📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 ষষ্ঠ পদক্ষেপ : আগে পরিশুদ্ধি, তারপর সাজসজ্জা

📄 ষষ্ঠ পদক্ষেপ : আগে পরিশুদ্ধি, তারপর সাজসজ্জা


“কিন্তু অন্তর কীভাবে আলোকিত হতে পারে যখন তাতে সৃষ্টির চিত্র আচ্ছাদন করে আছে? কীভাবে অন্তর আল্লাহর দিকে যাত্রা করতে পারে যখন তা কামনা-বাসনার দ্বারা শৃঙ্খলিত হয়ে আছে? উদাসীনতা ও বিস্মৃতির কলুষতা থেকে মুক্ত না হয়ে অন্তর কীভাবে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হতে পারে?”
উপলব্ধি ও অভিচিন্তনের মাধ্যমে মুমিনের অন্তরে ঈমানের নূর প্রজ্জ্বলিত হয়। কিন্তু অন্তর আয়নার মত, এ কারণে অন্তরকে চকচকে হতে হলে আগে একে সকল প্রকার অনাকাঙ্খিত দাগ, ধূলিময়লা থেকে পরিশুদ্ধ হতে হবে। এ কারণে ইবনু আতা বলছেন,
"অন্তরের জন্য উযলাহ বা বিচ্ছিন্নতার চাইতে অধিক উপকারী আর কিছুই হয় না, কেননা এর মাধ্যমেই চিন্তার অবস্থায় প্রবেশ করা যায়। কিন্তু অন্তর কীভাবে আলোকিত হতে পারে যখন তাতে সৃষ্টির চিত্র আচ্ছাদন করে আছে? কীভাবে অন্তর আল্লাহর দিকে যাত্রা করতে পারে যখন তা কামনা-বাসনার দ্বারা শৃঙ্খলিত হয়ে আছে? উদাসীনতা ও বিস্মৃতির কলুষতা থেকে মুক্ত না হয়ে অন্তর কীভাবে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হতে পারে?"
অর্থাৎ, অন্তরকে আলোকিত করতে চাইলে আগে তাকে পঙ্কিলতামুক্ত করতে হবে। ইবনু আতার ভাষায় সেসকল পঙ্কিলতা হলো-সৃষ্টির চিত্র, কামনা-বাসনা ও উদাসীনতা।
সূফীদের ভাষায় আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল কিছুকে বলা হয় 'আল-আগইয়ার' বা অন্যকিছু। অন্তরে যখন আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছু-তা হতে পারে জাগতিক বস্তু, মানুষ, পরিবার, বন্ধুবান্ধব-বাসা বাঁধে এবং একমাত্র তা-ই যখন বদ্ধমূল চিত্রের মত অন্তরকে আচ্ছাদিত করে রাখে সেই অন্তর কীভাবে আল্লাহকে চিনতে পারে? তার মানে এই নয় যে আমরা জাগতিক কাজকর্ম, পরিবার, সম্পদ ও চাকরি-বাকরি পরিত্যাগ করবো। মূল বিষয় হচ্ছে আমাদের দৃষ্টি কোনদিকে? আমরা কীসের প্রতি মনোযোগী? আমাদের অন্তর কীসের ও কার চিন্তায় বিভোর? আমাদের অন্তর যদি সৃষ্টির প্রতি মনোযোগী থাকে, সৃষ্টির ধ্যানজ্ঞানে বিমোহিত থাকে তবে সেই অন্তর তো আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
অন্তরের দ্বিতীয় কলুষতা উল্লেখ করতে যেয়ে ইবনু আতা কামনা-বাসনার কথা উল্লেখ করেছেন। ইসলাম মৌলিকভাবে কামনা-বাসনা চরিতার্থের বিরোধী নয়। ইসলাম কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে নিষেধও করে না। আল্লাহ নিজেই মানুষের মাঝে কামনা-বাসনা প্রোথিত করে দেবেন তারপর সেই কামনা-বাসনাকে একেবারে পদদলিত করতে নির্দেশ দেবেন-এ ধরণের অযৌক্তিক নির্দেশ দেবার কথা আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তাই করা যায় না। আল্লাহ এমন কোনো কিছুকেই পুরোপুরি অবদমন করতে নির্দেশ দেন না যা আমাদের মৌলিক স্বভাবের অন্তর্গত, যেমন-খাওয়া, পান করা, বিবাহ, যৌনকর্ম, কথা বলা, হাসিঠাট্টা ইত্যাদি। ইসলাম এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সীমার মাঝে এমনভাবে পরিশীলিত করতে চায় যাতে তা মানুষের নৈতিক সত্তাকে উন্নত করে, নৈতিকতার উচ্চ সীমায় পৌঁছার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। ইসলাম খাবার খাওয়াকে নিষেধ করে না, নিষেধ করে অপচয়, অতিরিক্ত পানাহার ও এর পেছনেই দিবানিশি ব্যয় করা। তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পানীয় পান করাতে ইসলামের কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু যখন তা মদ বা নেশাদায়ক পানীয় হবে তখন তা মানুষের নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকারক। যৌনকর্ম একদিক থেকে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য, তেমনি নারী-পুরুষের স্বাভাবিক ও সাধারণ স্বভাবজাত আকর্ষণের দিক থেকেও তা অনিবার্য, তবে ইসলাম অবাধ যৌনতাকে হারাম করেছে, এর স্থলে বিবাহের মাধ্যমে যৌনতাকে প্রশংসিত স্থান দিয়েছে। কথা বলাটা মানুষের স্বভাব, তাই ইসলাম একে অবদমন করতে চায় না, ইসলাম চায় কথা যাতে মিথ্যাশ্রিত না হয়ে সত্যাশ্রিত হয়, কথার পরিমাণ যাতে মাত্রা অতিক্রম না করে, কথার মাধ্যমে যাতে অশ্লীলতা ও পাপাচার না ছড়ায়, এমন কথা বলা যা আল্লাহর নিকটবর্তী করবে।
এসকল স্বভাব, চাহিদা, কামনা-বাসনা যখন ইসলাম অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে যায়, যখন মানুষ শিশ্লোদরবৃত্তিতে নিমজ্জিত হয়, পেট ও লজ্জাস্থানের দাস হয়ে যায়, তখনই তা নৈতিক সত্তার পবিত্রতা বিনষ্ট করে ফেলে, অন্তরের আয়নাকে অপরিচ্ছন্ন করে দেয়। এরূপ মরচে পড়া অন্তর নিয়ে আল্লাহকে পাওয়া সম্ভব নয়।
অন্তরের তৃতীয় যে ত্রুটির দিকে ইবনু আতা নির্দেশ করেছেন তা হলো উদাসীনতা। আল্লাহ বান্দার নিকটবর্তী।
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
“আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। ঘাড়ের শিরার চেয়েও আমি তার কাছে রয়েছি।”১
আল্লাহ তো সকল বান্দারই নিকটেই আছেন, তবে বান্দা আল্লাহর উপস্থিতি বা নৈকট্য অনুভব করতে পারে না। কোন জিনিস তাকে আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করতে বাধা দেয়? ইবনু আতার ভাষায় তা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃতি ও উদাসীনতা।
উদাসীনতা এক ধরণের চিন্তাগত অলসতা বা শৈথিল্য। এমন অবস্থায় অন্তর ভাবলেশহীন একপ্রকার মৃতশরীর কিংবা জড় পদার্থের মত হয়ে যায়। উদাসীনতাকে দূর করার উপায় অন্তরে সঠিক ভয়টাকে প্রতিস্থাপিত করা। কেননা সঠিক ভয়ই পারে অন্তরের শৈথিল্যকে দূর করতে, অন্তরকে রোগমুক্ত করতে এবং একমাত্র সঠিক ভয়ই পারে অন্য সকলপ্রকার ভয় থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখতে।
সেই সঠিক ভয়টি হলো এই চিন্তা মনের মধ্যে জাগিয়ে রাখা- জগতের প্রতিভাসের পেছনে যে এক পরম বাস্তবতা আছে তা আমি ভুলে যাচ্ছি কিনা, আমি সত্য বাদে মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরছি কিনা, আমার জীবন অনর্থক ও অহেতুক এক বোঝায় পরিণত হচ্ছে কিনা, বা।।আমি স্থায়ীত্ব থেকে অস্থায়ীত্বকে অধিক ভালোবেসে ফেলছি কিনা, নম্বরকে প্রাধান্য দিতে যেয়ে অবিনশ্বরকে ছুঁড়ে ফেলছি কিনা, এমনটা হচ্ছে নাকি যে আমি পৃথিবীর কোনো কাজেই আসছি না, আমার সময়গুলো বেহুদা ব্যয় হচ্ছে কিনা।
এই উদাসীনতাই সত্য থেকে দূরে রাখে, পরম বাস্তব আল্লাহর উপলব্ধি থেকে বিচ্যুত রাখে। এর থেকে মুক্তি পাবার আরেকটি বড় দাওয়াই হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে আলোকিত করে। আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃত হলে অন্তরাত্মা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আল্লাহর স্মরণ মানে পরম সত্যের স্মরণ, জীবনের সঞ্জীবনী রস।
প্রত্যেক মুসলিমেরই নির্দিষ্ট একটি সময় নিরিবিলি ও একনিবিষ্ট মনে আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত করা উচিত। সময় নেই-এ কথা বলে অযুহাত দেওয়া কমপক্ষে যিকরের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়, কারণ যিকর এমন একটি ইবাদাত যা শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে যেকোনো অবস্থায়ই করা যায়। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উপায়ে চেষ্টা-সংগ্রাম করতে করতেই মুমিনের অন্তর ধীরে ধীরে আলোকিত হতে থাকে, মহান আল্লাহর নূর থেকে।
اللهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَضْرِبُ اللهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ.
"আল্লাহ হলেন আকাশ ও পৃথিবীর নূর। তাঁর নূরের উপমা এরকম; যেন একটি দীপাধার, যাতে একটি প্রদীপ আছে। প্রদীপটি একটি কাঁচের (পাত্রের) মধ্যে। কাঁচটি যেন একটি উজ্জ্বল তারকা। প্রদীপটি একটি বরকতময় যাইতুন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়। প্রদীপটিতে আগুনের স্পর্শ ছাড়াই ঐ গাছের তেল উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দেয়। নূরের ওপর নূর। আল্লাহ যাকে চান তাকে নূরের পথ দেখান। আলাহ সবকিছুই ভালোভাবে জানেন।”১
আয়াতে উল্লেখিত প্রদীপটি মুমিন বান্দার বক্ষদেশের সাথে তুলনীয়। এই প্রদীপের ভেতরে আছে কাঁচ। অত্যন্ত ভঙ্গুর, স্পর্শকাতর তবে অতীব স্বচ্ছ সেই কাঁচ। এই কাঁচটি হচ্ছে মুমিনের অন্তর বা ক্বলব। মুমিন এই কাঁচের স্বচ্ছতার মাধ্যমে সত্য দর্শন করে থাকে। সত্য দর্শনের এই আয়না নানা প্রকার কলুষতায় যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন তখন তা আর আলো প্রত্যক্ষ করতে পারে না। এ কারণে সত্য দর্শন করতে, অন্তরকে আলোকময় পথে ভ্রমণ করানোর জন্য আগে অন্তরকে ধূলিময়লামুক্ত করে সত্যের পথের পথিক হবার যোগ্য ও প্রস্তুত করে তুলতে হবে।

টিকাঃ
১. (সূরা কফ, ৫০:১৬)
১. (সূরা নূর, ২৪:৩৫)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 সপ্তম পদক্ষেপ : সময় ব্যবস্থাপনা

📄 সপ্তম পদক্ষেপ : সময় ব্যবস্থাপনা


“অবসর পাওয়ার আগ পর্যন্ত উত্তম আমল স্থগিত রাখা লঘুচিত্ততার লক্ষণ।”
আমরা অনেক সময়ই আগামীকাল, আগামী সপ্তাহ, আগামী মাস কিংবা আগামী রমাদান, বিয়ে করার পর, প্রোমোশন পাবার পর, বাচ্চারা বড় হয়ে যাবার পরের সময়গুলোর জন্য ভালো কাজগুলোকে তুলে রাখি। এটাই ইবনু আতার ভাষায় 'লঘুচিত্ততা ও অপরিপক্বতা'র লক্ষণ। আসলে ভালো আমল করা মোটেও সময় পাবার কোনো বিষয় না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের জন্যই কম বা বেশি কিছু না কিছু সময় তো বরাদ্দ থাকেই। আসল বিষয় হচ্ছে প্রাধান্যতা, অগ্রাধিকার; আমি কোন কাজকে প্রাধান্য দিচ্ছি, কোন কাজটা আগে করছি। মানুষ তার নির্ধারিত সময়ে সেই কাজই আগে করে যাকে সে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। দেখার বিষয় প্রত্যেকে যার যার নির্ধারিত সময়ে কি করেছে, কোন কাজকে প্রাধান্য দিয়েছে। কেননা-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকেই সাধ্যাতীত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেন না।”১
মনে করুন ফরয সালাতের সময় শেষ হবার আগে আপনার হাতে পাঁচ মিনিট সময় বাকী আছে। আপনি এই পাঁচটি মিনিট সময় যেকোনোভাবেই কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু মুসলিম হিসেবে আপনার কাছে সালাত সর্বাগ্রাধিকার পাবার যোগ্য। এ কারণে আপনার ওপর আবশ্যিক হলো আপনি এই পাঁচ মিনিটে ফরয সালাত পড়ে নেবেন। হ্যাঁ, যদি কোনো কঠিন পরিস্থিতি সামনে এসে পড়ে সেক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। যেমন-আপনি দেখছেন কেউ পানিতে ডুবে যাচ্ছে কিংবা কোনো অন্ধ ব্যক্তি গাড়ির সামনে পড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে-সেক্ষেত্রে আপনি সালাত না পড়ে তাদেরকে সাহায্য করতে যেতে পারেন, যেহেতু জীবন-মরণের সমস্যা। কিন্তু সাধারণাবস্থায় মুমিনের কাছে সালাতের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। এভাবে মুমিনের কাছে প্রতিটি কাজই গুরুত্বানুযায়ী অগ্রাধিকার পাবে।
ভালো কাজে বিলম্ব করা আখিরাতে আফসোসের কারণ হবে।
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ. لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا .
“অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, 'প্রভু! আমাকে দুনিয়ায় ফেরত পাঠিয়ে দিন' যাতে আমি যা রেখে এসেছি সেখানে (দুনিয়ার জীবনে) ভালো কাজ করতে পারি। কিছুতেই তা হবার নয়...."১
এ কারণে বিলম্বকরণ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক মুমিনেরই উচিত জীবনের সময়গুলোকে সর্বোত্তমভাবে বিনিয়োগ করা। যে যতটা কার্যকারীতার সাথে সময় ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন করতে পারবে সে সাফল্যের প্রতিযোগীতায় এগিয়ে থাকবে ইন শা আল্লাহ, দুনিয়া ও আখিরাতে, উভয় জগতেই।। সময় ব্যবস্থাপনা জাগতিক কাজর্কমের জন্য যতটা না গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক, তার চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক দীনের কাজ ও ভালো আমল করার ক্ষেত্রে। হাঁটা, বাস-ট্রেন-গাড়িতে চড়ার সময়গুলোকে উত্তমভাবে কাজে লাগান। কুরআতের তিলাওয়াত শুনুন, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করুন, মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করুন। এমন অনেক ভাই ও বোন আছেন যার বাস ও ট্রেনের সময়কে কাজে লাগিয়ে গোটা কুরআন মুখস্ত করেছেন। হিসাব করে দেখা যায় প্রত্যেক দিন দেড় ঘণ্টা সময় দিলেই দু'বছরে সম্পূর্ণ কুরআন হিফয করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে দেখা যায় বাস-ট্রেনগুলোতে হৈ-হুল্লোড় কম থাকে। কেননা, প্রত্যেকেই নিজের মত করে অধ্যয়ন, লেখালেখি কিংবা চিন্তা করতে ব্যস্ত থাকে, এমনকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও। মুমিনদের জন্য সময় অন্য যে কারো চাইতে অনেক অনেক গুণ বেশী দামী। কারণ, মুমিন এই সময়ই মহাকালের অফুরন্ত জমিতে রোপন করে, এর ফলাফলই সে পরকালে পাবে। সুতরাং যে কিছুই রোপণ করতে পারেনি, সে পরকালে উপকৃত হবার মত কোনো ফসলই পাবে না। সেদিন তার আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। এ কারণে মুমিনের উচিত গুরুত্বানুযায়ী বিভিন্ন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিজের সময়কে সাজিয়ে নেওয়া।

টিকাঃ
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৮৬)
১. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৯৯-১০০)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 অষ্টম পদক্ষেপ : পরীক্ষার সময় সবর

📄 অষ্টম পদক্ষেপ : পরীক্ষার সময় সবর


“দুনিয়ায় অবস্থান করে দুঃখকষ্ট দেখে আশ্চর্য হয়ো না। কেননা বিপদাপদ তো দুনিয়ার প্রকৃত স্বভাবই উন্মোচন করে।"
বান্দা যখন তাওবা করে, আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তার নিয়‍্যাতকে খাঁটি করে নেয়, চিন্তাভাবনা করে, সময়কে মূল্যবান মনে করে সঠিক পথে বিনিয়োগ করে তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে সত্য ও ঈমানের আলোতে উদ্ভাসিত হতে থাকে এবং সে আস্তে আস্তে আল্লাহর পথে যাত্রায় অগ্রসর হতে থাকে। নবী ২৪ বলেছেন, আল্লাহ বলেন,
"আমার বান্দা নফল আমল করতে থাকে ও আমার নৈকট্যবর্তী হতে থাকে, এভাবেই আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। এমতাবস্থায় আমি তার কান হয়ে যাই যেই কান দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যেই চোখ দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যে হাত দিয়ে সে ধরে এবং পা হয়ে যাই যেই পা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা দেই, সে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে আশ্রয় দেই।" (বুখারী)
সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে এলে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে এক হাত এগিয়ে এলে এক বাহু পরিমাণ এগিয়ে যাই। সে হেঁটে আসলে আমি দৌড়ে যাই। (বুখারী ও মুসলিম)
তবে এটা আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত যে তিনি যখন কাউকে ভালোবাসেন তাকে দুনিয়ার বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন।
أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
"মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হবে?"১
ঈমানকে অবশ্যই যাচাই করে নেওয়া হয়, এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجْهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّبِرِينَ وَنَبْلُوا أَخْبَارَكُمْ.
"আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যাতে তোমাদের অবস্থা যাচাই করে নিতে পারি এবং দেখে নিতে পারি যে, তোমাদের মধ্যে কারা মুজাহিদ ও ধৈর্যশীল।”১
বিপদ যেমনই হোক না কেন অবশ্যই আমাদের প্রতিক্রিয়া সর্বদা ধৈর্য ও ধার্মিকতাপূর্ণ হওয়া চাই।
وَلَنَبْلُوَنَكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ.
"এবং নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো-ভয়, ক্ষুধা, ধন, প্রাণ ও শস্যের ঘাটতির কোনো একটি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করো।"২
لَتُبْلَونَ فِي أَمُولِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ.
"তোমরা অবশ্যই পরীক্ষিত হবে, নিজেদের ধন-সম্পদ, জীবনের ব্যাপারে। পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিলো এবং যারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে তাদের পক্ষ থেকে তোমরা নানা কষ্টদায়ক কথাবার্তা শুনে থাকো। তোমরা যদি ধৈর্য ধরো এবং আল্লাহকে ভয় করো তবে তা দৃঢ় প্রত্যয়ের কাজ।"৩
দুঃখ কেন পতিত হয়?
ক. বান্দা যেন দুঃখ-কষ্টে বিচলিত না হয়ে অন্তরে পরকালমুখীতাকে লালন করতে পারে সেই সুযোগ দান করতে।
খ. জীবনের উত্থান-পতনের দোলায় দুলতে দুলতে সে যেন সঠিক পথ অন্বেষণের সুযোগ পায়।
গ. বারংবার দুঃখ-কষ্টের হাওয়ায় এদিক ওদিক হয়ে সে যেন এই সত্যের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে শেখে যে, নিজ জ্ঞান কিংবা ক্ষমতা দিয়ে সে ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং এভাবেই সে যেন আল্লাহ-নির্ভরতা বা তাওয়াক্কুল শিখতে পারে।
ঘ. সে যেন দুঃখ-কষ্টের টানাপোড়েনের মধ্যে থেকে বুঝে ফেলে যে, প্রকৃত শান্তি মানে সাময়িক আনন্দ বা নিরানন্দ থেকে সাময়িক রেহাই নয় বরং আশা-আকাঙ্খার আধিক্য এবং আত্মিক কলুষতা-অপবিত্রতা থেকে মুক্তির মধ্যে।
আল্লাহর কাছে দুনিয়া খুবই তুচ্ছ ও নগন্য। তিনি যখন কাউকে দুনিয়ার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন বা বিপদে আপতিত করেন তিনি এর মাধ্যমে বান্দাকে তাওবার দিকে পরিচালিত করেন। এটা তাঁর দয়া ও করুণা এবং বান্দার জন্য এক অমূল্য উপহার। নবী বলেছেন,
"নবীরা সবচাইতে বেশি পরীক্ষার শিকার হন, এরপর তাদের সর্বোত্তম অনুসারীগণ, এরপর তাদের অনুসারীগণ। দীনের স্তর অনুযায়ী ব্যক্তির পরীক্ষা নেওয়া হয়।"১
এ কারণেই ইবনু আতা বলেছেন, "দুনিয়ায় অবস্থান করে দুঃখকষ্ট দেখে আশ্চর্য হয়ো না। কেননা বিপদাপদ তো দুনিয়ার প্রকৃত স্বভাবই উন্মোচন করে।" এই জগতের নামই হলো আদ-দুনিয়া, যার আভিধানিক অর্থ নিম্নতর জীবন। তাই কঠিন পরিস্থিতি, অনাকাঙ্খিত ঘটনাবলী ও দুঃখ-দুর্দশা এখানে মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়; বরং এটাই এই জগতের সাধারণ স্বভাব ও এই নিম্নতর জীবনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
দুনিয়ার এই স্বাভাবিকতাকে মেনে নিলে বান্দার মধ্যে আল্লাহর পথে যাত্রার জন্য বড় এক সৎগুণ হাসিল হয়, বিপদে সবর করা। ধৈর্য বান্দার উপলব্ধিকে শাণিত করে, অনুভূতিকে পরিশীলিত করে, বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, সত্যিকারার্থেই আল্লাহর নৈকট্য অনুভবের সুযোগ করে দেয়।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ "আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”১
আর আল্লাহর নিকটে থাকলে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই থাকে না। সবর বা ধৈর্য তিন প্রকারের, এক. ভালো আমলের ক্ষেত্রে ধৈর্য, দুই, মন্দকর্ম এড়াতে ধৈর্য ও তিন. বালা-মুসীবতে ধৈর্য। ভালো আমলের ক্ষেত্রে ধৈর্য মানে হলো মুমিন নিজেকে কষ্টে না ফেলে নিরন্তন উত্তম কর্ম করতেই থাকবে। আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ "আল্লাহ দীনের মাঝে কোনো কাঠিন্য রাখেননি। ২
নবী এক বৃদ্ধকে তার দু'ছেলের সহায়তায় পদব্রজে কাবার দিকে যেতে দেখে তিনি বললেন,
"এই ব্যক্তির নিজেকে কষ্টে ফেলার কোনো প্রয়োজনই আল্লাহর প্রয়োজন নেই।” এরপর তিনি সেই বৃদ্ধকে কাবার দিকে যাওয়ার জন্য বাহনে চড়তে নির্দেশ দেন।
তবে শরীয়ত পরীক্ষা। আল্লাহ জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টিই করেছেন কে ভালো আমল করে তা যাচাই করার জন্য। এ কারণে কখনো কখনো কষ্টের মাধ্যমেও আল্লাহর ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতা প্রমাণিত হয়। এ কারণে কুরআন ও হাদীছ থেকে এটা নিঃসন্দিগ্ধভাবে প্রমাণিত হয়, যে আমলের সাথে যেমন ও যত পরিমাণ কষ্ট জড়িত থাকে তা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় এবং বান্দা এর মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকে। এটা উন্মুক্ত ময়দান, এখানে যে যতটা আগাতে পারবে সে আল্লাহর দিকে যাত্রায় ততই অগ্রসর থাকবে। তবে সেই কষ্ট অবশ্যই এমন হবে না যা বান্দার সাধারণ ক্ষমতাসীমা অতিক্রম করে অবিমিশ্র কাঠিন্যের পর্যায়ে উপনীত হয়।
মন্দকর্ম এড়াতে ধৈর্য মানে হলো মুমিন এমন সকল কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে যা আল্লাহ হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন। এ ধরণের ধৈর্যের ক্ষেত্রেও আল্লাহর পক্ষ থেকে অগণিত পুরষ্কার রয়েছে। যেমন যে ব্যক্তি নিজের অবৈধ কামনা-বাসনা প্রতিরোধ করে তাঁর ব্যাপারে নবী সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া পাবে সাত ব্যক্তি, তাদের মধ্যে একজন হলো, “যাকে উচ্চ বংশের সুন্দরী কোনো নারী অবৈধ যৌনকর্মের দিকে আহ্বান করে, কিন্তু সে এই বলে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।”১
পরীক্ষার ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রাথমিক স্তর মন্দকর্মে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা, উচ্চ স্তর হলো মুখে অভিযোগ না করা এবং সর্বোচ্চ স্তর সৎ হলো অন্তরে অন্তরেও অভিযোগ না করা।
নিজেকে পাপ থেকে বিরত রাখা অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার অন্যতম শর্ত। আল্লাহ মুনাফিকদের ব্যাপারে বলতে যেয়ে বলেছেন,
وَلَقَدْ أَخَذْنَهُم بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
“আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হয়নি এবং কাতর প্রার্থনাও করেনি।”২
বিপদের সময় মানুষ দ্বিমুখী রাস্তার সামনে এসে উপনীত হয়, হয় সে তাওবা করে প্রত্যাবর্তন করবে অথবা পাপে জড়িয়ে পড়বে। পাপে জড়িয়ে পড়া মানেই আল্লাহ প্রদত্ত এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে যাওয়া।
উচ্চ স্তরের ধৈর্য হচ্ছে মুখে কোনো প্রকার অভিযোগ না করা, যাকে কুরআনে 'সুন্দর ধৈর্য' বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন নবী ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,
فَصَبْرٌ جَمِيلٌ “সুতরাং সৌকর্যময় ধৈর্যই শ্রেয়।”১
إِنَّمَا أَشْكُوا بَنِى وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ “আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকটই নিবেদন করছি।”২
আন্তরিকভাবে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রাজী-খুশি থাকা ধৈর্যের সর্বোত্তম স্তর। মুমিন তখনই এই স্তর লাভ করতে পারে যখন সে না মুখে কোনো অভিযোগ বা অখুশি প্রকাশ করে, আর না অন্তরে অন্তরে কোনো প্রকার আফসোস করে বা মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। এ অবস্থায় উপনীত হলে অন্তর পরিপূর্ণ প্রশান্ত, স্থির, নিশ্চল থাকে; এমনকি প্রবলতম বিপদের মুখেও! কেননা এই অন্তর দুনিয়ার বাস্তবতা বুঝে গেছে, সে সত্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখে, বিপদের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারে। নবী বলেছেন,
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى “বিপদের প্রথম ধাক্কার সবর-ই প্রকৃত সবর।”

টিকাঃ
১. (সূরা আনকাবুত, ২৯:২)
১. সূরা মুহাম্মাদ: ৩১
২. সূরা বাকারাহ: ১৫৫
৩. সূরা আলে-ইমরান: ১৮৬
১. (ইবনু হিব্বান)
১. (সূরা বাকারাহ, ২:১৫৩)
২. (সূরা হজ্জ, ২২:৭৮)
৩. (নাসাঈ)
১. (বুখারী ও মুসলিম)
২. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৭৬)
১. (সূরা ইউসুফ, ১২:১৮)
২. (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬)
• (বুখারী ও মুসলিম)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 নবম পদক্ষেপ : প্রারম্ভকে দীপ্তিময় করা

📄 নবম পদক্ষেপ : প্রারম্ভকে দীপ্তিময় করা


"সাফল্যের নিদর্শন হলো প্রারম্ভেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। যার শুরুটা আলোকিত, তার শেষটাও আলোকিত।"
বান্দা পূর্ববর্তী পদক্ষেপসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসার যোগ্য পরিণত হয়েছে। নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে হতে সে চিত্তের প্রশান্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন সে সর্বদাই নতুন নতুন আমলের কথা চিন্তা করে যা তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে পারে। এর মাধ্যমে আরেকটি নিয়মের কথা জানা যায়, তা হলো- ভিত্তি মজবুত করে নব নব উদ্যোগ চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রায় নিশ্চিত করে দেয়। যদি সে প্রারম্ভ থেকেই সচেতন থাকতে পারে, প্রারম্ভ থেকেই আলোর পথে হাঁটতে পারে তবে তার আখেরটাও উত্তমই হবে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রারম্ভকে আলোকিত করার উপায় কী? ইবনু আতা এর উত্তরে বলেছেন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। কিন্তু শুরুর দিকেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কীভাবে সম্ভব?
ইসলাম আমাদেরকে যেকোনো কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে শিক্ষা দেয়। নবী ﷺ বলেছেন,
"যে কাজ আল্লাহর নামে শুরু করা হয় না তা (আল্লাহ প্রদত্ত বারাকাহ) বঞ্চিত।”১
মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজই আল্লাহর নামে, আল্লাহকে স্মরণ করে শুরু করা। কথা বলতে হলে আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ পড়ে শুরু করুন। সালাতের প্রারম্ভে নিজের নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করে নিন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর সাথে পরামর্শ করে নিন ইস্তিখারা সালাত পড়ার মাধ্যমে। নবী ﷺ সাহাবীদেরকে কুরআন শেখানোর মত গুরুত্ব দিয়ে ইস্তিখারার সালাত শেখাতেন। এই সালাতে এই দুআ পড়তে হয়,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ العَظِيمِ؛ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ - وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ - خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ - فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسَّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيْهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرُّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ - فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أَرْضِنِي بِه.
“হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের সাহায্যে আপনার নিকট কল্যাণ কামনা করছি। আপনার শক্তির সাহায্যে আপনার নিকট শক্তি কামনা করছি এবং আপনার মহান অনুগ্রহের প্রার্থনা করছি। কেননা আপনিই শক্তিধর, আমি শক্তিহীন। আপনি জ্ঞানবান, আমি জ্ঞানহীন এবং আপনি গায়েবী বিষয় সম্পর্কে মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! এই কাজটি (এখানে উদ্দিষ্ট কাজ বা বিষয়টি মনে মনে উল্লেখ করবে) আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমার দীন, আমার জীবিকা এবং আমার কাজের পরিণতির দিক দিয়ে, (অথবা বলেছেন) ইহকাল ও পরকালের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন এবং তাকে আমার জন্য সহজলভ্য করে দিন, তারপর তাতে আমার জন্য বরকত দান করুন। আর এই কাজটি আপনার জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমার দীন, আমার জীবিকা এবং আমার কাজের পরিণতির দিক দিয়ে, (অথবা বলেছেন) ইহকাল ও পরকালের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে আপনি আমাকে তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন এবং যেখানেই কল্যাণ থাকুক আমার জন্য সেই কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন। অতঃপর তাতেই আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।”১
এসকল কিছুই আল্লাহকে স্মরণ করার উপায়। আল্লাহকে স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে আমরা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, একমাত্র তাঁর ওপরই ভরসা করেছি এবং আমরা সর্বক্ষেত্রে তাঁর সাহায্যই কামনা করি। ইবনু আতার ভাষায় প্রারম্ভে আল্লাহকে স্মরণ করা চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে দেয় এবং এটাই সাফল্যের নিদর্শন। হতে পারে আমরা জাগতিক দৃষ্টিতে জিতেছি, হতে পারে আমরা হেরেছি, কিন্তু যতক্ষণ আমরা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করছি এবং এ ব্যাপারে সচেতন থাকছি ততক্ষণ আমরা আল্লাহর দৃষ্টিতে বিজয়ী, জাগতিক ফলাফল যা-ই হোক না কেন। আসল বিষয় হচ্ছে শুরুতে আল্লাহকে স্মরণ করা, আশা করা যায় এটাই অনুকূল ফলাফল এনে দেবে।
যেমন আপনি ব্যবসা করছেন। সাধারণভাবেই আপনার লক্ষ্য থাকবে মুনাফা কামানো। এখানে লাভ ও ক্ষতির সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে। তবে মনে করুন আপনি ইস্তিখারা করলেন এবং আপনার লোকসান হলো। আপনি হয়ত আপনার নির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। তবে হতে পারে এই লোকসানই আপনাকে আপনার ব্যবসা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা তৈরী করতে আরও বেশি আগ্রহী ও তাড়িত করে তুললো। এর মাধ্যমেই হয়ত আপনি আপনার পূর্বতন পরিকল্পনাকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে করে নিজের সূক্ষ্ম ত্রুটি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং এর মাধ্যমেই আপনি সেগুলো দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারবেন, যা সামগ্রিকভাবে আপনার জন্য অধিক উপকারী হবে। আপনি হয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন, কিন্তু এই সময়েই আপনি পেয়ে গেলেন কোনো খাঁটি বন্ধু, যে বিপদাপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, দুঃখের ভাগীদার হয়। এভাবে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি পরাজিত হলেও সামগ্রিকভাবে বিজয়ীই হলেন।
কেননা, মানুষের কাছে সাফল্য ও ব্যর্থতার মানদণ্ড সাধারণত 'পরিসংখ্যানগত সংখ্যা'র ওপর নির্ভরশীল। মানুষ স্থূলদৃষ্টিতে সাফল্য ও ব্যর্থতাকে বিচার করে। কিন্তু আল্লাহর কাছে এই মানদণ্ডের সেরূপ মূল্য নেই। প্রকৃতপক্ষে যা মূল্যবান তা হচ্ছে আখিরাত ও পরকালীন সুখশান্তি। এ কারণে যে প্রথম থেকেই আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন হবে আশা করা যায় সে আখেরেও কাঙ্খিত ফলাফলই লাভ করবে।
এই নীতিটি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেমন-নবী সেই সাত শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন যারা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া পাবে। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে 'যেই যুবক আল্লাহর ইবাদাতের মধ্য দিয়ে বড় হয়'। (বুখারী) এই যুবক জীবনের শুরু থেকেই আল্লাহর ইবাদাত করে এসেছে, তাই তার চূড়ান্ত ফলাফলও সুখময় হয়েছে। সে আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবার মত বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছে।

টিকাঃ
১. (বায়হাকী)
১. (বুখারী)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00