📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 চতুর্থ পদক্ষেপ : ইখলাস

📄 চতুর্থ পদক্ষেপ : ইখলাস


“আমলসমূহ মৃত চিত্রকর্মের মত, ইখলাসের মাধ্যমেই তাতে প্রাণসঞ্চার হয়।”
তাওয়াক্কুলের চাইতেও ইখলাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তাওয়াক্কুল স্বস্থানে অতীব তাৎপর্যময় এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে ইখলাস আরও গভীর ও সূক্ষ্ম। এ কারণে আল্লাহর অপরিসীম দয়ার স্বীকৃতি ও তাঁর প্রতি শক্ত নির্ভরতা না থাকলে ইখলাস অর্জন করা সম্ভব নয়।
ইখলাস কি? ইখলাস হলো নিজ অন্তরের নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। আল্লাহর প্রতি সততা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের প্রতি একনিষ্ঠতা। একটি হাদীছে কুদসীতে এসেছে, "ইখলাস বা একনিষ্ঠতা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার অন্তরে প্রক্ষেপিত একটি রহস্য, যা তিনি তাদেরকেই দেন যাদের তিনি ভালোবাসেন।” নবী এর একটি বিখ্যাত হাদীছে এসেছে,
"নিশ্চয়ই নিয়্যাতের ওপর আমলসমূহ নির্ভরশীল। প্রত্যেকেই তা পাবে যার নিয়্যাত সে করেছে। সুতরাং যে আল্লাহ ও রাসূলের জন্য হিজরত করেছে তাঁর হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই। যে জাগতিক স্বার্থোদ্ধার কিংবা কোনো মহিলাকে বিবাহের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যের তরেই, যার জন্য সে হিজরত করেছে।" (বুখারী ও মুসলিম)
কেউ কেউ ব্যবসা ও বিবাহের স্বার্থে হিজরত করেছিলো, তারা তাদের নিয়্যাত অনুসারে ফলাফল পাবে। তবে সাহাবীরা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল ও তাঁর রাসূলকে সহায়তা করার জন্যই হিজরত করেছিলেন। আর তাদের প্রতিদানও তাদের নিয়্যাত অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে। আল্লাহ তাঁদের প্রতিদান সম্পর্কে জানাচ্ছেন,
وَالسَّبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهْجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَنٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنْتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।"
বিশুদ্ধ নিয়্যাত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইখলাসবিহীন আমল প্রদর্শনমাত্র, এর উদ্দেশ্য হয় মানুষকে খুশি রাখা, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা নয়। মানুষকে খুশি করার জন্য ইবাদাত করা এক প্রকারের শিরক ও নিফাক। আল্লাহ মুনাফিকদের বর্ণনা দিতে যেয়ে বলেছেন,
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ يُخْدِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَدِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلوةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
"নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়-কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।"
আখিরাতে যারা সর্বাধিক শাস্তি পাবে তারা হচ্ছে
الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُوْنَ
"যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে।"
প্রতিটি কাজই সঠিক নিয়্যাত নিয়ে করতে হবে। প্রতিটি কাজের শুরুতেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া উচিত এই যে, সাদাকা দিচ্ছি, হজ্জ করছি, অন্যকে সাহায্য করছি, সালাত আদায় করছি, উপকারী বইপত্র পড়ছি-এতকিছু কিসের জন্য? নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আমরা পানাহার, কাজ-কারবার করা, বিবাহশাদি করা, ভ্রমণ করা, বেচাকেনাসহ আমাদের দৈনন্দিন জাগতিক অভ্যাসাদি ও কর্মকাণ্ডকে ইবাদাতে পরিণত করতে পারি।
যেমন-কেউ শুধুমাত্র ক্ষুধা নিবারণের জন্যই নয়; বরং এর পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদাতের জন্য শক্তিসামর্থ্য অর্জনের জন্যও খেতে পারে, তখন খাওয়ার মত নিতান্ত জাগতিক কাজও ইবাদাতে পরিণত হবে। ভালো দেখানোর জন্য পোশাক পরাতে কোনো দোষ নেই, তবে যদি আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ ও শিষ্টাচার প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কেউ পোশাক পরে তবে এই কাজটি ইবাদাতে রূপ নেবে। আমরা বেতন পাবার জন্য কাজ করতে পারি, তবে যদি এর পেছনে সাদাকা দেওয়া, হজ্জ করা কিংবা পরিবারের ভরণপোষণ বহন করার নিয়্যাতও যুক্ত থাকে তবে এই কাজটিই ইবাদাতে পরিণত হবে। বিশুদ্ধ নিয়্যাত যেমন জাগতিক কাজকর্মকে ইবাদাতে পরিণত করে, তেমনি তা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির যাত্রায় এগিয়ে যেতেও সহায়তা করে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময় সালাত আদায়, যাকাত দান এগুলোর মাধ্যমেই কেবল ইবাদাত করে থাকেন; তারা আল্লাহর পথে আরও বেশি অগ্রসর হতে পারতেন যদি দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোকে কীভাবে ইবাদাতে পরিণত করতে হয় সেই সম্পর্কে জানতেন।
এক সূফী ইমাম তাঁর ছাত্রদের সাথে বসা ছিলেন। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন। দরজা খোলার আগে তিনি ছাত্রদের বেশ কয়েকটি নিয়্যাতের কথা উল্লেখ করলেন। যদি দরজা খুলে কোনো হতদরিদ্র ব্যক্তিকে পাওয়া যায় তবে আমরা তাকে সাদাকা দেবো, যদি অভাবী কেউ আসে তবে তাকে সাহায্য করবো, পথহারা কোনো মুসাফির দেখতে পেলে তাকে পথ দেখিয়ে দেবো, কোনো ছোট বাচ্চা হলে তার প্রতি সদয় হবো, কোনো ছাত্র হলে তাকে শেখাবো। দরজা খোলার মত একান্ত ক্ষুদ্র একটি কাজও বিশুদ্ধ নিয়্যাতের জোরে ইবাদাতে পরিণত হলো!
আল্লাহর কাছে দুআ করি যেন তিনি আমাদেরকে আন্তরিক একনিষ্ঠতা দান করেন, আমাদের অভ্যাসগুলোকে ইবাদাতে পরিণত করার তাওফীক দেন এবং কেবল তাঁর জন্যই জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেন।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.
"বলো, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ শুধু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।"

টিকাঃ
১. (সূরা তাওবা, ৯:১০০)
২. (সূরা নিসা, ৪:১৪২)
৩. (সূরা মাউন, ১০৭:৬)
১. সূরা আনআম, ৬:১৬২-১৬৩।

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 পঞ্চম পদক্ষেপ : তাফাক্কুর

📄 পঞ্চম পদক্ষেপ : তাফাক্কুর


"নিজের অস্তিত্বকে নিষ্প্রভতার গর্ভে রোপণ করে দাও, কেননা যে বীজকে মাটিতে বপন করা হয় না তা কখনোই ফসল দিতে পারে না। অন্তরের জন্য উযলাহ বা বিচ্ছিন্নতার চাইতে অধিক উপকারী আর কিছুই হয় না, কেননা এর মাধ্যমেই চিন্তা- উপলব্ধির অবস্থায় প্রবেশ করা যায়।"
প্রাণীজগতের অন্যান্য প্রজাতির মত মানুষও এক ধরণের প্রাণী- এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে মানুষ কেবলমাত্র পাশবিক গুণসমৃদ্ধ কোনো প্রাণী নয় বরং মানুষ মানুষ। মানুষের 'মানুষ' হবার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের চিন্তাশক্তি। সৃজনশীল চিন্তাশক্তিই মানুষকে প্রাণীজগতের অন্যান্যদের চাইতে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন করেছে। চিন্তাশক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য অনেক বড় এক নিআমত। মানুষ সর্বদাই এক চিন্তার স্রোতের মাঝে আবর্তিত হতে থাকে। চিন্তা মানুষের সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত যে একে মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্ব থেকে কোনোমতেই পৃথক করা সম্ভবপর নয়, কেননা এমন কোনো সময় নেই যখন মানুষ কিছু না কিছু না ভাবছে।
চিন্তার এই জাল মানুষের গোটা সত্তাকে ছেয়ে আছে। এই চিন্তাই মানুষের বিশ্বাস, বিশ্বদৃষ্টি, মূল্যবোধ গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখে। আর এ কারণে যেকোনো পরিবর্তন চিন্তা থেকেই শুরু হয়। যে পরিবর্তন চিন্তার মূলকে পরিবর্তন করতে পারে না, তা গোটা সত্তার সাথে একাঙ্গীভূত হতে পারে না। চিন্তা সঠিক হলে মানুষের বিশ্বাস পরিশুদ্ধ হয়, কর্ম সঠিক দিশা পায়, বিচার শক্তিশালী হয়। ইসলাম চিন্তাকে সত্যাশ্রয়ী করতে চায়, চিন্তাকে বিশুদ্ধ ও বাস্তবতার মূলের সাথে জুড়ে দিতে চায়। মানুষের প্রতিটি কর্ম হোক গভীর বুঝ সহকারে, এই বোধ বা বুঝ হবে তার বিশ্বাসের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশ্বাস হবে সঠিক চিন্তার ওপর স্থাপিত এবং এই চিন্তা থাকবে বাস্তবতার হৃদস্পন্দনের সাথে যুক্ত- এমনটাই ইসলামের কামনা।
আল্লাহর পথে যাত্রার জন্য প্রতি পদে পদেই প্রয়োজন গভীরতর বুঝ ও শক্তিশালী হৃদয়ের। আমরা এর আগে যেসকল বিষয়-অর্থাৎ, তাওবা, আশা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও ইখলাস-আলোচনা করেছি এগুলো সঠিকভাবে বোঝার জন্যও প্রয়োজন গভীর অভিনিবেশের। আর এটা সম্ভব তাফাক্কুর বা উপলব্ধির মাধ্যমে। তাফাকুর এক মহান ইবাদাত যা ব্যক্তিকে আল্লাহর দিকে অগ্রসর করে দেয় এবং আধ্যাত্মিকতার বুঝ পেতে সাহায্য করে। নবী এর দিকে সম্বোন্ধিত করে বলা হয়ে থাকে যে, "এক ঘণ্টার তাফাকুর ষাট বছরের ইবাদাতের চাইতেও উত্তম", এই হাদীছ সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল হলেও অর্থের দিক থেকে তা অনেকটাই সঠিক, কেননা যে আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তাফিকির করছে সে আসলে সুস্পষ্ট জ্ঞান, ঐকান্তিক অনুভূতি ও আত্মিক আলো সহকারে আল্লাহর ইবাদাতই করছে!
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
"নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে। যারা দণ্ডায়মান, বসা ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে (বলে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তা বৃথা সৃষ্টি করেননি, আমরা আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করি, অতএব আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।"
অনেকের কাছে আকাশ ও পৃথিবীর নানা ঘটনাবলীর ব্যাপারে গাদাগাদা তথ্য থাকে; রাত কীভাবে আসে, দিন কীভাবে যায়, সাগরের পানি কখন ও কেন কমে, চাঁদের আকার কেন কনে বাড়েসহ নানা তথ্য তাদের কাছে থাকে। কিন্তু এত তথ্য তাদের উপলব্ধিশক্তি বাড়ায় না। কেননা, তারা কেবল বুদ্ধি দিয়ে তা বিবেচনা করে, অন্তরাত্মার উর্ধ্বতন বুদ্ধি দিয়ে এত কিছুর পেছনে কার্যকর মহাশক্তিকে উপলব্ধি করতে পারে না বা উপলব্ধি করার চেষ্টাও করে না। কিন্তু যারা এসকল তথ্য অন্তর দিয়ে বিবেচনা করে তারা এর পেছনে এক অসীম শক্তিকে চিনে নিতে পারে। সৃষ্টির বিপুলতার মাধ্যমে তারা স্রষ্টার মহত্ত্ব ও বড়ত্ব অনুভব করতে পারে। তখন তারা স্বতস্ফূর্তভাবেই বলতে বাধ্য হয়, আপনি এসকল কিছু অনর্থক সৃষ্টি করেননি, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক বড় উদ্দেশ্য সুপ্ত রয়েছে।
তাফাকুরের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিস্ময়াবিষ্টতা বৃদ্ধি পায়।
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ.
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল তারাই আল্লাহর প্রতি ভীতবিহ্বল যারা (সত্যিকারার্থেই তাঁকে) জানে।”১
ইবনু আতা তাফাকুরের সাহায্যার্থে বলেছেন,
"নিজের অস্তিত্বকে নিষ্প্রভতার গর্ভে রোপণ করে দাও, কেননা যে বীজকে মাটিতে বপন করা হয় না তা কখনোই ফসল দিতে পারে না।"
এখানে ইবনু আতা নিষ্প্রভতার জন্য 'খুমুল' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার আভিধানিক অর্থ অলসতা, নিষ্ক্রিয়তা, জড়তা, দুর্বলতা, অবসাদ, উদাসীনতা, অখ্যাতি ইত্যাদি। ইবনু আতা'র উদ্দেশ্য নিজেকে পৃথক ও আলাদা করে নেওয়া। নিজেকে পৃথক করে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত সামাজিকতা, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গ-সাহচর্য থেকে আলাদা করে নেওয়া। এর উদ্দেশ্য নিজেকে সময় দেওয়া, নিজের চূড়ান্ত গন্তব্যের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনায় মগ্ন হওয়া, আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে অভিনিবেশ করা, নিজের আমল ও সামগ্রিকাবস্থা যাচাই করা, একনিবিষ্ট হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করা। অন্তরাত্মাকে সত্যের আলোয় আলোকিত ও একনিবিষ্ট করতে হলে এরূপ পৃথকতার কোনো বিকল্প নেই।
মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা কিংবা জাগতিক কাজকর্মে অতিরিক্ত পরিমাণে নিযুক্ত হয়ে গেলে মানুষ নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাতের আহ্বানকে অগ্রাহ্য করতে থাকে। এভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও সংযুক্তি ঢিলে হয়ে যায়। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় হয়ত অন্তর পুরোপুরিই মৃত্যুবরণ করে। এরূপ মৃত অন্তর নিয়ে শরীর ইবাদাত করতে পারে, ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানও পালন করতে পারে, কিন্তু সেই ইবাদাত তাঁকে উর্ধ্বজগতের সাথে যুক্ত করে না, নিজেকে পরিশুদ্ধ করে না, নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিশীলিত করে না। এহেন অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে, অন্তরকে পুনর্জীবিত করতে চাইলে, ফিতরাতকে স্থিত করতে চাইলে, অন্তরকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাতের দিকে পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে আসার মত অবকাশ দিতে হবে। আর এর বড় একটি উপায় হচ্ছে জগতের 'শোরগোল' থেকে কিছুটা সময় বিচ্ছিন্ন করে নিজের প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
এরূপ উযলাহ বা নিঃসঙ্গতার বৈধতার ভিত্তিও ইসলামে আছে। ই'তিকাফ আল্লাহর নৈকট্য পাবার অনেক বড় মাধ্যম। এটা এক প্রকারের বিচ্ছিন্নতা, কেননা ইতিকাফ মানেই হচ্ছে ঘর-সংসার, স্ত্রী সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করে নেওয়া। মৌলিক উদ্দেশ্য একমনে আল্লাহর ইবাদাত করা, তাঁর আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা। গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদের ফযীলতের কথাও সুবিদিত, এটাও এক প্রকার বিচ্ছিন্নতাই। বিচ্ছিন্নতা ঘুম থেকে, শরীরের আরাম থেকে, জীবনসঙ্গীর উষ্ণ ছোঁয়া থেকে। মৌনতার উপকারীতা ও এর প্রতি উৎসাহের কথাও আমাদের সবার জানা, এটাও দুনিয়ার শোরগোল থেকে সচেতনভাবে নিজেকে পৃথক রাখা, মানে এটাও এক প্রকারের বিচ্ছিন্নতাই বটে। এ কারণে কিছু কিছু বিচ্ছিন্নতা ইসলাম অনুমোদিত বরং প্রশংসিত। তবে এই বিচ্ছিন্নতার মানে যদি হয় নিজেকে ঘর, সংসার, সমাজ, সামাজিকতা থেকে একেবারে আলাদা করে নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া-তবে তা মোটেও ইসলাম অনুমোদিত নয়, আর এমনটা ইসলামের উদ্দেশ্যের সাথেও যায় না। পূর্বোক্ত অর্থেই অনেক সূফীরা 'উযলাহ' বা বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। যদিও এক্ষেত্রে তাদের অনেকের দ্বারাই বাড়াবাড়ি হয়েছে, তবে এর মৌলিক উদ্দেশ্য তা-ই যা ওপরে বর্ণিত হয়েছে। জগত থেকে পরিপূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া অর্থে পৃথকতা মোটেও ইসলামের কাম্য নয়। নবী বলেছেন,
لَا رُهْبَانِيَّةً فِي الْإِسْلَامِ
"ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই।"
তিনি আরও বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ الَّذِي يُخَالِطُ النَّاسِ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ ، أَفْضَلُ مِنَ الْمُؤْمِنِ الَّذِي لَا يُخَالِطُ النَّاسَ وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ.
“যে মুসলিম মানুষের সাথে মেলামেশা করে ও তাদের দেওয়া কষ্ট সহ্য করে সে তার থেকে উত্তম যে মেলামেশাও করে না, তাদের দেওয়া কষ্টে সবরও করে না।”
কোনো কিছুকে আলোকমণ্ডিত হয়ে দুনিয়ার বুকে প্রকাশিত হতে হলে তাকে নির্দিষ্ট সময় যাবত অন্ধকারের বুকে লুকিয়ে থাকতে হয়, এটাই জগতসংসারের সাধারণ নিয়ম, দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার মৌলিক একটি মূলনীতি। বটবৃক্ষ তখনই সুবিশাল ছায়াদার আশ্রয়ে পরিণত হতে পারে যখন তার বীজ মৃত্তিকার আঁধারে লুকিয়ে থাকে। অসংখ্য সম্ভাবনাময় মানুষকেও কর্মময় পৃথিবীতে এসে নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের আগে নির্দিষ্ট সময় যাবত মায়ের গর্ভে থাকতে হয়। আলো পেতে হলে অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে প্রস্তুত হতে হয়, ফলদায়ী বৃক্ষকেও মাটির ভেতরের অন্ধকার চিরে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়, পরিচিতির আগে নিঃসঙ্গতাকে বরণ করতে হয়, পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিতে হলে ধৈর্য্য সহকারে নির্দিষ্ট কাজে স্থবির রাখতে হয়। মানুষের মত মহান সৃষ্টিকেও নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে নিজেকে সময় দিতে হয়।
অন্ধকার, নীরবতা, নিঃসঙ্গতার গর্ভে নিজের অস্তিত্বকে রোপণ করার মাধ্যমেই সৃষ্টি থেকে স্রষ্টার দিকে রওয়ানা হতে পারে; চারপাশের ব্যস্ততা ও উদাসীনতার কলুষতা থেকে আত্মাকে পবিত্র করতে পারে; নিছক তথ্য, নিদর্শন, নিয়মনীতি ও আচারনুষ্ঠানের স্তর থেকে উর্ধ্বতন উদ্দেশ্য, অর্থ ও প্রজ্ঞার স্তরে উন্নীত করতে পারে। এভাবেই সে আল্লাহর সাথে বিলুপ্তপ্রায় সম্পর্ককে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়, আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। এ এমন এক নিয়ম যা পরিবর্তন বা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। পৃথকতা ও নীরবতার এ সময়েই চিন্তা প্রখর ও শানিত হয়, উপলব্ধি সঠিক পথ পায়, অনুভূতি সত্যের পথে অগ্রসর হয়, বিচ্ছিন্ন তথ্যের স্তূপ থেকে প্রজ্ঞার জ্যোতি পাওয়া যায়। ইবনু আতা বলছেন,
مَا نَفْعُ الْقَلْبِ مِثْلُ عُزْلَةٍ يَدْخُلُ بِهَا مَيْدَانَ فِكْرَةٍ.
অন্তরের জন্য উযলাহ বা বিচ্ছিন্নতার চাইতে অধিক উপকারী আর কিছুই হয় না, কেননা এর মাধ্যমেই চিন্তা-উপলব্ধির অবস্থায় প্রবেশ করা যায়।

টিকাঃ
১. (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৯০-১৯১)
১. (সূরা ফাতির, ৩৫:২৮)
১. বায়হাকী

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 ষষ্ঠ পদক্ষেপ : আগে পরিশুদ্ধি, তারপর সাজসজ্জা

📄 ষষ্ঠ পদক্ষেপ : আগে পরিশুদ্ধি, তারপর সাজসজ্জা


“কিন্তু অন্তর কীভাবে আলোকিত হতে পারে যখন তাতে সৃষ্টির চিত্র আচ্ছাদন করে আছে? কীভাবে অন্তর আল্লাহর দিকে যাত্রা করতে পারে যখন তা কামনা-বাসনার দ্বারা শৃঙ্খলিত হয়ে আছে? উদাসীনতা ও বিস্মৃতির কলুষতা থেকে মুক্ত না হয়ে অন্তর কীভাবে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হতে পারে?”
উপলব্ধি ও অভিচিন্তনের মাধ্যমে মুমিনের অন্তরে ঈমানের নূর প্রজ্জ্বলিত হয়। কিন্তু অন্তর আয়নার মত, এ কারণে অন্তরকে চকচকে হতে হলে আগে একে সকল প্রকার অনাকাঙ্খিত দাগ, ধূলিময়লা থেকে পরিশুদ্ধ হতে হবে। এ কারণে ইবনু আতা বলছেন,
"অন্তরের জন্য উযলাহ বা বিচ্ছিন্নতার চাইতে অধিক উপকারী আর কিছুই হয় না, কেননা এর মাধ্যমেই চিন্তার অবস্থায় প্রবেশ করা যায়। কিন্তু অন্তর কীভাবে আলোকিত হতে পারে যখন তাতে সৃষ্টির চিত্র আচ্ছাদন করে আছে? কীভাবে অন্তর আল্লাহর দিকে যাত্রা করতে পারে যখন তা কামনা-বাসনার দ্বারা শৃঙ্খলিত হয়ে আছে? উদাসীনতা ও বিস্মৃতির কলুষতা থেকে মুক্ত না হয়ে অন্তর কীভাবে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হতে পারে?"
অর্থাৎ, অন্তরকে আলোকিত করতে চাইলে আগে তাকে পঙ্কিলতামুক্ত করতে হবে। ইবনু আতার ভাষায় সেসকল পঙ্কিলতা হলো-সৃষ্টির চিত্র, কামনা-বাসনা ও উদাসীনতা।
সূফীদের ভাষায় আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল কিছুকে বলা হয় 'আল-আগইয়ার' বা অন্যকিছু। অন্তরে যখন আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছু-তা হতে পারে জাগতিক বস্তু, মানুষ, পরিবার, বন্ধুবান্ধব-বাসা বাঁধে এবং একমাত্র তা-ই যখন বদ্ধমূল চিত্রের মত অন্তরকে আচ্ছাদিত করে রাখে সেই অন্তর কীভাবে আল্লাহকে চিনতে পারে? তার মানে এই নয় যে আমরা জাগতিক কাজকর্ম, পরিবার, সম্পদ ও চাকরি-বাকরি পরিত্যাগ করবো। মূল বিষয় হচ্ছে আমাদের দৃষ্টি কোনদিকে? আমরা কীসের প্রতি মনোযোগী? আমাদের অন্তর কীসের ও কার চিন্তায় বিভোর? আমাদের অন্তর যদি সৃষ্টির প্রতি মনোযোগী থাকে, সৃষ্টির ধ্যানজ্ঞানে বিমোহিত থাকে তবে সেই অন্তর তো আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
অন্তরের দ্বিতীয় কলুষতা উল্লেখ করতে যেয়ে ইবনু আতা কামনা-বাসনার কথা উল্লেখ করেছেন। ইসলাম মৌলিকভাবে কামনা-বাসনা চরিতার্থের বিরোধী নয়। ইসলাম কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে নিষেধও করে না। আল্লাহ নিজেই মানুষের মাঝে কামনা-বাসনা প্রোথিত করে দেবেন তারপর সেই কামনা-বাসনাকে একেবারে পদদলিত করতে নির্দেশ দেবেন-এ ধরণের অযৌক্তিক নির্দেশ দেবার কথা আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তাই করা যায় না। আল্লাহ এমন কোনো কিছুকেই পুরোপুরি অবদমন করতে নির্দেশ দেন না যা আমাদের মৌলিক স্বভাবের অন্তর্গত, যেমন-খাওয়া, পান করা, বিবাহ, যৌনকর্ম, কথা বলা, হাসিঠাট্টা ইত্যাদি। ইসলাম এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সীমার মাঝে এমনভাবে পরিশীলিত করতে চায় যাতে তা মানুষের নৈতিক সত্তাকে উন্নত করে, নৈতিকতার উচ্চ সীমায় পৌঁছার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। ইসলাম খাবার খাওয়াকে নিষেধ করে না, নিষেধ করে অপচয়, অতিরিক্ত পানাহার ও এর পেছনেই দিবানিশি ব্যয় করা। তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পানীয় পান করাতে ইসলামের কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু যখন তা মদ বা নেশাদায়ক পানীয় হবে তখন তা মানুষের নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকারক। যৌনকর্ম একদিক থেকে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য, তেমনি নারী-পুরুষের স্বাভাবিক ও সাধারণ স্বভাবজাত আকর্ষণের দিক থেকেও তা অনিবার্য, তবে ইসলাম অবাধ যৌনতাকে হারাম করেছে, এর স্থলে বিবাহের মাধ্যমে যৌনতাকে প্রশংসিত স্থান দিয়েছে। কথা বলাটা মানুষের স্বভাব, তাই ইসলাম একে অবদমন করতে চায় না, ইসলাম চায় কথা যাতে মিথ্যাশ্রিত না হয়ে সত্যাশ্রিত হয়, কথার পরিমাণ যাতে মাত্রা অতিক্রম না করে, কথার মাধ্যমে যাতে অশ্লীলতা ও পাপাচার না ছড়ায়, এমন কথা বলা যা আল্লাহর নিকটবর্তী করবে।
এসকল স্বভাব, চাহিদা, কামনা-বাসনা যখন ইসলাম অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে যায়, যখন মানুষ শিশ্লোদরবৃত্তিতে নিমজ্জিত হয়, পেট ও লজ্জাস্থানের দাস হয়ে যায়, তখনই তা নৈতিক সত্তার পবিত্রতা বিনষ্ট করে ফেলে, অন্তরের আয়নাকে অপরিচ্ছন্ন করে দেয়। এরূপ মরচে পড়া অন্তর নিয়ে আল্লাহকে পাওয়া সম্ভব নয়।
অন্তরের তৃতীয় যে ত্রুটির দিকে ইবনু আতা নির্দেশ করেছেন তা হলো উদাসীনতা। আল্লাহ বান্দার নিকটবর্তী।
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
“আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। ঘাড়ের শিরার চেয়েও আমি তার কাছে রয়েছি।”১
আল্লাহ তো সকল বান্দারই নিকটেই আছেন, তবে বান্দা আল্লাহর উপস্থিতি বা নৈকট্য অনুভব করতে পারে না। কোন জিনিস তাকে আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করতে বাধা দেয়? ইবনু আতার ভাষায় তা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃতি ও উদাসীনতা।
উদাসীনতা এক ধরণের চিন্তাগত অলসতা বা শৈথিল্য। এমন অবস্থায় অন্তর ভাবলেশহীন একপ্রকার মৃতশরীর কিংবা জড় পদার্থের মত হয়ে যায়। উদাসীনতাকে দূর করার উপায় অন্তরে সঠিক ভয়টাকে প্রতিস্থাপিত করা। কেননা সঠিক ভয়ই পারে অন্তরের শৈথিল্যকে দূর করতে, অন্তরকে রোগমুক্ত করতে এবং একমাত্র সঠিক ভয়ই পারে অন্য সকলপ্রকার ভয় থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখতে।
সেই সঠিক ভয়টি হলো এই চিন্তা মনের মধ্যে জাগিয়ে রাখা- জগতের প্রতিভাসের পেছনে যে এক পরম বাস্তবতা আছে তা আমি ভুলে যাচ্ছি কিনা, আমি সত্য বাদে মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরছি কিনা, আমার জীবন অনর্থক ও অহেতুক এক বোঝায় পরিণত হচ্ছে কিনা, বা।।আমি স্থায়ীত্ব থেকে অস্থায়ীত্বকে অধিক ভালোবেসে ফেলছি কিনা, নম্বরকে প্রাধান্য দিতে যেয়ে অবিনশ্বরকে ছুঁড়ে ফেলছি কিনা, এমনটা হচ্ছে নাকি যে আমি পৃথিবীর কোনো কাজেই আসছি না, আমার সময়গুলো বেহুদা ব্যয় হচ্ছে কিনা।
এই উদাসীনতাই সত্য থেকে দূরে রাখে, পরম বাস্তব আল্লাহর উপলব্ধি থেকে বিচ্যুত রাখে। এর থেকে মুক্তি পাবার আরেকটি বড় দাওয়াই হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে আলোকিত করে। আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃত হলে অন্তরাত্মা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আল্লাহর স্মরণ মানে পরম সত্যের স্মরণ, জীবনের সঞ্জীবনী রস।
প্রত্যেক মুসলিমেরই নির্দিষ্ট একটি সময় নিরিবিলি ও একনিবিষ্ট মনে আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত করা উচিত। সময় নেই-এ কথা বলে অযুহাত দেওয়া কমপক্ষে যিকরের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়, কারণ যিকর এমন একটি ইবাদাত যা শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে যেকোনো অবস্থায়ই করা যায়। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উপায়ে চেষ্টা-সংগ্রাম করতে করতেই মুমিনের অন্তর ধীরে ধীরে আলোকিত হতে থাকে, মহান আল্লাহর নূর থেকে।
اللهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَضْرِبُ اللهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ.
"আল্লাহ হলেন আকাশ ও পৃথিবীর নূর। তাঁর নূরের উপমা এরকম; যেন একটি দীপাধার, যাতে একটি প্রদীপ আছে। প্রদীপটি একটি কাঁচের (পাত্রের) মধ্যে। কাঁচটি যেন একটি উজ্জ্বল তারকা। প্রদীপটি একটি বরকতময় যাইতুন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়। প্রদীপটিতে আগুনের স্পর্শ ছাড়াই ঐ গাছের তেল উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দেয়। নূরের ওপর নূর। আল্লাহ যাকে চান তাকে নূরের পথ দেখান। আলাহ সবকিছুই ভালোভাবে জানেন।”১
আয়াতে উল্লেখিত প্রদীপটি মুমিন বান্দার বক্ষদেশের সাথে তুলনীয়। এই প্রদীপের ভেতরে আছে কাঁচ। অত্যন্ত ভঙ্গুর, স্পর্শকাতর তবে অতীব স্বচ্ছ সেই কাঁচ। এই কাঁচটি হচ্ছে মুমিনের অন্তর বা ক্বলব। মুমিন এই কাঁচের স্বচ্ছতার মাধ্যমে সত্য দর্শন করে থাকে। সত্য দর্শনের এই আয়না নানা প্রকার কলুষতায় যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন তখন তা আর আলো প্রত্যক্ষ করতে পারে না। এ কারণে সত্য দর্শন করতে, অন্তরকে আলোকময় পথে ভ্রমণ করানোর জন্য আগে অন্তরকে ধূলিময়লামুক্ত করে সত্যের পথের পথিক হবার যোগ্য ও প্রস্তুত করে তুলতে হবে।

টিকাঃ
১. (সূরা কফ, ৫০:১৬)
১. (সূরা নূর, ২৪:৩৫)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 সপ্তম পদক্ষেপ : সময় ব্যবস্থাপনা

📄 সপ্তম পদক্ষেপ : সময় ব্যবস্থাপনা


“অবসর পাওয়ার আগ পর্যন্ত উত্তম আমল স্থগিত রাখা লঘুচিত্ততার লক্ষণ।”
আমরা অনেক সময়ই আগামীকাল, আগামী সপ্তাহ, আগামী মাস কিংবা আগামী রমাদান, বিয়ে করার পর, প্রোমোশন পাবার পর, বাচ্চারা বড় হয়ে যাবার পরের সময়গুলোর জন্য ভালো কাজগুলোকে তুলে রাখি। এটাই ইবনু আতার ভাষায় 'লঘুচিত্ততা ও অপরিপক্বতা'র লক্ষণ। আসলে ভালো আমল করা মোটেও সময় পাবার কোনো বিষয় না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের জন্যই কম বা বেশি কিছু না কিছু সময় তো বরাদ্দ থাকেই। আসল বিষয় হচ্ছে প্রাধান্যতা, অগ্রাধিকার; আমি কোন কাজকে প্রাধান্য দিচ্ছি, কোন কাজটা আগে করছি। মানুষ তার নির্ধারিত সময়ে সেই কাজই আগে করে যাকে সে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। দেখার বিষয় প্রত্যেকে যার যার নির্ধারিত সময়ে কি করেছে, কোন কাজকে প্রাধান্য দিয়েছে। কেননা-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকেই সাধ্যাতীত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেন না।”১
মনে করুন ফরয সালাতের সময় শেষ হবার আগে আপনার হাতে পাঁচ মিনিট সময় বাকী আছে। আপনি এই পাঁচটি মিনিট সময় যেকোনোভাবেই কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু মুসলিম হিসেবে আপনার কাছে সালাত সর্বাগ্রাধিকার পাবার যোগ্য। এ কারণে আপনার ওপর আবশ্যিক হলো আপনি এই পাঁচ মিনিটে ফরয সালাত পড়ে নেবেন। হ্যাঁ, যদি কোনো কঠিন পরিস্থিতি সামনে এসে পড়ে সেক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। যেমন-আপনি দেখছেন কেউ পানিতে ডুবে যাচ্ছে কিংবা কোনো অন্ধ ব্যক্তি গাড়ির সামনে পড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে-সেক্ষেত্রে আপনি সালাত না পড়ে তাদেরকে সাহায্য করতে যেতে পারেন, যেহেতু জীবন-মরণের সমস্যা। কিন্তু সাধারণাবস্থায় মুমিনের কাছে সালাতের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। এভাবে মুমিনের কাছে প্রতিটি কাজই গুরুত্বানুযায়ী অগ্রাধিকার পাবে।
ভালো কাজে বিলম্ব করা আখিরাতে আফসোসের কারণ হবে।
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ. لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا .
“অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, 'প্রভু! আমাকে দুনিয়ায় ফেরত পাঠিয়ে দিন' যাতে আমি যা রেখে এসেছি সেখানে (দুনিয়ার জীবনে) ভালো কাজ করতে পারি। কিছুতেই তা হবার নয়...."১
এ কারণে বিলম্বকরণ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক মুমিনেরই উচিত জীবনের সময়গুলোকে সর্বোত্তমভাবে বিনিয়োগ করা। যে যতটা কার্যকারীতার সাথে সময় ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন করতে পারবে সে সাফল্যের প্রতিযোগীতায় এগিয়ে থাকবে ইন শা আল্লাহ, দুনিয়া ও আখিরাতে, উভয় জগতেই।। সময় ব্যবস্থাপনা জাগতিক কাজর্কমের জন্য যতটা না গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক, তার চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক দীনের কাজ ও ভালো আমল করার ক্ষেত্রে। হাঁটা, বাস-ট্রেন-গাড়িতে চড়ার সময়গুলোকে উত্তমভাবে কাজে লাগান। কুরআতের তিলাওয়াত শুনুন, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করুন, মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করুন। এমন অনেক ভাই ও বোন আছেন যার বাস ও ট্রেনের সময়কে কাজে লাগিয়ে গোটা কুরআন মুখস্ত করেছেন। হিসাব করে দেখা যায় প্রত্যেক দিন দেড় ঘণ্টা সময় দিলেই দু'বছরে সম্পূর্ণ কুরআন হিফয করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে দেখা যায় বাস-ট্রেনগুলোতে হৈ-হুল্লোড় কম থাকে। কেননা, প্রত্যেকেই নিজের মত করে অধ্যয়ন, লেখালেখি কিংবা চিন্তা করতে ব্যস্ত থাকে, এমনকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও। মুমিনদের জন্য সময় অন্য যে কারো চাইতে অনেক অনেক গুণ বেশী দামী। কারণ, মুমিন এই সময়ই মহাকালের অফুরন্ত জমিতে রোপন করে, এর ফলাফলই সে পরকালে পাবে। সুতরাং যে কিছুই রোপণ করতে পারেনি, সে পরকালে উপকৃত হবার মত কোনো ফসলই পাবে না। সেদিন তার আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। এ কারণে মুমিনের উচিত গুরুত্বানুযায়ী বিভিন্ন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিজের সময়কে সাজিয়ে নেওয়া।

টিকাঃ
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৮৬)
১. (সূরা মুমিনুন, ২৩:৯৯-১০০)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00