📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সৌন্দর্য ও দৃঢ়তার মুখোশ

📄 সৌন্দর্য ও দৃঢ়তার মুখোশ


গত সপ্তাহে আমার বোন ফোন করেছিল। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই সে বিদেশে অধ্যয়নরত, তাই স্বভাবতই আমি তার কল পেয়ে পুলকিত বোধ করি। সে কেমন আছে জানার পর, আমি তার নতুন বাড়ি-ঘর সম্পর্কে জানতে চাই। যেহেতু সে একটি মুসলিম দেশে বসবাস করছে, তাই আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত ছিলাম যে, সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আর তাই ক্ষণিককাল বাদে সে আমাকে যা শোনালো, তাতে আমি প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। সে এমন এক স্থানের বিবরণ শুরু করে, যেখানে পথচারী পুরুষদের থেকে মৌখিকভাবে নাজেহাল হওয়া ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া নারীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। (নারীকে লক্ষ্য করে) শিস দেওয়া সেখানে আর অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং তা রীতিমত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এরপর সে তার পরিচিত এক মুসলিম মেয়ের কথা জানালো। মেয়েটি ট্যাক্সি চড়ে যাচ্ছিলো এবং যখন সে গন্তব্যে পৌঁছায়, তখন চালককে সে ভাড়া দেয়। এ সমস্ত দেশে নিয়মতান্ত্রিক মিটার না থাকায় না থাকায় ভাড়ার পরিমাণ কিছুটা অযৌক্তিক হওয়ায় ওই চালক তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। শেষ পর্যন্ত বাক বিতণ্ডার মাত্রা বাড়তে বাড়তে এতটাই তুঙ্গে উঠে যে, ওই চালক নারীর কাঁধ ধরে রীতি মতো তাকে ঝাঁকাতে শুরু করে। এই পর্যায়ে ওই মেয়েটি রেগে গিয়ে চালককে অপমান করে বসে। এ সময় ওই চালক এই যুবতীর মুখে ঘুষি মারে।

এই পর্যায়ে আমি ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। কিন্তু আমার বোন এরপর যে কথাগুলো বলে, সেগুলো তো আরও ভয়ানক। নিকটেই একদল পুরুষ পুরো ঘটনা দেখছিল, তারা এ অবস্থায় ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। স্বভাবতই তারা নারীটিকে সাহায্য করার জন্যই সেখানে ছুটে গিয়েছিল।

কিন্তু না, তারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে।

এই পর্যায়ে এসে অবাক বিস্ময়ে আমি ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। হঠাৎ করেই পুরুষত্ব সম্পর্কে আমার সকল পূর্ব ধারণাকে আমি প্রশ্ন করতে শুরু করি। আমি অবাক হয়ে ভাবতে বসলাম, কিভাবে একজন নয় বরং বহু সংখ্যক পুরুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন নারীকে নির্যাতিত হতে দেখেও হাত গুটিয়ে বসে একেবারে কিছুই না করে থাকতে পারে। আমার মধ্যে প্রশ্ন জন্ম নেয় যে, আজকের সমাজে পুরুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হওয়ার জন্য ঠিক কি ধরনের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। পৌরুষের সংজ্ঞা কি এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, তা কেবল লাগামহীন যৌন কামনা চরিতার্থ করায় পর্যবসিত হয়েছে? রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ইভটিজিং ও শিস দানরত চালকের দলই কি এখন "বীর পুরুষ" (knight in shining armour)-এর প্রতিমূর্তির স্থান দখল করেছে? সর্বোপরি, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আজকের যুগে একজন মুসলিম পুরুষ বলতে আসলেই কি বুঝায় তা নিয়ে ভাবতে আমি বাধ্য হলাম। আমি ভাবতে থাকি মুসলিম হিসেবে আমাদের সুপরিচিত সংজ্ঞাগুলো আসলেই কি যথাযথ। আজকের যুগে আশা করা হয় যে, পুরুষরা হবে: নির্বিকার, আবেগহীন, ভাবলেশহীন, শক্ত প্রকৃতির এবং অনমনীয়। শারীরিক আগ্রাসনকে মহিমান্বিত করা। আর অপরদিকে আবেগের প্রকাশকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। এ অবস্থায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পুরুষ বলতে আসলেই কি বুঝায়, তা আমি যাচাই করে দেখবো। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম (শ্রেষ্ঠতম পুরুষ) ৬৫ মুহাম্মদ (স)-এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিতে।

আজকের দিনে পৌরষের সবচেয়ে স্বাভাবিক সংজ্ঞা হলো: পুরুষের মধ্যে আবেগের প্রকাশ থাকবে কম। এটা প্রায় সার্বজনীন একটা ধারণা যে, কান্নাকাটি একটা "অপুরুষ সুলভ” এবং দুর্বল আচরণ। আর তা সত্ত্বেও নবি (স) এটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যখন তার মৃত্যু পথযাত্রী মুমূর্ষ নাতিকে নবি (স)-এর নিকট দেওয়া হলো, তখন তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। সাহাবি সাদ তাকে বলেন, “এটা কি, ইয়া রাসুলুল্লাহ! নবি (স) বলেন, 'এটা হলো রহমত, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন, তার হৃদয়ে এটি দিয়ে দেন। আর আল্লাহ তাঁর দয়াদ্র বান্দাদের প্রতিই দয়া করে থাকেন।” [বুখারি] ১৬

কিন্তু আজ, পুরুষের নিকট থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে, সে তার কষ্টের অনুভূতিগুলি লুকিয়ে রাখবে। তদুপরি, এর সাথে সাথে শিশুকাল থেকে তাকে এও শিক্ষা দেওয়া হয়ে যে, তার অন্যান্য আবেগ-অনুভূতিগুলিও প্রকাশ করা যাবে না। নবি (স)-এর যুগেও কিছু কিছু মানুষের এমন ধারণা ছিল। একবার গ্রামের এক লোকের সামনে নবি (স) তার নাতিদের কপালে চুমো দেন। এই দৃশ্য দেখে ওই গ্রাম্য লোকটি বেশ অবাক হয়ে বলে উঠে, “আমার দশ দশটি সন্তান আছে, আমি তো তাদের কাউকেও কখনো চুমু দেইনি।" নবি (স) তার দিকে তাকিয়ে বলেন, "যার অন্তরে দয়া-মায়া নেই, সে (আল্লাহর) দয়া পাবে না।” [বুখারি] প্রকৃতপক্ষে, স্নেহ, মায়া-মমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নবি (ﷺ) ছিলেন অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি বলেন: “কেউ যদি তার মুমিন ভাইকে ভালোবাসে, তবে সে যেন তার ওই ভাইকে বলে দেয়, সে তাকে ভালোবাসে।” [আবু দাউদ]

নবি (ﷺ) তার স্ত্রীগণের প্রতিও অত্যধিক ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন। আয়েশা থেকে বর্ণিত যে, নবি (ﷺ) তার পাশে বসে আহার করতেন। তারা উভয়ে একই পেয়ালা থেকে পানি পান করতেন। পানির পেয়ালার যেখানে আয়েশা তার ঠোঁট রাখতেন, নবি (ﷺ) সেটা দেখে রাখতেন এবং ঠিক ওই স্থানেই তিনি নিজের ঠোঁট রেখে চুমুক দিতেন। আয়েশার খাওয়া (মাংসল) হাড়ের (অবশিষ্ট) অংশ থেকে তিনি খেতেন, যে অংশে আয়েশা মুখ দিয়েছেন, সেখান থেকে তিনি খেতেন। [মুসলিম] পৌরষত্বের ব্যাপারে যে বিষয়টি বহুল প্রচলিত, তার বিপরীতে গিয়ে নবি (ﷺ) গৃহস্থালির কাজেও প্রায়শই সহায়তার হাত বাড়াতেন। আয়েশা থেকে বর্ণিত, “নবি মুহাম্মদ (ﷺ) নিজের জামা নিজেই সেলাই করতেন, ছাগলের দুধ দোহন করতেন এবং গৃহস্থালির কাজকর্মে সাহায্য করতেন।” [মুসলিম ও বুখারি]

তবে, পুরুষদেরকে কেমন হতে হবে, সম্ভবত সেটার সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো যে, তাদেরকে 'শক্ত ও কঠিন প্রকৃতির' হতে হবে। নম্রতা ও কোমলতা সাধারণত: নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও নবি (ﷺ) বলেন: “আল্লাহ বিনয়ী, তাই তিনি বিনয় ও নম্রতাকে ভালোবাসেন। বিনয় ও নম্রতা জন্য তিনি তাই প্রদান করেন, যা তিনি কঠোরতা এবং অন্য কিছুর জন্য দান করেন না।” [মুসলিম] তথাপি, পৌরষের আধুনিক সংজ্ঞা থেকে সেই বিনয় ও নম্রতা আজ অনেকখানি হারিয়ে গেছে। এটা একটা ভয়াবহ ব্যাপার যে, রাস্তায় কোনো নারীর ওপর যৌন হয়রানি চালানোকে একজন তরুণ পুরুষালি বৈশিষ্ট্য ভাবছে, অথচ তার পৌরষে কোনো প্রশ্ন উঠছে না, যখন একটা মেয়েকে জনসম্মুখে আঘাত করা হচ্ছে এবং সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখছে। এটা চিন্তার খোরাক জোগায় যে, বাস্তবিকভাবে পৌরষের যে নমুনা আমাদের সামনে বিরাজমান, তা নবি পাক (ﷺ)-এর চেয়ে হলিউডের কোনো গ্যাংস্টার বা গুণ্ডার সাথেই বেশি মিল খায়।

টিকাঃ
*- (সম্পাদক)।
** বুখারি, তাওহিদ প্রকাশনী, হাদিস নং: ৫৬৫৫ (সম্পাদক)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00