📄 নারীর মর্যাদা
সেজেগুজে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোর জন্য আমি দুনিয়ায় আসিনি। আমার এ দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। আমাকে নেহায়াত পণ্যের স্তরে নামিয়ে আনা যাবে না, আর না আমি হবো আরেক জোড়া জুতা বিক্রির জন্য একজোড়া পা মাত্র। আমি আত্মা ও মেধাসম্পন্ন আল্লাহর এক বান্দী। আমার আত্মা, আমার হৃদয়, আমার চারিত্রিক সৌন্দর্যই নির্ধারণ করবে আমার মূল্য। তাই আমি তোমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির ইবাদতও করবো না, আর না তোমাদের ফ্যাশনের চেতনার কাছে আত্মসমর্পণ করবো। আমার আত্মসমর্পণ তো সর্বোচ্চ সত্তারই সমীপে।
📄 নারীর ক্ষমতায়ন
নবি (ﷺ)-এর একজন সাহাবি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যখন এক শহরে প্রবেশ করেন, তখন অত্যন্ত চমৎকারভাবে তিনি ইসলামের দাওয়াতের সারাংশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আমি এসেছি একজন দাসের উপাসনা থেকে তোমাদেরকে স্বাধীন করতে এবং সকল দাসের সর্বময় প্রভুর দাসত্বের অধীনে তোমাদের নিয়ে আসতে।"
এই বক্তব্যের মাঝে লুকিয়ে আছে মূল্যবান ঐশ্বর্য ভাণ্ডার। এই শব্দমালার নিচে আবদ্ধ ক্ষমতায়নের চাবি ও সত্যিকার স্বাধীনতার একমাত্র পথ।
একটু ভেবে দেখুন, যেই মুহূর্তে আপনি বা আমি আমাদের সফলতা, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের সুখ বা আমাদের মূল্য স্রষ্টা বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে নির্ধারণ করার অধিকার দিই, ঠিক ওই মুহূর্তে আমরা নীরব কিন্তু ধ্বংসাত্মক এক দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই। যে জিনিস আমাকে আমার মর্যাদার মাপকাঠি, আমার সফলতা এবং আমার ব্যর্থতাকে সংজ্ঞায়িত করে, সে জিনিসই তো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর সেটাই আমার প্রভুতে পরিণত হয়।
তথাকথিত যে প্রভু নারীর মর্যাদা নির্ধারণ করেছে, বিভিন্ন কালে সে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে স্থায়ী যেসব মানদণ্ড নারীদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তা হলো: পুরুষ মানুষ। কিন্তু আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে, আল্লাহ তাঁর নিজ থেকেই নারীকে নারীত্বের এই মর্যাদা দান করে সম্মানিত করেছেন এবং পুরুষের তুলনায় নয়। অথচ পশ্চিমা নারীবাদ দৃশ্যপট থেকে যখন আল্লাহকে বাদ দিয়ে দিল, তখন পুরুষ ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড বাকি থাকলো না। এর ফলশ্রুতিতে পাশ্চাত্য নারীবাদীরা বাধ্য হলো, পুরুষের সাথে তুলনায় নিজেদের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে। আর এর মাধ্যমে সে এক ত্রুটিপূর্ণ ধারণা কবুল করে নিল। সে পুরুষকে নিজের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাই একজন নারী কখনো পূর্ণ মানব নয়, যতক্ষণ না সে তার নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড তথা পুরুষের মতো হতে না পারছে।
পুরুষ যখন ছোট করে চুল কাটে, তখন সেও ছোট করে চুল কাটতে চাইলো। পুরুষ যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, তখন সেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাইলো। নারী এ সমস্ত জিনিস শুধু একটি কারণেই হস্তগত করতে চাইলো, তা হলো: তার মানদণ্ড “পুরুষ”-এর তা আছে।
কিন্তু একথা সে উপলব্ধি করলো না যে, নারী ও পুরুষের মাঝে বৈশিষ্ট্যের যে বৈচিত্র রয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই আল্লাহ উভয়কে সম্মানিত করেছেন, তাদের সাদৃশ্যের ভিত্তিতে নয়। পুরুষকে আমরা যখন মাপকাঠি হিসেবে মেনে নেই, সহসাই নারীত্বের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যগুলি হেয় বা হীন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। সংবেদনশীল হওয়াটা অমর্যাদাকর, আর পুরোদমে মা হওয়াটা তো রীতিমত অধঃপতিত হওয়ার শামিল। পুরুষালি বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত আবেগ শূন্য নিরেট যুক্তিবাদ এবং নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত নিঃস্বার্থ মায়া ও মমতার দ্বন্দ্বে যুক্তিবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
পুরুষের যা আছে এবং পুরুষ যা করে, তার সবকিছুকে যখন আমরা উত্তম হিসেবে মেনে নেই, তখন তার অবশ্যম্ভাবী বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া হিসেবে যা ঘটে তা হলো: পুরুষের যদি এটা থাকতে পারে, তবে আমরাও সেটা পেতে চাই। পুরুষরা কাতারের সামনে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করলে আমরা ভেবে নিই যে, এটাই উত্তম, তাই আমরাও সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করতে চাই। যেহেতু পুরুষরা সলাতে ইমামতি করে – আর আমরা ধারণা করে নিই যে, ইমাম সাহেব তো আল্লাহর নিকটবর্তী, তাই আমরাও ইমামতি করতে চাই। এমনিভাবে কোনো এক সময় আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, দুনিয়াতে নেতৃত্বের কোনো একটা অংশ লাভ করাটা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটা আলামত।
কিন্তু একজন মুসলিম নারীর নিজেকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, আল্লাহর দেওয়া মাপকাঠিই তার মাপকাঠি। আল্লাহই তার মূল্যায়ন করবেন, এটার জন্য পুরুষের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন তার নেই।
নারী হিসেবে আমাদেরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সে মর্যাদাকে আমরা তখনই ভূলুণ্ঠিত করি, যখন আমরা যা নই, তা হওয়ার চেষ্টা করি। সত্যি বলতে কি, পুরুষের মতো হওয়ার চেষ্টা করবেন না। যতক্ষণ আমরা পুরুষকে অনুকরণ করার চেষ্টা বন্ধ না করবো, ততক্ষণ নারী হিসেবে আমাদের সত্যিকার স্বাধীনতা মিলবে না। আল্লাহর দেওয়া বৈচিত্রমণ্ডিত বৈশিষ্ট্যগুলোকে যতক্ষণ না আমরা কদর করবো, ততক্ষণ সত্যিকার মুক্তি আমাদের ভাগ্যে জুটবে না।
অন্যদিকে সমাজে আরেকটি প্রভাবশালী তথাকথিত 'প্রভু' রয়েছে, যে নারীর মর্যাদা নির্ধারণ করে। আর তা হলো: সৌন্দর্যের মাপকাঠি। যখন আমরা ছোট ছিলাম, তখন থেকেই নারী হিসেবে সমাজ আমাদেরকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। আর সেই বার্তাটি হলো: "স্লিম হও, আবেদনময়ী (সেক্সি) হও। আকর্ষণীয় হও। অন্যথায় ... তুমি কিছুই নও।”৫৭
আমাদেরকে বলা হয় তাদের মতো মেকআপ করতে এবং তাদের মতো ছোট ছোট স্কার্ট পড়তে। নির্দেশনা দেওয়া হয়, রূপসী দেখানোর স্বার্থে নিজেদের জীবন, নিজেদের দেহ এবং নিজেদের আত্মসম্মানকে বলি দিতে। শেষ অবধি আমরা বিশ্বাস করতে থাকি যে, আমরা যাই করি না কেন, আমরা ততটুকু মর্যাদারই অধিকারী, যতটুকু হলে আমরা पुरुषদেরকে তুষ্ট এবং তাদেরকে বিমোহিত করতে সফল হই। ফলে আমরা কাদামাটির নিচে কৃত্রিম জীবনযাপন করি, আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের হাতে নিজেদের দেহ তুলে দিই বিক্রির উদ্দেশ্যে।
আসলে আমরা গোলাম, তবে তারা আমাদের ভাবতে শেখায় যে, আমরা মুক্ত-স্বাধীন। প্রকৃতপক্ষে আমরা তাদের পণ্য সামগ্রী, কিন্তু তারা কসম খেয়ে বলে যে, এটাই সফলতা। যেহেতু তারা আপনাকে শিখিয়েছে যে, সবার সামনে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোই আপনার জীবনের উদ্দেশ্য এবং পুরুষদেরকে আকর্ষণ করা, তাদের জন্য নিজেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করাটাই মূল লক্ষ্য। তারা আপনাকে এ কথা বিশ্বাস করিয়েছে যে, তাদের গাড়ি বাজারজাত করার জন্য আপনার দেহখানা সৃষ্টি করা হয়েছে।
কিন্তু তারা মিথ্যা বলেছে।
আপনার দেহ, আপনার আত্মাকে এটার চেয়েও উন্নততর কিছুর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর থেকে অনেক উচ্চতর ও উন্নততর কিছুর জন্যই।
আল্লাহ কুরআনে বলেন: “বস্তুত তোমাদের মধ্যে সেই তো আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী (তথা আল্লাহ ভীরু, নেককার)।” (কুরআন, ৪৯:১৩)
বস্তুত আপনি সম্মানিত। তবে সেটা না পুরুষের সাথে আপনার সম্পর্কের কারণে, না তাদের মতো হয়ে, আর না তাদেরকে তুষ্ট করে। নারী হিসেবে আপনার মর্যাদা আপনার কোমরের মাপ কিংবা কতজন পুরুষ আপনাকে পছন্দ করে, তার সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ হিসেবে আপনার মর্যাদা এসবের চেয়ে উচ্চতর মাপকাঠিতে মাপা হয় এবং তা হচ্ছে: সৎকর্মশীলতা ও তাকওয়ার মাপকাঠি। ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলি যাই বলুক না কেন, আপনার জীবনের উদ্দেশ্য পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হওয়ার চেয়েও অনেক অনেক গুণ মহৎ ও উৎকৃষ্টতর কিছু।
আমাদের পূর্ণতা আসে আল্লাহর নিকট হতে এবং তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে। তথাপি একেবারে ছোটবেলা থেকেই আমাদেরকে একজন নারী হিসেবে শেখানো হয়েছে যে, যতক্ষণ না একজন পুরুষ এসে আমাদেরকে পূর্ণ করছে, ততক্ষণ আমরা পূর্ণতা লাভ করবো না। আমাদের শেখানো হয়েছে যে, সিনড্রেলার মতো যতক্ষণ না কোনো রাজকুমার এসে তাকে উদ্ধার করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিতান্তই অসহায়। আমাদের বলা হয়, Sleeping Beauty-র স্বপ্নের রাজকুমার এসে চুমু না দেওয়া পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের জীবনের সূচনা হচ্ছে না। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে: কোনো রাজকুমারই আপনাকে পূর্ণতা দিতে সক্ষম নয়। আর না কোনো বীরযোদ্ধা পারে আপনাকে বাঁচাতে। বস্তুতঃ শুধু আল্লাহই আপনাকে পূর্ণতা দিতে ও রক্ষা করতে সক্ষম।
আপনার রাজকুমার একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ হয়তো তাকে আপনার জীবন সঙ্গি হিসেবে পাঠাতে পারেন, কিন্তু সে আপনার মুক্তিদাতা নয়। তিনি (আপনার জীবন সঙ্গি), আপনার চোখের শান্তি হতে পারেন, কোনো অবস্থাতেই আপনার কণ্ঠনালীর জীবনদায়ী বাতাস নয়। আল্লাহর নৈকট্যই আপনার (জীবনদায়ী) বাতাস। তাঁর নৈকটের মধ্যেই আছে আপনার নাজাত ও পূর্ণতা, কোনো সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে নয়। কোনো রাজকুমারের মাঝে যেমন নয়, তেমনি কোনো ফ্যাশন বা স্টাইলের মধ্যেও নয়।
তাই আমি আপনাকে বলছি, এসব থেকে মুক্ত হন, মন থেকে এসব শিক্ষা ও ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। আমি আপনাকে বলবো, দাঁড়ান, উঠে দাঁড়ান এবং গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দেন যে, আপনি কোনো কিছুরই দাস নন, না কোনো ফ্যাশন, না রূপ-সৌন্দর্য, আর না কোনো পুরুষ, কোনো কিছুরই দাস নন আপনি। আপনি কেবলই আল্লাহর দাস কেবলই আল্লাহর। আমি আপনাকে আহ্বান করবো দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে যে, নিজের দেহ দিয়ে পুরুষদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য আপনি দুনিয়াতে আসেননি। আপনি এই দুনিয়াতে এসেছেন কেবলই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে। তাই আপনার সেই সব হিতাকাঙ্ক্ষী যারা আপনাকে 'মুক্ত' করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য কেবল একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলুন, "ধন্যবাদ, (যথেষ্ট হয়েছে), আর না।"
তাদেরকে বলে দেন, আপনি কোনো প্রদর্শনের বস্তু বা সামগ্রী নন। আপনার দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। দুনিয়া ভালো করে জানুক, তারা আপনাকে আর পণ্যের স্তরে নামিয়ে আনতে পারবে না বা জুতা বিক্রির বিজ্ঞাপনের জন্য আপনাকে কেবল এক জোড়া (সুন্দর) পা সর্বস্বও করতে সক্ষম হবে না। (সকলকে এটা জানিয়ে দিন) আপনি এক (পরিপূর্ণ মানব) আত্মা, একটি চিন্তাশীল সত্তা, স্রষ্টার এক দাস, আর আপনার মর্যাদার ভিত্তি হলো: হৃদয় ও আত্মার সৌন্দর্যে এবং নৈতিক চরিত্রের মাধুর্যে। তাই তাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির উপসনা আপনি করেন না এবং তাদের ফ্যাশন চেতনার কাছে আপনি নিজেকে কখনো সমর্পণ করেন না। আপনার আত্মসমর্পণ হলো: সর্বোচ্চ সেই সত্তার নিকট।
সুতরাং, কোথায় ও কিভাবে একজন নারীর ক্ষমতায়ন হবে, এই প্রশ্নের জবাব দানের সময় আমি নিজেকে আমাদের নবি (ﷺ)-এর ওই সাহাবির উক্তির দিকেই ফিরে যাচ্ছি। ঘুরেফিরে আমি এই উপলব্ধির দিকে ফিরে আসি যে, সত্যিকারের মুক্তি ও ক্ষমতায়ন নিহিত রয়েছে নিজেকে অন্যসব প্রভু থেকে মুক্ত করার মধ্যে, নিজেকে অন্য সকল সংজ্ঞা ও মানদণ্ড থেকে মুক্ত করার মাঝেই সত্যিকারের মুক্তি নিহিত।
মুসলিম নারী হিসেবে আমাদেরকে এই নীরব দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে। নিজেদের মর্যাদা ও মূল্যমান নির্ধারণে সমাজের তৈরি করা সৌন্দর্য ও ফ্যাশনের স্ট্যান্ডার্ডের প্রয়োজন আমাদের নেই। সম্মানিত হওয়ার জন্য আমাদেরকে কোনো পুরুষের মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের রক্ষা করা বা পূর্ণতা দেওয়ার জন্য কোনো এক রাজকুমারের আশায় থাকার প্রয়োজন আমাদের নেই। আমাদের গুরুত্ব, আমাদের মর্যাদা, আমাদের নাজাত এবং আমাদের পূর্ণতা কোনো এক দাস বা সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল না।
বরং এসবই নির্ভর করে সকল সৃষ্টি ও সকল দাসের প্রভু – আল্লাহর ওপর।
টিকাঃ
৫৭ এর সাথে আমাদের দেশে যুক্ত হয়েছে, “তোমার রং ফর্সা করো।" সমাজ, কর্পোরেট ব্যবসা আর মিডিয়ার দৌরাত্বে আমাদের মা-বোনেরা আজ আল্লাহর দেওয়া রূপ-লাবণ্যে সন্তুষ্ট নন। তারা বরং রং ফর্সা করার অসম্ভব এবং স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক প্রচেষ্টায় সময়, সম্পদ, মেধা এবং নিজের স্বাস্থ্য ধ্বংস করছেন। বিয়ের বাজারে সব ছেলেই ফর্সা মেয়েই খুঁজে, অথচ সে তার মা-বোনের দিকে তাকিয়ে দেখে না। সব মা তার ছেলের জন্য ফর্সা পাত্রী চান, কিন্তু নিজের কন্যার দিকে তাকিয়ে দেখেন না। কি দূর্ভাগ্যজনক ও অস্বাস্থ্যকর মানসিকতা। ঈমানহীন বস্তুবাদীতা হতে এসবের জন্ম। আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তা কেবলই মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিকৃত রূপ ধারণ করা। বরং আসুন আমরা সবাই অন্তরকে আলোকিত করে আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হই। রং-এ (তথা গুণ ও বৈশিষ্ট্যে) আল্লাহর চেয়ে উত্তম আর কে? (বাকারা: ১৩৮) (সম্পাদক)।
* Sleeping Beauty: একটি জনপ্রিয় পাশ্চাত্য রূপকথা। ডাইনি বা দুষ্টুপরী কর্তৃক অভিশপ্ত হয়ে এক রাজকন্যা একশ বছর ঘুমিয়ে থাকে। পরে এক রাজকুমার এসে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে দেখে অভিভূত হয়ে তাকে চুম্বন করলে রাজকন্যার ঘুম ভাঙ্গে। এখানে লেখিকা সে কল্পকাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করেছেন- (সম্পাদক)।
যা প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে (সম্পাদক)।
📄 যে সমাজ-সংস্কৃতিতে আমি বড় হয়েছি —তার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি
আমি যখন বেড়ে উঠছি, তখন তুমি (অর্থাৎ আমার সমাজ) আমাকে অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত (Ugly Duckling) ছাড়া কিছুই ভাবোনি। আর বছরের পর বছর নিজেকে আমি তা-ই ভেবে এসেছি। দীর্ঘ সময় ধরে তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, কাঙ্ক্ষিত স্ট্যান্ডার্ড (তথা পুরুষের) একটা বাজে কপি বা নমুনা ছাড়া আমি আর কিছুই নই।
না আমি (পুরুষের মতো) এত দ্রুত দৌড়াতে পারি, আর না আমি এত ওজন তুলতে পারি। (তাদের) সমপরিমাণ অর্থ উপার্জনেও আমি অক্ষম। তদপুরি আমি শুধু কাঁদি আর কাঁদি। আমি বেড়ে উঠেছি এক পুরুষ কেন্দ্রিক দুনিয়াতে, যেখানে আমার (তথা নারীর) কোনো স্থান নেই।
আর যখন আমি পুরুষের মতো হতে পারলাম না, তখন আমি কেবল তাদেরকে তুষ্ট করতে চাইলাম। তোমার দেওয়া প্রসাধনী (মেক-আপ) ব্যবহার করতাম, আর তোমাদের শর্ট স্কার্টগুলো পড়ে নিতাম। আমি আমার জীবন, আমার শরীর এবং আমার আত্মমর্যাদা শুধু রূপসী হওয়ার জন্যই বিলিয়ে দিয়েছি। আমি জানতাম যে, আমি যাই করি না কেন, যতক্ষণ আমার মনিব আমার প্রতি তুষ্ট এবং যতক্ষণ সে আমার রূপ লাবণ্যে বিমোহিত, কেবল ততক্ষণই আমার মূল্য থাকবে।
আর তাই তোমার কসমেটিকসে আবৃত হয়ে আমি নিজের গোটা জিন্দেগি কাটিয়েছি এবং তোমাকে আমার দেহ পর্যন্ত দান করেছি বিক্রয় করার জন্য।
আমি ছিলাম এক গোলাম, কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, আমি স্বাধীন, মুক্ত। আমি ছিলাম তোমার ভোগ্য পণ্য, কিন্তু তুমি কসম কেটে বলেছো, এটাই সাফল্য। তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, আমার জীবনের লক্ষ্যই হলো: নিজেকে প্রদর্শন করা, পুরুষের জন্য নিজেকে আকর্ষনীয় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করা। তুমি আমাকে একথা বিশ্বাস করিয়েছো যে, আমার দেহখানি সৃষ্টিই হয়েছে তোমার গাড়িগুলি বিক্রি করার জন্য। তুমি আমাকে এ বুঝের ওপর বড় করেছো যে, আমি এক Ugly Duckling (অর্থাৎ কোনো কাজেরই নই, অথর্ব, অদ্ভুত, অর্থহীন)। কিন্তু তুমি মিথ্যা বলেছো।
ইসলাম আমায় বলে, 'আমি এক রাজহাঁস। আমি (যে পুরুষের চেয়ে) ভিন্ন কিছু (এটা কোনো এক্সিডেন্ট নয় বরং) এটাই হবার কথা ছিল, এ উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছে। আমার দেহ, আমার আত্মা তো সৃষ্টি হয়েছে আরও উচ্চতর কিছুর জন্য।
আল্লাহ কুরআনে বলেন: “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি সব বিষয়ের খবর রাখেন।” (কুরআন, ৪৯:১৩)
তাই আমি সম্মানিত কিন্তু তা পুরুষের সাথে আমার সম্পর্কের কারণে নয়। নারী হিসেবে আমার মর্যাদা আমার কোমরের মাপ বা কতজন পুরুষ আমাকে পছন্দ করে – তার ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ হিসেবে আমার মর্যাদার মাপকাঠি আরও অনেক উচ্চতর: সৎকর্মশীলতা ও তাকওয়ার মাপকাঠি। ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলি যাই বলুক না কেন, আমার জীবনের উদ্দেশ্য পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হওয়ার চেয়েও মহত্ত্বর ও উৎকৃষ্টতর কিছু।
এজন্য আল্লাহ আমায় বলেছেন: নিজেকে আবৃত করতে, নিজের সৌন্দর্যকে আড়াল করতে এবং গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে যে, আমার দেহকে ব্যবহার করে পুরুষকে খুশি করতে আমি এখানে আসিনি, আমি এখানে এসেছি শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য। নারীর দেহকে সম্মান করা ও আবৃত রাখা এবং শুধু উপযুক্তজন তথা আমি যাকে বিয়ে করবো, তাকে দেখানোর নির্দেশ দানের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা নারী দেহের (তথা তার রূপ-সৌন্দর্য ও আবেদন-এর) মর্যাদাকে উন্নত করেছেন।
তাই যারা আমাকে (তথাকথিত) 'স্বাধীন ও মুক্ত' করতে চায়, আমি তাদেরকে শুধু বলি, 'ধন্যবাদ, তবে আর নয়।'
সেজেগুজে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোর জন্য আমি দুনিয়ায় আসিনি। আমার এ দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। আমাকে একটা পণ্যের স্তরে বা জুতা বিক্রির জন্য একজোড়া (আকর্ষণীয়) পায়ের স্তরে নামিয়ে আনতে আমি দেবো না। আমিও আল্লাহর এক বান্দী, যার আছে একটি (জীবন্ত) আত্মা, আছে এক মননশীল হৃদয়। আমার মূল্যমান নির্ধারণ করবে আমার আত্মা, আমার হৃদয় এবং আমার নৈতিক চরিত্রের সৌন্দর্য। তাই না আমি তোমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির ইবাদত করবো, আর না তোমাদের ফ্যাশনের চেতনার কাছে আত্মসমর্পণ করবো। আমার আত্মসমর্পণ তো সর্বোচ্চ সত্তারই সমীপে।
নিজের রূপ-লাবণ্য প্রদর্শন করে বেড়ানোর পরিবর্তে হিজাব পালনের মাধ্যমে আমি আমার ঈমানের প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকি। মানুষ হিসেবে আমার মর্যাদা নির্ভর করে আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্কের ওপর, আমি দেখতে কেমন, তার ওপর নয়। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি আমি ঢেকে নিই। আর তাই আমার দিকে যখন তুমি তাকাও, তখন তুমি নিছক কোনো দেহ দেখতে পাও না। আমাকে তখন তুমি দেখ আমার প্রকৃত পরিচয় তথা আল্লাহর একজন অনুগত বান্দি হিসেবে।
দেখ, একজন মুসলিম নারী হিসেবে এই সব নীরব দাসত্ব হতে আমি নিজেকে মুক্ত করেছি। আল্লাহর বান্দা বা গোলামদের কাছে আমি জবাবদিহি করি না। আমি জবাবদিহি করি তাদের মালিকের নিকট।
টিকাঃ
* লেখিকা এখানে একজন নারী বা কন্যা সন্তানের প্রতি সমাজের মানসিকতা বুঝানোর জন্য ইংরেজিতে “Ugly Duckling” পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। যদিও "Ugly Duckling” জনপ্রিয় কার্টুন কাহিনীর শিক্ষা ভিন্নরূপ এবং ইংরেজি ভাষায় এ শব্দগুচ্ছের অর্থও ভিন্ন। লেখিকা এখানে আক্ষরিক অর্থে একে ব্যবহার করেছেন। "Ugly Duckling” হচ্ছে Hans Christian Andersen রচিত একটি জনপ্রিয় রূপকথা। এর ভিত্তিতে কার্টুন /এনিমেটেড মুভি ইত্যাদি তৈরি করা হয়েছে। একটি রাজহাঁসের বাচ্চা, সে বাচ্চা অবস্থায় এক সাধারণ হাঁসের ঘরে লালিত-পালিত হয়। সে অন্য হাঁসের বাচ্চাগুলির মতো সুন্দর না হওয়ার কারণে তাকে সবাই অপছন্দ করে। কিন্তু শেষে বড় হয়ে সে অনিন্দ্যসুন্দর এক রাজহাঁসে পরিণত হয়। এ গল্পখানা শিক্ষনীয়। তবে এখানে আক্ষরিক অর্থে অর্থাৎ অপাংক্তেও, অপছন্দনীয় ইত্যাদি অর্থে "Ugly Duckling" শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে - (সম্পাদক)।
** এখানে তুমি / তোমার সম্বোধন এর লক্ষ্য হলো: প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা – (সম্পাদক)।
-(সম্পাদক)।
📄 সালাতে নারীদের ইমামতি সম্পর্কে একজন নারীর ভাবনা
২০০৫ সালের ১৮ই মার্চ আমেনা ওয়াদুদ প্রথম বারের মতো একজন নারী হিসেবে জুমুআর সলাতে ইমামতি করান। পুরুষের মতো হওয়ার অগ্রযাত্রায় ওই দিনটি সত্যই নারীর জন্য বেশ বড় রকমের পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কি আল্লাহর দেওয়া স্বাধীনতা বাস্তবায়নে সত্যিকার অর্থে এগুতে পেরেছি? আমি তা মনে করি না।
আমরা প্রায়শই যে কথাটি ভুলে যাই, তা হলো: আল্লাহ তা'আলা পুরুষের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি নারীকে সম্মানিত করেছেন, মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু পশ্চিমা নারীবাদ দৃশ্যপট থেকে যখন স্রষ্টাকে মুছে দিল, তখন পুরুষ ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড বাকি থাকলো না। ফলশ্রুতিতে, তারা পুরুষের সাথে তুলনায় নারীর মর্যাদা নিরূপণে বাধ্য হলো। আসলে এর মাধ্যমে তারা এক ভ্রান্ত ধারণাকেই মেনে নিল। সে মেনে নিল যে, পুরুষই প্রকৃত মাপকাঠি আর এ ধারণা অনুসারে একজন নারী ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মানব মর্যাদা লাভে সক্ষম হবে না, যতক্ষণ সে ঠিক একজন পুরুষের মতো হতে পারছে।
পুরুষ যখন নিজের চুল কেটে ছোট করলো, নারীও তখন নিজের চুল কাটতে চাইলো। পুরুষ যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিল, তখন সেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠলো। একজন নারী এ সমস্ত জিনিস শুধু একটি কারণেই হস্তগত করতে চাইলো, তা হলো: তার স্ট্যান্ডার্ড তথা মাপকাঠি "পুরুষ”-এর তা আছে।
নারী যা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলো, তা হচ্ছে: মহান আল্লাহ তা'আলা নারী ও পুরুষ উভয়কেই মর্যাদাবান করেছেন তাদের বৈসাদৃশ্যময় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে, তাদের সাদৃশ্যের ভিত্তিতে নয়। আর ১৮ই মার্চ মুসলিম নারীরা ঠিক একই ভুলটিই করলো।
প্রায় ১৪০০ বছর যাবৎ আলেম-উলামা ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, সলাতে ইমামতি করবে পুরুষগণ। ৬০ মুসলিম নারী হিসেবে এই ব্যাপারটি নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর কি আছে? যিনি সলাতে ইমামতি করেন, তিনি কোনো দিক দিয়েই রুহানিভাবে শ্রেষ্ঠ নন। কোনো কাজ পুরুষ করছে বলে, সেটাই শ্রেষ্ঠ হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। সলাতে ইমামতি করাটা ইমামতি বা নেতৃত্বের কারণে উত্তম, তা নয়। এটা যদি নারীদের দায়িত্ব হতো কিংবা এটা যদি রুহানি দিক থেকে শ্রেষ্ঠতর কাজ হতো, তবে নবি (ﷺ) কেন আয়েশা বা খাদিজা অথবা ফাতেমার মতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিয়সী নারীদেরকে সলাতে ইমামতি করতে বলেননি? জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া সত্ত্বেও এই মহিয়সী নারীগণ তো কখনো সলাতের ইমামতি করেননি।
কিন্তু আজ ১৪০০ বছর পর এই দিনে পুরুষদেরকে সলাতে ইমামতি করতে দেখে প্রথমবারের মতো আমাদের মনে এই চিন্তার উদয় ঘটেছে, "এটা তো ইনসাফ হলো না।” আমরা এমনটি ভাবছি, যদিও আল্লাহ ইমামতি করার মাঝে আলাদা কোনো মর্যাদা রাখেননি। আল্লাহর চোখে ইমামের মর্যাদা তার পেছনের সলাত আদায়কারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি নয়।
অন্যদিকে কেবল নারীরাই মা হতে পারেন এবং আল্লাহ মাকে দিয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। নবি (ﷺ) আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে, মায়ের পদতলে রয়েছে জান্নাত। কিন্তু একজন পুরুষ যাই করুক না কেন, সে কখনো মা হতে পারবে না। তাহলে এটা কেন বৈষম্য বলে বিবেচিত হচ্ছে না?
যখন প্রশ্ন করা হলো, 'আমাদের থেকে উত্তম আচরণ পাওয়ার কে বেশি হকদার?” “তোমার পিতা" কথাটি বলার আগে নবি (স.) তিন তিনবার বলেন, “তোমার মা।” এটা কি লিঙ্গ বৈষম্যবাদের মধ্যে পড়বে? একজন পুরুষ আর যাই করুক না কেন, মায়ের মর্যাদা তার কপালে জুটবে না।
তা সত্ত্বেও, এমনকি আল্লাহ যখন আমাদের নারীদের এমন কিছু দিয়ে সম্মানিত করেন, যা শুধুই নারীসুলভ অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত, তখন আমরা পুরুষের সাথে তুলনা করে নিজেদের মর্যাদা খুঁজতে ব্যস্ত। এমনকি আমাদের সেই সব তুলনাহীন মর্যাদাসমূহ লক্ষ্য করতেও আমরা ব্যর্থ। আসলে আমরা নারীরাও পুরুষদেরকে মানদণ্ড হিসেবে মেনে নিয়েছি, তাই যে বৈশিষ্ট্যগুলো একান্তই নারীসুলভ, সংজ্ঞাগতভাবে সেগুলো হেয়তর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। লাজুক ও সংবেদনশীল হওয়াটা অপমানজনক, আর মা হওয়াটা তো অধঃপতিত হওয়ার শামিল। পুরুষালি বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত নিরেট যুক্তিবাদ এবং নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত স্বার্থহীন মায়া ও মমতার মাঝে যে দ্বন্দ্ব চলে, তাতে যুক্তিবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
পুরুষের যা আছে এবং পুরুষ যা করে, তার সবকিছুকে যখন আমরা উত্তম হিসেবে মেনে নেই, তখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ সিদ্ধান্ত আসে যে, পুরুষের যদি এটা থাকতে পারে, তবে আমরা নারীরাও সেটা চাই। পুরুষরা কাতারের সামনে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করলে আমরা ভেবে নিই যে, এটাই উত্তম, তাই আমরাও সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করতে চাই। যেহেতু পুরুষরা সলাতে ইমামতি করে – আর আমরা ধারণা করে নিই যে, ইমাম সাহেব তো আল্লাহর নিকটবর্তী, তাই আমরাও ইমামতি করতে চাই। এমনিভাবে কোনো এক সময় আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, দুনিয়াতে নেতৃত্বের কোনো একটা অংশ লাভ করাটা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটা আলামত বহন করে।
একজন মুসলিম নারীর নিজেকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, আল্লাহই তার মাপকাঠি। সম্মান লাভের জন্য তিনিই তার জন্য যথেষ্ট, এটার জন্য পুরুষের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন তার নেই।
প্রকৃতপক্ষে, পুরুষদেরকে অনুসরণ করার আমাদের এ ক্রুসেডে নারী হিসেবে আমরা একটি বারের জন্যও এই সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে দেখিনি যে, হয়তোবা আমাদের যা আছে, সেটাই আমাদের জন্য উত্তম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবল পুরুষের মতো হতে গিয়ে আমরা উন্নততর জিনিসকে বিসর্জন দিয়েছি। পঞ্চাশ বছর আগে, সমাজ আমাদেরকে বলেছে যে, ফ্যাক্টরিতে কাজ করার জন্য পুরুষরা ঘর থেকে বের হয়, তাই পুরুষেরা শ্রেষ্ঠ। আমরা ছিলাম মা। কিন্তু আমাদেরকে বলা হলো, আরেকজন মানুষকে লালন পালন করার দায়িত্ব ফেলে দিয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজে লেগে পড়ার মাঝেই নারীর স্বাধীনতা নিহিত। আমরা মেনে নিয়েছি, সমাজের ভিত্তি (তথা ভবিষ্যৎ বংশদের) গড়ার চেয়ে ফ্যাক্টরিতে কাজ করাটাই শ্রেষ্ঠ, কেবলমাত্র এই কারণে যে, পুরুষরা এই কাজ করে তাই।
তারপর, কাজের শেষে আমাদের কাছ থেকে অতি মানবীয় ভূমিকা আশা করা হতো। আমাকে হতে হবে আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ গৃহিণী এবং সেই সাথে একটা আদর্শ ক্যারিয়ার থাকতে হবে। একজন নারীর একটা ক্যারিয়ার থাকার মধ্যে দোষনীয় কিছু নেই, কিন্তু শীঘ্রই আমাদের বোধোদয় হতে শুরু করে যে, পুরুষকে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে গিয়ে আসলেই আমরা নিজেদেরকে বলি দিয়ে ফেলেছি। আমাদের চোখের সামনে আমাদের সন্তানগুলো কেমন যেন অচেনা ও অপরিচিত হয়ে উঠলো এবং যে বিশেষ সুবিধা আমরা বিসর্জন দিয়েছি, তা শীঘ্রই আমরা উপলদি করতে শুরু করি।
আর তাই তো, এখন যখন পশ্চিমা নারীবাদীদের সুযোগ দেওয়া হলো, তখন তারা তাদের সন্তানদেরকে লালন পালনের জন্য বাড়িতে অবস্থান করাকে বেছে নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক, বাচ্চাসহ মা-দের শতকরা ৩১ জন এবং দুই বা ততোধিক সন্তানসহ মা-দের মাত্র শতকরা ১৮ জন ফুল টাইম (পূর্ণ সময়) কাজ করছেন। ২০০০ সালের প্যারেন্টিং ম্যাগাজিন কর্তৃক পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী এইসব কর্মজীবী মা-দের মধ্য থেকে শতকরা ৯৩ জন মা বলেছেন তারা বরং তাদের বাচ্চাদের সাথে বাড়িতে থেকে যেতে চান, কিন্তু 'অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার' কারণে তারা কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সমস্ত 'বাধ্যবাধকতা' লিঙ্গ সমতার দাবিদার আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা নারীর ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে, যেখানে ইসলাম লিঙ্গ বৈচিত্রতার ভিত্তিতে নারীর কাঁধ থেকে এসব 'বাধ্যবাধকতার' জিঞ্জির অপসারণ করেছে।
মুসলিম নারীগণকে ১৪০০ বছর আগে যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার মর্ম উপলব্ধি করতে পশ্চিমা সভ্যতার প্রায় শত বৎসর ব্যাপী পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়েছে। নারী হিসেবে আমাকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সে মর্যাদাকে আমি তখনই ভূলুণ্ঠিত করি, যখন আমি যা নই, তা হওয়ার জন্য চেষ্টা করি। পূর্ণ সততার সাথে বলছি, পুরুষের মতো হওয়ার চেষ্টা করবেন না। নারী হিসেবে যতক্ষণ না আমরা পুরুষের অনুসরণের চেষ্টা বন্ধ করবো এবং আমাদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া বৈচিত্রমণ্ডিত বৈশিষ্ট্যগুলির সৌন্দর্যের কদর না করবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সত্যিকার স্বাধীনতা মিলবে না।
যদি নিরেট ন্যায়বিচার এবং মমতার মাঝে বাছাই করতে দেওয়া হয়, তবে আমি মমতাকেই বেছে নেবো। আর যদি আমার পায়ের সামনে দুনিয়াবি নেতৃত্ব ও জান্নাতকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে আমি জান্নাতকেই বেছে নেবো।
টিকাঃ
•• আমেনা ওয়াদুদ ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক আফ্রিকান-আমেরিকান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি উগ্র নারীবাদী চিন্তা-চেতনা লালন করেন। আমেরিকার মসজিদগুলি এহেন জুমুআর জামাত আয়োজনে অস্বীকৃতি জানালে তিনি এক গির্জায় এই তথাকথিত জুমুআর সলাত আয়োজন করেন। এই কার্যক্রম সকল হকপন্থী ইসলামি চিন্তাবিদগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন (সম্পাদক)।
* এখানে নারী পুরুষের সম্মিলিত সলাতের কথা বলা হয়েছে। কারণ, শুধু নারীদের মধ্যে যে সলাতের জামাত হয়, তাতে নারীরা ইমামতি করতে শরিয়তে কোনো বাধা নেই (সম্পাদক)।