📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 দ্বিতীয় পদক্ষেপ : আল্লাহর সুন্নাতের খেয়াল রাখা

📄 দ্বিতীয় পদক্ষেপ : আল্লাহর সুন্নাতের খেয়াল রাখা


"একজন মানুষ, তার ইচ্ছাশক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে কখনোই ভাগ্যের দেয়াল ভেদ করতে পারবে না।"
নিজেদের অজস্র গুনাহ সত্ত্বেও আমরা আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে এই যাত্রা শুরু করেছি। আমরা যেন কখনোই নিজেদের ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে আল্লাহর দয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেই। আল্লাহ ক্ষমাশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা একনিষ্ঠ তাওবা করবে আল্লাহ ততক্ষণ তাকে মাফ করবেন।
যাত্রার প্রথমদিকে আমাদের মনোবল দৃঢ় থাকে, উদ্যম থাকে পরিপূর্ণ। সে চেষ্টা করে নিজেকে, নিজের পরিবার ও সমাজকে, রাষ্ট্রকে এমনকি গোটা বিশ্বকে রাতারাতি পরিবর্তন করে ফেলতে। ইবনু আতা বলছেন, "একজন মানুষ, তার ইচ্ছাশক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে কখনোই ভাগ্যের দেয়াল ভেদ করতে পারবে না।" অর্থাৎ, মানুষ কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারবে না, তাকে ডিঙ্গিয়ে কোনো কাজ করতে পারবে না। আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য বা তাকদীরের মধ্যে তাঁর সুন্নাতসমূহও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজেই বলেছেন,
فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَبْدِيلًا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَحْوِيلًا.
"তুমি আল্লাহর সুন্নাতের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাবে না। তুমি আল্লাহর সুন্নাতের কোনো ব্যতিক্রম দেখতে পাবে না।”১
গোটা মহাবিশ্বই এভাবে সৃষ্টি হয়েছে,
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْتُهُ بِقَدَرٍ
"নিশ্চয়ই আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী।"২
আল্লাহর সুন্নাতের মধ্যে এটাও অন্তর্ভুক্ত যে, পৃথিবীতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত নির্দিষ্ট ফলাফলের দিকে পরিচালিত করে। কোনো মানুষই, হোক মুসলিম বা অমুসলিম, ভাগ্যের দেয়াল ভেদ করে সঠিক উপায়, পন্থা, পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করতে সক্ষম নয়। যেমন আল্লাহ বলছেন,
أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُوْلُوْا ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ. "মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?"১
এটা বিপদ ও পরীক্ষার সুন্নাত। যদি কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবী করে তবে আল্লাহ তাকে দুনিয়ার কিছু বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করবেন। ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি যতই মজবুত হোক না কেন সে এই সুন্নাতরুপী বিপদাপদকে প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। এটাই আল্লাহর অমোঘ বিধান।
পরিবর্তন ও বিবর্তনের নিয়মটিও আল্লাহর সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীতে যেকোনো পরিবর্তনের জন্য যথাযথ সময় প্রয়োজন। আল্লাহ সময়কে সৃষ্টি করেছেন, প্রত্যেকটি মানুষই নিজ নিজ জ্ঞানের স্তর থেকে এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। প্রত্যেকটি সৃষ্টিই সময় দ্বারা আবদ্ধ। সময় মানুষের জন্য এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। আল্লাহ নিজে সময়ের গণ্ডিমুক্ত, তবে তিনি সময় সৃষ্টি করেছেন এবং নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট ফলাফল হাসিল করতে হলে এর জন্য যথাযথ সময় অবশ্যই দিতে হবে।
আমরা এক মুহূর্তেই নিজেদের কিংবা বিশ্বকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারি না। আপনি হয়ত দ্রুত কুরআন মুখস্ত করে নিতে পারেন, হয়ত এক সপ্তাহ বা এক মাসের মধ্যেই, কিন্তু আশঙ্কা আছে এই কুরআন খুব দ্রুতই আপনার অন্তর থেকে বিদায় নেবে, কেননা এর স্থায়ীত্বের জন্য যে সময়ের প্রয়োজন তা আপনি দেননি, আগে আগেই তা অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। যারা হুটহাট করে পরিবর্তন হতে বা করতে চায় তারা অধিকাংশ সময়ই তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কোনো কোনো আলিম বলেছেন, “যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় আসার পূর্বেই কার্য সম্পাদন করতে চায় তার শাস্তিস্বরূপ তাকে সেই ফলাফল হাসিল থেকে বঞ্চিত করা হয়।" অর্থাৎ, বৃহত্তর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে সময়ের মত গুরুত্বপূর্ণ শর্তকে মাথায় না রেখেই কাজ করতে যায়, সে পরিবর্তন তো করতে পারেই না বরং আখেরে সবই হারাবে। এ কারণে আমাদের করণীয় হচ্ছে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাতের প্রতিও সজাগ্র খেয়াল রাখা।
ভাগ্যের দেয়ালের মধ্যে সেই জিনিসও অন্তর্ভুক্ত যাকে আলিমরা 'ওয়াজিবুল ওয়াক্ত' বা 'সময়ের আবশ্যকীয় দায়িত্ব' বলে আখ্যায়িত করেছেন। মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তর রয়েছে, প্রত্যেকটি স্তরেই মানুষকে বিভিন্নপ্রকার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। জীবনের এক পর্যায়ে বিবাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে অর্থোপার্জন করতে হয়। এর জন্য যথেষ্ট সময় ও চেষ্টা-তদবীরের দরকার হয়। অন্য সময় বাচ্চাকাচ্চা ও বয়োবৃদ্ধদের যত্ন নিতে হয়, তাদের দেখভাল করতে হয়। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে আপনার সন্তানরা হয়ত স্বাধীন হয়ে গেলো, আপনারও হয়ত অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আছে, কিন্তু বর্তমান অবস্থার চাইতে আরেকটু ভালো অবস্থানে যেতে হলে বা বড় কোনো উদ্দেশ্য সাধন করতে গেলে আপনাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হতে পারে। জীবনের একটি পর্যায়ে হয়ত আপনাকে জ্ঞানার্জনের জন্য ভ্রমণ করতে হতে পারে, আবার কখনো কখনো শারিরীক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ বিরতিও নিতে হতে পারে। এর কোনোক্ষেত্রেই মানুষ ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারে না। অসুস্থতার সময় আপনি তাগড়া জোয়ানের মত আচরণ করতে পারেন না। সত্তর বছরের বুড়ো হয়ে আপনি চল্লিশ বছরের প্রৌঢ়ের মত আচরণ প্রদর্শন করতে পারেন না।
আল্লাহর পথে যাত্রার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আল্লাহ আপনাকে যা দেন বা আপনার থেকে যা কেড়ে নেন মনে রাখবেন এর পেছনে আল্লাহর কোনো না কোনো প্রজ্ঞা লুক্কায়িত আছে। এ কারণে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাত ও তাকদীরের কাছে আত্মসমর্পণ করা।
আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা হচ্ছে যে, যেকোনো কাজ সম্পন্ন করার পর আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে, ইবাদাত ও তাঁর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি-শ্রদ্ধার মাধ্যমে। নবী-কেও কুরআনে এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَأَرْغَبْ
"অতএব যখনই অবকাশ পাবে, তখনই (আল্লাহর পথে) পরিশ্রম করবে এবং নিজের প্রভুর প্রতি মনোযোগী হবে।"১
আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনের সময়ও আমাদের স্তরে স্তরে আগাতে হবে। নবী বলেছেন,
إِنَّ هَٰذَا الدِّينَ مَتِينٌ، فَأَوْغَلُوا فِيهِ بِرِفْقٍ. "নিশ্চয়ই এই দীন (ধর্ম) দৃঢ়-কঠিন, তাই নম্রতার সাথে এতে প্রবেশ করো।"১
'অর্থাৎ, দীনের কাজগুলো হতে হবে ব্যক্তির সামর্থ্যের মধ্যে এবং তা ধীরস্থিরতার সাথে স্তরে স্তরে ও যথাযথ চর্চার মাধ্যমে নিজের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নিতে হবে। কেউই একদিনে দীনের সকল বিধান জেনে নিতে পারে না। রাতারাতি আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হতে পারে না। একদিনেই সত্যের নিগুঢ় বুঝ ও প্রজ্ঞা হাসিল করতে পারে না। এসবগুলোই অত্যন্ত ভারী ও কঠিন কাজ। এর জন্য যথাযথ সময় এবং তা হাসিল করার জন্য সঠিক উপায়-উপকরণ ও পদ্ধতি অবলম্বন করা একান্ত জরুরী।
ইমাম গাযালী রহ. বলেছেন,
"এর অর্থ হলো নিজের ওপর দীনের এমন কোনো বিধান চাপিয়ে নেওয়া যাবে না যা স্বভাবপরিপন্থী। একবারে শীর্ষে পৌঁছার চেষ্টা না করে ধারাবাহিকতা ও নম্রতার সাথে পরিবর্তনের চেষ্টা চালাতে হবে। এমনটা করা হলে মানুষের স্বভাব তাকে অস্বীকার করবে, স্বভাব এমনটা অপছন্দ করে। মন্দ স্বভাব দূর করার পদ্ধতি হলো ধীরে ধীরে তা দূর করতে হবে, যাতে অন্তরে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যাওয়া মন্দ স্বভাবের শিকড়সহ কর্তিত হয়ে যায়। যে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার খেয়াল না করে একবারে সব হাসিলের চেষ্টা করবে সে এক কষ্টদায়ক অবস্থায় পতিত হবে, তার প্রত্যাশার বিপরীত সব কিছু হতে থাকবে। একসময় যা পছন্দনীয় ছিলো তা অতীব অপছন্দনীয় হয়ে যাবে, যা একসময় অপছন্দনীয় ছিলো সেই কাজ করতে অন্তর কোনোপ্রকার দ্বিধাবোধ করবে না।"

টিকাঃ
১. সূরা ফাতির : ৪৩
২. সূরা কমার : ৪৯
১. সূরা আনকাবুত : ২
১. সূরা ইনশিরাহ : ৭-৮
১. বায়হাকী

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : তাওয়াক্কুল

📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : তাওয়াক্কুল


"নিজেই নিজের জন্য ব্যবস্থা (তাদবীর) করার মত গুরুতর কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো। তোমার বিষয়াদি তো আরেকজন দেখভাল করছেনই, সেই কাজের ভার নিজের ওপর নিতে যেও না।"
আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা, যা কুরআনে বহুবার উল্লেখিত হয়েছে, তবে সূফীদের কারো কারো মধ্যে এ ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণা পাওয়া যায়, যা তাদেরকে আল্লাহর সত্য ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে, তাদের দুনিয়াবী ও পরকালীন জীবনকে প্রভাবিত করে এমনকি তা দুনিয়া ও আখিরাতকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর্যায়েও পতিত হয়। আর এটা তখন হয় যখন কেউ ভাবে তাওয়াক্কুল মানে হচ্ছে দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা, সন্ন্যাসধারণ করা- তখন তাওয়াক্কুলের (توکل) নামে তাওয়া-কূলের (تواكل) চর্চা করা হয়, ফলে দুনিয়াকে পরিপূর্ণরূপে ত্যাগ করে দীনহীন, নিকৃষ্ট ও নিম্নতর যোগ্যতাসম্পন্নদের হাতে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ছেড়ে দেওয়া হয়। এভাবে দীন ইসলামের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য (আত্মশুদ্ধি) বাস্তবায়ন করতে যেয়ে আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্যকে (জগতের সংস্কার) ত্যাগ করা হয়, ফলে মানুষ ইসলামকে দুনিয়াবিমুখ ও ইহজাগতিক বিষয়াদি থেকে বিচ্ছিন্ন ধর্ম বলে ভাবতে থাকে, আদতে যা নয়।
তাহলে সঠিক তাওয়াক্কুল কীভাবে চর্চা করতে পারি? ইবনু আতা এ বিষয়ে বলেছেন, "নিজেই নিজের জন্য ব্যবস্থা (তাদবীর) করার মত গুরুতর কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো। তোমার বিষয়াদি তো আরেকজন-অর্থাৎ, আল্লাহ-দেখভাল করছেনই, সেই কাজের ভার নিজের ওপর নিতে যেও না।"
তাদবীর মূলত কাজের ফলাফলের সাথে জড়িত। ইবনু আতার মতে কাজের ফলাফলের দিক থেকেই তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। আল্লাহ বলছেন,
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন।"১
উপযুক্ত মাধ্যম সহকারে কাজের সংকল্প করা প্রত্যাশিত তবে মানুষের ক্ষমতা নেই এই কাজের ফলাফল বাস্তবায়ন করার। মুমিন সর্বাত্মক চেষ্টা করবে কাঙ্খিত লক্ষ্যার্জনের, তবে চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ন্ত্রণের কোনো, ক্ষমতাই মানুষের নেই। আর এখানেই তাওয়াক্কুলের প্রসঙ্গ চলে আসে। কেননা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সেই মহামহিমের হাতে। তিনিই নিজ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান মোতাবেক যাবতীয় সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন।
وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ “কে সব বিষয় পরিচালনা করেন?”১
মুমিন এই অমোঘ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞাত। তাই সে আল্লাহর সুন্নাত মাফিক সকল প্রকার ব্যবস্থা-উপায়-উপকরণ গ্রহণ তো করে, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করে। অকারণে উদ্বিগ্ন হয় না। ইবনু আতার কথার মর্মও এটাই যে, মানুষ কাজ করতে পারলেও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনার নাটাই আল্লাহরই হাতে, তাই মানুষ নিজের ব্যবস্থা নিজেই নিতে পারে না। কারণ, এই কর্তৃত্ব তো আল্লাহ নিয়েই নিয়েছেন। এখন মুমিনের কর্তব্য নিজের করণীয় সঠিকভাবে সম্পন্ন করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। নবী তাওয়াক্কুলের ব্যাপারে চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন,
"যদি তোমরা সত্যিই তাওয়াক্কুল করতে তবে আল্লাহ তোমাদেরকে রিযক দান করতেন যেভাবে তিনি পাখিদেরকে রিযক দিয়ে থাকেন, পাখি সকালে খালি পেটে বের হয়ে ফিরে আসে ভরা পেট নিয়ে।”২
কিন্তু কেউ কেউ দীনের এই সরল শিক্ষার অনুসরণ করে না। তারা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়, অন্যের কাছে চেয়েচিন্তে দিনগুজার করে। তাদের যুক্তি, 'তাদবীর আমাদের কাজ নয়'। এরূপ পরিস্থিতি রাসুলুল্লাহ এর সময় তৈরী হয়নি। বর্ণনায় এসেছে এক লোক মসজিদে বসে ইবাদাত করত। নবী জিজ্ঞাসা করলেন তার রিযকের ব্যবস্থা হয় কীভাবে? বলা হলো তার ভাই তার জন্য উপার্জন করে। নবী বললেন, “তার ভাই তার থেকে উত্তম!” একই রকমভাবে উমার রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর ওপর ভরসা করার দাবীকারী কিছু লোককে দেখে তিনি সেই বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, "আকাশ সোনা-রূপা বর্ষণ করে না।"
প্রয়োজনীয় সকল মাধ্যম অবলম্বনের পরেও যদি সাফল্য না আসে তবে তাওয়াক্কুল প্রত্যাশিত। আল্লাহ মানুষের কাঙ্খিত ফলাফল প্রতিরোধ করেন বা উপকরণ কেড়ে নেন যাতে লোকেরা তাঁর দিকে ফিরে আসে, তাঁর ওপর ভরসা করে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহ প্রদত্ত একটি উপহার, যদি সত্যিই আমরা বুঝতে পারি তো।
এ কারণে পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই, বাজার বিশ্লেষণসহ সাফল্যের জন্য কোনো প্রকার পদক্ষেপই তাওয়াক্কুলের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, সংগঠন, গবেষণা-এসকল কিছুই সাফল্যের মাধ্যম, উপায়-উপকরণ। এগুলো স্বয়ং তাওয়াক্কুলের অন্তর্ভুক্ত। আপনি সফল হোন বা না হোন, সকল ক্ষেত্রেই তা আল্লাহর সিদ্ধান্ত। কোনো ক্ষেত্রেই আপনি ফলাফল নিয়ে চিন্তা করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না।
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কেউ আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ায় কিংবা ইবাদাত করায় উৎকর্ষতা অর্জন করতে চায়। এক্ষেত্রেও আমরা নিজেদের সাধ্যমত সর্বোচ্চটুকু করে যাবো, বাকী ফলাফল দেবার মালিক আল্লাহ।
لَيْسَ عَلَيْكَ هُدُهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ.
"তাদেরকে হেদায়াত করার দায়িত্ব আপনার নয়, কিন্তু আল্লাহ যাকে চান হেদায়াত করেন।"১
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ.
"নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালবাসেন তাকেই আপনি হেদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন। আর হেদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।”২

টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৫৯
১. সূরা ইউনুস, ১০:৩১
২. তিরমিযী: ২৩৪৪
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৭২)
২. (সূরা কাসাস, ২৮:৫৬)

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 চতুর্থ পদক্ষেপ : ইখলাস

📄 চতুর্থ পদক্ষেপ : ইখলাস


“আমলসমূহ মৃত চিত্রকর্মের মত, ইখলাসের মাধ্যমেই তাতে প্রাণসঞ্চার হয়।”
তাওয়াক্কুলের চাইতেও ইখলাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তাওয়াক্কুল স্বস্থানে অতীব তাৎপর্যময় এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে ইখলাস আরও গভীর ও সূক্ষ্ম। এ কারণে আল্লাহর অপরিসীম দয়ার স্বীকৃতি ও তাঁর প্রতি শক্ত নির্ভরতা না থাকলে ইখলাস অর্জন করা সম্ভব নয়।
ইখলাস কি? ইখলাস হলো নিজ অন্তরের নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। আল্লাহর প্রতি সততা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের প্রতি একনিষ্ঠতা। একটি হাদীছে কুদসীতে এসেছে, "ইখলাস বা একনিষ্ঠতা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার অন্তরে প্রক্ষেপিত একটি রহস্য, যা তিনি তাদেরকেই দেন যাদের তিনি ভালোবাসেন।” নবী এর একটি বিখ্যাত হাদীছে এসেছে,
"নিশ্চয়ই নিয়্যাতের ওপর আমলসমূহ নির্ভরশীল। প্রত্যেকেই তা পাবে যার নিয়্যাত সে করেছে। সুতরাং যে আল্লাহ ও রাসূলের জন্য হিজরত করেছে তাঁর হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই। যে জাগতিক স্বার্থোদ্ধার কিংবা কোনো মহিলাকে বিবাহের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যের তরেই, যার জন্য সে হিজরত করেছে।" (বুখারী ও মুসলিম)
কেউ কেউ ব্যবসা ও বিবাহের স্বার্থে হিজরত করেছিলো, তারা তাদের নিয়্যাত অনুসারে ফলাফল পাবে। তবে সাহাবীরা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল ও তাঁর রাসূলকে সহায়তা করার জন্যই হিজরত করেছিলেন। আর তাদের প্রতিদানও তাদের নিয়্যাত অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে। আল্লাহ তাঁদের প্রতিদান সম্পর্কে জানাচ্ছেন,
وَالسَّبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهْجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَنٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنْتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।"
বিশুদ্ধ নিয়্যাত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইখলাসবিহীন আমল প্রদর্শনমাত্র, এর উদ্দেশ্য হয় মানুষকে খুশি রাখা, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা নয়। মানুষকে খুশি করার জন্য ইবাদাত করা এক প্রকারের শিরক ও নিফাক। আল্লাহ মুনাফিকদের বর্ণনা দিতে যেয়ে বলেছেন,
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ يُخْدِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَدِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلوةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
"নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়-কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।"
আখিরাতে যারা সর্বাধিক শাস্তি পাবে তারা হচ্ছে
الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُوْنَ
"যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে।"
প্রতিটি কাজই সঠিক নিয়্যাত নিয়ে করতে হবে। প্রতিটি কাজের শুরুতেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া উচিত এই যে, সাদাকা দিচ্ছি, হজ্জ করছি, অন্যকে সাহায্য করছি, সালাত আদায় করছি, উপকারী বইপত্র পড়ছি-এতকিছু কিসের জন্য? নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আমরা পানাহার, কাজ-কারবার করা, বিবাহশাদি করা, ভ্রমণ করা, বেচাকেনাসহ আমাদের দৈনন্দিন জাগতিক অভ্যাসাদি ও কর্মকাণ্ডকে ইবাদাতে পরিণত করতে পারি।
যেমন-কেউ শুধুমাত্র ক্ষুধা নিবারণের জন্যই নয়; বরং এর পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদাতের জন্য শক্তিসামর্থ্য অর্জনের জন্যও খেতে পারে, তখন খাওয়ার মত নিতান্ত জাগতিক কাজও ইবাদাতে পরিণত হবে। ভালো দেখানোর জন্য পোশাক পরাতে কোনো দোষ নেই, তবে যদি আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ ও শিষ্টাচার প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কেউ পোশাক পরে তবে এই কাজটি ইবাদাতে রূপ নেবে। আমরা বেতন পাবার জন্য কাজ করতে পারি, তবে যদি এর পেছনে সাদাকা দেওয়া, হজ্জ করা কিংবা পরিবারের ভরণপোষণ বহন করার নিয়্যাতও যুক্ত থাকে তবে এই কাজটিই ইবাদাতে পরিণত হবে। বিশুদ্ধ নিয়্যাত যেমন জাগতিক কাজকর্মকে ইবাদাতে পরিণত করে, তেমনি তা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির যাত্রায় এগিয়ে যেতেও সহায়তা করে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময় সালাত আদায়, যাকাত দান এগুলোর মাধ্যমেই কেবল ইবাদাত করে থাকেন; তারা আল্লাহর পথে আরও বেশি অগ্রসর হতে পারতেন যদি দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোকে কীভাবে ইবাদাতে পরিণত করতে হয় সেই সম্পর্কে জানতেন।
এক সূফী ইমাম তাঁর ছাত্রদের সাথে বসা ছিলেন। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন। দরজা খোলার আগে তিনি ছাত্রদের বেশ কয়েকটি নিয়্যাতের কথা উল্লেখ করলেন। যদি দরজা খুলে কোনো হতদরিদ্র ব্যক্তিকে পাওয়া যায় তবে আমরা তাকে সাদাকা দেবো, যদি অভাবী কেউ আসে তবে তাকে সাহায্য করবো, পথহারা কোনো মুসাফির দেখতে পেলে তাকে পথ দেখিয়ে দেবো, কোনো ছোট বাচ্চা হলে তার প্রতি সদয় হবো, কোনো ছাত্র হলে তাকে শেখাবো। দরজা খোলার মত একান্ত ক্ষুদ্র একটি কাজও বিশুদ্ধ নিয়্যাতের জোরে ইবাদাতে পরিণত হলো!
আল্লাহর কাছে দুআ করি যেন তিনি আমাদেরকে আন্তরিক একনিষ্ঠতা দান করেন, আমাদের অভ্যাসগুলোকে ইবাদাতে পরিণত করার তাওফীক দেন এবং কেবল তাঁর জন্যই জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেন।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.
"বলো, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ শুধু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।"

টিকাঃ
১. (সূরা তাওবা, ৯:১০০)
২. (সূরা নিসা, ৪:১৪২)
৩. (সূরা মাউন, ১০৭:৬)
১. সূরা আনআম, ৬:১৬২-১৬৩।

📘 রবের পথে যাত্রা > 📄 পঞ্চম পদক্ষেপ : তাফাক্কুর

📄 পঞ্চম পদক্ষেপ : তাফাক্কুর


"নিজের অস্তিত্বকে নিষ্প্রভতার গর্ভে রোপণ করে দাও, কেননা যে বীজকে মাটিতে বপন করা হয় না তা কখনোই ফসল দিতে পারে না। অন্তরের জন্য উযলাহ বা বিচ্ছিন্নতার চাইতে অধিক উপকারী আর কিছুই হয় না, কেননা এর মাধ্যমেই চিন্তা- উপলব্ধির অবস্থায় প্রবেশ করা যায়।"
প্রাণীজগতের অন্যান্য প্রজাতির মত মানুষও এক ধরণের প্রাণী- এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে মানুষ কেবলমাত্র পাশবিক গুণসমৃদ্ধ কোনো প্রাণী নয় বরং মানুষ মানুষ। মানুষের 'মানুষ' হবার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের চিন্তাশক্তি। সৃজনশীল চিন্তাশক্তিই মানুষকে প্রাণীজগতের অন্যান্যদের চাইতে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন করেছে। চিন্তাশক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য অনেক বড় এক নিআমত। মানুষ সর্বদাই এক চিন্তার স্রোতের মাঝে আবর্তিত হতে থাকে। চিন্তা মানুষের সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত যে একে মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্ব থেকে কোনোমতেই পৃথক করা সম্ভবপর নয়, কেননা এমন কোনো সময় নেই যখন মানুষ কিছু না কিছু না ভাবছে।
চিন্তার এই জাল মানুষের গোটা সত্তাকে ছেয়ে আছে। এই চিন্তাই মানুষের বিশ্বাস, বিশ্বদৃষ্টি, মূল্যবোধ গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখে। আর এ কারণে যেকোনো পরিবর্তন চিন্তা থেকেই শুরু হয়। যে পরিবর্তন চিন্তার মূলকে পরিবর্তন করতে পারে না, তা গোটা সত্তার সাথে একাঙ্গীভূত হতে পারে না। চিন্তা সঠিক হলে মানুষের বিশ্বাস পরিশুদ্ধ হয়, কর্ম সঠিক দিশা পায়, বিচার শক্তিশালী হয়। ইসলাম চিন্তাকে সত্যাশ্রয়ী করতে চায়, চিন্তাকে বিশুদ্ধ ও বাস্তবতার মূলের সাথে জুড়ে দিতে চায়। মানুষের প্রতিটি কর্ম হোক গভীর বুঝ সহকারে, এই বোধ বা বুঝ হবে তার বিশ্বাসের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশ্বাস হবে সঠিক চিন্তার ওপর স্থাপিত এবং এই চিন্তা থাকবে বাস্তবতার হৃদস্পন্দনের সাথে যুক্ত- এমনটাই ইসলামের কামনা।
আল্লাহর পথে যাত্রার জন্য প্রতি পদে পদেই প্রয়োজন গভীরতর বুঝ ও শক্তিশালী হৃদয়ের। আমরা এর আগে যেসকল বিষয়-অর্থাৎ, তাওবা, আশা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও ইখলাস-আলোচনা করেছি এগুলো সঠিকভাবে বোঝার জন্যও প্রয়োজন গভীর অভিনিবেশের। আর এটা সম্ভব তাফাক্কুর বা উপলব্ধির মাধ্যমে। তাফাকুর এক মহান ইবাদাত যা ব্যক্তিকে আল্লাহর দিকে অগ্রসর করে দেয় এবং আধ্যাত্মিকতার বুঝ পেতে সাহায্য করে। নবী এর দিকে সম্বোন্ধিত করে বলা হয়ে থাকে যে, "এক ঘণ্টার তাফাকুর ষাট বছরের ইবাদাতের চাইতেও উত্তম", এই হাদীছ সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল হলেও অর্থের দিক থেকে তা অনেকটাই সঠিক, কেননা যে আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তাফিকির করছে সে আসলে সুস্পষ্ট জ্ঞান, ঐকান্তিক অনুভূতি ও আত্মিক আলো সহকারে আল্লাহর ইবাদাতই করছে!
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
"নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে। যারা দণ্ডায়মান, বসা ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে (বলে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তা বৃথা সৃষ্টি করেননি, আমরা আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করি, অতএব আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।"
অনেকের কাছে আকাশ ও পৃথিবীর নানা ঘটনাবলীর ব্যাপারে গাদাগাদা তথ্য থাকে; রাত কীভাবে আসে, দিন কীভাবে যায়, সাগরের পানি কখন ও কেন কমে, চাঁদের আকার কেন কনে বাড়েসহ নানা তথ্য তাদের কাছে থাকে। কিন্তু এত তথ্য তাদের উপলব্ধিশক্তি বাড়ায় না। কেননা, তারা কেবল বুদ্ধি দিয়ে তা বিবেচনা করে, অন্তরাত্মার উর্ধ্বতন বুদ্ধি দিয়ে এত কিছুর পেছনে কার্যকর মহাশক্তিকে উপলব্ধি করতে পারে না বা উপলব্ধি করার চেষ্টাও করে না। কিন্তু যারা এসকল তথ্য অন্তর দিয়ে বিবেচনা করে তারা এর পেছনে এক অসীম শক্তিকে চিনে নিতে পারে। সৃষ্টির বিপুলতার মাধ্যমে তারা স্রষ্টার মহত্ত্ব ও বড়ত্ব অনুভব করতে পারে। তখন তারা স্বতস্ফূর্তভাবেই বলতে বাধ্য হয়, আপনি এসকল কিছু অনর্থক সৃষ্টি করেননি, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক বড় উদ্দেশ্য সুপ্ত রয়েছে।
তাফাকুরের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিস্ময়াবিষ্টতা বৃদ্ধি পায়।
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ.
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল তারাই আল্লাহর প্রতি ভীতবিহ্বল যারা (সত্যিকারার্থেই তাঁকে) জানে।”১
ইবনু আতা তাফাকুরের সাহায্যার্থে বলেছেন,
"নিজের অস্তিত্বকে নিষ্প্রভতার গর্ভে রোপণ করে দাও, কেননা যে বীজকে মাটিতে বপন করা হয় না তা কখনোই ফসল দিতে পারে না।"
এখানে ইবনু আতা নিষ্প্রভতার জন্য 'খুমুল' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার আভিধানিক অর্থ অলসতা, নিষ্ক্রিয়তা, জড়তা, দুর্বলতা, অবসাদ, উদাসীনতা, অখ্যাতি ইত্যাদি। ইবনু আতা'র উদ্দেশ্য নিজেকে পৃথক ও আলাদা করে নেওয়া। নিজেকে পৃথক করে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত সামাজিকতা, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গ-সাহচর্য থেকে আলাদা করে নেওয়া। এর উদ্দেশ্য নিজেকে সময় দেওয়া, নিজের চূড়ান্ত গন্তব্যের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনায় মগ্ন হওয়া, আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে অভিনিবেশ করা, নিজের আমল ও সামগ্রিকাবস্থা যাচাই করা, একনিবিষ্ট হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করা। অন্তরাত্মাকে সত্যের আলোয় আলোকিত ও একনিবিষ্ট করতে হলে এরূপ পৃথকতার কোনো বিকল্প নেই।
মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা কিংবা জাগতিক কাজকর্মে অতিরিক্ত পরিমাণে নিযুক্ত হয়ে গেলে মানুষ নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাতের আহ্বানকে অগ্রাহ্য করতে থাকে। এভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও সংযুক্তি ঢিলে হয়ে যায়। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় হয়ত অন্তর পুরোপুরিই মৃত্যুবরণ করে। এরূপ মৃত অন্তর নিয়ে শরীর ইবাদাত করতে পারে, ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানও পালন করতে পারে, কিন্তু সেই ইবাদাত তাঁকে উর্ধ্বজগতের সাথে যুক্ত করে না, নিজেকে পরিশুদ্ধ করে না, নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিশীলিত করে না। এহেন অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে, অন্তরকে পুনর্জীবিত করতে চাইলে, ফিতরাতকে স্থিত করতে চাইলে, অন্তরকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাতের দিকে পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে আসার মত অবকাশ দিতে হবে। আর এর বড় একটি উপায় হচ্ছে জগতের 'শোরগোল' থেকে কিছুটা সময় বিচ্ছিন্ন করে নিজের প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
এরূপ উযলাহ বা নিঃসঙ্গতার বৈধতার ভিত্তিও ইসলামে আছে। ই'তিকাফ আল্লাহর নৈকট্য পাবার অনেক বড় মাধ্যম। এটা এক প্রকারের বিচ্ছিন্নতা, কেননা ইতিকাফ মানেই হচ্ছে ঘর-সংসার, স্ত্রী সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করে নেওয়া। মৌলিক উদ্দেশ্য একমনে আল্লাহর ইবাদাত করা, তাঁর আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা। গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদের ফযীলতের কথাও সুবিদিত, এটাও এক প্রকার বিচ্ছিন্নতাই। বিচ্ছিন্নতা ঘুম থেকে, শরীরের আরাম থেকে, জীবনসঙ্গীর উষ্ণ ছোঁয়া থেকে। মৌনতার উপকারীতা ও এর প্রতি উৎসাহের কথাও আমাদের সবার জানা, এটাও দুনিয়ার শোরগোল থেকে সচেতনভাবে নিজেকে পৃথক রাখা, মানে এটাও এক প্রকারের বিচ্ছিন্নতাই বটে। এ কারণে কিছু কিছু বিচ্ছিন্নতা ইসলাম অনুমোদিত বরং প্রশংসিত। তবে এই বিচ্ছিন্নতার মানে যদি হয় নিজেকে ঘর, সংসার, সমাজ, সামাজিকতা থেকে একেবারে আলাদা করে নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া-তবে তা মোটেও ইসলাম অনুমোদিত নয়, আর এমনটা ইসলামের উদ্দেশ্যের সাথেও যায় না। পূর্বোক্ত অর্থেই অনেক সূফীরা 'উযলাহ' বা বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। যদিও এক্ষেত্রে তাদের অনেকের দ্বারাই বাড়াবাড়ি হয়েছে, তবে এর মৌলিক উদ্দেশ্য তা-ই যা ওপরে বর্ণিত হয়েছে। জগত থেকে পরিপূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া অর্থে পৃথকতা মোটেও ইসলামের কাম্য নয়। নবী বলেছেন,
لَا رُهْبَانِيَّةً فِي الْإِسْلَامِ
"ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই।"
তিনি আরও বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ الَّذِي يُخَالِطُ النَّاسِ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ ، أَفْضَلُ مِنَ الْمُؤْمِنِ الَّذِي لَا يُخَالِطُ النَّاسَ وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ.
“যে মুসলিম মানুষের সাথে মেলামেশা করে ও তাদের দেওয়া কষ্ট সহ্য করে সে তার থেকে উত্তম যে মেলামেশাও করে না, তাদের দেওয়া কষ্টে সবরও করে না।”
কোনো কিছুকে আলোকমণ্ডিত হয়ে দুনিয়ার বুকে প্রকাশিত হতে হলে তাকে নির্দিষ্ট সময় যাবত অন্ধকারের বুকে লুকিয়ে থাকতে হয়, এটাই জগতসংসারের সাধারণ নিয়ম, দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার মৌলিক একটি মূলনীতি। বটবৃক্ষ তখনই সুবিশাল ছায়াদার আশ্রয়ে পরিণত হতে পারে যখন তার বীজ মৃত্তিকার আঁধারে লুকিয়ে থাকে। অসংখ্য সম্ভাবনাময় মানুষকেও কর্মময় পৃথিবীতে এসে নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের আগে নির্দিষ্ট সময় যাবত মায়ের গর্ভে থাকতে হয়। আলো পেতে হলে অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে প্রস্তুত হতে হয়, ফলদায়ী বৃক্ষকেও মাটির ভেতরের অন্ধকার চিরে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়, পরিচিতির আগে নিঃসঙ্গতাকে বরণ করতে হয়, পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিতে হলে ধৈর্য্য সহকারে নির্দিষ্ট কাজে স্থবির রাখতে হয়। মানুষের মত মহান সৃষ্টিকেও নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে নিজেকে সময় দিতে হয়।
অন্ধকার, নীরবতা, নিঃসঙ্গতার গর্ভে নিজের অস্তিত্বকে রোপণ করার মাধ্যমেই সৃষ্টি থেকে স্রষ্টার দিকে রওয়ানা হতে পারে; চারপাশের ব্যস্ততা ও উদাসীনতার কলুষতা থেকে আত্মাকে পবিত্র করতে পারে; নিছক তথ্য, নিদর্শন, নিয়মনীতি ও আচারনুষ্ঠানের স্তর থেকে উর্ধ্বতন উদ্দেশ্য, অর্থ ও প্রজ্ঞার স্তরে উন্নীত করতে পারে। এভাবেই সে আল্লাহর সাথে বিলুপ্তপ্রায় সম্পর্ককে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়, আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। এ এমন এক নিয়ম যা পরিবর্তন বা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। পৃথকতা ও নীরবতার এ সময়েই চিন্তা প্রখর ও শানিত হয়, উপলব্ধি সঠিক পথ পায়, অনুভূতি সত্যের পথে অগ্রসর হয়, বিচ্ছিন্ন তথ্যের স্তূপ থেকে প্রজ্ঞার জ্যোতি পাওয়া যায়। ইবনু আতা বলছেন,
مَا نَفْعُ الْقَلْبِ مِثْلُ عُزْلَةٍ يَدْخُلُ بِهَا مَيْدَانَ فِكْرَةٍ.
অন্তরের জন্য উযলাহ বা বিচ্ছিন্নতার চাইতে অধিক উপকারী আর কিছুই হয় না, কেননা এর মাধ্যমেই চিন্তা-উপলব্ধির অবস্থায় প্রবেশ করা যায়।

টিকাঃ
১. (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৯০-১৯১)
১. (সূরা ফাতির, ৩৫:২৮)
১. বায়হাকী

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00