📄 উপসংহার : সমাপ্তি নয়, নিরন্তর পথচলা
শেষের কথা হলো আল্লাহর পথে যাত্রার কোনো শেষ নেই, নেই কোনো পরিসমাপ্তি। যতদিন মানুষের জীবন আছে, ততদিন পর্যন্তই এই যাত্রা চলতেই থাকবে। মানুষের বিকাশ ও উন্নতির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, তাই আল্লাহর পথে যাত্রারও কোনো সীমা নেই।
তাছাড়া আবর্তন, বিবর্তন, অবস্থান্তর-এগুলো আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের জীবনেও অবস্থান্তর ঘটে থাকে। মানুষের অন্তর অতিশয় পরিবর্তনশীল। অন্তর একই অবস্থানে অনড় হয়ে আছে-এমনটা খুব কমই ঘটে থাকে। এ কারণে মানুষের সামনে উন্নতি ও অবনতি উভয়েরই সমান সম্ভাবনা থাকে। নিজেকে পরিশুদ্ধ করা, ব্যক্তিত্বকে গঠন করা, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা, দিব্যনেত্রে সত্য দর্শনের কাজে কখনোই বিরাম দেওয়া যায় না। সর্বক্ষণই মানুষকে উন্নতির জন্য চেষ্টা করতে থাকতে হয়। যদি কখনো অবনতি ঘটে যায়, সেক্ষেত্রেও নিজের দুর্বলতাকে দূর করে উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে হয়। এ কারণে আত্মশুদ্ধি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া (lifelong process), জীবনভর যাকে বাস্তবায়ন করতে থাকতে হয়, যতদিন না মৃত্যু এসে হাজির হচ্ছে।
وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
“আর আপনার প্রভুর ইবাদাত করতে থাকুন, যতক্ষণ না তোমার কাছে ইয়াকীন (মৃত্যু) উপস্থিত হয়।”
ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ
“অতঃপর তোমরা তা অবশ্যই নিশ্চয়তার চোখে (নিশ্চিত দৃষ্টিতে) দেখবে।”
নিরন্তর নিজের অন্তরের প্রতি খেয়াল রাখা হলে, ঈমান ও তাকওয়ার বোধ দ্বারা চিত্তকে পরিশীলিত করা হলে, জ্ঞান ও বুঝ দ্বারা অন্তরকে সজ্জিত করা হলে আশা করা যায় অন্তর আল্লাহর পথে নির্বিঘ্নে যাত্রা করতে থাকবে। তবুও সর্বদা সচেতন থাকা বাঞ্চনীয়, যেন অনাকাঙ্খিতভাবে ঝড়ো হাওয়ার মত কোনো ঘটনা, কোনো উদ্বেগ, কোনো কষ্ট, কোনো দুশ্চিন্তা, কোনো প্রলোভন, কোনো ঝোঁক এসে অন্তরকে হেলিয়ে দিতে না পারে। এ কারণে এমনটা কখনোই মনে করা যাবে না যে, আমার যাত্রার বুঝি অন্ত হয়েছে। না, আমাদের এই যাত্রার কখনোই অন্ত হতে পারে না, কেননা আমরা কখনোই নিশ্চিত হতে পারি না যে আমরা আসলেই সফল হয়েছি, যতক্ষণ না আমরা জান্নাতে প্রবেশ করছি। আর সেটা জানা সম্ভব একমাত্র মৃত্যুর পরে। আর তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজেকে মুক্তিপ্রাপ্ত মনে করে আল্লাহর দিকে যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। কারণ, এই পথে যাত্রা বন্ধ করা মানেই হচ্ছে ছিটকে পড়া।
হে সত্য স্বরূপ! হে জ্ঞান স্বরূপ! হে অনন্ত জ্ঞানজ্যোতি! হে অনন্ত প্রেমময় মহান সত্তা! হে নিত্য ও পূর্ণ পবিত্র! হে দোষ-পাপমুক্ত পরম সত্তা! হে আল্লাহ! আপনি নিজ গুণে এই দীনহীনকে সকল সমস্যার সত্য মীমাংসা দান করুন। সন্দেহ-সংশয়-কামনা-বাসনা-উদাসীনতা-নৈরাশ্যের অমানিশার অন্ধকার সমাচ্ছন্ন এই হৃদয়কে আপনার অতুলনীয় জ্ঞান-জ্যোতিতে উজ্জ্বল ও আলোকিত করুন। আমাদেরকে আপনার ব্যাপারে সঠিক ও নিঃসন্দিগ্ধ জ্ঞান ও বোধ দান করুন। আপনি আমাদের সম্মুখ থেকে সংশয়-মোহ-দ্বেষের আবরণ উন্মোচন করে দিন। আমাদেরকে আপন ক্ষমার গুণে মার্জনা করে দিন। আপনার মনোনীত দীন-ধর্মের ওপর আমাদের পা দুটিকে দৃঢ় রাখুন। আপনার পবিত্র শরীয়তের ওপর আমাদেরকে আমল করার সামর্থ্য দিন।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন সকল প্রকার পাপ ও পাপের ইচ্ছা থেকে। আমাদের অসুস্থ অন্তরকে নিরাময় দিন, এমন নিরাময় যার পরে আর কোনো অসুস্থতার আশঙ্কা করা হয় না। আপনার পথের এই যাত্রা আমাদের জন্য মসৃণ করে দিন। পথের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিন। আমাদের মন-চিত্ত-বোধি-অন্তরাত্মাকে আপনার প্রতি অবনত করে দিন। সত্যের নিষ্কলঙ্ক আলো দিয়ে আমাদেরকে আলোকিত করুন। আমাদেরকে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আপনার কাছে উপস্থিত হওয়ার সামর্থ্য দিন, যেন আমরা চিরন্তনভাবে সফল ও প্রকৃতার্থে মুক্তিপ্রাপ্তে পরিণত হই।
اللَّهُمَّ بِعِلْمِكَ الْغَيْبَ وَقُدْرَتِكَ عَلَى الْخَلْقِ أَحْيِنِي مَا عَلِمْتَ الْحَيَاةَ خَيْرًا لِي وَتَوَفَّنِي إِذَا عَلِمْتَ الْوَفَاةَ خَيْرًا لِي وَأَسْأَلُكَ خَشْيَتَكَ فِي الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ وَكَلِمَةَ الْإِخْلَاصِ فِي الرِّضَاءِ وَالْغَضَبِ وَأَسْأَلُكَ نَعِيمًا لَا يَنْفَدُ وَقُرَّةَ عَيْنٍ لَا تَنْقَطِعُ وَأَسْأَلُكَ الرَّضَاءَ بِالْقَضَاءِ وَبَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَلَذَّةَ النَّظَرِ إِلَى وَجْهِكَ وَالشَّوْقَ إِلَى لِقَائِكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ ضَرَّاءَ مُضِرَّةٍ وَفِتْنَةٍ مُضِلَّةٍ اللَّهُمَّ زَيَّنَا بِزِينَةِ الْإِيْمَانِ وَاجْعَلْنَا هُدَاةً مُهْتَدِينَ
হে আল্লাহ! আপনার অদৃশ্য জ্ঞান ও সৃষ্টি জগতের ওপর আপনার ক্ষমতার (কাছে আমি আশ্রয় চাই)। আমাকে ততদিন বাঁচিয়ে রাখুন যতদিন আপনার জ্ঞানানুযায়ী আমার বেঁচে থাকা কল্যাণকর হয়। আমাকে তখনই নিয়ে যান আপনার জ্ঞানানুযায়ী যখন চলে যাওয়াই আমার জন্য কল্যাণজনক হয়। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে চাই যেন গোপন ও প্রকাশ্য উভয়াবস্থায় আপনাকে ভয় করে চলতে পারি। আমি আপনার কাছে চাই যেন রাগ ও সন্তুষ্টি উভয়াবস্থায় সত্য কথা বলতে পারি। আপনার কাছে চাই যেন দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য উভয়াবস্থায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে পারি। আপনার কাছে চাই এমন অনুগ্রহ, যা কখনো শেষ হবে না। আপনার কাছে নিরবচ্ছিন্ন চক্ষু-শীতলকারী (অনুগ্রহ) চাই। আপনার কাছে চাই আমি যেন আপনার সিদ্ধান্ত খুশিমনে মেনে নিতে পারি। আপনার কাছে মৃত্যুর পর আরামদায়ক জীবন চাই। আপনার কাছে চাই (যেন পরকালে) আপনার দিকে তাকানোর মিষ্টতা (দুনিয়ায় স্মরণ রাখতে পারি)। আমি আপনার সাথে এমনভাবে সাক্ষাৎ করতে চাই যেন কোনো কষ্টদায়ক বেদনা না থাকে, না থাকে পথ-ভোলানো কোনো পরীক্ষা। হে আল্লাহ! আমাদেরকে ঈমানের সৌন্দর্য দিয়ে সুশোভিত করে দিন এবং আমাদেরকে বানিয়ে দিন সত্য ও সঠিক পথের পথিক ও দিশারী।
টিকাঃ
১. (সূরা হিজর, ১৫:৯৯)
২. (সূরা তাকাছুর, ১০২:৮)
১. (নাসাঈ)