📄 ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব মহান আল্লাহ তা'আলার। সালাত ও সালাম নবী ও রাসূলগণের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর বর্ষিত হোক।
অতঃপর, এটি কতিপয় সূক্ষ্ম মাসআলার সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা যা আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তার “কিতাবুর রূহ” তে উত্তর দিয়েছেন। আমি এতে আলিমগণের মতানৈক্য ও বিভিন্ন দলীল-প্রমাণ উল্লেখ ব্যতীত শুধু সঠিক জবাবগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করেছি, যাতে তালিবে ইলম ও সাধারণ মুসলিমদের বুঝতে সহজ হয়।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেনো এ কিতাবটি দ্বারা লেখক ও পাঠক উভয়কে উপকৃত করেন। আল্লাহর রহমত আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর বর্ষিত হোক।
সুলাইমান ইবন সালিহ আল-খারাশী
📄 প্রথম মাসআলা: মৃত ব্যক্তি কি জীবিত ব্যক্তির যিয়ারত ও সালাম বুঝতে পারে? না-কি বুঝে না?
জবাব: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«ما من مسلم يمر بقبر أخيه كان يعرفه في الدنيا فَيُسَلم عليه، إلا رد الله عليه روحه، حتى يرد عليه السلام».
“যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি দুনিয়াতে পরিচিত তার কোনো মৃত্যু ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে গমন করে এবং তাকে সালাম দিলে তখন তার সালামের উত্তর দেওয়ার জন্য আল্লাহ তার রূহকে ফেরত দেন।”¹ হাদীসের এ কথা দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারেন এবং তার সালামের উত্তর দেন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, কবরবাসীকে যখন তারা সালাম দিবেন তখন তাদেরকে মুখাতিব তথা উপস্থিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করার শব্দ দ্বারা সালাম দিবেন। ফলে মুসলিম কবরবাসীকে সালামের সময় বলবে,
«السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ».
“তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, হে মুমিনদের গৃহে বসবাসকারী।”²
মুতাওয়াতির সূত্রে সালাফদের থেকে অসংখ্য আসার (বাণী) বর্ণিত আছে যে, মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তির যিয়ারত বুঝতে পারেন এবং এতে সে খুশী হন।
কবর যিয়ারতকারী মুসলিমকে যিয়ারতকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারা যদি কারো উপস্থিতি অনুধাবন করতে না পারে তবে যিয়ারতকারীকে যায়ির তথা যিয়ারতকারী বলা হতো না। কেননা যার যিয়ারতের জন্য যাওয়া হয় সে যদি যিয়ারতকারীকে না জানে তবে এ কথা বলা শুদ্ধ হবে না যে, সে তার যিয়ারত করেছে। যিয়ারতের এ ব্যাপারটি সব জাতির কাছে জ্ঞাত ব্যাপার। এমনিভাবে কবরবাসীকে সালাম দেওয়া। কেননা যাকে সালাম দেওয়া হয় সে যদি তা বুঝতে না পারে এবং সালাম প্রদানকারীকে না জানে তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে সালাম দেওয়াও অসম্ভব। সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির জানাযার পরে তার কবরের পাশে কিছুক্ষণ কারো অবস্থান করে থাকা সে পছন্দ করে ও ভালোবাসে।³
টিকাঃ
¹ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসটি ইবন আব্দুল বার রহ. তার সনদে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, আল-ইসতিযকার, ১/১৮৫; আর-রূহ ফিল কালাম 'আলা আরওয়াহিল আমওয়াতি ওয়াল আহইয়াই বিদ-দালায়িলি মিনাল কিতাব ওয়াস-সুন্নাহ, ইবনুল কাইয়্যিম রহ. পৃষ্ঠা ৫।
² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৯।
³ দেখুন সহীহ মুসলিমের হাদীস নং ১২১। এতে 'আমর ইবনুল 'আস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু মৃত্যুর পূর্বে তার সন্তানকে বলেছিলেন, “আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট যবাই করে তার গোশত বণ্টন করতে যে সময় লাগে, ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে, যেনো তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্ক-মুক্ত অবস্থায় চিন্তা করতে পারি যে, আমার রবের দূতের (ফিরিশতার) কী জবাব দেবো।” -অনুবাদক
📄 দ্বিতীয় মাসআলা: মৃত ব্যক্তিদের রূহ কি পরস্পর মিলিত হয়
জবাব: রূহ দু'প্রকার:
১- 'আযাবপ্রাপ্ত রূহ – আল্লাহর কাছে পানাহ চাচ্ছি- এ ধরণের রূহ শাস্তি ভোগের কারণে ব্যস্ত থাকবে বলে পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ ও মিলিত হওয়া থেকে বিরত থাকবে।
২- নি'আমতপ্রাপ্ত রূহ। এসব রূহ বিচরণকারী হবে, এরা আবদ্ধ থাকবে না। তারা পরস্পর মিলিত হয়ে দুনিয়া ও দুনিয়ায় বসবাসকারীদের ব্যাপারে কথাবার্তা বলবেন এবং নিজেরা নিজেদের পরিচিতদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করবেন। প্রত্যেক রূহ তার আমল অনুযায়ী তার পরিচিত বন্ধুর সাথে থাকবেন। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোচ্চ বন্ধুর সাথে থাকবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
﴿وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَبِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّنَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُوْلَبِكَ رَفِيقًا ﴾ [النساء : ٦٩]
“আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে অনেক উত্তম।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯]
দুনিয়ায়, বারযাখে ও জান্নাতে এভাবে একত্রে থাকা সাব্যস্ত আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
﴿يَأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي ﴾ [الفجر: ٢٧ ، ٣١]
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে, সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও। আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।” [সূরা আল-ফাজর, আয়াত: ২৭-৩১] অর্থাৎ তাদের সাথে শামিল হও এবং তাদের সাথে থাকো। আর এ কথা মৃত্যুর সময় আত্মাকে বলা হবে।
আল্লাহ তা'আলা শহীদদের সম্পর্কে বলেছেন,
﴿ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ ﴾
“তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিযিক দেওয়া হয়।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯]
আল্লাহ তা'আলা শহীদদের সম্পর্কে আরও বলেছেন,
﴿يَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِم مِّنْ خَلْفِهِمْ﴾
“আর তারা উৎফুল্ল হয়, পরবর্তীদের থেকে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয় নি তাদের বিষয়ে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭০]
আল্লাহ তা'আলা শহীদদের সম্পর্কে আরও বলেছেন,
﴿يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ ﴾ [ال عمران: ١٦٩، ١٧١]
“তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নি'আমত ও অনুগ্রহ লাভ করে খুশি হয়।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭১] এ আয়াতসমূহ দ্বারা তাদের পরস্পর মিলিত হওয়া তিনভাবে প্রমাণিত হয়:
১- তারা (শহীদগণ) জীবিত। আর জীবিতরা পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, দেখা সাক্ষাৎ করে।
২- তারা তাদের পরবর্তীতে আগমনকারী ভাইদের আগমন ও তাদের সাথে দেখা হওয়ার ব্যাপারে আনন্দিত ও উৎফুল্ল।
৩- ﴾ يَسْتَبْشِرُونَ শব্দ প্রমাণ করে যে, তারা পরস্পর পরস্পরে সুসংবাদ দেয় ও খুশি হয়।
📄 পরস্পর সাক্ষাৎ করে ও কথাবার্তা বলে?
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।