📄 যে সমাজ-সংস্কৃতিতে আমি বড় হয়েছি —তার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি
আমি যখন বেড়ে উঠছি, তখন তুমি (অর্থাৎ আমার সমাজ) আমাকে অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত (Ugly Duckling) ছাড়া কিছুই ভাবোনি। আর বছরের পর বছর নিজেকে আমি তা-ই ভেবে এসেছি। দীর্ঘ সময় ধরে তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, কাঙ্ক্ষিত স্ট্যান্ডার্ড (তথা পুরুষের) একটা বাজে কপি বা নমুনা ছাড়া আমি আর কিছুই নই।
না আমি (পুরুষের মতো) এত দ্রুত দৌড়াতে পারি, আর না আমি এত ওজন তুলতে পারি। (তাদের) সমপরিমাণ অর্থ উপার্জনেও আমি অক্ষম। তদপুরি আমি শুধু কাঁদি আর কাঁদি। আমি বেড়ে উঠেছি এক পুরুষ কেন্দ্রিক দুনিয়াতে, যেখানে আমার (তথা নারীর) কোনো স্থান নেই।
আর যখন আমি পুরুষের মতো হতে পারলাম না, তখন আমি কেবল তাদেরকে তুষ্ট করতে চাইলাম। তোমার দেওয়া প্রসাধনী (মেক-আপ) ব্যবহার করতাম, আর তোমাদের শর্ট স্কার্টগুলো পড়ে নিতাম। আমি আমার জীবন, আমার শরীর এবং আমার আত্মমর্যাদা শুধু রূপসী হওয়ার জন্যই বিলিয়ে দিয়েছি। আমি জানতাম যে, আমি যাই করি না কেন, যতক্ষণ আমার মনিব আমার প্রতি তুষ্ট এবং যতক্ষণ সে আমার রূপ লাবণ্যে বিমোহিত, কেবল ততক্ষণই আমার মূল্য থাকবে।
আর তাই তোমার কসমেটিকসে আবৃত হয়ে আমি নিজের গোটা জিন্দেগি কাটিয়েছি এবং তোমাকে আমার দেহ পর্যন্ত দান করেছি বিক্রয় করার জন্য।
আমি ছিলাম এক গোলাম, কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, আমি স্বাধীন, মুক্ত। আমি ছিলাম তোমার ভোগ্য পণ্য, কিন্তু তুমি কসম কেটে বলেছো, এটাই সাফল্য। তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, আমার জীবনের লক্ষ্যই হলো: নিজেকে প্রদর্শন করা, পুরুষের জন্য নিজেকে আকর্ষনীয় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করা। তুমি আমাকে একথা বিশ্বাস করিয়েছো যে, আমার দেহখানি সৃষ্টিই হয়েছে তোমার গাড়িগুলি বিক্রি করার জন্য। তুমি আমাকে এ বুঝের ওপর বড় করেছো যে, আমি এক Ugly Duckling (অর্থাৎ কোনো কাজেরই নই, অথর্ব, অদ্ভুত, অর্থহীন)। কিন্তু তুমি মিথ্যা বলেছো।
ইসলাম আমায় বলে, 'আমি এক রাজহাঁস। আমি (যে পুরুষের চেয়ে) ভিন্ন কিছু (এটা কোনো এক্সিডেন্ট নয় বরং) এটাই হবার কথা ছিল, এ উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছে। আমার দেহ, আমার আত্মা তো সৃষ্টি হয়েছে আরও উচ্চতর কিছুর জন্য।
আল্লাহ কুরআনে বলেন: “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি সব বিষয়ের খবর রাখেন।” (কুরআন, ৪৯:১৩)
তাই আমি সম্মানিত কিন্তু তা পুরুষের সাথে আমার সম্পর্কের কারণে নয়। নারী হিসেবে আমার মর্যাদা আমার কোমরের মাপ বা কতজন পুরুষ আমাকে পছন্দ করে – তার ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ হিসেবে আমার মর্যাদার মাপকাঠি আরও অনেক উচ্চতর: সৎকর্মশীলতা ও তাকওয়ার মাপকাঠি। ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলি যাই বলুক না কেন, আমার জীবনের উদ্দেশ্য পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হওয়ার চেয়েও মহত্ত্বর ও উৎকৃষ্টতর কিছু।
এজন্য আল্লাহ আমায় বলেছেন: নিজেকে আবৃত করতে, নিজের সৌন্দর্যকে আড়াল করতে এবং গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে যে, আমার দেহকে ব্যবহার করে পুরুষকে খুশি করতে আমি এখানে আসিনি, আমি এখানে এসেছি শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য। নারীর দেহকে সম্মান করা ও আবৃত রাখা এবং শুধু উপযুক্তজন তথা আমি যাকে বিয়ে করবো, তাকে দেখানোর নির্দেশ দানের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা নারী দেহের (তথা তার রূপ-সৌন্দর্য ও আবেদন-এর) মর্যাদাকে উন্নত করেছেন।
তাই যারা আমাকে (তথাকথিত) 'স্বাধীন ও মুক্ত' করতে চায়, আমি তাদেরকে শুধু বলি, 'ধন্যবাদ, তবে আর নয়।'
সেজেগুজে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোর জন্য আমি দুনিয়ায় আসিনি। আমার এ দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। আমাকে একটা পণ্যের স্তরে বা জুতা বিক্রির জন্য একজোড়া (আকর্ষণীয়) পায়ের স্তরে নামিয়ে আনতে আমি দেবো না। আমিও আল্লাহর এক বান্দী, যার আছে একটি (জীবন্ত) আত্মা, আছে এক মননশীল হৃদয়। আমার মূল্যমান নির্ধারণ করবে আমার আত্মা, আমার হৃদয় এবং আমার নৈতিক চরিত্রের সৌন্দর্য। তাই না আমি তোমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির ইবাদত করবো, আর না তোমাদের ফ্যাশনের চেতনার কাছে আত্মসমর্পণ করবো। আমার আত্মসমর্পণ তো সর্বোচ্চ সত্তারই সমীপে।
নিজের রূপ-লাবণ্য প্রদর্শন করে বেড়ানোর পরিবর্তে হিজাব পালনের মাধ্যমে আমি আমার ঈমানের প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকি। মানুষ হিসেবে আমার মর্যাদা নির্ভর করে আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্কের ওপর, আমি দেখতে কেমন, তার ওপর নয়। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি আমি ঢেকে নিই। আর তাই আমার দিকে যখন তুমি তাকাও, তখন তুমি নিছক কোনো দেহ দেখতে পাও না। আমাকে তখন তুমি দেখ আমার প্রকৃত পরিচয় তথা আল্লাহর একজন অনুগত বান্দি হিসেবে।
দেখ, একজন মুসলিম নারী হিসেবে এই সব নীরব দাসত্ব হতে আমি নিজেকে মুক্ত করেছি। আল্লাহর বান্দা বা গোলামদের কাছে আমি জবাবদিহি করি না। আমি জবাবদিহি করি তাদের মালিকের নিকট।
টিকাঃ
* লেখিকা এখানে একজন নারী বা কন্যা সন্তানের প্রতি সমাজের মানসিকতা বুঝানোর জন্য ইংরেজিতে “Ugly Duckling” পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। যদিও "Ugly Duckling” জনপ্রিয় কার্টুন কাহিনীর শিক্ষা ভিন্নরূপ এবং ইংরেজি ভাষায় এ শব্দগুচ্ছের অর্থও ভিন্ন। লেখিকা এখানে আক্ষরিক অর্থে একে ব্যবহার করেছেন। "Ugly Duckling” হচ্ছে Hans Christian Andersen রচিত একটি জনপ্রিয় রূপকথা। এর ভিত্তিতে কার্টুন /এনিমেটেড মুভি ইত্যাদি তৈরি করা হয়েছে। একটি রাজহাঁসের বাচ্চা, সে বাচ্চা অবস্থায় এক সাধারণ হাঁসের ঘরে লালিত-পালিত হয়। সে অন্য হাঁসের বাচ্চাগুলির মতো সুন্দর না হওয়ার কারণে তাকে সবাই অপছন্দ করে। কিন্তু শেষে বড় হয়ে সে অনিন্দ্যসুন্দর এক রাজহাঁসে পরিণত হয়। এ গল্পখানা শিক্ষনীয়। তবে এখানে আক্ষরিক অর্থে অর্থাৎ অপাংক্তেও, অপছন্দনীয় ইত্যাদি অর্থে "Ugly Duckling" শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে - (সম্পাদক)।
** এখানে তুমি / তোমার সম্বোধন এর লক্ষ্য হলো: প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা – (সম্পাদক)।
-(সম্পাদক)।
📄 সালাতে নারীদের ইমামতি সম্পর্কে একজন নারীর ভাবনা
২০০৫ সালের ১৮ই মার্চ আমেনা ওয়াদুদ প্রথম বারের মতো একজন নারী হিসেবে জুমুআর সলাতে ইমামতি করান। পুরুষের মতো হওয়ার অগ্রযাত্রায় ওই দিনটি সত্যই নারীর জন্য বেশ বড় রকমের পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কি আল্লাহর দেওয়া স্বাধীনতা বাস্তবায়নে সত্যিকার অর্থে এগুতে পেরেছি? আমি তা মনে করি না।
আমরা প্রায়শই যে কথাটি ভুলে যাই, তা হলো: আল্লাহ তা'আলা পুরুষের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি নারীকে সম্মানিত করেছেন, মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু পশ্চিমা নারীবাদ দৃশ্যপট থেকে যখন স্রষ্টাকে মুছে দিল, তখন পুরুষ ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড বাকি থাকলো না। ফলশ্রুতিতে, তারা পুরুষের সাথে তুলনায় নারীর মর্যাদা নিরূপণে বাধ্য হলো। আসলে এর মাধ্যমে তারা এক ভ্রান্ত ধারণাকেই মেনে নিল। সে মেনে নিল যে, পুরুষই প্রকৃত মাপকাঠি আর এ ধারণা অনুসারে একজন নারী ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মানব মর্যাদা লাভে সক্ষম হবে না, যতক্ষণ সে ঠিক একজন পুরুষের মতো হতে পারছে।
পুরুষ যখন নিজের চুল কেটে ছোট করলো, নারীও তখন নিজের চুল কাটতে চাইলো। পুরুষ যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিল, তখন সেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠলো। একজন নারী এ সমস্ত জিনিস শুধু একটি কারণেই হস্তগত করতে চাইলো, তা হলো: তার স্ট্যান্ডার্ড তথা মাপকাঠি "পুরুষ”-এর তা আছে।
নারী যা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলো, তা হচ্ছে: মহান আল্লাহ তা'আলা নারী ও পুরুষ উভয়কেই মর্যাদাবান করেছেন তাদের বৈসাদৃশ্যময় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে, তাদের সাদৃশ্যের ভিত্তিতে নয়। আর ১৮ই মার্চ মুসলিম নারীরা ঠিক একই ভুলটিই করলো।
প্রায় ১৪০০ বছর যাবৎ আলেম-উলামা ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, সলাতে ইমামতি করবে পুরুষগণ। ৬০ মুসলিম নারী হিসেবে এই ব্যাপারটি নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর কি আছে? যিনি সলাতে ইমামতি করেন, তিনি কোনো দিক দিয়েই রুহানিভাবে শ্রেষ্ঠ নন। কোনো কাজ পুরুষ করছে বলে, সেটাই শ্রেষ্ঠ হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। সলাতে ইমামতি করাটা ইমামতি বা নেতৃত্বের কারণে উত্তম, তা নয়। এটা যদি নারীদের দায়িত্ব হতো কিংবা এটা যদি রুহানি দিক থেকে শ্রেষ্ঠতর কাজ হতো, তবে নবি (ﷺ) কেন আয়েশা বা খাদিজা অথবা ফাতেমার মতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিয়সী নারীদেরকে সলাতে ইমামতি করতে বলেননি? জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া সত্ত্বেও এই মহিয়সী নারীগণ তো কখনো সলাতের ইমামতি করেননি।
কিন্তু আজ ১৪০০ বছর পর এই দিনে পুরুষদেরকে সলাতে ইমামতি করতে দেখে প্রথমবারের মতো আমাদের মনে এই চিন্তার উদয় ঘটেছে, "এটা তো ইনসাফ হলো না।” আমরা এমনটি ভাবছি, যদিও আল্লাহ ইমামতি করার মাঝে আলাদা কোনো মর্যাদা রাখেননি। আল্লাহর চোখে ইমামের মর্যাদা তার পেছনের সলাত আদায়কারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি নয়।
অন্যদিকে কেবল নারীরাই মা হতে পারেন এবং আল্লাহ মাকে দিয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। নবি (ﷺ) আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে, মায়ের পদতলে রয়েছে জান্নাত। কিন্তু একজন পুরুষ যাই করুক না কেন, সে কখনো মা হতে পারবে না। তাহলে এটা কেন বৈষম্য বলে বিবেচিত হচ্ছে না?
যখন প্রশ্ন করা হলো, 'আমাদের থেকে উত্তম আচরণ পাওয়ার কে বেশি হকদার?” “তোমার পিতা" কথাটি বলার আগে নবি (স.) তিন তিনবার বলেন, “তোমার মা।” এটা কি লিঙ্গ বৈষম্যবাদের মধ্যে পড়বে? একজন পুরুষ আর যাই করুক না কেন, মায়ের মর্যাদা তার কপালে জুটবে না।
তা সত্ত্বেও, এমনকি আল্লাহ যখন আমাদের নারীদের এমন কিছু দিয়ে সম্মানিত করেন, যা শুধুই নারীসুলভ অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত, তখন আমরা পুরুষের সাথে তুলনা করে নিজেদের মর্যাদা খুঁজতে ব্যস্ত। এমনকি আমাদের সেই সব তুলনাহীন মর্যাদাসমূহ লক্ষ্য করতেও আমরা ব্যর্থ। আসলে আমরা নারীরাও পুরুষদেরকে মানদণ্ড হিসেবে মেনে নিয়েছি, তাই যে বৈশিষ্ট্যগুলো একান্তই নারীসুলভ, সংজ্ঞাগতভাবে সেগুলো হেয়তর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। লাজুক ও সংবেদনশীল হওয়াটা অপমানজনক, আর মা হওয়াটা তো অধঃপতিত হওয়ার শামিল। পুরুষালি বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত নিরেট যুক্তিবাদ এবং নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত স্বার্থহীন মায়া ও মমতার মাঝে যে দ্বন্দ্ব চলে, তাতে যুক্তিবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
পুরুষের যা আছে এবং পুরুষ যা করে, তার সবকিছুকে যখন আমরা উত্তম হিসেবে মেনে নেই, তখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ সিদ্ধান্ত আসে যে, পুরুষের যদি এটা থাকতে পারে, তবে আমরা নারীরাও সেটা চাই। পুরুষরা কাতারের সামনে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করলে আমরা ভেবে নিই যে, এটাই উত্তম, তাই আমরাও সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করতে চাই। যেহেতু পুরুষরা সলাতে ইমামতি করে – আর আমরা ধারণা করে নিই যে, ইমাম সাহেব তো আল্লাহর নিকটবর্তী, তাই আমরাও ইমামতি করতে চাই। এমনিভাবে কোনো এক সময় আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, দুনিয়াতে নেতৃত্বের কোনো একটা অংশ লাভ করাটা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটা আলামত বহন করে।
একজন মুসলিম নারীর নিজেকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, আল্লাহই তার মাপকাঠি। সম্মান লাভের জন্য তিনিই তার জন্য যথেষ্ট, এটার জন্য পুরুষের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন তার নেই।
প্রকৃতপক্ষে, পুরুষদেরকে অনুসরণ করার আমাদের এ ক্রুসেডে নারী হিসেবে আমরা একটি বারের জন্যও এই সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে দেখিনি যে, হয়তোবা আমাদের যা আছে, সেটাই আমাদের জন্য উত্তম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবল পুরুষের মতো হতে গিয়ে আমরা উন্নততর জিনিসকে বিসর্জন দিয়েছি। পঞ্চাশ বছর আগে, সমাজ আমাদেরকে বলেছে যে, ফ্যাক্টরিতে কাজ করার জন্য পুরুষরা ঘর থেকে বের হয়, তাই পুরুষেরা শ্রেষ্ঠ। আমরা ছিলাম মা। কিন্তু আমাদেরকে বলা হলো, আরেকজন মানুষকে লালন পালন করার দায়িত্ব ফেলে দিয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজে লেগে পড়ার মাঝেই নারীর স্বাধীনতা নিহিত। আমরা মেনে নিয়েছি, সমাজের ভিত্তি (তথা ভবিষ্যৎ বংশদের) গড়ার চেয়ে ফ্যাক্টরিতে কাজ করাটাই শ্রেষ্ঠ, কেবলমাত্র এই কারণে যে, পুরুষরা এই কাজ করে তাই।
তারপর, কাজের শেষে আমাদের কাছ থেকে অতি মানবীয় ভূমিকা আশা করা হতো। আমাকে হতে হবে আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ গৃহিণী এবং সেই সাথে একটা আদর্শ ক্যারিয়ার থাকতে হবে। একজন নারীর একটা ক্যারিয়ার থাকার মধ্যে দোষনীয় কিছু নেই, কিন্তু শীঘ্রই আমাদের বোধোদয় হতে শুরু করে যে, পুরুষকে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে গিয়ে আসলেই আমরা নিজেদেরকে বলি দিয়ে ফেলেছি। আমাদের চোখের সামনে আমাদের সন্তানগুলো কেমন যেন অচেনা ও অপরিচিত হয়ে উঠলো এবং যে বিশেষ সুবিধা আমরা বিসর্জন দিয়েছি, তা শীঘ্রই আমরা উপলদি করতে শুরু করি।
আর তাই তো, এখন যখন পশ্চিমা নারীবাদীদের সুযোগ দেওয়া হলো, তখন তারা তাদের সন্তানদেরকে লালন পালনের জন্য বাড়িতে অবস্থান করাকে বেছে নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক, বাচ্চাসহ মা-দের শতকরা ৩১ জন এবং দুই বা ততোধিক সন্তানসহ মা-দের মাত্র শতকরা ১৮ জন ফুল টাইম (পূর্ণ সময়) কাজ করছেন। ২০০০ সালের প্যারেন্টিং ম্যাগাজিন কর্তৃক পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী এইসব কর্মজীবী মা-দের মধ্য থেকে শতকরা ৯৩ জন মা বলেছেন তারা বরং তাদের বাচ্চাদের সাথে বাড়িতে থেকে যেতে চান, কিন্তু 'অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার' কারণে তারা কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সমস্ত 'বাধ্যবাধকতা' লিঙ্গ সমতার দাবিদার আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা নারীর ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে, যেখানে ইসলাম লিঙ্গ বৈচিত্রতার ভিত্তিতে নারীর কাঁধ থেকে এসব 'বাধ্যবাধকতার' জিঞ্জির অপসারণ করেছে।
মুসলিম নারীগণকে ১৪০০ বছর আগে যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার মর্ম উপলব্ধি করতে পশ্চিমা সভ্যতার প্রায় শত বৎসর ব্যাপী পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়েছে। নারী হিসেবে আমাকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সে মর্যাদাকে আমি তখনই ভূলুণ্ঠিত করি, যখন আমি যা নই, তা হওয়ার জন্য চেষ্টা করি। পূর্ণ সততার সাথে বলছি, পুরুষের মতো হওয়ার চেষ্টা করবেন না। নারী হিসেবে যতক্ষণ না আমরা পুরুষের অনুসরণের চেষ্টা বন্ধ করবো এবং আমাদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া বৈচিত্রমণ্ডিত বৈশিষ্ট্যগুলির সৌন্দর্যের কদর না করবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সত্যিকার স্বাধীনতা মিলবে না।
যদি নিরেট ন্যায়বিচার এবং মমতার মাঝে বাছাই করতে দেওয়া হয়, তবে আমি মমতাকেই বেছে নেবো। আর যদি আমার পায়ের সামনে দুনিয়াবি নেতৃত্ব ও জান্নাতকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে আমি জান্নাতকেই বেছে নেবো।
টিকাঃ
•• আমেনা ওয়াদুদ ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক আফ্রিকান-আমেরিকান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি উগ্র নারীবাদী চিন্তা-চেতনা লালন করেন। আমেরিকার মসজিদগুলি এহেন জুমুআর জামাত আয়োজনে অস্বীকৃতি জানালে তিনি এক গির্জায় এই তথাকথিত জুমুআর সলাত আয়োজন করেন। এই কার্যক্রম সকল হকপন্থী ইসলামি চিন্তাবিদগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন (সম্পাদক)।
* এখানে নারী পুরুষের সম্মিলিত সলাতের কথা বলা হয়েছে। কারণ, শুধু নারীদের মধ্যে যে সলাতের জামাত হয়, তাতে নারীরা ইমামতি করতে শরিয়তে কোনো বাধা নেই (সম্পাদক)।
📄 সৌন্দর্য ও দৃঢ়তার মুখোশ
গত সপ্তাহে আমার বোন ফোন করেছিল। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই সে বিদেশে অধ্যয়নরত, তাই স্বভাবতই আমি তার কল পেয়ে পুলকিত বোধ করি। সে কেমন আছে জানার পর, আমি তার নতুন বাড়ি-ঘর সম্পর্কে জানতে চাই। যেহেতু সে একটি মুসলিম দেশে বসবাস করছে, তাই আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত ছিলাম যে, সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আর তাই ক্ষণিককাল বাদে সে আমাকে যা শোনালো, তাতে আমি প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। সে এমন এক স্থানের বিবরণ শুরু করে, যেখানে পথচারী পুরুষদের থেকে মৌখিকভাবে নাজেহাল হওয়া ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া নারীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। (নারীকে লক্ষ্য করে) শিস দেওয়া সেখানে আর অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং তা রীতিমত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এরপর সে তার পরিচিত এক মুসলিম মেয়ের কথা জানালো। মেয়েটি ট্যাক্সি চড়ে যাচ্ছিলো এবং যখন সে গন্তব্যে পৌঁছায়, তখন চালককে সে ভাড়া দেয়। এ সমস্ত দেশে নিয়মতান্ত্রিক মিটার না থাকায় না থাকায় ভাড়ার পরিমাণ কিছুটা অযৌক্তিক হওয়ায় ওই চালক তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। শেষ পর্যন্ত বাক বিতণ্ডার মাত্রা বাড়তে বাড়তে এতটাই তুঙ্গে উঠে যে, ওই চালক নারীর কাঁধ ধরে রীতি মতো তাকে ঝাঁকাতে শুরু করে। এই পর্যায়ে ওই মেয়েটি রেগে গিয়ে চালককে অপমান করে বসে। এ সময় ওই চালক এই যুবতীর মুখে ঘুষি মারে।
এই পর্যায়ে আমি ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। কিন্তু আমার বোন এরপর যে কথাগুলো বলে, সেগুলো তো আরও ভয়ানক। নিকটেই একদল পুরুষ পুরো ঘটনা দেখছিল, তারা এ অবস্থায় ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। স্বভাবতই তারা নারীটিকে সাহায্য করার জন্যই সেখানে ছুটে গিয়েছিল।
কিন্তু না, তারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে।
এই পর্যায়ে এসে অবাক বিস্ময়ে আমি ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। হঠাৎ করেই পুরুষত্ব সম্পর্কে আমার সকল পূর্ব ধারণাকে আমি প্রশ্ন করতে শুরু করি। আমি অবাক হয়ে ভাবতে বসলাম, কিভাবে একজন নয় বরং বহু সংখ্যক পুরুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন নারীকে নির্যাতিত হতে দেখেও হাত গুটিয়ে বসে একেবারে কিছুই না করে থাকতে পারে। আমার মধ্যে প্রশ্ন জন্ম নেয় যে, আজকের সমাজে পুরুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হওয়ার জন্য ঠিক কি ধরনের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। পৌরুষের সংজ্ঞা কি এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, তা কেবল লাগামহীন যৌন কামনা চরিতার্থ করায় পর্যবসিত হয়েছে? রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ইভটিজিং ও শিস দানরত চালকের দলই কি এখন "বীর পুরুষ" (knight in shining armour)-এর প্রতিমূর্তির স্থান দখল করেছে? সর্বোপরি, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আজকের যুগে একজন মুসলিম পুরুষ বলতে আসলেই কি বুঝায় তা নিয়ে ভাবতে আমি বাধ্য হলাম। আমি ভাবতে থাকি মুসলিম হিসেবে আমাদের সুপরিচিত সংজ্ঞাগুলো আসলেই কি যথাযথ। আজকের যুগে আশা করা হয় যে, পুরুষরা হবে: নির্বিকার, আবেগহীন, ভাবলেশহীন, শক্ত প্রকৃতির এবং অনমনীয়। শারীরিক আগ্রাসনকে মহিমান্বিত করা। আর অপরদিকে আবেগের প্রকাশকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। এ অবস্থায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পুরুষ বলতে আসলেই কি বুঝায়, তা আমি যাচাই করে দেখবো। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম (শ্রেষ্ঠতম পুরুষ) ৬৫ মুহাম্মদ (স)-এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিতে।
আজকের দিনে পৌরষের সবচেয়ে স্বাভাবিক সংজ্ঞা হলো: পুরুষের মধ্যে আবেগের প্রকাশ থাকবে কম। এটা প্রায় সার্বজনীন একটা ধারণা যে, কান্নাকাটি একটা "অপুরুষ সুলভ” এবং দুর্বল আচরণ। আর তা সত্ত্বেও নবি (স) এটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যখন তার মৃত্যু পথযাত্রী মুমূর্ষ নাতিকে নবি (স)-এর নিকট দেওয়া হলো, তখন তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। সাহাবি সাদ তাকে বলেন, “এটা কি, ইয়া রাসুলুল্লাহ! নবি (স) বলেন, 'এটা হলো রহমত, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন, তার হৃদয়ে এটি দিয়ে দেন। আর আল্লাহ তাঁর দয়াদ্র বান্দাদের প্রতিই দয়া করে থাকেন।” [বুখারি] ১৬
কিন্তু আজ, পুরুষের নিকট থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে, সে তার কষ্টের অনুভূতিগুলি লুকিয়ে রাখবে। তদুপরি, এর সাথে সাথে শিশুকাল থেকে তাকে এও শিক্ষা দেওয়া হয়ে যে, তার অন্যান্য আবেগ-অনুভূতিগুলিও প্রকাশ করা যাবে না। নবি (স)-এর যুগেও কিছু কিছু মানুষের এমন ধারণা ছিল। একবার গ্রামের এক লোকের সামনে নবি (স) তার নাতিদের কপালে চুমো দেন। এই দৃশ্য দেখে ওই গ্রাম্য লোকটি বেশ অবাক হয়ে বলে উঠে, “আমার দশ দশটি সন্তান আছে, আমি তো তাদের কাউকেও কখনো চুমু দেইনি।" নবি (স) তার দিকে তাকিয়ে বলেন, "যার অন্তরে দয়া-মায়া নেই, সে (আল্লাহর) দয়া পাবে না।” [বুখারি] প্রকৃতপক্ষে, স্নেহ, মায়া-মমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নবি (ﷺ) ছিলেন অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি বলেন: “কেউ যদি তার মুমিন ভাইকে ভালোবাসে, তবে সে যেন তার ওই ভাইকে বলে দেয়, সে তাকে ভালোবাসে।” [আবু দাউদ]
নবি (ﷺ) তার স্ত্রীগণের প্রতিও অত্যধিক ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন। আয়েশা থেকে বর্ণিত যে, নবি (ﷺ) তার পাশে বসে আহার করতেন। তারা উভয়ে একই পেয়ালা থেকে পানি পান করতেন। পানির পেয়ালার যেখানে আয়েশা তার ঠোঁট রাখতেন, নবি (ﷺ) সেটা দেখে রাখতেন এবং ঠিক ওই স্থানেই তিনি নিজের ঠোঁট রেখে চুমুক দিতেন। আয়েশার খাওয়া (মাংসল) হাড়ের (অবশিষ্ট) অংশ থেকে তিনি খেতেন, যে অংশে আয়েশা মুখ দিয়েছেন, সেখান থেকে তিনি খেতেন। [মুসলিম] পৌরষত্বের ব্যাপারে যে বিষয়টি বহুল প্রচলিত, তার বিপরীতে গিয়ে নবি (ﷺ) গৃহস্থালির কাজেও প্রায়শই সহায়তার হাত বাড়াতেন। আয়েশা থেকে বর্ণিত, “নবি মুহাম্মদ (ﷺ) নিজের জামা নিজেই সেলাই করতেন, ছাগলের দুধ দোহন করতেন এবং গৃহস্থালির কাজকর্মে সাহায্য করতেন।” [মুসলিম ও বুখারি]
তবে, পুরুষদেরকে কেমন হতে হবে, সম্ভবত সেটার সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো যে, তাদেরকে 'শক্ত ও কঠিন প্রকৃতির' হতে হবে। নম্রতা ও কোমলতা সাধারণত: নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও নবি (ﷺ) বলেন: “আল্লাহ বিনয়ী, তাই তিনি বিনয় ও নম্রতাকে ভালোবাসেন। বিনয় ও নম্রতা জন্য তিনি তাই প্রদান করেন, যা তিনি কঠোরতা এবং অন্য কিছুর জন্য দান করেন না।” [মুসলিম] তথাপি, পৌরষের আধুনিক সংজ্ঞা থেকে সেই বিনয় ও নম্রতা আজ অনেকখানি হারিয়ে গেছে। এটা একটা ভয়াবহ ব্যাপার যে, রাস্তায় কোনো নারীর ওপর যৌন হয়রানি চালানোকে একজন তরুণ পুরুষালি বৈশিষ্ট্য ভাবছে, অথচ তার পৌরষে কোনো প্রশ্ন উঠছে না, যখন একটা মেয়েকে জনসম্মুখে আঘাত করা হচ্ছে এবং সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখছে। এটা চিন্তার খোরাক জোগায় যে, বাস্তবিকভাবে পৌরষের যে নমুনা আমাদের সামনে বিরাজমান, তা নবি পাক (ﷺ)-এর চেয়ে হলিউডের কোনো গ্যাংস্টার বা গুণ্ডার সাথেই বেশি মিল খায়।
টিকাঃ
*- (সম্পাদক)।
** বুখারি, তাওহিদ প্রকাশনী, হাদিস নং: ৫৬৫৫ (সম্পাদক)।