📄 বিংশ পদক্ষেপ : ইয়াকীন ও যুহদ
“ইয়াকীনের নূর থাকলে তুমি দেখতে পেতে তুমি যতটা না আখিরাতের দিকে এগুচ্ছ, আখিরাত তার চাইতেও তোমার নিকটবর্তী। তখন তুমি বুঝতে পারতে দুনিয়ার সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির মধ্যে পতিত হচ্ছে।”
দুনিয়ার বুকে আল্লাহর পথে যাত্রা যতটা দীর্ঘ, আখিরাতে আল্লাহর দিকে যাত্রা তার চেয়েও অনেক বেশী দীর্ঘ। আমাদের কাউকেই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, মৃত্যু এক পরম বাস্তবতা। বিশ্বাসী হোক কিংবা অবিশ্বাসী, প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। নবী আমাদেরকে কেবলমাত্র এই দুনিয়ার জন্য কর্ম করতে, চেষ্টা-সংগ্রাম করতে নিষেধ করেছেন। এর অর্থ দুনিয়াকে পরিত্যাগ করা নয়, অবহেলা করাও নয়, বরং এর উদ্দিষ্ট আখিরাতকে ভুলে না যাওয়া এবং আখিরাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া। নবী বলেছেন,
“যে সকালে উঠবে এবং তার মূল মনোযোগ হবে দুনিয়া, আল্লাহ তার সকল বিষয়াদিকে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন, সে নিজেকে ভগ্ন মনে করবে এবং দুনিয়া থেকে সে কিছুই পাবে না যতটুকু তার ভাগ্যে লেখা আছে ততটুকু ছাড়া। অন্যদিকে যে সকালে উঠবে এবং তার মূল মনোযোগ হবে আখিরাত, তবে আল্লাহ তাকে একনিবিষ্ট ও পরিতুষ্ট অনুভব করাবেন এবং তাকে অমুখাপেক্ষীতার ভাব দান করবেন এবং দুনিয়া দান করবেন যদিও সে অনিচ্ছুক।”১
সকালে উঠেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, আমার মনের গহীনে কী লুকিয়ে আছে? কী আমার উদ্দেশ্য? আখিরাত নাকি দুনিয়া? যদি উদ্দেশ্য হয় আখিরাত তবে দেখবেন আপনার জীবন পরিপাটি ও গোছানো হবে, দুনিয়া আপনার সামনে হাজির হবে যদিও আপনি দুনিয়ার ব্যাপারে নিস্পৃহ। আর সকালে উঠে যদি আপনার চিন্তা হয় দুনিয়া তবে দেখবেন আপনার জীবন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। বহু উপার্জনের পরেও কোনো কিছুতেই আপনি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। এ ধরণের মানুষ অন্তরে সর্বদাই এক প্রকারের দারিদ্র্য ও প্রয়োজন অনুভব করতেই থাকে।
প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে আখিরাতকে চিন্তার জগতে স্থায়ী করে নেওয়া সম্ভব? কীভাবে সর্বদা আখিরাতকে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে? ইবনু আতার মতে এক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হচ্ছে বিশ্বাসের দৃঢ়তা। যার বিশ্বাস যত দৃঢ়, যত স্বচ্ছ, যত পরিচ্ছন্ন চিন্তার জগতে তা স্বাভাবিকভাবেই স্থায়ী হয়ে যায়। তার ভাষায়, “ইয়াকীনের নূর থাকলে তুমি দেখতে পেতে তুমি যতটা না আখিরাতের দিকে এগুচ্ছ, আখিরাত তার চাইতেও তোমার নিকটবর্তী। তখন তুমি বুঝতে পারতে দুনিয়ার সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির মধ্যে পতিত হচ্ছে।”
এখানে তিনি ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাসকে আখিরাতের স্মরণের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু এই ইয়াকীন কীভাবে আসে? এর উত্তর কুরআন দিচ্ছে এভাবে,
وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
"এবং আল্লাহর ইবাদাত করো ইয়াকীন আসা পর্যন্ত।”১
নবীর সাহাবীরা কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর ইবাদাত করার সময় এই ইয়াকীন উপলব্ধি করতে পারতেন। সাহাবীদের বর্ণনায় এসেছে, "আমরা যখন নবী ﷺ এর সাথে বসে ঈমানের বিষয়াদি আলোচনা করতাম তখন মনে হত নিজ চোখে জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করছি।”২
এর মানে এই নয় যে দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা হবে। আখিরাত স্মরণের জন্য দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে হবে এই ধারণাই ভুল। এই ভুল ধারণাই ভ্রান্ত অনুশীলনের দিকে নিয়ে যায়। দুনিয়ার জীবনের ব্যাপারে অনিচ্ছা মানে দুনিয়া পরিত্যাগ নয়, বরং আধ্যাত্মিক স্তরে আবিরাতকে সর্বদা অন্তরে জাগরুক রাখা। এটাই ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধের দাবী, আর ভারসাম্য ইসলামের দাবী।
لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ. وَابْتَغِ فِيْمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنُ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ.
"(সম্পদ নিয়ে) এত উল্লাস কোরো না; আল্লাহ উল্লাসকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের (সুখের) আবাস অন্বেষণ করো। দুনিয়ায় তোমার (বৈধ) অংশ ভুলে যেও না। আল্লাহ তোমার প্রতি যেমন অনুগ্রহ করেছেন তুমিও (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ করো। আর যমীনে গোলযোগ সৃষ্টি করতে চেও না। আল্লাহ গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।”১
ইবনু আতা আরও বলেছেন, “তখন তুমি বুঝতে পারতে দুনিয়ার সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির মধ্যে পতিত হচ্ছে"। দুনিয়া সার্বক্ষণিকভাবে বিলুপ্তির মধ্যে দিয়েই যাচ্ছে। হাসান বসরী বলেছেন, “হে আদমসন্তান! কিছু দিবস সমষ্টি ছাড়া তুমি আর কি? একেকটি দিন অতিবাহিত হওয়া মানে তোমার একটি অংশ বিলীন হয়ে যাওয়া।”
আখিরাতের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস থাকলে এই সত্যতা উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। তখন অন্তর্চক্ষু দিয়ে প্রত্যক্ষ করা যাবে কীভাবে ক্রমশ দুনিয়া বিলুপ্তির কৃষ্ণগহ্বরে অন্তলীন হয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধিই দুনিয়ার রঙ, রূপ, রস, গন্ধ ও আনন্দের ব্যাপারে উদাসীন করে দেয় এবং আখিরাতের আরও নিকটবর্তী করে দেয়। এ কারণে সবচাইতে দরকারী হলো সঠিক বুঝ ও উপলব্ধি, কেননা আমরা উপলব্ধি ও অনুভবের জগত থেকেই আগে আখিরাত থেকে বিমুখ হয়ে যাই এবং মৃত্যুর ব্যাপারে বিস্মৃত হই, এরপর যেয়েই আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার অনুসরণ করে।
শুধুমাত্র দুনিয়ার জন্যই কর্ম করা ইহকাল ও পরকালে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে আখিরাতকে স্মরণ করে কর্ম করা হলে উভয় জগতেই সাফল্য ধরা দেবে।
مَنْ كَانَ يُرِيدُ ثَوَابَ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ ثَوَابُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا بَصِيرًا.
“যে ইহকালের পুরষ্কার চায় (তার জানা উচিত), আল্লাহর কাছে ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেরই পুরষ্কার রয়েছে। আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।”১
মনে রাখতে হবে দুনিয়ার আনন্দ মানুষকে স্বাভাবিকভাবে উল্লসিত করে। তবে এই উল্লাস ও উৎফুল্ল যাতে আমাদের অন্তরের জগতে স্থায়ীভাবে বাসা না গাঁড়তে পারে। দুনিয়াবিমুখতার প্রকৃত অর্থ দুনিয়াকে হাতে রাখা, অন্তরে স্থান না দেওয়া। এটাই প্রকৃত যুহদ। অবিচলভাবে যুহদের পথে স্থির থাকা ইয়াকীন ছাড়া সম্ভব নয়। এ কারণে ইয়াকীন ও যুহদ পাশাপাশি চলে।
টিকাঃ
১. (তিরমিযী)
১. (সূরা হিজর, ১৫:১১)
২. (ইবনু মাজাহ)
১. (সূরা কাসাস, ২৮:৭৬-৭৭)
১. (সূরা নিসা, ৪:১৩৪)
📄 একবিংশ পদক্ষেপ : প্রশংসার মোকাবেলা
“মানুষ তোমাকে ধারণার ভিত্তিতে প্রশংসা করে, কিন্তু তুমি তো নিজের সম্পর্কে নিশ্চিতরূপেই জানো তুমি কি, সেই নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই তুমি নিজের সমালোচনা করো। সবচেয়ে বড় অজ্ঞ তো সে-ই যে নিজের কাছে থাকা নিশ্চিত জ্ঞানকে মানুষের কাছে থাকা ধারণার ভিত্তিতে পরিত্যাগ করে।"
বান্দা যখন আল্লাহর দিকে এগুতে থাকে তখন সে একটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তা হলো মানুষের প্রশংসা। তার ধার্মিকতা, উত্তম আচরণ, জ্ঞান, গভীর বুঝ, ইবাদাত ইত্যাদির কারণে মানুষ তার ব্যাপারে এটা ওটা ভেবে প্রশংসা করতে থাকে। মানুষের প্রশংসা একাধিক দিক থেকে বিপদের কারণ। হতে পারে প্রশংসার কারণে ব্যক্তি আল্লাহর রাজিখুশীর বদলে মানুষের রাজিখুশীর জন্য আমল করবে, হতে পারে এমন কাজই করবে যা তাকে অধিক পরিমাণে মানুষের প্রশংসা কুড়াতে সহায়তা করবে এবং সমালোচনা থেকে দূরে রাখবে কিংবা প্রশংসার কারণে ব্যক্তি নিজের দোষত্রুটি দেখার বদলে কেবল নিজের মাঝে ভালো দিকের প্রতিই অধিক মনোযোগী হয়ে পড়বে। এর সবগুলোই সমূহ বিপদের কারণ। সম্ভাবনা আছে সে আল্লাহর পথ থেকে ছিটকেও পড়তে পারে।
নবী এর সামনে একজন আরেকজনকে প্রশংসা করছিলো। এই দেখে তিনি বলেছিলেন, “তুমি তো তোমার ভাইয়ের গলা কেটে দিলে!”১
তিনি আরও বলেছেন, “কাউকে (মুখের সামনে) প্রশংসা করতে দেখলে তার দিকে ধুলা নিক্ষেপ করবে।”২
তাহলে এই প্রশংসারূপ বিপদকে কীভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব? ইবনু আতা এ কারণেই বলেছেন, "মানুষ তোমাকে ধারণার ভিত্তিতে প্রশংসা করে, কিন্তু তুমি তো নিশ্চিতরূপেই জানো তোমার মধ্যে কি আছে না আছে।" মানুষ বাহির থেকে দেখে ভাবে এই মানুষটা বোধহয় এরকম এরকম, কিন্তু ব্যক্তি নিজে তার অবস্থা সম্পর্কে সবচাইতে ভালো জানে। এ কারণে প্রশংসা করা হলে ব্যক্তির উচিত নিজের দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করা। মানুষের প্রশংসার বদলে নিজের দোষত্রুটিকে সামনে নিয়ে আসা। দেখা যাবে মানুষ তার ব্যাপারে যা যা বলছে তা আসলে ঠিক নয়। আর যদি তা ঠিক হয়েও থাকে তা তার অদৃশ্যমান দোষত্রুটির চাইতে অনেক কম। দৃশ্যমান প্রশংসাকে অদৃশ্যমান ও গুপ্ত দোষত্রুটি দিয়ে মোকাবেলা করাই সর্বোত্তম। ইবনু আতা বলেছেন, "মানুষ তোমাকে ধারণার ভিত্তিতে প্রশংসা করে, কিন্তু তুমি তো নিজের সম্পর্কে নিশ্চিতরূপেই জানো তুমি কি, সেই নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই তুমি নিজের সমালোচনা করো।"
আলী ইবনু আবি তালিব রাদিআল্লাহু আনহু মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে যেয়ে বলেন, "যখন তাঁদের প্রশংসা করা হয় তাঁরা ভীত হয়। তাঁরা বলে, অন্যদের চাইতে আমি নিজেই আমার সম্পর্কে ভালো জানি। আমার রব এর চাইতেও উত্তমভাবে আমার সম্পর্কে জানেন। হে আল্লাহ! তারা যা বলছে আমাকে সে ব্যাপারে মাফ করে দিন, এর জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না এবং তাদের ধারণার চাইতেও আমাকে উত্তম বানিয়ে দিন।"
মানুষ আমার সম্পর্কে যা জানে তা তো কেবল ধারণামাত্র, তাদের সেই ধারণা নিতান্তই বাহ্যিকতার ওপর ভিত্তিশীল। সেই ধারণা সঠিকও হতে পারে তেমনি ভুলও হতে পারে। কিন্তু আমি আমার সম্পর্কে জানি যা আমি প্রকাশ করি আর যা আমি গোপন রাখি, এটাও জানি আমি আমার প্রকৃত সত্তার কতটুকু প্রকাশ করি এবং কতটুকু গোপন রাখি। এ কারণে নিজের সম্পর্কে আমার জ্ঞান-ধারণার ওপর নির্ভরশীল নয়, তা ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাস। ধারণা আর ইয়াকীন কখনোই বরাবর নয়। ইয়াকীন নিঃসন্দেহে প্রাধান্য পায়। এ কারণে আমি অন্যদের চাইতে নিজেকে ভালোভাবে জানবো-এটাই তো স্বাভাবিক।
ওপরের দুআটির মর্ম হচ্ছে-হে আল্লাহ! মানুষ আমাকে আমার প্রকাশিত সত্তার কারণে প্রশংসা করছে, হতে পারে আমি সচেতনভাবেই নিজের প্রকৃত সত্তাকে প্রকাশ করছি না, হতে পারে স্বাভাবিকভাবে যা প্রকাশ পাচ্ছে তা অপ্রকাশ্য সত্তার চাইতে কম কুৎসিত, তাই আমাকে মাফ করে দিন তাদের ধারণাভিত্তিক প্রশংসার কারণে, এ কারণে আমাকে পাকড়াও করবেন না, তারা আমার ব্যাপারে যা ধারণা করছে আমাকে তাওফীক দিন নিজেকে পরিশুদ্ধ করার, সামর্থ্য দিন এর চেয়েও উত্তম করে নিজেকে গড়ে তুলতে।
তিনি আরও বলেছেন, “সবচেয়ে বড় অজ্ঞ তো সে-ই যে নিজের কাছে থাকা নিশ্চিত জ্ঞানকে মানুষের কাছে থাকা ধারণার ভিত্তিতে পরিত্যাগ করে।" ইসলাম দীন হিসেবে সুস্থ আকল ও বিশুদ্ধ ফিতরাতপন্থী হওয়ার কারণে সাধারণভাবেই ইয়াকীন প্রত্যাশা করে, সর্বক্ষেত্রেই। এখানেও একই কথা প্রযোজ্য, মানুষের উচিত নয় নিজের ব্যাপারে নিজস্ব নিশ্চিত জ্ঞানকে মানুষের ধারণাভিত্তিক জ্ঞানের কারণে পরিত্যাগ করা। যে এমনটা করে সে বড়ই অজ্ঞতার পরিচয় দেয়। এর মাধ্যমে সে নিজেকে অধিক পরিশুদ্ধ করার, সত্যকে আরও নিবিড়ভাবে জানার, আল্লাহর আরও নৈকট্যবর্তী হওয়ার সুযোগ হারায়।
কিন্তু কখনো কখনো মানুষ না চাইতেও প্রশংসা পেয়ে যায়। এটা তার জন্য এক প্রকারের সুসংবাদ, আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া ফযীলত ও মর্যাদা। তবে এই প্রশংসা যাতে নিজেকে নিশ্চিত করতে না পারে, নিজের মাঝে নিজের প্রতি বিস্ময় (আমি কি না কি হয়ে গেছি) সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। এদিকেও সজাগ থাকা প্রয়োজন যে এই প্রশংসাকে আমি নিশ্চিত কিছু মনে করে নিজের অভ্যন্তরীণ দোষত্রুটির ব্যাপারে বেখেয়াল রইলাম।
টিকাঃ
১. (বুখারী)
২. (ইবনু হিব্বান)
📄 দ্বাবিংশ পদক্ষেপ : ভুলকারীর সাথে রহমত প্রদর্শন
“যে মানুষের রহস্য সম্পর্কে জানে কিন্তু ঐশী করুণার গুণে গুণান্বিত হতে পারেনি তার এই অবগতি তার জন্য পরীক্ষা ও দুর্ভাগ্য আপতনের কারণ হতে পারে।”
ব্যক্তি যখন আল্লাহর পথে অগ্রসর হতে থাকে স্বাভাবিকভাবেই তার মাঝে জ্ঞানের প্রবৃদ্ধি ঘটতে থাকে, প্রজ্ঞা প্রস্ফুটিত হতে থাকে, বোধ পরিশুদ্ধ হতে থাকে, এমন সূক্ষ্মতা আসতে থাকে যা অন্য কারো মাঝে পাওয়া যায় না। তখন সে অন্যদের অবস্থা- দুরবস্থা, পরিস্থিতি, অন্তরের হালত, দুর্বলতা-সবলতা ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ এক ফযীলত বা মর্যাদা। আল্লাহর পথের পথিকদের উচিত এক্ষেত্রে রহমতে ইলাহিয়্যাহ বা ঐশী করুণার ভিত্তিতে কাজ করা। কীভাবে?
প্রথমত, আল্লাহর রহমতের দাবী হচ্ছে মানুষের দোষত্রুটি গোপন করে রাখা। আল্লাহ হচ্ছেন আস-সাত্তার বা আচ্ছাদনকারী, অর্থাৎ, তিনি বান্দার দোষত্রুটি গোপন করে রাখেন, লুক্কায়িত করেন।
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَبِيٌّ سِتِّيرُ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ.
“আল্লাহ হচ্ছেন হাইয়্যি বা পরম লজ্জাশীল ও আস-সিত্তির বা আচ্ছাদনকারী। তিনি লজ্জাশীলতা ও (দোষত্রুটি) গোপন রাখাকে ভালোবাসেন।”১
এ কারণে মানুষের গোপন ত্রুটি প্রকাশ করা, অপমানিত করা ও কষ্ট দেওয়া ইসলামে কবীরা গুনাহ বলে সাব্যস্ত। দোষত্রুটি গোপন রাখার ফযীলত যেমন বর্ণিত হয়েছে তেমনি তা প্রকাশ করার মারাত্মক শাস্তির কথাও বর্ণনায় এসেছে।
নবী ﷺ বলেছেন, “যে তার মুসলিম ভাইয়ের গোপনীয়তা বজায় রাখে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। যে মুসলিম ভাইয়ের গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয় আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার গোপনীয়তা ফাঁস করে দেবেন। এমনকি সে বাড়ীতে থাকলেও আল্লাহ তাকে অপমানিত করে ছাড়বেন।”১
দ্বিতীয়ত, রহমতের দাবী হচ্ছে দোষত্রুটি গোপন রেখে তাদের সংস্কার ও সংশোধনের চেষ্টা করা, তাদেরকে কল্যাণের পথ দেখিয়ে দেওয়া-উত্তম কথা, নসীহত ও উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে। নবী ﷺ এর সাধারণ নীতি এমনই ছিলো। এমনকি মুনাফিক, যাদের কুফর ও বিভ্রান্তির ব্যাপারে নবীজীর নিশ্চিত অবগতি ছিলো, তাদের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাকে একই নির্দেশ দিয়েছেন।
أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُلْ لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيْخًا
এরাই তারা, যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো, তাদেরকে সদুপদেশ দাও এবং তাদেরকে তাদের মর্ম স্পর্শ করে এমন কথা বলো।২
তৃতীয়ত, মানুষের ব্যাপারে সূক্ষ্ম জ্ঞান তাদের ওপর এক ধরণের অদৃশ্য কর্তৃত্বের মত। এই জ্ঞান অনেককে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে ব্যবহারের দিকে প্রলুব্ধ করতে পারে বা উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু রহমতের দাবী হচ্ছে নিজস্ব কল্যাণ বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়; বরং সৃষ্টির কল্যাণ ও তাদের সংশোধনের নিয়্যাতে এই জ্ঞানকে ব্যবহার করা।
যে ব্যক্তি এ জ্ঞান পাওয়ার পর নিজেকে ঐশী দয়ার গুণে সজ্জিত করবে না এই জ্ঞান তার জন্য পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। এই পরীক্ষা তাদের ওপর মানুষের ওপর অনর্থক কর্তৃত্ব ও দখল স্থাপনের বাসনা, দম্ভ-অহংকার, হিংসাবিদ্বেষ, নিজের ব্যাপারে ভালো ধারণা ও অন্যের ব্যাপারে বদধারণা রাখাসহ নানাভাবেই প্রকাশিত হতে পারে। তার দ্বারা এমন যুলুম প্রকাশ পেতে পারে যার জন্যে তাকে দুনিয়া কিংবা আখিরাতে অথবা দু জগতেই শাস্তির সম্মুখীন হওয়া লাগবে। হাদীছে এসেছে যুলুম দুনিয়ার বুকে ও আখিরাতের ময়দানে সবচেয়ে দ্রুত শাস্তি টেনে আনে।১
আল্লাহ আমাদের এ পাপ থেকে হেফাযত করুন। আল্লাহর পথের পথিকদের এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অন্তর যত সূক্ষ্মতা লাভ করতে থাকে বিপদের আশঙ্কাও ততই বাড়তে থাকে। ওপরে উঠতে সময় লাগে, পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু নিচে পতিত হওয়ার জন্য সময় কিংবা পরিশ্রম কোনোটারই প্রয়োজন হয় না।
টিকাঃ
১. (আবু দাউদ)
১. (ইবনু মাজাহ)
২. (সূরা নিসা, ৪:৬৩)
১. (আদাবুল মুফরাদ)
📄 ত্রিবিংশ পদক্ষেপ : অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ সম্পাদন
“প্রবৃত্তির অনুসরণের নিদর্শন হচ্ছে ওয়াজিব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলস্য করে নফলের দিকে দ্রুতধাবন করা।"
নবী বলেছেন, “আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দীনের ফিকহ দান করেন।" (বুখারী)
এখানে 'ফিকহ' অর্থ দীনের বুঝ বা সমঝ, যাকে ফাহমও বলা হয়ে থাকে। তবে এখানে বুঝ বা ফিকহ-এর দ্বারা প্রচলিত অর্থে কেবল শাখাগত কিছু মাসআলা- মাসায়েল জানাই উদ্দিষ্ট নয়; বরং এর মূল মর্ম, তত্ত্ব সম্পর্কেও জানা, গভীরভাবে দীনের হাকীকত উপলব্ধি করতে পারাও উদ্দিষ্ট। এই হাকীকত উপলব্ধির একটি অংশ দীনের বিভিন্ন বিধানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং এদের ক্রমধারা সম্পর্কে জানা। কোনটি আগে কোনটি পরে, কোন বিধানটি বিলম্বে পালন করা যেতে পারে, কোনটির মাঝে কোনো প্রকারেই বিলম্বের সুযোগ নেই ইত্যাদি সম্পর্কে জানা।
আমাদের দীন সর্বক্ষেত্রেই ক্রমধারার প্রতি লক্ষ রাখে এবং প্রত্যাশা করে যে এর অনুসারীরাও এ ব্যাপারে সজাগ থাকবে। আগে মূল তারপর শাখা, আগে উসূল তারপর ফুরু, বাহ্যিকতার আগে অভ্যন্তর, বহিঃস্থের পূর্বে অন্তঃস্থ, নফলের আগে ওয়াজিব, সুন্নাতের আগে ফরয, সবার আগে ঈমান-এর সবগুলোই ক্রমধারা। ক্রমধারার ভিত্তিতে আমলসমূহকে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেওয়া দীনের সঠিক ও যুৎসই বুঝের জন্য একান্তই জরুরী বিবেচ্য।
নফলের ফযীলত যতই বর্ণিত থাক তা কখনোই একটি ফরযের সমানও নয়। যেমন-কেউ তাহিয়্যাতুল মসজিদের ফযীলতের কথা জানতে পারলো। ফরযের সময় ইমাম সাহেব মুক্তাদীদেরকে নিয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলো, আর এই সাহেব তাহিয়্যাতুল মসজিদের ফযীলত লাভের আশায় তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে ফরয পড়তে গেলো। নিঃসন্দেহে এমনটা করা জায়েজ নয়। কেননা, সাধারণাবস্থায় ফরয সালাতের ইকামত হয়ে গেলে আর ওই নির্দিষ্ট ফরয ছাড়া কোনো প্রকার সালাত পড়া জায়েজ নয়।
প্রত্যেক শাখা মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে মূল শাখার দিকে নয়। যেমন-শাখাগত মাসআলার সাথে সম্পৃক্ত দলীল বা নস অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মূলনীতি ও ইসলানে সামগ্রিক মাকসাদ বা উদ্দেশ্যের আলোকেই বুঝতে হবে। শাখাকে মূল থেকে পৃথক করে কিংবা শাখাকে মূল ধরে, ফুরু-কে উসূল ধরে দীন বুঝতে গেলে মূলের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে দীনের সঠিক বুঝ যেমন সম্ভব নয় তেমনি মানুষের কাছে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের সম্ভাবনা তৈরী হয়। তাই ইসলামের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাধান্যতা হবে ক্রমধারা অনুযায়ী, (তথা প্রথমে মূলনীতি বুঝতে হবে এরপর শাখাগত বিষয়গুলো একেরপর এক আসবে।) এটাই দীনে ফিতরাতের মৌলিকতা ও এর সাধারণ দাবী।
কিন্তু আমরা উম্মাহকে অনেকক্ষেত্রেই এই ক্রমধারার দিকে লক্ষ রাখতে দেখি না। তারা অন্তরের পরিবর্তন ও অন্তরে ঈমানের যথাযথ বিকাশের আগে পাঞ্জাবী-টুপির দিকে অধিক মনোযোগ দেখায়; বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা অবশ্যই অন্তরের ঈমান পরিস্ফুটনের আগে স্থান পাবে না। অনেককে দেখা যায় দীনের মাকসাদ বা উদ্দেশ্যের চাইতে বাহ্যিকতার দিকেই অধিক নিবিষ্ট। অনেকে ফরয পালন না করেই নফল পালন করতে ব্যস্ত হয়ে যায়। অনেকে সুস্পষ্ট হারামে লিপ্ত, রাতদিন আমানতের খেয়ানত করে, দিবানিশি মা-বাবার সাথে খারাপ আচরণ করে, তাদের সাথে সম্পর্ক ভালো নয়, বোনদের সম্পত্তি নষ্ট করে, অধিকারীকে যথাযথ অধিকার দেয় না কিন্তু তারা মসজিদের কমিটির সভাপতি, ওয়াজ-মাহফিলে আয়োজনে তাদের অত্যধিক আগ্রহ। এগুলো ভালো কাজ নিঃসন্দেহে, কিন্তু হারাম ত্যাগ না করে বা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে এসব নফল কাজ করে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জীবনেও পড়ে না, কিন্তু শবে বরাত, শবে কদর আর ঈদের সালাতের দিন তারা খুব আগ্রহভরে সালাত পড়ে, রাত জাগরণ করে। এগুলো নফল সালাত, ফযীলতও আছে, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে ফরয সালাতের মত নয়।
ক্রমধারার দিকে মনোযোগী না হওয়া সকল মুসলিমের জন্যই কমবেশি ক্ষতিকর, কিন্তু আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য এটা আরও বেশি ক্ষতিকর। ইবনু আতা এ কারণেই বলেছেন, “প্রবৃত্তির অনুসরণের নিদর্শন হচ্ছে ওয়াজিব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলস্য করে নফলের দিকে দ্রুতধাবন করা।" কারণ, যে শরীয়তের অনুসারী তার জানার কথা ফরয/ওয়াজিব আমলই আল্লাহর কাছে সর্বাগ্রাধিকার পাবে। আল্লাহ এগুলোর হিসাবই আগে নেবেন। এগুলোই আসল, বাকীগুলো অতিরিক্ত। তারপরেও যে এমনটা না করে ক্রমধারাকে উল্টে দিয়ে ফরয/ওয়াজিবের আগেই নফল বা অতিরিক্ত নিয়ে মাতামাতি করে, সে নিঃসন্দেহে পবিত্র শরীয়তের নয় বরং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে। একটি বিখ্যাত হাদীছে কুদসীতে এসেছে,
"বান্দা আমার নির্ধারিত ফরয বা আবশ্যক দায়িত্ব পালন করার মত আর কোনোভাবেই আমার নিকটবর্তী হতে পারে না। এরপর বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতেই থাকে, এমনকি আমি তাঁকে ভালোবেসে ফেলি। এক সময় আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যে হাত দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে চাইলে আমি তাকে তা দেই। সে আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দেই।"১
টিকাঃ
১. (বুখারী)