📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি এবং আমাদের উম্মাহর অবস্থা

📄 অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি এবং আমাদের উম্মাহর অবস্থা


আমার ধারণা মানুষের মনের গহীনে এমন এক জায়গা আছে, যখন কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না, তখন আমরা সেথায় লুকাই। আর সম্ভবত, মানুষের হৃদয়ে এমন একটা অংশ আছে, যেখানে অচিন্তনীয় ট্রাজেডিগুলি আমরা আজীবন প্রত্যক্ষ করতে পারি। তবে আজ সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের লোকদের জন্য ট্রাজেডি আর মনের বা হৃদয়ের কোনো ভাবনা বা প্রতিচ্ছবিমাত্র নয়, বরং এটা তাদের একমাত্র বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

অসহায়ের মতো আমি যখন এসব দেশে চলমান হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করি, আমিও ভেবে পাই না যে, কোথায় যাবো। মনের মাঝে আমি এমন এক জায়গা খুঁজতে থাকি, যেখানে এই সব অর্থহীন কাজের কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে এবং কল্পনা করা যাবে যে, আসলে এসব কিছুই ঘটছে না। আমি হারিয়ে যাই। দুঃখ, রাগ ও নৈরাশ্যের মাঝে, আবার বাস্তবতায় ফিরে আসি। কিন্তু শেষ অবধি আমি ফিরে আসি এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি:

কেন?

কেন এমনটি হচ্ছে আমাদের সাথে? গোটা দুনিয়া জুড়ে কেন আমরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছি? কেন আমরা এতটা অসহায় যে, এগুলো থামানোর এতটুকু শক্তি আমাদের নেই? আমরা যে দেশের নাগরিক, রাজনৈতিকভাবে সে দেশেই আমরা কেন এতটা অক্ষম - অধিকারহীন? 'নিজেকে রক্ষা করার অধিকার ইসরাইলের আছে' হোয়াইট হাউজের প্রতিনিধিদের মুখ থেকে মন্ত্রের মতো অবিরাম এই বুলি শোনার জন্য কেনইবা আমরা নিজেদের সবটুকু শক্তি উজাড় করে তাদের বরাবর চিৎকার করি, চিঠি লিখি এবং আহ্বান করি? কেন আমরা এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছি? কেন? আমাদেরকে এই "কেন" প্রশ্নটিই করতে হবে?

আমাদের ধীর-স্থির ও গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে যে, উম্মাহ (জাতি) হিসেবে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এবং আমাদের বর্তমান অবস্থাই বা কি। একটা সময় ছিল দুনিয়া জুড়ে মুসলিমদেরকে যখন সমীহ করা হতো, যখন বন্ধুরা আমাদের ভালোবাসতো আর শত্রুরা ভয়ে কাঁপতো। আর আজ আমরাই পরিণত হয়েছি দুনিয়ার সবচেয়ে সমালোচিত, নিন্দিত এবং ঘৃণিত জাতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে Gallup poll পরিচালিত সমীক্ষাতে ইসলাম সম্পর্কে প্রায় অর্ধেকের মতো আমেরিকানের মতে ইসলাম "তেমন একটা সন্তোষজনক নয়" অথবা "আদৌ সন্তোষজনক নয়” এবং শতকরা ৪৩ জন আমেরিকান অকপটে স্বীকার করেছেন যে, অন্তত "অল্প” পরিমাণ হলেও মুসলিমদের ক্ষেত্রে তারা বিরূপ ধারণা পোষণ করেন। খ্রিস্টান, ইহুদি কিংবা বৌদ্ধদের (প্রতি বিরূপ ধারণার) তুলনায় এ হার দ্বিগুণেরও বেশি।

এদিকে আমাদেরকে যে কেবল ঘৃণা করা হচ্ছে তা-ই নয়, বরং বহু স্থানে আমাদের ওপর চলছে অত্যাচারের স্টিম রোলার, চালানো হয় হত্যাযজ্ঞ এবং কেড়ে নেওয়া হচ্ছে আমাদের যাবতীয় সহায় সম্পত্তি। যেখানে আমাদের শারীরিকভাবে টার্গেট করা হচ্ছে না, সেখানে অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয় আমাদের অধিকার, মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত, এমনকি কারারুদ্ধ করা হচ্ছে। বস্তুত মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা এতটাই বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মিথ্যাচার ও বাগাড়ম্বর -এখন এক ধরনের গ্রহণযোগ্য গোড়ামীতে পরিণত হয়েছে। মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্যের কদর এতটাই বেড়েছে যে, রাজনৈতিকভাবে সুবিধা আদায়ের স্বার্থে কেউ কেউ এটাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

উম্মাহ হিসেবে নিজেদের আমরা এই যে অবস্থায় আবিষ্কার করছি, এর বিস্তারিত বিবরণ ১৪০০ বছর আগেই দেওয়া হয়েছিল।

নবি মুহাম্মদ (ﷺ) তার সাহাবিগণকে (রাদিআল্লাহু আনহুম) উদ্দেশ্য করে বলেন:
"তোমাদের ওপর হামলা করার জন্য শীঘ্রই লোকজন একে অপরকে ডাকবে, যেন খাবারের টেবিলে শরিক হওয়ার জন্য একে অপরকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।”

একজন জিজ্ঞাসা করলেন, "ওই সময় আমরা কি সংখ্যায় কম হবো, যে কারণে তারা এমনটি করবে?"

তিনি (ﷺ) উত্তরে বললেন, "না, বরং ওই সময় সংখ্যায় তোমরা বিপুল হবে, বরং তোমরা হবে ফেনার মতো, যেটাকে (সমুদ্রের) ঝড় আছড়ে ফেলে এবং আল্লাহ তোমাদের দুশমনদের হৃদয় থেকে তোমাদের ভয় তুলে নেবেন এবং তোমাদের অন্তরে ‘আল-ওয়াহন’ ঢেলে দেবেন।"

একজন জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রসুল, আল-ওয়াহন কি?” তিনি উত্তরে বলেন: এই দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।” [আবু দাউদ এবং আহমদ কর্তৃক বর্ণিত সহিহ হাদিস]

যেমনিভাবে নবি (ﷺ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ঠিক তেমনিভাবেই লোকজন খাবারে শরিক হওয়ার জন্য একে অপরকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো করেই লোকেরা আমাদেরকে আক্রমণের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এই হাদিসে নবি (ﷺ) আমাদের অবস্থা জলের ফেনার ন্যায় হবে বলেও আগাম বার্তা দিয়ে রেখেছেন। আপনি যদি সমুদ্রের প্রবাহমান তরঙ্গরাজির দিকে লক্ষ্য করেন, তবে দেখবেন তার ওপর ফেনার পাতলা আবরণ, যা সম্পূর্ণ ওজনহীন এবং তাতে সামান্যই সারবস্তু থাকে। বাতাসের হালকা প্রবাহই এটা ধ্বংস করে দিতে পারে। নিজের চলার পথ নির্ধারণ করার মতো ক্ষমতাও এটার নেই, বরং স্রোত এটাকে যে দিকে নিয়ে যায়, সে দিকেই এটা চলে।

এটাই আমাদের বর্তমান অবস্থা, যেমন নবি (ﷺ) বর্ণনা করেছেন। আমাদেরকে আবারও ফিরে যেতে হবে সেই একই প্রশ্ন ‘কেন’-এর দিকে। নবি (ﷺ) এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, অন্তরগুলো ওয়াহন দ্বারা ছেয়ে যাবে। ওয়াহন শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করলে, নবি (ﷺ) অল্প কথায় এটার যে জবাব দেন, তা সুগভীর এক সত্যকে ধারণ করে আছে। তিনি বলেন, “এই দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুকে ঘৃণা করা।” নবি (ﷺ) এখানে এমন লোকদের বিবরণ দিচ্ছেন, যারা পার্থিব জীবনে নিয়ে এতটাই মত্ত যে, দুনিয়া তাদেরকে বানিয়েছে নিদারুন স্বার্থপর, বস্তুবাদী, অপরিণামদর্শী এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সম্পূর্ণ গাফেল। তিনি (ﷺ) এমন লোকদের বর্ণনা দিয়েছেন, যারা এতটাই দুনিয়াদার হয়ে পড়েছে যে, তারা নৈতিকতা হারিয়ে ফেলছে।

কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটে নৈতিকতার ক্ষেত্রে তার অবস্থার কারণে - হয় ভালো থেকে খারাপের দিকে, না হয় খারাপ থেকে ভালোর দিকে ঘটে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) আমাদেরকে বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (কুরআন, ১৩:১১) অতএব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বদৌলতে একটি জাতি সুপার পাওয়ার থেকে সমুদ্রের জলরাশির তুচ্ছ ফেনাতে পরিণত হয়। আবার অন্তর ও চরিত্রকে পরিবর্তনের মাধ্যমেই যে জাতি ছিল এক সময় ছিল সমুদ্রের ফেনার মতো, তারাও পুনরায় শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হতে পারে।

সেজন্য, মুসলিম হিসেবে আমাদের হতাশ হবার কারণ নেই। কারণ আল্লাহর দ্বীনের নাস্ত্র (তথা সাহায্য ও বিজয়) প্রতিশ্রুতি আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি আর আমি এটার অংশ হবো কিনা। আল্লাহ (স) কুরআনে আমাদেরকে এটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যখন তিনি বলেন, "তোমরা দুর্বল হয়ো না, দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি (সত্যিকারের) মুমিন হও।” (কুরআন, ৩:১৩৯)

একনিষ্ঠ ঈমান এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার ভিত্তিতেই আল্লাহ (স) আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। তাই সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং আজকের দুনিয়ার সর্বত্র যারা রক্তাক্ত হচ্ছেন, অন্তত তাদের জন্য হলেও উম্মাহ হিসেবে আমাদেরকে জেগে ওঠা এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 লোহিত সাগরের নবতর উন্মোচন: মিসরের ঘটনাবলির ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ

📄 লোহিত সাগরের নবতর উন্মোচন: মিসরের ঘটনাবলির ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ


নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন লোহিত সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন পিছন থেকে ধেয়ে আসছিল এক অত্যাচারী রাজা ও তার বাহিনী। তা দেখে মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর লোকদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। কেননা, সামনে তারা পরাজয় ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না।

"অতঃপর যখন দুই দল পরস্পরকে দেখলো, তখন মুসার সঙ্গিরা বলে উঠলো, 'আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।"” (কুরআন, ২৬:৬১)

কিন্তু মুসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন এক ভিন্নতর দৃষ্টিশক্তির অধিকারী। তার ছিল রুহানি দৃষ্টি, যা দুনিয়ার কষ্ট-বেদনা ও পরাজয়ের মিথ্যা বিভ্রম ভেদ করে দেখতে সক্ষম। এহেন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি প্রকৃত অবস্থা দেখতে পেলেন। দৃশ্যমান আপাত অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন সেই সত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত আত্মার অধিকারী মুসা (আলাইহিস সালাম) দেখলেন কেবল মহান আল্লাহর কুদরতকে:
"মুসা বললো, 'কখনোই নয়!আমার সাথে আছেন আমার প্রতিপালক; শীঘ্রই তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।"
قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ (কুরআন, ২৬:৬২)

"অতঃপর মুসার প্রতি ওহি করলাম, 'তোমার হাতের লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো।' ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রতিটি অংশ বিশাল পর্বতের মতো হয়ে গেল। ওদিকে আমরা অপর দলটিকে সেখানে পৌঁছে দিলাম। মুসা ও তার সঙ্গি সকলকে আমি উদ্ধার করলাম, কিন্তু অপর দলকে আমরা ডুবিয়ে মারলাম।" (কুরআন, ২৬:৬১)

আজ আমরা মিসরে যেন এমনি এক লোহিত সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে। আজকের এই মিসরেও আমাদের ওপর হামলে পড়েছে এক নিপীড়ক ও তার সৈন্য বাহিনী। আজও কিছু লোকের চোখেমুখে শুধুই পরাজয়ের আশংকা। তা সত্ত্বেও কিছু লোক আছে পথের সমস্ত অবরোধ ভেদ করে শুধুই তাদের দৃষ্টি প্রসারিত, আর তারা কেবল আশাল আলোই দেখে। আজকের এই মিসরে নিপীড়কদের অব্যাহত হামলারও মুখেও কিছু লোক এমন আছে, যারা বলে:
"নিশ্চয়ই, আমার সঙ্গে আছেন আমার রব; তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।"
قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ

কেউ বিস্মিত হতে পারেন, ইতিহাসের এমন সংকটপূর্ণ সময়ে আমরা কেন প্রাচীন এক ঘটনা স্মরণ করছি। হাজার বছর আগে সংঘটিত ঘটনা আজকের যুগে কিভাবে প্রাসঙ্গিক? কারণ হলো, এটা কোনো সাধারণ গল্প নয়। প্রাচীন কিছুও নয়। এটা এক চিরস্থায়ী নিদর্শন এবং সর্বকালের জন্য এক উপদেশ। ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চিতভাবে এর মাঝে নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ লোকই এগুলো বিশ্বাস করে না।"
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُم مُّؤْمِنِينَ
(কুরআন, ২৬:৬৭)

এটাই আল্লাহর সত্যতার এক নিদর্শন এবং এই দুনিয়ার এক রহস্য। এটা এক নিদর্শন যে, স্বৈরাচারের কখনো জয় হয় না এবং যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা - সবই এক মায়াজাল, এগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল আমাদেরকে পরীক্ষা করতে, আমাদের প্রশিক্ষিত করতে এবং পরিশুদ্ধ করতে। সর্বোপরি সাফল্যের উৎস কি, এটা তারই একটা নিদর্শন। আর এটা হলো সমস্ত প্রতিবন্ধকতার মুখে সফলতার একটি প্রতিচ্ছবি – এমন একটি সময়ে, যখন আমাদের মনে হয়, আমরা ফাঁদে আটকা পড়ে গেছি, পরাজিত হয়েছি এবং বিরুদ্ধবাদীদের সামনে একেবারে অক্ষম হয়ে পড়েছি।

কেউ হয়তো এ প্রশ্ন করতে পারেন যে, সত্য-সত্যই যদি আমরা আল্লাহর পথে থেকে থাকি, তবে বিজয় আমাদের নিকটে সহজে ধরা দিচ্ছে না কেন? কেউ হয়তো অবাক হতে পারেন যে, এতসব প্রবল সংগ্রাম ও কুরবানি ছাড়াই কেন আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মশীলদের বিজয়ী করে দেন না। এই প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ তা'আলা দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন:

"আমি কোনো জনপদে নবি পাঠালে তার অধিবাসীদের অর্থ- সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ দ্বারা আক্রান্ত করি, যাতে তারা নমনীয় হয় (অর্থাৎ তাদ্বাররু' পর্যায়ে উপনীত হয়)।”
وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّبِي إِلَّا أَخَذْنَا أَهْلَهَا بِالْبَأْسَاءِ وَالضَّرَاءِ لَعَلَّهُمْ يَضَّرَّعُونَ
(কুরআন, ৭:৯৪)

এখানে আল্লাহ বলে দিচ্ছেন যে, বালা ও মুসিবতের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে: তাদ্বারু' অবস্থা অর্জন করা। আল্লাহর সামনে বিনীত-বিনম্র হওয়াটাই তাদ্বারু', কিন্তু এটা কেবলই বিনয়-নম্রতা নয়। 'তাদ্বারু' বিষয়টি বুঝতে হলে, নিজেকে আপনি সমুদ্রের মাঝে কল্পনা করুন। কল্পনা করুন, আপনি [ওই মাঝ দরিয়াতে] একাকি নৌকার ওপর। কল্পনা করুন, ওই অবস্থায় আপনার ওপর এসে গেছে এক প্রবল ঝড় আর পাহাড় সমান ঢেউ চারপাশ থেকে আপনাকে ঘিরে ধরেছে। এখন চিন্তা করে দেখুন, ঠিক এই অবস্থায় আপনি আল্লাহর দিকে ফিরছেন এবং তাঁর সাহায্য ও আশ্রয় কামনা করছেন। এমতাবস্থায়, কি পরিমাণ দীনতা, আল্লাহ ভীতি, তাঁর প্রতি নির্ভরতা ও বিনম্রতায় আপনার অন্তরটা ছেয়ে যাবে, তা একবার ভেবে দেখুন? এটাই তাদ্বারু'। আল্লাহ বলেন, তিনি বালা ও মুসবিতের এই সব পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন, যাতে করে তিনি আমাদেরকে এই উন্নত মানসিক অবস্থা উপহার দিতে পারেন। আমাদের জন্য পরিস্থিতি জটিল করার প্রয়োজন আল্লাহর নেই। তিনি এই অবস্থাগুলি সৃষ্টি করেন, যাতে করে আমরা তাঁর নৈকট্য লাভের অবস্থায় উন্নীত হতে পারি। অন্যথায় আমরা সে অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না।

মিসরের জনগণ আজ বিনয়-নম্রতা, আল্লাহর নৈকট্য এবং তাঁর ওপর পুরোপুরি তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতার সেই অমূল্য নিয়ামত লাভে ধন্য হয়েছে। আল্লাহু আকবার -আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু আল্লাহ এসব কষ্ট ও সংগ্রামের পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
"আর দুনিয়ায় আমি তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করি; তাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ ও কতক অন্যরূপ এবং মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করি, যাতে তারা (আনুগত্যের দিকে) ফিরে আসে।”
وَقَطَعْنَاهُمْ فِي الْأَرْضِ أُمَمًا مِّنْهُمُ الصَّالِحُونَ وَمِنْهُمْ دُونَ ذَلِكَ وَبَلَوْنَاهُم بِالْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
(কুরআন, ৭:১৬৮)

সুরা আল-ইমরানে আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যে বলেন: "তোমরা যদি আঘাত পেয়ে থাকো, একই রকম আঘাত তো অপর লোকদেরও (অর্থাৎ মুশরিকদের) লেগেছিল। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলো পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই, যাতে করে আল্লাহ মুমিনদের জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে শহীদ (সত্যের সাক্ষী) হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ জালিমদেরকে ভালোবাসেন না। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন এবং কাফিরদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেন। তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে (তাঁর পথে) সংগ্রাম করেছে এবং সবর ইখতিয়ার (তথা কঠিন বিপদে ধৈর্য ধারণ) করেছে, তা এখনো প্রকাশ করেননি?” (কুরআন, ৩:১৪০-১৪২)

এখানে, আল্লাহ কষ্ট ও দুর্ভোগের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে “তামহিস” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্বর্ণকে উত্তপ্ত করে সেটাকে বিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়া বর্ণনার জন্য ঠিক এই তামহিস শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। যদিও স্বর্ণ মূল্যবান ধাতু, কিন্তু উত্তপ্ত করা ছাড়া এটাকে পরিপূর্ণভাবে খাদ মুক্ত করা যায় না। উত্তপ্ত করার এই প্রক্রিয়াকে তামহিস বলে এবং এর মাধ্যমে স্বর্ণ থেকে সকল খাদ সরানো হয়। মুমিনদের সাথে আল্লাহ এটাই করেন। কষ্ট ও দুর্ভোগের মাধ্যমে মুমিনগণ পরিশুদ্ধ হন, যেমনিভাবে উত্তাপে স্বর্ণ হয় খাদমুক্ত।

আর এভাবেই মিসরীয়রা পরিশুদ্ধ হচ্ছে। অভ্যুত্থানের কিছুদিন আগেও মিসরের যুবকদেরকে বিশ্ব অকর্মণ্যই বিবেচনা করতো। আমরা তাদেরকে পথহারা- বিভ্রান্ত মনে করতাম এবং ভাবতাম তাদের কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নেই। মনে করতাম রাস্তায় রাস্তায় ঘুরাফেরা করা, নারীদেরকে শিস দেওয়া কিংবা ইন্টারনেট ক্যাফেগুলোতে হুক্কা টানার জীবনই তারা বেছে নিয়েছে। কিন্তু এই কষ্ট ও দুর্ভোগ মিসরের যুবকদেরকে মৃত্যুপুরী থেকে ফিরিয়ে এনেছে।

আর এই যুবকরাই এখন রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, সলাত আদায় করছে, আকাশের দিকে দু'হাত তুলে নিজেদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছে। এই মানুষগুলি, কিছুদিন আগেও যাদের সলাতে খুঁজে পাওয়া যেত না, আজ সেনা বাহিনীর ট্যাংকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের স্রষ্টার উদ্দেশ্যে সেজদা দিচ্ছে। অভ্যুত্থানের কিছু দিন আগেও মিসরের মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মাঝে বৈরিতা সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছিল। আজ মুসলিম ও খ্রিস্টান একে অপরের নিরাপত্তা এবং নিজেদের দেশের স্বার্থে কাঁধে মিলিয়ে কাজ করছে। এই লোকেরাই, যারা গতকালও পরস্পরকে একবিন্দু বিশ্বাস করতো না, অথচ অভ্যুত্থানের পরীক্ষার আগুনে যখন তাদের উত্তপ্ত করা হলো, তখন তারাই পরিণত হয়েছে একে অপরের ভাই ও বোনে, যেন তারা একই দেহ তাদের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি এবং তাদের পাড়া পড়শিদেরকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। যারা এই ক'দিন আগেও বেঁচে থাকতো কেবল মুঠোফোন, সীসা ও সিগারেটের জন্য, এই কঠিন অবস্থায় পড়ে আজ তারাই তাদের জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিতে রাজি।

আল্লাহ কুরআনে আমাদেরকে বলেন: "বলো, 'কে তোমাদেরকে আকাশ ও পৃথিবী হতে জীবনোপকরণ সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন? জীবিতকে মৃত হতে কে বের করে এবং মৃতকে জীবিত হতে কে বের করে এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, 'আল্লাহ'। বলো, 'তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?"
قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ
(কুরআন, ১০:৩১)

আল্লাহই মৃত থেকে জীবিতকে বের করে আনেন। তিনিই আমাদেরকে মৃত অবস্থা থেকে পুনরায় জীবিত করেছেন। এক মুহূর্তের জন্যও ভাববেন না যে, এর কোনো এক মুহূর্তের ঘটনাও কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই এসব ঘটছে। বরং এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে সুগভীর, প্রগাঢ় এবং সুন্দরতম উদ্দেশ্য। যুগের পর যুগ মিসরের জনতা ভয়-ভীতির মধ্যে বসবাস করেছে। কিন্তু যখন আপনি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভয়কে সুযোগ করে দেন, তখন আপনি দাস ছাড়া আর কিছুই নন। তাদের সবচেয়ে বড় ভীতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে এবং তাকে পরাস্ত করার মাধ্যমে আল্লাহপাক মিসরের জনগণকে এই দাসত্ব থেকে মুক্তি দান করেছেন। আল্লাহ মিসরবাসীকে মুক্ত করেছেন, তাদের সুযোগ করে দিয়ে যে, তারা স্বৈরাচারের চোখে চোখ রেখে তাকে এবং গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দেয়, মিসরের জনগণ ভয়ের মধ্যে বাস করে না। তাই মোবারক থাকুক বা না থাকুক, সে বাঁচুক অথবা না বাঁচুক, সেটা আর বিবেচ্য নয়। কারণ, মিসরের জনগণ ইতোমধ্যেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

তাদেরকে মুক্ত করা হয়েছে।৮০

হুসনি মুবারক এখানে অপ্রাসঙ্গিক। সে একটা উপকরণ মাত্র। এমন এক উপকরণ, যার মাধ্যমে আল্লাহ মিসরের জনগণ ও গোটা উম্মাহর জন্য নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী মিসরের জনগণ এবং গোটা উম্মাহকে পরিশুদ্ধ, সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং স্বাধীন করার একটা হাতিয়ার মাত্র সে। আমরা মিসরে থাকি আর না থাকি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মিসর আমাদের দেহের একটি অঙ্গ। মিসরের পরিশুদ্ধি মানে আমাদের উম্মাহর গোটা দেহেরই পরিশুদ্ধি। এটা আমার এবং আপনার পরিশুদ্ধি। এই পরিস্থিতি আমাদের নিজেদেরকে এই প্রশ্ন করার সুযোগ করে দিয়েছে যে, কিসের প্রতি আমরা আসক্ত-অনুরক্ত? কিসের ভয়ে আমরা ভীত? কিসের জন্য আমরা সংগ্রাম করছি, প্রচেষ্টা চালাচ্ছি? আমরা কোন নীতি আদর্শের পক্ষে? আমরা চলছিই কোন দিকে?

দেহ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বা অচেতন হয়ে কোমাতে, তখন কেবল তাঁর অপরিসীম দয়া ও করুণায় তিনি আমাদের জেগে ওঠার ডাক দিয়েছেন। যেখানে এক সময় ছিল মৃত্যুর হিমশীতল নিশ্চলতা, সেখানে তিনি তাঁর অপার করুণায় আমাদের পুনরায় জীবন দান করেছেন। আমরা গাফেল-অমনোযোগী ছিলাম, তাই তিনি পাঠালেন সতর্কবার্তা। আমরা ছিলাম গভীর ঘুমে অচেতন, তিনি আমাদেরকে জাগ্রত করলেন। আমরা হয়ে ওঠেছিলাম দুনিয়া পূজারী। যে মুক্ত আত্মা আল্লাহর সাথেই জুড়ে থাকে এবং কেবল তাঁকেই ভয় করে, তার চেয়ে আমরা পছন্দ করতাম দুনিয়ার ভোগ-সামগ্রীকে- তাই তিনি তা থেকে আমাদের মুক্ত করলেন।

ক'জন মানুষ তাদের জীবনে এমন অভিজ্ঞতার স্বাক্ষী হবে? আর ক'জন মানুষের কপালে সমুদ্র বিদীর্ণ হওয়ার এমন ঘটনা ঘটবে, যখন তারা স্বৈরাচারকে এভাবে অবনমিত করা হবে, এভাবে পতনে বাধ্য করা হবে? আমরা কি নিজেদেরকে এই প্রশ্ন করবো না যে, কেন আমাদেরকে এটা প্রত্যক্ষ করার জন্য বেছে নেওয়া হলো? এখান থেকে আমরা কি শিখতে পারি, কি পরিবর্তন ও রূপান্তর আমরা নিজেদের জীবনে আনতে পারি, এই প্রশ্নগুলো কি আমাদের নিজেদেরকে করা উচিত নয়? কারণ, আমরা যদি মনে করি, এগুলো কেবল মিসরের জনগণের ব্যাপার, আমাদের জন্য এখানে কিছুই নেই, তাহলে পুরো বিষয়টির মর্ম বুঝতে আমরা নিদারুনভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা ছিলাম ঘুমিয়ে, আর আল্লাহ আমাদেরকে জাগ্রত করেছেন।

আমরা ছিলাম মৃত, আল্লাহ চাইলেন আমাদেরকে প্রাণ দিতে।

আমাদেরকে এমন ঘোরের মধ্যে রাখা হয়েছে যে, আমরা ভাবি, আমরা বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত। আর সে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আসলে এটাও একটা ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। শত্রু আমাদের নিজেদের মধ্যেই অবস্থান করছে। যাবতীয় বহিঃশত্রুগুলি আসলে আমাদের মধ্যস্থ রোগেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই যদি বাহিরের এসব শত্রুকে জয় করতে হয়, তবে আমাদেরকে সর্বপ্রথম নিজেদের মধ্যে বসবাসরত শত্রুদেরকে জয় করতে হবে। এই কারণে কুরআন আমাদেরকে বলে দিচ্ছে:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।"
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ (কুরআন, ১৩:১১)

সর্বপ্রথম আমাদেরকে লোভ, স্বার্থপরতা, শির্ক, চরম ভয়ভীতি, প্রেম-ভালোবাসা, আশা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাকে জয় করতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই হুদ্বুদ দুনিয়া (তথা দুনিয়ার মহব্বতের) ওপর জয় লাভ করতে হবে। কারণ, আমাদের যাবতীয় রোগ এবং সকল নির্যাতনের মূল কারণ এটাই। বাস্তব জগতের ফেরাউনগুলোকে পরাস্ত করার আগে, আমাদের মাঝে বসবাসরত ফেরাউনগুলোকে আগে পরাস্ত করতে হবে। তাই মিসরের এই সংগ্রাম প্রকৃত অর্থেই মুক্তির সংগ্রাম। হ্যাঁ, কিন্তু কিসের থেকে মুক্তির সংগ্রাম? সত্যিকার অর্থে নির্যাতিত কে? আপনি আর আমি কি আসলেই স্বাধীন ও মুক্ত? সত্যিকারের নির্যাতন কাকে বলে? এই প্রশ্নের জবাব ইবনে তাইমিয়া (র.) এভাবে দিয়েছেন, "সত্যিকার কারারুদ্ধ সে-ই, যার অন্তর আল্লাহর থেকে কারারুদ্ধ (অর্থাৎ সে আল্লাহর নৈকট্য লাভে অক্ষম বা ব্যর্থ), আর প্রকৃত কয়েদি তো সে-ই, যার কামনা-বাসনা যাকে তার গোলাম বানিয়ে নিয়েছে।” (ইবনে কাইয়্যিম, আল-ওয়াবিল)

যখন আপনি আত্মিকভাবে স্বাধীন ও মুক্ত, তখন কাউকে আপনি এই স্বাধীনতা হরণের অধিকার ও সুযোগ দেবেন না। যখন আপনার আত্মা স্বাধীন, তখন আপনি হিম্মত রাখেন স্বৈরাচার ও তার সহযোগী পাণ্ডাদের উপেক্ষা করে সকল কিছুর প্রকৃত মালিক ও প্রভুর ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও পছন্দ-অপছন্দের দিকে দৃষ্টি রাখতে। আপনি আত্মিকভাবে মুক্ত, তখন আপনাকে দাস বানানো অসম্ভব। কারণ, দাস বানানো যায় তাকেই, যার অন্তরে (দুনিয়ার প্রতি) মোহ ও আসক্তি রয়েছে। যে লোক সব সময় হারানো ভয়ে তাকে ভীত, তাকে ভয় দেখানো যায়। কারো ওপর তখনই আপনি নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যখন তার প্রয়োজনীয় কিংবা কামনাকৃত কোনো জিনিস কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আপনার আছে। কিন্তু একটা জিনিস আছে, যা কেউ আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। তিনি হলেন: আল্লাহ তা'আলা।

তাই আমরা যখন মিসরকে স্বাধীন ও মুক্ত করতে লড়াই করছি, তখন আরও বৃহত্তর পরিসরে এবং অধিকতর বাস্তব মাত্রায় এ লড়াই আমাদের নিজেদের মুক্ত করার লড়াইও বটে। এ লড়াই আমাদের নিজেদেরকে নিজেদের নফসানিয়াত ও কামনা-বাসনার স্বেচ্ছাচার থেকে মুক্ত করার লড়াই। যেসব মিথ্যা, আসক্তি ও নির্ভরশীলতা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং আল্লাহ ছাড়া যা কিছুর আনুগত্য ও উপাসনা আমরা করি, সেসব থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াই। এ লড়াই নিজেদের গোলামী থেকে নিজেদের মুক্ত করার লড়াই। আমরা মার্কিন ডলারের গোলাম হই কিংবা নিজেদের কামনা-বাসনা, পদ-মর্যাদা বা প্রতিপত্তি, ধনসম্পদ অথবা ভয়-ভীতি যারই গোলাম হই না কেন - মিসরের পরিশুদ্ধি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সবার পরিশুদ্ধি।

তাই কুরআন আমাদের প্রকৃত সফলতার যে মূলসূত্র বাতলে দিয়েছে, তা দুটি উপাদান নিয়ে গঠিত: সবর (ধৈর্য, অধ্যবসায়) এবং তাকওয়া (শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়):
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা করো এবং সংগ্রামের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকো, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (কুরআন, ৩:২০০)

অতএব, মিসরে যা ঘটছে, তা যদি আমরা আমাদের সাথে সম্পর্কহীন কোনো অত্যাশ্চর্য ঘটনা হিসেবে দেখতে থাকি, আর নিজেদের ও নিজেদের জীবনকে সত্যিকার অর্থে পরিশুদ্ধ করা, তাকে পরীক্ষা ও বাস্তব পরিবর্তন করার কোনো উদ্যোগ না নেই, তাহলে এ পুরো ঘটনার মূল উদ্দেশ্যটাই আমরা আসলে উপলব্ধি করতে পারিনি।

সর্বোপরি, প্রতিদিন তো আর আমাদের চোখের সামনে সমুদ্রের বুক চিরে মুক্তির রাস্তা করে দেওয়া হবে না।

টিকাঃ
* তাদ্বাররু )تضرع( অর্থ: বিনয়ী, বিনম্র বা নমনীয় হওয়া- (সম্পাদক)।
৮০ হুসনি মোবারকের পতনের পর জনগণের ভোটে মুহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় আসেন। পরবর্তীতে মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হন। স্বৈরাচারী শক্তি ক্ষমতায় ফিরে আসে। মুহাম্মদ মুরসি কারাগারে নির্যাতিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহপাক তাকে শহিদ হিসেবে কবুল করুন। আরব বসন্তের দিনগুলিতে গোটা বিশ্বের ইসলাম প্রিয় মানুষের আবেগের প্রকাশিত হয়েছে। আরব বসন্ত বিশ্বের সব প্রান্তের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলকে নাড়া দেয়। বিশেষত, ইসলামের পুনর্জীবনের জন্য যারা করেন, তাদের আরব বসন্ত শেষ হয়ে যায়নি। হক-বাতিলের সংঘাত চিরন্তন। এইসব উত্থান-পতন হকপন্থীদের আরও সুসংগঠিত করবে, নিজেদের দুর্বলতাগুলি উপলব্ধি করতে এবং আরও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে উপযুক্ত করে তুলবে। মহান আল্লাহ যেমন মুসা (আ.)-এর সাথে ছিলেন তেমনি তাদের সাথেও তিনি আছেন। অমানিশার অন্ধকারে তিনিই তাদের পথ দেখাবেন, সমুদ্র চিড়ে হলেও পথ করে দেবেন "আমার প্রেরিত বানাদাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়ে আছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে এবং আমরা বাহিনীই হবে বিজয়ী। অতএব কিছুকালের জন্য তুমি তাদের উপেক্ষা করো।" -(কুরআন, ৩৭:১৭১-১৭৪); আরও দ্রষ্টব্য কুরআন, ৫৮:১০-২২ (সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 কবিতা

📄 কবিতা


বহু পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমি এখানে পৌঁছেছি। কখনো আমি পাড়ি দিয়েছি মরুভূমির পর মরুভূমি, আর ওই কষ্টকর যাত্রাতে আমার প্রয়োজন ছিল কেবল এক ফোঁটা পানি, যা তুমি আমায় দিতে পারোনি। কখনো পড়েছি প্রবল ঝড়ে, যেখানে পথ চলার জন্য আমার প্রয়োজন ছিল সামান্য আলো। বারবার চাওয়া সত্ত্বেও তুমি আমায় তা দিতে পারোনি। তোমার আছে কেবল প্রতারণাময় জাকজমক, দম্ভ আর অস্থায়ী সামগ্রী। আর তাই আমি নিজেকে পেয়েছি পানিহীন মরুভূমিতে, আলোহীন অন্ধকারে বারবার। কিন্তু আমি আর নই তোমার দাস। কারণ, আমাকে এসব থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য একজন এসেছিলেন। একজন, যিনি এসেছিলেন আমাকে দাসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে। আর আমাকে সকল দাসের প্রভু যিনি, তাঁর দাসত্বে নিয়ে আসতে।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 তোমার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি

📄 তোমার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি


এই স্বাধীনতার অনুভূতি ব্যাখ্যা করে বুঝানো বেশ কঠিন। এটা খুবই গভীর এবং খুবই বাস্তব এক অনুভূতি। দ্বিধা-সংশয়, (মার্কেটিং-এর) শূন্য বাক্সগুলি আর অবাস্তব সব প্রতিমূর্তিগুলির দিকে আমি তোমায় দেখেছি- হে দুনিয়া। তুমি আমার চোখে পর্দার পর পর্দা চাপিয়ে গেছো। চেয়েছো আমায় জয় করতে, ধোঁকা দিতে, তোমার অগণিত মিথ্যার জাল আবদ্ধ করে তোমার দাসে পরিণত করতে।

বরং সত্য কথা হলো: তোমার দরজায় যখন এক ফোঁটা পানির জন্য কড়া নাড়ছিলাম, তখন তো তুমি আমাকে তা দিতে পারোনি। আমাকে পূর্ণ করার জন্য তোমার সামনে হাঁটু গেড়ে কেবল ব্যর্থ মিনতিই করে গেছি আমি।

আমি এখন স্পষ্টভাবে দেখতে পারছি, তা কেবল অবিরাম নৈরাশ্যের আঘাতই খোদাই করতে সক্ষম। আর আমি বসে রই, তোমার সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে, তোমার এই মিথ্যুকদের পাঠানোই হয়েছে আমাকে শেকলে বাঁধতে। কিন্তু আমি আর তোমার বন্দি থাকবো না। আমি আর ওই ছোট্ট বালিকা হবো না, শুয়ে শুয়ে সারারাত যে কেবল তোমার কথা ভাবে। আমি আর ওই মনভাঙা সেই ছোট্ট শিশু নই যে, তোমার জন্য কেঁদে নিজের চোখের জল নষ্ট করবো। আমার ব্যর্থ প্রেম আমাকে আর ভেঙে চুরমার করতে পারবে না। তুমি আমাকে ভাঙতে পারবে না। তোমার জাকজমক আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির সামনে আমি মাথা নত করবো না। তোমার মেকি তখতের সামনে দাঁড়ানো অনুগত প্রজাটি আমি আর নই। আমার অশ্রুর ওপর আর তোমার নেই কোনো অধিকার। আমার হৃদয় আর তোমার বেদি নয়।

এখানে আর তুমি থাকতে পারো না।

টিকাঃ
"লেখিকা দুনিয়াকে উদ্দেশ্য করে এ পত্র লিখেছেন- (সম্পাদক)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00