📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 নবম পদক্ষেপ : প্রারম্ভকে দীপ্তিময় করা

📄 নবম পদক্ষেপ : প্রারম্ভকে দীপ্তিময় করা


"সাফল্যের নিদর্শন হলো প্রারম্ভেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। যার শুরুটা আলোকিত, তার শেষটাও আলোকিত।"
বান্দা পূর্ববর্তী পদক্ষেপসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসার যোগ্য পরিণত হয়েছে। নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে হতে সে চিত্তের প্রশান্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন সে সর্বদাই নতুন নতুন আমলের কথা চিন্তা করে যা তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে পারে। এর মাধ্যমে আরেকটি নিয়মের কথা জানা যায়, তা হলো- ভিত্তি মজবুত করে নব নব উদ্যোগ চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রায় নিশ্চিত করে দেয়। যদি সে প্রারম্ভ থেকেই সচেতন থাকতে পারে, প্রারম্ভ থেকেই আলোর পথে হাঁটতে পারে তবে তার আখেরটাও উত্তমই হবে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রারম্ভকে আলোকিত করার উপায় কী? ইবনু আতা এর উত্তরে বলেছেন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। কিন্তু শুরুর দিকেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কীভাবে সম্ভব?
ইসলাম আমাদেরকে যেকোনো কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে শিক্ষা দেয়। নবী ﷺ বলেছেন,
"যে কাজ আল্লাহর নামে শুরু করা হয় না তা (আল্লাহ প্রদত্ত বারাকাহ) বঞ্চিত।”১
মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজই আল্লাহর নামে, আল্লাহকে স্মরণ করে শুরু করা। কথা বলতে হলে আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ পড়ে শুরু করুন। সালাতের প্রারম্ভে নিজের নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করে নিন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর সাথে পরামর্শ করে নিন ইস্তিখারা সালাত পড়ার মাধ্যমে। নবী ﷺ সাহাবীদেরকে কুরআন শেখানোর মত গুরুত্ব দিয়ে ইস্তিখারার সালাত শেখাতেন। এই সালাতে এই দুআ পড়তে হয়,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ العَظِيمِ؛ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ - وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ - خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ - فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسَّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيْهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرُّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ - فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أَرْضِنِي بِه.
“হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের সাহায্যে আপনার নিকট কল্যাণ কামনা করছি। আপনার শক্তির সাহায্যে আপনার নিকট শক্তি কামনা করছি এবং আপনার মহান অনুগ্রহের প্রার্থনা করছি। কেননা আপনিই শক্তিধর, আমি শক্তিহীন। আপনি জ্ঞানবান, আমি জ্ঞানহীন এবং আপনি গায়েবী বিষয় সম্পর্কে মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! এই কাজটি (এখানে উদ্দিষ্ট কাজ বা বিষয়টি মনে মনে উল্লেখ করবে) আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমার দীন, আমার জীবিকা এবং আমার কাজের পরিণতির দিক দিয়ে, (অথবা বলেছেন) ইহকাল ও পরকালের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন এবং তাকে আমার জন্য সহজলভ্য করে দিন, তারপর তাতে আমার জন্য বরকত দান করুন। আর এই কাজটি আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমার দীন, আমার জীবিকা এবং আমার কাজের পরিণতির দিক দিয়ে, (অথবা বলেছেন) ইহকাল ও পরকালের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে আপনি আমাকে তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন এবং যেখানেই কল্যাণ থাকুক আমার জন্য সেই কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন। অতঃপর তাতেই আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।”১
এসকল কিছুই আল্লাহকে স্মরণ করার উপায়। আল্লাহকে স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে আমরা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, একমাত্র তাঁর ওপরই ভরসা করেছি এবং আমরা সর্বক্ষেত্রে তাঁর সাহায্যই কামনা করি। ইবনু আতার ভাষায় প্রারম্ভে আল্লাহকে স্মরণ করা চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে দেয় এবং এটাই সাফল্যের নিদর্শন। হতে পারে আমরা জাগতিক দৃষ্টিতে জিতেছি, হতে পারে আমরা হেরেছি, কিন্তু যতক্ষণ আমরা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করছি এবং এ ব্যাপারে সচেতন থাকছি ততক্ষণ আমরা আল্লাহর দৃষ্টিতে বিজয়ী, জাগতিক ফলাফল যা-ই হোক না কেন। আসল বিষয় হচ্ছে শুরুতে আল্লাহকে স্মরণ করা, আশা করা যায় এটাই অনুকূল ফলাফল এনে দেবে।
যেমন আপনি ব্যবসা করছেন। সাধারণভাবেই আপনার লক্ষ্য থাকবে মুনাফা কামানো। এখানে লাভ ও ক্ষতির সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে। তবে মনে করুন আপনি ইস্তিখারা করলেন এবং আপনার লোকসান হলো। আপনি হয়ত আপনার নির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। তবে হতে পারে এই লোকসানই আপনাকে আপনার ব্যবসা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা তৈরী করতে আরও বেশি আগ্রহী ও তাড়িত করে তুললো। এর মাধ্যমেই হয়ত আপনি আপনার পূর্বতন পরিকল্পনাকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে করে নিজের সূক্ষ্ম ত্রুটি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং এর মাধ্যমেই আপনি সেগুলো দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারবেন, যা সামগ্রিকভাবে আপনার জন্য অধিক উপকারী হবে। আপনি হয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন, কিন্তু এই সময়েই আপনি পেয়ে গেলেন কোনো খাঁটি বন্ধু, যে বিপদাপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, দুঃখের ভাগীদার হয়। এভাবে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি পরাজিত হলেও সামগ্রিকভাবে বিজয়ীই হলেন।
কেননা, মানুষের কাছে সাফল্য ও ব্যর্থতার মানদণ্ড সাধারণত 'পরিসংখ্যানগত সংখ্যা'র ওপর নির্ভরশীল। মানুষ স্থূলদৃষ্টিতে সাফল্য ও ব্যর্থতাকে বিচার করে। কিন্তু আল্লাহর কাছে এই মানদণ্ডের সেরূপ মূল্য নেই। প্রকৃতপক্ষে যা মূল্যবান তা হচ্ছে আখিরাত ও পরকালীন সুখশান্তি। এ কারণে যে প্রথম থেকেই আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন হবে আশা করা যায় সে আখেরেও কাঙ্খিত ফলাফলই লাভ করবে।
এই নীতিটি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেমন-নবী সেই সাত শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন যারা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া পাবে। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে 'যেই যুবক আল্লাহর ইবাদাতের মধ্য দিয়ে বড় হয়'। (বুখারী) এই যুবক জীবনের শুরু থেকেই আল্লাহর ইবাদাত করে এসেছে, তাই তার চূড়ান্ত ফলাফলও সুখময় হয়েছে। সে আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবার মত বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছে।

টিকাঃ
১. (বায়হাকী)
১. (বুখারী)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 দশম পদক্ষেপ : নিজের ত্রুটি আবিষ্কার

📄 দশম পদক্ষেপ : নিজের ত্রুটি আবিষ্কার


“নিজের মাঝে আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা খোঁজার চাইতে অনেকগুণে উত্তম নিজের দোষত্রুটি খুঁজে বের করা।"
কেউ হয়ত আল্লাহর দিকে যাত্রায় ঠিকঠাকভাবেই সফর করে যাচ্ছে, কিন্তু একটা সময় সে ধোঁকায় পড়ে ভাবতে শুরু করলো এসব করে বুঝি সে আল্লাহকেই ধন্য করছে, দীনের বড়সড় খেদমত করছে, এভাবেই সে নিজের হাজারো ত্রুটিবিচ্যুতি বেমালুম ভুলে যায়। প্রারম্ভকে সুচারু করার কথা বলেই ইবনু আতা বলছেন, “নিজের মাঝে আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা খোঁজার চাইতে অনেকগুণে উত্তম নিজের দোষত্রুটি খুঁজে বের করা।”
ঈমান ও আমলের পথে সক্রিয় মুমিন কিছু ইবাদাত-বন্দেগী করেই ভাবতে পারে সে বুঝি বিরাট কিছু হয়ে গেছে, তার জ্ঞানচক্ষু বুঝি খুলে গেছে, অন্তরাত্মা বুঝি জাগ্রত হয়ে গেছে, এবার সে সৃষ্টির নানা গুপ্ত রহস্য বোঝার মত যোগ্যে পরিণত হয়েছে, এবার বুঝি সময় এসে গেছে আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি প্রাপ্তির যার কথা নবী * এই ভাষায় বলেছেন,
“মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, কেননা সে আল্লাহর নূরের মাধ্যমে দেখে।”১
এ কারণে ইবনু আতা নিজের দোষত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কেউ যদি নিজেকে দোষমুক্ত মনে করে তবে সেটাই তার আত্মার অনেক বড় এক দোষ। ভুলভ্রান্তি, দোষত্রুটি মানুষের স্বভাবের মৌলিক অংশ। মানুষ ভুল করবে, ভুলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। আরবীতে মানুষকে ইনসান বলা হয়, ইনসান শব্দের অর্থই এমন কেউ যে কিনা ভুলে যায়, বিস্মৃত হয়। ভুলত্রুটির উর্ধ্বে হওয়া একমাত্র আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। তিনিই ভুলভ্রান্তি, দোষাবহতার সকল কলুষতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
মানুষ সম্পদের ভয় করে, কিন্তু আল্লাহ এই ভয় করেন না, তিনি অতিশয় দয়ালু ও উদার।
قُل لَّوْ أَنتُمْ تَمْلِكُونَ خَزَائِنَ رَحْمَةِ رَبِّي إِذًا لَّأَمْسَلْتُمْ خَشْيَةً الْإِنفَاقِ وَكَانَ الْإِنْسُنُ قَتُوْرًا
“বলো, 'যদি তোমরা আমার প্রতিপালকের দয়ার ভাণ্ডারের অধিকারী হতে, তবুও 'ব্যয় হয়ে যাবে' এ আশংকায় তোমরা তা ধরে রাখতে; মানুষ তো অতিশয় কৃপণ।” (সূরা ইসরা, ১৭:১০০)
মানুষ অত্যন্ত দুর্বল, কিন্তু আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
يُرِيدُ اللهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ وَخُلِقَ الْإِنْسُنُ ضَعِيفًا
“আল্লাহ তোমাদের ভার হালকা করতে চান; মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে।”১
আল্লাহ করুণার আধার, মানুষ অল্পতেই করুণার বোধ হারিয়ে ফেলে নিষ্ঠুর ও নির্দয় হয়ে উঠতে পারে। আল্লাহ নিরন্তর ধৈর্যশীল, অন্যদিকে মানুষের ধৈর্য অত্যন্ত সীমিত, মানুষ সহজেই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, সত্য ও বাস্তবতার পাঠ ভুলে নিজের বাসনা মেটাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, কিন্তু মানুষ সহজে মাফ করতে চায় না, অনেক সময় পারেও না স্বভাবগত দোষের কারণে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মানুষ কাঠামোগত কারণেই জ্ঞানের দিক থেকে সীমাবদ্ধতার অধিকারী। আল্লাহ জানেন, মানুষ অল্প জানে, যা জানেও তাতে ভুলশুদ্ধের ব্যাপার স্যাপার আছে। আল্লাহ পরম ন্যায়পরায়ণ ও মানুষ অধিকাংশ সময়ই ন্যায়পরায়ণতাকে শিকেয় তুলে রাখে।
এ কারণে মানুষ হিসেবে যত ভালো কাজই আমরা করি না কেন, যত ইবাদাত- বন্দেগীই আমরা করি না কেন, যত প্রশংসাই মানুষ আমাদের করুক না কেন- দিনশেষে আমরা মানুষই। আর তাই মানুষ হিসেবে অনেক সীমাবদ্ধতা দ্বারা আমরা বেষ্টিত। এ কারণে আধ্যাত্মিক পথের যাত্রীদেরকে সর্বদা নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্মরণ করে আপন ভুলত্রুটি খুঁজতে থাকা উচিত। আত্মাকে নিত্য কলুষমুক্ত রাখতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই। আর আত্মাকে নির্মল করার আগ পর্যন্ত কেউই আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হতে পারে না, পরম সত্যের বোধপ্রাপ্ত হতে পারে না।
মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন নিজেকে সে পরিপূর্ণরূপে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে পারে না। এ কারণে মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধতাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে, সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বিনয়ী হয়ে উঠবে। বিনয়জাত আত্মশুদ্ধি আমাদেরকে আল্লাহর নিকট উচ্চকিত করে তোলে এবং আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি লাভে সহায়তা করে।
নিজের দোষত্রুটি জানার কয়েকটি উপায় আছে-
১. সমালোচনা গ্রহণ করা। সর্বদা সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা রাখুন। সমালোচনা শুনে ক্রোধান্বিত হবেন না। এতে আপনারই ক্ষতি। বিরাট ক্ষতি। ক্রোধ করে নিজের আত্মার ক্ষতি তো করলেনই, আবার সমালোচনা থেকে নিজেকে উন্নত করার সুযোগও খোয়ালেন। তাই সমালোচনা যে-ই করুক ও যেভাবেই করুক না কেন, তা গ্রহণ করুন। সমালোচনার পরে সমালোচনাকারীর প্রতি ক্ষুব্ধ না হয়ে সর্বপ্রথম নিজের ভেতরে বেঁকে দেখুন, আপনি কি সত্যিই এই সমালোচনার যোগ্য? যদি আপনার মাঝে সমালোচনার সত্যতা পাওয়া যায়-যদিও সমালোচনার ভাষা ছিলো কঠোর ও রুক্ষ্ম-তবে সেই সমালোচনা আপনার জন্যই উপকারী হতে পারে, যদি আপনি তাকে গ্রহণ করে নিজেকে শুধরে নেন তো। সমালোচনা শুনে রাগ-ক্রোধ- বিদ্বেষ নয় সর্বপ্রথম নিজের দোষান্বেষণের মানসিকতা আসলে বোঝা যাবে অন্তর ধীরে ধীরে আত্মিক শুচিতার দিকে আগাচ্ছে, ইন শা আল্লাহ।
২. বন্ধুবান্ধব। বন্ধুরা অনেকসময়ই উপদেশের মাধ্যমে নিজের দোষত্রুটি জানতে সহায়তা করে থাকে। উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু বলেছেন, "আল্লাহ তার ওপর রহম করুন যে আমার দোষ দেখিয়ে দেয়।" দেখুন! উমারের মত সাহাবী ভুল ধরিয়ে দেওয়ার কাজটিকে উপহার হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই কোনো বন্ধু যদি নিষ্ঠা ও কোমলতার সাথে আপনার ভুল ধরিয়ে দেয় তবে আন্তরিকতার সাথে তা গ্রহণ করে নিন। নিজেকে যথাসাধ্য সংশোধনের চেষ্টা করুন।
৩. পরীক্ষা। বিপদাপদ ও বালা-মুসীবতের মাধ্যমে নিজের দোষত্রুটি বের হয়ে আসে। আল্লাহ বলেছেন,
أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةٌ أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُوْنَ.
“তারা কি দেখে না যে, 'তাদেরকে প্রতি বৎসর একবার বা দু'বার বিপর্যস্ত করা হয়?' এরপরও তারা তাওবা করে না এবং উপদেশও গ্রহণ করে না।"১
আয়াতটি মুনাফিকদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছিলো, তারা একের পর এক বিপদের পরেও আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তন করত না, নিজেদের বিভ্রান্তি ও ধোঁকার মধ্যেই মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। কিন্তু আমি আপনি মুমিন। আমাদের ওপর যখন কোনো বিপদ আপতিত হয় আমাদের উচিত তাকে নিজেদের ভুলত্রুটি অন্বেষণের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে লুফে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়া।

টিকাঃ
১. (তাবারানী)
১. (সূরা নিসা, ৪:২৮)
১. (সূরা তাওবা, ৯:১২৬)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 একাদশ পদক্ষেপ : আত্ম-সমালোচনা

📄 একাদশ পদক্ষেপ : আত্ম-সমালোচনা


"সকল পাপ, উদাসীনতা ও কামনা-বাসনার মূল হচ্ছে আত্মতুষ্টি এবং সকল সৎকর্ম, সতর্কতা ও পবিত্রতার উৎস আত্ম-সমালোচনা।"
নিজেদের দোষত্রুটি খোঁজার পর আমাদের এসকল দোষত্রুটির উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালাতে হবে, জানতে হবে এগুলো কোন জায়গা থেকে আসছে, যাতে আমরা এসকল দোষত্রুটিকে দূর করতে পারি। এ কারণে ইবনু আতা বলছেন, “সকল পাপ, উদাসীনতা ও কামনা-বাসনার মূল হচ্ছে আত্মতুষ্টি এবং সকল সৎকর্ম, সতর্কতা ও পবিত্রতার উৎস আত্ম-সমালোচনা।"
আমাদের দোষত্রুটির-তা পাপাচার, উদাসীনতা কিংবা কামনাবাসনা যাই হোক না কেন-সাধারণ উৎস নিজের প্রতি সন্তুষ্টিভাব। নিজের প্রতি মিথ্যা তুষ্টিই মানুষকে ধোঁকায় ফেলে রাখে, প্রতারণায় ভুলিয়ে রাখে। সে নিজেকে বলে, "আমি তো এই, আমি সেই, আমি ভালো আমল করছি, অন্যরা তো সব ধ্বংসের মুখে, সব পথভ্রষ্ট, আমিই হেদায়াতের পথে আছি। তারা সব খারাপ, আমিই কেবল ভালো। আমার কোনো চিন্তা নেই, আমি প্রায় মুক্তিপ্রাপ্ত।"
আল্লাহ বলছেন,
وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ التَّوَّامَةِ
"আরও শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।”১
মানুষের অভ্যন্তরে বাস করা এই তিরস্কারকারী আত্মা মুমিনকে নিজের ওপর সন্তুষ্ট হতে দেয় না। কখনোই সে ধোঁকায় পড়ে না যে পাপ করলেও আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবে। বরং সে সর্বদাই নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে, নিজের সমালোচনা করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। এমনকি নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামও নিজেকে দোষারোপ করেছেন যা কুরআনে এভাবে এসেছে,
وَمَا أُبْرِئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ، إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"সে বললো, 'আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্ম প্রবণ, কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”১
নবী ইউসুফের মত এমন পূতপবিত্র ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাবান নবী পর্যন্ত নিজেকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করেননি, সেখানে আমরা কে? তাঁর মর্যাদা ও পবিত্রতার তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়?
ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ বিবেক, যা তাকে তিরস্কার করে, কিয়ামতের দিন তাকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। যার মাঝে এই বিবেক নিষ্ক্রিয় সে সমূহ বিপদের মধ্যে আছে। কুরআনে দুই বাগানের অধিকারী’র গল্প থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই। দুজন ব্যক্তির একজন ছিলো অত্যন্ত দাম্ভিক ও নিজের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। এমনকি সে বলত,
وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِن رُّدِدتُّ إِلَىٰ رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنقَلَبًا
"আমি মনে করি না যে, কিয়ামত হবে, আর আমাকে যদি আমার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়ে নেয়া হয়ই, তবে আমি নিশ্চয়ই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাবো।”২
কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা এটাই যে, মুমিনের সাধারণ মানসিকতা কখনোই আত্মতুষ্টি হবে না। নবী ﷺ এর সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামানের কাছে মদীনার মুনাফিকদের নাম ছিলো, যা অন্যান্য সাহাবীদের জানা ছিলো না। উমার ইবনুল খাত্তাব হানযালার কাছে এসে জানতে চাইতেন তাঁর নাম সেই তালিকায় আছে কিনা! উমারের মত ব্যক্তিত্ব এই প্রশ্ন কেন করতেন? কারণ তিনি আন্তরিকভাবে কখনোই নিজেকে নিরাপদ মনে করতেন না, নিজের প্রতি তৃষ্ট হতে পারতেন না, নিজেকে তিনি কোনো দৃষ্টিতেই ধার্মিকতার উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত বলে বিবেচনা করতে পারতেন না। তিনি কঠোর ও নির্দয়ভাবে নিজেকে সমালোচনা করতেন, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু বলতেন, "আমার এক পা জান্নাতে আরেক পা জান্নাতের বাহিরে থাকলেও আমি আল্লাহর থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবো না।” কেন তিনি এমনটা বলতেন? কারণ জান্নাতকে নিজের আমলের বদৌলতে অর্জিতব্য বলে মনে করতেই পারতেন না। হাজারো উত্তম আমল সত্ত্বেও তিনি নিজেকে জান্নাতের যোগ্য ও আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ বলে ভাবতে পারতেন না। এই আবু বকরের ব্যাপারে উমার ইবনুল খাত্তাব বলেছিলেন,
لَوْ وُزْنَ إِيْمَانَ أَبِي بَكْرٍ بِإِيْمَانِ أَهْلِ الْأَرْضِ لَرَبِّحَ بِهِمْ.
"পৃথিবীবাসীর আমলের সাথে যদি একা আবু বকরের ঈমানের ওজন করা হয় তবে আবু বকরের ঈমানই অধিক ভারী হবে!"১
ব্যক্তি যদি নিজেকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী মনে করে তবে এই ভাবনাই তাকে এক সময় অহংকারের দিকে ঠেলে দেয়, তখন তার নেক আমলই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি সে নিজেকে সর্বনিম্ন স্তরের মুমিন বলে মনে করে, তবে সর্বদা নিজেকে উন্নত করার, নিজের আমল ও আখলাককে বিকশিত করার এবং আল্লাহকে বেশি বেশি সন্তুষ্ট করার চিন্তায় বিভোর থাকবে। নিজের ব্যাপারে সে কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারবে না। এমনটাই নবী, সাহাবী ও পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ।
তবে আত্ম-সমালোচনা যেন আত্ম-ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয় সেদিকেও নজর রাখা জরুরী। ব্যক্তি নিজেকে এতটাই সমালোচনা করবে না যে সে নিজের প্রতি সকল প্রকার আত্মবিশ্বাস ও ভরসা হারিয়ে ফেলে নিদারুণ হতাশায় পতিত হবে-এমনটা মোটেও কাম্য নয়। সে সর্বদা নিজেকে বলতে থাকবে সে ভালো না, সে কখনোই কোনো ভালো কাজ করেনি, তার দ্বারা ভালো কাজ হওয়া সম্ভব না, তার জন্য আযাব অপেক্ষা করছে এবং এসব ভেবে ভেবে সে নৈরাশ্যের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে-আত্মতৃপ্তি না ভোগার অর্থ মোটেও এটা নয়। এটা আত্মতৃপ্তির বিপরীত পক্ষে আরেক প্রান্তিকতা। আমরা আগেই বলে এসেছি ইসলাম ভারসাম্যের দীন, পরিমিতির ধর্ম। সবকিছুতে পরিমিতিবোধ অত্যন্ত জরুরী, এর মাঝেই আছে মুক্তি। এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিজের ঈমান ও আমলের প্রতি বিস্ময়াবিষ্ট না হওয়া, নিজেকে পবিত্র না ভাবা, আত্মতুষ্টিতে না ভোগা, নিজের সমালোচনা অত্যন্ত জরুরী, তবে তা যেন নিজের প্রতি হতাশা ও নৈরাশ্যে পরিণত না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখা একান্ত দরকারী। আত্ম-সমালোচনা না করে নিজের ব্যাপারে ধোঁকায় পড়ে যাওয়া এবং সমালোচনা করতে করতে নিজেকে ফুরিয়ে ফেলা উভয় রকমের প্রান্তিকতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন এবং ভারসাম্যের সাথে নিজের অবস্থান বিবেচনা করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়াই মুমিনের কর্তব্য।

টিকাঃ
১. (সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:২)
১. (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)
২. (সূরা কাহাফ, ১৮:৩৬)
১. (শুআবুল ঈমান)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 দ্বাদশ পদক্ষেপ : সৎ বন্ধু

📄 দ্বাদশ পদক্ষেপ : সৎ বন্ধু


"এমন কাউকে বন্ধু বানিও না যে নিজের অবস্থার মাধ্যমে তোমাকে উন্নত করে না কিংবা কথাবার্তার মাধ্যমে তোমাকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করতে পারে না। তুমি পাপ করছ, তারপরেও তুমি ভাবছ তুমি ভালো কাজ করছ, কেননা তুমি যাদেরকে সঙ্গী বানিয়েছ তারা তোমার চাইতেও নিকৃষ্ট।"
আমরা জেনেছি নিজের দোষ কীভাবে খুঁজতে হয়, নিজেদের দোষত্রুটির উৎস কি। অবগত হয়েছি যে, আত্মতুষ্টিই আমাদের সকল পাপাচারের সাধারণ উৎস। এক্ষেত্রে ইবনু আতা আমাদেরকে আরেকটি দোষের দিকে নির্দেশ করছেন, তা হলো-অসং বন্ধু নির্বাচন। তাঁর ভাষায়, “এমন কাউকে বন্ধু বানিও না যে নিজের অবস্থার মাধ্যমে তোমাকে উন্নত করে না কিংবা কথাবার্তার মাধ্যমে তোমাকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করতে পারে না। তুমি পাপ করছ, তারপরেও তুমি ভাবছ তুমি ভালো কাজ করছ, কেননা তুমি যাদেরকে সঙ্গী বানিয়েছ তারা তোমার চাইতেও নিকৃষ্ট।"
মানুষ সাধারণত নিজেকে আপন সঙ্গীদের সাথে তুলনা করে। মানুষের সঙ্গী যদি তার চাইতেও নিকৃষ্ট কেউ হয় তবে সে নিজের সামান্য দোষত্রুটি তো দূর বড় বড় পাপাচারও ছোট মনে করতে থাকবে, কেননা সে তার চারপাশে দেখবে এর চেয়েও বড় খারাপ অবস্থা বিদ্যমান। তখন এটা স্বাভাবিক যে সে নিজেকে উন্নত করার কোনো প্রকার তাড়না অনুভব করবে না। কিন্তু যদি তার সঙ্গী এমন কেউ হয় যারা তার চাইতে উন্নত, তারা তাকে ভালো কাজ ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে সঠিক পথের দিকে নির্দেশ করে তখন সে নিজেকে সঙ্গীদের সাথে তুলনা করলে নিজেকে অন্যদের চাইতে তুলনামূলক নিচু স্তরের বলে আবিষ্কার করবে। তখন সে নিজের প্রতি মনোযোগী হবে, নিজেকে উন্নত করার জন্য ভেতর থেকে প্রেরণা পাবে। নবী সঙ্গীদের ব্যাপারে বলেছেন,
"উত্তম সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের মত। সুগন্ধি বিক্রেতা হয় তোমাকে কোনো সুগন্ধি উপহার দেবে অথবা তুমি তার থেকে সুগন্ধি পাবে। আর কামার হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে।”১
উত্তম আচরণের কাউকে বন্ধু বানালে আপনি তার থেকে সুগন্ধি পাবেন। কেননা, মুমিন স্বাভাবিকভাবেই পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করে, সুগন্ধি পরিচ্ছন্নতার একটি অংশ, এ কারণে মুমিন সুগন্ধিযুক্তই থাকে। অন্যদিকে ঈমান, আমল, সত্যাশ্রিত চিন্তা, যথার্থ বচনের কারণে (আত্মিকভাবেও সে) সুগন্ধিযুক্ত থাকে। আর তাই উত্তম মুমিনকে বন্ধু বানালে আপনি তার সঙ্গের কারণে সুবাসবেষ্টিত থাকবেন এবং উপদেশ, স্মরণিকা, কুরআন, উত্তম নির্দেশনা এমনকি মুচকি হাসির মাধ্যমে আপনি নৈতিক সুগন্ধিও পাবেন। আপনি তাকে দেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, সাদাকা করতে, উত্তম কথা বলতে, সালাত পড়তে, উত্তমভাবে কথা বলতে, উন্নত চিন্তা করতে অনুপ্রেরিত হবেন।
অন্যদিকে কামারের মত মন্দ কোনো মানুষকে নিজের সঙ্গী বানিয়ে নিলে আপনি তার থেকে হয়ত অপরিচ্ছন্নতা ও ধুমপানের দুর্গন্ধ পাবেন। তেমনি মন্দ কথা বলা, গালি দেওয়া, চোখের খিয়ানত করা, সালাত না পড়া, গীবত, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে মন্দ ধারণার মত নানা নৈতিক দুর্গন্ধ ও পাপাচার আপনি তার থেকে লাভ করবেন।
ইবনু আতার কথায় একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে যা আদতে ক্ষুদ্র মনে হলেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনু আতা বলেছেন, "এমন কাউকে বন্ধু বানিও না, যে নিজের অবস্থার মাধ্যমে..." অবস্থা কেন বলা হলো? অবস্থা বলতে কি বোঝানো হয়েছে? অবস্থা, যাকে আরবীতে 'হাল বা হালাত' বলা হয়, হচ্ছে ব্যক্তির আধ্যাত্মিক, অভ্যন্তরীণ, আত্মিক, নৈতিক অবস্থা। নবী ﷺ বলেছেন, "এক দিরহাম হাজার দিরহামের চাইতে ভারী হয়ে গিয়েছে।” সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এরকমটা কীভাবে হলো?” তিনি উত্তরে বললেন,
"একজন ধনী ব্যক্তি নিজের অঢেল সম্পদ থেকে এক হাজার দিরহাম নিয়ে দান করে দিলো, অন্যদিকে এক ব্যক্তির কাছে আছেই দুই দিরহাম, সে সেখান থেকে এক দিরহাম নিয়ে দান করে দিলো (এভাবে এক দিরহাম হাজার দিরহামের চাইতে আল্লাহর দৃষ্টিতে অধিক মূল্যবান হয়ে গেলো)।"
একটি মাত্র দিরহাম এক হাজার দিরহামের চাইতে ভারী এ কারণেই হয়েছে যে, একজন ব্যক্তি তার গোটা সম্পত্তি থেকে অর্ধেক দিয়ে দিয়েছে, আরেকজন তার অঢেল সম্পত্তি থেকে এক হাজার দিরহাম দান করেছে, এখানে প্রথমোক্ত ব্যক্তির অন্তরের অবস্থা বা হালাতের কারণেই তার দানকৃত এক দিরহাম এক হাজার দিরহামের চাইতে অধিক মূল্যবান হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এখানে মূল পার্থক্য দানকারীর আন্তরিক অবস্থা। এই আত্মিক অবস্থাই দৃশ্যত একই আমলের মাঝে আকাশ ও যমীনের মত পার্থক্য সূচিত করতে পারে।
এরূপ আত্মিক প্রশান্তি, সত্যের প্রতি অনুরক্তি ও অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তার ভিত্তিতেই এক মানুষের প্রতি আরেক মানুষের প্রভাব পড়ে। যার আত্মিক শক্তি, যা ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমেই হাসিল হয়ে থাকে, উচ্চমানের হয় তার পারিপার্শ্বিক লোকেরা তার দ্বারা অধিক প্রভাবিত হয়। এ কারণেই দেখা যায় কোনো কোনো পবিত্র আত্মার একটি কথাতেই মানুষ পরিবর্তন হয়ে যায়। একটিমাত্র বাক্যই হাজারো অন্তরে ঝড় তুলে দিতে পারে, বিপ্লবের প্রারম্ভ করতে পারে, বহু বছরের মিথ্যার জঞ্জাল দূর করে দিতে পারে। এমনকি কোনো কোনো সময় কথা না বলেও তিনি অন্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেন, কেবলমাত্র নিজের অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধির মাধ্যমে।

টিকাঃ
১. (বুখারী ও মুসলিম)
১. (ইবনু হিব্বান ও নাসাঈ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00