📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সালাত: জীবনের ভুলে যাওয়া উদ্দেশ্য

📄 সালাত: জীবনের ভুলে যাওয়া উদ্দেশ্য


সময়ের পরিক্রমায় মানুষ অনেক সফরই করেছে। কিন্তু একটা সফর এমন, যা দুনিয়ার কেউই করেনি।

কেউই না, তবে একজন ছাড়া।

এমন এক বাহনে করে তিনি সেই ভ্রমণ করেছেন, যাতে কোনো মানুষ কখনো চড়েনি। এমন এক পথে যে পথ কোনো মানবাত্মা কখনো দেখেনি। এমন এক স্থানের উদ্দেশ্যে, যেখানে কোনো সৃষ্টি পা রাখেনি। এটা ছিল একজন মানুষের সফর, মহান স্রষ্টার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। এটা ছিল আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ (ﷺ)-এর সর্বোচ্চ আসমানে গমনের সফর।

এটা ছিল 'আল-ইসরা ওয়াল মিরাজ' (মহিমান্বিত যাত্রা)।

এই সফরে আল্লাহ তাঁর হাবিব রসুল (ﷺ)-কে সপ্ত আসমানে নিয়ে যান, যেখানে জিব্রাইল ফেরেশতারও প্রবেশের অনুমতি নেই। দুনিয়াতে নবি (ﷺ)-এর মিশনে প্রতিটি দিক-নির্দেশনা, প্রতিটি আদেশ পাঠানো হতো ফেরেশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে। কিন্তু একটি আদেশ ছিল এর থেকে ব্যতিক্রম। একটি আদেশ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, ফেরেশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে তা প্রেরণের বদলে আল্লাহ পাক স্বয়ং নবি (ﷺ)-কে নিজের কাছে তুলে নেন।

এ হুকুমটা ছিল সলাত বা নামাজের। নবি (ﷺ)-কে সলাতের প্রথম যে আদেশ দেওয়া হয়, তা ছিল দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্তের। নবি (ﷺ) আল্লাহর কাছে তা সহজ করার আর্জি পেশ করায়, এই আদেশকে পঞ্চাশ থেকে কমিয়ে তিনি পাঁচে নির্ধারণ করেন, তবে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব ঠিকই বহাল রাখেন।

এই ঘটনার পর্যালোচনা করে ইসলামি চিন্তাবিদগণ বলেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে সলাতকে পাঁচ ওয়াক্তে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়া উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিল এবং আমাদের জীবনে সলাতের প্রকৃত গুরুত্ব ও অবস্থান তুলে ধরতেই এমনটি করা হয়েছে। সত্যি সত্যি দিনে পঞ্চাশ বার সলাত আদায়ের দৃশ্যটি একবার কল্পনা করুন। সলাত আদায় ছাড়া আমরা কি অন্য কিছু করতে পারতাম? উত্তর হলো: না।

আর সেটাই হলো আসল কথা (যেদিকে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই)। আমাদের জীবনের সত্যিকার উদ্দেশ্য তুলে ধরার জন্য এর চেয়ে উত্তম কোনো পন্থা আছে কি? প্রকারান্তরে যেন একথাই বলা হচ্ছে: সলাতই আমাদের প্রকৃত জীবন, আর বাদবাকি যা দিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে পূর্ণ করি, সেসবই কেবল আনুষঙ্গিক।

তা সত্ত্বেও আমরা ঠিক এর বিপরীত তরিকায় জীবন যাপন করি। সলাত তো এমন জিনিস, যা খুব কষ্টে-সৃষ্টে আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত করি; যখন সময় পাই – যদি তা পাই। আমাদের জীবন সলাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় না; বরং সলাতই আমাদের 'জীবনের' আশেপাশে ঘুরপাক খায়। যদি আমরা শ্রেণিকক্ষে থাকি, তবে সলাতের চিন্তা মাথায়ই আসে না – আসলেও ঘটনাচক্রে। যদি শপিংমলে থাকি, তবে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের মূল্যছাড়ের চিন্তাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। [সামান্য] বাস্কেটবল (অথবা ফুটবল বা ক্রিকেট) খেলা দেখার জন্য আমরা যদি নিজেদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে (অর্থাৎ মাথাকেই) ভুলে যাই তখন বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও মারাত্মক রকমের সমস্যা রয়েছে।

এতো তো গেল তাদের কথা, যারা কোনো রকম সলাত আদায় করেন। কিন্তু এমনও মানুষ আছে, যারা নিজেদের জীবনের এই উদ্দেশ্য (তথা সলাতকে) কেবল দূরেই নিক্ষেপ করেনি, বরং একে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেছে। অথচ সলাত পরিত্যাগ করার বিষয়ে যে কথাটি আমরা বিবেচনার না, তা হলো: যিনা বা ব্যাভিচার করলে কেউ কাফির হয়ে যায়, এই মত কোনো ইসলামি চিন্তাবিদ কখনো পোষণ করেননি। চুরি করলে, মদ পান করলে বা মাদক গ্রহণ করলে কেউ কাফিরে পরিণত হবে, এমন মত কখনো কোনো ইসলামি স্কলার পোষণ করেননি। খুন করলে কেউ অমুসলিম হয়ে যায়, কোনো আলেম কখনো এরকম দাবি করেননি। কিন্তু সলাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে কিছু আলেমের মত হলো, সে আর মুসলিম থাকে না। নিম্নের হাদিসটির মতো কিছু হাদিসের ওপর ভিত্তি করে এ মতটি প্রতিষ্ঠিত:
"সলাতই আমাদের ও কাফিরদের মাঝে পার্থক্য রেখা। তাই যে এটা পরিত্যাগ করে, সে কাফিরে পরিণত হয়।” [আহমদ]”

একটা কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে নবি (ﷺ) সেটার ব্যাপারে এ ধরনের ভাষা প্রয়োগ করেন। শয়তান কি অপরাধ করেছিল, সেটা একবার ভাবুন তো। সে তো আল্লাহকে মানতে অস্বীকার করেনি। সে তো শুধু একটি সেজদা দিতেই অস্বীকার করেছিল। তাহলে ভেবে দেখুন তো, আমরা যে হাজারো সেজদা দিতে অস্বীকৃতি জানাই, তার কি পরিণতি হবে।

এই অস্বীকৃতির ভয়াবহতা একবার কল্পনা করুন। তারপরও চিন্তা করে দেখুন আমরা সলাতের বিষয়টি কত হালকাভাবেই না গ্রহণ করি। বিচার দিবসে প্রথম যে জিনিস সম্পর্কে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তা হচ্ছে: সলাত, তথাপি সলাত আমাদের কাছে সর্বশেষ বিবেচ্য বিষয়। নবি (ﷺ) বলেন:
"পুনরুত্থান দিবসে বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম সলাতের হিসাব নেওয়া হবে। যদি ঠিক মতো সলাত আদায় হয়ে থাকে, তবে সে সাফল্য ও নাজাত লাভ করবে। কিন্তু এতে যদি তার ঘাটতি থাকে তবে সে ব্যর্থ হবে এবং সে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে শামিল হবে।” [তিরমিযি, হাদিস নং ২৪৯]

ওই দিন জান্নাতবাসীগণ জাহান্নামীদের প্রশ্ন করবেন, কেন তারা এ আগুনে প্রবেশ করেছে। আর কুরআন আমাদের জানিয়ে দিয়েছে তাদের সর্বপ্রথম জবাব কি হবে: "কিসে তোমাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবে: আমরা সলাত আদায়কারী ছিলাম না।” (কুরআন, ৭৪:৪২-৪৩)

আমাদের মাঝে কতজন ওইসব লোকের মধ্যে শামিল হবে, যারা বলবে, "আমরা সলাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না অথবা আমরা ঠিক সময়ে সলাত আদায়কারীদের মধ্যে ছিলাম না অথবা আমরা ওইসব লোকের দলে শামিল নই, যারা সলাতকে তাদের জীবনের সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিতো?" ব্যাপারটা কেমন, আমরা যদি ক্লাসে থাকি কিংবা কর্মক্ষেত্রে অথবা ফজরের সময়ে অসারের মতো ঘুমিয়ে থাকি, তথাপি আমাদেরকে শৌচাগার [বা ওয়াশরুমে] যাওয়ার প্রয়োজন হলে, তার জন্য আমরা ঠিকই সময় বের করে ফেলি? আসলে এই প্রশ্নটি অবান্তর শুনায়। এর জন্য সময় বের না করার বিষয়টি আমরা বিবেচনাই করতে পারি না। এমনকি জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাতে অংশ নেওয়ার সময়ও যখনই (টয়লেটে) যাবার সময় হয়, তখন তাতে আমরা যাবোই। কেন? কারণ তাতে সাড়া না দেওয়ার অবশ্যম্ভাবী লজ্জাকর ও যন্ত্রণাদায়ক পরিণতিই একে একটা অনৈচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করে।

এমন বহু মানুষ আছেন, যারা বলেন, যখন তারা কর্মক্ষেত্রে বা বিদ্যালয়ে কিংবা ঘরের বাহিরে থাকেন, তখন সলাত আদায় করার সময় তারা পান না। কিন্তু আমাদের মাঝে ক'জন কখনো এই কথা বলেছেন যে, যখন তারা বাহিরে থাকেন অথবা কাজে থাকেন অথবা বিদ্যালয়ে থাকেন, তখন শৌচাগারে যাওয়ার সময় তাদের থাকে না, তাই তারা ডাইপার পরাই পছন্দ করেন (এবং তাতেই তাদের প্রয়োজন সারেন)? ক'জন আছেন, যারা ফজরের সময় ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও ঘুম ভেঙে উঠতে চাই না, বরং তার বদলে বিছানা নষ্ট করতে পছন্দ করি? বাস্তবতা হচ্ছে, বিছানা ছেড়ে আমরা সবাই উঠি অথবা শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করি অথবা কাজ রেখে ঠিকই আমরা শৌচাগারে যেতে পারলেও [দুঃখজনকভাবে] আমরা সলাত আদায়ের জন্য সময় করতে পারি না।

বিষয়টা হাস্যকর শুনালেও, বাস্তবতা হচ্ছে আমরা আমাদের দেহের বা শরীরী চাহিদাকে আমরা নিজেদের আত্মার চাহিদার উপরে স্থান দেই। আমরা আমাদের শরীরকে খাওয়াই। কেননা, এমনটি না করলে আমরা মারা পড়বো। কিন্তু আমাদের মাঝে এমন বহু লোক আছে, যারা আত্মাকে অনাহারে রাখে এবং এ কথা একেবারে ভুলে যায় যে, সলাত আদায় না করলে, আমাদের আত্মার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, আমাদের এত যত্নের এই শরীরের স্থায়িত্ব নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, অন্যদিকে আমাদের অবহেলার পাত্র আমাদের আত্মা, যার স্থায়িত্ব চিরকালের।

টিকাঃ
- (সম্পাদক)।
* নিম্নের হাদিসটি এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য: "বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো: সলাত পরিত্যাগ করা।" (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান ১ম খণ্ড, হাদিস নং: ১৪৯, হাদিস একাডেমী প্রকাশিত)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সালাত এবং নিকটতম ছুরি

📄 সালাত এবং নিকটতম ছুরি


সত্য-সঠিক পথ খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, পাওয়ার পর তা হারিয়ে ফেলা। বিচ্যুত হওয়ার অসংখ্য পথ রয়েছে, নিজের দ্বীন [বা ধর্ম] থেকে বিচ্যুত হওয়ার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না। কখনো কোনো বোন তার হিজাব খুলে ফেলে ভিন্ন ধরনের জীবন বেছে নেয়, আবার কখনো কোনো ভাই, যে সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশ সক্রিয় ছিল, সে ভুল লোকদের পাল্লায় পড়ে। কিন্তু এরকম প্রতিটি গল্পেই সর্বোপরি কোনো না কোনোভাবে, কোথাও না কোথাও আমাদের ভাই ও বোনেরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে বহু দূরে চলে যান।

দুঃখজনক হলেও এই গল্পগুলো একেবারেই বিরল নয়। কখনো কখনো তাদের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে এই প্রশ্ন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না যে, কেন এমন হলো? কিভাবে হলো? একথা ভেবে আমাদের অবাক লাগে যে, কিভাবে এরকম একটা মানুষ, যে দ্বীনের ওপর এতো মজবুত ছিল, সে আজ সেখান থেকে এতো দূরে সরে যেতে পারলো।

এ নিয়ে অবাক হওয়ার সময় প্রায়শই আমরা বুঝে উঠতে পারি না যে, আমাদের ভাবনার চেয়েও এসব প্রশ্নের উত্তর বেশ সহজ ও সরল। মানুষ নানা ধরনের পাপে লিপ্ত হয়, কিন্তু এসব মানুষের অধিকাংশের মধ্যেই একটি কমন (Common) পাপ দেখা যায়। যে ব্যক্তি পাপে পূর্ণ জীবন যাপন করে, তার মাঝে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান। ওই ব্যক্তি কখনো সরল পথে ছিল, পরবর্তীতে সেখান থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথবা কখনোই সে সরল পথে ছিল না, যেটাই হোক না কেন, একটি বিষয় উভয় ক্ষেত্রে একই রকম। ওই ব্যক্তি সরল পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আগে সর্বপ্রথম সলাতকে পরিত্যাগ করে, হালকা হিসেবে গ্রহণ করে, অবহেলা করে কিংবা সলাতকে অবজ্ঞা করে।

কেউ যদি সলাত আদায় করে, তথাপি সে পাপাচারে পূর্ণ জীবন অব্যাহত রাখে, তাহলে সে সলাত শুধুই শারীরিক কিছু কাজই থেকে যাচ্ছে, তাতে প্রাণ বা আত্মা নেই। লক্ষ্য করবেন, সলাতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট রয়েছে, প্রায়শই যা উপেক্ষা করা হয়। আমাদের স্রষ্টার সাথে এক পবিত্র সাক্ষাতের পাশাপাশি সলাত সর্বাপেক্ষা বাস্তব এক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

আল্লাহ বলেন:
"তুমি পাঠ করো কিতাব হতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়ে এবং সলাত কায়েম করো। সলাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও খারাপ কাজ হতে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বোত্তম। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা জানেন।” (কুরআন, ২৯:৪৫)

যখন কেউ সলাত পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা একই সাথে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও বর্জন করে। এটা স্মরণে রাখা জরুরি যে, সলাত পরিত্যাগের এই অভ্যাস একদিনে হয় না, বরং তা তৈরি হয় ধাপে ধাপে। নির্ধারিত ওয়াক্ত থেকে দেরী করে সলাত আদায়ের মাধ্যমে তা শুরু হয়। এরপর এক সলাতের সাথে আরেক সলাত মিলিয়ে পড়া শুরু হয়। শীঘ্রই সলাত একেবারেই বাদ পড়তে শুরু করে। কোনো কিছু বুঝার আগেই, ওই ব্যক্তির জন্য সলাত পরিত্যাগ একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়।

এদিকে চোখে দেখা গেলেও এ সময় আরেকটি ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিটি দেরী করে আদায় করা সলাত বা প্রতিটি ছেড়ে দেওয়া সলাতের সাথে সাথে শুরু হয় এক অদৃশ্য লড়াই, শুরু হয় শয়তানের লড়াই। সলাত পরিত্যাগের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর দেওয়া সুরক্ষা বর্ম ফেলে দেয় এবং কোনো নিরাপত্তা বর্ম ছাড়াই তারা যুদ্ধে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে চলে যায়।

এই বাস্তবতা প্রসংগে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর যে দয়াময় আল্লাহর যিকির বা স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সেই হয় তার সাথি।” (কুরআন, ৪৩:৩৬)

অতএব, এ ব্যাপারে কারো অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সলাত পরিত্যাগ করাই হয় অধঃপতিত জীবনের সিঁড়ির প্রথম ধাপ। যারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের প্রয়োজন পেছনে ফিরে দেখা, ফিরে দেখা দরকার কোথা থেকে তাদের এই অধঃপতনের সূচনা হয়েছিল। তাহলে তারা দেখবে যে, এর শুরু হয়েছিল সলাত হতে (অর্থাৎ সলাতের প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলা থেকে)। একই কথা বিপরীত ক্ষেত্রেও সত্য। যারা নিজেদের জীবনকে পরিবর্তন করতে আগ্রহী, তাদের এ কাজও শুরু হয় সলাতের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং যথাযথ হক আদায় করে তা সম্পাদনে সচেষ্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে। যখন আপনি বিদ্যালয়, রিজিকের ধান্দা, বিনোদন, সামাজিক কর্মকাণ্ড, বাজার করা, টিভি দেখা, খেলাধুলা থেকে শুরু করে সবকিছুর ওপর সলাতকে প্রাধান্য দেবেন, কেবল তখনই আপনি পারবেন আপনার জীবনের গতিধারাকে সম্পূর্ণরূপে বদলাতে।

বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হচ্ছে, অনেক লোকই একথা মনে করে প্রতারিত হন যে, সলাত শুরুর আগে প্রথমে তার নিজের জীবনধারাকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে নিতে হবে। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা শয়তানের এক বড় ভয়ংকর কৌশল। কেননা, সে জানে, ওই ব্যক্তির জীবনধারাকে বদলে দেওয়ার চালিকাশক্তি ও দিক-নির্দেশনা দেবে সলাতই। এমন লোকের উপমা ওই গাড়ি চালকের মতো, যার গাড়িতে কোনো গ্যাস বা প্রেট্রোল নেই, কিন্তু কোনো রকম জ্বালানী সংগ্রহের আগে তার সফর শেষ করা জন্য জিদ করছে। ওই ব্যক্তি কোথাও যেতে পারবে না। একইভাবে উল্লিখিত মনোভাবের লোকেরা বছরের পর বছর একই অবস্থানে পড়ে থাকে। সলাত আদায় করে না, আর তার জীবনেরও কোনো পরিবর্তন হয় না। শয়তান তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং সে তাতে জয়ী হয়েছে।

এমনটি করার মাধ্যমে আমরা শয়তানকে আমাদের কাছে তা-ই চুরি করার সুযোগ দিই, যা অমূল্য। আমাদের ঘরবাড়ি এবং আমাদের গাড়ি আমাদের কাছে এতটাই মূল্যবান যে, আমরা সেগুলোকে কখনো অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখার চিন্তাও করি না। তাই সেগুলো সুরক্ষিত রাখার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আমরা শত শত ডলার খরচ করি। আর সেই আমরাই আবার নিজেদের দ্বীন [বা ধর্মকে] একেবারে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখি, যাতে করে সব থেকে নিকৃষ্ট চোর যাতে সেটা চুরি করতে পারে। সেই চোর যে আল্লাহর কাছে ওয়াদা করে এসেছে যে, কিয়ামত-তক সে আমাদের সাথে দুশমনীই করে যাবে। সে এমন চোর যে, কেবল মার্সিডিস চিহ্নিত, ধাতু নির্মিত কোনো বস্তুগত জিনিসই মাত্র (যেমন: গাড়ি) চুরি করছে না। বরং সে এমন এক চোর যে চুরি করছে আমাদের অনন্ত আত্মা এবং জান্নাতে যাওয়ার চিরস্থায়ী টিকেটখানি।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 একটি পবিত্র সংলাপ

📄 একটি পবিত্র সংলাপ


রাতের বেলায় একটি সময় আছে, গোটা দুনিয়া যখন রূপান্তরিত হয়। দিনের বেলায় নানা ঝুট ঝামেলা প্রায়শই আমাদের জীবনকে গ্রাস করে রাখে। কাজ- কর্মের দায়-দায়িত্ব, শিক্ষাঙ্গন এবং পরিবারের গুরু দায়িত্ব আমাদের মনোযোগের বড় একটা অংশ দখল করে নেয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়ের সময় ছাড়া চিন্তা, ভাবনা করা, এমনকি স্বস্তিতে দম ফেলার সময়টুকু বের করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের অনেকে এতো গতিময় জীবন কাটায় যে, জীবনে তারা কিসের অভাব বোধ করেন, সেটা পর্যন্ত ধরতে তারা অক্ষম।

তথাপি রাতের বেলায় একটি সময় থাকে, যখন কাজকর্ম শেষ হয়, যান চলাচল থেমে যায় এবং নিঃশব্দতা তখন একমাত্র আওয়াজ। ঠিক এই সময়টিতে গোটা দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এমন একজন আছেন, সদাজাগ্রত যিনি এবং অপেক্ষায় থাকেন, কখন আমরা তাঁকে আহ্বান করি। একটি হাদিসে কুদসিতে আমাদেরকে বলা হয়: "আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন: “কেউ কি আছো যে আমাকে ডাকবে, যাতে আমি তার ডাকে সাড়া দিতে পারি? কেউ কি আছো, আমার কাছে চাইবে, যাতে আমি তাকে দান করতে পারি? কেউ কি আছো, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যাতে আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি?” [বুখারি ও মুসলিম]

এটা কেবল কল্পনাই করা যায় যে, একজন রাজা আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়ে আমরা যাই চাই, তা দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এ অবস্থায় আমাদের আচরণ চিন্তা করুন। যে কেউই উপলব্ধি করবে যে, যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এমন একটা সাক্ষাতের জন্য অন্ততঃপক্ষে অ্যালার্ম দিয়ে রাখবে। আমাদেরকে যদি বলা হয়, ভোর হওয়ার ঠিক ঘন্টাখানেক বাড়ির দরজায় ১০,০০০,০০০ (এক কোটি) ডলারের একটি চেক আমাদের জন্য রাখা হবে, তবে আমরা কি সেটা সংগ্রহের জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হতাম না?

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, ভোর হওয়ার ঠিক আগে রাতের এই সময়টিতে তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী হন।

বিষয়টা একবার ভেবে দেখুন তো। গোটা বিশ্ব জাহানের প্রভু আমাদেরকে তাঁর সাথে কথোপকথনের জন্য আহ্বান করছেন। এই মহান প্রভু আমাদের সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করেন। অথচ আমাদের অনেকেই তাঁকে অপেক্ষায় রেখে নিজ নিজ বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে। আল্লাহ (স) আমাদের নিকটবর্তী হন এবং আমরা তাঁর কাছে কি চাই, তিনি তা জানতে চান। সবকিছুর স্রষ্টা আমাদেরকে বলেন যে, আমরা যাই চাই না কেন, তিনি আমাদেরকে তাই দেবেন। তা সত্ত্বেও আমরা ঘুমে বিভোড়। এমন একটি দিন আসবে, যখন প্রবঞ্চনার এই পর্দা সরে যাবে। কুরআন বলে: "[তাদেরকে বলা হবে], আজকের এই দিন সম্পর্কে তুমি উদাসীন ছিলে, আর এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, তাই আজকের এই দিনে তোমার দৃষ্টি প্রখর।” (কুরআন, ৫০:২২)

ওই দিনটিতে আমরা সত্যিকার বাস্তবতা দেখতে পাবো। ওই দিন আমরা ঠিকই উপলব্ধি করবো যে, দু'রাকাত সলাত আসমান ও জমিনের সবকিছু থেকে উত্তম ছিল। প্রতিরাতে আমরা যখন ঘুমে বিভোড়, তখন আমাদের বাড়ির দরজার সামনে যে অমূল্য চেক ফেলে রাখা হতো, ওই দিন আমরা ঠিকই এটা বুঝতে পারবো। এমন একটি দিন আসবে, যখন আমরা কেবল দুনিয়াতে ফেরৎ আসা এবং ওই দু'রাকাত সলাত আদায় করার জন্য আসমানের নিচে সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে রাজি থাকবো।

এমন একটি দিন আসবে, যখন আমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে ওই কথোপকথনের জন্য এই দুনিয়াতে নিজেদের ভালোবাসার সবকিছু, আমাদের অন্তর ও মনকে আচ্ছন্ন করা সবকিছু এবং প্রতিটি মরীচিকা, যার পেছনে আমরা হন্যে হয়ে ছুটেছি, সেগুলোর সবই আমরা ত্যাগ করতে চাইবো। ওই দিন, কিছু লোক থেকে আল্লাহ (স) তাঁর [দৃষ্টি] ফিরিয়ে নেবেন... এবং তাদেরকে ভুলে যাবেন, যেমনিভাবে একদিন তারাও আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। কুরআন বলে: “সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ করে ওঠালে? অথচ আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান? তিনি বলবেন, 'এই রকমই আমার নিদর্শনাবলী তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আর সেইভাবে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো।” (কুরআন, ২০:১২৫-১২৬)

অন্যদিকে সুরা আল-মুমিনুনে আল্লাহ বলেন:
"আজ আর্তনাদ করো না, নিশ্চয়ই আমার পক্ষ থেকে তোমরা কোনো সাহায্য পাবে না।” (কুরআন, ২৩:৬৫)

এক মুহুর্তের জন্য কি আপনি চিন্তা করতে পারেন, এ আয়াতগুলো কি বলছে? পুরাতন কোনো বন্ধু বা সহপাঠী আপনাকে ভুলে গেছে, এটা তেমন কোনো ব্যাপার নয়। এটা তো জগতসমূহের রব তথা প্রভু আপনাকে ভুলে গেছেন। না জাহান্নামের আগুন, না ফুটন্ত পানি, আর না দগ্ধ চামড়া কোনো কিছুই এই আযাবের থেকে ভয়াবহ হতে পারে না।

যেমনিভাবে এর থেকে ভয়াবহ আর কোনো শাস্তি হতে পারে না, ঠিক তেমনি নবি (ﷺ) থেকে নিম্নে উদ্ধৃত হাদিসে বর্ণিত পুরষ্কারের চেয়ে বড় কোনো পুরষ্কার হতে পারে না:
“জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে বলবেন, 'তোমরা কি চাও আমি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ বাড়িয়ে দিই?' তারা বলবে, 'আপনি কি আমাদের চেহারাগুলি আলোকজ্জ্বল করে দেননি, আমাদের জান্নাতে দাখিল করেননি এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত দেননি? রসুল (ﷺ) বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা পর্দা বা আবরণ তুলে নেবেন। আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা-এর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই তাদের দেওয়া হয়নি।" [সহিহ মুসলিম]”

তদপুরি, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-এর সাথে রাত্রিকালীন এই সাক্ষাতের ফল কেমন, সেটা জানার জন্য কাউকে ওই দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় কাটাতে হবে না। সত্য বলতে কি, এরূপ কথোপকথনের মাঝে কি যে অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি নিহিত রয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অনুভব করা ছাড়া একে উপলব্ধি করার অন্য কোনো পথ নেই। একজনের জীবনে এমন অনুভূতির প্রভাব সীমাহীন। শেষরাতে যদি আপনি কিয়াম তথা তাহাজ্জুদের স্বাদ নেন, দেখবেন আপনার বাকি জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে যাবে। হঠাৎ করেই, যে বোঝার ভার আপনাকে নুইয়ে দিতো, তা পরিণত হবে নুরে। যেসব সমস্যা সমাধান ছিল অসম্ভব, সেগুলির সমাধান হবে। আপনার স্রষ্টার সাথে যে নৈকট্য এক সময় ছিল কল্পনাতীত, তা-ই পরিণত হবে আপনার একমাত্র লাইফ লাইনে।**

টিকাঃ
*সহিহ মুসলিম: কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং- ৩৩৮, হাদিস একাডেমি প্রকাশিত।
** লাইফ লাইন: যার ওপর একজনের জীবন নির্ভর করে (সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 অন্ধকার সময় এবং আসন্ন প্রভাত

📄 অন্ধকার সময় এবং আসন্ন প্রভাত


একটি বিখ্যাত প্রবাদ অনুসারে, ভোরের পূর্ব মুহূর্তেই অন্ধকার সবচেয়ে গভীরতম হয়। জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে যদিও রাতের সবচেয়ে গভীর বিন্দু আরও আগেই হয়ে থাকে, তথাপি এই প্রবাদের সত্যতা রূপকধর্মী, আর কোনোভাবেই তা বাস্তব অবস্থা থেকে কিছুমাত্র কম নয়।

অনেক সময়ই, আমাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের পর পরই আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ের সাক্ষাত লাভ করি। প্রায়শই, এ রকম এক সময়, যখন সবকিছুই বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত মনে হয়, তখন সবচেয়ে কম প্রত্যাশার বিষয়ই আমাদের টেনে তোলে এবং এই কঠিন সময় পাড়ি দিতে আমাদের সাহায্য করে। নবি আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম) কি প্রথমে একে একে সব হারালেন না, অতঃপর তাকে আবার সব ফিরিয়ে দেওয়া হল, বরং আরও অধিক দেওয়া হলো?

হ্যাঁ, নবি আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম)-এর জন্য ওই আঁধার ঘন রাত্রি সত্য ছিল। আমাদের অনেকের নিকট এই আঁধার ঘন রাত্রির যেন কোনো শেষ নেই। কিন্তু আল্লাহ কখনো রাত্রিকে চিরকালের জন্য দীর্ঘায়িত করেন না। তাঁর অপার করুণাতে তিনি আমাদেরকে সূর্যের আলো দিয়ে ধন্য করেন। তথাপি এমনও সময় যায়, যখন আমাদের মনে হয়, এই কষ্ট ও দুর্ভোগের বুঝি আর শেষ নেই। আর আমাদের অনেকেই দীনি দৃষ্টিকোণ থেকে এতটাই রুহানি বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত যে, আমরা নিজেদেরকে স্রষ্টার কাছ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করি। আমাদের অনেকেই আবার এতটাই (রুহানি) অন্ধকারে ডুবে আছে যে, তারা এটা উপলব্ধিই করতে পারে না।

কিন্তু রাতের শেষে যেমনিভাবে সূর্য উদিত হয় হয়, তেমনিভাবে আমাদের প্রভাতও এসে গেছে। আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় রাত্রির নিকষ কালো অন্ধকার মুছে দেওয়ার জন্য রমজানের আলো প্রেরণ করেছেন। তিনি দান করেছেন কুরআনের মাস, যাতে করে তিনি আমাদের (রুহানি) অবস্থা উন্নত করতে পারেন এবং আমাদেরকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে তাঁর সান্নিধ্যে নিতে পারেন। আমাদের মাঝে বিরাজমান শূন্যতা পূরণের জন্য, আমাদের নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর জন্য এবং আমাদের রুহানি দারিদ্যের সমাপ্তি টানার জন্য তিনি এই বরকতময় মাস আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। আমাদের নিকট তিনি পাঠিয়েছেন প্রভাতের আলো, যাতে করে আঁধার থেকে মুক্ত হয়ে আমরা আলোর খোঁজ পেতে পারি। আল্লাহ বলেন:
"তিনিই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং ফেরেশতাগণও তোমাদের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোতে আনার জন্য, আর তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।”
هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَا بِكَتُهُ ८ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا (কুরআন, ৩৩:৪৩)

যারাই এই রহমতের প্রত্যাশী তাদের সবার জন্যই আল্লাহ তা'আলার এই রহমত প্রসারিত। এমনকি ভয়ানক পাপীকেও আল্লাহর অসীম করুণা থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে বলেন"
"বলো: হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের আত্মার প্রতি যুলুম করেছো, তারা আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা, আল্লাহ সকল পাপ মোচন করে দিবেন। তিনিই অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” ج قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (কুরআন, ৩৯:৫৩)

করুণা ও ক্ষমার মালিক আল্লাহ। বরকতময় রমজান ছাড়া এমন কোনো সময় নেই, যখন আমাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা অপার করুণা এতো অধিক পরিমাণে বর্ষিত হয়। রমজান প্রসঙ্গে নবি (ﷺ) বলেন:

রোজাকে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করবেন না:
নবি (ﷺ) বলেন:
“(রোজা রেখে) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং খারাপ কাজ বর্জন করলো না, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [বুখারি]

নবি (ﷺ) আমাদেরকে এই বলে সতর্ক করেছেন:
"বহু লোকই ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হওয়া ছাড়া রোজা থেকে কিছু হাসিল করে না এবং অনেক লোকই রাতের বেলাতে [সলাতে] দণ্ডায়মান হয়, কিন্তু রাত্রি জাগরণ ছাড়া সে আর কিছুই পায় না।” [দারিমি]

রোজা অবস্থায় গোটা দৃশ্যপটটি উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, রোজা মানে কেবল খানা-পিনা থেকে দূরে থাকা নয়। রোজা তো রাখা হয় আরও উত্তম মানুষে পরিণত হওয়ার জন্য।

এই প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য হতে বিচ্ছিন্ন থাকার অন্ধকার হতে বের হয়ে আসার সুযোগ প্রদান করা হয়। তবে দিন শেষে যেমন সূর্য অস্ত যায়, ঠিক তেমনি রমজান আসবে আবার চলে যাবে, কিন্তু আপনার আমার হৃদয়ে সে তার নিশানী রেখে যাবে।

টিকাঃ
৪০ বুখারি, তাওহিদ প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত, কিতাবুস সওম, হাদিস নং: ১৯০৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00