📄 একাদশতম মাসআলা: কবরের প্রশ্ন কি মুসলিম, মুনাফিক ও কাফির সকলের জন্য সমান? নাকি মুসলিম ও মুনাফিকের জন্য আলাদা?
উত্তর: কবরে সকলের জন্যই একই প্রশ্ন করা হবে। বারা ইবন 'আযিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,
«فإذا كان كافراً جاءه ملك الموت فجلس عند رأسه».
“অতঃপর কাফির ব্যক্তির মৃত্যুর সময় মালাকুল মাউত এসে তার মাথার কাছে বসবে।” এ হাদীসে এরপরে এসেছে,
«وَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ شَدِيدًا الانْتِهَارِ فَيَنْتَهِرَانِهِ وَيُجْلِسَانِهِ، فَيَقُولَانِ: مَنْ رَبُّكَ».
“তার কাছে ভয়ংকর চেহারার ধমকদানকারী দুজন ফিরিশতা আসবে, তারা ভর্ৎসনা করবে, তারা তাকে বসাবে, অতঃপর বলবে, তোমার রব কে?”⁷
আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে বলেছেন যে, তিনি কিয়ামতের দিনে কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস করবেন,
﴿وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ ﴾ [القصص: ٦٥]
“আর সেদিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা রাসূলদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে?” [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৬৫]
﴿فَوَرَبِّكَ لَنَسْلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [الحجر: ٩٢، ٩٣]
“অতএব তোমার রবের কসম, আমি তাদের সকলকে অবশ্যই জেরা করব, তারা যা করত, সে সম্পর্কে”। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯২-৯৩]
কিয়ামতের দিনে যেহেতু আল্লাহ কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, সেহেতু কবরে কীভাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না? (অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে)
টিকাঃ
⁷ ইসবাতু আযাবিল কবর, বাইহাকী, পৃষ্ঠা ৩৭; মুসনাদ আবু দাউদ ত্বয়ালিসী, হাদীস নং ৭৮৯।
📄 দ্বাদশতম মাসআলা: মুনকার ও নাকীরের প্রশ্ন কি এ উম্মতের জন্যই খাস নাকি অন্যান্য উম্মতেও জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল?
উত্তর: আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। প্রত্যেক জাতিই তাদের নবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তাদেরকে প্রশ্ন করে ও তাদের বিরুদ্ধে দলীল প্রমাণিত হওয়ার পরেই কবরে শাস্তি দেওয়া হবে, যেভাবে কিয়ামতের দিনে তাদেরকে জেরা করা ও দলীল-প্রমাণ সাব্যস্ত করার পরে শাস্তি দেওয়া হবে।
📄 ত্রয়োদশতম মাসআলা: শিশুরা কি কবরে জিজ্ঞাসিত হবে?
উত্তর: না, শিশুরা কবরে জিজ্ঞাসিত হবে না। কেননা যাদের রাসূল ও রাসূলের আনিত জিনিস সম্পর্কে জ্ঞান আছে তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। ফলে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তারা কি রাসূলের অনুসরণ করেছে, নাকি তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে? পক্ষান্তরে শিশু ভালো-মন্দ কিছুই পার্থক্য করতে পারে না, তাহলে তাদেরকে কীভাবে জিজ্ঞেস করা হবে?
অন্য দিকে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শিশুর জানাযার সালাত আদায় করলেন, তাকে এ দো'আ পড়তে শোনা গেছে,
«اللَّهُمَّ قِهِ عَذَابَ الْقَبْرِ».
“হে আল্লাহ আপনি তাকে কবরের 'আযাব থেকে রক্ষা করুন।”⁸ এখানে কবরের 'আযাব দ্বারা শিশুকে আনুগত্য না করা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকার কারণে কবরে শাস্তি দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; কেননা আল্লাহ কাউকে গুনাহ ব্যতীত শাস্তি দিবেন না। বরং এখানে কবরের 'আযাব বলতে অন্যের কারণে মৃত ব্যক্তির যে কষ্ট হবে সে কষ্টের কথা বুঝানো হয়েছে; যদিও তার কর্মের কারণে কবরে শাস্তি হবে না।
এ ধরণের 'আযাবের বর্ণনা অন্য হাদীসেও বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«إِنَّ المَيِّتَ لَيُعَذِّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ».
“মৃত ব্যক্তিকে তার জন্য বিলাপের কারণে কবরে 'আযাব দেওয়া হয়”।⁹ অর্থাৎ সে জীবিত ব্যক্তির কান্নার কারণে ব্যথিত হয় ও কষ্ট পায়, জীবিত ব্যক্তির গুনাহের কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ [الانعام: ١٦٤]
“আর কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৬৪]
এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«السَّفَرُ قِطْعَةُ مِنَ العَذَابِ».
“সফর 'আযাবের অংশ বিশেষ।”¹⁰ সুতরাং 'আযাব শাস্তির চেয়ে ব্যাপক। নিঃসন্দেহে কবরে অনেক দুঃখ-কষ্ট, দুঃশ্চিন্তা, হতাশা থাকবে যার প্রভাব শিশুর মধ্যে পরিলক্ষিত হবে। অতএব আল্লাহর কাছে কবরের 'আযাব থেকে শিশুর জন্য পানাহ চাওয়া মুসল্লির জন্য শরী'আতসম্মত। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
টিকাঃ
⁸ দো'আ, ত্বাবরানী, পৃষ্ঠা ৩৫৮, হাদীস নং ১১৮৭; মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং ৭৭৬।
⁹ মুত্তাফাকুন 'আলাইহি। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯২৭।
¹⁰ মুত্তাফাকুন 'আলাইহি। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯২৭।
📄 চতুর্দশতম মাসআলা: কবরের 'আযাব কি সর্বদা চলতে থাকবে নাকি তা মাঝে মাঝে হবে?
উত্তর: কবরের 'আযাব দু'ধরণের।
১- সার্বক্ষণিক 'আযাব। এর প্রমাণ আল্লাহ তা'আলার বাণী,
﴿النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيَّا ﴾ [غافر: ٤٦]
“আগুন, তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়।” [সূরা গাফের, আয়াত: ৪৬]
সামুরা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে 'আযাবপ্রাপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন,
«فهو يُفْعَلُ بِهِ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ».
“তার সাথে এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত করা হবে।”¹¹
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে 'আযাবপ্রাপ্ত দু'জনের কবরে খেজুরের ডাল পুঁতে রেখেছেন। সেখানে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لَعَلَّهُ يُخَفِّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا».
“হয়ত এ ডালগুলো শুকনো থাকা পর্যন্ত তাদের কবরের 'আযাব হালকা করা হবে।”¹² এ হাদীসে 'আযাব হালকা হওয়া নির্দিষ্ট সময়ের সাথে নির্ধারণ করা হয়েছে, আর তা হলো সেগুলো যতক্ষণ ভিজা থাকবে। তাহলে মূল হলো, কবরের 'আযাব সর্বদা চলতে থাকবে।
তবে কিছু হাদীসে বর্ণিত আছে যে, দু ফুৎকারের মাঝে তাদের কবরের 'আযাব হালকা করা হবে। যেহেতু তারা যখন কবর থেকে উঠবে তখন তারা বলবে,
﴿قَالُوا يَوَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَا ﴾ [يس: ٥٢]
“তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো?” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫২]
২- দ্বিতীয় প্রকারের কবরের 'আযাব নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। আর তা হবে কতিপয় গুনাহগারের 'আযাব; যাদের কিছু পাপ ছিল, সে অনুপাতে শাস্তি ভোগ করে তাদের 'আযাব বন্ধ রাখা হবে।
টিকাঃ
¹¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৮৬।
¹² সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২১৮।