📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 ষষ্ঠদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর ‘দান করা’ ও ‘বঞ্চিত করা’র প্রজ্ঞা বোঝা

📄 ষষ্ঠদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর ‘দান করা’ ও ‘বঞ্চিত করা’র প্রজ্ঞা বোঝা


“তুমি ভাবছ আল্লাহ তোমাকে দিচ্ছেন, আসলে তিনি তোমাকে বঞ্চিত করছেন! তুমি ভাবছ তিনি তোমার থেকে কেড়ে নিচ্ছেন, আসলে তিনি তোমাকে দিচ্ছেন! তোমাকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে যদি আল্লাহ তোমার জন্য বুঝের দ্বার খুলে দেন, তবে এটা তোমার জন্য উপহার। তুমি বিপদকে শাস্তি ভাবো, কেননা তুমি এর মর্ম বুঝতে পারছ না। তোমার জন্য ইবাদাতের দরজা খুলে দেওয়া হলো কিন্তু তোমার জন্য কবুলিয়্যাতের দরজা খোলা হলো না। তুমি গুনাহ করতে উদ্যত হচ্ছ, কিন্তু এটাই হয়ত তোমার জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ হয়ে গেছে। যেই গুনাহ অন্তরে বিনয় ও অনুতাপ সৃষ্টি করে তা অহংকার ও (নিজের ব্যাপারে) ভুল ধারণা সৃষ্টি করা নেক আমলের চাইতে উত্তম।”
আল্লাহ মানুষকে 'ভালো', 'মন্দ', 'সৌভাগ্য' 'দুর্ভাগ্য' দিয়ে পরীক্ষা করেন। কিন্তু অনেক সময় এ বিষয়গুলো নির্ভর করে আমরা এগুলোকে কীভাবে দেখছি ও কীভাবে বিচার করছি। ইবনু আতা আল্লাহর 'দান' ও 'বঞ্চিত' করার প্রজ্ঞা বোঝাতে চাচ্ছেন।
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ. وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّ أَهَانَنِ. كَلَّا بَلْ لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ.
“মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। কক্ষনো নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান করো না।”১
আল্লাহ আমাদের রিযক সংকুচিত করে দেন, এর মানে কি এই নয় যে তিনি আমাদেরকে অপমান করছেন এবং তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন দান করেছেন মানে কি এই নয় যে এটা আসলেই উত্তম? এটা বিচার করার মানদণ্ড কি? মানদণ্ড হচ্ছে বুঝ বা ফাহম। বিপদের মাধ্যমে যদি সঠিক বুঝ আসে, উপলব্ধি অর্জিত হয়, তবে এই বুঝের কারণে আমরা যা হারিয়েছি তার চাইতেও বেশি কিছু অর্জন করে নিয়েছি। বুঝ না থাকলে আমরা পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বিচার করি। টাকা, সম্পদ, প্রিয়জন হারিয়েছি মানে তা বিরাট "ক্ষতি'। কিন্তু যদি এর মাধ্যমেই আমরা পরিতুষ্টি, উত্তম আমল, দৃঢ় ইচ্ছার সম্পদ লাভ করি তবে এটাই ওই আপাত ক্ষতির চাইতে বেশি অর্জন বলে গণ্য হবে।
এ কারণে, আমাদের দান ও বঞ্চিতকরণের প্রকৃত অর্থ বোঝা দরকার। অনেক সময় বিরাট অংকের অর্থপ্রাপ্তি আদতে ভালো নয়, কেননা এই অর্থ হয়ত গুনাহের কাজে ব্যয়িত হবে। এভাবে আল্লাহ অধিক পরিমাণে সম্পদ দেন যাতে সে ফিরে আসে এই পাপের রাস্তা থেকে।
فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُكِّرُوْا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوْا بِمَا أُوْتُوْا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُوْنَ. فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ.
“তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তারা যখন তা বিস্মৃত হলো তখন আমি তাদের জন্য সমস্ত কিছুর (নিআমতের) দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম; অবশেষে তাদেরকে যা দেয়া হলো তারা তাতে উল্লসিত হলো তখন অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম; ফলে তখনি তারা নিরাশ হলো। অতঃপর যালিম সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হলো এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”১
আল্লাহ যখনই নিআমতের দ্বার খুলে দেন তিনি চান আমরা যাতে এর মাধ্যমে সঠিক বুঝ হাসিল করি। এ কারণে নিআমতপ্রাপ্ত হলে প্রথমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত এই নিআমতের সাথে জড়িত সম্ভাব্য পরীক্ষার বিষয়টিকেও গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। ইবনু আতা দুটি উদাহরণ দিয়েছেন, “তোমার জন্য ইবাদাতের দরজা খুলে দেওয়া হলো কিন্তু তোমার জন্য কবুলিয়্যাতের দরজা খোলা হলো না। তুমি গুনাহ করতে উদ্যত হচ্ছ, কিন্তু এটাই হয়ত তোমার জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ হয়ে গিয়েছে।”
অনেক মানুষ সালাত, কুরআন হিফয, দান-সাদাকা, হজ্জ আদায় করা, মানুষকে উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়াসহ নানা ভালো কাজে লিপ্ত আছে, সে ভাবছে এগুলো নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমত। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা এর বিপরীত। সে আমল করেছে কিন্তু এর প্রতিদান সে পাবে না। কেননা তাঁর নিয়্যাতে বিশুদ্ধতা ছিলো না, ছিলো একনিষ্ঠতার অভাব। সে মনে মনে মানুষের প্রশংসাপ্রাপ্তির বাসনা করত। আর এই নিয়্যাত নিয়ে ভালো আমল করাই তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুনাফিকরা লোক দেখানো সালাত পড়ত।
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ يُخْدِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خُدِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلُوةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا.
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়-কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।”১
আবার ভালো কাজে ভালো নিয়্যাত থাকার পরেও পরবর্তী কিছু কাজের জন্য সেই কাজের প্রতিদান বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।
الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَلَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنفَقُوا مَنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ.
“যারা আল্লাহর পথে তাদের মাল খরচ করে, পরে তার জন্য খোঁটা দেয় না এবং কষ্টও দেয় না তাদের জন্য প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের নিকট। আর তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”১
এ আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে খোঁটা দেওয়া ও দানের কথা মনে করিয়ে কষ্ট দেওয়ার মানসিকতা রেখে দান করলে বা পরবর্তীতে খোঁটা দেওয়া হলে এতে দান নষ্ট হয়ে যায়। আমল কবুল হওয়ার মূল শর্ত একনিষ্ঠতা। এর মাধ্যমেই আমলে গ্রহণযোগ্যতা আসে; আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উপকার হাসিল হয়।
এরপর তিনি আরেকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, “যেই গুনাহ অন্তরে বিনয় ও অনুতাপ সৃষ্টি করে তা অহংকার ও (নিজের ব্যাপারে) ভুল ধারণা সৃষ্টি করা নেক আমলের চাইতে উত্তম। ইবনুল কাইয়্যিমও একই কথা বলেছেন, "একটি গুনাহ কখনো কখনো বিনয় সৃষ্টি করে জান্নাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আবার ইবাদাতও কখনো কখনো অহংকার সৃষ্টি করে, যা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
অবশ্যই স্বয়ং পাপ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় না। যে পাপ সংঘটিত হয়েছে, গুনাহকারী যদি সেই পাপ থেকে তাওবা করে, নিজের মানসিকতা ও পথ পরিবর্তন করে নেয়, নিজের পাপকে অনুতাপের সাথে স্মরণ করে এবং ভালো আমলের মাধ্যমে সেই পাপের যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করে তবে এর ফলাফল বান্দার মাঝে বিনয় ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষীতা সৃষ্টি করে, যা সামগ্রিকভাবে উত্তম পরিণতির দিকেই পরিচালিত করে। তার মানে এই নয় যে, কেউ পাপ করে বলবে আমি এর মাধ্যমে বিনয়ী হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করার চেষ্টা করছি, যদিও দুঃখজনকভাবে সূফী নামধারীদের কেউ কেউ এই পন্থা অবলম্বন করেছে।
অন্যদিকে যেই ইবাদাত ব্যক্তির মনে দম্ভের সৃষ্টি করে তা স্বয়ং ভালো আমল হলেও তা পরিণতির দিক থেকে মোটেও ভালো নয়। নবী বলেছেন,
"যার অন্তরে সরিষার দানা সমপরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"
তিনি আরও বলেছেন,
“মুমিনের বিষয়টি কতই-না চমৎকার! তার জন্য সকল কিছুই কল্যাণময়। আর এমনটা মুমিন ছাড়া আর কারো হয় না। তার সাথে উত্তম কিছু হলে সে কৃতজ্ঞ হয় এবং এটা তার জন্য কল্যাণময়। তার সাথে খারাপ কিছু ঘটলে সে ধৈর্য ধরে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণময়।”১
এ হাদীছ থেকে বোঝা যায় আমরাই নিজেদের ওপর ভালো কিংবা মন্দ ফলাফল নির্ধারণ করি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও গ্রহণ করার মনোভাবের মাধ্যমে। ভালো সময়ের কৃতজ্ঞতা এবং খারাপ সময়ের ধৈর্য সকল কিছুই আমাদের জন্য কল্যাণবহ। কিন্তু আমরা যদি নিআমত পেয়ে দম্ভ করি আর খারাপ সময়ে আফসোস আর হা-হুতাশ করে বেড়াই, তবে আমরা অজ্ঞতার পরিচয় দিলাম, এভাবে তা আমাদের জন্য আখেরে অমঙ্গলে পরিণত হলো। আমাদের আচরণের ওপরই নির্ভর করছে কোনো ঘটনা আমাদের জন্য সত্যিকারার্থেই নিআমত নাকি শাস্তি!

টিকাঃ
১. (সূরা ফজর, ৮৯:১৫-১৭)
১. (সূরা আনআম, ৬:৪৪-৪৫)
১. (সূরা নিসা, ৪:১৪২)
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৬২)
১. (বুখারী)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 সপ্তদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর সাহচর্য উপভোগ ও তাঁর নিকট দুআ

📄 সপ্তদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর সাহচর্য উপভোগ ও তাঁর নিকট দুআ


“তিনি যদি তোমার থেকে আপনজনদের দূরে নিয়ে যান, তবে জেনে রাখো তিনি তোমার জন্য তাঁর সাহচর্যের দ্বার খুলে দিচ্ছেন। "তিনি যদি তোমাকে দুআ করার সামর্থ্য দেন, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে কিছু দিতে চাচ্ছেন।”
কখনো কখনো আমাদের প্রিয়জন মারা যায়, আমরা বহুদূরের দেশে চলে যাই, কখনো হতে পারি কারাবন্দী, কিংবা হতে পারি রোগের কারণে হাসপাতালবন্দী। এসকল কিছুই আসলে পরীক্ষা, যা তিনি আমাদের কল্যাণার্থেই দিয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে আত্মীয়তা, বন্ধুত্বের বন্ধনের প্রকৃত সত্য উন্মোচন করে আমাদেরকে তাঁর সঙ্গের দিকে পরিচালিত করেন। সর্বদা পিতামাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গবেষ্টিত থাকার কারণে আমরা আল্লাহকে স্মরণের সময় পাই না। কিন্তু এরাই যখন আমাদের থেকে দূরে চলে যায় তখন আমরা একনিষ্ঠতা ও মনোযোগীতার সাথে আল্লাহকে স্মরণ করার ফুরসত পাই। বিচ্ছিন্নতাকে আপনি হয়ত পরীক্ষা ভাবছেন, উপলব্ধি করতে পারলে তা আসলে এক মহান নিআমত।
ইসলামী ইতিহাসে এরকম অনেক আলিম আছেন যারা কারাবন্দী হয়েও অবিস্মরণীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেননা, তারা প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদের এ সময়টিকে শাস্তি নয়; বরং উপহার হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অন্যান্য সময় সাধারণ যে ব্যস্ততা থাকে সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রাখার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।১
ইবনু আতা বলছেন, “তিনি যদি তোমাকে দুআ করার সামর্থ্য দেন, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে কিছু দিতে চাচ্ছেন।” অনেক সময় বিপদ এতটা সঙ্গীন হয় যে, আল্লাহর কাছে দুআ করা ছাড়া অন্য কোনো পথই খোলা থাকে না। হতে পারে এর আগে আপনি উদাসীন ছিলেন। আল্লাহর কাছে আপনি একনিষ্ঠভাবে দুআ করতেন না। করলেও তাতে দুআর প্রাণ থাকত না। এরকম একটি বিপদ দিয়ে তিনি আপনাকে তাঁর কাছে একনিষ্ঠভাবে দুআ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ
“আচ্ছা! কে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন?”১
এরূপ অবস্থাও আপনার জন্য কল্যাণজনক। কেননা, দুআর মাধ্যমে আপনি সর্বক্ষণ ইবাদাতের মধ্যেই অতিবাহিত করছেন। নবী বলেছেন,
“দুআ হলো ইবাদাত।”২
এ কারণে বিপদাপদকে কখনোই সংকীর্ণ বস্তুগত প্রাপ্তি কিংবা বিয়োগের মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক। কখনো তিনি বিপদের পর বিপদ দিয়ে আপনাকে ভারাক্রান্ত করেন যাতে তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক উন্নত হয়। আপনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে আরও ইখলাস ও ঐকান্তিকতার সাথে ডাকেন। এটা নিঃসন্দেহে বড় নিআমত।

টিকাঃ
১. এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইমাম সারাখসী, যিনি আল-মাবসূত নামের ফিকহী বিশ্বকোষের রচয়িতা, গোটা গ্রন্থটিই আসলে কারাগারে থেকে রচিত। তিনি ছাত্রদেরকে বলতেন আর ছাত্ররা সেটা লিপিবদ্ধ করে নিত। এভাবেই ত্রিশোর্ধ্ব খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থটি পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছে।
১. (সূরা নামল, ২৭:৬২)
২. (তিরমিযী)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 অষ্টাদশ পদক্ষেপ : ইবাদাতের মানোন্নয়ন

📄 অষ্টাদশ পদক্ষেপ : ইবাদাতের মানোন্নয়ন


“তিনি তোমার বাস্তবতা সম্পর্কে জানেন। এ কারণে তিনি ইবাদাতকে বৈচিত্র্যময় করে দিয়েছেন। কিছু কিছু ইবাদাতকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাই তাকে অতিক্রম করতে যেও না। ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল তা পালন করা নয়; বরং তা পূর্ণাঙ্গতার সাথে পালন করা। প্রত্যেক পালনকারী পূর্ণাঙ্গতাদানকারী হয় না।”
আমরা এখন আল্লাহর পথে যাত্রার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, তা হলো ইবাদাতের মানোন্নয়ন। মুমিন নিরন্তর ইবাদাত করার কারণে কখনো কখনো একঘেয়েমিতা অনুভব করতে পারে। আল্লাহ পরম করুণাময়, তিনি মানুষের এই স্বভাব সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত। এ কারণেই তিনি ইবাদাতকে বৈচিত্র্যময় করে দিয়েছেন, এর প্রকার ও সময়ের দিক থেকে।
যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। এটা আল্লাহ আবশ্যক করে দিয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও কিছু সালাত আছে যা অতিরিক্ত বা নফল, যেমন-তাহাজ্জুদ, শুকরিয়ার সালাত, প্রয়োজনের সময়কার সালাত ও প্রমুখ। মুমিন যদি নফল সালাতে একঘেয়েমিতা বোধ করে তবে সে কেবল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়েই ক্ষান্ত দিতে পারে। সেসময়টায় নফল সালাতের পরিবর্তে অন্যান্য নফল ইবাদাত-যেমন : দান-সাদাকা, উমরা, জ্ঞানার্জন, প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়া, মানুষকে সাহায্য করা, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া-করতে পারে। এসকল নফল ইবাদাতই তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে সাহায্য করবে।
মানুষ বৈচিত্র্যময়। এ বৈচিত্র্য কেবল শারিরীক ক্ষমতার দিক থেকেই নয়, বরং কোনো কাজকে উদ্যম ও স্ফূর্তির সাথে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও। এ কারণে আল্লাহ ইবাদাতের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য রেখেছেন। একইভাবে কিছু কাজকে নির্দিষ্ট কিছু সময়ে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। নবী বলেছেন,
"নিশ্চয়ই এই দীন দৃঢ়। তাই দৃঢ়তার সাথেই একে প্রয়োগ করো। যে তার বাহনের প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা প্রদর্শন করে সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না, তার আগেই বাহন পথিমধ্যে মারা যাবে।"
এ কারণে সূর্যাস্ত, দুপুরের ঠিক পূর্বমুহূর্তে কিংবা আসরের পরে আমাদেরকে সালাত পড়তে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বছরের সবদিন সিয়াম রাখা গেলেও রমাদানের আগের কয়টা দিন কিংবা ঈদের দিন সিয়াম রাখতে নিষিদ্ধতার ব্যাপারে বর্ণনা এসেছে।
আল্লাহ চান আমরা যাতে ইবাদাতের মান উন্নয়ন করে উত্তরোত্তর বিকশিত হই এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে থাকি। ইবনু আতা বলেছেন, “ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল তা পালন করা নয়; বরং তা পূর্ণাঙ্গতার সাথে পালন করা। প্রত্যেক পালনকারী পূর্ণাঙ্গতাদানকারী হয় না।" আল্লাহ সালাতের ক্ষেত্রে বলেছেন, وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ "আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো।”১
সালাত প্রতিষ্ঠা করার অর্থ কেবলমাত্র সালাত আদায় করা নয়, এর অর্থ সালাতের সাথে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে নেওয়া, সালাতের সময় নিজেকে বিনয়ী ও মনোযোগী করা, সমাজে সালাত প্রতিষ্ঠা করা, সালাত আদায়ের পরিবেশ তৈরী করা। সালাত প্রতিষ্ঠা করাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
“অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে।”২
একঘেয়েমিতা, বিরক্তি কিংবা ক্লান্তি অনুভব করলে সেখানে অন্তরের সংযোগ বজায় থাকে না, বিচ্ছিন্ন হয়। সালাতেও যদি ক্লান্তি চলে আসে তখন তা আর বিনয় উদগত করতে পারে না। কিন্তু সালাতের মূলই হচ্ছে বিনয় বা খুশু। আলিমগণ সালাতের খুশুর তিনটি পর্যায় বর্ণনা করেছেন,
প্রথম পর্যায়, তুচ্ছতা অনুভব করা। এর মানে হলো নিজেকে আল্লাহর সামনে তুচ্ছ ও মূল্যহীন বলে মনে করা। অন্তরের এই ভাব সালাতের গতিবিধিতে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। গোটা সালাতের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর বড়ত্ব ও নিজেদের তুচ্ছতা প্রকাশ করে থাকি। আল্লাহকে বড় তখনই মনে করা সম্ভব যখন আল্লাহর প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে মুখাপেক্ষীতা অনুভব করবো।
দ্বিতীয় পর্যায়, আল্লাহর প্রতি বিস্ময়াবিষ্টতা। এটি তুচ্ছতার স্তর থেকে উর্দ্ধতন। এ স্তরে উঠে বান্দা নিজেকে তুচ্ছ ভাবার পাশাপাশি আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের কারণে তাঁর প্রতি প্রবল ভক্তিশ্রদ্ধা উপলব্ধি করতে থাকে। এই বিনয় ও বিনম্রতাই ভেতর থেকে ক্রন্দন উৎপত্তি করে থাকে।
إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ أَيْتُ الرَّحْمَنِ خَرُوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
"তাদের নিকট দয়াময়ের আয়াত তেলাওয়াত করা হলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত ক্রন্দন করতে করতে।”১
اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتٰبًا مُّتَشْبِهًا مَّثَانِي تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ
“আল্লাহ অতি উত্তম বাণী নাযিল করেছেন, তা এমন কিতাব যা সুসামঞ্জস্য, বার বার তিলাওয়াত করা হয়। এতে তাদের দেহ রোমাঞ্চিত হয় যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, অতঃপর তাদের দেহ ও তাদের অন্তর বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটাই আল্লাহর হিদায়াত, এর দ্বারা তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন, আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই।"১
তৃতীয় পর্যায়, প্রসন্নতা। সালাতের খুশুর সর্বোত্তম পর্যায় হচ্ছে প্রসন্নতা, অর্থাৎ, আল্লাহর সঙ্গ পেয়ে সুখানুভব করা। কুরআনে আল্লাহর নাম আসলে অন্তরে প্রসন্নতা ও খুশীর ভাব সঞ্চার হওয়া সালাতের সর্বোচ্চ স্তরের বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ। এরূপ প্রশান্ত ও স্থিরাবস্থায় ফেরেশতারা নেমে এসে কুরআন শ্রবণ করতে থাকেন। এরকমও বর্ণনা পাওয়া যায় যে, সাহাবীরা কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন এবং ফেরেশতারা মেঘের মধ্য দিয়ে সেই কুরআন শ্রবণ করছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
বোঝাই যাচ্ছে খুশু কেবলমাত্র তখনই আসা সম্ভব যখন তা অন্তরের ভাবাবেগের সাথে আদায় করা হবে। ক্লান্তি বা বিরক্তির সাথে এমনটা সম্ভব নয়।
এই তিনটি পর্যায় কেবল সালাতের ক্ষেত্রেই নয়; বরং অন্যান্য ইবাদাতের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণের মৌলিক স্তর ঐশী নির্দেশ মোতাবেক বাহ্যিক আচারানুষ্ঠান পালন করা। কিয়াম, রুকু ও সিজদার মাধ্যমে সালাত পড়া। অর্থ প্রদানের মাধ্যমে দান করা। পানাহার থেকে বিরত থেকে সিয়াম আদায় করা। কাবার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে, সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়িয়ে হজ্জ আদায় করা।
কিন্তু এসকল ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক গতিবিধি ও নাড়াচাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর মা'রিফাতকে মজবুত করা। এই উদ্দেশ্য বিভিন্নভাবে সম্পাদিত করার জন্যই মূলত নানাপ্রকার ইবাদাত দেওয়া হয়েছে। সালাতের মূল উদ্দেশ্য মাথা ঝোঁকানো কিংবা মাথা নুইয়ে দেওয়া নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিনম্রতা, তাঁর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তিশ্রদ্ধা অর্জন। দান মানে অর্থ বিলানো নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নিআমতকে তাঁর পথে ব্যয় করে তাঁর নৈকট্য অর্জন এবং দরিদ্রের প্রতি দয়া ও রহমত উপলব্ধি করা। খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা সিয়ামের একটি অংশ মাত্র, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ধৈর্য, আল্লাহর যিকর, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর প্রতি একনিবিষ্টতা অর্জন। কাবা প্রদক্ষিণ করলে, সাফা-মারওয়ায় দৌড়ালে হজ্জের আচার তো পালিত হয়ে যাবে কিন্তু এর উদ্দেশ্য আখিরাতকে স্মরণ করা, মুমিনদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, নবী ও রাসূলদের পদাংক অনুসরণ-এসব না হলে তো হজ্জের প্রকৃত লক্ষ্য বা মাকসাদ হাসিল হতে পারে না।
এরপরই ইহসানের স্তর। এর মানে হলো এমনভাবে ইবাদাত করা যেন আমি আল্লাহকে দেখছি, এটা না হলে কমপক্ষে এতটুকু ভাব জাগ্রত রাখা যে, তিনি আমাকে সর্বদা দেখছেন, প্রত্যক্ষ করছেন ও পর্যবেক্ষণ করছেন। আমাদের সকল ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য তো এটাই যে, আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হবো, আল্লাহকে সঠিকভাবে চিনতে ও উপলব্ধি করতে পারবো।
এ কারণে আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে মানুষের অবস্থাভেদে ইবাদাতের মধ্যে বৈচিত্র্য ও তারতম্যের সুযোগ রেখেছেন, যাতে মানুষ সর্বদাই আল্লাহর সাথে নিজেকে জুড়ে রাখতে পারে। এভাবে নিজের অবস্থা, পরিস্থিতি, সামর্থ্য মোতাবেক বৈচিত্র্যের সাথে বিভিন্ন ইবাদাত-এর মূল অন্তর্নিহিত মর্ম অর্জনের উদ্দেশ্যে পালন করা হলে আল্লাহর পথে যাত্রা সহজ হয়ে যায়।

টিকাঃ
১. (সূরা বাকারাহ, ২:৪৩)
২. (সূরা মুমিনুন, ২৩:১-২)
১. (সূরা মারঈয়াম, ১৯:৫৮)
১. (সূরা যুমার, ৩৯:২৩)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 উনবিংশ পদক্ষেপ : দুর্বলতার আহ্বান

📄 উনবিংশ পদক্ষেপ : দুর্বলতার আহ্বান


“আল্লাহর কাছে চাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম হলো নিজের দুর্বলতা ও দুর্দশাকে পেশ করা। আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়ার দ্রুততম পথ হচ্ছে নিজের বিনম্রতা ও মুখাপেক্ষীতা প্রদর্শন করা।”
দুআর আদব বা শিষ্টাচার নয়; বরং দুআ করার সময় অন্তরের অবস্থা বর্ণনা করাই এর উদ্দেশ্য।
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَءِلَهُ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
“আচ্ছা! কে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মাবুদ আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।”১
আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে কাফিররা বিপদে পড়লে তারা কাকুতি মিনতির সাথে আল্লাহকে ডাকে। আল্লাহও তাদের ডাকে সাড়া দেন। কাফিরদের ক্ষেত্রেই যদি এই অবস্থা হয় তবে মুমিন বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকলে কি হতে পারে!
বোঝা যাচ্ছে বিপদে পড়লে দুআ তাড়াতাড়ি কবুল হয়। ইবনু আতা বলছেন, “আল্লাহর কাছে চাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম হলো নিজের দুর্দশাকে পেশ করা”। দুর্দশার সময় আল্লাহর প্রতি নিজের সার্বক্ষণিক মুখাপেক্ষীতা অনুভব করে ঐকান্তিকভাবে যদি দুআ করা হয় তবে আশা করা যায় যে, আল্লাহ দুআয় সাড়া দেবেন। বিপদ যে কেবল জাগতিকই হতে হবে এমন নয়, ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত বিপদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
এর উদাহরণ পাওয়া যায় নবী ﷺ এর সময়েও। বদর যুদ্ধের দিন তিনি আল্লাহর কাছে দীর্ঘক্ষণ দুআ করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করুন। আমাকে যার ওয়াদা করেছিলেন তা সংঘটিত করে দিন। হে আল্লাহ! আজকে মুসলিমদের এই ছোট্ট দলটি ধ্বংস হয়ে গেলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদাত করার মত আর কেউই অবশিষ্ট থাকবে না।" তিনি দুআয় এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গিয়েছিলো।১
ইবনু আতা আরও বলেছেন, “আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়ার দ্রুততম পথ হচ্ছে নিজের বিনম্রতা ও মুখাপেক্ষীতা প্রদর্শন করা"। কোনো কোনো আলিম তো এভাবেও বলেছেন-যাকাত নেবার মত দরিদ্র ব্যক্তিও যদি আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন পেশ করে তবে আল্লাহ তাকে নিআমত দেবেন, লোকেরা যা দিতে পারে তার থেকেও বেশি করে তিনি দেবেন।
দুআ করার আদব কি? কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে, হাত দুটি প্রসারিত করে, আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ পড়ে দুআ শুরু করা, তাই তো? কিন্তু দুআর ক্ষেত্রে এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ হলো অন্তরের অবস্থা, যা আমরা অনেক সময় অবহেলা করি।
নবী ঘুম থেকে উঠে, ঘুমাতে যাওয়ার সময়, কাপড় পরার সময়, কাপড় খোলার সময়, আয়নার দিকে তাকানোর সময়, ওযু করার আগে, নতুন চাঁদ দেখে, সকালে, সন্ধ্যায় নানা দুআ পাঠ করতেন। নির্দিষ্ট সময়ে মৌখিকভাবে এসব দুআ পড়লেই নবী এর পুরোপুরি অনুসরণ হয় না। এর পাশাপাশি দুআর মর্ম, অন্তরের অবস্থার দিক থেকেও তাঁর অনুসরণ করতে হবে। দুআর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব হচ্ছে আল্লাহর সাথে নিজেকে জুড়ে রাখা, নিজেকে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী বলে মনে করা।
পূর্ব যুগের নেককার বান্দা তো অবশ্যই এমনকি পূর্ববর্তী নবীদের ইতিহাস ঘাঁটলেও আমরা নবী মুহাম্মাদ এর মত এত অধিক দুআ করতে আর কাউকে দেখি না। এমনকি তোরাহ, সুসমাচার ও গীতসংহিতা পড়লেও আমরা নবীদের এত এত দুআ খুঁজে পাই না। নবী দুআ করতেন গভীর ব্যাকুলতা ও ভাবাবেশের সাথে।
আতা বিশ্বাসীদের মাতা আয়িশা আ.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন নবী এর সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা। তিনি কেঁদে বললেন, “তাঁর কোন জিনিসটা চমকপ্র বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতেই থাকে, এমনকি আমি তাঁকে ভালোবেসে ফেলি। এক সময় আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যে হাত দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে চাইলে আমি তাকে তা দেই। সে আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দেই।"১

টিকাঃ
১. (বুখারী)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00