📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 ত্রয়োদশ পদক্ষেপ : উদাসীনতা

📄 ত্রয়োদশ পদক্ষেপ : উদাসীনতা


"অন্তর উপস্থিত না হওয়ার কারণে আল্লাহর স্মরণ করা বন্ধ করে দিও না। কেননা তাঁর ব্যাপারে অমনোযোগী হওয়ার চাইতে তাঁকে ভুলে যাওয়া আরও মন্দ। (মৌখিকভাবে যিকর করতে থাকলে) হতে পারে আল্লাহ তোমার অমনোযোগীতার অবস্থাকে মনোযোগীতার অবস্থায় পরিবর্তন করে দেবেন এবং মনোযোগীতার অবস্থা থেকে তাঁর ব্যাপারে পূর্ণ একনিবিষ্টতার অবস্থায় নিয়ে যাবেন। তাঁর ব্যাপারে একনিবিষ্টতা অর্থ তিনি ছাড়া আর সকলকিছুর ব্যাপারে অমনোযোগী হয়ে যাওয়া।"
উদাসীনতা মানুষের অনেক বড় একটি ত্রুটি, আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য তা আরও বেশি ভয়ান‌ক ও মারাত্মক। আমরা নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্বকে ভুলে যাই, বিস্মৃত হয়ে যাই আমাদের দ্বীনি কর্তব্যের ব্যাপারে, এর মূল কারণ উদাসীনতা। এই উদাসীনতা দূর করার উপায় বেশি বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করা। কুরআন ও সুন্নাহয় যিকর বা আল্লাহকে স্মরণ করার ব্যাপারে অসংখ্য নির্দেশনা এসেছে,
وَاذْكُرْ رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُةِ وَالْأَصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغُفِلِينَ.
“তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ করো, আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”১
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بُطِلًا سُبْحَنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
“যারা দণ্ডায়মান, বসা ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে (বলে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তা বৃথা সৃষ্টি করেননি, আমরা আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করি, অতএব আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করুন।”১
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا، وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا.
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করো। এবং সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।”২
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لَا يَزالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِّنْ ذِكْرِ اللَّهِ
“তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকে।”
আমরা আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহও আমাদেরকে স্মরণ করেন
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرُكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
“সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো আর তোমরা আমার শুকরিয়া আদায় করো ও অকৃতজ্ঞ হোয়ো না।”
আল্লাহকে স্মরণ করা অন্তরের প্রশান্তির কারণ,
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوْبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ.
“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো! আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।”১
আল্লাহর স্মরণ করাই ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য,
فَاعْبُدُنِي وَأَقِمِ الصَّلُوةَ لِذِكْرِى
“অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো।"২
কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যিকর করা হলেও অন্তর মনোযোগী হয় না। হৃদয় অমনোযোগী থাকে, কিন্তু জিহ্বা নড়তে থাকে। ফলে যিকরের সাথে আত্মিক সংযোগ ঘটে না, আধ্যাত্মিক যোগাযোগ স্থাপিত হয় না। ইবনু আতা বলছেন, “অন্তর উপস্থিত না হওয়ার কারণে আল্লাহর স্মরণ করা বন্ধ করে দিও না। কেননা, তাঁর ব্যাপারে অমনোযোগী হওয়ার চাইতে তাঁকে ভুলে যাওয়া আরও মন্দ। (মৌখিকভাবে যিকর করতে থাকলে) হতে পারে আল্লাহ তোমার অমনোযোগীতার অবস্থাকে মনোযোগীতার অবস্থায় পরিবর্তন করে দেবেন এবং মনোযোগীতার অবস্থা থেকে তাঁর ব্যাপারে পূর্ণ একনিবিষ্টতার অবস্থায় নিয়ে যাবেন। তাঁর ব্যাপারে একনিবিষ্টতা অর্থ তিনি ছাড়া আর সকল কিছুর ব্যাপারে অমনোযোগী হয়ে যাওয়া।"
কুরআন পড়ছেন কিন্তু কুরআনের দাবী ও চাহিদা মোতাবেক কুরআনের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা ও তাদাব্বুর করতে পারছেন না, সালাত পড়ছেন কিন্তু মনোযোগ আসছে না, মুখে যিকর করলেও অন্তরে তার প্রভাব পড়ছে না-এ কারণে ইবাদাত ও যিকর করা বন্ধ করে দেবেন না। কেননা, বাহ্যিকভাবে এসকল আমল যখন অভ্যাসে পরিণত হবে আশা করা যায় একসময় এর সাথে অন্তরের মনোযোগও সংযুক্ত হয়ে যাবে। বান্দার চেষ্টা দেখে আল্লাহ বান্দার বাহ্যিক আমলের সাথে অন্তরকেও জুড়ে দেবেন। হতে পারে এক সময় মুমিনের মাঝে উচ্চতর মনোযোগ ও পূর্ণ একনিবিষ্টতা চলে আসবে যার কারণে আমলের সাথে অন্তর সর্বদা উপস্থিত থাকবে।
অন্তরে সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি সাধারণ মনোযোগীতা থেকে উচ্চতর স্তর। অন্তরের উপস্থিতির মানে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে সে অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ত্ব, ঐশ্বর্য ও নিআমত অনুভব করতে পারে: জান্নাতের কথা ওঠানো হলে সে মনে মনে জান্নাতকে উপলব্ধি করতে পারে। আলী ইবনু আবি তালিব এমন অন্তরের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, "তাদের সামনে আযাবের কোনো আয়াত আসলে তাদের অন্তর ভীত হয়, তাদের কর্ণ সজাগ হয়ে যায়, যেন তারা নিজেদের কানে জাহান্নামের চিৎকার ও ক্রন্দন শুনতে পাচ্ছে। জান্নাতের বর্ণনা শুনলে তাদের মাঝে ব্যাকুলতা সৃষ্টি হয়, তারা হন্যে হয়ে জান্নাতকে খুঁজতে থাকে, তারা জান্নাতের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, যেন তারা জান্নাতকে স্বচক্ষে দর্শন করছে।"
এমতাবস্থায় আল্লাহর নাম স্মরণ করা মাত্রই তারা আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছু থেকে আন্তরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুই তার চেতনায় বিরাজ করতে পারে না। এটা অন্তরের বিশেষ এক অবস্থা। সবার এরকম হালত হয় না। আল্লাহর বিশেষ এই নিআমত যদি দিনে বা সপ্তাহে এক দু'বারও আসে তবুও তা বান্দার জন্য বিরাট সৌভাগ্য। এক মুহূর্তের জন্য হলেও গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অভিনিবেশ ও আত্মিকভাবে আল্লাহর সাথে নিজেকে জুড়ে রাখা, অতএব অন্তরে সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি ও সাধারণ মনযোগের বিষয়টি একই নয়, এদের মাঝে পার্থক্য আছে।
যেমন-আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাঈর রাদিআল্লাহু আনহু সালাত পড়তে দাঁড়ালে নিজের ঘরের দেয়াল পতিত হওয়ার শব্দও অনুভব করতে পারতেন না। পাখি তাঁর মাথায় এসে দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু তিনি নিশ্চলভাবে সালাত পড়তেই থাকতেন। মানুষজন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলতেন 'আমি কোনো শব্দই শুনতে পাইনি।' এটা কীভাবে হত? কারণ তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে সত্যিকারার্থেই আল্লাহর দরবারে হাজির হতেন। তিনি দুনিয়া থেকে নিজেকে পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিজেকে মহামহিম আল্লাহর সামনে পেশ করতেন। নিজের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণের সাথে এমনভাবে জুড়ে রাখতেন যে, তিনি জগতের কোনো কিছুই অনুভব করতে পারতেন না।
তবে প্রাসঙ্গিকভাবে একটি কথা বলে রাখা উচিত, আসলে উদাসীনতা স্বয়ং কিন্তু কোনো সমস্যা নয়। কেন? উদাসীনতা আসলে কি? উদাসীনতা হচ্ছে মনোযোগীতার বিপরীত। মনোযোগ মানে হলো concentration বা মনকে একটি বিশেষ বিষয়ের প্রতি নিবদ্ধ করা। আর মনকে বিশেষ একটি বিষয়ের প্রতি নিবদ্ধ করা মানে হলো অন্যান্য যেসব জায়গায় মন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেখান থেকে তাকে মুক্ত করা। মনকে বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্ত করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই তা concentrated বা ঘণীভূত হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কিছুর ওপর মনোযোগ দিতে হলে কিছু না কিছুর ওপর থেকে মনোযোেগ সরিয়ে নিতেই হয়, অর্থাৎ, এক প্রকার উদাসীন হয়ে যেতে হয়। উদাসীনতা মনের এক প্রকার স্বাভাবিকতাই বটে। এমন কোনো মন নেই যেখানে উদাসীনতা নেই। যেখানেই মন আছে সেখানেই উদাসীনতা আছে।
এ কারণে উদাসীনতা স্বয়ং মন্দ কিছু নয়। তাই মন থেকে উদাসীনতা পুরোপুরি নির্মূল করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বরং কিছু কিছু উদাসীনতা অন্তরের ব্যাধি এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে ক্ষতিকর। দেখার বিষয় হচ্ছে আমি-আপনি কিসের প্রতি মনোযোগী আর কিসের প্রতি উদাসীন। হয় আপনি জগতের প্রতি উদাসীন থাকবেন এবং সত্যের প্রতি মনোযোগী হবেন অন্যথায় জগতের প্রতি মনোযোগী হয়ে সত্যের দিকে মনোযোগ হারাবেন। যদি সত্যের প্রতি উদাসীন থাকা হয় এবং মিথ্যার প্রতি আগ্রহ থেকে থাকে তবে নিঃসন্দেহে সেই উদাসীনতা নেতিবাচক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে ক্ষতিকারক। তখনই তা আত্মঘাতী ব্যাধিতে পরিণত হবে। ধীরে ধীরে তা প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলবে, যতক্ষণ না তাওবা ও তাকওয়া নামক উদাসীনতাবিনাশী শক্তিগুলো দ্রুত তাকে গ্রাস না করে নিচ্ছে।
আর আমরা যদি উদাসীনতাকে সত্যিকারার্থেই ব্যবহার করতে পারি, সত্যের প্রতি মনোযোগী থাকি, সৎকর্ম ও তাকওয়ার প্রতি মনোযোগ আবদ্ধ রাখি, সত্যের প্রতি অন্তরের চোখ সবসময় খোলা রাখতে পারি এবং মিথ্যা, অস্থায়ীত্ব, অর্থহীনতা ইত্যাদি থেকে উদাসীন থাকতে পারি-তখন আমরা প্রকৃতার্থেই জেগে উঠতে পারবো, হতে পারবো মনোযোগী, হতে পারবো মুক্ত-ব্যাধিরূপ উদাসীনতা থেকে।
আশা রাখি যে, একদিন উদাসীনতা ও বিস্মৃতির সুড়ঙ্গ থেকে আমরা আত্মিক নিশ্চলতা ও প্রশান্তির আলোর পথে হাঁটবো। এক নতুন 'আমি'তে পরিণত হবো। যেই 'আমি' নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালককে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্মরণ ও উপলব্ধি করতে পারবে।

টিকাঃ
১. (সূরা আ'রাফ, ৭:২০৫)
১. (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৯১)
২. (সূরা আহযাব, ৩৩:৪১-৪২)
৩. (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)
৪. (সূরা বাকারাহ, ২:১৫২)
১. (সূরা রাদ, ১৩:২৮)
২. (সূরা ত্বহা, ২০:১৪)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 চতুর্দশ পদক্ষেপ : অপমান, মুখাপেক্ষীতা ও ধোঁকা থেকে মুক্ত হওয়া

📄 চতুর্দশ পদক্ষেপ : অপমান, মুখাপেক্ষীতা ও ধোঁকা থেকে মুক্ত হওয়া


"(মানুষের কাছ থেকে) অপমানের বৃক্ষ আসলে (তাদের প্রতি) মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকে উদগত।"
অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা নিজের দোষত্রুটি অন্বেষণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। ইবনু আতা এখানে আরেকটি দোষের কথা উল্লেখ করছেন, তা হলো- অপমান। প্রশ্ন আসতে পারে যে অপমান ভোগ করছে তার দোষ কীভাবে হয়, দোষ তো হওয়ার কথা যে অপমান করেছে তার? অপমান এ কারণে দোষ কেননা, এই অপমান আসলে অন্তরে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজের বহিঃপ্রকাশ। অত্যন্ত আলঙ্কারিকভাবে ইবনু আতা দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছেন, "(মানুষের কাছ থেকে) অপমানের বৃক্ষ আসলে (তাদের প্রতি) মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকে উদগত।”
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজই এক সময় মানুষের কাছ থেকে আগত অপমানের বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। এই বৃক্ষ কথা ও কাজের মাধ্যমে সিঞ্চিত হয়, যার মাধ্যমে মানুষ আরেক মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন ও আর্জি পেশ করে।
এই মুখাপেক্ষীতার কারণ কি? ইবনু আতার ভাষায় এর কারণ হলো 'ধোঁকা”, “আর কোনো কিছুই তোমাকে এরূপ ধোঁকা দিতে পারে না যতটা এই ধারণা যে, তুমি যা ছেড়ে দাও সেক্ষেত্রে তুমি স্বাধীন, কিন্তু তোমার যা প্রয়োজন সে ব্যাপারে তুমি দাসানুদাস।” যারা মানুষের কাছে এই ভেবে ধরনা দেয় যে তারা মনে হয় তার প্রকৃত উপকার সাধন করতে পারবে-তবে এটা এক বিশাল ধোঁকা। কেননা প্রতিপালক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই প্রকৃত উপকার করতে পারে না। মানুষের প্রতি এরূপ মুখাপেক্ষীতা অনুভব করাই অপমানের কারণ, মানুষ কারো উপকার করতে পারে এই ধোঁকাই মুখাপেক্ষীতার কারণ। এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই সমাধান এবং আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার অনেক বড় একটি পন্থা।
জীবনে চলতে হলে মানুষের সাহায্য নেওয়া মাঝে মাঝে একান্ত জরুরী হয়ে পড়ে। তাতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ এই সাহায্য নেওয়া সাহায্যকারীর প্রতি মুখাপেক্ষীতার সৃষ্টি না করছে, যা বিনিময়ে অপমান ও দাসত্ব সৃষ্টি করে।
নবী বলেছেন,
أَطْلُبُوا الْحَوَائِجَ بِعِزَّةِ الْأَنْفُسِ
"নিজের প্রয়োজন চাইতে হলে মর্যাদার সাথে চাও।”
প্রয়োজনের সময় মানুষের কাছে চাইতে বাধা নেই, তবে মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের সাথে চাইতে হবে, অন্তরে মুখাপেক্ষীতা ও নিচুতার ভাব রাখা যাবে না। অন্তরে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজ রোপণ করতে দেওয়া যাবে না, যাতে তা অপমানের বৃক্ষে পরিণত না হতে পারে। মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার ভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারলে ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে মানুষের সাথে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে আচরণ করা সম্ভবপর হয়। নবী ইবনু আব্বাসকে উপদেশ দিতে যেয়ে বলেছেন,
“হে বৎস! যদি গোটা জাতি একত্রিত হয়ে তোমার উপকার করার চেষ্টা করে তবে তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না যতটুকু তোমার ভাগ্যে লেখা আছে তা বাদে। গোটা জাতি যদি তোমার বিরুদ্ধে একত্র হয়ে তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না যতটুকু তোমার জন্য লিখিত হয়ে আছে।”১
প্রকৃত স্বাধীনতা আল্লাহর দাসত্বেই, স্বাধীনতার এটাই প্রকৃত ইসলামী দৃষ্টিকোণ। আপনি যখন আল্লাহর দাস হবেন তখন আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছু থেকে আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন; মানুষ, বস্তু, নিজের কামনা-বাসনা, সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ যাই হোক না কেন।
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার ভাব থেকে যেমন অপমান উদ্ভূত, আল্লাহর প্রতি প্রকৃত দাসত্বের বৃক্ষ আল্লাহর প্রতি আন্তরিক মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকেই উদগত। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত অন্যদের (প্রতি মুখাপেক্ষীতা) বর্জন করে আল্লাহর প্রতি দাসানুভূতির সঠিক পরিচর্যা করা। যা আমাদেরকে আল্লাহর পথের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে পরিচালিত করবে।

টিকাঃ
¹ (তিরমিযী)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 পঞ্চদশ পদক্ষেপ : কৃতজ্ঞতাবোধ

📄 পঞ্চদশ পদক্ষেপ : কৃতজ্ঞতাবোধ


"তুমি যখন কৃতজ্ঞতা পোষণ করো না তখন তা হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দাও। আর যখন কৃতজ্ঞতা আদায় করো তখন তা নিজের সাথে দৃঢ়ভাবে বেঁধে নাও। যদি তুমি নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে অগ্রসর না হও তবে তিনি তোমাকে পরীক্ষার শেকল দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেবেন।"
রিযকের ক্ষেত্রে আল্লাহর একটি সুন্নাত হচ্ছে আমরা যদি কৃতজ্ঞ হই তবে তিনি বৃদ্ধি করে দেবেন অথবা অধিক উত্তম কোনো কিছু দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করে দেবেন।
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
“যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তাহলে তোমাদেরকে অবশ্যই (আমার নিআমত) বৃদ্ধি করে দেবো।”১
আমরা কখনোই আল্লাহর সকল নিআমত গণনা করতে পারবো না। এ কারণে আমাদের উচিত আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন সর্বোত্তমভাবে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা।
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
“তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।”২
আল্লাহ আরও বলেছেন,
وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
"আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (জেনে রেখো) অবশ্যই আমার শাস্তি কঠোর।”১
এখানে 'কাফারতুম' দ্বারা আভিধানিক অর্থে কুফর বা অবিশ্বাস অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং এর অর্থ আল্লাহর নিআমতের ব্যাপারে অকৃতজ্ঞতা পোষণ করা। এই শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতাহীনতার গুরুত্ববহতা। ইবনু আতা বলেছেন, "তুমি যখন কৃতজ্ঞতা পোষণ করো না তখন তা হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দাও। আর যখন কৃতজ্ঞতা আদায় করো তখন তা নিজের সাথে দৃঢ়ভাবে বেঁধে নাও।” আল্লাহ নিআমত বৃদ্ধি করে দেওয়ার, নিরন্তর নিআমত বর্ষণের প্রতিশ্রুতি করেছেন-তবে শর্ত হচ্ছে নিআমতের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। তবে কৃতজ্ঞতা মানে কেবল মুখে মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলা নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত নিআমতকে সর্বোত্তম উপায়ে ব্যবহারের মাধ্যমেও এই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে।
ইবনু আতা বলছেন, “যদি তুমি নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে অগ্রসর না হও তবে তিনি তোমাকে পরীক্ষার শেকল দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেবেন।" অতএব আমরা যদি আল্লাহর নিআমতের শুকরিয়া স্বরূপ নেক আমল করে আল্লাহর দিকে না আগাই তবে আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা নেবেন এবং এর মাধ্যমে আমাদেরকে তাঁর কাছে টেনে নেবেন। এটাও আল্লাহর সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।
পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের মর্যাদাকে উন্নীত ও অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন। আপনি যখন বিপদে পতিত হন, আল্লাহর দিকে ফিরে যান, এর মাধ্যমে আপনি আল্লাহর নিকটবর্তী হন এবং তিনি আপনার গুনাহ মাফ করে দেন।
وَلَقَدْ أَخَذْنُهُمْ بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
"আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হলো না এবং কাতর প্রার্থনাও করে না।”২
أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ
"তারা কি দেখে না যে, 'তাদেরকে প্রতি বৎসর একবার বা দু'বার বিপর্যয়স্থ করা হয়?' এরপরও তারা তাওবাহ করে না এবং উপদেশও গ্রহণ করে না।"১
আল্লাহ শাস্তি দেওয়ার জন্য বিপদ দেন না। তিনি শাস্তি দেন তাঁর নিআমতের কদর উপলব্ধির জন্য, আমাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করার জন্য। তিনি চান বিপদের মাধ্যমে যাতে কথা ও কাজের মাধ্যমে আমরা আরও অধিক পরিমাণে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ করি।
আমরা প্রতি মুহূর্তেই তাঁর দেওয়া অজস্র নিআমত ভোগ করে চলেছি। কিন্তু তিনি একটি নিআমত কেড়ে নিলে আমরা ভাবি আমরা বুঝি 'শেষ'। আসলে তা হাজারো নিআমতের একটি মাত্র। বিপদের মূল উদ্দেশ্য একটি নিআমত চলে যাওয়ার মাধ্যমে যাতে আমরা অন্যান্য নিআমতের মর্মও অনুভব করি এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করি। যদি আমরা একনিষ্ঠভাবে তাওবা করি তবে আমাদের পরীক্ষা শেষ।
سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا
"আল্লাহ কষ্টের পর সহজ করে দেবেন।"
فَإِنَّ مَّعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَّعَ الْعُسْرِ يُسْرًا.
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।"
যদি আমরা পরীক্ষা একেবারেই বাদ দিয়ে দিতে চাই তবে আমাদেরকে কোনো ভুল করা চলবে না। কিন্তু মানুষমাত্রই ভুল করে। ভুল করাটাই তার স্বভাব, না করাটাই বরং অস্বাভাবিকতা। আমরা সর্বদা নিষ্কলুষতার সাথে আল্লাহর পথে চলতে পারি না। সর্বদা তাঁর নিআমতের শুকরিয়া আদায় করা আমাদের দ্বারা হয়ে ওঠে না। আমরা বারেবারে বিস্মৃত হয়ে যাই-ই। এ কারণে নবী বলেছেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُوْنَ
"প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। কিন্তু সর্বোত্তম ভুলকারী যে তাওবা করে।”
আল্লাহ যেন আমাদের এই যাত্রাকে সহজ করে দেন। এমন কোনো পরীক্ষা না নেন যা আমাদের সাধ্যাতীত। আর যখন পরীক্ষা আপতিত হয়েই যায় তখন যেন ধৈর্য ও তাওবার সাথে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি, আমীন।

টিকাঃ
১. (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৭)
২. (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৩৪)
১. (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৭)
২. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৭৬)
১. (সূরা তাওবা, ৯:১২৬)
২. (সূরা ত্বলাক, ৬৫:৭)
৩. (সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৫-৬)
¹. (তিরমিযী)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 ষষ্ঠদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর ‘দান করা’ ও ‘বঞ্চিত করা’র প্রজ্ঞা বোঝা

📄 ষষ্ঠদশ পদক্ষেপ : আল্লাহর ‘দান করা’ ও ‘বঞ্চিত করা’র প্রজ্ঞা বোঝা


“তুমি ভাবছ আল্লাহ তোমাকে দিচ্ছেন, আসলে তিনি তোমাকে বঞ্চিত করছেন! তুমি ভাবছ তিনি তোমার থেকে কেড়ে নিচ্ছেন, আসলে তিনি তোমাকে দিচ্ছেন! তোমাকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে যদি আল্লাহ তোমার জন্য বুঝের দ্বার খুলে দেন, তবে এটা তোমার জন্য উপহার। তুমি বিপদকে শাস্তি ভাবো, কেননা তুমি এর মর্ম বুঝতে পারছ না। তোমার জন্য ইবাদাতের দরজা খুলে দেওয়া হলো কিন্তু তোমার জন্য কবুলিয়্যাতের দরজা খোলা হলো না। তুমি গুনাহ করতে উদ্যত হচ্ছ, কিন্তু এটাই হয়ত তোমার জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ হয়ে গেছে। যেই গুনাহ অন্তরে বিনয় ও অনুতাপ সৃষ্টি করে তা অহংকার ও (নিজের ব্যাপারে) ভুল ধারণা সৃষ্টি করা নেক আমলের চাইতে উত্তম।”
আল্লাহ মানুষকে 'ভালো', 'মন্দ', 'সৌভাগ্য' 'দুর্ভাগ্য' দিয়ে পরীক্ষা করেন। কিন্তু অনেক সময় এ বিষয়গুলো নির্ভর করে আমরা এগুলোকে কীভাবে দেখছি ও কীভাবে বিচার করছি। ইবনু আতা আল্লাহর 'দান' ও 'বঞ্চিত' করার প্রজ্ঞা বোঝাতে চাচ্ছেন।
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ. وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّ أَهَانَنِ. كَلَّا بَلْ لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ.
“মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। কক্ষনো নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান করো না।”১
আল্লাহ আমাদের রিযক সংকুচিত করে দেন, এর মানে কি এই নয় যে তিনি আমাদেরকে অপমান করছেন এবং তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন দান করেছেন মানে কি এই নয় যে এটা আসলেই উত্তম? এটা বিচার করার মানদণ্ড কি? মানদণ্ড হচ্ছে বুঝ বা ফাহম। বিপদের মাধ্যমে যদি সঠিক বুঝ আসে, উপলব্ধি অর্জিত হয়, তবে এই বুঝের কারণে আমরা যা হারিয়েছি তার চাইতেও বেশি কিছু অর্জন করে নিয়েছি। বুঝ না থাকলে আমরা পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বিচার করি। টাকা, সম্পদ, প্রিয়জন হারিয়েছি মানে তা বিরাট "ক্ষতি'। কিন্তু যদি এর মাধ্যমেই আমরা পরিতুষ্টি, উত্তম আমল, দৃঢ় ইচ্ছার সম্পদ লাভ করি তবে এটাই ওই আপাত ক্ষতির চাইতে বেশি অর্জন বলে গণ্য হবে।
এ কারণে, আমাদের দান ও বঞ্চিতকরণের প্রকৃত অর্থ বোঝা দরকার। অনেক সময় বিরাট অংকের অর্থপ্রাপ্তি আদতে ভালো নয়, কেননা এই অর্থ হয়ত গুনাহের কাজে ব্যয়িত হবে। এভাবে আল্লাহ অধিক পরিমাণে সম্পদ দেন যাতে সে ফিরে আসে এই পাপের রাস্তা থেকে।
فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُكِّرُوْا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوْا بِمَا أُوْتُوْا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُوْنَ. فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ.
“তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তারা যখন তা বিস্মৃত হলো তখন আমি তাদের জন্য সমস্ত কিছুর (নিআমতের) দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম; অবশেষে তাদেরকে যা দেয়া হলো তারা তাতে উল্লসিত হলো তখন অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম; ফলে তখনি তারা নিরাশ হলো। অতঃপর যালিম সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হলো এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”১
আল্লাহ যখনই নিআমতের দ্বার খুলে দেন তিনি চান আমরা যাতে এর মাধ্যমে সঠিক বুঝ হাসিল করি। এ কারণে নিআমতপ্রাপ্ত হলে প্রথমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত এই নিআমতের সাথে জড়িত সম্ভাব্য পরীক্ষার বিষয়টিকেও গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। ইবনু আতা দুটি উদাহরণ দিয়েছেন, “তোমার জন্য ইবাদাতের দরজা খুলে দেওয়া হলো কিন্তু তোমার জন্য কবুলিয়্যাতের দরজা খোলা হলো না। তুমি গুনাহ করতে উদ্যত হচ্ছ, কিন্তু এটাই হয়ত তোমার জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পথ হয়ে গিয়েছে।”
অনেক মানুষ সালাত, কুরআন হিফয, দান-সাদাকা, হজ্জ আদায় করা, মানুষকে উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়াসহ নানা ভালো কাজে লিপ্ত আছে, সে ভাবছে এগুলো নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমত। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা এর বিপরীত। সে আমল করেছে কিন্তু এর প্রতিদান সে পাবে না। কেননা তাঁর নিয়্যাতে বিশুদ্ধতা ছিলো না, ছিলো একনিষ্ঠতার অভাব। সে মনে মনে মানুষের প্রশংসাপ্রাপ্তির বাসনা করত। আর এই নিয়্যাত নিয়ে ভালো আমল করাই তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুনাফিকরা লোক দেখানো সালাত পড়ত।
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ يُخْدِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خُدِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلُوةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا.
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়-কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।”১
আবার ভালো কাজে ভালো নিয়্যাত থাকার পরেও পরবর্তী কিছু কাজের জন্য সেই কাজের প্রতিদান বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।
الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَلَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنفَقُوا مَنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ.
“যারা আল্লাহর পথে তাদের মাল খরচ করে, পরে তার জন্য খোঁটা দেয় না এবং কষ্টও দেয় না তাদের জন্য প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের নিকট। আর তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”১
এ আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে খোঁটা দেওয়া ও দানের কথা মনে করিয়ে কষ্ট দেওয়ার মানসিকতা রেখে দান করলে বা পরবর্তীতে খোঁটা দেওয়া হলে এতে দান নষ্ট হয়ে যায়। আমল কবুল হওয়ার মূল শর্ত একনিষ্ঠতা। এর মাধ্যমেই আমলে গ্রহণযোগ্যতা আসে; আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উপকার হাসিল হয়।
এরপর তিনি আরেকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, “যেই গুনাহ অন্তরে বিনয় ও অনুতাপ সৃষ্টি করে তা অহংকার ও (নিজের ব্যাপারে) ভুল ধারণা সৃষ্টি করা নেক আমলের চাইতে উত্তম। ইবনুল কাইয়্যিমও একই কথা বলেছেন, "একটি গুনাহ কখনো কখনো বিনয় সৃষ্টি করে জান্নাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আবার ইবাদাতও কখনো কখনো অহংকার সৃষ্টি করে, যা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
অবশ্যই স্বয়ং পাপ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় না। যে পাপ সংঘটিত হয়েছে, গুনাহকারী যদি সেই পাপ থেকে তাওবা করে, নিজের মানসিকতা ও পথ পরিবর্তন করে নেয়, নিজের পাপকে অনুতাপের সাথে স্মরণ করে এবং ভালো আমলের মাধ্যমে সেই পাপের যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করে তবে এর ফলাফল বান্দার মাঝে বিনয় ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষীতা সৃষ্টি করে, যা সামগ্রিকভাবে উত্তম পরিণতির দিকেই পরিচালিত করে। তার মানে এই নয় যে, কেউ পাপ করে বলবে আমি এর মাধ্যমে বিনয়ী হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করার চেষ্টা করছি, যদিও দুঃখজনকভাবে সূফী নামধারীদের কেউ কেউ এই পন্থা অবলম্বন করেছে।
অন্যদিকে যেই ইবাদাত ব্যক্তির মনে দম্ভের সৃষ্টি করে তা স্বয়ং ভালো আমল হলেও তা পরিণতির দিক থেকে মোটেও ভালো নয়। নবী বলেছেন,
"যার অন্তরে সরিষার দানা সমপরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"
তিনি আরও বলেছেন,
“মুমিনের বিষয়টি কতই-না চমৎকার! তার জন্য সকল কিছুই কল্যাণময়। আর এমনটা মুমিন ছাড়া আর কারো হয় না। তার সাথে উত্তম কিছু হলে সে কৃতজ্ঞ হয় এবং এটা তার জন্য কল্যাণময়। তার সাথে খারাপ কিছু ঘটলে সে ধৈর্য ধরে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণময়।”১
এ হাদীছ থেকে বোঝা যায় আমরাই নিজেদের ওপর ভালো কিংবা মন্দ ফলাফল নির্ধারণ করি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও গ্রহণ করার মনোভাবের মাধ্যমে। ভালো সময়ের কৃতজ্ঞতা এবং খারাপ সময়ের ধৈর্য সকল কিছুই আমাদের জন্য কল্যাণবহ। কিন্তু আমরা যদি নিআমত পেয়ে দম্ভ করি আর খারাপ সময়ে আফসোস আর হা-হুতাশ করে বেড়াই, তবে আমরা অজ্ঞতার পরিচয় দিলাম, এভাবে তা আমাদের জন্য আখেরে অমঙ্গলে পরিণত হলো। আমাদের আচরণের ওপরই নির্ভর করছে কোনো ঘটনা আমাদের জন্য সত্যিকারার্থেই নিআমত নাকি শাস্তি!

টিকাঃ
১. (সূরা ফজর, ৮৯:১৫-১৭)
১. (সূরা আনআম, ৬:৪৪-৪৫)
১. (সূরা নিসা, ৪:১৪২)
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৬২)
১. (বুখারী)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00