📄 সপ্তদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর সাহচর্য উপভোগ ও তাঁর নিকট দুআ
“তিনি যদি তোমার থেকে আপনজনদের দূরে নিয়ে যান, তবে জেনে রাখো তিনি তোমার জন্য তাঁর সাহচর্যের দ্বার খুলে দিচ্ছেন। "তিনি যদি তোমাকে দুআ করার সামর্থ্য দেন, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে কিছু দিতে চাচ্ছেন।”
কখনো কখনো আমাদের প্রিয়জন মারা যায়, আমরা বহুদূরের দেশে চলে যাই, কখনো হতে পারি কারাবন্দী, কিংবা হতে পারি রোগের কারণে হাসপাতালবন্দী। এসকল কিছুই আসলে পরীক্ষা, যা তিনি আমাদের কল্যাণার্থেই দিয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে আত্মীয়তা, বন্ধুত্বের বন্ধনের প্রকৃত সত্য উন্মোচন করে আমাদেরকে তাঁর সঙ্গের দিকে পরিচালিত করেন। সর্বদা পিতামাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গবেষ্টিত থাকার কারণে আমরা আল্লাহকে স্মরণের সময় পাই না। কিন্তু এরাই যখন আমাদের থেকে দূরে চলে যায় তখন আমরা একনিষ্ঠতা ও মনোযোগীতার সাথে আল্লাহকে স্মরণ করার ফুরসত পাই। বিচ্ছিন্নতাকে আপনি হয়ত পরীক্ষা ভাবছেন, উপলব্ধি করতে পারলে তা আসলে এক মহান নিআমত।
ইসলামী ইতিহাসে এরকম অনেক আলিম আছেন যারা কারাবন্দী হয়েও অবিস্মরণীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেননা, তারা প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদের এ সময়টিকে শাস্তি নয়; বরং উপহার হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অন্যান্য সময় সাধারণ যে ব্যস্ততা থাকে সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রাখার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।১
ইবনু আতা বলছেন, “তিনি যদি তোমাকে দুআ করার সামর্থ্য দেন, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে কিছু দিতে চাচ্ছেন।” অনেক সময় বিপদ এতটা সঙ্গীন হয় যে, আল্লাহর কাছে দুআ করা ছাড়া অন্য কোনো পথই খোলা থাকে না। হতে পারে এর আগে আপনি উদাসীন ছিলেন। আল্লাহর কাছে আপনি একনিষ্ঠভাবে দুআ করতেন না। করলেও তাতে দুআর প্রাণ থাকত না। এরকম একটি বিপদ দিয়ে তিনি আপনাকে তাঁর কাছে একনিষ্ঠভাবে দুআ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ
“আচ্ছা! কে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন?”১
এরূপ অবস্থাও আপনার জন্য কল্যাণজনক। কেননা, দুআর মাধ্যমে আপনি সর্বক্ষণ ইবাদাতের মধ্যেই অতিবাহিত করছেন। নবী বলেছেন,
“দুআ হলো ইবাদাত।”২
এ কারণে বিপদাপদকে কখনোই সংকীর্ণ বস্তুগত প্রাপ্তি কিংবা বিয়োগের মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক। কখনো তিনি বিপদের পর বিপদ দিয়ে আপনাকে ভারাক্রান্ত করেন যাতে তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক উন্নত হয়। আপনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে আরও ইখলাস ও ঐকান্তিকতার সাথে ডাকেন। এটা নিঃসন্দেহে বড় নিআমত।
টিকাঃ
১. এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইমাম সারাখসী, যিনি আল-মাবসূত নামের ফিকহী বিশ্বকোষের রচয়িতা, গোটা গ্রন্থটিই আসলে কারাগারে থেকে রচিত। তিনি ছাত্রদেরকে বলতেন আর ছাত্ররা সেটা লিপিবদ্ধ করে নিত। এভাবেই ত্রিশোর্ধ্ব খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থটি পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছে।
১. (সূরা নামল, ২৭:৬২)
২. (তিরমিযী)
📄 অষ্টাদশ পদক্ষেপ : ইবাদাতের মানোন্নয়ন
“তিনি তোমার বাস্তবতা সম্পর্কে জানেন। এ কারণে তিনি ইবাদাতকে বৈচিত্র্যময় করে দিয়েছেন। কিছু কিছু ইবাদাতকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাই তাকে অতিক্রম করতে যেও না। ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল তা পালন করা নয়; বরং তা পূর্ণাঙ্গতার সাথে পালন করা। প্রত্যেক পালনকারী পূর্ণাঙ্গতাদানকারী হয় না।”
আমরা এখন আল্লাহর পথে যাত্রার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, তা হলো ইবাদাতের মানোন্নয়ন। মুমিন নিরন্তর ইবাদাত করার কারণে কখনো কখনো একঘেয়েমিতা অনুভব করতে পারে। আল্লাহ পরম করুণাময়, তিনি মানুষের এই স্বভাব সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত। এ কারণেই তিনি ইবাদাতকে বৈচিত্র্যময় করে দিয়েছেন, এর প্রকার ও সময়ের দিক থেকে।
যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। এটা আল্লাহ আবশ্যক করে দিয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও কিছু সালাত আছে যা অতিরিক্ত বা নফল, যেমন-তাহাজ্জুদ, শুকরিয়ার সালাত, প্রয়োজনের সময়কার সালাত ও প্রমুখ। মুমিন যদি নফল সালাতে একঘেয়েমিতা বোধ করে তবে সে কেবল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়েই ক্ষান্ত দিতে পারে। সেসময়টায় নফল সালাতের পরিবর্তে অন্যান্য নফল ইবাদাত-যেমন : দান-সাদাকা, উমরা, জ্ঞানার্জন, প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়া, মানুষকে সাহায্য করা, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া-করতে পারে। এসকল নফল ইবাদাতই তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে সাহায্য করবে।
মানুষ বৈচিত্র্যময়। এ বৈচিত্র্য কেবল শারিরীক ক্ষমতার দিক থেকেই নয়, বরং কোনো কাজকে উদ্যম ও স্ফূর্তির সাথে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও। এ কারণে আল্লাহ ইবাদাতের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য রেখেছেন। একইভাবে কিছু কাজকে নির্দিষ্ট কিছু সময়ে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। নবী বলেছেন,
"নিশ্চয়ই এই দীন দৃঢ়। তাই দৃঢ়তার সাথেই একে প্রয়োগ করো। যে তার বাহনের প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা প্রদর্শন করে সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না, তার আগেই বাহন পথিমধ্যে মারা যাবে।"
এ কারণে সূর্যাস্ত, দুপুরের ঠিক পূর্বমুহূর্তে কিংবা আসরের পরে আমাদেরকে সালাত পড়তে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বছরের সবদিন সিয়াম রাখা গেলেও রমাদানের আগের কয়টা দিন কিংবা ঈদের দিন সিয়াম রাখতে নিষিদ্ধতার ব্যাপারে বর্ণনা এসেছে।
আল্লাহ চান আমরা যাতে ইবাদাতের মান উন্নয়ন করে উত্তরোত্তর বিকশিত হই এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে থাকি। ইবনু আতা বলেছেন, “ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল তা পালন করা নয়; বরং তা পূর্ণাঙ্গতার সাথে পালন করা। প্রত্যেক পালনকারী পূর্ণাঙ্গতাদানকারী হয় না।" আল্লাহ সালাতের ক্ষেত্রে বলেছেন, وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ "আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো।”১
সালাত প্রতিষ্ঠা করার অর্থ কেবলমাত্র সালাত আদায় করা নয়, এর অর্থ সালাতের সাথে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে নেওয়া, সালাতের সময় নিজেকে বিনয়ী ও মনোযোগী করা, সমাজে সালাত প্রতিষ্ঠা করা, সালাত আদায়ের পরিবেশ তৈরী করা। সালাত প্রতিষ্ঠা করাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
“অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে।”২
একঘেয়েমিতা, বিরক্তি কিংবা ক্লান্তি অনুভব করলে সেখানে অন্তরের সংযোগ বজায় থাকে না, বিচ্ছিন্ন হয়। সালাতেও যদি ক্লান্তি চলে আসে তখন তা আর বিনয় উদগত করতে পারে না। কিন্তু সালাতের মূলই হচ্ছে বিনয় বা খুশু। আলিমগণ সালাতের খুশুর তিনটি পর্যায় বর্ণনা করেছেন,
প্রথম পর্যায়, তুচ্ছতা অনুভব করা। এর মানে হলো নিজেকে আল্লাহর সামনে তুচ্ছ ও মূল্যহীন বলে মনে করা। অন্তরের এই ভাব সালাতের গতিবিধিতে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। গোটা সালাতের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর বড়ত্ব ও নিজেদের তুচ্ছতা প্রকাশ করে থাকি। আল্লাহকে বড় তখনই মনে করা সম্ভব যখন আল্লাহর প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে মুখাপেক্ষীতা অনুভব করবো।
দ্বিতীয় পর্যায়, আল্লাহর প্রতি বিস্ময়াবিষ্টতা। এটি তুচ্ছতার স্তর থেকে উর্দ্ধতন। এ স্তরে উঠে বান্দা নিজেকে তুচ্ছ ভাবার পাশাপাশি আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের কারণে তাঁর প্রতি প্রবল ভক্তিশ্রদ্ধা উপলব্ধি করতে থাকে। এই বিনয় ও বিনম্রতাই ভেতর থেকে ক্রন্দন উৎপত্তি করে থাকে।
إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ أَيْتُ الرَّحْمَنِ خَرُوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
"তাদের নিকট দয়াময়ের আয়াত তেলাওয়াত করা হলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত ক্রন্দন করতে করতে।”১
اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتٰبًا مُّتَشْبِهًا مَّثَانِي تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ
“আল্লাহ অতি উত্তম বাণী নাযিল করেছেন, তা এমন কিতাব যা সুসামঞ্জস্য, বার বার তিলাওয়াত করা হয়। এতে তাদের দেহ রোমাঞ্চিত হয় যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, অতঃপর তাদের দেহ ও তাদের অন্তর বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটাই আল্লাহর হিদায়াত, এর দ্বারা তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন, আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই।"১
তৃতীয় পর্যায়, প্রসন্নতা। সালাতের খুশুর সর্বোত্তম পর্যায় হচ্ছে প্রসন্নতা, অর্থাৎ, আল্লাহর সঙ্গ পেয়ে সুখানুভব করা। কুরআনে আল্লাহর নাম আসলে অন্তরে প্রসন্নতা ও খুশীর ভাব সঞ্চার হওয়া সালাতের সর্বোচ্চ স্তরের বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ। এরূপ প্রশান্ত ও স্থিরাবস্থায় ফেরেশতারা নেমে এসে কুরআন শ্রবণ করতে থাকেন। এরকমও বর্ণনা পাওয়া যায় যে, সাহাবীরা কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন এবং ফেরেশতারা মেঘের মধ্য দিয়ে সেই কুরআন শ্রবণ করছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
বোঝাই যাচ্ছে খুশু কেবলমাত্র তখনই আসা সম্ভব যখন তা অন্তরের ভাবাবেগের সাথে আদায় করা হবে। ক্লান্তি বা বিরক্তির সাথে এমনটা সম্ভব নয়।
এই তিনটি পর্যায় কেবল সালাতের ক্ষেত্রেই নয়; বরং অন্যান্য ইবাদাতের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণের মৌলিক স্তর ঐশী নির্দেশ মোতাবেক বাহ্যিক আচারানুষ্ঠান পালন করা। কিয়াম, রুকু ও সিজদার মাধ্যমে সালাত পড়া। অর্থ প্রদানের মাধ্যমে দান করা। পানাহার থেকে বিরত থেকে সিয়াম আদায় করা। কাবার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে, সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়িয়ে হজ্জ আদায় করা।
কিন্তু এসকল ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক গতিবিধি ও নাড়াচাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর মা'রিফাতকে মজবুত করা। এই উদ্দেশ্য বিভিন্নভাবে সম্পাদিত করার জন্যই মূলত নানাপ্রকার ইবাদাত দেওয়া হয়েছে। সালাতের মূল উদ্দেশ্য মাথা ঝোঁকানো কিংবা মাথা নুইয়ে দেওয়া নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিনম্রতা, তাঁর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তিশ্রদ্ধা অর্জন। দান মানে অর্থ বিলানো নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নিআমতকে তাঁর পথে ব্যয় করে তাঁর নৈকট্য অর্জন এবং দরিদ্রের প্রতি দয়া ও রহমত উপলব্ধি করা। খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা সিয়ামের একটি অংশ মাত্র, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ধৈর্য, আল্লাহর যিকর, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর প্রতি একনিবিষ্টতা অর্জন। কাবা প্রদক্ষিণ করলে, সাফা-মারওয়ায় দৌড়ালে হজ্জের আচার তো পালিত হয়ে যাবে কিন্তু এর উদ্দেশ্য আখিরাতকে স্মরণ করা, মুমিনদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, নবী ও রাসূলদের পদাংক অনুসরণ-এসব না হলে তো হজ্জের প্রকৃত লক্ষ্য বা মাকসাদ হাসিল হতে পারে না।
এরপরই ইহসানের স্তর। এর মানে হলো এমনভাবে ইবাদাত করা যেন আমি আল্লাহকে দেখছি, এটা না হলে কমপক্ষে এতটুকু ভাব জাগ্রত রাখা যে, তিনি আমাকে সর্বদা দেখছেন, প্রত্যক্ষ করছেন ও পর্যবেক্ষণ করছেন। আমাদের সকল ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য তো এটাই যে, আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হবো, আল্লাহকে সঠিকভাবে চিনতে ও উপলব্ধি করতে পারবো।
এ কারণে আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে মানুষের অবস্থাভেদে ইবাদাতের মধ্যে বৈচিত্র্য ও তারতম্যের সুযোগ রেখেছেন, যাতে মানুষ সর্বদাই আল্লাহর সাথে নিজেকে জুড়ে রাখতে পারে। এভাবে নিজের অবস্থা, পরিস্থিতি, সামর্থ্য মোতাবেক বৈচিত্র্যের সাথে বিভিন্ন ইবাদাত-এর মূল অন্তর্নিহিত মর্ম অর্জনের উদ্দেশ্যে পালন করা হলে আল্লাহর পথে যাত্রা সহজ হয়ে যায়।
টিকাঃ
১. (সূরা বাকারাহ, ২:৪৩)
২. (সূরা মুমিনুন, ২৩:১-২)
১. (সূরা মারঈয়াম, ১৯:৫৮)
১. (সূরা যুমার, ৩৯:২৩)
📄 উনবিংশ পদক্ষেপ : দুর্বলতার আহ্বান
“আল্লাহর কাছে চাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম হলো নিজের দুর্বলতা ও দুর্দশাকে পেশ করা। আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়ার দ্রুততম পথ হচ্ছে নিজের বিনম্রতা ও মুখাপেক্ষীতা প্রদর্শন করা।”
দুআর আদব বা শিষ্টাচার নয়; বরং দুআ করার সময় অন্তরের অবস্থা বর্ণনা করাই এর উদ্দেশ্য।
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَءِلَهُ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
“আচ্ছা! কে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মাবুদ আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।”১
আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে কাফিররা বিপদে পড়লে তারা কাকুতি মিনতির সাথে আল্লাহকে ডাকে। আল্লাহও তাদের ডাকে সাড়া দেন। কাফিরদের ক্ষেত্রেই যদি এই অবস্থা হয় তবে মুমিন বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকলে কি হতে পারে!
বোঝা যাচ্ছে বিপদে পড়লে দুআ তাড়াতাড়ি কবুল হয়। ইবনু আতা বলছেন, “আল্লাহর কাছে চাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম হলো নিজের দুর্দশাকে পেশ করা”। দুর্দশার সময় আল্লাহর প্রতি নিজের সার্বক্ষণিক মুখাপেক্ষীতা অনুভব করে ঐকান্তিকভাবে যদি দুআ করা হয় তবে আশা করা যায় যে, আল্লাহ দুআয় সাড়া দেবেন। বিপদ যে কেবল জাগতিকই হতে হবে এমন নয়, ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত বিপদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
এর উদাহরণ পাওয়া যায় নবী ﷺ এর সময়েও। বদর যুদ্ধের দিন তিনি আল্লাহর কাছে দীর্ঘক্ষণ দুআ করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করুন। আমাকে যার ওয়াদা করেছিলেন তা সংঘটিত করে দিন। হে আল্লাহ! আজকে মুসলিমদের এই ছোট্ট দলটি ধ্বংস হয়ে গেলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদাত করার মত আর কেউই অবশিষ্ট থাকবে না।" তিনি দুআয় এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গিয়েছিলো।১
ইবনু আতা আরও বলেছেন, “আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়ার দ্রুততম পথ হচ্ছে নিজের বিনম্রতা ও মুখাপেক্ষীতা প্রদর্শন করা"। কোনো কোনো আলিম তো এভাবেও বলেছেন-যাকাত নেবার মত দরিদ্র ব্যক্তিও যদি আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন পেশ করে তবে আল্লাহ তাকে নিআমত দেবেন, লোকেরা যা দিতে পারে তার থেকেও বেশি করে তিনি দেবেন।
দুআ করার আদব কি? কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে, হাত দুটি প্রসারিত করে, আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ পড়ে দুআ শুরু করা, তাই তো? কিন্তু দুআর ক্ষেত্রে এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ হলো অন্তরের অবস্থা, যা আমরা অনেক সময় অবহেলা করি।
নবী ঘুম থেকে উঠে, ঘুমাতে যাওয়ার সময়, কাপড় পরার সময়, কাপড় খোলার সময়, আয়নার দিকে তাকানোর সময়, ওযু করার আগে, নতুন চাঁদ দেখে, সকালে, সন্ধ্যায় নানা দুআ পাঠ করতেন। নির্দিষ্ট সময়ে মৌখিকভাবে এসব দুআ পড়লেই নবী এর পুরোপুরি অনুসরণ হয় না। এর পাশাপাশি দুআর মর্ম, অন্তরের অবস্থার দিক থেকেও তাঁর অনুসরণ করতে হবে। দুআর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব হচ্ছে আল্লাহর সাথে নিজেকে জুড়ে রাখা, নিজেকে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী বলে মনে করা।
পূর্ব যুগের নেককার বান্দা তো অবশ্যই এমনকি পূর্ববর্তী নবীদের ইতিহাস ঘাঁটলেও আমরা নবী মুহাম্মাদ এর মত এত অধিক দুআ করতে আর কাউকে দেখি না। এমনকি তোরাহ, সুসমাচার ও গীতসংহিতা পড়লেও আমরা নবীদের এত এত দুআ খুঁজে পাই না। নবী দুআ করতেন গভীর ব্যাকুলতা ও ভাবাবেশের সাথে।
আতা বিশ্বাসীদের মাতা আয়িশা আ.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন নবী এর সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা। তিনি কেঁদে বললেন, “তাঁর কোন জিনিসটা চমকপ্র বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতেই থাকে, এমনকি আমি তাঁকে ভালোবেসে ফেলি। এক সময় আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যে হাত দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে চাইলে আমি তাকে তা দেই। সে আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দেই।"১
টিকাঃ
১. (বুখারী)
📄 বিংশ পদক্ষেপ : ইয়াকীন ও যুহদ
“ইয়াকীনের নূর থাকলে তুমি দেখতে পেতে তুমি যতটা না আখিরাতের দিকে এগুচ্ছ, আখিরাত তার চাইতেও তোমার নিকটবর্তী। তখন তুমি বুঝতে পারতে দুনিয়ার সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির মধ্যে পতিত হচ্ছে।”
দুনিয়ার বুকে আল্লাহর পথে যাত্রা যতটা দীর্ঘ, আখিরাতে আল্লাহর দিকে যাত্রা তার চেয়েও অনেক বেশী দীর্ঘ। আমাদের কাউকেই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, মৃত্যু এক পরম বাস্তবতা। বিশ্বাসী হোক কিংবা অবিশ্বাসী, প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। নবী আমাদেরকে কেবলমাত্র এই দুনিয়ার জন্য কর্ম করতে, চেষ্টা-সংগ্রাম করতে নিষেধ করেছেন। এর অর্থ দুনিয়াকে পরিত্যাগ করা নয়, অবহেলা করাও নয়, বরং এর উদ্দিষ্ট আখিরাতকে ভুলে না যাওয়া এবং আখিরাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া। নবী বলেছেন,
“যে সকালে উঠবে এবং তার মূল মনোযোগ হবে দুনিয়া, আল্লাহ তার সকল বিষয়াদিকে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন, সে নিজেকে ভগ্ন মনে করবে এবং দুনিয়া থেকে সে কিছুই পাবে না যতটুকু তার ভাগ্যে লেখা আছে ততটুকু ছাড়া। অন্যদিকে যে সকালে উঠবে এবং তার মূল মনোযোগ হবে আখিরাত, তবে আল্লাহ তাকে একনিবিষ্ট ও পরিতুষ্ট অনুভব করাবেন এবং তাকে অমুখাপেক্ষীতার ভাব দান করবেন এবং দুনিয়া দান করবেন যদিও সে অনিচ্ছুক।”১
সকালে উঠেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, আমার মনের গহীনে কী লুকিয়ে আছে? কী আমার উদ্দেশ্য? আখিরাত নাকি দুনিয়া? যদি উদ্দেশ্য হয় আখিরাত তবে দেখবেন আপনার জীবন পরিপাটি ও গোছানো হবে, দুনিয়া আপনার সামনে হাজির হবে যদিও আপনি দুনিয়ার ব্যাপারে নিস্পৃহ। আর সকালে উঠে যদি আপনার চিন্তা হয় দুনিয়া তবে দেখবেন আপনার জীবন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। বহু উপার্জনের পরেও কোনো কিছুতেই আপনি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। এ ধরণের মানুষ অন্তরে সর্বদাই এক প্রকারের দারিদ্র্য ও প্রয়োজন অনুভব করতেই থাকে।
প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে আখিরাতকে চিন্তার জগতে স্থায়ী করে নেওয়া সম্ভব? কীভাবে সর্বদা আখিরাতকে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে? ইবনু আতার মতে এক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হচ্ছে বিশ্বাসের দৃঢ়তা। যার বিশ্বাস যত দৃঢ়, যত স্বচ্ছ, যত পরিচ্ছন্ন চিন্তার জগতে তা স্বাভাবিকভাবেই স্থায়ী হয়ে যায়। তার ভাষায়, “ইয়াকীনের নূর থাকলে তুমি দেখতে পেতে তুমি যতটা না আখিরাতের দিকে এগুচ্ছ, আখিরাত তার চাইতেও তোমার নিকটবর্তী। তখন তুমি বুঝতে পারতে দুনিয়ার সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির মধ্যে পতিত হচ্ছে।”
এখানে তিনি ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাসকে আখিরাতের স্মরণের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু এই ইয়াকীন কীভাবে আসে? এর উত্তর কুরআন দিচ্ছে এভাবে,
وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
"এবং আল্লাহর ইবাদাত করো ইয়াকীন আসা পর্যন্ত।”১
নবীর সাহাবীরা কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর ইবাদাত করার সময় এই ইয়াকীন উপলব্ধি করতে পারতেন। সাহাবীদের বর্ণনায় এসেছে, "আমরা যখন নবী ﷺ এর সাথে বসে ঈমানের বিষয়াদি আলোচনা করতাম তখন মনে হত নিজ চোখে জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করছি।”২
এর মানে এই নয় যে দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা হবে। আখিরাত স্মরণের জন্য দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে হবে এই ধারণাই ভুল। এই ভুল ধারণাই ভ্রান্ত অনুশীলনের দিকে নিয়ে যায়। দুনিয়ার জীবনের ব্যাপারে অনিচ্ছা মানে দুনিয়া পরিত্যাগ নয়, বরং আধ্যাত্মিক স্তরে আবিরাতকে সর্বদা অন্তরে জাগরুক রাখা। এটাই ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধের দাবী, আর ভারসাম্য ইসলামের দাবী।
لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ. وَابْتَغِ فِيْمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنُ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ.
"(সম্পদ নিয়ে) এত উল্লাস কোরো না; আল্লাহ উল্লাসকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের (সুখের) আবাস অন্বেষণ করো। দুনিয়ায় তোমার (বৈধ) অংশ ভুলে যেও না। আল্লাহ তোমার প্রতি যেমন অনুগ্রহ করেছেন তুমিও (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ করো। আর যমীনে গোলযোগ সৃষ্টি করতে চেও না। আল্লাহ গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।”১
ইবনু আতা আরও বলেছেন, “তখন তুমি বুঝতে পারতে দুনিয়ার সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির মধ্যে পতিত হচ্ছে"। দুনিয়া সার্বক্ষণিকভাবে বিলুপ্তির মধ্যে দিয়েই যাচ্ছে। হাসান বসরী বলেছেন, “হে আদমসন্তান! কিছু দিবস সমষ্টি ছাড়া তুমি আর কি? একেকটি দিন অতিবাহিত হওয়া মানে তোমার একটি অংশ বিলীন হয়ে যাওয়া।”
আখিরাতের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস থাকলে এই সত্যতা উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। তখন অন্তর্চক্ষু দিয়ে প্রত্যক্ষ করা যাবে কীভাবে ক্রমশ দুনিয়া বিলুপ্তির কৃষ্ণগহ্বরে অন্তলীন হয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধিই দুনিয়ার রঙ, রূপ, রস, গন্ধ ও আনন্দের ব্যাপারে উদাসীন করে দেয় এবং আখিরাতের আরও নিকটবর্তী করে দেয়। এ কারণে সবচাইতে দরকারী হলো সঠিক বুঝ ও উপলব্ধি, কেননা আমরা উপলব্ধি ও অনুভবের জগত থেকেই আগে আখিরাত থেকে বিমুখ হয়ে যাই এবং মৃত্যুর ব্যাপারে বিস্মৃত হই, এরপর যেয়েই আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার অনুসরণ করে।
শুধুমাত্র দুনিয়ার জন্যই কর্ম করা ইহকাল ও পরকালে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে আখিরাতকে স্মরণ করে কর্ম করা হলে উভয় জগতেই সাফল্য ধরা দেবে।
مَنْ كَانَ يُرِيدُ ثَوَابَ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ ثَوَابُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا بَصِيرًا.
“যে ইহকালের পুরষ্কার চায় (তার জানা উচিত), আল্লাহর কাছে ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেরই পুরষ্কার রয়েছে। আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।”১
মনে রাখতে হবে দুনিয়ার আনন্দ মানুষকে স্বাভাবিকভাবে উল্লসিত করে। তবে এই উল্লাস ও উৎফুল্ল যাতে আমাদের অন্তরের জগতে স্থায়ীভাবে বাসা না গাঁড়তে পারে। দুনিয়াবিমুখতার প্রকৃত অর্থ দুনিয়াকে হাতে রাখা, অন্তরে স্থান না দেওয়া। এটাই প্রকৃত যুহদ। অবিচলভাবে যুহদের পথে স্থির থাকা ইয়াকীন ছাড়া সম্ভব নয়। এ কারণে ইয়াকীন ও যুহদ পাশাপাশি চলে।
টিকাঃ
১. (তিরমিযী)
১. (সূরা হিজর, ১৫:১১)
২. (ইবনু মাজাহ)
১. (সূরা কাসাস, ২৮:৭৬-৭৭)
১. (সূরা নিসা, ৪:১৩৪)