📄 চতুর্দশ পদক্ষেপ : অপমান, মুখাপেক্ষীতা ও ধোঁকা থেকে মুক্ত হওয়া
"(মানুষের কাছ থেকে) অপমানের বৃক্ষ আসলে (তাদের প্রতি) মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকে উদগত।"
অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা নিজের দোষত্রুটি অন্বেষণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। ইবনু আতা এখানে আরেকটি দোষের কথা উল্লেখ করছেন, তা হলো- অপমান। প্রশ্ন আসতে পারে যে অপমান ভোগ করছে তার দোষ কীভাবে হয়, দোষ তো হওয়ার কথা যে অপমান করেছে তার? অপমান এ কারণে দোষ কেননা, এই অপমান আসলে অন্তরে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজের বহিঃপ্রকাশ। অত্যন্ত আলঙ্কারিকভাবে ইবনু আতা দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছেন, "(মানুষের কাছ থেকে) অপমানের বৃক্ষ আসলে (তাদের প্রতি) মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকে উদগত।”
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজই এক সময় মানুষের কাছ থেকে আগত অপমানের বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। এই বৃক্ষ কথা ও কাজের মাধ্যমে সিঞ্চিত হয়, যার মাধ্যমে মানুষ আরেক মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন ও আর্জি পেশ করে।
এই মুখাপেক্ষীতার কারণ কি? ইবনু আতার ভাষায় এর কারণ হলো 'ধোঁকা”, “আর কোনো কিছুই তোমাকে এরূপ ধোঁকা দিতে পারে না যতটা এই ধারণা যে, তুমি যা ছেড়ে দাও সেক্ষেত্রে তুমি স্বাধীন, কিন্তু তোমার যা প্রয়োজন সে ব্যাপারে তুমি দাসানুদাস।” যারা মানুষের কাছে এই ভেবে ধরনা দেয় যে তারা মনে হয় তার প্রকৃত উপকার সাধন করতে পারবে-তবে এটা এক বিশাল ধোঁকা। কেননা প্রতিপালক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই প্রকৃত উপকার করতে পারে না। মানুষের প্রতি এরূপ মুখাপেক্ষীতা অনুভব করাই অপমানের কারণ, মানুষ কারো উপকার করতে পারে এই ধোঁকাই মুখাপেক্ষীতার কারণ। এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই সমাধান এবং আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার অনেক বড় একটি পন্থা।
জীবনে চলতে হলে মানুষের সাহায্য নেওয়া মাঝে মাঝে একান্ত জরুরী হয়ে পড়ে। তাতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ এই সাহায্য নেওয়া সাহায্যকারীর প্রতি মুখাপেক্ষীতার সৃষ্টি না করছে, যা বিনিময়ে অপমান ও দাসত্ব সৃষ্টি করে।
নবী বলেছেন,
أَطْلُبُوا الْحَوَائِجَ بِعِزَّةِ الْأَنْفُسِ
"নিজের প্রয়োজন চাইতে হলে মর্যাদার সাথে চাও।”
প্রয়োজনের সময় মানুষের কাছে চাইতে বাধা নেই, তবে মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের সাথে চাইতে হবে, অন্তরে মুখাপেক্ষীতা ও নিচুতার ভাব রাখা যাবে না। অন্তরে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজ রোপণ করতে দেওয়া যাবে না, যাতে তা অপমানের বৃক্ষে পরিণত না হতে পারে। মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার ভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারলে ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে মানুষের সাথে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে আচরণ করা সম্ভবপর হয়। নবী ইবনু আব্বাসকে উপদেশ দিতে যেয়ে বলেছেন,
“হে বৎস! যদি গোটা জাতি একত্রিত হয়ে তোমার উপকার করার চেষ্টা করে তবে তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না যতটুকু তোমার ভাগ্যে লেখা আছে তা বাদে। গোটা জাতি যদি তোমার বিরুদ্ধে একত্র হয়ে তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না যতটুকু তোমার জন্য লিখিত হয়ে আছে।”১
প্রকৃত স্বাধীনতা আল্লাহর দাসত্বেই, স্বাধীনতার এটাই প্রকৃত ইসলামী দৃষ্টিকোণ। আপনি যখন আল্লাহর দাস হবেন তখন আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছু থেকে আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন; মানুষ, বস্তু, নিজের কামনা-বাসনা, সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ যাই হোক না কেন।
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার ভাব থেকে যেমন অপমান উদ্ভূত, আল্লাহর প্রতি প্রকৃত দাসত্বের বৃক্ষ আল্লাহর প্রতি আন্তরিক মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকেই উদগত। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত অন্যদের (প্রতি মুখাপেক্ষীতা) বর্জন করে আল্লাহর প্রতি দাসানুভূতির সঠিক পরিচর্যা করা। যা আমাদেরকে আল্লাহর পথের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে পরিচালিত করবে।
টিকাঃ
¹ (তিরমিযী)
📄 পঞ্চদশ পদক্ষেপ : কৃতজ্ঞতাবোধ
"তুমি যখন কৃতজ্ঞতা পোষণ করো না তখন তা হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দাও। আর যখন কৃতজ্ঞতা আদায় করো তখন তা নিজের সাথে দৃঢ়ভাবে বেঁধে নাও। যদি তুমি নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে অগ্রসর না হও তবে তিনি তোমাকে পরীক্ষার শেকল দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেবেন।"
রিযকের ক্ষেত্রে আল্লাহর একটি সুন্নাত হচ্ছে আমরা যদি কৃতজ্ঞ হই তবে তিনি বৃদ্ধি করে দেবেন অথবা অধিক উত্তম কোনো কিছু দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করে দেবেন।
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
“যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তাহলে তোমাদেরকে অবশ্যই (আমার নিআমত) বৃদ্ধি করে দেবো।”১
আমরা কখনোই আল্লাহর সকল নিআমত গণনা করতে পারবো না। এ কারণে আমাদের উচিত আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন সর্বোত্তমভাবে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা।
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
“তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।”২
আল্লাহ আরও বলেছেন,
وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
"আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (জেনে রেখো) অবশ্যই আমার শাস্তি কঠোর।”১
এখানে 'কাফারতুম' দ্বারা আভিধানিক অর্থে কুফর বা অবিশ্বাস অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং এর অর্থ আল্লাহর নিআমতের ব্যাপারে অকৃতজ্ঞতা পোষণ করা। এই শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতাহীনতার গুরুত্ববহতা। ইবনু আতা বলেছেন, "তুমি যখন কৃতজ্ঞতা পোষণ করো না তখন তা হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দাও। আর যখন কৃতজ্ঞতা আদায় করো তখন তা নিজের সাথে দৃঢ়ভাবে বেঁধে নাও।” আল্লাহ নিআমত বৃদ্ধি করে দেওয়ার, নিরন্তর নিআমত বর্ষণের প্রতিশ্রুতি করেছেন-তবে শর্ত হচ্ছে নিআমতের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। তবে কৃতজ্ঞতা মানে কেবল মুখে মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলা নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত নিআমতকে সর্বোত্তম উপায়ে ব্যবহারের মাধ্যমেও এই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে।
ইবনু আতা বলছেন, “যদি তুমি নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে অগ্রসর না হও তবে তিনি তোমাকে পরীক্ষার শেকল দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেবেন।" অতএব আমরা যদি আল্লাহর নিআমতের শুকরিয়া স্বরূপ নেক আমল করে আল্লাহর দিকে না আগাই তবে আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা নেবেন এবং এর মাধ্যমে আমাদেরকে তাঁর কাছে টেনে নেবেন। এটাও আল্লাহর সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।
পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের মর্যাদাকে উন্নীত ও অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন। আপনি যখন বিপদে পতিত হন, আল্লাহর দিকে ফিরে যান, এর মাধ্যমে আপনি আল্লাহর নিকটবর্তী হন এবং তিনি আপনার গুনাহ মাফ করে দেন।
وَلَقَدْ أَخَذْنُهُمْ بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
"আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হলো না এবং কাতর প্রার্থনাও করে না।”২
أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ
"তারা কি দেখে না যে, 'তাদেরকে প্রতি বৎসর একবার বা দু'বার বিপর্যয়স্থ করা হয়?' এরপরও তারা তাওবাহ করে না এবং উপদেশও গ্রহণ করে না।"১
আল্লাহ শাস্তি দেওয়ার জন্য বিপদ দেন না। তিনি শাস্তি দেন তাঁর নিআমতের কদর উপলব্ধির জন্য, আমাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করার জন্য। তিনি চান বিপদের মাধ্যমে যাতে কথা ও কাজের মাধ্যমে আমরা আরও অধিক পরিমাণে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ করি।
আমরা প্রতি মুহূর্তেই তাঁর দেওয়া অজস্র নিআমত ভোগ করে চলেছি। কিন্তু তিনি একটি নিআমত কেড়ে নিলে আমরা ভাবি আমরা বুঝি 'শেষ'। আসলে তা হাজারো নিআমতের একটি মাত্র। বিপদের মূল উদ্দেশ্য একটি নিআমত চলে যাওয়ার মাধ্যমে যাতে আমরা অন্যান্য নিআমতের মর্মও অনুভব করি এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করি। যদি আমরা একনিষ্ঠভাবে তাওবা করি তবে আমাদের পরীক্ষা শেষ।
سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا
"আল্লাহ কষ্টের পর সহজ করে দেবেন।"
فَإِنَّ مَّعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَّعَ الْعُسْرِ يُسْرًا.
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।"
যদি আমরা পরীক্ষা একেবারেই বাদ দিয়ে দিতে চাই তবে আমাদেরকে কোনো ভুল করা চলবে না। কিন্তু মানুষমাত্রই ভুল করে। ভুল করাটাই তার স্বভাব, না করাটাই বরং অস্বাভাবিকতা। আমরা সর্বদা নিষ্কলুষতার সাথে আল্লাহর পথে চলতে পারি না। সর্বদা তাঁর নিআমতের শুকরিয়া আদায় করা আমাদের দ্বারা হয়ে ওঠে না। আমরা বারেবারে বিস্মৃত হয়ে যাই-ই। এ কারণে নবী বলেছেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُوْنَ
"প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। কিন্তু সর্বোত্তম ভুলকারী যে তাওবা করে।”
আল্লাহ যেন আমাদের এই যাত্রাকে সহজ করে দেন। এমন কোনো পরীক্ষা না নেন যা আমাদের সাধ্যাতীত। আর যখন পরীক্ষা আপতিত হয়েই যায় তখন যেন ধৈর্য ও তাওবার সাথে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি, আমীন।
টিকাঃ
১. (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৭)
২. (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৩৪)
১. (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৭)
২. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৭৬)
১. (সূরা তাওবা, ৯:১২৬)
২. (সূরা ত্বলাক, ৬৫:৭)
৩. (সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৫-৬)
¹. (তিরমিযী)
📄 ষষ্ঠদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর ‘দান করা’ ও ‘বঞ্চিত করা’র প্রজ্ঞা বোঝা
“তুমি ভাবছ আল্লাহ তোমাকে দিচ্ছেন, আসলে তিনি তোমাকে বঞ্চিত করছেন! তুমি ভাবছ তিনি তোমার থেকে কেড়ে নিচ্ছেন, আসলে তিনি তোমাকে দিচ্ছেন! তোমাকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে যদি আল্লাহ তোমার জন্য বুঝের দ্বার খুলে দেন, তবে এটা তোমার জন্য উপহার। তুমি বিপদকে শাস্তি ভাবো, কেননা তুমি এর মর্ম বুঝতে পারছ না। তোমার জন্য ইবাদাতের দরজা খুলে দেওয়া হলো কিন্তু তোমার জন্য কবুলিয়্যাতের দরজা খোলা হলো না। তুমি গুনাহ করতে উদ্যত হচ্ছ, কিন্তু এটাই হয়ত তোমার জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ হয়ে গেছে। যেই গুনাহ অন্তরে বিনয় ও অনুতাপ সৃষ্টি করে তা অহংকার ও (নিজের ব্যাপারে) ভুল ধারণা সৃষ্টি করা নেক আমলের চাইতে উত্তম।”
আল্লাহ মানুষকে 'ভালো', 'মন্দ', 'সৌভাগ্য' 'দুর্ভাগ্য' দিয়ে পরীক্ষা করেন। কিন্তু অনেক সময় এ বিষয়গুলো নির্ভর করে আমরা এগুলোকে কীভাবে দেখছি ও কীভাবে বিচার করছি। ইবনু আতা আল্লাহর 'দান' ও 'বঞ্চিত' করার প্রজ্ঞা বোঝাতে চাচ্ছেন।
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ. وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّ أَهَانَنِ. كَلَّا بَلْ لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ.
“মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। কক্ষনো নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান করো না।”১
আল্লাহ আমাদের রিযক সংকুচিত করে দেন, এর মানে কি এই নয় যে তিনি আমাদেরকে অপমান করছেন এবং তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন দান করেছেন মানে কি এই নয় যে এটা আসলেই উত্তম? এটা বিচার করার মানদণ্ড কি? মানদণ্ড হচ্ছে বুঝ বা ফাহম। বিপদের মাধ্যমে যদি সঠিক বুঝ আসে, উপলব্ধি অর্জিত হয়, তবে এই বুঝের কারণে আমরা যা হারিয়েছি তার চাইতেও বেশি কিছু অর্জন করে নিয়েছি। বুঝ না থাকলে আমরা পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বিচার করি। টাকা, সম্পদ, প্রিয়জন হারিয়েছি মানে তা বিরাট "ক্ষতি'। কিন্তু যদি এর মাধ্যমেই আমরা পরিতুষ্টি, উত্তম আমল, দৃঢ় ইচ্ছার সম্পদ লাভ করি তবে এটাই ওই আপাত ক্ষতির চাইতে বেশি অর্জন বলে গণ্য হবে।
এ কারণে, আমাদের দান ও বঞ্চিতকরণের প্রকৃত অর্থ বোঝা দরকার। অনেক সময় বিরাট অংকের অর্থপ্রাপ্তি আদতে ভালো নয়, কেননা এই অর্থ হয়ত গুনাহের কাজে ব্যয়িত হবে। এভাবে আল্লাহ অধিক পরিমাণে সম্পদ দেন যাতে সে ফিরে আসে এই পাপের রাস্তা থেকে।
فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُكِّرُوْا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوْا بِمَا أُوْتُوْا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُوْنَ. فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ.
“তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তারা যখন তা বিস্মৃত হলো তখন আমি তাদের জন্য সমস্ত কিছুর (নিআমতের) দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম; অবশেষে তাদেরকে যা দেয়া হলো তারা তাতে উল্লসিত হলো তখন অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম; ফলে তখনি তারা নিরাশ হলো। অতঃপর যালিম সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হলো এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”১
আল্লাহ যখনই নিআমতের দ্বার খুলে দেন তিনি চান আমরা যাতে এর মাধ্যমে সঠিক বুঝ হাসিল করি। এ কারণে নিআমতপ্রাপ্ত হলে প্রথমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত এই নিআমতের সাথে জড়িত সম্ভাব্য পরীক্ষার বিষয়টিকেও গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। ইবনু আতা দুটি উদাহরণ দিয়েছেন, “তোমার জন্য ইবাদাতের দরজা খুলে দেওয়া হলো কিন্তু তোমার জন্য কবুলিয়্যাতের দরজা খোলা হলো না। তুমি গুনাহ করতে উদ্যত হচ্ছ, কিন্তু এটাই হয়ত তোমার জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ হয়ে গিয়েছে।”
অনেক মানুষ সালাত, কুরআন হিফয, দান-সাদাকা, হজ্জ আদায় করা, মানুষকে উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়াসহ নানা ভালো কাজে লিপ্ত আছে, সে ভাবছে এগুলো নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমত। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা এর বিপরীত। সে আমল করেছে কিন্তু এর প্রতিদান সে পাবে না। কেননা তাঁর নিয়্যাতে বিশুদ্ধতা ছিলো না, ছিলো একনিষ্ঠতার অভাব। সে মনে মনে মানুষের প্রশংসাপ্রাপ্তির বাসনা করত। আর এই নিয়্যাত নিয়ে ভালো আমল করাই তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুনাফিকরা লোক দেখানো সালাত পড়ত।
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ يُخْدِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خُدِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلُوةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا.
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়-কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।”১
আবার ভালো কাজে ভালো নিয়্যাত থাকার পরেও পরবর্তী কিছু কাজের জন্য সেই কাজের প্রতিদান বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।
الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَلَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنفَقُوا مَنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ.
“যারা আল্লাহর পথে তাদের মাল খরচ করে, পরে তার জন্য খোঁটা দেয় না এবং কষ্টও দেয় না তাদের জন্য প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের নিকট। আর তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”১
এ আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে খোঁটা দেওয়া ও দানের কথা মনে করিয়ে কষ্ট দেওয়ার মানসিকতা রেখে দান করলে বা পরবর্তীতে খোঁটা দেওয়া হলে এতে দান নষ্ট হয়ে যায়। আমল কবুল হওয়ার মূল শর্ত একনিষ্ঠতা। এর মাধ্যমেই আমলে গ্রহণযোগ্যতা আসে; আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উপকার হাসিল হয়।
এরপর তিনি আরেকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, “যেই গুনাহ অন্তরে বিনয় ও অনুতাপ সৃষ্টি করে তা অহংকার ও (নিজের ব্যাপারে) ভুল ধারণা সৃষ্টি করা নেক আমলের চাইতে উত্তম। ইবনুল কাইয়্যিমও একই কথা বলেছেন, "একটি গুনাহ কখনো কখনো বিনয় সৃষ্টি করে জান্নাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আবার ইবাদাতও কখনো কখনো অহংকার সৃষ্টি করে, যা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
অবশ্যই স্বয়ং পাপ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় না। যে পাপ সংঘটিত হয়েছে, গুনাহকারী যদি সেই পাপ থেকে তাওবা করে, নিজের মানসিকতা ও পথ পরিবর্তন করে নেয়, নিজের পাপকে অনুতাপের সাথে স্মরণ করে এবং ভালো আমলের মাধ্যমে সেই পাপের যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করে তবে এর ফলাফল বান্দার মাঝে বিনয় ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষীতা সৃষ্টি করে, যা সামগ্রিকভাবে উত্তম পরিণতির দিকেই পরিচালিত করে। তার মানে এই নয় যে, কেউ পাপ করে বলবে আমি এর মাধ্যমে বিনয়ী হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করার চেষ্টা করছি, যদিও দুঃখজনকভাবে সূফী নামধারীদের কেউ কেউ এই পন্থা অবলম্বন করেছে।
অন্যদিকে যেই ইবাদাত ব্যক্তির মনে দম্ভের সৃষ্টি করে তা স্বয়ং ভালো আমল হলেও তা পরিণতির দিক থেকে মোটেও ভালো নয়। নবী বলেছেন,
"যার অন্তরে সরিষার দানা সমপরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"
তিনি আরও বলেছেন,
“মুমিনের বিষয়টি কতই-না চমৎকার! তার জন্য সকল কিছুই কল্যাণময়। আর এমনটা মুমিন ছাড়া আর কারো হয় না। তার সাথে উত্তম কিছু হলে সে কৃতজ্ঞ হয় এবং এটা তার জন্য কল্যাণময়। তার সাথে খারাপ কিছু ঘটলে সে ধৈর্য ধরে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণময়।”১
এ হাদীছ থেকে বোঝা যায় আমরাই নিজেদের ওপর ভালো কিংবা মন্দ ফলাফল নির্ধারণ করি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও গ্রহণ করার মনোভাবের মাধ্যমে। ভালো সময়ের কৃতজ্ঞতা এবং খারাপ সময়ের ধৈর্য সকল কিছুই আমাদের জন্য কল্যাণবহ। কিন্তু আমরা যদি নিআমত পেয়ে দম্ভ করি আর খারাপ সময়ে আফসোস আর হা-হুতাশ করে বেড়াই, তবে আমরা অজ্ঞতার পরিচয় দিলাম, এভাবে তা আমাদের জন্য আখেরে অমঙ্গলে পরিণত হলো। আমাদের আচরণের ওপরই নির্ভর করছে কোনো ঘটনা আমাদের জন্য সত্যিকারার্থেই নিআমত নাকি শাস্তি!
টিকাঃ
১. (সূরা ফজর, ৮৯:১৫-১৭)
১. (সূরা আনআম, ৬:৪৪-৪৫)
১. (সূরা নিসা, ৪:১৪২)
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৬২)
১. (বুখারী)
📄 সপ্তদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর সাহচর্য উপভোগ ও তাঁর নিকট দুআ
“তিনি যদি তোমার থেকে আপনজনদের দূরে নিয়ে যান, তবে জেনে রাখো তিনি তোমার জন্য তাঁর সাহচর্যের দ্বার খুলে দিচ্ছেন। "তিনি যদি তোমাকে দুআ করার সামর্থ্য দেন, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে কিছু দিতে চাচ্ছেন।”
কখনো কখনো আমাদের প্রিয়জন মারা যায়, আমরা বহুদূরের দেশে চলে যাই, কখনো হতে পারি কারাবন্দী, কিংবা হতে পারি রোগের কারণে হাসপাতালবন্দী। এসকল কিছুই আসলে পরীক্ষা, যা তিনি আমাদের কল্যাণার্থেই দিয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে আত্মীয়তা, বন্ধুত্বের বন্ধনের প্রকৃত সত্য উন্মোচন করে আমাদেরকে তাঁর সঙ্গের দিকে পরিচালিত করেন। সর্বদা পিতামাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গবেষ্টিত থাকার কারণে আমরা আল্লাহকে স্মরণের সময় পাই না। কিন্তু এরাই যখন আমাদের থেকে দূরে চলে যায় তখন আমরা একনিষ্ঠতা ও মনোযোগীতার সাথে আল্লাহকে স্মরণ করার ফুরসত পাই। বিচ্ছিন্নতাকে আপনি হয়ত পরীক্ষা ভাবছেন, উপলব্ধি করতে পারলে তা আসলে এক মহান নিআমত।
ইসলামী ইতিহাসে এরকম অনেক আলিম আছেন যারা কারাবন্দী হয়েও অবিস্মরণীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেননা, তারা প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদের এ সময়টিকে শাস্তি নয়; বরং উপহার হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অন্যান্য সময় সাধারণ যে ব্যস্ততা থাকে সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রাখার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।১
ইবনু আতা বলছেন, “তিনি যদি তোমাকে দুআ করার সামর্থ্য দেন, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে কিছু দিতে চাচ্ছেন।” অনেক সময় বিপদ এতটা সঙ্গীন হয় যে, আল্লাহর কাছে দুআ করা ছাড়া অন্য কোনো পথই খোলা থাকে না। হতে পারে এর আগে আপনি উদাসীন ছিলেন। আল্লাহর কাছে আপনি একনিষ্ঠভাবে দুআ করতেন না। করলেও তাতে দুআর প্রাণ থাকত না। এরকম একটি বিপদ দিয়ে তিনি আপনাকে তাঁর কাছে একনিষ্ঠভাবে দুআ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ
“আচ্ছা! কে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন?”১
এরূপ অবস্থাও আপনার জন্য কল্যাণজনক। কেননা, দুআর মাধ্যমে আপনি সর্বক্ষণ ইবাদাতের মধ্যেই অতিবাহিত করছেন। নবী বলেছেন,
“দুআ হলো ইবাদাত।”২
এ কারণে বিপদাপদকে কখনোই সংকীর্ণ বস্তুগত প্রাপ্তি কিংবা বিয়োগের মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক। কখনো তিনি বিপদের পর বিপদ দিয়ে আপনাকে ভারাক্রান্ত করেন যাতে তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক উন্নত হয়। আপনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে আরও ইখলাস ও ঐকান্তিকতার সাথে ডাকেন। এটা নিঃসন্দেহে বড় নিআমত।
টিকাঃ
১. এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইমাম সারাখসী, যিনি আল-মাবসূত নামের ফিকহী বিশ্বকোষের রচয়িতা, গোটা গ্রন্থটিই আসলে কারাগারে থেকে রচিত। তিনি ছাত্রদেরকে বলতেন আর ছাত্ররা সেটা লিপিবদ্ধ করে নিত। এভাবেই ত্রিশোর্ধ্ব খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থটি পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছে।
১. (সূরা নামল, ২৭:৬২)
২. (তিরমিযী)