ইমাম ও আলিমগণ ইবনু তাইমিয়া রহ. এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। হ্যা, অল্প সংখ্যক তাঁর সমালোচনাও করেছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলোর কারণ ছিল ব্যক্তি কিংবা মতাদর্শগত পার্থক্য। ফলে এর বাইরে দল-মত নির্বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমগণ তাঁর প্রশংসা করেছেন, তাঁর জ্ঞান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছেন। খাতিমাতুল মুহাক্কিকীন আল্লামা ইবনু আবিদীনও (১২৫২ হি.) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'রদ্দুল মুহতার' এ ইবনু তাইমিয়া রহ. এর নামের শুরুতে 'শাইখুল ইসলাম' উপাধি ব্যবহার করেছেন (রদ্দুল মুহতার ৪/২১৪)। ইমাম ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, শিবলী নোমানী রহ. তাঁর ব্যাপক প্রশংসা করেছেন। আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. তাঁর 'রিজালুল ফিকরি ওয়াদ দাওয়াহ' গ্রন্থের একটি স্বতন্ত্র খণ্ড ইবনু তাইমিয়া রহ. এর জীবনীর ওপর উৎসর্গ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা এই মহান ইমামের ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমাদেকে তাঁর ইলমের মাধ্যমে উপকৃত করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00