📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 ফেসবুক: লুকানো বিপদ

📄 ফেসবুক: লুকানো বিপদ


আমরা এক iWorld-এ বাস করছি। আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে আছে iPhone, ipad, MYspace, YouTube এবং এসবের ফোকাস [বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুও] বেশ পরিষ্কার: আমি, আমাকে, আমার (Me, My, I)। আমিত্বের এই যে সীমাহীন মোহ, তা দেখার জন্য কারো বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিক্রি বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোকে মানুষের আমিত্বের (Ego) নিকট আহ্বান করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, এমন অনেক বিজ্ঞাপন আছে, যেগুলো আমাদের প্রবৃত্তির ওই অংশগুলির নিকট আবেদন করে, যেগুলি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভালোবাসে। Direct TV আপনাকে বলে: “Don't watch TV, direct TV!” এদিকে Yougurtland বলে: "সিদ্ধান্ত আপনারই! স্বাগতম আপনাকে দই জাতীয় রেসিপির সীমাহীন সম্ভাবনার ভূমিতে, যেখানে আপনার বরাদ্দ, পছন্দ ও পরিবেশের ওপর কর্তৃত্ব আপনারই।”

শুধু বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলিই আমাদের ইগোর নিকট আবেদন জানাচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। বরং বৈশ্বিক এক বিস্ময়কর জিনিস আমাদের ইগো বা আমিত্বের চর্চা ও বিকাশের জন্য এক আঁতুড় ঘর (Breeding Ground) এবং মঞ্চ বা প্লাটফর্মের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তার নাম হলো: ফেসবুক। এমতাবস্থায়, আমি সর্বাগ্রে এ বিষয়টির স্বীকৃতি দেবো যে, ভালো কাজ ও কল্যাণের পথে চলার জন্য ফেসবুক একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। অন্য যেকোনো কিছুর মতো, এটা নির্ভর করে আপনি কিভাবে তা ব্যবহার করেন, তার ওপর। ক্ষুধার্তকে পরিবেশনের জন্য খাবার কাটার উদ্দেশ্যে ছুরি ব্যবহৃত হতে পারে, আবার কাউকে খুন করার জন্যও ছুরি ব্যবহার করা যায়। ফেসবুক বৃহত্তর কল্যাণের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। সর্বোপরি এক স্বৈরশাসকের ক্ষমতা উপড়ে দিতে ফেসবুকের সহায়ক ভূমিকা ঠিকই আমরা দেখেছি। লোকজনকে সংঘবদ্ধ করা, ডাকা, তাগিদ দেওয়া এবং ঐক্যবদ্ধ করার মতো কাজে ফেসবুক এক শক্তিশালী হাতিয়ারের হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক মজবুত করা এবং একে অপরের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ জোরদার করার কাজে ফেসবুক ব্যবহৃত হতে পারে অথবা এই ফেসবুকই আমাদের ওপর আমাদের নফসের (তথা নিম্নতর সত্তা বা ইগোর) নিয়ন্ত্রণ মজবুত করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফেসবুকের এমন বিস্ময়কর প্রসার সত্যই এক চমকপ্রদ ঘটনা। প্রত্যেকের মধ্যেই একটা ইগো আছে। এটা আমাদের সত্তার এমন একটি অংশ, যেটাকে দমিয়ে রাখা আবশ্যক (যদি না এনাকিনের মতো পুরোপুরি মন্দ আত্মাতে পরিণত হতে না চাই)। ইগোকে তার ইচ্ছামত চলার সুযোগ দিয়ে তাকে প্রতিপালন করার বিপদ হচ্ছে, যতই আপনি একে পরিপুষ্ট করবেন, এটা ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর এটা যখন শক্তিশালী হয়ে উঠে, তখন তা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। শীঘ্রই আমরা আর আল্লাহর গোলাম না থেকে বরং আমাদের প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হই।

ইগো আমাদের সত্তার এমন এক অংশ, যা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভালোবাসে। এটা ভালোবাসে দৃশ্যপটে থাকতে, স্বীকৃতি লাভ করতে, প্রশংসিত হতে এবং সকলের আরাধ্য ও কাঙ্ক্ষিত হতে। এদিকে ফেসবুক ইগোর এই কামনা পূরণের এক শক্তিশালী প্লাটফর্ম দেয়। এটা এমন এক প্লাটফর্ম দেয়, যেখানে আমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ছবি বা আমার প্রতিটি ভাবনা ও চিন্তা দৃশ্যমান হতে পারে, হতে পারে সবার দ্বারা প্রশংসিত এবং সকলের 'পছন্দকৃত' [Liked]। ফলশ্রুতিতে আমিও এগুলোর পেছনে ছুটতে শুরু করি। কিন্তু তখন এগুলো আর সাইবার জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এমনকি আমি আমার জীবনও এই দৃষ্টিগোচরতার মধ্যে কাটাতে শুরু করি। সহসাই আমি এমনভাবে জীবন যাপন করতে থাকি যেন আমার প্রতিটি অভিজ্ঞতা, আমার প্রতিটি ছবি, আমার প্রতিটি চিন্তাকে কেউ না কেউ দেখছে। কেননা, আমার ধ্যানে-খেয়ালে কেবল একথা ঘুরছে যে, "আমি এটা ফেসবুকে আপলোড করবো।” এ মানসিকতা অদ্ভূত এক অবস্থার জন্ম দেয়। যেন একটা সার্বক্ষণিক অনুভূতি যে, আমার জীবনটা সব সময় ডিসপ্লে হচ্ছে। লোকজন আমায় দেখছে, সে ব্যাপারে আমি বেশ সচেতন হয়ে উঠি। কেননা, ফেসবুকে সবকিছুই আপলোড করা যায়, যা অন্যরা দেখতে ও কমেন্ট করতে পারে।

তদপুরি, এটা নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে অবাস্তব ও মেকি মনোভাব তৈরি করে, যেখানে আমি ভাবতে থাকি, আমার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শীঘ্রই আমি মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হই। পরিণত হই প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুতে। আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এটাই মুখ্য খবর। আমার জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপের গুরুত্ব সীমাহীন। ফলে আরও শক্তিশালী "আমি কেন্দ্রীক" এক বিশ্ব তৈরি হয়, যেখানে আমিই সবকিছুর কেন্দ্র।

প্রকৃতপক্ষে, এই ফলাফল – সম্পূর্ণভাবে বাস্তব অবস্থার বিপরীত। আল্লাহর মহত্ত্ব ও বিশালতার সত্যতাকে উপলব্ধি করা এবং তাঁর সামনে নিজের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজনের ক্ষুদ্রতা হৃদয়ঙ্গম করাই জীবনের পরম লক্ষ্য। লক্ষ্য হলো নিজেকে সরিয়ে আল্লাহকে সমস্ত জিনিসের কেন্দ্রে বাসানো। কিন্তু ফেসবুক এটার ঠিক বিপরীত বিভ্রান্তিকে স্থায়ী করতে চায়। এটা আমার এ চিন্তাধারাকে জোরদার করে যে, আমি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় আমার তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজ ও ভাবনা সকলের সামনে তুলে ধরতে হবে। সহসাই গুরুত্বপূর্ণ খবরে পরিণত হয়, কি দিয়ে সকালের নাস্তা করলাম কিংবা মুদি দোকান থেকে নতুন কি কিনে আনলাম, যা প্রকাশ করার মতো জরুরি হয়ে পড়ে। যখন আমি একটা ছবি আপলোড করি, তখন কেউ সেটাকে অভিনন্দন জানাবে, কেউ সেটা দেখবে এবং সেটাকে [লাইকের মাধ্যমে] স্বীকৃতি দেবে, এই অপেক্ষায় থাকি। লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য এখন সংখ্যায় প্রকাশ করা যাচ্ছে। যখন আমি কোনো পোস্ট আপলোড করি, তখন কেউ এটাকে 'লাইক' দেবে বলে অপেক্ষায় থাকি। (ফেসবুকে) আমার ক'জন 'বন্ধু' আছে, তা নিয়ে আমি সব সময় বেশ সচেতন, এমনকি তার সংখ্যা নিয়ে আমি প্রতিযোগিতায়ও লিপ্ত হই (বন্ধু, উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়ে এটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেননা, ফেসবুকে তাদের তথাকথিত 'বন্ধু'দের শতকরা ৮০ ভাগকেই কেউ চিনেও না)।

আরও পাবার এই যে একাগ্রতা এবং প্রতিযোগিতা, কুরআনে সেটার উল্লেখ রয়েছে।
আল্লাহ বলেন: “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।" أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ (কুরআন, ১০২:১)

ধনসম্পদ পুঞ্জিভূত করার প্রতিযোগিতা হোক কিংবা ফেসবুকে 'লাইক' বা বন্ধু সংগ্রহের প্রতিযোগিতা হোক, সবগুলোর ফলাফল একই। আর তা হচ্ছে: আমরা সেগুলো দ্বারা চরমভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছি।

ফেসবুক আরেকটা মারাত্মক বিষয়ে আমাদের মনোযোগ আটকে রাখে, তা হলো: অন্যদের বিষয়ে আগ্রহ, তারা কি করছে, তারা কি পছন্দ করে। তারা আমার ব্যাপারে কি চিন্তা করে। অন্যরা আমাকে কিভাবে মূল্যায়ন করে, ফেসবুক আমাকে এই চিন্তায় মশগুল রাখে। শীঘ্রই আমি সৃষ্ট বস্তুর কক্ষপথে পা বাড়াই। ওই কক্ষপথে আমার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমার সংজ্ঞাসমূহ, আমার দুঃখ-বেদনা, আমার সুখ- শান্তি, আমার আত্মমূল্যায়ন, আমার সফলতা ও আমার ব্যর্থতা সবই সৃষ্টবস্তু কর্তৃক নির্ধারিত হয়। যখন আমি ওই কক্ষপথে বাস করি, তখন আমার উত্থান ও পতন নির্ভর করে সৃষ্টবস্তুর ওপর। লোকেরা যখন আমাকে নিয়ে খুশি, আমিও তখন উল্লসিত, উচ্ছ্বসিত। যখন তারা আমায় নিয়ে অসুখী, তখন আমি একেবারে ভেঙে পড়ি। কোন বিষয়ে আমার অবস্থান কি, লোকেরাই সেটা নির্ধারণ করে। আমি যেন এক কয়েদি, কারণ আমি আমার সুখ, আমার দুঃখ ও বেদনা, আমার পূর্ণতা ও আমার হতাশার চাবিকাঠিগুলি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছি।

আল্লাহর কক্ষপথের পরিবর্তে যখন আমি সৃষ্টির কক্ষপথে প্রবেশ করি এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকি, তখন আমি সেখানকার কারেন্সি বা মুদ্রা ব্যবহার করতে শুরু করি। লক্ষ্যনীয় যে, আল্লাহর কক্ষপথে বিনিময় ব্যবস্থার ভিত্তি হলো: তাঁর সন্তুষ্টি কিংবা তাঁর অসন্তুষ্টি, তাঁর পুরস্কার কিংবা তাঁর শাস্তি। ওদিকে সৃষ্টির কক্ষপথের মুদ্রা বা বিনিময় ব্যবস্থা হচ্ছে: মানুষের প্রশংসা অথবা তাদের সমালোচনা। যতই আমি এই কক্ষপথের গভীরে থেকে গভীরে যেতে থাকি, ততই আমি এর লেনদেনের এই ব্যবস্থার প্রতি অধিকহারে আকৃষ্ট হতে থাকি এবং এসব হারানোর ভয় ও আশঙ্কা উত্তোরত্তর আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা "মনোপলি৪৬ খেলি, তখন আমি এর কারেন্সি (খেলনা হওয়া সত্ত্বেও) অধিক, আরও অধিক পরিমাণে সংগ্রহের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি। কিছু সময়ের জন্য ধনী হতে (অন্ততঃ এ ধরনের অনুভূতি) ৪৭ ভালোই লাগে। কিন্তু খেলা শেষ হয়ে যাবার পরে "মনোপলি” খেলার খেলনা টাকা দিয়ে বাস্তব জগতের কিছু কি আমি কিনতে পারি?

মানবীয় প্রশংসার কারেন্সি এই মনোপলি খেলার খেলনা টাকার মতোই। কিছু সময়ের জন্য এগুলো সংগ্রহ করতে বেশ ভালোই লাগে, কিন্তু খেলা শেষে এগুলো মূল্যহীন। দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের বাস্তবতার নিরিখে এসবের (অর্থাৎ মানবীয় প্রশংসা বা সমালোচনার) বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই। তা সত্ত্বেও কেন জানি আমার ইবাদত বন্দেগির মধ্যেও আমি এসব অর্থহীন কারেন্সির ব্যাপক আকর্ষণ বোধ করি। এর ফল আমি গুপ্ত শিরক রিয়ায় (তথা লোক দেখানো ইবাদত বন্দেগি) আক্রান্ত হই। সৃষ্টির কক্ষপথে বসবাসের ফলশ্রুতিতে রিয়ার মতো শির্কের জন্ম হয়। যতই আমি এই কক্ষপথের গভীর থেকে গভীরে ঢুকতে থাকি, ততই মানুষের প্রশংসা, অনুমোদন এবং তাদের স্বীকৃতি আমাকে গ্রাস করতে থাকে। যতই কক্ষপথের গহীনে প্রবেশ করতে থাকি, ততই হারানোর ভয় আমাকে পেয়ে বসে - মান-সম্মান হারানোর ভয়, সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়, প্রশংসা হারানোর ভয়, স্বীকৃতির হারানোর ভয়।

উপরন্তু, যতই আমি মানুষের ভয়ে কাঁপবো, ততই আমি (এদের) দাসত্বে আবদ্ধ হবো। সত্যিকার স্বাধীনতা ও মুক্তি তখনোই অর্জন করা যাবে, যখন আমি আল্লাহ ছাড়া অপরাপর সমস্ত বস্তু ও ব্যক্তির ভয় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবো।

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: নবি (ﷺ)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলে: “হে আল্লাহর রসুল, আমাকে এমন এক কাজের সন্ধান দেন, যে কাজ করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবে এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে। তিনি (ﷺ) বলেন: “নিজেকে দুনিয়া থেকে অনাসক্তি অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের কাছে যা আছে (অর্থাৎ দুনিয়ার ভোগ্যবস্তু) তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে।” [ইবনে মাজা] ৪৯

লক্ষনীয় বিষয় হলো, মানুষের স্বীকৃতি ও ভালোবাসার পেছনে আমরা যত কম ছুটবো, ততই আমরা সেগুলো পেতে থাকবো। অন্যের ওপর যত কম নির্ভরশীল হবো, ততই তারা আমাদের প্রতি আকৃষ্ট এবং আমাদের সঙ্গ লাভে আগ্রহী হবে। এই হাদিস আমাদেরকে এই নিগূঢ় সত্যেরই শিক্ষা দেয়। সৃষ্ট বস্তুর পরিমণ্ডল ও বলয় ভেঙে যখন আমরা বের হতে পারবো, তখনই আমরা স্রষ্টা ও মানুষের সাথে সম্পর্কে সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হবো।

অতএব, ফেসবুক এক শক্তিশালী মাধ্যম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, তাই এটাকে নিজের স্বাধীনতা ও মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করুন। এটা যেন আপনাকে আপন সত্তা ও অন্যের মূল্যায়নের দাসে পরিণত করার অস্ত্রে পরিণত না হয়।

টিকাঃ
* এনাকিন - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নির্ভর 'স্টার ওয়ার্স' খ্যাত এক কাল্পনিক মুভির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। প্রাথমিক অবস্থায় সে ভালোর পক্ষে থাকলেও পরবর্তীতে নিজ ইগোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সম্পূর্ণ খারাপ সত্তায় পরিণত হয়। লেখিকা মুভি প্রিয় পাশ্চাত্যবাসীর বুঝের জন্য - এ উদাহরণ টেনেছেন। তবে এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ-“ইবলিস”। নিজ ইগোকে প্রাধান্য দিয়ে সে চির নিকৃষ্ট ও বহিষ্কৃত হয়- (সম্পাদক)।
** "মনোপলি" (Monopoly): লুডুর মতো এক ধরনের বোর্ড গেইম। যাতে অন্যদের হারিয়ে সবচেয়ে ধনী ও সম্পদশালী হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীরা মত্ত হয় (সম্পাদক)।
"- (সম্পাদক)।
* অনুবাদক।
• ইবনে মাজা, কিতাবুয যুহদ (দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি শীর্ষক অধ্যায়), হাদিস নং: ৪১০২, তাহক্বীক আলবানি: সহিহ।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 তাওয়াক্কুল: এমন হাতল আঁকড়ে ধরা, যা কখনো ভাঙ্গে না

📄 তাওয়াক্কুল: এমন হাতল আঁকড়ে ধরা, যা কখনো ভাঙ্গে না


তার তখন বিধ্বস্ত অবস্থা। তার বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য পুষ্টির একমাত্র উৎস তার থেকে বিদায় নিয়েছে। (বেঁচে থাকার) এই একটি অবলম্বনই তার জানা ছিল, আর সহসা আজ সেটাও বিলুপ্ত হয়েছে। (মায়ের গর্ভের) স্বাভাবিক উষ্ণ দুনিয়া হঠাৎ করেই যেন হিম শীতল ঠাণ্ডা হয়ে উঠলো, আর তার চারপাশ ঘিরে কেবল অপরিচিত মুখ। নবজাতক আর্তনাদ করে উঠলো। তার মনে হলো, এখানেই বুঝি তার জীবন শেষ।

সদ্যজাত শিশুটি অনুভব করতে পারেনি যে, কেউ একজন তার দিকে খেয়াল রাখছেন। তার জন্য (শুরু থেকেই) একটা পরিকল্পনা ছিল। তার থেকে যা কিছু কেড়ে নেওয়া হলো, সে জায়গায় তার প্রতিপালক তাকে পূর্বের চেয়ে উত্তম জিনিস দান করলেন। যে পুষ্টি সে আগে লাভ করতো (তার মায়ের) রক্ত থেকে, এখন ওই পুষ্টিই লাভ করে মায়ের দুধ থেকে। মায়ের গর্ভের প্রাণহীন যে দেয়াল এক সময় বিবেচিত হতো তার একমাত্র আধার, শীঘ্রই পরিবারের স্বজনদের কোমল পরশ তার স্থান দখল করে নেবে।

তা সত্ত্বেও, সদ্যজাত শিশুটির বিবেচনায়, সে যেন তার সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে।

আমাদের অনেকেই সময় সময় নিজেদের এই শিশুর মতো অবস্থায় আবিষ্কার করি। অনেক সময় মনে হয়, সবই বুঝি আমরা হারিয়ে ফেলেছি অথবা মনে হয়, আমাদের সবই ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে, কোনো কিছুই যেন আমরা যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে হয়নি। কখনো কখনো নিজেদেরকে যেন একেবারে পরিত্যক্ত অসহায় মনে হয়, আর মনে হয় কোনো কিছুই যেন নিজেদের পরিকল্পনা মাফিক সংঘটিত হচ্ছে না।

কিন্তু ঠিক ওই নবজাতক শিশুটির মতোই অনেক সময় পরিস্থিতি বাহ্যিকভাবে যেমন দেখা যায় বাস্তবে তেমনটি নয়। আর তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ভরসা রাখার তাৎপর্য হচ্ছে, আমাদের জন্য আমাদের প্রতিপালকের একটি পরিকল্পনা আছে, এই সত্যটি উপলব্ধি করা। তাওয়াক্কুল হলো এ কথার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখা যে, আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম। পরিস্থিতি যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন, আল্লাহ আপনার খেয়াল রাখবেন, এই বিশ্বাসের ওপর মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকাই তাওয়াক্কুল। দুর্বার সেনাবাহিনী ধেয়ে আসছে, এটা জেনেও পিছু না হটে নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যেভাবে লোহিত সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, শত বিপদের মাঝে সেভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এবং আল্লাহ আপনাকে উদ্ধার করবেনই, এটা জেনে শত বিপদের মাঝে সেভাবে মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে থাকার নামই তাওয়াক্কুল। আল্লাহ যখন নাড়ির বন্ধন (Umbilical Cord) ছিন্ন করার ব্যবস্থা করেছেন, তখন মায়ের দুধ দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করবেন, এ কথার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখাই তাওয়াক্কুল।

তাওয়াক্কুল ছাড়া কোনো ঈমান নেই। সত্যিকার ঈমান যেখানে বিরাজমান, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে তাওয়াক্কুলের দেখা মিলবে। আল্লাহ কুরআনে বলেন:
"মুমিন তো তারাই, যাদের হৃদয় কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের সামনে পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর (তাওয়াক্কুল) করে।” (কুরআন, ৮:২)

কেউ যদি সত্যিকার অর্থে বাস্তবতা এবং আল্লাহর ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তার কাছে প্রকাশ হয়ে পড়বে যে, আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে না পারাটা মূলত মানব মনের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই মহাবিশ্বের কিছুই আল্লাহর বিনা অনুমতিতে ঘটে না। এমনকি আল্লাহর অনুমতি ছাড়া গাছের একটি পাতাও ঝরে পড়ে না (হাদিস)। অস্তিত্বে যা আছে, তার সবকিছুর জীবিকা বা রিযিক তিনিই দান করেন। "সবকিছুর ওপর কেবল তাঁরই ক্ষমতা বিরাজমান।” (কুরআন, ৬৭:১) কি করে আমরা তাঁর ওপর আমাদের সকল আস্থা ও নির্ভরতাকে সমর্পণ না করে থাকতে পারি? ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন, "বলো, আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্দিষ্ট করেছেন, তা ছাড়া আমাদের অন্য কিছু হবে না। তিনিই আমাদের রক্ষক এবং আল্লাহর ওপরই মুমিনদের নির্ভর করা উচিত” (কুরআন, ৯:৫১)

[তাওয়াক্কুলের] বিষয়টিকে কুরআন ব্যাখ্যা এভাবে করে:
"যে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (কুরআন, ৬৫:৩)

“বাস্তবতা হচ্ছে: অবলম্বন করার মতো মজবুত এমন কোনো জিনিস বা স্থান নেই, যা মানুষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। বস্তুতঃ আল্লাহই সে হাতল, যা অবলম্বন করলে কখনো ভাঙ্গে না।” (কুরআন, ২:২৫৬)

আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন:
“তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো, তিনি তোমাদের জন্য ঠিক সেভাবে রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, যেভাবে তিনি পক্ষিকুলকে রিযিক দিয়ে থাকেন। ভোর বেলায় যদিও তারা খালি পেটে বেরিয়ে যায়, তথাপি সন্ধ্যার সময় ঠিকই তারা ভরা পেটে নীড়ে ফিরে।” [তিরমিযি]

[আর সত্যি সত্যি যখন যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে পারি], পক্ষিকুল ও নবজাতক শিশুর জন্য যেভাবে আল্লাহ রিযিকের বন্দোবস্ত করেন, ঠিক সেভাবেই কল্পনাতীত স্থান থেকে তিনি আমাদেরকে রিযিকের যোগান দিয়ে থাকেন।

টিকাঃ
** বস্তুত এটা কুরআনের আয়াত (আনআম, ৬:৫৯) -(সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 তাওয়াক্কুল, আশা এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টা: গোটা বিষয়টির তিনটি অংশ

📄 তাওয়াক্কুল, আশা এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টা: গোটা বিষয়টির তিনটি অংশ


শুরুতে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। বিদায় নিতে উদ্যত তার স্বামীর প্রতি আকুতি জানান। "আপনি কি আমাদেরকে এখানে মারা যাওয়ার জন্য রেখে যাচ্ছেন?” [শঙ্কিত কণ্ঠে তিনি বলে উঠেন]। কিন্তু কোনো জবাব নেই। তিনি আবারও তার স্বামীকে ডাকলেন। তবুও কোনো জবাব নেই। সহসাই তিনি তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনার প্রতিপালকই কি আমাদের এখানে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন?"

“হ্যাঁ” নবি ইব্রাহিম (আ.) জবাব দিলেন।

এই কথা শোনার পরই বিবি হাজেরার সমস্ত ভয় দূর হয়ে যায়। নবজাতক শিশুকে কোলে নিয়ে যদিও তিনি সহসা নিজেকে পানি শূন্য ধু ধু মরুভূমিতে আবিষ্কার করলেন, তথাপি নিশ্চিত দৃঢ়তার সাথে তিনি জানতেন যে, আল্লাহ কখনো তাকে একা ছেড়ে দেবেন না। তার ঈমান ছিল মজবুত, তার বিশ্বাস ছিল অটুট।

নবি ইব্রাহিম (আ.)-এর বিদায় নিতে না নিতেই পিপাসায় তার শিশু সন্তান ইসমাইল কাঁদতে শুরু করে। আল্লাহর প্রতি বিবি হাজেরার পূর্ণ তাওয়াক্কুল (আস্থা ও নির্ভরতা) থাকার পরেও তিনি হাত-পা গুটিয়ে বসে ছিলেন না, এই অপেক্ষায় যে আকাশ থেকে পানি নাযিল হবে।

বিবি হাজেরার অন্তর ছিল আল্লাহর প্রতি নিখাঁদ আস্থায় ভরপুর, কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে তিনি তার সাধ্যানুসারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড় দুটির মধ্যে মরিয়া হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকেন এবং সন্তানের জন্য হন্যে হয়ে পানির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে থাকেন। যতবারই বিবি হাজেরা পর্বতের চূড়ায় উঠছেন এবং কিছুই পাচ্ছেন না, তিনি না হতাশ হলেন, আর না তিনি আশা হারালেন। তার ইচ্ছা ছিল অদম্য, তাই তিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। প্রকৃতপক্ষে, বিবি হাজেরা এতটাই সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেন যে, তার এই কাজের আনুষ্ঠানিকতা 'সাই' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে, যার আক্ষরিক মর্ম: 'সর্বাত্মক চেষ্টা করা।'

অনেকেই তাওয়াক্কুলকে হাল ছেড়ে দেওয়া এবং সাধ্যমত চেষ্টা থেকে পিছিয়ে আসার সাথে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু কোনোভাবেই তাওয়াক্কুল অর্থ: কেউ তার সংগ্রাম থেকে বিরত হওয়া নয়। বিবি হাজেরার এই কাহিনী এ বিষয়ে আমাদের জন্য সর্বোত্তম একটি উদাহরণ উপস্থাপন করে, যা নবি (সা.) আমাদের শিক্ষা দান করেছেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞাসা করলো সে কি (তার উটটি ছেড়ে রেখে) আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে নাকি উটটি বাঁধবে এবং অতঃপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নবি (সা.) বলেন, তার উচিত হবে, তার উটটি মজবুতভাবে বেঁধে রাখা এবং তারপর আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

তাওয়াক্কুল অঙ্গ-প্রতঙ্গের কোনো কাজ নয়, আসলে এটা অন্তরের কাজ। তাই অঙ্গপ্রতঙ্গ যখন সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করে যাবে, হৃদয় তখন পুরোপুরি নির্ভর করবে আল্লাহর ওপর। এটার তাৎপর্য হচ্ছে, অঙ্গ-প্রতঙ্গের আপ্রাণ চেষ্টার ফলাফল যাই হোক না কেন, এ কথা জেনে হৃদয় পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবে যে, এই ফলাফল আল্লাহর ভ্রান্তিহীন সিদ্ধান্তেরই পরিণতি।

কিন্তু এই পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য একজনকে আশায় বুক বাঁধতে হবে, দৈহিকভাবে প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে হবে এবং অন্তরকে (আল্লাহর সন্তুষ্টির হাতে) ছেড়ে দিতে হবে।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 একেই বলে জাগরণ

📄 একেই বলে জাগরণ


এমন অনুভূতি বর্ণনার ভাষা নেই। একবার ভাবুন তো, আপনি সারাটা জীবন একটা গুহায় বাস করলেন এবং এই বিশ্বাসে যে, এটাই আপনার গোটা দুনিয়া। এরপর হঠাৎ করেই একদিন আপনি বাইরে পা রাখলেন। প্রথমবারের মতো আপনি আকাশ দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন সারি সারি গাছ, পক্ষিকুল এবং সূর্য। জীবনে প্রথমবারের মতো আপনি উপলব্ধি করলেন, যে জাতটা আপনি চিনতেন তার পুরোটাই ছিল ভ্রম, বিভ্রান্তি। প্রথমবারের মতো আপনি অধিকতর সত্য ও সুন্দর এক বাস্তবতা আবিষ্কার করলেন। এই উপলব্ধির উচ্চতাটা একবার অনুভব করুন। ক্ষণিকের জন্য মনে হবে, আপনি যেকোনো কিছু করতে পারেন। সহসাই গুহায় কাটানো আগের জীবনের সকল কিছুই আপনার কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। প্রথমবারের মতো আপনি ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেন, সম্পূর্ণভাবে জেগে উঠলেন, পূর্ণভাবে প্রাণবন্ত হলেন এবং হলেন পুরোপুরি সচেতন। এটা এমন একটা অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটাই সে রুহানি উৎকর্ষ, যা সত্যকে নতুনভাবে আবিষ্কারে ফলশ্রুতিতে অর্জিত হয়।

এটাই প্রকৃত জাগরণ।

একজন ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিই কেবল এই অনুভূতির স্বাদ পান। একজন জন্মগত মুসলিম ব্যক্তি, যিনি দ্বীনে আসেন, তিনিও এই অনুভূতিকে চিনেন। যেকোনো ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ বিমুখ জীবনযাপন করছিলেন, অতঃপর আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন, তিনিও এ অনুভূতির সাথে পরিচিত। এই অবস্থাকে ইবনে কাইয়্যিম (র.) তার 'মাদারিজ আস-সালিকিন' (আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার স্টেশনসমূহ) গ্রন্থে يُقَظَةُ (জাগরণ) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই অবস্থাকে তিনি আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রথম স্টেশন হিসেবে বর্ণনা করেন। কখনো কখনো এই অবস্থাকে 'ধর্মান্তরের উদ্দীপনা' বলা হয়। যখন কেউ প্রথমবারের মতো ধর্মান্তরিত হন কিংবা আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে শুরু করেন, সচরাচর তারা বেশ উদ্দীপ্ত এবং প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকেন, যেটা অন্যদের মাঝে দেখা যায় না। রুহানি উৎকর্ষের কারণেই এই প্রাণশক্তির সঞ্চার হয় এবং এটাই এই অবস্থার সহজাত বৈশিষ্ট্য।

'জাগরণ' স্টেশনের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
আল্লাহ ইবাদতকে সহজ করে দেন:- এই অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত বেশ সহজতর হয়। এই পর্যায়ে ব্যক্তি এতটাই উদ্দীপ্ত ও সতেজ থাকে যে, সদ্য আবিষ্কৃত ওই বাস্তবতার জন্য সে সহজেই সকল কিছু কুরবানি করতে পারে। এই উদ্দীপনা এই ব্যক্তিকে এক নিমিষেই ০ থেকে ৬০ এ নিয়ে যেতে পারে। এটা অনেকটা রুহানি স্টেরয়েড গ্রহণের মতো। এই যে শক্তি আপনি লাভ করেন, তা আপনার নিজ সত্তা থেকে আসে না, বরং আপনাকে দেওয়া সাহায্য থেকে আপনি এই শক্তি লাভ করেন। এই ক্ষেত্রে এই সাহায্য আসে আল্লাহর তরফ থেকে। অনেকে এতো বেশি, এত দ্রুত বদলে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু দ্রুত বদলে যাওয়াটা কোনো সমস্যা বলে আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় এক্ষেত্রে আসল সমস্যা হলো: অহমিকা। সমস্যা হলো সহজেই হতোদ্যম হয়ে পড়ার মধ্যে। আল্লাহ যদি আপনাকে এমন কোনো উপহার দেন, যার সাহায্যে আপনি অধিক হারে কিছু করতে সক্ষম হন, তাহলে তা ব্যবহার করাতে দোষের কিছু নেই। তবে ওই সক্ষমতা লাভের জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দেবেন না। বরং আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করুন। আর মনে রাখবেন, (প্রাথমিক পর্যায়ের) এই উজ্জীবিত মানসিক অবস্থা ক্ষণস্থায়ী। আপনি হয়তো এর সাহায্যে অল্প সময়েই ০ থেকে ৬০ এ পৌঁছে যেতে পারেন, কিন্তু উজ্জীবিত অবস্থা পার হয়ে গেলে, আশা হারাবেন না এবং নিজেকে পিছলে "০”-তে ফিরে যেতে দেবেন না।

ক্ষণস্থায়িত্ব:- এই জীবনের অন্য সব অবস্থার মতো আত্মার এই উজ্জীবিত অবস্থাও ক্ষণস্থায়ী। জীবন সরলরেখার মতো সোজা নয়। আল্লাহর দিকে চলার পথটাও নয়। এই বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি না করলে, এ অবস্থা অতিক্রান্ত হওয়ার পর হতাশা ও নৈরাশ্যের জন্ম দিতে পারে।

আত্মার এই অবস্থার লুকায়িত বিপত্তিসমূহ:
রুহানি জাগরণের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি বুঝে না আসাই প্রকৃতপক্ষে আত্মার এ অবস্থার অজানা বা লুকায়িত দুটো বিপত্তি উৎসারিত হওয়ার কারণ। এই বিপত্তি দুটো আল্লাহর পথে শুরু করা যাত্রাকে স্থবির করে দেওয়ার দুটো কারণও বটে। এই বিপত্তি দুটো হচ্ছে: [১] অহমিকা/আত্মতুষ্টি এবং [২] নৈরাশ্য। অহংকারী ব্যক্তি ইতোমধ্যেই এ রকমটাই ধারণা করে যে, সে যথেষ্ট উন্নতি করছে, তাই সে প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে আশাহত ব্যক্তি তো ধরেই নিয়েছে, তার পক্ষে যথেষ্ট উন্নতি করা কখনোই সম্ভব না, তাই সেও চেষ্টা থামিয়ে দেয়। [মজার ব্যাপার হলো] দুটো ভিন্ন ভিন্ন রোগ একই পরিণতির দিকে ধাবিত করে। আর তাহলো আল্লাহর পথে সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টাকে থামিয়ে দেয়।

অহমিকা:- রুহানি জাগরণের এই পর্যায়ে অধিক ইবাদতের যে শক্তি সৃষ্টি হয়, সেটা এই বিশেষ অবস্থার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য এবং এই শক্তি আল্লাহর তরফ থেকে আসে, ব্যক্তির নিজের তরফ বা তার যোগ্যতায় নয় – এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলশ্রুতিতে প্রথম বিপত্তির সৃষ্টি হয়। বিষয়টি যারা ঠিক মতো উপলব্ধি করে না, ইবাদতের এই বর্ধিত শক্তিকে তারা ভুলভাবে নিজেদের দ্বীনদারি বা তাকওয়ার উচ্চমান বলে মনে করতে থাকে। এই ভুল ধারণা বেশ ভয়ংকর। কেননা, এটা ব্যক্তির মাঝে অহংকার এবং নিজেকে অন্যদের তুলনায় দ্বীনদার ভাবার রোগ সৃষ্টি করে। আত্মিক জাগরণের এই উন্নত “দ্বীনদার অবস্থা” বস্তুত আল্লাহর তরফ থেকে আসা এক উপহার, এটা উপলব্ধি করার পরিবর্তে (এই নতুন) ইবাদতগুজার বান্দা নিজের মাঝে এক প্রকার লুকানো গর্ব অনুভব করতে শুরু করে এবং এই একইরকম উদ্দীপনা দেখায় না, তাদেরকে সে খাটো করে দেখতে শুরু করে।

হতাশা ও নৈরাশ্য:- জীবনের অন্য সব অবস্থার মতো “উন্নত” আত্মিক জাগরণও যে ক্ষণস্থায়ী ৫২ এটা উপলব্ধি করতে না পারার ফলে এই বিপত্তির জন্ম নেয়। এটার মানে এই নয় যে, আপনি ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা কোনো ভুল করেছেন। রমজান যে আত্মিক উৎকর্ষতা আমার-আপনার মধ্যে নিয়ে আসে, তা মনের মাঝে কেমন অনুভূতির সৃষ্টি হয়, তা অনেকেই উপলব্ধি করেন। উন্নত আত্মিক অবস্থায় এই অস্থায়ী অবস্থা জীবনেরই এক স্বাভাবিক চিত্র। আর এটি এমন একটি শিক্ষা, যা আবু বকর (রা.)-কেও শিখতে হয়েছে।

একদিন আবু বকর (রা.) এবং হানযালা (রা.) নবি (ﷺ)-এর কাছে আসেন এবং বলেন: “হে আল্লাহর রসুল, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। আল্লাহর রসুল (ﷺ) বলেন, 'তা কি রকম?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসুল, যখন আমরা আপনার সাথে থাকি, তখন আপনি জান্নাত ও জাহান্নামের কথা আমাদেরকে এমনভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যেন আমরা তা সরাসরি দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের স্ত্রী, সন্তান ও ধন-সম্পদের মধ্যে নিমগ্ন হই, সে সময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। আল্লাহর রসুল (ﷺ) বললেন, 'যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর কসম করে বলছি! আমার কাছে থাকার সময় তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সে অবস্থায় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর যিকিরের ওপর থাকতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে তোমাদের বিছানায় এবং রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করতো। কিন্তু, হে হানযালা! কিছু সময় (আল্লাহর যিকিরে) এবং কিছু সময় (দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করো) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা করো)। এ কথাটি তিনি (ﷺ) তিনবার বললেন।” [মুসলিম]

রুহানি উৎকর্ষতার উচ্চ অবস্থা অতিক্রান্ত হওয়ার পর:
এই [রুহানি] যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে: কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। মনে রাখবেন, আপনি একই রকম উদ্দীপনা সব সময় অনুভব করবেন না, এটা এজন্য নয় যে, আপনি কোনোকিছুতে ব্যর্থ হয়েছেন। (রুহানি প্রেরণার) উচ্চ মুখী প্রবলতার পর যে নিম্নমুখী প্রবণতার সৃষ্টি হয়, তা এ পথের স্বাভাবিক অংশ। যেমনিভাবে নবি (ﷺ) আবু বকর (রা.)-কে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, এসব উত্থান-পতন এই [রুহানি] পথের স্বাভাবিক অংশ। আমরা যদি সব সময় আত্মার উচ্চতম উৎকৃষ্টতায় অবস্থান করতাম, তখন আমরা মানুষ থাকতাম না, ফেরেশতা হয়ে যেতাম। আমরা কি করি, মূলতঃ সাফল্য তার ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রশ্ন হলো: যখন আত্মা নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকে, যখন আমলের সেই আমেজটা আমরা আর সে রকম অনুভব করছি না, তখন আমরা কি করি। এই পথে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো: যখন আপনি উদ্দীপনার তলানীতে পৌঁছে গেছেন, তখনও আপনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন, এ কথা জেনে যে, এটাই এ পথের স্বাভাবিক অবস্থা।

শয়তানের ফাঁদ:
মনে রাখবেন, আপনি কোন অবস্থায় আছেন, তার ওপর ভিত্তি করে শয়তান আপনাকে কাবু করার নানা চেষ্টা চালাবে।

যখন আপনি [রুহানি] উচ্চতায় অবস্থান করেন- যখন আপনি রুহানি বা আত্মিক উচ্চতায় অবস্থান করেন, তখন সে চাইবে আপনাকে অহংকারী বানাতে। সে চাইবে, আপনি যেন অন্যদের খাটো করে দেখেন। শেষমেশ সে আপনাকে নিজের সম্পর্কে এতটাই আত্মতুষ্ট করে তুলবে যে, নিজের অবস্থা উন্নয়নের জন্য যে কঠিন পরিশ্রম করা দরকার, তার প্রয়োজন আপনি আর বোধ করবেন না। কেননা, আপনি তো ইতোমধ্যেই বিশাল উন্নতি হাসিল করেছেন (এবং আশেপাশের সবার থেকে আপনি উত্তম। আপনার নিজের দুর্বলতাগুলির যথার্থতা প্রমাণের জন্য সে (অর্থাৎ শয়তান) আপনাকে অবিরাম আপনার চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে আমলে পিছিয়ে আছে, এমন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দিতে উদ্বুদ্ধ করবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি হিজাব না পড়েন, তবে সে আপনার মনে এ ভাবনা সৃষ্টি করবে যে, হিজাবিদের কেউ কেউ আছে, যারা এমন অন্যায় কাজ করে। আমি অন্তত সেগুলো করি না। আর আমি এমন অমুক অমুক ভালো কাজ করি, যেগুলো এসব হিজাবিরা করে না! অথবা আপনি যদি সলাতে অমনোযোগী হন, তখন হয়তো ভাবতে পারেন, “অন্ততপক্ষে, আমি তো আর অমুকের অমুকের মতো ক্লাবে যাই না, মাদক গ্রহণ করি না।” মনে রাখবেন, আল্লাহ কোনো (গ্রাফ পেপারে) "কার্ড” (Curve)-এ আপনার গ্রেডিং করছেন না (অর্থাৎ অন্যের সাথে তুলনায় আপনার গ্রেডিং হচ্ছে না)। অন্যরা কি করছে, তাতে কিছু যায় আসে না। কিয়ামতের দিন আমাদের সবাইকে (হিসাবের জন্য যার যার হিসাব নিয়ে) একাকী দাঁড়াতে হবে। আমরা যেন আল্লাহর পথে চেষ্টা থামিয়ে দেই, সে লক্ষ্যে শয়তান এসব চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

যখন আপনি তলানিতে:- অন্যদিকে যখন (আমলের দুর্বলতার কারণে) আপনার আত্মিক মনোবল নিম্নমুখী, তখন শয়তান আপনার ওপর ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে। সে নৈরাশ্য দিয়ে আপনাকে পাকড়াও করতে চাইবে। সে আপনাকে বিশ্বাস করাতে চাইবে যে, আপনি একটা অপদার্থ, আর তাই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কোনো মানে নেই। সে আপনার মনে একথা বদ্ধমূল করে দিতে চাইবে যে, আপনি পুরোপুরি ব্যর্থ আর আপনি যাই করুন না কেন, যে ঈমানি ও রুহানি উচ্চতায় আপনি এক সময় ছিলেন, সেখানে আর কখনো ফিরতে পারবেন না। কিংবা সে চাইবে আপনার মনে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করতে যে, আপনি এতটাই 'খারাপ' যে স্বয়ং আল্লাহও আপনাকে ক্ষমা করবেন না। যার ফলশ্রুতিতে, আপনি নিজেকে (ঈমান ও আমলে) আরও অধঃপতিত হওয়ার সুযোগ করে দেবেন। আপনি হয়তো এক সময় (ঈমান ও আমলের দিক দিয়ে) উচ্চ অবস্থানে ছিলেন, পরবর্তীতে নিজের প্রতি খারাপ ধারণা জন্মাতে থাকে। ইবাদত-বন্দেগিতে গাফেলতি শুরু হলে আপনার এমনও হতে পারে যে, আপনি যখন ইতোপূর্বে দ্বীনদারীর দিক থেকে অগ্রসর ছিলেন, তখন আপনি অন্যের ভুলত্রুটি বা তাদের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিতেন না। শেষ পর্যন্ত এটা এক আত্মঘাতী পরিণতি ডেকে আনে, কারণ চূড়ান্ত পর্যায়ে এর ফলাফল দাঁড়ায়: আপনি নিজেকেও ভুল করার বা দুর্বলতা প্রদর্শনের অনুমতি দেবেন না।

যেহেতু আপনি নিজেকে আর সব মানুষের মতো মানুষ মনে করছেন না এবং আপনারও ভুল-ত্রুটি-কমতি হতে পারে, এ কথা মানতে পারছেন না, ফলশ্রুতিতে যখন আপনি ভুল করে ফেলেন, তখন নিজের প্রতি এতটাই কঠোর হন যে, আশা হারিয়ে ফেলেন। ফলে হাল ছেড়ে দেন। এর পরিনামে আপনি আরও গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারেন, যা আপনার হতাশাকে আরও খারাপ দিকে নিয়ে যায়। আর এটা আপনার এক আত্ম-সৃষ্ট অবিরাম দুষ্টচক্রের রূপ ধারণ করে। শয়তান আরও চেষ্টা করবে আপনাকে এটা বিশ্বাস করাতে যে, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া বা তাঁর ইবাদত বন্দেগি করা আপনার জন্য বাঞ্ছনীয় নয়, কারণ এমন একজন 'খারাপ' মানুষ হয়ে এসব করা আপনাকে কেবল একজন মুনাফিকে পরিণত করবে মাত্র। শয়তান আপনাকে আল্লাহর ক্ষমা থেকে নিরাশ করতে চায়। এটাই তার চাওয়া। এসবই অতি অবশ্যই মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু শয়তান যা করে, তাতে সে বেশ দক্ষ। কারণ, যখন আপনি পাপ করেন, তখনই আপনাকে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে আরও অধিক হারে কম কোনো অবস্থাতেই নয়।

এই নিম্নমুখী সর্পিল প্রতারণার জাল থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হলে, মনে রাখবেন, এই যে আত্মিক নিম্নমুখী প্রবণতা এটা কিন্তু এই পথেরই একটা অংশ। মনে রাখবেন, 'ফুতুর' তথা পতন মানুষের জীবনেরই একটি অংশ। তাই একবার যখন আপনি উপলব্ধি করেন যে, এই রুহানি পতনের অর্থ এই নয় যে, আপনি ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা আপনি একজন মুনাফিক (যেমনটি আবু বকর (রা.) ভেবেছিলেন), তখন এই অবস্থায় পৌঁছার পরও আপনি হাল ছেড়ে দেওয়া থেকে নিজেকে সামলাতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো: আপনাকে এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যা আপনার জন্য "ন্যূনতম মান" হিসেবে কাজ করবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আপনি যেমনই বোধ করুন না কেন, যতই হতোদ্যম বা যত মনমরা হতাশ বোধ করেন না কেন, কম করে হলেও এইটুকু আপনি অবশ্যই করে যাবেন। আপনি উপলব্ধি করেন, যখন আপনি আপনার উদ্দীপনার একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছাবেন, তখন একাজগুলি করা আপনার জন্য অবশ্যই কঠিন হয়ে উঠবে, তথাপি এগুলো সম্পন্ন করার জন্য আপনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। উদাহরণস্বরূপ, যথা সময়ে ৫ ওয়াক্ত সলাত আদায় করা এমনই একটি "ন্যূনতম" কাজ। আপনার মন চাচ্ছে না বলে যতই আপনি অনুভব করেন না কেন, এ ব্যাপারে বিন্দু পরিমাণ আপোস করা যাবে না। এই ৫ ওয়াক্ত সলাতকে নিজের প্রাণবায়ুর মতো বিবেচনা করতে হবে। যখন আপনি পরিশ্রান্ত কিংবা আপনার মেজাজ ভালো নেই, তখন যদি শ্বাস না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, আপনার অবস্থা কেমন হবে, একবার ভাবুন তো।

'ন্যূনতম' অভ্যাসের মধ্যে আরও কিছু ইবাদত অন্তর্ভুক্ত থাকা উত্তম। উদাহরণস্বরূপ, পরিমাণে কম করে হলেও প্রতিদিন অল্প অতিরিক্ত কিছু সলাত, যিকির-আযকার কিংবা সামান্য পরিমাণ হলেও প্রতিদিন কুরআন থেকে কিছু না কিছু অধ্যয়ন করার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা। মনে রাখবেন, অনিয়মিতভাবে অনেক পরিমাণে আমলের চেয়ে আল্লাহ পাক অল্প পরিমাণ হলেও নিয়মিত আমল পছন্দ করেন। যখন আপনার আত্মিক উদ্দীপনা বা প্রেরণা একবারে তলানীতে গিয়ে ঠেকে তখনও যদি আপনি মৌলিক বিষয়গুলির ওপর কায়েম থাকতে পারেন, তবে ঈমানি জজবাতে সওয়ার হয়ে পুনরায় আপনি নিজের অবস্থানে ফিরে আসবেন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর ইচ্ছায় যখন আপনি পুনরায় উঠে দাঁড়াবেন, তখন আপনি আবার আগের থেকে (ঈমান ও আমলে) আরও 'উচ্চে' উঠতে সক্ষম হবেন।

জেনে রাখুন, আল্লাহর দিকে যে পথ চলে গেছে, তা কোনো সমতল ভূমি নয়। আপনার ঈমান কখনো বৃদ্ধি পেয়ে উচ্চ অবস্থানে পৌঁছাবে কখনো বা আবার তা কমে যেতে পারে। আপনার ইবাদতের সামর্থ্য কখনো উচ্চে অবস্থান করে আবার কখনো সে শক্তি স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু জেনে রাখবেন, প্রতিটি পতনের পরেই আছে উত্থান। তাই ধৈর্য ধারণ করুন, ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন, আশাহত হবেন না এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে যান অব্যাহতভাবে। এ পথ বন্ধুর। এই পথে যেমন উত্থান থাকবে, তেমনি থাকবে পতন। তবে জীবনের আর সবকিছুর মতোই এই পথেরও আছে সমাপ্তি। আর ওই সমাপ্তি যে চরম ফায়দা ও কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে, তা সফরের সবটুকু কষ্ট উসুল করে দেবে। আল্লাহ বলেন:
“হে মানব সম্প্রদায়, নিশ্চিতভাবে, তোমরা আপন প্রতিপালক পর্যন্ত পৌঁছা পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাকো, পরে তুমি তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে।"
يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ (কুরআন, ৮৪:৬)

টিকাঃ
* এক প্রকারের শক্তিবর্ধক-(সম্পাদক)।
** জীবনের বিভিন্ন অবস্থা মানুষের মধ্যে আল্লাহ প্রেম, তাকওয়া, ইবাদত-বন্দেগি প্রভৃতি বিষয়ের মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি করে। এর একটি অবস্থা সত্যকে চেনার প্রাথমিক পর্যায়। এছাড়াও বিপদ-মুসিবত, সফলতা-ব্যর্থতা ইত্যাদি নানা বিষয় ব্যক্তি ভেদে দ্বীনদারীর গভীরতার মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি করে। প্রতিটি অবস্থাকে সবর ও শোকরের সাথে অতিক্রম করা দ্বীনদারীর ওপর যথাযথভাবে কায়েম থাকার জন্য অপরিহার্য। একইভাবে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের অনুভূতি চিরস্থায়ী নয়। জীবনের চড়াই-উৎরাই, আল্লাহর পরীক্ষা সামনে আসবেই। সেক্ষেত্রে যথাযথ ঈমানি মানে কায়েম থাকার জন্যই লেখিকার এই উপলব্ধি ও পরামর্শ (সম্পাদক)।
** মুসলিম, কিতাবুত তওবাহ, হাদিস নং: ৬৮৫৯ - (সম্পাদক)।
* লেখিকা মূলত: মুসলিম মা-বোনদের লক্ষ্য করে বইখানি লেখায় হিজাবিদের কথা উল্লেখ করেছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে যাদের দাড়ি আছে বা টাখনুর ওপর কাপড় পরেন, তাদের কথা আসতে পারে – (সম্পাদক)।
** - (সম্পাদক)।
***- (সম্পাদক)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00