📄 একেই বলে জাগরণ
এমন অনুভূতি বর্ণনার ভাষা নেই। একবার ভাবুন তো, আপনি সারাটা জীবন একটা গুহায় বাস করলেন এবং এই বিশ্বাসে যে, এটাই আপনার গোটা দুনিয়া। এরপর হঠাৎ করেই একদিন আপনি বাইরে পা রাখলেন। প্রথমবারের মতো আপনি আকাশ দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন সারি সারি গাছ, পক্ষিকুল এবং সূর্য। জীবনে প্রথমবারের মতো আপনি উপলব্ধি করলেন, যে জাতটা আপনি চিনতেন তার পুরোটাই ছিল ভ্রম, বিভ্রান্তি। প্রথমবারের মতো আপনি অধিকতর সত্য ও সুন্দর এক বাস্তবতা আবিষ্কার করলেন। এই উপলব্ধির উচ্চতাটা একবার অনুভব করুন। ক্ষণিকের জন্য মনে হবে, আপনি যেকোনো কিছু করতে পারেন। সহসাই গুহায় কাটানো আগের জীবনের সকল কিছুই আপনার কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। প্রথমবারের মতো আপনি ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেন, সম্পূর্ণভাবে জেগে উঠলেন, পূর্ণভাবে প্রাণবন্ত হলেন এবং হলেন পুরোপুরি সচেতন। এটা এমন একটা অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটাই সে রুহানি উৎকর্ষ, যা সত্যকে নতুনভাবে আবিষ্কারে ফলশ্রুতিতে অর্জিত হয়।
এটাই প্রকৃত জাগরণ।
একজন ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিই কেবল এই অনুভূতির স্বাদ পান। একজন জন্মগত মুসলিম ব্যক্তি, যিনি দ্বীনে আসেন, তিনিও এই অনুভূতিকে চিনেন। যেকোনো ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ বিমুখ জীবনযাপন করছিলেন, অতঃপর আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন, তিনিও এ অনুভূতির সাথে পরিচিত। এই অবস্থাকে ইবনে কাইয়্যিম (র.) তার 'মাদারিজ আস-সালিকিন' (আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার স্টেশনসমূহ) গ্রন্থে يُقَظَةُ (জাগরণ) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই অবস্থাকে তিনি আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রথম স্টেশন হিসেবে বর্ণনা করেন। কখনো কখনো এই অবস্থাকে 'ধর্মান্তরের উদ্দীপনা' বলা হয়। যখন কেউ প্রথমবারের মতো ধর্মান্তরিত হন কিংবা আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে শুরু করেন, সচরাচর তারা বেশ উদ্দীপ্ত এবং প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকেন, যেটা অন্যদের মাঝে দেখা যায় না। রুহানি উৎকর্ষের কারণেই এই প্রাণশক্তির সঞ্চার হয় এবং এটাই এই অবস্থার সহজাত বৈশিষ্ট্য।
'জাগরণ' স্টেশনের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
আল্লাহ ইবাদতকে সহজ করে দেন:- এই অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত বেশ সহজতর হয়। এই পর্যায়ে ব্যক্তি এতটাই উদ্দীপ্ত ও সতেজ থাকে যে, সদ্য আবিষ্কৃত ওই বাস্তবতার জন্য সে সহজেই সকল কিছু কুরবানি করতে পারে। এই উদ্দীপনা এই ব্যক্তিকে এক নিমিষেই ০ থেকে ৬০ এ নিয়ে যেতে পারে। এটা অনেকটা রুহানি স্টেরয়েড গ্রহণের মতো। এই যে শক্তি আপনি লাভ করেন, তা আপনার নিজ সত্তা থেকে আসে না, বরং আপনাকে দেওয়া সাহায্য থেকে আপনি এই শক্তি লাভ করেন। এই ক্ষেত্রে এই সাহায্য আসে আল্লাহর তরফ থেকে। অনেকে এতো বেশি, এত দ্রুত বদলে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু দ্রুত বদলে যাওয়াটা কোনো সমস্যা বলে আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় এক্ষেত্রে আসল সমস্যা হলো: অহমিকা। সমস্যা হলো সহজেই হতোদ্যম হয়ে পড়ার মধ্যে। আল্লাহ যদি আপনাকে এমন কোনো উপহার দেন, যার সাহায্যে আপনি অধিক হারে কিছু করতে সক্ষম হন, তাহলে তা ব্যবহার করাতে দোষের কিছু নেই। তবে ওই সক্ষমতা লাভের জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দেবেন না। বরং আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করুন। আর মনে রাখবেন, (প্রাথমিক পর্যায়ের) এই উজ্জীবিত মানসিক অবস্থা ক্ষণস্থায়ী। আপনি হয়তো এর সাহায্যে অল্প সময়েই ০ থেকে ৬০ এ পৌঁছে যেতে পারেন, কিন্তু উজ্জীবিত অবস্থা পার হয়ে গেলে, আশা হারাবেন না এবং নিজেকে পিছলে "০”-তে ফিরে যেতে দেবেন না।
ক্ষণস্থায়িত্ব:- এই জীবনের অন্য সব অবস্থার মতো আত্মার এই উজ্জীবিত অবস্থাও ক্ষণস্থায়ী। জীবন সরলরেখার মতো সোজা নয়। আল্লাহর দিকে চলার পথটাও নয়। এই বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি না করলে, এ অবস্থা অতিক্রান্ত হওয়ার পর হতাশা ও নৈরাশ্যের জন্ম দিতে পারে।
আত্মার এই অবস্থার লুকায়িত বিপত্তিসমূহ:
রুহানি জাগরণের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি বুঝে না আসাই প্রকৃতপক্ষে আত্মার এ অবস্থার অজানা বা লুকায়িত দুটো বিপত্তি উৎসারিত হওয়ার কারণ। এই বিপত্তি দুটো আল্লাহর পথে শুরু করা যাত্রাকে স্থবির করে দেওয়ার দুটো কারণও বটে। এই বিপত্তি দুটো হচ্ছে: [১] অহমিকা/আত্মতুষ্টি এবং [২] নৈরাশ্য। অহংকারী ব্যক্তি ইতোমধ্যেই এ রকমটাই ধারণা করে যে, সে যথেষ্ট উন্নতি করছে, তাই সে প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে আশাহত ব্যক্তি তো ধরেই নিয়েছে, তার পক্ষে যথেষ্ট উন্নতি করা কখনোই সম্ভব না, তাই সেও চেষ্টা থামিয়ে দেয়। [মজার ব্যাপার হলো] দুটো ভিন্ন ভিন্ন রোগ একই পরিণতির দিকে ধাবিত করে। আর তাহলো আল্লাহর পথে সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টাকে থামিয়ে দেয়।
অহমিকা:- রুহানি জাগরণের এই পর্যায়ে অধিক ইবাদতের যে শক্তি সৃষ্টি হয়, সেটা এই বিশেষ অবস্থার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য এবং এই শক্তি আল্লাহর তরফ থেকে আসে, ব্যক্তির নিজের তরফ বা তার যোগ্যতায় নয় – এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলশ্রুতিতে প্রথম বিপত্তির সৃষ্টি হয়। বিষয়টি যারা ঠিক মতো উপলব্ধি করে না, ইবাদতের এই বর্ধিত শক্তিকে তারা ভুলভাবে নিজেদের দ্বীনদারি বা তাকওয়ার উচ্চমান বলে মনে করতে থাকে। এই ভুল ধারণা বেশ ভয়ংকর। কেননা, এটা ব্যক্তির মাঝে অহংকার এবং নিজেকে অন্যদের তুলনায় দ্বীনদার ভাবার রোগ সৃষ্টি করে। আত্মিক জাগরণের এই উন্নত “দ্বীনদার অবস্থা” বস্তুত আল্লাহর তরফ থেকে আসা এক উপহার, এটা উপলব্ধি করার পরিবর্তে (এই নতুন) ইবাদতগুজার বান্দা নিজের মাঝে এক প্রকার লুকানো গর্ব অনুভব করতে শুরু করে এবং এই একইরকম উদ্দীপনা দেখায় না, তাদেরকে সে খাটো করে দেখতে শুরু করে।
হতাশা ও নৈরাশ্য:- জীবনের অন্য সব অবস্থার মতো “উন্নত” আত্মিক জাগরণও যে ক্ষণস্থায়ী ৫২ এটা উপলব্ধি করতে না পারার ফলে এই বিপত্তির জন্ম নেয়। এটার মানে এই নয় যে, আপনি ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা কোনো ভুল করেছেন। রমজান যে আত্মিক উৎকর্ষতা আমার-আপনার মধ্যে নিয়ে আসে, তা মনের মাঝে কেমন অনুভূতির সৃষ্টি হয়, তা অনেকেই উপলব্ধি করেন। উন্নত আত্মিক অবস্থায় এই অস্থায়ী অবস্থা জীবনেরই এক স্বাভাবিক চিত্র। আর এটি এমন একটি শিক্ষা, যা আবু বকর (রা.)-কেও শিখতে হয়েছে।
একদিন আবু বকর (রা.) এবং হানযালা (রা.) নবি (ﷺ)-এর কাছে আসেন এবং বলেন: “হে আল্লাহর রসুল, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। আল্লাহর রসুল (ﷺ) বলেন, 'তা কি রকম?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসুল, যখন আমরা আপনার সাথে থাকি, তখন আপনি জান্নাত ও জাহান্নামের কথা আমাদেরকে এমনভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যেন আমরা তা সরাসরি দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের স্ত্রী, সন্তান ও ধন-সম্পদের মধ্যে নিমগ্ন হই, সে সময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। আল্লাহর রসুল (ﷺ) বললেন, 'যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর কসম করে বলছি! আমার কাছে থাকার সময় তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সে অবস্থায় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর যিকিরের ওপর থাকতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে তোমাদের বিছানায় এবং রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করতো। কিন্তু, হে হানযালা! কিছু সময় (আল্লাহর যিকিরে) এবং কিছু সময় (দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করো) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা করো)। এ কথাটি তিনি (ﷺ) তিনবার বললেন।” [মুসলিম]
রুহানি উৎকর্ষতার উচ্চ অবস্থা অতিক্রান্ত হওয়ার পর:
এই [রুহানি] যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে: কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। মনে রাখবেন, আপনি একই রকম উদ্দীপনা সব সময় অনুভব করবেন না, এটা এজন্য নয় যে, আপনি কোনোকিছুতে ব্যর্থ হয়েছেন। (রুহানি প্রেরণার) উচ্চ মুখী প্রবলতার পর যে নিম্নমুখী প্রবণতার সৃষ্টি হয়, তা এ পথের স্বাভাবিক অংশ। যেমনিভাবে নবি (ﷺ) আবু বকর (রা.)-কে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, এসব উত্থান-পতন এই [রুহানি] পথের স্বাভাবিক অংশ। আমরা যদি সব সময় আত্মার উচ্চতম উৎকৃষ্টতায় অবস্থান করতাম, তখন আমরা মানুষ থাকতাম না, ফেরেশতা হয়ে যেতাম। আমরা কি করি, মূলতঃ সাফল্য তার ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রশ্ন হলো: যখন আত্মা নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকে, যখন আমলের সেই আমেজটা আমরা আর সে রকম অনুভব করছি না, তখন আমরা কি করি। এই পথে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো: যখন আপনি উদ্দীপনার তলানীতে পৌঁছে গেছেন, তখনও আপনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন, এ কথা জেনে যে, এটাই এ পথের স্বাভাবিক অবস্থা।
শয়তানের ফাঁদ:
মনে রাখবেন, আপনি কোন অবস্থায় আছেন, তার ওপর ভিত্তি করে শয়তান আপনাকে কাবু করার নানা চেষ্টা চালাবে।
যখন আপনি [রুহানি] উচ্চতায় অবস্থান করেন- যখন আপনি রুহানি বা আত্মিক উচ্চতায় অবস্থান করেন, তখন সে চাইবে আপনাকে অহংকারী বানাতে। সে চাইবে, আপনি যেন অন্যদের খাটো করে দেখেন। শেষমেশ সে আপনাকে নিজের সম্পর্কে এতটাই আত্মতুষ্ট করে তুলবে যে, নিজের অবস্থা উন্নয়নের জন্য যে কঠিন পরিশ্রম করা দরকার, তার প্রয়োজন আপনি আর বোধ করবেন না। কেননা, আপনি তো ইতোমধ্যেই বিশাল উন্নতি হাসিল করেছেন (এবং আশেপাশের সবার থেকে আপনি উত্তম। আপনার নিজের দুর্বলতাগুলির যথার্থতা প্রমাণের জন্য সে (অর্থাৎ শয়তান) আপনাকে অবিরাম আপনার চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে আমলে পিছিয়ে আছে, এমন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দিতে উদ্বুদ্ধ করবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি হিজাব না পড়েন, তবে সে আপনার মনে এ ভাবনা সৃষ্টি করবে যে, হিজাবিদের কেউ কেউ আছে, যারা এমন অন্যায় কাজ করে। আমি অন্তত সেগুলো করি না। আর আমি এমন অমুক অমুক ভালো কাজ করি, যেগুলো এসব হিজাবিরা করে না! অথবা আপনি যদি সলাতে অমনোযোগী হন, তখন হয়তো ভাবতে পারেন, “অন্ততপক্ষে, আমি তো আর অমুকের অমুকের মতো ক্লাবে যাই না, মাদক গ্রহণ করি না।” মনে রাখবেন, আল্লাহ কোনো (গ্রাফ পেপারে) "কার্ড” (Curve)-এ আপনার গ্রেডিং করছেন না (অর্থাৎ অন্যের সাথে তুলনায় আপনার গ্রেডিং হচ্ছে না)। অন্যরা কি করছে, তাতে কিছু যায় আসে না। কিয়ামতের দিন আমাদের সবাইকে (হিসাবের জন্য যার যার হিসাব নিয়ে) একাকী দাঁড়াতে হবে। আমরা যেন আল্লাহর পথে চেষ্টা থামিয়ে দেই, সে লক্ষ্যে শয়তান এসব চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
যখন আপনি তলানিতে:- অন্যদিকে যখন (আমলের দুর্বলতার কারণে) আপনার আত্মিক মনোবল নিম্নমুখী, তখন শয়তান আপনার ওপর ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে। সে নৈরাশ্য দিয়ে আপনাকে পাকড়াও করতে চাইবে। সে আপনাকে বিশ্বাস করাতে চাইবে যে, আপনি একটা অপদার্থ, আর তাই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কোনো মানে নেই। সে আপনার মনে একথা বদ্ধমূল করে দিতে চাইবে যে, আপনি পুরোপুরি ব্যর্থ আর আপনি যাই করুন না কেন, যে ঈমানি ও রুহানি উচ্চতায় আপনি এক সময় ছিলেন, সেখানে আর কখনো ফিরতে পারবেন না। কিংবা সে চাইবে আপনার মনে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করতে যে, আপনি এতটাই 'খারাপ' যে স্বয়ং আল্লাহও আপনাকে ক্ষমা করবেন না। যার ফলশ্রুতিতে, আপনি নিজেকে (ঈমান ও আমলে) আরও অধঃপতিত হওয়ার সুযোগ করে দেবেন। আপনি হয়তো এক সময় (ঈমান ও আমলের দিক দিয়ে) উচ্চ অবস্থানে ছিলেন, পরবর্তীতে নিজের প্রতি খারাপ ধারণা জন্মাতে থাকে। ইবাদত-বন্দেগিতে গাফেলতি শুরু হলে আপনার এমনও হতে পারে যে, আপনি যখন ইতোপূর্বে দ্বীনদারীর দিক থেকে অগ্রসর ছিলেন, তখন আপনি অন্যের ভুলত্রুটি বা তাদের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিতেন না। শেষ পর্যন্ত এটা এক আত্মঘাতী পরিণতি ডেকে আনে, কারণ চূড়ান্ত পর্যায়ে এর ফলাফল দাঁড়ায়: আপনি নিজেকেও ভুল করার বা দুর্বলতা প্রদর্শনের অনুমতি দেবেন না।
যেহেতু আপনি নিজেকে আর সব মানুষের মতো মানুষ মনে করছেন না এবং আপনারও ভুল-ত্রুটি-কমতি হতে পারে, এ কথা মানতে পারছেন না, ফলশ্রুতিতে যখন আপনি ভুল করে ফেলেন, তখন নিজের প্রতি এতটাই কঠোর হন যে, আশা হারিয়ে ফেলেন। ফলে হাল ছেড়ে দেন। এর পরিনামে আপনি আরও গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারেন, যা আপনার হতাশাকে আরও খারাপ দিকে নিয়ে যায়। আর এটা আপনার এক আত্ম-সৃষ্ট অবিরাম দুষ্টচক্রের রূপ ধারণ করে। শয়তান আরও চেষ্টা করবে আপনাকে এটা বিশ্বাস করাতে যে, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া বা তাঁর ইবাদত বন্দেগি করা আপনার জন্য বাঞ্ছনীয় নয়, কারণ এমন একজন 'খারাপ' মানুষ হয়ে এসব করা আপনাকে কেবল একজন মুনাফিকে পরিণত করবে মাত্র। শয়তান আপনাকে আল্লাহর ক্ষমা থেকে নিরাশ করতে চায়। এটাই তার চাওয়া। এসবই অতি অবশ্যই মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু শয়তান যা করে, তাতে সে বেশ দক্ষ। কারণ, যখন আপনি পাপ করেন, তখনই আপনাকে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে আরও অধিক হারে কম কোনো অবস্থাতেই নয়।
এই নিম্নমুখী সর্পিল প্রতারণার জাল থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হলে, মনে রাখবেন, এই যে আত্মিক নিম্নমুখী প্রবণতা এটা কিন্তু এই পথেরই একটা অংশ। মনে রাখবেন, 'ফুতুর' তথা পতন মানুষের জীবনেরই একটি অংশ। তাই একবার যখন আপনি উপলব্ধি করেন যে, এই রুহানি পতনের অর্থ এই নয় যে, আপনি ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা আপনি একজন মুনাফিক (যেমনটি আবু বকর (রা.) ভেবেছিলেন), তখন এই অবস্থায় পৌঁছার পরও আপনি হাল ছেড়ে দেওয়া থেকে নিজেকে সামলাতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো: আপনাকে এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যা আপনার জন্য "ন্যূনতম মান" হিসেবে কাজ করবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আপনি যেমনই বোধ করুন না কেন, যতই হতোদ্যম বা যত মনমরা হতাশ বোধ করেন না কেন, কম করে হলেও এইটুকু আপনি অবশ্যই করে যাবেন। আপনি উপলব্ধি করেন, যখন আপনি আপনার উদ্দীপনার একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছাবেন, তখন একাজগুলি করা আপনার জন্য অবশ্যই কঠিন হয়ে উঠবে, তথাপি এগুলো সম্পন্ন করার জন্য আপনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। উদাহরণস্বরূপ, যথা সময়ে ৫ ওয়াক্ত সলাত আদায় করা এমনই একটি "ন্যূনতম" কাজ। আপনার মন চাচ্ছে না বলে যতই আপনি অনুভব করেন না কেন, এ ব্যাপারে বিন্দু পরিমাণ আপোস করা যাবে না। এই ৫ ওয়াক্ত সলাতকে নিজের প্রাণবায়ুর মতো বিবেচনা করতে হবে। যখন আপনি পরিশ্রান্ত কিংবা আপনার মেজাজ ভালো নেই, তখন যদি শ্বাস না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, আপনার অবস্থা কেমন হবে, একবার ভাবুন তো।
'ন্যূনতম' অভ্যাসের মধ্যে আরও কিছু ইবাদত অন্তর্ভুক্ত থাকা উত্তম। উদাহরণস্বরূপ, পরিমাণে কম করে হলেও প্রতিদিন অল্প অতিরিক্ত কিছু সলাত, যিকির-আযকার কিংবা সামান্য পরিমাণ হলেও প্রতিদিন কুরআন থেকে কিছু না কিছু অধ্যয়ন করার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা। মনে রাখবেন, অনিয়মিতভাবে অনেক পরিমাণে আমলের চেয়ে আল্লাহ পাক অল্প পরিমাণ হলেও নিয়মিত আমল পছন্দ করেন। যখন আপনার আত্মিক উদ্দীপনা বা প্রেরণা একবারে তলানীতে গিয়ে ঠেকে তখনও যদি আপনি মৌলিক বিষয়গুলির ওপর কায়েম থাকতে পারেন, তবে ঈমানি জজবাতে সওয়ার হয়ে পুনরায় আপনি নিজের অবস্থানে ফিরে আসবেন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর ইচ্ছায় যখন আপনি পুনরায় উঠে দাঁড়াবেন, তখন আপনি আবার আগের থেকে (ঈমান ও আমলে) আরও 'উচ্চে' উঠতে সক্ষম হবেন।
জেনে রাখুন, আল্লাহর দিকে যে পথ চলে গেছে, তা কোনো সমতল ভূমি নয়। আপনার ঈমান কখনো বৃদ্ধি পেয়ে উচ্চ অবস্থানে পৌঁছাবে কখনো বা আবার তা কমে যেতে পারে। আপনার ইবাদতের সামর্থ্য কখনো উচ্চে অবস্থান করে আবার কখনো সে শক্তি স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু জেনে রাখবেন, প্রতিটি পতনের পরেই আছে উত্থান। তাই ধৈর্য ধারণ করুন, ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন, আশাহত হবেন না এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে যান অব্যাহতভাবে। এ পথ বন্ধুর। এই পথে যেমন উত্থান থাকবে, তেমনি থাকবে পতন। তবে জীবনের আর সবকিছুর মতোই এই পথেরও আছে সমাপ্তি। আর ওই সমাপ্তি যে চরম ফায়দা ও কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে, তা সফরের সবটুকু কষ্ট উসুল করে দেবে। আল্লাহ বলেন:
“হে মানব সম্প্রদায়, নিশ্চিতভাবে, তোমরা আপন প্রতিপালক পর্যন্ত পৌঁছা পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাকো, পরে তুমি তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে।"
يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ (কুরআন, ৮৪:৬)
টিকাঃ
* এক প্রকারের শক্তিবর্ধক-(সম্পাদক)।
** জীবনের বিভিন্ন অবস্থা মানুষের মধ্যে আল্লাহ প্রেম, তাকওয়া, ইবাদত-বন্দেগি প্রভৃতি বিষয়ের মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি করে। এর একটি অবস্থা সত্যকে চেনার প্রাথমিক পর্যায়। এছাড়াও বিপদ-মুসিবত, সফলতা-ব্যর্থতা ইত্যাদি নানা বিষয় ব্যক্তি ভেদে দ্বীনদারীর গভীরতার মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি করে। প্রতিটি অবস্থাকে সবর ও শোকরের সাথে অতিক্রম করা দ্বীনদারীর ওপর যথাযথভাবে কায়েম থাকার জন্য অপরিহার্য। একইভাবে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের অনুভূতি চিরস্থায়ী নয়। জীবনের চড়াই-উৎরাই, আল্লাহর পরীক্ষা সামনে আসবেই। সেক্ষেত্রে যথাযথ ঈমানি মানে কায়েম থাকার জন্যই লেখিকার এই উপলব্ধি ও পরামর্শ (সম্পাদক)।
** মুসলিম, কিতাবুত তওবাহ, হাদিস নং: ৬৮৫৯ - (সম্পাদক)।
* লেখিকা মূলত: মুসলিম মা-বোনদের লক্ষ্য করে বইখানি লেখায় হিজাবিদের কথা উল্লেখ করেছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে যাদের দাড়ি আছে বা টাখনুর ওপর কাপড় পরেন, তাদের কথা আসতে পারে – (সম্পাদক)।
** - (সম্পাদক)।
***- (সম্পাদক)।
📄 নারীর মর্যাদা
সেজেগুজে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোর জন্য আমি দুনিয়ায় আসিনি। আমার এ দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। আমাকে নেহায়াত পণ্যের স্তরে নামিয়ে আনা যাবে না, আর না আমি হবো আরেক জোড়া জুতা বিক্রির জন্য একজোড়া পা মাত্র। আমি আত্মা ও মেধাসম্পন্ন আল্লাহর এক বান্দী। আমার আত্মা, আমার হৃদয়, আমার চারিত্রিক সৌন্দর্যই নির্ধারণ করবে আমার মূল্য। তাই আমি তোমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির ইবাদতও করবো না, আর না তোমাদের ফ্যাশনের চেতনার কাছে আত্মসমর্পণ করবো। আমার আত্মসমর্পণ তো সর্বোচ্চ সত্তারই সমীপে।
📄 নারীর ক্ষমতায়ন
নবি (ﷺ)-এর একজন সাহাবি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যখন এক শহরে প্রবেশ করেন, তখন অত্যন্ত চমৎকারভাবে তিনি ইসলামের দাওয়াতের সারাংশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আমি এসেছি একজন দাসের উপাসনা থেকে তোমাদেরকে স্বাধীন করতে এবং সকল দাসের সর্বময় প্রভুর দাসত্বের অধীনে তোমাদের নিয়ে আসতে।"
এই বক্তব্যের মাঝে লুকিয়ে আছে মূল্যবান ঐশ্বর্য ভাণ্ডার। এই শব্দমালার নিচে আবদ্ধ ক্ষমতায়নের চাবি ও সত্যিকার স্বাধীনতার একমাত্র পথ।
একটু ভেবে দেখুন, যেই মুহূর্তে আপনি বা আমি আমাদের সফলতা, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের সুখ বা আমাদের মূল্য স্রষ্টা বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে নির্ধারণ করার অধিকার দিই, ঠিক ওই মুহূর্তে আমরা নীরব কিন্তু ধ্বংসাত্মক এক দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই। যে জিনিস আমাকে আমার মর্যাদার মাপকাঠি, আমার সফলতা এবং আমার ব্যর্থতাকে সংজ্ঞায়িত করে, সে জিনিসই তো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর সেটাই আমার প্রভুতে পরিণত হয়।
তথাকথিত যে প্রভু নারীর মর্যাদা নির্ধারণ করেছে, বিভিন্ন কালে সে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে স্থায়ী যেসব মানদণ্ড নারীদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তা হলো: পুরুষ মানুষ। কিন্তু আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে, আল্লাহ তাঁর নিজ থেকেই নারীকে নারীত্বের এই মর্যাদা দান করে সম্মানিত করেছেন এবং পুরুষের তুলনায় নয়। অথচ পশ্চিমা নারীবাদ দৃশ্যপট থেকে যখন আল্লাহকে বাদ দিয়ে দিল, তখন পুরুষ ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড বাকি থাকলো না। এর ফলশ্রুতিতে পাশ্চাত্য নারীবাদীরা বাধ্য হলো, পুরুষের সাথে তুলনায় নিজেদের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে। আর এর মাধ্যমে সে এক ত্রুটিপূর্ণ ধারণা কবুল করে নিল। সে পুরুষকে নিজের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাই একজন নারী কখনো পূর্ণ মানব নয়, যতক্ষণ না সে তার নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড তথা পুরুষের মতো হতে না পারছে।
পুরুষ যখন ছোট করে চুল কাটে, তখন সেও ছোট করে চুল কাটতে চাইলো। পুরুষ যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, তখন সেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাইলো। নারী এ সমস্ত জিনিস শুধু একটি কারণেই হস্তগত করতে চাইলো, তা হলো: তার মানদণ্ড “পুরুষ”-এর তা আছে।
কিন্তু একথা সে উপলব্ধি করলো না যে, নারী ও পুরুষের মাঝে বৈশিষ্ট্যের যে বৈচিত্র রয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই আল্লাহ উভয়কে সম্মানিত করেছেন, তাদের সাদৃশ্যের ভিত্তিতে নয়। পুরুষকে আমরা যখন মাপকাঠি হিসেবে মেনে নেই, সহসাই নারীত্বের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যগুলি হেয় বা হীন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। সংবেদনশীল হওয়াটা অমর্যাদাকর, আর পুরোদমে মা হওয়াটা তো রীতিমত অধঃপতিত হওয়ার শামিল। পুরুষালি বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত আবেগ শূন্য নিরেট যুক্তিবাদ এবং নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত নিঃস্বার্থ মায়া ও মমতার দ্বন্দ্বে যুক্তিবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
পুরুষের যা আছে এবং পুরুষ যা করে, তার সবকিছুকে যখন আমরা উত্তম হিসেবে মেনে নেই, তখন তার অবশ্যম্ভাবী বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া হিসেবে যা ঘটে তা হলো: পুরুষের যদি এটা থাকতে পারে, তবে আমরাও সেটা পেতে চাই। পুরুষরা কাতারের সামনে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করলে আমরা ভেবে নিই যে, এটাই উত্তম, তাই আমরাও সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করতে চাই। যেহেতু পুরুষরা সলাতে ইমামতি করে – আর আমরা ধারণা করে নিই যে, ইমাম সাহেব তো আল্লাহর নিকটবর্তী, তাই আমরাও ইমামতি করতে চাই। এমনিভাবে কোনো এক সময় আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, দুনিয়াতে নেতৃত্বের কোনো একটা অংশ লাভ করাটা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটা আলামত।
কিন্তু একজন মুসলিম নারীর নিজেকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, আল্লাহর দেওয়া মাপকাঠিই তার মাপকাঠি। আল্লাহই তার মূল্যায়ন করবেন, এটার জন্য পুরুষের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন তার নেই।
নারী হিসেবে আমাদেরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সে মর্যাদাকে আমরা তখনই ভূলুণ্ঠিত করি, যখন আমরা যা নই, তা হওয়ার চেষ্টা করি। সত্যি বলতে কি, পুরুষের মতো হওয়ার চেষ্টা করবেন না। যতক্ষণ আমরা পুরুষকে অনুকরণ করার চেষ্টা বন্ধ না করবো, ততক্ষণ নারী হিসেবে আমাদের সত্যিকার স্বাধীনতা মিলবে না। আল্লাহর দেওয়া বৈচিত্রমণ্ডিত বৈশিষ্ট্যগুলোকে যতক্ষণ না আমরা কদর করবো, ততক্ষণ সত্যিকার মুক্তি আমাদের ভাগ্যে জুটবে না।
অন্যদিকে সমাজে আরেকটি প্রভাবশালী তথাকথিত 'প্রভু' রয়েছে, যে নারীর মর্যাদা নির্ধারণ করে। আর তা হলো: সৌন্দর্যের মাপকাঠি। যখন আমরা ছোট ছিলাম, তখন থেকেই নারী হিসেবে সমাজ আমাদেরকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। আর সেই বার্তাটি হলো: "স্লিম হও, আবেদনময়ী (সেক্সি) হও। আকর্ষণীয় হও। অন্যথায় ... তুমি কিছুই নও।”৫৭
আমাদেরকে বলা হয় তাদের মতো মেকআপ করতে এবং তাদের মতো ছোট ছোট স্কার্ট পড়তে। নির্দেশনা দেওয়া হয়, রূপসী দেখানোর স্বার্থে নিজেদের জীবন, নিজেদের দেহ এবং নিজেদের আত্মসম্মানকে বলি দিতে। শেষ অবধি আমরা বিশ্বাস করতে থাকি যে, আমরা যাই করি না কেন, আমরা ততটুকু মর্যাদারই অধিকারী, যতটুকু হলে আমরা पुरुषদেরকে তুষ্ট এবং তাদেরকে বিমোহিত করতে সফল হই। ফলে আমরা কাদামাটির নিচে কৃত্রিম জীবনযাপন করি, আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের হাতে নিজেদের দেহ তুলে দিই বিক্রির উদ্দেশ্যে।
আসলে আমরা গোলাম, তবে তারা আমাদের ভাবতে শেখায় যে, আমরা মুক্ত-স্বাধীন। প্রকৃতপক্ষে আমরা তাদের পণ্য সামগ্রী, কিন্তু তারা কসম খেয়ে বলে যে, এটাই সফলতা। যেহেতু তারা আপনাকে শিখিয়েছে যে, সবার সামনে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোই আপনার জীবনের উদ্দেশ্য এবং পুরুষদেরকে আকর্ষণ করা, তাদের জন্য নিজেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করাটাই মূল লক্ষ্য। তারা আপনাকে এ কথা বিশ্বাস করিয়েছে যে, তাদের গাড়ি বাজারজাত করার জন্য আপনার দেহখানা সৃষ্টি করা হয়েছে।
কিন্তু তারা মিথ্যা বলেছে।
আপনার দেহ, আপনার আত্মাকে এটার চেয়েও উন্নততর কিছুর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর থেকে অনেক উচ্চতর ও উন্নততর কিছুর জন্যই।
আল্লাহ কুরআনে বলেন: “বস্তুত তোমাদের মধ্যে সেই তো আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী (তথা আল্লাহ ভীরু, নেককার)।” (কুরআন, ৪৯:১৩)
বস্তুত আপনি সম্মানিত। তবে সেটা না পুরুষের সাথে আপনার সম্পর্কের কারণে, না তাদের মতো হয়ে, আর না তাদেরকে তুষ্ট করে। নারী হিসেবে আপনার মর্যাদা আপনার কোমরের মাপ কিংবা কতজন পুরুষ আপনাকে পছন্দ করে, তার সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ হিসেবে আপনার মর্যাদা এসবের চেয়ে উচ্চতর মাপকাঠিতে মাপা হয় এবং তা হচ্ছে: সৎকর্মশীলতা ও তাকওয়ার মাপকাঠি। ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলি যাই বলুক না কেন, আপনার জীবনের উদ্দেশ্য পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হওয়ার চেয়েও অনেক অনেক গুণ মহৎ ও উৎকৃষ্টতর কিছু।
আমাদের পূর্ণতা আসে আল্লাহর নিকট হতে এবং তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে। তথাপি একেবারে ছোটবেলা থেকেই আমাদেরকে একজন নারী হিসেবে শেখানো হয়েছে যে, যতক্ষণ না একজন পুরুষ এসে আমাদেরকে পূর্ণ করছে, ততক্ষণ আমরা পূর্ণতা লাভ করবো না। আমাদের শেখানো হয়েছে যে, সিনড্রেলার মতো যতক্ষণ না কোনো রাজকুমার এসে তাকে উদ্ধার করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিতান্তই অসহায়। আমাদের বলা হয়, Sleeping Beauty-র স্বপ্নের রাজকুমার এসে চুমু না দেওয়া পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের জীবনের সূচনা হচ্ছে না। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে: কোনো রাজকুমারই আপনাকে পূর্ণতা দিতে সক্ষম নয়। আর না কোনো বীরযোদ্ধা পারে আপনাকে বাঁচাতে। বস্তুতঃ শুধু আল্লাহই আপনাকে পূর্ণতা দিতে ও রক্ষা করতে সক্ষম।
আপনার রাজকুমার একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ হয়তো তাকে আপনার জীবন সঙ্গি হিসেবে পাঠাতে পারেন, কিন্তু সে আপনার মুক্তিদাতা নয়। তিনি (আপনার জীবন সঙ্গি), আপনার চোখের শান্তি হতে পারেন, কোনো অবস্থাতেই আপনার কণ্ঠনালীর জীবনদায়ী বাতাস নয়। আল্লাহর নৈকট্যই আপনার (জীবনদায়ী) বাতাস। তাঁর নৈকটের মধ্যেই আছে আপনার নাজাত ও পূর্ণতা, কোনো সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে নয়। কোনো রাজকুমারের মাঝে যেমন নয়, তেমনি কোনো ফ্যাশন বা স্টাইলের মধ্যেও নয়।
তাই আমি আপনাকে বলছি, এসব থেকে মুক্ত হন, মন থেকে এসব শিক্ষা ও ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। আমি আপনাকে বলবো, দাঁড়ান, উঠে দাঁড়ান এবং গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দেন যে, আপনি কোনো কিছুরই দাস নন, না কোনো ফ্যাশন, না রূপ-সৌন্দর্য, আর না কোনো পুরুষ, কোনো কিছুরই দাস নন আপনি। আপনি কেবলই আল্লাহর দাস কেবলই আল্লাহর। আমি আপনাকে আহ্বান করবো দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে যে, নিজের দেহ দিয়ে পুরুষদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য আপনি দুনিয়াতে আসেননি। আপনি এই দুনিয়াতে এসেছেন কেবলই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে। তাই আপনার সেই সব হিতাকাঙ্ক্ষী যারা আপনাকে 'মুক্ত' করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য কেবল একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলুন, "ধন্যবাদ, (যথেষ্ট হয়েছে), আর না।"
তাদেরকে বলে দেন, আপনি কোনো প্রদর্শনের বস্তু বা সামগ্রী নন। আপনার দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। দুনিয়া ভালো করে জানুক, তারা আপনাকে আর পণ্যের স্তরে নামিয়ে আনতে পারবে না বা জুতা বিক্রির বিজ্ঞাপনের জন্য আপনাকে কেবল এক জোড়া (সুন্দর) পা সর্বস্বও করতে সক্ষম হবে না। (সকলকে এটা জানিয়ে দিন) আপনি এক (পরিপূর্ণ মানব) আত্মা, একটি চিন্তাশীল সত্তা, স্রষ্টার এক দাস, আর আপনার মর্যাদার ভিত্তি হলো: হৃদয় ও আত্মার সৌন্দর্যে এবং নৈতিক চরিত্রের মাধুর্যে। তাই তাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির উপসনা আপনি করেন না এবং তাদের ফ্যাশন চেতনার কাছে আপনি নিজেকে কখনো সমর্পণ করেন না। আপনার আত্মসমর্পণ হলো: সর্বোচ্চ সেই সত্তার নিকট।
সুতরাং, কোথায় ও কিভাবে একজন নারীর ক্ষমতায়ন হবে, এই প্রশ্নের জবাব দানের সময় আমি নিজেকে আমাদের নবি (ﷺ)-এর ওই সাহাবির উক্তির দিকেই ফিরে যাচ্ছি। ঘুরেফিরে আমি এই উপলব্ধির দিকে ফিরে আসি যে, সত্যিকারের মুক্তি ও ক্ষমতায়ন নিহিত রয়েছে নিজেকে অন্যসব প্রভু থেকে মুক্ত করার মধ্যে, নিজেকে অন্য সকল সংজ্ঞা ও মানদণ্ড থেকে মুক্ত করার মাঝেই সত্যিকারের মুক্তি নিহিত।
মুসলিম নারী হিসেবে আমাদেরকে এই নীরব দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে। নিজেদের মর্যাদা ও মূল্যমান নির্ধারণে সমাজের তৈরি করা সৌন্দর্য ও ফ্যাশনের স্ট্যান্ডার্ডের প্রয়োজন আমাদের নেই। সম্মানিত হওয়ার জন্য আমাদেরকে কোনো পুরুষের মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের রক্ষা করা বা পূর্ণতা দেওয়ার জন্য কোনো এক রাজকুমারের আশায় থাকার প্রয়োজন আমাদের নেই। আমাদের গুরুত্ব, আমাদের মর্যাদা, আমাদের নাজাত এবং আমাদের পূর্ণতা কোনো এক দাস বা সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল না।
বরং এসবই নির্ভর করে সকল সৃষ্টি ও সকল দাসের প্রভু – আল্লাহর ওপর।
টিকাঃ
৫৭ এর সাথে আমাদের দেশে যুক্ত হয়েছে, “তোমার রং ফর্সা করো।" সমাজ, কর্পোরেট ব্যবসা আর মিডিয়ার দৌরাত্বে আমাদের মা-বোনেরা আজ আল্লাহর দেওয়া রূপ-লাবণ্যে সন্তুষ্ট নন। তারা বরং রং ফর্সা করার অসম্ভব এবং স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক প্রচেষ্টায় সময়, সম্পদ, মেধা এবং নিজের স্বাস্থ্য ধ্বংস করছেন। বিয়ের বাজারে সব ছেলেই ফর্সা মেয়েই খুঁজে, অথচ সে তার মা-বোনের দিকে তাকিয়ে দেখে না। সব মা তার ছেলের জন্য ফর্সা পাত্রী চান, কিন্তু নিজের কন্যার দিকে তাকিয়ে দেখেন না। কি দূর্ভাগ্যজনক ও অস্বাস্থ্যকর মানসিকতা। ঈমানহীন বস্তুবাদীতা হতে এসবের জন্ম। আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তা কেবলই মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিকৃত রূপ ধারণ করা। বরং আসুন আমরা সবাই অন্তরকে আলোকিত করে আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হই। রং-এ (তথা গুণ ও বৈশিষ্ট্যে) আল্লাহর চেয়ে উত্তম আর কে? (বাকারা: ১৩৮) (সম্পাদক)।
* Sleeping Beauty: একটি জনপ্রিয় পাশ্চাত্য রূপকথা। ডাইনি বা দুষ্টুপরী কর্তৃক অভিশপ্ত হয়ে এক রাজকন্যা একশ বছর ঘুমিয়ে থাকে। পরে এক রাজকুমার এসে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে দেখে অভিভূত হয়ে তাকে চুম্বন করলে রাজকন্যার ঘুম ভাঙ্গে। এখানে লেখিকা সে কল্পকাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করেছেন- (সম্পাদক)।
যা প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে (সম্পাদক)।
📄 যে সমাজ-সংস্কৃতিতে আমি বড় হয়েছি —তার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি
আমি যখন বেড়ে উঠছি, তখন তুমি (অর্থাৎ আমার সমাজ) আমাকে অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত (Ugly Duckling) ছাড়া কিছুই ভাবোনি। আর বছরের পর বছর নিজেকে আমি তা-ই ভেবে এসেছি। দীর্ঘ সময় ধরে তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, কাঙ্ক্ষিত স্ট্যান্ডার্ড (তথা পুরুষের) একটা বাজে কপি বা নমুনা ছাড়া আমি আর কিছুই নই।
না আমি (পুরুষের মতো) এত দ্রুত দৌড়াতে পারি, আর না আমি এত ওজন তুলতে পারি। (তাদের) সমপরিমাণ অর্থ উপার্জনেও আমি অক্ষম। তদপুরি আমি শুধু কাঁদি আর কাঁদি। আমি বেড়ে উঠেছি এক পুরুষ কেন্দ্রিক দুনিয়াতে, যেখানে আমার (তথা নারীর) কোনো স্থান নেই।
আর যখন আমি পুরুষের মতো হতে পারলাম না, তখন আমি কেবল তাদেরকে তুষ্ট করতে চাইলাম। তোমার দেওয়া প্রসাধনী (মেক-আপ) ব্যবহার করতাম, আর তোমাদের শর্ট স্কার্টগুলো পড়ে নিতাম। আমি আমার জীবন, আমার শরীর এবং আমার আত্মমর্যাদা শুধু রূপসী হওয়ার জন্যই বিলিয়ে দিয়েছি। আমি জানতাম যে, আমি যাই করি না কেন, যতক্ষণ আমার মনিব আমার প্রতি তুষ্ট এবং যতক্ষণ সে আমার রূপ লাবণ্যে বিমোহিত, কেবল ততক্ষণই আমার মূল্য থাকবে।
আর তাই তোমার কসমেটিকসে আবৃত হয়ে আমি নিজের গোটা জিন্দেগি কাটিয়েছি এবং তোমাকে আমার দেহ পর্যন্ত দান করেছি বিক্রয় করার জন্য।
আমি ছিলাম এক গোলাম, কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, আমি স্বাধীন, মুক্ত। আমি ছিলাম তোমার ভোগ্য পণ্য, কিন্তু তুমি কসম কেটে বলেছো, এটাই সাফল্য। তুমি আমাকে শিখিয়েছো যে, আমার জীবনের লক্ষ্যই হলো: নিজেকে প্রদর্শন করা, পুরুষের জন্য নিজেকে আকর্ষনীয় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করা। তুমি আমাকে একথা বিশ্বাস করিয়েছো যে, আমার দেহখানি সৃষ্টিই হয়েছে তোমার গাড়িগুলি বিক্রি করার জন্য। তুমি আমাকে এ বুঝের ওপর বড় করেছো যে, আমি এক Ugly Duckling (অর্থাৎ কোনো কাজেরই নই, অথর্ব, অদ্ভুত, অর্থহীন)। কিন্তু তুমি মিথ্যা বলেছো।
ইসলাম আমায় বলে, 'আমি এক রাজহাঁস। আমি (যে পুরুষের চেয়ে) ভিন্ন কিছু (এটা কোনো এক্সিডেন্ট নয় বরং) এটাই হবার কথা ছিল, এ উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছে। আমার দেহ, আমার আত্মা তো সৃষ্টি হয়েছে আরও উচ্চতর কিছুর জন্য।
আল্লাহ কুরআনে বলেন: “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি সব বিষয়ের খবর রাখেন।” (কুরআন, ৪৯:১৩)
তাই আমি সম্মানিত কিন্তু তা পুরুষের সাথে আমার সম্পর্কের কারণে নয়। নারী হিসেবে আমার মর্যাদা আমার কোমরের মাপ বা কতজন পুরুষ আমাকে পছন্দ করে – তার ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ হিসেবে আমার মর্যাদার মাপকাঠি আরও অনেক উচ্চতর: সৎকর্মশীলতা ও তাকওয়ার মাপকাঠি। ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলি যাই বলুক না কেন, আমার জীবনের উদ্দেশ্য পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হওয়ার চেয়েও মহত্ত্বর ও উৎকৃষ্টতর কিছু।
এজন্য আল্লাহ আমায় বলেছেন: নিজেকে আবৃত করতে, নিজের সৌন্দর্যকে আড়াল করতে এবং গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে যে, আমার দেহকে ব্যবহার করে পুরুষকে খুশি করতে আমি এখানে আসিনি, আমি এখানে এসেছি শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য। নারীর দেহকে সম্মান করা ও আবৃত রাখা এবং শুধু উপযুক্তজন তথা আমি যাকে বিয়ে করবো, তাকে দেখানোর নির্দেশ দানের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা নারী দেহের (তথা তার রূপ-সৌন্দর্য ও আবেদন-এর) মর্যাদাকে উন্নত করেছেন।
তাই যারা আমাকে (তথাকথিত) 'স্বাধীন ও মুক্ত' করতে চায়, আমি তাদেরকে শুধু বলি, 'ধন্যবাদ, তবে আর নয়।'
সেজেগুজে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়ানোর জন্য আমি দুনিয়ায় আসিনি। আমার এ দেহ সর্বসাধারণের ভোগের সামগ্রী নয়। আমাকে একটা পণ্যের স্তরে বা জুতা বিক্রির জন্য একজোড়া (আকর্ষণীয়) পায়ের স্তরে নামিয়ে আনতে আমি দেবো না। আমিও আল্লাহর এক বান্দী, যার আছে একটি (জীবন্ত) আত্মা, আছে এক মননশীল হৃদয়। আমার মূল্যমান নির্ধারণ করবে আমার আত্মা, আমার হৃদয় এবং আমার নৈতিক চরিত্রের সৌন্দর্য। তাই না আমি তোমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠির ইবাদত করবো, আর না তোমাদের ফ্যাশনের চেতনার কাছে আত্মসমর্পণ করবো। আমার আত্মসমর্পণ তো সর্বোচ্চ সত্তারই সমীপে।
নিজের রূপ-লাবণ্য প্রদর্শন করে বেড়ানোর পরিবর্তে হিজাব পালনের মাধ্যমে আমি আমার ঈমানের প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকি। মানুষ হিসেবে আমার মর্যাদা নির্ভর করে আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্কের ওপর, আমি দেখতে কেমন, তার ওপর নয়। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি আমি ঢেকে নিই। আর তাই আমার দিকে যখন তুমি তাকাও, তখন তুমি নিছক কোনো দেহ দেখতে পাও না। আমাকে তখন তুমি দেখ আমার প্রকৃত পরিচয় তথা আল্লাহর একজন অনুগত বান্দি হিসেবে।
দেখ, একজন মুসলিম নারী হিসেবে এই সব নীরব দাসত্ব হতে আমি নিজেকে মুক্ত করেছি। আল্লাহর বান্দা বা গোলামদের কাছে আমি জবাবদিহি করি না। আমি জবাবদিহি করি তাদের মালিকের নিকট।
টিকাঃ
* লেখিকা এখানে একজন নারী বা কন্যা সন্তানের প্রতি সমাজের মানসিকতা বুঝানোর জন্য ইংরেজিতে “Ugly Duckling” পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। যদিও "Ugly Duckling” জনপ্রিয় কার্টুন কাহিনীর শিক্ষা ভিন্নরূপ এবং ইংরেজি ভাষায় এ শব্দগুচ্ছের অর্থও ভিন্ন। লেখিকা এখানে আক্ষরিক অর্থে একে ব্যবহার করেছেন। "Ugly Duckling” হচ্ছে Hans Christian Andersen রচিত একটি জনপ্রিয় রূপকথা। এর ভিত্তিতে কার্টুন /এনিমেটেড মুভি ইত্যাদি তৈরি করা হয়েছে। একটি রাজহাঁসের বাচ্চা, সে বাচ্চা অবস্থায় এক সাধারণ হাঁসের ঘরে লালিত-পালিত হয়। সে অন্য হাঁসের বাচ্চাগুলির মতো সুন্দর না হওয়ার কারণে তাকে সবাই অপছন্দ করে। কিন্তু শেষে বড় হয়ে সে অনিন্দ্যসুন্দর এক রাজহাঁসে পরিণত হয়। এ গল্পখানা শিক্ষনীয়। তবে এখানে আক্ষরিক অর্থে অর্থাৎ অপাংক্তেও, অপছন্দনীয় ইত্যাদি অর্থে "Ugly Duckling" শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে - (সম্পাদক)।
** এখানে তুমি / তোমার সম্বোধন এর লক্ষ্য হলো: প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা – (সম্পাদক)।
-(সম্পাদক)।