📄 একটি পবিত্র সংলাপ
রাতের বেলায় একটি সময় আছে, গোটা দুনিয়া যখন রূপান্তরিত হয়। দিনের বেলায় নানা ঝুট ঝামেলা প্রায়শই আমাদের জীবনকে গ্রাস করে রাখে। কাজ- কর্মের দায়-দায়িত্ব, শিক্ষাঙ্গন এবং পরিবারের গুরু দায়িত্ব আমাদের মনোযোগের বড় একটা অংশ দখল করে নেয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়ের সময় ছাড়া চিন্তা, ভাবনা করা, এমনকি স্বস্তিতে দম ফেলার সময়টুকু বের করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের অনেকে এতো গতিময় জীবন কাটায় যে, জীবনে তারা কিসের অভাব বোধ করেন, সেটা পর্যন্ত ধরতে তারা অক্ষম।
তথাপি রাতের বেলায় একটি সময় থাকে, যখন কাজকর্ম শেষ হয়, যান চলাচল থেমে যায় এবং নিঃশব্দতা তখন একমাত্র আওয়াজ। ঠিক এই সময়টিতে গোটা দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এমন একজন আছেন, সদাজাগ্রত যিনি এবং অপেক্ষায় থাকেন, কখন আমরা তাঁকে আহ্বান করি। একটি হাদিসে কুদসিতে আমাদেরকে বলা হয়: "আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন: “কেউ কি আছো যে আমাকে ডাকবে, যাতে আমি তার ডাকে সাড়া দিতে পারি? কেউ কি আছো, আমার কাছে চাইবে, যাতে আমি তাকে দান করতে পারি? কেউ কি আছো, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যাতে আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি?” [বুখারি ও মুসলিম]
এটা কেবল কল্পনাই করা যায় যে, একজন রাজা আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়ে আমরা যাই চাই, তা দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এ অবস্থায় আমাদের আচরণ চিন্তা করুন। যে কেউই উপলব্ধি করবে যে, যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এমন একটা সাক্ষাতের জন্য অন্ততঃপক্ষে অ্যালার্ম দিয়ে রাখবে। আমাদেরকে যদি বলা হয়, ভোর হওয়ার ঠিক ঘন্টাখানেক বাড়ির দরজায় ১০,০০০,০০০ (এক কোটি) ডলারের একটি চেক আমাদের জন্য রাখা হবে, তবে আমরা কি সেটা সংগ্রহের জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হতাম না?
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, ভোর হওয়ার ঠিক আগে রাতের এই সময়টিতে তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী হন।
বিষয়টা একবার ভেবে দেখুন তো। গোটা বিশ্ব জাহানের প্রভু আমাদেরকে তাঁর সাথে কথোপকথনের জন্য আহ্বান করছেন। এই মহান প্রভু আমাদের সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করেন। অথচ আমাদের অনেকেই তাঁকে অপেক্ষায় রেখে নিজ নিজ বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে। আল্লাহ (স) আমাদের নিকটবর্তী হন এবং আমরা তাঁর কাছে কি চাই, তিনি তা জানতে চান। সবকিছুর স্রষ্টা আমাদেরকে বলেন যে, আমরা যাই চাই না কেন, তিনি আমাদেরকে তাই দেবেন। তা সত্ত্বেও আমরা ঘুমে বিভোড়। এমন একটি দিন আসবে, যখন প্রবঞ্চনার এই পর্দা সরে যাবে। কুরআন বলে: "[তাদেরকে বলা হবে], আজকের এই দিন সম্পর্কে তুমি উদাসীন ছিলে, আর এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, তাই আজকের এই দিনে তোমার দৃষ্টি প্রখর।” (কুরআন, ৫০:২২)
ওই দিনটিতে আমরা সত্যিকার বাস্তবতা দেখতে পাবো। ওই দিন আমরা ঠিকই উপলব্ধি করবো যে, দু'রাকাত সলাত আসমান ও জমিনের সবকিছু থেকে উত্তম ছিল। প্রতিরাতে আমরা যখন ঘুমে বিভোড়, তখন আমাদের বাড়ির দরজার সামনে যে অমূল্য চেক ফেলে রাখা হতো, ওই দিন আমরা ঠিকই এটা বুঝতে পারবো। এমন একটি দিন আসবে, যখন আমরা কেবল দুনিয়াতে ফেরৎ আসা এবং ওই দু'রাকাত সলাত আদায় করার জন্য আসমানের নিচে সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে রাজি থাকবো।
এমন একটি দিন আসবে, যখন আমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে ওই কথোপকথনের জন্য এই দুনিয়াতে নিজেদের ভালোবাসার সবকিছু, আমাদের অন্তর ও মনকে আচ্ছন্ন করা সবকিছু এবং প্রতিটি মরীচিকা, যার পেছনে আমরা হন্যে হয়ে ছুটেছি, সেগুলোর সবই আমরা ত্যাগ করতে চাইবো। ওই দিন, কিছু লোক থেকে আল্লাহ (স) তাঁর [দৃষ্টি] ফিরিয়ে নেবেন... এবং তাদেরকে ভুলে যাবেন, যেমনিভাবে একদিন তারাও আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। কুরআন বলে: “সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ করে ওঠালে? অথচ আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান? তিনি বলবেন, 'এই রকমই আমার নিদর্শনাবলী তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আর সেইভাবে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো।” (কুরআন, ২০:১২৫-১২৬)
অন্যদিকে সুরা আল-মুমিনুনে আল্লাহ বলেন:
"আজ আর্তনাদ করো না, নিশ্চয়ই আমার পক্ষ থেকে তোমরা কোনো সাহায্য পাবে না।” (কুরআন, ২৩:৬৫)
এক মুহুর্তের জন্য কি আপনি চিন্তা করতে পারেন, এ আয়াতগুলো কি বলছে? পুরাতন কোনো বন্ধু বা সহপাঠী আপনাকে ভুলে গেছে, এটা তেমন কোনো ব্যাপার নয়। এটা তো জগতসমূহের রব তথা প্রভু আপনাকে ভুলে গেছেন। না জাহান্নামের আগুন, না ফুটন্ত পানি, আর না দগ্ধ চামড়া কোনো কিছুই এই আযাবের থেকে ভয়াবহ হতে পারে না।
যেমনিভাবে এর থেকে ভয়াবহ আর কোনো শাস্তি হতে পারে না, ঠিক তেমনি নবি (ﷺ) থেকে নিম্নে উদ্ধৃত হাদিসে বর্ণিত পুরষ্কারের চেয়ে বড় কোনো পুরষ্কার হতে পারে না:
“জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে বলবেন, 'তোমরা কি চাও আমি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ বাড়িয়ে দিই?' তারা বলবে, 'আপনি কি আমাদের চেহারাগুলি আলোকজ্জ্বল করে দেননি, আমাদের জান্নাতে দাখিল করেননি এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত দেননি? রসুল (ﷺ) বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা পর্দা বা আবরণ তুলে নেবেন। আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা-এর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই তাদের দেওয়া হয়নি।" [সহিহ মুসলিম]”
তদপুরি, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-এর সাথে রাত্রিকালীন এই সাক্ষাতের ফল কেমন, সেটা জানার জন্য কাউকে ওই দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় কাটাতে হবে না। সত্য বলতে কি, এরূপ কথোপকথনের মাঝে কি যে অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি নিহিত রয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অনুভব করা ছাড়া একে উপলব্ধি করার অন্য কোনো পথ নেই। একজনের জীবনে এমন অনুভূতির প্রভাব সীমাহীন। শেষরাতে যদি আপনি কিয়াম তথা তাহাজ্জুদের স্বাদ নেন, দেখবেন আপনার বাকি জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে যাবে। হঠাৎ করেই, যে বোঝার ভার আপনাকে নুইয়ে দিতো, তা পরিণত হবে নুরে। যেসব সমস্যা সমাধান ছিল অসম্ভব, সেগুলির সমাধান হবে। আপনার স্রষ্টার সাথে যে নৈকট্য এক সময় ছিল কল্পনাতীত, তা-ই পরিণত হবে আপনার একমাত্র লাইফ লাইনে।**
টিকাঃ
*সহিহ মুসলিম: কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং- ৩৩৮, হাদিস একাডেমি প্রকাশিত।
** লাইফ লাইন: যার ওপর একজনের জীবন নির্ভর করে (সম্পাদক)।
📄 অন্ধকার সময় এবং আসন্ন প্রভাত
একটি বিখ্যাত প্রবাদ অনুসারে, ভোরের পূর্ব মুহূর্তেই অন্ধকার সবচেয়ে গভীরতম হয়। জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে যদিও রাতের সবচেয়ে গভীর বিন্দু আরও আগেই হয়ে থাকে, তথাপি এই প্রবাদের সত্যতা রূপকধর্মী, আর কোনোভাবেই তা বাস্তব অবস্থা থেকে কিছুমাত্র কম নয়।
অনেক সময়ই, আমাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের পর পরই আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ের সাক্ষাত লাভ করি। প্রায়শই, এ রকম এক সময়, যখন সবকিছুই বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত মনে হয়, তখন সবচেয়ে কম প্রত্যাশার বিষয়ই আমাদের টেনে তোলে এবং এই কঠিন সময় পাড়ি দিতে আমাদের সাহায্য করে। নবি আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম) কি প্রথমে একে একে সব হারালেন না, অতঃপর তাকে আবার সব ফিরিয়ে দেওয়া হল, বরং আরও অধিক দেওয়া হলো?
হ্যাঁ, নবি আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম)-এর জন্য ওই আঁধার ঘন রাত্রি সত্য ছিল। আমাদের অনেকের নিকট এই আঁধার ঘন রাত্রির যেন কোনো শেষ নেই। কিন্তু আল্লাহ কখনো রাত্রিকে চিরকালের জন্য দীর্ঘায়িত করেন না। তাঁর অপার করুণাতে তিনি আমাদেরকে সূর্যের আলো দিয়ে ধন্য করেন। তথাপি এমনও সময় যায়, যখন আমাদের মনে হয়, এই কষ্ট ও দুর্ভোগের বুঝি আর শেষ নেই। আর আমাদের অনেকেই দীনি দৃষ্টিকোণ থেকে এতটাই রুহানি বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত যে, আমরা নিজেদেরকে স্রষ্টার কাছ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করি। আমাদের অনেকেই আবার এতটাই (রুহানি) অন্ধকারে ডুবে আছে যে, তারা এটা উপলব্ধিই করতে পারে না।
কিন্তু রাতের শেষে যেমনিভাবে সূর্য উদিত হয় হয়, তেমনিভাবে আমাদের প্রভাতও এসে গেছে। আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় রাত্রির নিকষ কালো অন্ধকার মুছে দেওয়ার জন্য রমজানের আলো প্রেরণ করেছেন। তিনি দান করেছেন কুরআনের মাস, যাতে করে তিনি আমাদের (রুহানি) অবস্থা উন্নত করতে পারেন এবং আমাদেরকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে তাঁর সান্নিধ্যে নিতে পারেন। আমাদের মাঝে বিরাজমান শূন্যতা পূরণের জন্য, আমাদের নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর জন্য এবং আমাদের রুহানি দারিদ্যের সমাপ্তি টানার জন্য তিনি এই বরকতময় মাস আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। আমাদের নিকট তিনি পাঠিয়েছেন প্রভাতের আলো, যাতে করে আঁধার থেকে মুক্ত হয়ে আমরা আলোর খোঁজ পেতে পারি। আল্লাহ বলেন:
"তিনিই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং ফেরেশতাগণও তোমাদের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোতে আনার জন্য, আর তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।”
هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَا بِكَتُهُ ८ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا (কুরআন, ৩৩:৪৩)
যারাই এই রহমতের প্রত্যাশী তাদের সবার জন্যই আল্লাহ তা'আলার এই রহমত প্রসারিত। এমনকি ভয়ানক পাপীকেও আল্লাহর অসীম করুণা থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে বলেন"
"বলো: হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের আত্মার প্রতি যুলুম করেছো, তারা আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা, আল্লাহ সকল পাপ মোচন করে দিবেন। তিনিই অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” ج قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (কুরআন, ৩৯:৫৩)
করুণা ও ক্ষমার মালিক আল্লাহ। বরকতময় রমজান ছাড়া এমন কোনো সময় নেই, যখন আমাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা অপার করুণা এতো অধিক পরিমাণে বর্ষিত হয়। রমজান প্রসঙ্গে নবি (ﷺ) বলেন:
রোজাকে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করবেন না:
নবি (ﷺ) বলেন:
“(রোজা রেখে) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং খারাপ কাজ বর্জন করলো না, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [বুখারি]
নবি (ﷺ) আমাদেরকে এই বলে সতর্ক করেছেন:
"বহু লোকই ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হওয়া ছাড়া রোজা থেকে কিছু হাসিল করে না এবং অনেক লোকই রাতের বেলাতে [সলাতে] দণ্ডায়মান হয়, কিন্তু রাত্রি জাগরণ ছাড়া সে আর কিছুই পায় না।” [দারিমি]
রোজা অবস্থায় গোটা দৃশ্যপটটি উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, রোজা মানে কেবল খানা-পিনা থেকে দূরে থাকা নয়। রোজা তো রাখা হয় আরও উত্তম মানুষে পরিণত হওয়ার জন্য।
এই প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য হতে বিচ্ছিন্ন থাকার অন্ধকার হতে বের হয়ে আসার সুযোগ প্রদান করা হয়। তবে দিন শেষে যেমন সূর্য অস্ত যায়, ঠিক তেমনি রমজান আসবে আবার চলে যাবে, কিন্তু আপনার আমার হৃদয়ে সে তার নিশানী রেখে যাবে।
টিকাঃ
৪০ বুখারি, তাওহিদ প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত, কিতাবুস সওম, হাদিস নং: ১৯০৩।
📄 আজও এক যুবাবনকে দাফন করে এলাম: মৃত্যু নিয়ে গভীর ভাবনা
পুণ্যবান এক আত্মার দাফন শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রবন্ধটা আমার গাড়িতে বসে লিখি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (ঙ) তার ও তার পরিবারের রহম করুন। আমিন।
আজ একজনকে আমরা দাফন করলাম। আর এখন, জীবিতদের কাফেলার একজন সাথি হিসেবে আমি নিজ বাড়ির দিকে অন্ততঃ এখনকার মতো ছুটছি।
এখনকার সময়ের জন্য আমি ও আপনি জীবিতদের কাফেলাতে আছি। এটা এজন্য নয় যে, আমরা ভিন্ন কোনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। এজন্য নয় যে, শুধু তারাই বিদায় নিচ্ছে, আর আমরা থেকে যাচ্ছি। বরং এর একমাত্র কারণ হলো, আমাদের কাফেলাটা পিছিয়ে আছে। এই মুহূর্তে আমরা নিজেদের বাড়ি ফিরছি, ফিরে যাচ্ছি আমাদের বিছানা, টেলিভিশন, স্টেরিও সেটের কাছে। ফিরছি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে, নিজেদের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে, নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছে, নিজেদের ফেসবুক ও জি-চ্যাটের কাছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমরা ফিরছি নিজেদের উৎকণ্ঠা, নিজেদের ভালোবাসার বিষয় ও নিজেদের প্রবঞ্চক মায়াজালগুলির কাছে। কিন্তু বাস্তবতার মিল কেবল এটুকুর মধ্যেই। আসলে আমি তো আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছি না, না আমি ফিরছি নিজের বিছানাতে, নিজের টেলিভিশন, নিজের স্টেরিও সেট, নিজের কর্মক্ষেত্র, নিজের পরীক্ষা, নিজের বন্ধু-বান্ধব, নিজের ফেসবুক ও জি-চ্যাটের কাছে। আমি আমার উৎকণ্ঠা, মোহ ও [কামনার] মূর্তির কাছেও ফিরে যাচ্ছি না। বরং আমি ফিরে যাচ্ছি সেখানে, যেখান থেকে আমি শুরু করেছি। আমি তো ওইখানে রওনা দিয়েছি, যেখানে ফিরে গেছেন ওই মৃত ব্যক্তি। সেই একই স্থানের দিকে আমি রওনা হয়েছি। আমি কেবল জানি না, কতটুকু সময় আমাকে চলতে হবে।
আমি ফিরে যাচ্ছি সেখানেই, যেখান থেকে আমার এ যাত্রা (দুনিয়ার জীবন) শুরু করেছিলাম - আল্লাহর দিকে। কেননা, আল্লাহই 'আল-আওয়াল' (সূচনা) এবং আল্লাহই হলেন 'আল-আখির' (সমাপ্তি)।
আমার দেহ আমাকে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে। কেননা, বাহন ছাড়া তো এটা আর কিছুই নয়। যখন আমি সেখানে পৌঁছাবো, এই দেহ - এই শরীর পেছনে রয়ে যাবে। যেমনিভাবে ওই মৃত ব্যক্তি তার দেহ পেছনে রেখে গেছেন। আমার দেহ এসেছে মাটি থেকে, আবার সেই মাটিতেই ফিরবে এই দেহখানা, যেভাবে সে এসেছিল। এটা তো একটা খোলস, আমার আত্মাকে ধারণ করে রাখার আধার বা পাত্র, ক্ষণিকের সাথি মাত্র। কিন্তু যখন আমি গন্তব্যে পৌঁছাবো, তখন আমি তা এখানে রেখে যাবো। প্রকৃতপক্ষে এটা আগমন, বিদায় নয়। কারণ ওটাই (তথা আখিরাতই) আমার ঘর। এটা (অর্থাৎ দুনিয়া) নয়। ঠিক এই কারণে পুণ্যবান আত্মাকে যখন আল্লাহ (5) তাঁর পানে ফিরে যাওয়ার জন্য ডেকে পাঠান, তখন [ওই আত্মাকে] উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, 'ইরজি'ই': ফিরে এসো। (কুরআন, ৮৯:২৮) ৪৪
ওই সুন্দর, পুণ্যবান আত্মা, যাকে আমরা দাফন করলাম, তিনি আজ জীবন থেকে বিদায় নেননি। তিনি তো জীবনের আরেক উচ্চ ধাপে এবং আল্লাহর তা'আলার ইচ্ছায় অধিকতর উত্তম এক ধাপে প্রবেশ করেছেন মাত্র। তিনি তার আপন গৃহে পৌঁছেছেন। যেহেতু তার দেহ দুনিয়ার মাটি দিয়ে তৈরি, তাই তাকে সে দেহ দুনিয়াতে রেখে যেতে হয়েছে। এই দেহ নিম্নতর জগতের, যে জগতে আমাদের খাওয়া ও ঘুমের প্রয়োজন হয়, যে জগতে আমরা রক্তাক্ত ও কান্নায় কাতর হই। অতঃপর মৃত্যুবরণ করি। ওদিকে আত্মা হলো ঊর্ধ্বতর জগতের। আত্মার চাহিদা ও প্রয়োজন কেবল একটাই এবং সেটা হলো: আল্লাহর সান্নিধ্য।
আর তাই, দেহ যখন কান্নায় শোকাতুর, রক্তে রঞ্জিত এবং বস্তুগত দুনিয়ার কষ্টে কাতর, তখন আত্মাকে এসব স্পর্শ করতে পারে না। আত্মাকে কেবল একটি জিনিসই পারে ক্ষতবিক্ষত করতে অথবা আঘাতে জর্জরিত করতে। একটি জিনিসই পারে আত্মাকে হত্যা করতে। তার সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা মহান আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য লাভের যে অপরিহার্য চাহিদা আত্মার মাঝে বিরাজমান, তা থেকে আত্মাকে বঞ্চিত করলেই (আত্মার মৃত্যু) ঘটে। আর তাই আত্মার এই গৃহে প্রত্যাবর্তনে আমাদের কাঁদা উচিত নয়, কারণ সে তো মরেনি। বরং আমাদের তো তার জন্য কাঁদা উচিত, যার দেহ তো জীবিত কিন্তু তার আত্মা মৃত্যুবরণ করেছে।
কারণ আত্মাকে যিনি জীবন দান করেন, সেই স্রষ্টা থেকে তার আত্মা দূরে সরে গিয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
এই কারণে ঈমানদার আত্মা দ্রুত গৃহ পানে ধাবিত হয়, এমনকি এই পার্থিব জীবনেও [সে গৃহে ফিরে]।
হে প্রভু, আমার আত্মাকে দান করো এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল, নিজ সত্তার মাঝে এক সুরক্ষিত কেল্লা। যাতে করে কেউ ও কোনো কিছু এটাকে বিরক্ত না করে। প্রশান্তি, নীরবতা ও নির্মলতায় পূর্ণ এক স্থান, যা বাহ্যিক দুনিয়ার স্পর্শ থেকে মুক্ত। আমাকে ওই আত্মার পরিণত করুন, যাঁকে আল্লাহ (*) 'আন-নাফস আল- মুতমায়িন্না' (প্রশান্ত আত্মা) বলে অভিহিত করেছেন যে, (পূণ্যবান) আত্মাকে আল্লাহ (*) এভাবে আহ্বান করবেন:
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের নিকট ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও, আর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।"
يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارجعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةٌ فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي (কুরআন, ৮৯:২৭-৩০)
টিকাঃ
* আয়াতের এই শব্দটির আরবি পাঠ এরূপ: ازجی
📄 আমার দু'আগুলি কবুল হচ্ছে না কেন?
প্রশ্ন: আমার দু'আগুলি কবুল হচ্ছে না কেন?
উত্তর: এমন একটা আন্তরিক প্রশ্ন করার জন্য আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পুরষ্কৃত করুন এবং তিনি আপনাকে সত্যের দিকে হেদায়েত করুন। আমিন।
আমি মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে যা হয়, তা হলো, আমরা আমাদের উপায়-উপকরণ বা মাধ্যমের সাথে আমাদের লক্ষ্যকে মিলিয়ে ফেলি। উদাহরণস্বরূপ যখন আমরা ভালো স্বামী (বা স্ত্রী) পাওয়ার জন্য দু'আ করি, তখন আমরা কি ভালো বিয়েকে একটি মাধ্যম মনে করি, নাকি আমরা সেটাকে লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করি? আমার মতে, আমাদের অধিকাংশই এটাকে (জীবনের) লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করি, যেটা বিবাহ পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট অধিকাংশ মোহভঙ্গ ও হতাশাকে ব্যাখ্যা করে (পরিহাসের বিষয় হলো, আমরা ভালো জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী পাই বা না পাই, উভয়ক্ষেত্রেই আমরা আশাহত হতে পারি)। এই দুনিয়ার বাকি সবকিছুর মতোই বিয়ে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তোষ লাভের একটি মাধ্যম মাত্র। তাই আমরা যে ভালো জীবন সঙ্গীর জন্য দু'আ করছি, আর সেটা যদি আমরা না পাই, তাহলে সম্ভবতঃ আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য অপর একটি মাধ্যম ঠিক করে রেখেছেন। সম্ভবতঃ কষ্টের মাধ্যমে আমাদের মাঝে পরিশুদ্ধি ও সবর (ধৈর্যের) মতো গুণের সৃষ্টি করবে। আর সেটাই আমাদেরকে আমাদের মূল লক্ষ্য তথা আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তোষের দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহই ভালো জানেন, হতে পারে এই যে ভালো জীবন সঙ্গীর জন্য আমাদের যে দু'আ, তা যদি তিনি আমাদের দিয়ে দিতেন, তাহলে তা আমাদের (আল্লাহর ব্যাপারে) গাফেল করে তুলতো এবং পরিণামে আমরা আমাদের যে মূল লক্ষ্য (তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি), তাতে একেবারেই উপনীত হতে পারতাম না।
যাহোক, বিষয়টি এভাবে না দেখে, আমার ধারণা, বিপরীতভাবে দেখা আমাদের যাবতীয় সমস্যার কারণ। (আমাদের অবস্থা এমন যে) দুনিয়ায় আমাদের চাহিদাগুলি (তথা ভালো চাকুরি, নির্দিষ্ট ধরনের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান লাভ করা, বিদ্যালয়, ক্যারিয়ার ইত্যাদি) হচ্ছে আমাদের সমাপ্তি এবং এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম হলেন 'আল্লাহ'। (এই দুনিয়ার জিনিসগুলো পাবার জন্য আমরা যে দু'আই করি না কেন), বস্তুত এসব দু'আর আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে: আল্লাহ নামক] এই 'মাধ্যমকে' ব্যবহার করে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হাসিল করা। এরপর আমাদের মাধ্যম (আল্লাহ) যখন আমাদের অনুকূলে ফয়সালা দেন না, তখন নিদারুন হতাশা আমাদেরকে ভর করে। আকাশের দিকে হাত তুলে আমরা অভিযোগ করতে থাকি যে, আমাদের দু'আ কবুল হচ্ছে না। আমাদের মাধ্যম আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসলো না!
কিন্তু, আল্লাহ তো কোনো মাধ্যম নন। তিনি সবকিছুর মূল লক্ষ্য। এই যে দু'আ, সেটারও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে: আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করা। দু'আর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হই। তাই আমার মতে, আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতেই সকল সমস্যা নিহিত। এজন্য 'ইস্তিখারার' দু'আকে আমি এতো ভালোবাসি। এটা যথার্থ এক দু'আ। এই দু'আর মধ্যে ঘোষণা করা হয় যে, সবকিছু আল্লাহই ভালো জানেন এবং অতঃপর যা সর্বোত্তম, তা দান করার এবং যা অকল্যাণকর, তা দূর করার আর্জি এই দু'আতে পেশ করা হয়। আপনি যা চাইছেন, সেটা এই দু'আর মূল বিষয় নয়, বরং যা এই দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য সর্বোত্তম, সেটাই এই দু'আর মূল বিষয়। এর মানে এটা নয় যে, আমরা নির্দিষ্ট কোনো জিনিসের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করতে পারবো না। বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাঁর কাছে চাওয়াকে ভীষণ পছন্দ করেন।
এর তাৎপর্য হলো, আমরা আমাদের হৃদয়-মন উজাড় করে আল্লাহর কাছে চাইবো এবং আল্লাহ আমাদের জন্য যা পছন্দ করবেন, তাতে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবো। আর আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা সব দু'আই কবুল করেন, তবে সব সময় আমরা যেভাবে চাই, সেভাবে নয়। আর তা কেবল এজন্যই যে, আমাদের জ্ঞান সীমিত, আর তাঁর জ্ঞান অসীম। তাঁর অসীম জ্ঞানে তিনি আমাদের জন্য তা-ই কবুল করেন, যা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা “আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ", তাতে উপনীত হওয়ার জন্য বেশি উপযোগী হবে।
ওয়াল্লাহু আ'লামু (আর আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন)।