📄 অন্ধকার সময় এবং আসন্ন প্রভাত
একটি বিখ্যাত প্রবাদ অনুসারে, ভোরের পূর্ব মুহূর্তেই অন্ধকার সবচেয়ে গভীরতম হয়। জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে যদিও রাতের সবচেয়ে গভীর বিন্দু আরও আগেই হয়ে থাকে, তথাপি এই প্রবাদের সত্যতা রূপকধর্মী, আর কোনোভাবেই তা বাস্তব অবস্থা থেকে কিছুমাত্র কম নয়।
অনেক সময়ই, আমাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের পর পরই আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ের সাক্ষাত লাভ করি। প্রায়শই, এ রকম এক সময়, যখন সবকিছুই বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত মনে হয়, তখন সবচেয়ে কম প্রত্যাশার বিষয়ই আমাদের টেনে তোলে এবং এই কঠিন সময় পাড়ি দিতে আমাদের সাহায্য করে। নবি আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম) কি প্রথমে একে একে সব হারালেন না, অতঃপর তাকে আবার সব ফিরিয়ে দেওয়া হল, বরং আরও অধিক দেওয়া হলো?
হ্যাঁ, নবি আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম)-এর জন্য ওই আঁধার ঘন রাত্রি সত্য ছিল। আমাদের অনেকের নিকট এই আঁধার ঘন রাত্রির যেন কোনো শেষ নেই। কিন্তু আল্লাহ কখনো রাত্রিকে চিরকালের জন্য দীর্ঘায়িত করেন না। তাঁর অপার করুণাতে তিনি আমাদেরকে সূর্যের আলো দিয়ে ধন্য করেন। তথাপি এমনও সময় যায়, যখন আমাদের মনে হয়, এই কষ্ট ও দুর্ভোগের বুঝি আর শেষ নেই। আর আমাদের অনেকেই দীনি দৃষ্টিকোণ থেকে এতটাই রুহানি বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত যে, আমরা নিজেদেরকে স্রষ্টার কাছ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করি। আমাদের অনেকেই আবার এতটাই (রুহানি) অন্ধকারে ডুবে আছে যে, তারা এটা উপলব্ধিই করতে পারে না।
কিন্তু রাতের শেষে যেমনিভাবে সূর্য উদিত হয় হয়, তেমনিভাবে আমাদের প্রভাতও এসে গেছে। আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় রাত্রির নিকষ কালো অন্ধকার মুছে দেওয়ার জন্য রমজানের আলো প্রেরণ করেছেন। তিনি দান করেছেন কুরআনের মাস, যাতে করে তিনি আমাদের (রুহানি) অবস্থা উন্নত করতে পারেন এবং আমাদেরকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে তাঁর সান্নিধ্যে নিতে পারেন। আমাদের মাঝে বিরাজমান শূন্যতা পূরণের জন্য, আমাদের নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর জন্য এবং আমাদের রুহানি দারিদ্যের সমাপ্তি টানার জন্য তিনি এই বরকতময় মাস আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। আমাদের নিকট তিনি পাঠিয়েছেন প্রভাতের আলো, যাতে করে আঁধার থেকে মুক্ত হয়ে আমরা আলোর খোঁজ পেতে পারি। আল্লাহ বলেন:
"তিনিই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং ফেরেশতাগণও তোমাদের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোতে আনার জন্য, আর তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।”
هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَا بِكَتُهُ ८ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا (কুরআন, ৩৩:৪৩)
যারাই এই রহমতের প্রত্যাশী তাদের সবার জন্যই আল্লাহ তা'আলার এই রহমত প্রসারিত। এমনকি ভয়ানক পাপীকেও আল্লাহর অসীম করুণা থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে বলেন"
"বলো: হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের আত্মার প্রতি যুলুম করেছো, তারা আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা, আল্লাহ সকল পাপ মোচন করে দিবেন। তিনিই অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” ج قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (কুরআন, ৩৯:৫৩)
করুণা ও ক্ষমার মালিক আল্লাহ। বরকতময় রমজান ছাড়া এমন কোনো সময় নেই, যখন আমাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা অপার করুণা এতো অধিক পরিমাণে বর্ষিত হয়। রমজান প্রসঙ্গে নবি (ﷺ) বলেন:
রোজাকে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করবেন না:
নবি (ﷺ) বলেন:
“(রোজা রেখে) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং খারাপ কাজ বর্জন করলো না, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [বুখারি]
নবি (ﷺ) আমাদেরকে এই বলে সতর্ক করেছেন:
"বহু লোকই ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হওয়া ছাড়া রোজা থেকে কিছু হাসিল করে না এবং অনেক লোকই রাতের বেলাতে [সলাতে] দণ্ডায়মান হয়, কিন্তু রাত্রি জাগরণ ছাড়া সে আর কিছুই পায় না।” [দারিমি]
রোজা অবস্থায় গোটা দৃশ্যপটটি উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, রোজা মানে কেবল খানা-পিনা থেকে দূরে থাকা নয়। রোজা তো রাখা হয় আরও উত্তম মানুষে পরিণত হওয়ার জন্য।
এই প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য হতে বিচ্ছিন্ন থাকার অন্ধকার হতে বের হয়ে আসার সুযোগ প্রদান করা হয়। তবে দিন শেষে যেমন সূর্য অস্ত যায়, ঠিক তেমনি রমজান আসবে আবার চলে যাবে, কিন্তু আপনার আমার হৃদয়ে সে তার নিশানী রেখে যাবে।
টিকাঃ
৪০ বুখারি, তাওহিদ প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত, কিতাবুস সওম, হাদিস নং: ১৯০৩।
📄 আজও এক যুবাবনকে দাফন করে এলাম: মৃত্যু নিয়ে গভীর ভাবনা
পুণ্যবান এক আত্মার দাফন শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রবন্ধটা আমার গাড়িতে বসে লিখি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (ঙ) তার ও তার পরিবারের রহম করুন। আমিন।
আজ একজনকে আমরা দাফন করলাম। আর এখন, জীবিতদের কাফেলার একজন সাথি হিসেবে আমি নিজ বাড়ির দিকে অন্ততঃ এখনকার মতো ছুটছি।
এখনকার সময়ের জন্য আমি ও আপনি জীবিতদের কাফেলাতে আছি। এটা এজন্য নয় যে, আমরা ভিন্ন কোনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। এজন্য নয় যে, শুধু তারাই বিদায় নিচ্ছে, আর আমরা থেকে যাচ্ছি। বরং এর একমাত্র কারণ হলো, আমাদের কাফেলাটা পিছিয়ে আছে। এই মুহূর্তে আমরা নিজেদের বাড়ি ফিরছি, ফিরে যাচ্ছি আমাদের বিছানা, টেলিভিশন, স্টেরিও সেটের কাছে। ফিরছি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে, নিজেদের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে, নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছে, নিজেদের ফেসবুক ও জি-চ্যাটের কাছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমরা ফিরছি নিজেদের উৎকণ্ঠা, নিজেদের ভালোবাসার বিষয় ও নিজেদের প্রবঞ্চক মায়াজালগুলির কাছে। কিন্তু বাস্তবতার মিল কেবল এটুকুর মধ্যেই। আসলে আমি তো আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছি না, না আমি ফিরছি নিজের বিছানাতে, নিজের টেলিভিশন, নিজের স্টেরিও সেট, নিজের কর্মক্ষেত্র, নিজের পরীক্ষা, নিজের বন্ধু-বান্ধব, নিজের ফেসবুক ও জি-চ্যাটের কাছে। আমি আমার উৎকণ্ঠা, মোহ ও [কামনার] মূর্তির কাছেও ফিরে যাচ্ছি না। বরং আমি ফিরে যাচ্ছি সেখানে, যেখান থেকে আমি শুরু করেছি। আমি তো ওইখানে রওনা দিয়েছি, যেখানে ফিরে গেছেন ওই মৃত ব্যক্তি। সেই একই স্থানের দিকে আমি রওনা হয়েছি। আমি কেবল জানি না, কতটুকু সময় আমাকে চলতে হবে।
আমি ফিরে যাচ্ছি সেখানেই, যেখান থেকে আমার এ যাত্রা (দুনিয়ার জীবন) শুরু করেছিলাম - আল্লাহর দিকে। কেননা, আল্লাহই 'আল-আওয়াল' (সূচনা) এবং আল্লাহই হলেন 'আল-আখির' (সমাপ্তি)।
আমার দেহ আমাকে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে। কেননা, বাহন ছাড়া তো এটা আর কিছুই নয়। যখন আমি সেখানে পৌঁছাবো, এই দেহ - এই শরীর পেছনে রয়ে যাবে। যেমনিভাবে ওই মৃত ব্যক্তি তার দেহ পেছনে রেখে গেছেন। আমার দেহ এসেছে মাটি থেকে, আবার সেই মাটিতেই ফিরবে এই দেহখানা, যেভাবে সে এসেছিল। এটা তো একটা খোলস, আমার আত্মাকে ধারণ করে রাখার আধার বা পাত্র, ক্ষণিকের সাথি মাত্র। কিন্তু যখন আমি গন্তব্যে পৌঁছাবো, তখন আমি তা এখানে রেখে যাবো। প্রকৃতপক্ষে এটা আগমন, বিদায় নয়। কারণ ওটাই (তথা আখিরাতই) আমার ঘর। এটা (অর্থাৎ দুনিয়া) নয়। ঠিক এই কারণে পুণ্যবান আত্মাকে যখন আল্লাহ (5) তাঁর পানে ফিরে যাওয়ার জন্য ডেকে পাঠান, তখন [ওই আত্মাকে] উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, 'ইরজি'ই': ফিরে এসো। (কুরআন, ৮৯:২৮) ৪৪
ওই সুন্দর, পুণ্যবান আত্মা, যাকে আমরা দাফন করলাম, তিনি আজ জীবন থেকে বিদায় নেননি। তিনি তো জীবনের আরেক উচ্চ ধাপে এবং আল্লাহর তা'আলার ইচ্ছায় অধিকতর উত্তম এক ধাপে প্রবেশ করেছেন মাত্র। তিনি তার আপন গৃহে পৌঁছেছেন। যেহেতু তার দেহ দুনিয়ার মাটি দিয়ে তৈরি, তাই তাকে সে দেহ দুনিয়াতে রেখে যেতে হয়েছে। এই দেহ নিম্নতর জগতের, যে জগতে আমাদের খাওয়া ও ঘুমের প্রয়োজন হয়, যে জগতে আমরা রক্তাক্ত ও কান্নায় কাতর হই। অতঃপর মৃত্যুবরণ করি। ওদিকে আত্মা হলো ঊর্ধ্বতর জগতের। আত্মার চাহিদা ও প্রয়োজন কেবল একটাই এবং সেটা হলো: আল্লাহর সান্নিধ্য।
আর তাই, দেহ যখন কান্নায় শোকাতুর, রক্তে রঞ্জিত এবং বস্তুগত দুনিয়ার কষ্টে কাতর, তখন আত্মাকে এসব স্পর্শ করতে পারে না। আত্মাকে কেবল একটি জিনিসই পারে ক্ষতবিক্ষত করতে অথবা আঘাতে জর্জরিত করতে। একটি জিনিসই পারে আত্মাকে হত্যা করতে। তার সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা মহান আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য লাভের যে অপরিহার্য চাহিদা আত্মার মাঝে বিরাজমান, তা থেকে আত্মাকে বঞ্চিত করলেই (আত্মার মৃত্যু) ঘটে। আর তাই আত্মার এই গৃহে প্রত্যাবর্তনে আমাদের কাঁদা উচিত নয়, কারণ সে তো মরেনি। বরং আমাদের তো তার জন্য কাঁদা উচিত, যার দেহ তো জীবিত কিন্তু তার আত্মা মৃত্যুবরণ করেছে।
কারণ আত্মাকে যিনি জীবন দান করেন, সেই স্রষ্টা থেকে তার আত্মা দূরে সরে গিয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
এই কারণে ঈমানদার আত্মা দ্রুত গৃহ পানে ধাবিত হয়, এমনকি এই পার্থিব জীবনেও [সে গৃহে ফিরে]।
হে প্রভু, আমার আত্মাকে দান করো এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল, নিজ সত্তার মাঝে এক সুরক্ষিত কেল্লা। যাতে করে কেউ ও কোনো কিছু এটাকে বিরক্ত না করে। প্রশান্তি, নীরবতা ও নির্মলতায় পূর্ণ এক স্থান, যা বাহ্যিক দুনিয়ার স্পর্শ থেকে মুক্ত। আমাকে ওই আত্মার পরিণত করুন, যাঁকে আল্লাহ (*) 'আন-নাফস আল- মুতমায়িন্না' (প্রশান্ত আত্মা) বলে অভিহিত করেছেন যে, (পূণ্যবান) আত্মাকে আল্লাহ (*) এভাবে আহ্বান করবেন:
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের নিকট ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও, আর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।"
يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارجعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةٌ فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي (কুরআন, ৮৯:২৭-৩০)
টিকাঃ
* আয়াতের এই শব্দটির আরবি পাঠ এরূপ: ازجی
📄 আমার দু'আগুলি কবুল হচ্ছে না কেন?
প্রশ্ন: আমার দু'আগুলি কবুল হচ্ছে না কেন?
উত্তর: এমন একটা আন্তরিক প্রশ্ন করার জন্য আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পুরষ্কৃত করুন এবং তিনি আপনাকে সত্যের দিকে হেদায়েত করুন। আমিন।
আমি মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে যা হয়, তা হলো, আমরা আমাদের উপায়-উপকরণ বা মাধ্যমের সাথে আমাদের লক্ষ্যকে মিলিয়ে ফেলি। উদাহরণস্বরূপ যখন আমরা ভালো স্বামী (বা স্ত্রী) পাওয়ার জন্য দু'আ করি, তখন আমরা কি ভালো বিয়েকে একটি মাধ্যম মনে করি, নাকি আমরা সেটাকে লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করি? আমার মতে, আমাদের অধিকাংশই এটাকে (জীবনের) লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করি, যেটা বিবাহ পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট অধিকাংশ মোহভঙ্গ ও হতাশাকে ব্যাখ্যা করে (পরিহাসের বিষয় হলো, আমরা ভালো জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী পাই বা না পাই, উভয়ক্ষেত্রেই আমরা আশাহত হতে পারি)। এই দুনিয়ার বাকি সবকিছুর মতোই বিয়ে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তোষ লাভের একটি মাধ্যম মাত্র। তাই আমরা যে ভালো জীবন সঙ্গীর জন্য দু'আ করছি, আর সেটা যদি আমরা না পাই, তাহলে সম্ভবতঃ আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য অপর একটি মাধ্যম ঠিক করে রেখেছেন। সম্ভবতঃ কষ্টের মাধ্যমে আমাদের মাঝে পরিশুদ্ধি ও সবর (ধৈর্যের) মতো গুণের সৃষ্টি করবে। আর সেটাই আমাদেরকে আমাদের মূল লক্ষ্য তথা আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তোষের দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহই ভালো জানেন, হতে পারে এই যে ভালো জীবন সঙ্গীর জন্য আমাদের যে দু'আ, তা যদি তিনি আমাদের দিয়ে দিতেন, তাহলে তা আমাদের (আল্লাহর ব্যাপারে) গাফেল করে তুলতো এবং পরিণামে আমরা আমাদের যে মূল লক্ষ্য (তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি), তাতে একেবারেই উপনীত হতে পারতাম না।
যাহোক, বিষয়টি এভাবে না দেখে, আমার ধারণা, বিপরীতভাবে দেখা আমাদের যাবতীয় সমস্যার কারণ। (আমাদের অবস্থা এমন যে) দুনিয়ায় আমাদের চাহিদাগুলি (তথা ভালো চাকুরি, নির্দিষ্ট ধরনের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান লাভ করা, বিদ্যালয়, ক্যারিয়ার ইত্যাদি) হচ্ছে আমাদের সমাপ্তি এবং এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম হলেন 'আল্লাহ'। (এই দুনিয়ার জিনিসগুলো পাবার জন্য আমরা যে দু'আই করি না কেন), বস্তুত এসব দু'আর আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে: আল্লাহ নামক] এই 'মাধ্যমকে' ব্যবহার করে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হাসিল করা। এরপর আমাদের মাধ্যম (আল্লাহ) যখন আমাদের অনুকূলে ফয়সালা দেন না, তখন নিদারুন হতাশা আমাদেরকে ভর করে। আকাশের দিকে হাত তুলে আমরা অভিযোগ করতে থাকি যে, আমাদের দু'আ কবুল হচ্ছে না। আমাদের মাধ্যম আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসলো না!
কিন্তু, আল্লাহ তো কোনো মাধ্যম নন। তিনি সবকিছুর মূল লক্ষ্য। এই যে দু'আ, সেটারও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে: আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করা। দু'আর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হই। তাই আমার মতে, আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতেই সকল সমস্যা নিহিত। এজন্য 'ইস্তিখারার' দু'আকে আমি এতো ভালোবাসি। এটা যথার্থ এক দু'আ। এই দু'আর মধ্যে ঘোষণা করা হয় যে, সবকিছু আল্লাহই ভালো জানেন এবং অতঃপর যা সর্বোত্তম, তা দান করার এবং যা অকল্যাণকর, তা দূর করার আর্জি এই দু'আতে পেশ করা হয়। আপনি যা চাইছেন, সেটা এই দু'আর মূল বিষয় নয়, বরং যা এই দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য সর্বোত্তম, সেটাই এই দু'আর মূল বিষয়। এর মানে এটা নয় যে, আমরা নির্দিষ্ট কোনো জিনিসের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করতে পারবো না। বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাঁর কাছে চাওয়াকে ভীষণ পছন্দ করেন।
এর তাৎপর্য হলো, আমরা আমাদের হৃদয়-মন উজাড় করে আল্লাহর কাছে চাইবো এবং আল্লাহ আমাদের জন্য যা পছন্দ করবেন, তাতে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবো। আর আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা সব দু'আই কবুল করেন, তবে সব সময় আমরা যেভাবে চাই, সেভাবে নয়। আর তা কেবল এজন্যই যে, আমাদের জ্ঞান সীমিত, আর তাঁর জ্ঞান অসীম। তাঁর অসীম জ্ঞানে তিনি আমাদের জন্য তা-ই কবুল করেন, যা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা “আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ", তাতে উপনীত হওয়ার জন্য বেশি উপযোগী হবে।
ওয়াল্লাহু আ'লামু (আর আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন)।
📄 ফেসবুক: লুকানো বিপদ
আমরা এক iWorld-এ বাস করছি। আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে আছে iPhone, ipad, MYspace, YouTube এবং এসবের ফোকাস [বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুও] বেশ পরিষ্কার: আমি, আমাকে, আমার (Me, My, I)। আমিত্বের এই যে সীমাহীন মোহ, তা দেখার জন্য কারো বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিক্রি বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোকে মানুষের আমিত্বের (Ego) নিকট আহ্বান করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, এমন অনেক বিজ্ঞাপন আছে, যেগুলো আমাদের প্রবৃত্তির ওই অংশগুলির নিকট আবেদন করে, যেগুলি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভালোবাসে। Direct TV আপনাকে বলে: “Don't watch TV, direct TV!” এদিকে Yougurtland বলে: "সিদ্ধান্ত আপনারই! স্বাগতম আপনাকে দই জাতীয় রেসিপির সীমাহীন সম্ভাবনার ভূমিতে, যেখানে আপনার বরাদ্দ, পছন্দ ও পরিবেশের ওপর কর্তৃত্ব আপনারই।”
শুধু বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলিই আমাদের ইগোর নিকট আবেদন জানাচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। বরং বৈশ্বিক এক বিস্ময়কর জিনিস আমাদের ইগো বা আমিত্বের চর্চা ও বিকাশের জন্য এক আঁতুড় ঘর (Breeding Ground) এবং মঞ্চ বা প্লাটফর্মের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তার নাম হলো: ফেসবুক। এমতাবস্থায়, আমি সর্বাগ্রে এ বিষয়টির স্বীকৃতি দেবো যে, ভালো কাজ ও কল্যাণের পথে চলার জন্য ফেসবুক একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। অন্য যেকোনো কিছুর মতো, এটা নির্ভর করে আপনি কিভাবে তা ব্যবহার করেন, তার ওপর। ক্ষুধার্তকে পরিবেশনের জন্য খাবার কাটার উদ্দেশ্যে ছুরি ব্যবহৃত হতে পারে, আবার কাউকে খুন করার জন্যও ছুরি ব্যবহার করা যায়। ফেসবুক বৃহত্তর কল্যাণের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। সর্বোপরি এক স্বৈরশাসকের ক্ষমতা উপড়ে দিতে ফেসবুকের সহায়ক ভূমিকা ঠিকই আমরা দেখেছি। লোকজনকে সংঘবদ্ধ করা, ডাকা, তাগিদ দেওয়া এবং ঐক্যবদ্ধ করার মতো কাজে ফেসবুক এক শক্তিশালী হাতিয়ারের হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক মজবুত করা এবং একে অপরের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ জোরদার করার কাজে ফেসবুক ব্যবহৃত হতে পারে অথবা এই ফেসবুকই আমাদের ওপর আমাদের নফসের (তথা নিম্নতর সত্তা বা ইগোর) নিয়ন্ত্রণ মজবুত করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফেসবুকের এমন বিস্ময়কর প্রসার সত্যই এক চমকপ্রদ ঘটনা। প্রত্যেকের মধ্যেই একটা ইগো আছে। এটা আমাদের সত্তার এমন একটি অংশ, যেটাকে দমিয়ে রাখা আবশ্যক (যদি না এনাকিনের মতো পুরোপুরি মন্দ আত্মাতে পরিণত হতে না চাই)। ইগোকে তার ইচ্ছামত চলার সুযোগ দিয়ে তাকে প্রতিপালন করার বিপদ হচ্ছে, যতই আপনি একে পরিপুষ্ট করবেন, এটা ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর এটা যখন শক্তিশালী হয়ে উঠে, তখন তা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। শীঘ্রই আমরা আর আল্লাহর গোলাম না থেকে বরং আমাদের প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হই।
ইগো আমাদের সত্তার এমন এক অংশ, যা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভালোবাসে। এটা ভালোবাসে দৃশ্যপটে থাকতে, স্বীকৃতি লাভ করতে, প্রশংসিত হতে এবং সকলের আরাধ্য ও কাঙ্ক্ষিত হতে। এদিকে ফেসবুক ইগোর এই কামনা পূরণের এক শক্তিশালী প্লাটফর্ম দেয়। এটা এমন এক প্লাটফর্ম দেয়, যেখানে আমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ছবি বা আমার প্রতিটি ভাবনা ও চিন্তা দৃশ্যমান হতে পারে, হতে পারে সবার দ্বারা প্রশংসিত এবং সকলের 'পছন্দকৃত' [Liked]। ফলশ্রুতিতে আমিও এগুলোর পেছনে ছুটতে শুরু করি। কিন্তু তখন এগুলো আর সাইবার জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এমনকি আমি আমার জীবনও এই দৃষ্টিগোচরতার মধ্যে কাটাতে শুরু করি। সহসাই আমি এমনভাবে জীবন যাপন করতে থাকি যেন আমার প্রতিটি অভিজ্ঞতা, আমার প্রতিটি ছবি, আমার প্রতিটি চিন্তাকে কেউ না কেউ দেখছে। কেননা, আমার ধ্যানে-খেয়ালে কেবল একথা ঘুরছে যে, "আমি এটা ফেসবুকে আপলোড করবো।” এ মানসিকতা অদ্ভূত এক অবস্থার জন্ম দেয়। যেন একটা সার্বক্ষণিক অনুভূতি যে, আমার জীবনটা সব সময় ডিসপ্লে হচ্ছে। লোকজন আমায় দেখছে, সে ব্যাপারে আমি বেশ সচেতন হয়ে উঠি। কেননা, ফেসবুকে সবকিছুই আপলোড করা যায়, যা অন্যরা দেখতে ও কমেন্ট করতে পারে।
তদপুরি, এটা নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে অবাস্তব ও মেকি মনোভাব তৈরি করে, যেখানে আমি ভাবতে থাকি, আমার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শীঘ্রই আমি মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হই। পরিণত হই প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুতে। আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এটাই মুখ্য খবর। আমার জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপের গুরুত্ব সীমাহীন। ফলে আরও শক্তিশালী "আমি কেন্দ্রীক" এক বিশ্ব তৈরি হয়, যেখানে আমিই সবকিছুর কেন্দ্র।
প্রকৃতপক্ষে, এই ফলাফল – সম্পূর্ণভাবে বাস্তব অবস্থার বিপরীত। আল্লাহর মহত্ত্ব ও বিশালতার সত্যতাকে উপলব্ধি করা এবং তাঁর সামনে নিজের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজনের ক্ষুদ্রতা হৃদয়ঙ্গম করাই জীবনের পরম লক্ষ্য। লক্ষ্য হলো নিজেকে সরিয়ে আল্লাহকে সমস্ত জিনিসের কেন্দ্রে বাসানো। কিন্তু ফেসবুক এটার ঠিক বিপরীত বিভ্রান্তিকে স্থায়ী করতে চায়। এটা আমার এ চিন্তাধারাকে জোরদার করে যে, আমি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় আমার তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজ ও ভাবনা সকলের সামনে তুলে ধরতে হবে। সহসাই গুরুত্বপূর্ণ খবরে পরিণত হয়, কি দিয়ে সকালের নাস্তা করলাম কিংবা মুদি দোকান থেকে নতুন কি কিনে আনলাম, যা প্রকাশ করার মতো জরুরি হয়ে পড়ে। যখন আমি একটা ছবি আপলোড করি, তখন কেউ সেটাকে অভিনন্দন জানাবে, কেউ সেটা দেখবে এবং সেটাকে [লাইকের মাধ্যমে] স্বীকৃতি দেবে, এই অপেক্ষায় থাকি। লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য এখন সংখ্যায় প্রকাশ করা যাচ্ছে। যখন আমি কোনো পোস্ট আপলোড করি, তখন কেউ এটাকে 'লাইক' দেবে বলে অপেক্ষায় থাকি। (ফেসবুকে) আমার ক'জন 'বন্ধু' আছে, তা নিয়ে আমি সব সময় বেশ সচেতন, এমনকি তার সংখ্যা নিয়ে আমি প্রতিযোগিতায়ও লিপ্ত হই (বন্ধু, উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়ে এটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেননা, ফেসবুকে তাদের তথাকথিত 'বন্ধু'দের শতকরা ৮০ ভাগকেই কেউ চিনেও না)।
আরও পাবার এই যে একাগ্রতা এবং প্রতিযোগিতা, কুরআনে সেটার উল্লেখ রয়েছে।
আল্লাহ বলেন: “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।" أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ (কুরআন, ১০২:১)
ধনসম্পদ পুঞ্জিভূত করার প্রতিযোগিতা হোক কিংবা ফেসবুকে 'লাইক' বা বন্ধু সংগ্রহের প্রতিযোগিতা হোক, সবগুলোর ফলাফল একই। আর তা হচ্ছে: আমরা সেগুলো দ্বারা চরমভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছি।
ফেসবুক আরেকটা মারাত্মক বিষয়ে আমাদের মনোযোগ আটকে রাখে, তা হলো: অন্যদের বিষয়ে আগ্রহ, তারা কি করছে, তারা কি পছন্দ করে। তারা আমার ব্যাপারে কি চিন্তা করে। অন্যরা আমাকে কিভাবে মূল্যায়ন করে, ফেসবুক আমাকে এই চিন্তায় মশগুল রাখে। শীঘ্রই আমি সৃষ্ট বস্তুর কক্ষপথে পা বাড়াই। ওই কক্ষপথে আমার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমার সংজ্ঞাসমূহ, আমার দুঃখ-বেদনা, আমার সুখ- শান্তি, আমার আত্মমূল্যায়ন, আমার সফলতা ও আমার ব্যর্থতা সবই সৃষ্টবস্তু কর্তৃক নির্ধারিত হয়। যখন আমি ওই কক্ষপথে বাস করি, তখন আমার উত্থান ও পতন নির্ভর করে সৃষ্টবস্তুর ওপর। লোকেরা যখন আমাকে নিয়ে খুশি, আমিও তখন উল্লসিত, উচ্ছ্বসিত। যখন তারা আমায় নিয়ে অসুখী, তখন আমি একেবারে ভেঙে পড়ি। কোন বিষয়ে আমার অবস্থান কি, লোকেরাই সেটা নির্ধারণ করে। আমি যেন এক কয়েদি, কারণ আমি আমার সুখ, আমার দুঃখ ও বেদনা, আমার পূর্ণতা ও আমার হতাশার চাবিকাঠিগুলি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছি।
আল্লাহর কক্ষপথের পরিবর্তে যখন আমি সৃষ্টির কক্ষপথে প্রবেশ করি এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকি, তখন আমি সেখানকার কারেন্সি বা মুদ্রা ব্যবহার করতে শুরু করি। লক্ষ্যনীয় যে, আল্লাহর কক্ষপথে বিনিময় ব্যবস্থার ভিত্তি হলো: তাঁর সন্তুষ্টি কিংবা তাঁর অসন্তুষ্টি, তাঁর পুরস্কার কিংবা তাঁর শাস্তি। ওদিকে সৃষ্টির কক্ষপথের মুদ্রা বা বিনিময় ব্যবস্থা হচ্ছে: মানুষের প্রশংসা অথবা তাদের সমালোচনা। যতই আমি এই কক্ষপথের গভীরে থেকে গভীরে যেতে থাকি, ততই আমি এর লেনদেনের এই ব্যবস্থার প্রতি অধিকহারে আকৃষ্ট হতে থাকি এবং এসব হারানোর ভয় ও আশঙ্কা উত্তোরত্তর আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা "মনোপলি৪৬ খেলি, তখন আমি এর কারেন্সি (খেলনা হওয়া সত্ত্বেও) অধিক, আরও অধিক পরিমাণে সংগ্রহের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি। কিছু সময়ের জন্য ধনী হতে (অন্ততঃ এ ধরনের অনুভূতি) ৪৭ ভালোই লাগে। কিন্তু খেলা শেষ হয়ে যাবার পরে "মনোপলি” খেলার খেলনা টাকা দিয়ে বাস্তব জগতের কিছু কি আমি কিনতে পারি?
মানবীয় প্রশংসার কারেন্সি এই মনোপলি খেলার খেলনা টাকার মতোই। কিছু সময়ের জন্য এগুলো সংগ্রহ করতে বেশ ভালোই লাগে, কিন্তু খেলা শেষে এগুলো মূল্যহীন। দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের বাস্তবতার নিরিখে এসবের (অর্থাৎ মানবীয় প্রশংসা বা সমালোচনার) বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই। তা সত্ত্বেও কেন জানি আমার ইবাদত বন্দেগির মধ্যেও আমি এসব অর্থহীন কারেন্সির ব্যাপক আকর্ষণ বোধ করি। এর ফল আমি গুপ্ত শিরক রিয়ায় (তথা লোক দেখানো ইবাদত বন্দেগি) আক্রান্ত হই। সৃষ্টির কক্ষপথে বসবাসের ফলশ্রুতিতে রিয়ার মতো শির্কের জন্ম হয়। যতই আমি এই কক্ষপথের গভীর থেকে গভীরে ঢুকতে থাকি, ততই মানুষের প্রশংসা, অনুমোদন এবং তাদের স্বীকৃতি আমাকে গ্রাস করতে থাকে। যতই কক্ষপথের গহীনে প্রবেশ করতে থাকি, ততই হারানোর ভয় আমাকে পেয়ে বসে - মান-সম্মান হারানোর ভয়, সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়, প্রশংসা হারানোর ভয়, স্বীকৃতির হারানোর ভয়।
উপরন্তু, যতই আমি মানুষের ভয়ে কাঁপবো, ততই আমি (এদের) দাসত্বে আবদ্ধ হবো। সত্যিকার স্বাধীনতা ও মুক্তি তখনোই অর্জন করা যাবে, যখন আমি আল্লাহ ছাড়া অপরাপর সমস্ত বস্তু ও ব্যক্তির ভয় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবো।
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: নবি (ﷺ)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলে: “হে আল্লাহর রসুল, আমাকে এমন এক কাজের সন্ধান দেন, যে কাজ করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবে এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে। তিনি (ﷺ) বলেন: “নিজেকে দুনিয়া থেকে অনাসক্তি অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের কাছে যা আছে (অর্থাৎ দুনিয়ার ভোগ্যবস্তু) তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে।” [ইবনে মাজা] ৪৯
লক্ষনীয় বিষয় হলো, মানুষের স্বীকৃতি ও ভালোবাসার পেছনে আমরা যত কম ছুটবো, ততই আমরা সেগুলো পেতে থাকবো। অন্যের ওপর যত কম নির্ভরশীল হবো, ততই তারা আমাদের প্রতি আকৃষ্ট এবং আমাদের সঙ্গ লাভে আগ্রহী হবে। এই হাদিস আমাদেরকে এই নিগূঢ় সত্যেরই শিক্ষা দেয়। সৃষ্ট বস্তুর পরিমণ্ডল ও বলয় ভেঙে যখন আমরা বের হতে পারবো, তখনই আমরা স্রষ্টা ও মানুষের সাথে সম্পর্কে সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হবো।
অতএব, ফেসবুক এক শক্তিশালী মাধ্যম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, তাই এটাকে নিজের স্বাধীনতা ও মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করুন। এটা যেন আপনাকে আপন সত্তা ও অন্যের মূল্যায়নের দাসে পরিণত করার অস্ত্রে পরিণত না হয়।
টিকাঃ
* এনাকিন - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নির্ভর 'স্টার ওয়ার্স' খ্যাত এক কাল্পনিক মুভির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। প্রাথমিক অবস্থায় সে ভালোর পক্ষে থাকলেও পরবর্তীতে নিজ ইগোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সম্পূর্ণ খারাপ সত্তায় পরিণত হয়। লেখিকা মুভি প্রিয় পাশ্চাত্যবাসীর বুঝের জন্য - এ উদাহরণ টেনেছেন। তবে এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ-“ইবলিস”। নিজ ইগোকে প্রাধান্য দিয়ে সে চির নিকৃষ্ট ও বহিষ্কৃত হয়- (সম্পাদক)।
** "মনোপলি" (Monopoly): লুডুর মতো এক ধরনের বোর্ড গেইম। যাতে অন্যদের হারিয়ে সবচেয়ে ধনী ও সম্পদশালী হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীরা মত্ত হয় (সম্পাদক)।
"- (সম্পাদক)।
* অনুবাদক।
• ইবনে মাজা, কিতাবুয যুহদ (দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি শীর্ষক অধ্যায়), হাদিস নং: ৪১০২, তাহক্বীক আলবানি: সহিহ।