📄 সপ্তম পদক্ষেপ : সময় ব্যবস্থাপনা
“অবসর পাওয়ার আগ পর্যন্ত উত্তম আমল স্থগিত রাখা লঘুচিত্ততার লক্ষণ।”
আমরা অনেক সময়ই আগামীকাল, আগামী সপ্তাহ, আগামী মাস কিংবা আগামী রমাদান, বিয়ে করার পর, প্রোমোশন পাবার পর, বাচ্চারা বড় হয়ে যাবার পরের সময়গুলোর জন্য ভালো কাজগুলোকে তুলে রাখি। এটাই ইবনু আতার ভাষায় 'লঘুচিত্ততা ও অপরিপক্বতা'র লক্ষণ। আসলে ভালো আমল করা মোটেও সময় পাবার কোনো বিষয় না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের জন্যই কম বা বেশি কিছু না কিছু সময় তো বরাদ্দ থাকেই। আসল বিষয় হচ্ছে প্রাধান্যতা, অগ্রাধিকার; আমি কোন কাজকে প্রাধান্য দিচ্ছি, কোন কাজটা আগে করছি। মানুষ তার নির্ধারিত সময়ে সেই কাজই আগে করে যাকে সে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। দেখার বিষয় প্রত্যেকে যার যার নির্ধারিত সময়ে কি করেছে, কোন কাজকে প্রাধান্য দিয়েছে। কেননা-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকেই সাধ্যাতীত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেন না।”১
মনে করুন ফরয সালাতের সময় শেষ হবার আগে আপনার হাতে পাঁচ মিনিট সময় বাকী আছে। আপনি এই পাঁচটি মিনিট সময় যেকোনোভাবেই কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু মুসলিম হিসেবে আপনার কাছে সালাত সর্বাগ্রাধিকার পাবার যোগ্য। এ কারণে আপনার ওপর আবশ্যিক হলো আপনি এই পাঁচ মিনিটে ফরয সালাত পড়ে নেবেন। হ্যাঁ, যদি কোনো কঠিন পরিস্থিতি সামনে এসে পড়ে সেক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। যেমন-আপনি দেখছেন কেউ পানিতে ডুবে যাচ্ছে কিংবা কোনো অন্ধ ব্যক্তি গাড়ির সামনে পড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে-সেক্ষেত্রে আপনি সালাত না পড়ে তাদেরকে সাহায্য করতে যেতে পারেন, যেহেতু জীবন-মরণের সমস্যা। কিন্তু সাধারণাবস্থায় মুমিনের কাছে সালাতের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। এভাবে মুমিনের কাছে প্রতিটি কাজই গুরুত্বানুযায়ী অগ্রাধিকার পাবে।
ভালো কাজে বিলম্ব করা আখিরাতে আফসোসের কারণ হবে।
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ. لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا .
“অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, 'প্রভু! আমাকে দুনিয়ায় ফেরত পাঠিয়ে দিন' যাতে আমি যা রেখে এসেছি সেখানে (দুনিয়ার জীবনে) ভালো কাজ করতে পারি। কিছুতেই তা হবার নয়...."১
এ কারণে বিলম্বকরণ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক মুমিনেরই উচিত জীবনের সময়গুলোকে সর্বোত্তমভাবে বিনিয়োগ করা। যে যতটা কার্যকারীতার সাথে সময় ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন করতে পারবে সে সাফল্যের প্রতিযোগীতায় এগিয়ে থাকবে ইন শা আল্লাহ, দুনিয়া ও আখিরাতে, উভয় জগতেই।। সময় ব্যবস্থাপনা জাগতিক কাজর্কমের জন্য যতটা না গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক, তার চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক দীনের কাজ ও ভালো আমল করার ক্ষেত্রে। হাঁটা, বাস-ট্রেন-গাড়িতে চড়ার সময়গুলোকে উত্তমভাবে কাজে লাগান। কুরআতের তিলাওয়াত শুনুন, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করুন, মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করুন। এমন অনেক ভাই ও বোন আছেন যার বাস ও ট্রেনের সময়কে কাজে লাগিয়ে গোটা কুরআন মুখস্ত করেছেন। হিসাব করে দেখা যায় প্রত্যেক দিন দেড় ঘণ্টা সময় দিলেই দু'বছরে সম্পূর্ণ কুরআন হিফয করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে দেখা যায় বাস-ট্রেনগুলোতে হৈ-হুল্লোড় কম থাকে। কেননা, প্রত্যেকেই নিজের মত করে অধ্যয়ন, লেখালেখি কিংবা চিন্তা করতে ব্যস্ত থাকে, এমনকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও। মুমিনদের জন্য সময় অন্য যে কারো চাইতে অনেক অনেক গুণ বেশী দামী। কারণ, মুমিন এই সময়ই মহাকালের অফুরন্ত জমিতে রোপন করে, এর ফলাফলই সে পরকালে পাবে। সুতরাং যে কিছুই রোপণ করতে পারেনি, সে পরকালে উপকৃত হবার মত কোনো ফসলই পাবে না। সেদিন তার আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। এ কারণে মুমিনের উচিত গুরুত্বানুযায়ী বিভিন্ন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিজের সময়কে সাজিয়ে নেওয়া।
টিকাঃ
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৮৬)
১. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৯৯-১০০)
📄 অষ্টম পদক্ষেপ : পরীক্ষার সময় সবর
“দুনিয়ায় অবস্থান করে দুঃখকষ্ট দেখে আশ্চর্য হয়ো না। কেননা বিপদাপদ তো দুনিয়ার প্রকৃত স্বভাবই উন্মোচন করে।"
বান্দা যখন তাওবা করে, আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তার নিয়্যাতকে খাঁটি করে নেয়, চিন্তাভাবনা করে, সময়কে মূল্যবান মনে করে সঠিক পথে বিনিয়োগ করে তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে সত্য ও ঈমানের আলোতে উদ্ভাসিত হতে থাকে এবং সে আস্তে আস্তে আল্লাহর পথে যাত্রায় অগ্রসর হতে থাকে। নবী ২৪ বলেছেন, আল্লাহ বলেন,
"আমার বান্দা নফল আমল করতে থাকে ও আমার নৈকট্যবর্তী হতে থাকে, এভাবেই আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। এমতাবস্থায় আমি তার কান হয়ে যাই যেই কান দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যেই চোখ দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যে হাত দিয়ে সে ধরে এবং পা হয়ে যাই যেই পা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা দেই, সে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে আশ্রয় দেই।" (বুখারী)
সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে এলে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে এক হাত এগিয়ে এলে এক বাহু পরিমাণ এগিয়ে যাই। সে হেঁটে আসলে আমি দৌড়ে যাই। (বুখারী ও মুসলিম)
তবে এটা আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত যে তিনি যখন কাউকে ভালোবাসেন তাকে দুনিয়ার বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন।
أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
"মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হবে?"১
ঈমানকে অবশ্যই যাচাই করে নেওয়া হয়, এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجْهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّبِرِينَ وَنَبْلُوا أَخْبَارَكُمْ.
"আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যাতে তোমাদের অবস্থা যাচাই করে নিতে পারি এবং দেখে নিতে পারি যে, তোমাদের মধ্যে কারা মুজাহিদ ও ধৈর্যশীল।”১
বিপদ যেমনই হোক না কেন অবশ্যই আমাদের প্রতিক্রিয়া সর্বদা ধৈর্য ও ধার্মিকতাপূর্ণ হওয়া চাই।
وَلَنَبْلُوَنَكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ.
"এবং নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো-ভয়, ক্ষুধা, ধন, প্রাণ ও শস্যের ঘাটতির কোনো একটি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করো।"২
لَتُبْلَونَ فِي أَمُولِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ.
"তোমরা অবশ্যই পরীক্ষিত হবে, নিজেদের ধন-সম্পদ, জীবনের ব্যাপারে। পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিলো এবং যারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে তাদের পক্ষ থেকে তোমরা নানা কষ্টদায়ক কথাবার্তা শুনে থাকো। তোমরা যদি ধৈর্য ধরো এবং আল্লাহকে ভয় করো তবে তা দৃঢ় প্রত্যয়ের কাজ।"৩
দুঃখ কেন পতিত হয়?
ক. বান্দা যেন দুঃখ-কষ্টে বিচলিত না হয়ে অন্তরে পরকালমুখীতাকে লালন করতে পারে সেই সুযোগ দান করতে।
খ. জীবনের উত্থান-পতনের দোলায় দুলতে দুলতে সে যেন সঠিক পথ অন্বেষণের সুযোগ পায়।
গ. বারংবার দুঃখ-কষ্টের হাওয়ায় এদিক ওদিক হয়ে সে যেন এই সত্যের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে শেখে যে, নিজ জ্ঞান কিংবা ক্ষমতা দিয়ে সে ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং এভাবেই সে যেন আল্লাহ-নির্ভরতা বা তাওয়াক্কুল শিখতে পারে।
ঘ. সে যেন দুঃখ-কষ্টের টানাপোড়েনের মধ্যে থেকে বুঝে ফেলে যে, প্রকৃত শান্তি মানে সাময়িক আনন্দ বা নিরানন্দ থেকে সাময়িক রেহাই নয় বরং আশা-আকাঙ্খার আধিক্য এবং আত্মিক কলুষতা-অপবিত্রতা থেকে মুক্তির মধ্যে।
আল্লাহর কাছে দুনিয়া খুবই তুচ্ছ ও নগন্য। তিনি যখন কাউকে দুনিয়ার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন বা বিপদে আপতিত করেন তিনি এর মাধ্যমে বান্দাকে তাওবার দিকে পরিচালিত করেন। এটা তাঁর দয়া ও করুণা এবং বান্দার জন্য এক অমূল্য উপহার। নবী বলেছেন,
"নবীরা সবচাইতে বেশি পরীক্ষার শিকার হন, এরপর তাদের সর্বোত্তম অনুসারীগণ, এরপর তাদের অনুসারীগণ। দীনের স্তর অনুযায়ী ব্যক্তির পরীক্ষা নেওয়া হয়।"১
এ কারণেই ইবনু আতা বলেছেন, "দুনিয়ায় অবস্থান করে দুঃখকষ্ট দেখে আশ্চর্য হয়ো না। কেননা বিপদাপদ তো দুনিয়ার প্রকৃত স্বভাবই উন্মোচন করে।" এই জগতের নামই হলো আদ-দুনিয়া, যার আভিধানিক অর্থ নিম্নতর জীবন। তাই কঠিন পরিস্থিতি, অনাকাঙ্খিত ঘটনাবলী ও দুঃখ-দুর্দশা এখানে মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়; বরং এটাই এই জগতের সাধারণ স্বভাব ও এই নিম্নতর জীবনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
দুনিয়ার এই স্বাভাবিকতাকে মেনে নিলে বান্দার মধ্যে আল্লাহর পথে যাত্রার জন্য বড় এক সৎগুণ হাসিল হয়, বিপদে সবর করা। ধৈর্য বান্দার উপলব্ধিকে শাণিত করে, অনুভূতিকে পরিশীলিত করে, বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, সত্যিকারার্থেই আল্লাহর নৈকট্য অনুভবের সুযোগ করে দেয়।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ "আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”১
আর আল্লাহর নিকটে থাকলে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই থাকে না। সবর বা ধৈর্য তিন প্রকারের, এক. ভালো আমলের ক্ষেত্রে ধৈর্য, দুই, মন্দকর্ম এড়াতে ধৈর্য ও তিন. বালা-মুসীবতে ধৈর্য। ভালো আমলের ক্ষেত্রে ধৈর্য মানে হলো মুমিন নিজেকে কষ্টে না ফেলে নিরন্তন উত্তম কর্ম করতেই থাকবে। আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ "আল্লাহ দীনের মাঝে কোনো কাঠিন্য রাখেননি। ২
নবী এক বৃদ্ধকে তার দু'ছেলের সহায়তায় পদব্রজে কাবার দিকে যেতে দেখে তিনি বললেন,
"এই ব্যক্তির নিজেকে কষ্টে ফেলার কোনো প্রয়োজনই আল্লাহর প্রয়োজন নেই।” এরপর তিনি সেই বৃদ্ধকে কাবার দিকে যাওয়ার জন্য বাহনে চড়তে নির্দেশ দেন।
তবে শরীয়ত পরীক্ষা। আল্লাহ জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টিই করেছেন কে ভালো আমল করে তা যাচাই করার জন্য। এ কারণে কখনো কখনো কষ্টের মাধ্যমেও আল্লাহর ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতা প্রমাণিত হয়। এ কারণে কুরআন ও হাদীছ থেকে এটা নিঃসন্দিগ্ধভাবে প্রমাণিত হয়, যে আমলের সাথে যেমন ও যত পরিমাণ কষ্ট জড়িত থাকে তা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় এবং বান্দা এর মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকে। এটা উন্মুক্ত ময়দান, এখানে যে যতটা আগাতে পারবে সে আল্লাহর দিকে যাত্রায় ততই অগ্রসর থাকবে। তবে সেই কষ্ট অবশ্যই এমন হবে না যা বান্দার সাধারণ ক্ষমতাসীমা অতিক্রম করে অবিমিশ্র কাঠিন্যের পর্যায়ে উপনীত হয়।
মন্দকর্ম এড়াতে ধৈর্য মানে হলো মুমিন এমন সকল কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে যা আল্লাহ হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন। এ ধরণের ধৈর্যের ক্ষেত্রেও আল্লাহর পক্ষ থেকে অগণিত পুরষ্কার রয়েছে। যেমন যে ব্যক্তি নিজের অবৈধ কামনা-বাসনা প্রতিরোধ করে তাঁর ব্যাপারে নবী সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া পাবে সাত ব্যক্তি, তাদের মধ্যে একজন হলো, “যাকে উচ্চ বংশের সুন্দরী কোনো নারী অবৈধ যৌনকর্মের দিকে আহ্বান করে, কিন্তু সে এই বলে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।”১
পরীক্ষার ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রাথমিক স্তর মন্দকর্মে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা, উচ্চ স্তর হলো মুখে অভিযোগ না করা এবং সর্বোচ্চ স্তর সৎ হলো অন্তরে অন্তরেও অভিযোগ না করা।
নিজেকে পাপ থেকে বিরত রাখা অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার অন্যতম শর্ত। আল্লাহ মুনাফিকদের ব্যাপারে বলতে যেয়ে বলেছেন,
وَلَقَدْ أَخَذْنَهُم بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
“আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হয়নি এবং কাতর প্রার্থনাও করেনি।”২
বিপদের সময় মানুষ দ্বিমুখী রাস্তার সামনে এসে উপনীত হয়, হয় সে তাওবা করে প্রত্যাবর্তন করবে অথবা পাপে জড়িয়ে পড়বে। পাপে জড়িয়ে পড়া মানেই আল্লাহ প্রদত্ত এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে যাওয়া।
উচ্চ স্তরের ধৈর্য হচ্ছে মুখে কোনো প্রকার অভিযোগ না করা, যাকে কুরআনে 'সুন্দর ধৈর্য' বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন নবী ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,
فَصَبْرٌ جَمِيلٌ “সুতরাং সৌকর্যময় ধৈর্যই শ্রেয়।”১
إِنَّمَا أَشْكُوا بَنِى وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ “আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকটই নিবেদন করছি।”২
আন্তরিকভাবে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রাজী-খুশি থাকা ধৈর্যের সর্বোত্তম স্তর। মুমিন তখনই এই স্তর লাভ করতে পারে যখন সে না মুখে কোনো অভিযোগ বা অখুশি প্রকাশ করে, আর না অন্তরে অন্তরে কোনো প্রকার আফসোস করে বা মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। এ অবস্থায় উপনীত হলে অন্তর পরিপূর্ণ প্রশান্ত, স্থির, নিশ্চল থাকে; এমনকি প্রবলতম বিপদের মুখেও! কেননা এই অন্তর দুনিয়ার বাস্তবতা বুঝে গেছে, সে সত্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখে, বিপদের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারে। নবী বলেছেন,
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى “বিপদের প্রথম ধাক্কার সবর-ই প্রকৃত সবর।”
টিকাঃ
১. (সূরা আনকাবুত, ২৯:২)
১. সূরা মুহাম্মাদ: ৩১
২. সূরা বাকারাহ: ১৫৫
৩. সূরা আলে-ইমরান: ১৮৬
১. (ইবনু হিব্বান)
১. (সূরা বাকারাহ, ২:১৫৩)
২. (সূরা হজ্জ, ২২:৭৮)
৩. (নাসাঈ)
১. (বুখারী ও মুসলিম)
২. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৭৬)
১. (সূরা ইউসুফ, ১২:১৮)
২. (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬)
• (বুখারী ও মুসলিম)
📄 নবম পদক্ষেপ : প্রারম্ভকে দীপ্তিময় করা
"সাফল্যের নিদর্শন হলো প্রারম্ভেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। যার শুরুটা আলোকিত, তার শেষটাও আলোকিত।"
বান্দা পূর্ববর্তী পদক্ষেপসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসার যোগ্য পরিণত হয়েছে। নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে হতে সে চিত্তের প্রশান্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন সে সর্বদাই নতুন নতুন আমলের কথা চিন্তা করে যা তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে পারে। এর মাধ্যমে আরেকটি নিয়মের কথা জানা যায়, তা হলো- ভিত্তি মজবুত করে নব নব উদ্যোগ চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রায় নিশ্চিত করে দেয়। যদি সে প্রারম্ভ থেকেই সচেতন থাকতে পারে, প্রারম্ভ থেকেই আলোর পথে হাঁটতে পারে তবে তার আখেরটাও উত্তমই হবে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রারম্ভকে আলোকিত করার উপায় কী? ইবনু আতা এর উত্তরে বলেছেন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। কিন্তু শুরুর দিকেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কীভাবে সম্ভব?
ইসলাম আমাদেরকে যেকোনো কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে শিক্ষা দেয়। নবী ﷺ বলেছেন,
"যে কাজ আল্লাহর নামে শুরু করা হয় না তা (আল্লাহ প্রদত্ত বারাকাহ) বঞ্চিত।”১
মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজই আল্লাহর নামে, আল্লাহকে স্মরণ করে শুরু করা। কথা বলতে হলে আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ পড়ে শুরু করুন। সালাতের প্রারম্ভে নিজের নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করে নিন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর সাথে পরামর্শ করে নিন ইস্তিখারা সালাত পড়ার মাধ্যমে। নবী ﷺ সাহাবীদেরকে কুরআন শেখানোর মত গুরুত্ব দিয়ে ইস্তিখারার সালাত শেখাতেন। এই সালাতে এই দুআ পড়তে হয়,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ العَظِيمِ؛ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ - وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ - خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ - فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسَّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيْهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرُّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ - فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أَرْضِنِي بِه.
“হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের সাহায্যে আপনার নিকট কল্যাণ কামনা করছি। আপনার শক্তির সাহায্যে আপনার নিকট শক্তি কামনা করছি এবং আপনার মহান অনুগ্রহের প্রার্থনা করছি। কেননা আপনিই শক্তিধর, আমি শক্তিহীন। আপনি জ্ঞানবান, আমি জ্ঞানহীন এবং আপনি গায়েবী বিষয় সম্পর্কে মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! এই কাজটি (এখানে উদ্দিষ্ট কাজ বা বিষয়টি মনে মনে উল্লেখ করবে) আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমার দীন, আমার জীবিকা এবং আমার কাজের পরিণতির দিক দিয়ে, (অথবা বলেছেন) ইহকাল ও পরকালের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন এবং তাকে আমার জন্য সহজলভ্য করে দিন, তারপর তাতে আমার জন্য বরকত দান করুন। আর এই কাজটি আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমার দীন, আমার জীবিকা এবং আমার কাজের পরিণতির দিক দিয়ে, (অথবা বলেছেন) ইহকাল ও পরকালের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে আপনি আমাকে তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন এবং যেখানেই কল্যাণ থাকুক আমার জন্য সেই কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন। অতঃপর তাতেই আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।”১
এসকল কিছুই আল্লাহকে স্মরণ করার উপায়। আল্লাহকে স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে আমরা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, একমাত্র তাঁর ওপরই ভরসা করেছি এবং আমরা সর্বক্ষেত্রে তাঁর সাহায্যই কামনা করি। ইবনু আতার ভাষায় প্রারম্ভে আল্লাহকে স্মরণ করা চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে দেয় এবং এটাই সাফল্যের নিদর্শন। হতে পারে আমরা জাগতিক দৃষ্টিতে জিতেছি, হতে পারে আমরা হেরেছি, কিন্তু যতক্ষণ আমরা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করছি এবং এ ব্যাপারে সচেতন থাকছি ততক্ষণ আমরা আল্লাহর দৃষ্টিতে বিজয়ী, জাগতিক ফলাফল যা-ই হোক না কেন। আসল বিষয় হচ্ছে শুরুতে আল্লাহকে স্মরণ করা, আশা করা যায় এটাই অনুকূল ফলাফল এনে দেবে।
যেমন আপনি ব্যবসা করছেন। সাধারণভাবেই আপনার লক্ষ্য থাকবে মুনাফা কামানো। এখানে লাভ ও ক্ষতির সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে। তবে মনে করুন আপনি ইস্তিখারা করলেন এবং আপনার লোকসান হলো। আপনি হয়ত আপনার নির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। তবে হতে পারে এই লোকসানই আপনাকে আপনার ব্যবসা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা তৈরী করতে আরও বেশি আগ্রহী ও তাড়িত করে তুললো। এর মাধ্যমেই হয়ত আপনি আপনার পূর্বতন পরিকল্পনাকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে করে নিজের সূক্ষ্ম ত্রুটি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং এর মাধ্যমেই আপনি সেগুলো দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারবেন, যা সামগ্রিকভাবে আপনার জন্য অধিক উপকারী হবে। আপনি হয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন, কিন্তু এই সময়েই আপনি পেয়ে গেলেন কোনো খাঁটি বন্ধু, যে বিপদাপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, দুঃখের ভাগীদার হয়। এভাবে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি পরাজিত হলেও সামগ্রিকভাবে বিজয়ীই হলেন।
কেননা, মানুষের কাছে সাফল্য ও ব্যর্থতার মানদণ্ড সাধারণত 'পরিসংখ্যানগত সংখ্যা'র ওপর নির্ভরশীল। মানুষ স্থূলদৃষ্টিতে সাফল্য ও ব্যর্থতাকে বিচার করে। কিন্তু আল্লাহর কাছে এই মানদণ্ডের সেরূপ মূল্য নেই। প্রকৃতপক্ষে যা মূল্যবান তা হচ্ছে আখিরাত ও পরকালীন সুখশান্তি। এ কারণে যে প্রথম থেকেই আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন হবে আশা করা যায় সে আখেরেও কাঙ্খিত ফলাফলই লাভ করবে।
এই নীতিটি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেমন-নবী সেই সাত শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন যারা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া পাবে। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে 'যেই যুবক আল্লাহর ইবাদাতের মধ্য দিয়ে বড় হয়'। (বুখারী) এই যুবক জীবনের শুরু থেকেই আল্লাহর ইবাদাত করে এসেছে, তাই তার চূড়ান্ত ফলাফলও সুখময় হয়েছে। সে আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবার মত বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছে।
টিকাঃ
১. (বায়হাকী)
১. (বুখারী)
📄 দশম পদক্ষেপ : নিজের ত্রুটি আবিষ্কার
“নিজের মাঝে আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা খোঁজার চাইতে অনেকগুণে উত্তম নিজের দোষত্রুটি খুঁজে বের করা।"
কেউ হয়ত আল্লাহর দিকে যাত্রায় ঠিকঠাকভাবেই সফর করে যাচ্ছে, কিন্তু একটা সময় সে ধোঁকায় পড়ে ভাবতে শুরু করলো এসব করে বুঝি সে আল্লাহকেই ধন্য করছে, দীনের বড়সড় খেদমত করছে, এভাবেই সে নিজের হাজারো ত্রুটিবিচ্যুতি বেমালুম ভুলে যায়। প্রারম্ভকে সুচারু করার কথা বলেই ইবনু আতা বলছেন, “নিজের মাঝে আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা খোঁজার চাইতে অনেকগুণে উত্তম নিজের দোষত্রুটি খুঁজে বের করা।”
ঈমান ও আমলের পথে সক্রিয় মুমিন কিছু ইবাদাত-বন্দেগী করেই ভাবতে পারে সে বুঝি বিরাট কিছু হয়ে গেছে, তার জ্ঞানচক্ষু বুঝি খুলে গেছে, অন্তরাত্মা বুঝি জাগ্রত হয়ে গেছে, এবার সে সৃষ্টির নানা গুপ্ত রহস্য বোঝার মত যোগ্যে পরিণত হয়েছে, এবার বুঝি সময় এসে গেছে আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি প্রাপ্তির যার কথা নবী * এই ভাষায় বলেছেন,
“মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, কেননা সে আল্লাহর নূরের মাধ্যমে দেখে।”১
এ কারণে ইবনু আতা নিজের দোষত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কেউ যদি নিজেকে দোষমুক্ত মনে করে তবে সেটাই তার আত্মার অনেক বড় এক দোষ। ভুলভ্রান্তি, দোষত্রুটি মানুষের স্বভাবের মৌলিক অংশ। মানুষ ভুল করবে, ভুলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। আরবীতে মানুষকে ইনসান বলা হয়, ইনসান শব্দের অর্থই এমন কেউ যে কিনা ভুলে যায়, বিস্মৃত হয়। ভুলত্রুটির উর্ধ্বে হওয়া একমাত্র আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। তিনিই ভুলভ্রান্তি, দোষাবহতার সকল কলুষতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
মানুষ সম্পদের ভয় করে, কিন্তু আল্লাহ এই ভয় করেন না, তিনি অতিশয় দয়ালু ও উদার।
قُل لَّوْ أَنتُمْ تَمْلِكُونَ خَزَائِنَ رَحْمَةِ رَبِّي إِذًا لَّأَمْسَلْتُمْ خَشْيَةً الْإِنفَاقِ وَكَانَ الْإِنْسُنُ قَتُوْرًا
“বলো, 'যদি তোমরা আমার প্রতিপালকের দয়ার ভাণ্ডারের অধিকারী হতে, তবুও 'ব্যয় হয়ে যাবে' এ আশংকায় তোমরা তা ধরে রাখতে; মানুষ তো অতিশয় কৃপণ।” (সূরা ইসরা, ১৭:১০০)
মানুষ অত্যন্ত দুর্বল, কিন্তু আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
يُرِيدُ اللهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ وَخُلِقَ الْإِنْسُنُ ضَعِيفًا
“আল্লাহ তোমাদের ভার হালকা করতে চান; মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে।”১
আল্লাহ করুণার আধার, মানুষ অল্পতেই করুণার বোধ হারিয়ে ফেলে নিষ্ঠুর ও নির্দয় হয়ে উঠতে পারে। আল্লাহ নিরন্তর ধৈর্যশীল, অন্যদিকে মানুষের ধৈর্য অত্যন্ত সীমিত, মানুষ সহজেই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, সত্য ও বাস্তবতার পাঠ ভুলে নিজের বাসনা মেটাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, কিন্তু মানুষ সহজে মাফ করতে চায় না, অনেক সময় পারেও না স্বভাবগত দোষের কারণে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মানুষ কাঠামোগত কারণেই জ্ঞানের দিক থেকে সীমাবদ্ধতার অধিকারী। আল্লাহ জানেন, মানুষ অল্প জানে, যা জানেও তাতে ভুলশুদ্ধের ব্যাপার স্যাপার আছে। আল্লাহ পরম ন্যায়পরায়ণ ও মানুষ অধিকাংশ সময়ই ন্যায়পরায়ণতাকে শিকেয় তুলে রাখে।
এ কারণে মানুষ হিসেবে যত ভালো কাজই আমরা করি না কেন, যত ইবাদাত- বন্দেগীই আমরা করি না কেন, যত প্রশংসাই মানুষ আমাদের করুক না কেন- দিনশেষে আমরা মানুষই। আর তাই মানুষ হিসেবে অনেক সীমাবদ্ধতা দ্বারা আমরা বেষ্টিত। এ কারণে আধ্যাত্মিক পথের যাত্রীদেরকে সর্বদা নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্মরণ করে আপন ভুলত্রুটি খুঁজতে থাকা উচিত। আত্মাকে নিত্য কলুষমুক্ত রাখতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই। আর আত্মাকে নির্মল করার আগ পর্যন্ত কেউই আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হতে পারে না, পরম সত্যের বোধপ্রাপ্ত হতে পারে না।
মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন নিজেকে সে পরিপূর্ণরূপে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে পারে না। এ কারণে মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধতাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে, সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বিনয়ী হয়ে উঠবে। বিনয়জাত আত্মশুদ্ধি আমাদেরকে আল্লাহর নিকট উচ্চকিত করে তোলে এবং আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি লাভে সহায়তা করে।
নিজের দোষত্রুটি জানার কয়েকটি উপায় আছে-
১. সমালোচনা গ্রহণ করা। সর্বদা সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা রাখুন। সমালোচনা শুনে ক্রোধান্বিত হবেন না। এতে আপনারই ক্ষতি। বিরাট ক্ষতি। ক্রোধ করে নিজের আত্মার ক্ষতি তো করলেনই, আবার সমালোচনা থেকে নিজেকে উন্নত করার সুযোগও খোয়ালেন। তাই সমালোচনা যে-ই করুক ও যেভাবেই করুক না কেন, তা গ্রহণ করুন। সমালোচনার পরে সমালোচনাকারীর প্রতি ক্ষুব্ধ না হয়ে সর্বপ্রথম নিজের ভেতরে বেঁকে দেখুন, আপনি কি সত্যিই এই সমালোচনার যোগ্য? যদি আপনার মাঝে সমালোচনার সত্যতা পাওয়া যায়-যদিও সমালোচনার ভাষা ছিলো কঠোর ও রুক্ষ্ম-তবে সেই সমালোচনা আপনার জন্যই উপকারী হতে পারে, যদি আপনি তাকে গ্রহণ করে নিজেকে শুধরে নেন তো। সমালোচনা শুনে রাগ-ক্রোধ- বিদ্বেষ নয় সর্বপ্রথম নিজের দোষান্বেষণের মানসিকতা আসলে বোঝা যাবে অন্তর ধীরে ধীরে আত্মিক শুচিতার দিকে আগাচ্ছে, ইন শা আল্লাহ।
২. বন্ধুবান্ধব। বন্ধুরা অনেকসময়ই উপদেশের মাধ্যমে নিজের দোষত্রুটি জানতে সহায়তা করে থাকে। উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু বলেছেন, "আল্লাহ তার ওপর রহম করুন যে আমার দোষ দেখিয়ে দেয়।" দেখুন! উমারের মত সাহাবী ভুল ধরিয়ে দেওয়ার কাজটিকে উপহার হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই কোনো বন্ধু যদি নিষ্ঠা ও কোমলতার সাথে আপনার ভুল ধরিয়ে দেয় তবে আন্তরিকতার সাথে তা গ্রহণ করে নিন। নিজেকে যথাসাধ্য সংশোধনের চেষ্টা করুন।
৩. পরীক্ষা। বিপদাপদ ও বালা-মুসীবতের মাধ্যমে নিজের দোষত্রুটি বের হয়ে আসে। আল্লাহ বলেছেন,
أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةٌ أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُوْنَ.
“তারা কি দেখে না যে, 'তাদেরকে প্রতি বৎসর একবার বা দু'বার বিপর্যস্ত করা হয়?' এরপরও তারা তাওবা করে না এবং উপদেশও গ্রহণ করে না।"১
আয়াতটি মুনাফিকদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছিলো, তারা একের পর এক বিপদের পরেও আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তন করত না, নিজেদের বিভ্রান্তি ও ধোঁকার মধ্যেই মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। কিন্তু আমি আপনি মুমিন। আমাদের ওপর যখন কোনো বিপদ আপতিত হয় আমাদের উচিত তাকে নিজেদের ভুলত্রুটি অন্বেষণের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে লুফে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়া।
টিকাঃ
১. (তাবারানী)
১. (সূরা নিসা, ৪:২৮)
১. (সূরা তাওবা, ৯:১২৬)