📄 প্রথম পদক্ষেপ : তাওবা ও আশা
“কোনো ভুল করে বসলে যদি আল্লাহর ব্যাপারে তোমার আশা কমে যেতে দেখো, তবে জানবে যে তুমি আসলে তোমার নিজের কর্মের ওপর নির্ভর করছ আল্লাহর রহমতের ওপর নয়।"
আল্লাহর দিকে আধ্যাত্মিক যাত্রায় প্রথমেই প্রশ্ন আসে-কোথা থেকে শুরু করবো? এই যাত্রায় আমার সঙ্গী কি হবে? আমি কি নিজ ভালো আমলকে স্মরণ করবো এবং তাদেরকেই যাত্রার পাথেয় হিসেবে নেবো? ইবনু আতা বলছেন, না, নিজের সৎকর্মের ওপর নির্ভর কোরো না। আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো। কেবলমাত্র তাঁর ওপর নির্ভর করে এবং তাঁর রহমত ও দয়ার আশা করে তোমাকে যাত্রা শুরু করতে হবে।
প্রশ্ন আসতে পারে-ভালো আমলই কি আল্লাহর রহমত পাওয়ার কারণ নয়? ভালো আমল না করা হলে কি আল্লাহর রহমত বর্ষণ বন্ধ হয়ে যায় না? আল্লাহ বলছেন, وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِم مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِن دَابَّةٍ
"যদি আল্লাহ লোকদেরকে তাদের অন্যায় কাজের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভুপৃষ্ঠে চলমান কোনো কিছুকেই ছাড়তেন না।”১
মানুষের মধ্যে প্রত্যাবর্তন তথা ফিরে আসার যে প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই লুকিয়ে রয়েছে তা তখনই কার্যকর হয়, যখন তার কাছে বর্তমান জীবনের গতিবিধির চূড়ান্ত পরিণতির হাস্যকরতা এবং নিষ্ফলতা তার নিজের কাছে ধরা পড়ে। নিজের বর্তমান অবস্থার প্রতি অসন্তুষ্টি, গুনাহের প্রতি তীব্র আফসোস ও অনুতাপ এবং নিজেকে শুধরে নেওয়ার প্রবল প্রতিজ্ঞাই মূলত তাওবার মূল মর্ম। অন্তরের আন্তরিক এই উপলব্ধিই মূলত তাওবা। নিজের ভুলত্রুটির 'গোমর ফাঁস' হয়ে যাওয়ার এই অবস্থাই মূলত তাওবার দিকে ধাবিত করে।
মূল বিষয় হচ্ছে নিজের ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও আল্লাহর রহমত ও ঐশ্বর্যের ওপর নির্ভর করতে পারা। সঠিক পথের দিকে এটাই যথার্থ প্রারম্ভ।
তবে আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা করতে হলে অবশ্যই নিজ ভুলত্রুটির জন্য তাওবা করতে হবে। আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাত মোতাবেক কোনো কিছুকে নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হলে তার জন্য স্থান বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। ঈমানও এই সুন্নাতের ব্যতিক্রম নয়। অন্তরকে ঈমান, নূর ও আল্লাহর স্মরণ দ্বারা পরিপূর্ণ করতে হলে আমাদের অন্তরকে অবশ্যই এমন অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে যা অন্য কোনো বিষয় কিংবা বাসনা দ্বারা পূর্ণ হবে না। তখনই আমরা আমাদের অন্তরকে সুকৃতি দ্বারা সজ্জিত করতে পারবো। সূফীদের পরিভাষায় একে বলা হয় 'তাখাল্লি ছুম্মাত তাহাল্লি ছুম্মাত তাজাল্লি' অর্থাৎ, প্রথমে অন্তরকে সকল দুষ্কৃতি, কামনা-বাসনার ইচ্ছা থেকে মুক্ত করতে হবে; এরপর নিরন্তর উত্তম আমল করে একে সজ্জিত করতে হবে এবং এরপরেই আত্মিক-আধ্যাত্মিক আলোর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
ইবনু আতার মতে তাওবার সাথে সাথে আল্লাহর ওপর আশাও করতে হবে। কিন্তু তাওবার সাথে আশার কি সম্পর্ক? কেনই-বা তা জরুরী? আল্লাহর পথে যাত্রার সাথে তা কতটুকু সম্পর্কিত? ইবনু আতা বলছেন,
“কোনো ভুল করে বসলে যদি আল্লাহর ব্যাপারে তোমার আশা কমে যেতে দেখো, তবে জানবে যে তুমি আসলে তোমার নিজের কর্মের ওপর নির্ভর করছ আল্লাহর রহমতের ওপর নয়।" আল্লাহর দয়ার প্রত্যাশা করা ও তাঁর ওপর ভরসা করার অর্থ হচ্ছে আপনি নিজ চেষ্টা ও আমলের মাধ্যমে পুণ্য হাসিল করতে পারেন না। আল্লাহর চাইতে নিজ আমলের ওপর ভরসা করার একটি নিদর্শন হচ্ছে গুনাহ বা ভুল করে বসলে অন্তর হতাশ হয়ে যায়, আল্লাহর রহমতের ওপর আশা হ্রাস পায়, কেননা, আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভর করার অর্থ হচ্ছে সবসময় আল্লাহর দয়ার প্রত্যাশা করা, ভালো ও খারাপ অবস্থায়, সুখে ও দুঃখে, গুনাহ হয়ে গেলে এবং গুনাহ না হলেও, সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে প্রত্যাশার স্তর একই থাকা।
আলিমগণ যথার্থ তাওবার জন্য চারটি শর্ত বাতলেছেন,
* এক. নিজের ভুলের ব্যাপারে আফসোস ও অনুতপ্ত বোধ করা * দুই. যদি তা চলমান কোনো গুনাহ হয়ে থাকে তবে তা থেকে বিরত থাকা * তিন. ভবিষ্যতে সেই গুনাহ পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা এবং - চার. যদি সেই গুনাহর সম্পর্ক মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের সাথে হয়ে থাকে তবে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
যথার্থ তাওবার জন্য এই চারটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে। প্রথম শর্ত হচ্ছে, অনুতপ্ত হওয়া। নবী বলেছেন
الندم توبة
"অনুতপ্ত হওয়াই তাওবা।”১
দ্বিতীয় শর্ত, গুনাহ থেকে বিরত হওয়া। গুনাহের পুনরাবৃত্তি করতেই থাকা সাথে সাথে তাওবার দাবী করা নিফাক, এমনটা করা বৈধ নয়।
তৃতীয় শর্ত, গুনাহ পুনরায় না করার দৃঢ় ইচ্ছা রাখা। এমনটা সম্ভব নয় যে, কেউ গুনাহের ব্যাপারে অনুতপ্ত হবে, তারপর তা থেকে বিরত থাকবে এবং সাথে সাথে গুনাহ পুনরায় করার ইচ্ছাও পুষে রাখবে। এটা অযৌক্তিক। আর এমনটা যদি হয়েই যায় তবে সমাধান হচ্ছে পুনরায় তাওবা করে নেওয়া। তাওবা নবায়ন করে নেওয়া। এই একই প্রক্রিয়ার পুনরাবর্তন করা। আবার অনুতপ্ত হওয়া, আবারও এই শপথ করা যে পুনরায় এই গুনাহ করবো না। আল্লাহ অবশ্যই সর্বাধিক ক্ষমাশীল। আল্লাহ বারংবার নিষ্ঠাপূর্ণ তাওবা গ্রহণ করেন। বরং তিনি বান্দার তাওবায় সন্তুষ্ট হন, যেমনটা নবী বলেছেন।
চতুর্থ শর্ত, আলিমগণ বলেছেন যদি কারো গুনাহ বান্দার হকের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় তবে তাকে অবশ্যই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যেমন-যদি কেউ কারো মালিকানার জিনিস অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয় তবে তাকে সেই জিনিস অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে। কারো ওপর অবিচার করলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আলিমরা এও বলেছেন যে, যদি কেউ মানুষের ব্যাপারে ভালো-মন্দ বলে তাকেও মাফ চেয়ে নিতে হবে, যদি সত্যিকারের তাওবা করতে হয় তো।
ইবনু আতা ধরে নিচ্ছেন এই শর্তগুলো পূরণ করা হয়েছে, এরপর তিনি আল্লাহর ওপর আশা রাখতে বলেছেন, তবে এটা তাওবার শর্ত নয়, আল্লাহর সাথে আদব। কেননা, আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা করা নেককারদের বৈশিষ্ট্য।
أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ. "তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী করুণাময়।"১
কখনো কখনো হতাশা চলে আসতে পারে এই ভেবে যে, আমি তো এত গুনাহ করেছি আল্লাহ কি মাফ করবেন? তিনি কীভাবে আমার তাওবা কবুল করতে পারেন? এরকমটা ভাবাটাই ভুল। আমরা আল্লাহকে পরম করুণাময় বলে বিশ্বাস করি, তারপরেও তিনি আমার গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন না বা করবেন না-এমন বিশ্বাস করাটাই ভুল।
قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُوْنَ. "তিনি বললেন, পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?"২
আর যে আল্লাহর ওপর থেকে আশা-প্রত্যাশা হারিয়ে ফেলে সে আসলে আল্লাহর ওপর নয়, নিজের দুর্বল সত্তা, সীমাবদ্ধ মন ও ক্ষীণ আমলের ওপর নির্ভর করছে। তার মানে এই নয় যে, ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিষ্ক্রিয় হয়ে কাজকর্ম বন্ধ করে দেবে। বরং এর মানে হচ্ছে অন্তরে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা থাকবে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিজ কর্ম করে যাবে।
মানুষের গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন সর্বদা আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা রাখা চাই। কেউ যদি একনিষ্ঠতার সাথে তাওবা করে তবে প্রবল আশা এই যে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে নেবেন। নবী ও বলেছেন,
التَّائِبُ مِنْ الذَنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ "গুনাহ থেকে তাওবা করা ব্যক্তি এমন যেন সে কোনো গুনাহই করেনি।"*
তিনি আরও বলেছেন,
"আল্লাহ বলেছেন, হে আদমসন্তান! যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমাকে ডাকবে ও আমার কাছে ক্ষমা চাইবে ততক্ষণ আমি তোমাকে ক্ষমা করবো, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে মানবসকল! যদি তোমরা আমার কাছে পৃথিবী সমপরিমাণ গুনাহ নিয়েও আসো তবুও আমি তোমাদের ক্ষমা করবো, কোনো কিছুর পরোয়া করবো না।”১
এ কারণে গুনাহ যত গুরুতরই হোক না কেন তা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করতে না পারে; বরং উচিত আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে প্রত্যাবর্তন করা, তাঁর দয়া প্রত্যাশা করা ও তাঁর রহমতের ওপর ভরসা করা। নবী আরও বলেছেন,
يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي فَلْيَظُنَّ فِي مَا شَاءَ.
“আল্লাহ বলেছেন, বান্দা আমাকে যেমনটা মনে করে আমি তার কাছে তেমনই, সে যেমনটা চায় আমার ব্যাপারে ভাবতে পারে (অর্থাৎ, সে চাইলে আমাকে দূরবর্তীও মনে করতে পারে আবার নিকটবর্তীও মনে করতে পারে।"২
বান্দার উচিত না যে সে আল্লাহর চাইতে নিজের আমলের ওপর অধিক নির্ভর করবে। কেননা রাসুলুল্লাহ বলেছেন,
لَنْ يُدْخِلَ الجَنَّةَ أَحَدًا عَمَلُهُ قَالُوا: وَلَا أَنْتَ؟ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ: وَلَا أَنَا، إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللهُ مِنْهُ بِرَحْمَةٍ.
"তোমাদের কেউই কেবলমাত্র নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এমনকি আপনিও না?” তিনি উত্তরে বললেন, “না, আমিও না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমতে আচ্ছাদিত করে নিচ্ছেন।"
এই হাদীছের মর্ম হলো আমরা নিজেদের আমল করে যাবো তবে ভরসা আমলের ওপর নয় বরং আল্লাহর ওপর করবো। ইবনু আতা এমনটাই বলতে চাচ্ছেন।
তবে আল্লাহর ওপর ভরসা করা যেন আবার নিজেকে নিরাপদ ভাবতে প্ররোচিত না করে। নিজেকে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্ত মনে করা কখনোই কাম্য নয়।
وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَعْدُودَةً "তারা বলে, আগুন আমাদেরকে কখনোই স্পর্শ করবে না; অল্প কয়েকটা দিন বাদে।”১
এই আয়াত পূর্ববর্তী জাতিদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছিলো। তারা নিজেদেরকে স্রষ্টার নির্বাচিত বিশেষ বান্দা বলে ভাবত। তারা দুনিয়াতে যা খুশি তা-ই করুক না কেন এতে তাদের বিশেষত্বে কোনো প্রভাব পড়তে পারে না, এমনটাই ছিলো তাদের বিশ্বাস। আজকাল কিছু মুসলিমও এমন বিশ্বাস করে যে, তারা যা খুশি করুক না কেন তা তাদের কোনো সমস্যা নেই, কেননা তারা তো মুসলিম, একদিন না একদিন জান্নাতে তো তারা যাবেই!
فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخُسِرُوْنَ. "বস্তুতঃ আল্লাহর পাকড়াও থেকে তারাই নিশ্চিন্ত হতে পারে, যাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসে।""
আল্লাহর প্রতি আশা যাতে কখনোই এই নিশ্চয়তায় ভোগাতে না পারে যে, আল্লাহ অবশ্যই আমাদের ওপর দয়া করবেন, আমরা যা খুশি তা-ই করি না কেন। জান্নাতে ঢোকার আগ পর্যন্ত মুমিন নিশ্চিত হতে পারে না। আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু বলেছেন, "আমার এক পা জান্নাতে আর আরেক পা জান্নাতের বাহিরে থাকলেও আমি আল্লাহর (শাস্তির আশঙ্কা) থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করি না।"
আশা ও ভয়ের মাঝে পরিমিতিবোধ থাকা প্রয়োজন। আসলে পরিমিতিবোধ এমন এক চিরন্তন মূলনীতি প্রত্যেকটি বিষয়েই যার প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। গোটা ইসলামই সুষমতা ও পরিমিতিবোধের অনন্য নিদর্শন। ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস, আইন, নৈতিক নিয়মনীতি ও বিধিবিধান আমাদেরকে এই পরিমিতিবোধ ও ভারসাম্যই শিক্ষা দেয়। তাওবার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত জরুরী, যাতে আমরা কেবলমাত্র আল্লাহর দয়ার ওপর ভরসাই নয় সাথে সাথে আল্লাহর শাস্তির ভয়কেও মাথায় রাখি।
কারো কারো মাঝে নৈরাশ্যের প্রাবল্য দেখা যায়। তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে তো চায় কিন্তু ভাবে আল্লাহ বোধহয় তাদেরকে কখনোই মাফ করবেন না। অতএব তারা নিজেদের অবস্থাতেই গুমরে পড়ে থাকে। আল্লাহ বলছেন,
كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنكُمْ سُوءًا بِجَهْلَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْعَايَتِ وَلِتَسْتَبِينَ سَبِيلُ الْمُجْرِمِينَ.
"তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর লিখে নিয়েছেন দয়া, নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে যে না জেনে খারাপ কাজ করে তারপর তাওবা করে এবং শুধরে নেয়, তবে তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর এভাবেই আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি। আর যাতে অপরাধীদের পথ স্পষ্ট হয়ে যায়।"১
এক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আল্লাহর দয়ার প্রতি আশা রাখা, তাঁর শাস্তিকে ভয় করা এবং নিজের অন্তরকে তার দিকে প্রত্যাবর্তন করানো। এটাই আল্লাহর দিকে যাত্রার প্রথম ঘাঁটি।
টিকাঃ
১. সূরা নাহল: ৬১
১. ইবনু মাজাহ ও ইবনু হিব্বান
১. সূরা বাকারাহ : ২১৮
২. সূরা হিজর:৫৬
*. ইবনু মাজাহ
১. (তিরমিযী)
২. বুখারী ও মুসলিম।
১. সূরা বাকারাহ :৮০
২. সূরা আ'রাফ:৯৯
১. সূরা আনআম : ৫৪-৫৫
📄 দ্বিতীয় পদক্ষেপ : আল্লাহর সুন্নাতের খেয়াল রাখা
"একজন মানুষ, তার ইচ্ছাশক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে কখনোই ভাগ্যের দেয়াল ভেদ করতে পারবে না।"
নিজেদের অজস্র গুনাহ সত্ত্বেও আমরা আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে এই যাত্রা শুরু করেছি। আমরা যেন কখনোই নিজেদের ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে আল্লাহর দয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেই। আল্লাহ ক্ষমাশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা একনিষ্ঠ তাওবা করবে আল্লাহ ততক্ষণ তাকে মাফ করবেন।
যাত্রার প্রথমদিকে আমাদের মনোবল দৃঢ় থাকে, উদ্যম থাকে পরিপূর্ণ। সে চেষ্টা করে নিজেকে, নিজের পরিবার ও সমাজকে, রাষ্ট্রকে এমনকি গোটা বিশ্বকে রাতারাতি পরিবর্তন করে ফেলতে। ইবনু আতা বলছেন, "একজন মানুষ, তার ইচ্ছাশক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে কখনোই ভাগ্যের দেয়াল ভেদ করতে পারবে না।" অর্থাৎ, মানুষ কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারবে না, তাকে ডিঙ্গিয়ে কোনো কাজ করতে পারবে না। আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য বা তাকদীরের মধ্যে তাঁর সুন্নাতসমূহও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজেই বলেছেন,
فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَبْدِيلًا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَحْوِيلًا.
"তুমি আল্লাহর সুন্নাতের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাবে না। তুমি আল্লাহর সুন্নাতের কোনো ব্যতিক্রম দেখতে পাবে না।”১
গোটা মহাবিশ্বই এভাবে সৃষ্টি হয়েছে,
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْتُهُ بِقَدَرٍ
"নিশ্চয়ই আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী।"২
আল্লাহর সুন্নাতের মধ্যে এটাও অন্তর্ভুক্ত যে, পৃথিবীতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত নির্দিষ্ট ফলাফলের দিকে পরিচালিত করে। কোনো মানুষই, হোক মুসলিম বা অমুসলিম, ভাগ্যের দেয়াল ভেদ করে সঠিক উপায়, পন্থা, পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করতে সক্ষম নয়। যেমন আল্লাহ বলছেন,
أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُوْلُوْا ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ. "মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?"১
এটা বিপদ ও পরীক্ষার সুন্নাত। যদি কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবী করে তবে আল্লাহ তাকে দুনিয়ার কিছু বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করবেন। ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি যতই মজবুত হোক না কেন সে এই সুন্নাতরুপী বিপদাপদকে প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। এটাই আল্লাহর অমোঘ বিধান।
পরিবর্তন ও বিবর্তনের নিয়মটিও আল্লাহর সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীতে যেকোনো পরিবর্তনের জন্য যথাযথ সময় প্রয়োজন। আল্লাহ সময়কে সৃষ্টি করেছেন, প্রত্যেকটি মানুষই নিজ নিজ জ্ঞানের স্তর থেকে এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। প্রত্যেকটি সৃষ্টিই সময় দ্বারা আবদ্ধ। সময় মানুষের জন্য এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। আল্লাহ নিজে সময়ের গণ্ডিমুক্ত, তবে তিনি সময় সৃষ্টি করেছেন এবং নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট ফলাফল হাসিল করতে হলে এর জন্য যথাযথ সময় অবশ্যই দিতে হবে।
আমরা এক মুহূর্তেই নিজেদের কিংবা বিশ্বকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারি না। আপনি হয়ত দ্রুত কুরআন মুখস্ত করে নিতে পারেন, হয়ত এক সপ্তাহ বা এক মাসের মধ্যেই, কিন্তু আশঙ্কা আছে এই কুরআন খুব দ্রুতই আপনার অন্তর থেকে বিদায় নেবে, কেননা এর স্থায়ীত্বের জন্য যে সময়ের প্রয়োজন তা আপনি দেননি, আগে আগেই তা অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। যারা হুটহাট করে পরিবর্তন হতে বা করতে চায় তারা অধিকাংশ সময়ই তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কোনো কোনো আলিম বলেছেন, “যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় আসার পূর্বেই কার্য সম্পাদন করতে চায় তার শাস্তিস্বরূপ তাকে সেই ফলাফল হাসিল থেকে বঞ্চিত করা হয়।" অর্থাৎ, বৃহত্তর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে সময়ের মত গুরুত্বপূর্ণ শর্তকে মাথায় না রেখেই কাজ করতে যায়, সে পরিবর্তন তো করতে পারেই না বরং আখেরে সবই হারাবে। এ কারণে আমাদের করণীয় হচ্ছে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাতের প্রতিও সজাগ্র খেয়াল রাখা।
ভাগ্যের দেয়ালের মধ্যে সেই জিনিসও অন্তর্ভুক্ত যাকে আলিমরা 'ওয়াজিবুল ওয়াক্ত' বা 'সময়ের আবশ্যকীয় দায়িত্ব' বলে আখ্যায়িত করেছেন। মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তর রয়েছে, প্রত্যেকটি স্তরেই মানুষকে বিভিন্নপ্রকার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। জীবনের এক পর্যায়ে বিবাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে অর্থোপার্জন করতে হয়। এর জন্য যথেষ্ট সময় ও চেষ্টা-তদবীরের দরকার হয়। অন্য সময় বাচ্চাকাচ্চা ও বয়োবৃদ্ধদের যত্ন নিতে হয়, তাদের দেখভাল করতে হয়। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে আপনার সন্তানরা হয়ত স্বাধীন হয়ে গেলো, আপনারও হয়ত অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আছে, কিন্তু বর্তমান অবস্থার চাইতে আরেকটু ভালো অবস্থানে যেতে হলে বা বড় কোনো উদ্দেশ্য সাধন করতে গেলে আপনাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হতে পারে। জীবনের একটি পর্যায়ে হয়ত আপনাকে জ্ঞানার্জনের জন্য ভ্রমণ করতে হতে পারে, আবার কখনো কখনো শারিরীক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ বিরতিও নিতে হতে পারে। এর কোনোক্ষেত্রেই মানুষ ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারে না। অসুস্থতার সময় আপনি তাগড়া জোয়ানের মত আচরণ করতে পারেন না। সত্তর বছরের বুড়ো হয়ে আপনি চল্লিশ বছরের প্রৌঢ়ের মত আচরণ প্রদর্শন করতে পারেন না।
আল্লাহর পথে যাত্রার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আল্লাহ আপনাকে যা দেন বা আপনার থেকে যা কেড়ে নেন মনে রাখবেন এর পেছনে আল্লাহর কোনো না কোনো প্রজ্ঞা লুক্কায়িত আছে। এ কারণে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাত ও তাকদীরের কাছে আত্মসমর্পণ করা।
আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা হচ্ছে যে, যেকোনো কাজ সম্পন্ন করার পর আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে, ইবাদাত ও তাঁর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি-শ্রদ্ধার মাধ্যমে। নবী-কেও কুরআনে এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَأَرْغَبْ
"অতএব যখনই অবকাশ পাবে, তখনই (আল্লাহর পথে) পরিশ্রম করবে এবং নিজের প্রভুর প্রতি মনোযোগী হবে।"১
আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনের সময়ও আমাদের স্তরে স্তরে আগাতে হবে। নবী বলেছেন,
إِنَّ هَٰذَا الدِّينَ مَتِينٌ، فَأَوْغَلُوا فِيهِ بِرِفْقٍ. "নিশ্চয়ই এই দীন (ধর্ম) দৃঢ়-কঠিন, তাই নম্রতার সাথে এতে প্রবেশ করো।"১
'অর্থাৎ, দীনের কাজগুলো হতে হবে ব্যক্তির সামর্থ্যের মধ্যে এবং তা ধীরস্থিরতার সাথে স্তরে স্তরে ও যথাযথ চর্চার মাধ্যমে নিজের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নিতে হবে। কেউই একদিনে দীনের সকল বিধান জেনে নিতে পারে না। রাতারাতি আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হতে পারে না। একদিনেই সত্যের নিগুঢ় বুঝ ও প্রজ্ঞা হাসিল করতে পারে না। এসবগুলোই অত্যন্ত ভারী ও কঠিন কাজ। এর জন্য যথাযথ সময় এবং তা হাসিল করার জন্য সঠিক উপায়-উপকরণ ও পদ্ধতি অবলম্বন করা একান্ত জরুরী।
ইমাম গাযালী রহ. বলেছেন,
"এর অর্থ হলো নিজের ওপর দীনের এমন কোনো বিধান চাপিয়ে নেওয়া যাবে না যা স্বভাবপরিপন্থী। একবারে শীর্ষে পৌঁছার চেষ্টা না করে ধারাবাহিকতা ও নম্রতার সাথে পরিবর্তনের চেষ্টা চালাতে হবে। এমনটা করা হলে মানুষের স্বভাব তাকে অস্বীকার করবে, স্বভাব এমনটা অপছন্দ করে। মন্দ স্বভাব দূর করার পদ্ধতি হলো ধীরে ধীরে তা দূর করতে হবে, যাতে অন্তরে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যাওয়া মন্দ স্বভাবের শিকড়সহ কর্তিত হয়ে যায়। যে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার খেয়াল না করে একবারে সব হাসিলের চেষ্টা করবে সে এক কষ্টদায়ক অবস্থায় পতিত হবে, তার প্রত্যাশার বিপরীত সব কিছু হতে থাকবে। একসময় যা পছন্দনীয় ছিলো তা অতীব অপছন্দনীয় হয়ে যাবে, যা একসময় অপছন্দনীয় ছিলো সেই কাজ করতে অন্তর কোনোপ্রকার দ্বিধাবোধ করবে না।"
টিকাঃ
১. সূরা ফাতির : ৪৩
২. সূরা কমার : ৪৯
১. সূরা আনকাবুত : ২
১. সূরা ইনশিরাহ : ৭-৮
১. বায়হাকী
📄 তৃতীয় পদক্ষেপ : তাওয়াক্কুল
"নিজেই নিজের জন্য ব্যবস্থা (তাদবীর) করার মত গুরুতর কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো। তোমার বিষয়াদি তো আরেকজন দেখভাল করছেনই, সেই কাজের ভার নিজের ওপর নিতে যেও না।"
আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা, যা কুরআনে বহুবার উল্লেখিত হয়েছে, তবে সূফীদের কারো কারো মধ্যে এ ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণা পাওয়া যায়, যা তাদেরকে আল্লাহর সত্য ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে, তাদের দুনিয়াবী ও পরকালীন জীবনকে প্রভাবিত করে এমনকি তা দুনিয়া ও আখিরাতকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর্যায়েও পতিত হয়। আর এটা তখন হয় যখন কেউ ভাবে তাওয়াক্কুল মানে হচ্ছে দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা, সন্ন্যাসধারণ করা- তখন তাওয়াক্কুলের (توکل) নামে তাওয়া-কূলের (تواكل) চর্চা করা হয়, ফলে দুনিয়াকে পরিপূর্ণরূপে ত্যাগ করে দীনহীন, নিকৃষ্ট ও নিম্নতর যোগ্যতাসম্পন্নদের হাতে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ছেড়ে দেওয়া হয়। এভাবে দীন ইসলামের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য (আত্মশুদ্ধি) বাস্তবায়ন করতে যেয়ে আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্যকে (জগতের সংস্কার) ত্যাগ করা হয়, ফলে মানুষ ইসলামকে দুনিয়াবিমুখ ও ইহজাগতিক বিষয়াদি থেকে বিচ্ছিন্ন ধর্ম বলে ভাবতে থাকে, আদতে যা নয়।
তাহলে সঠিক তাওয়াক্কুল কীভাবে চর্চা করতে পারি? ইবনু আতা এ বিষয়ে বলেছেন, "নিজেই নিজের জন্য ব্যবস্থা (তাদবীর) করার মত গুরুতর কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো। তোমার বিষয়াদি তো আরেকজন-অর্থাৎ, আল্লাহ-দেখভাল করছেনই, সেই কাজের ভার নিজের ওপর নিতে যেও না।"
তাদবীর মূলত কাজের ফলাফলের সাথে জড়িত। ইবনু আতার মতে কাজের ফলাফলের দিক থেকেই তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। আল্লাহ বলছেন,
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন।"১
উপযুক্ত মাধ্যম সহকারে কাজের সংকল্প করা প্রত্যাশিত তবে মানুষের ক্ষমতা নেই এই কাজের ফলাফল বাস্তবায়ন করার। মুমিন সর্বাত্মক চেষ্টা করবে কাঙ্খিত লক্ষ্যার্জনের, তবে চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ন্ত্রণের কোনো, ক্ষমতাই মানুষের নেই। আর এখানেই তাওয়াক্কুলের প্রসঙ্গ চলে আসে। কেননা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সেই মহামহিমের হাতে। তিনিই নিজ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান মোতাবেক যাবতীয় সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন।
وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ “কে সব বিষয় পরিচালনা করেন?”১
মুমিন এই অমোঘ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞাত। তাই সে আল্লাহর সুন্নাত মাফিক সকল প্রকার ব্যবস্থা-উপায়-উপকরণ গ্রহণ তো করে, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করে। অকারণে উদ্বিগ্ন হয় না। ইবনু আতার কথার মর্মও এটাই যে, মানুষ কাজ করতে পারলেও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনার নাটাই আল্লাহরই হাতে, তাই মানুষ নিজের ব্যবস্থা নিজেই নিতে পারে না। কারণ, এই কর্তৃত্ব তো আল্লাহ নিয়েই নিয়েছেন। এখন মুমিনের কর্তব্য নিজের করণীয় সঠিকভাবে সম্পন্ন করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। নবী তাওয়াক্কুলের ব্যাপারে চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন,
"যদি তোমরা সত্যিই তাওয়াক্কুল করতে তবে আল্লাহ তোমাদেরকে রিযক দান করতেন যেভাবে তিনি পাখিদেরকে রিযক দিয়ে থাকেন, পাখি সকালে খালি পেটে বের হয়ে ফিরে আসে ভরা পেট নিয়ে।”২
কিন্তু কেউ কেউ দীনের এই সরল শিক্ষার অনুসরণ করে না। তারা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়, অন্যের কাছে চেয়েচিন্তে দিনগুজার করে। তাদের যুক্তি, 'তাদবীর আমাদের কাজ নয়'। এরূপ পরিস্থিতি রাসুলুল্লাহ এর সময় তৈরী হয়নি। বর্ণনায় এসেছে এক লোক মসজিদে বসে ইবাদাত করত। নবী জিজ্ঞাসা করলেন তার রিযকের ব্যবস্থা হয় কীভাবে? বলা হলো তার ভাই তার জন্য উপার্জন করে। নবী বললেন, “তার ভাই তার থেকে উত্তম!” একই রকমভাবে উমার রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর ওপর ভরসা করার দাবীকারী কিছু লোককে দেখে তিনি সেই বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, "আকাশ সোনা-রূপা বর্ষণ করে না।"
প্রয়োজনীয় সকল মাধ্যম অবলম্বনের পরেও যদি সাফল্য না আসে তবে তাওয়াক্কুল প্রত্যাশিত। আল্লাহ মানুষের কাঙ্খিত ফলাফল প্রতিরোধ করেন বা উপকরণ কেড়ে নেন যাতে লোকেরা তাঁর দিকে ফিরে আসে, তাঁর ওপর ভরসা করে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহ প্রদত্ত একটি উপহার, যদি সত্যিই আমরা বুঝতে পারি তো।
এ কারণে পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই, বাজার বিশ্লেষণসহ সাফল্যের জন্য কোনো প্রকার পদক্ষেপই তাওয়াক্কুলের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, সংগঠন, গবেষণা-এসকল কিছুই সাফল্যের মাধ্যম, উপায়-উপকরণ। এগুলো স্বয়ং তাওয়াক্কুলের অন্তর্ভুক্ত। আপনি সফল হোন বা না হোন, সকল ক্ষেত্রেই তা আল্লাহর সিদ্ধান্ত। কোনো ক্ষেত্রেই আপনি ফলাফল নিয়ে চিন্তা করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না।
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কেউ আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ায় কিংবা ইবাদাত করায় উৎকর্ষতা অর্জন করতে চায়। এক্ষেত্রেও আমরা নিজেদের সাধ্যমত সর্বোচ্চটুকু করে যাবো, বাকী ফলাফল দেবার মালিক আল্লাহ।
لَيْسَ عَلَيْكَ هُدُهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ.
"তাদেরকে হেদায়াত করার দায়িত্ব আপনার নয়, কিন্তু আল্লাহ যাকে চান হেদায়াত করেন।"১
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ.
"নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালবাসেন তাকেই আপনি হেদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন। আর হেদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।”২
টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৫৯
১. সূরা ইউনুস, ১০:৩১
২. তিরমিযী: ২৩৪৪
১. (সূরা বাকারাহ, ২:২৭২)
২. (সূরা কাসাস, ২৮:৫৬)
📄 চতুর্থ পদক্ষেপ : ইখলাস
“আমলসমূহ মৃত চিত্রকর্মের মত, ইখলাসের মাধ্যমেই তাতে প্রাণসঞ্চার হয়।”
তাওয়াক্কুলের চাইতেও ইখলাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তাওয়াক্কুল স্বস্থানে অতীব তাৎপর্যময় এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে ইখলাস আরও গভীর ও সূক্ষ্ম। এ কারণে আল্লাহর অপরিসীম দয়ার স্বীকৃতি ও তাঁর প্রতি শক্ত নির্ভরতা না থাকলে ইখলাস অর্জন করা সম্ভব নয়।
ইখলাস কি? ইখলাস হলো নিজ অন্তরের নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। আল্লাহর প্রতি সততা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের প্রতি একনিষ্ঠতা। একটি হাদীছে কুদসীতে এসেছে, "ইখলাস বা একনিষ্ঠতা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার অন্তরে প্রক্ষেপিত একটি রহস্য, যা তিনি তাদেরকেই দেন যাদের তিনি ভালোবাসেন।” নবী এর একটি বিখ্যাত হাদীছে এসেছে,
"নিশ্চয়ই নিয়্যাতের ওপর আমলসমূহ নির্ভরশীল। প্রত্যেকেই তা পাবে যার নিয়্যাত সে করেছে। সুতরাং যে আল্লাহ ও রাসূলের জন্য হিজরত করেছে তাঁর হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই। যে জাগতিক স্বার্থোদ্ধার কিংবা কোনো মহিলাকে বিবাহের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যের তরেই, যার জন্য সে হিজরত করেছে।" (বুখারী ও মুসলিম)
কেউ কেউ ব্যবসা ও বিবাহের স্বার্থে হিজরত করেছিলো, তারা তাদের নিয়্যাত অনুসারে ফলাফল পাবে। তবে সাহাবীরা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল ও তাঁর রাসূলকে সহায়তা করার জন্যই হিজরত করেছিলেন। আর তাদের প্রতিদানও তাদের নিয়্যাত অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে। আল্লাহ তাঁদের প্রতিদান সম্পর্কে জানাচ্ছেন,
وَالسَّبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهْجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَنٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنْتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।"
বিশুদ্ধ নিয়্যাত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইখলাসবিহীন আমল প্রদর্শনমাত্র, এর উদ্দেশ্য হয় মানুষকে খুশি রাখা, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা নয়। মানুষকে খুশি করার জন্য ইবাদাত করা এক প্রকারের শিরক ও নিফাক। আল্লাহ মুনাফিকদের বর্ণনা দিতে যেয়ে বলেছেন,
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ يُخْدِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَدِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلوةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
"নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়-কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।"
আখিরাতে যারা সর্বাধিক শাস্তি পাবে তারা হচ্ছে
الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُوْنَ
"যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে।"
প্রতিটি কাজই সঠিক নিয়্যাত নিয়ে করতে হবে। প্রতিটি কাজের শুরুতেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া উচিত এই যে, সাদাকা দিচ্ছি, হজ্জ করছি, অন্যকে সাহায্য করছি, সালাত আদায় করছি, উপকারী বইপত্র পড়ছি-এতকিছু কিসের জন্য? নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আমরা পানাহার, কাজ-কারবার করা, বিবাহশাদি করা, ভ্রমণ করা, বেচাকেনাসহ আমাদের দৈনন্দিন জাগতিক অভ্যাসাদি ও কর্মকাণ্ডকে ইবাদাতে পরিণত করতে পারি।
যেমন-কেউ শুধুমাত্র ক্ষুধা নিবারণের জন্যই নয়; বরং এর পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদাতের জন্য শক্তিসামর্থ্য অর্জনের জন্যও খেতে পারে, তখন খাওয়ার মত নিতান্ত জাগতিক কাজও ইবাদাতে পরিণত হবে। ভালো দেখানোর জন্য পোশাক পরাতে কোনো দোষ নেই, তবে যদি আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ ও শিষ্টাচার প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কেউ পোশাক পরে তবে এই কাজটি ইবাদাতে রূপ নেবে। আমরা বেতন পাবার জন্য কাজ করতে পারি, তবে যদি এর পেছনে সাদাকা দেওয়া, হজ্জ করা কিংবা পরিবারের ভরণপোষণ বহন করার নিয়্যাতও যুক্ত থাকে তবে এই কাজটিই ইবাদাতে পরিণত হবে। বিশুদ্ধ নিয়্যাত যেমন জাগতিক কাজকর্মকে ইবাদাতে পরিণত করে, তেমনি তা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির যাত্রায় এগিয়ে যেতেও সহায়তা করে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময় সালাত আদায়, যাকাত দান এগুলোর মাধ্যমেই কেবল ইবাদাত করে থাকেন; তারা আল্লাহর পথে আরও বেশি অগ্রসর হতে পারতেন যদি দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোকে কীভাবে ইবাদাতে পরিণত করতে হয় সেই সম্পর্কে জানতেন।
এক সূফী ইমাম তাঁর ছাত্রদের সাথে বসা ছিলেন। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন। দরজা খোলার আগে তিনি ছাত্রদের বেশ কয়েকটি নিয়্যাতের কথা উল্লেখ করলেন। যদি দরজা খুলে কোনো হতদরিদ্র ব্যক্তিকে পাওয়া যায় তবে আমরা তাকে সাদাকা দেবো, যদি অভাবী কেউ আসে তবে তাকে সাহায্য করবো, পথহারা কোনো মুসাফির দেখতে পেলে তাকে পথ দেখিয়ে দেবো, কোনো ছোট বাচ্চা হলে তার প্রতি সদয় হবো, কোনো ছাত্র হলে তাকে শেখাবো। দরজা খোলার মত একান্ত ক্ষুদ্র একটি কাজও বিশুদ্ধ নিয়্যাতের জোরে ইবাদাতে পরিণত হলো!
আল্লাহর কাছে দুআ করি যেন তিনি আমাদেরকে আন্তরিক একনিষ্ঠতা দান করেন, আমাদের অভ্যাসগুলোকে ইবাদাতে পরিণত করার তাওফীক দেন এবং কেবল তাঁর জন্যই জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেন।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.
"বলো, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ শুধু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।"
টিকাঃ
১. (সূরা তাওবা, ৯:১০০)
২. (সূরা নিসা, ৪:১৪২)
৩. (সূরা মাউন, ১০৭:৬)
১. সূরা আনআম, ৬:১৬২-১৬৩।