📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক

📄 সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক


গড়ার উদ্দেশ্যেই তিনি আপনাকে ভাঙেন। দেওয়ার জন্যই তিনি আপনাকে রাখেন বঞ্চিত। এই জীবনের জন্য আকুল না হয়ে আপনি যেন জান্নাতের জন্য ব্যাকুল হন, সেজন্যই তিনি আপনার অন্তরে সৃষ্টি করেছেন বিরহ ও বেদনা।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 স্রষ্টার সন্ধানে

📄 স্রষ্টার সন্ধানে


আমার গোটা জীবন আমি স্রষ্টার সন্ধানে ব্যয় করেছি। কিন্তু আমি নিজে তা বুঝতেই পারিনি।

[আমাদের] জীবনে, সম্পর্ক ও সাথির মাঝে, সকল কিছুর মাঝে যে জিনিসগুলো আমরা সবাই খুঁজে ফিরি, আমরা যদি সেগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখি, তবে আমরা দেখতে পাবো, আস্তিক-নাস্তিক সবাই আসলে স্রষ্টাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। গভীরভাবে ভেবে দেখলে উপলব্ধি করবেন স্রষ্টাই সকল কিছুর রূপকার, নকশাকার। আপনি আস্তিক হন বা নাস্তিক, স্রষ্টাই আপনার চাহিদা, আপনার আকর্ষণ, আপনার বাসনা সবকিছুর রূপকার। বস্তুত প্রাকৃতিক বিন্যাসকে সচল রাখতেই অন্তরের মাঝে স্রষ্টা এসব অনুঘটকের জন্ম দিয়েছেন। ওই প্রাকৃতিক বিন্যাসই: তাওহিদ (এক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীকে অন্বেষণ করা, তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা)।

আমি এবং আপনি যেসব জিনিস চাই, এক মুহূর্তের জন্য তা নিয়ে একটু ভাবুন তো। উদাহরণস্বরূপ, একজন সাথির মাঝে আমরা কি দেখতে চাই? (তাদের মাঝে) কোন জিনিসটি পাওয়ার আশায় ছুটছি? আর কোন কথাটুকু শোনার জন্য আমরা সবকিছু দিতেও রাজি?

"আমি তোমার (ভালোমন্দের) দিকে খেয়াল রাখছি।”
"সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"আমি তোমাকে ভালোবাসি, সবসময়। আর ওই ভালোবাসা কখনো শেষ হয়েও যাবে না, বদলেও যাবে না।”
"তুমি আমার ওপর ভরসা করতে পারো।”
"আমি তোমাকে কখনো হতাশ করবো না।”
"আমি তোমাকে কখনো দুঃখ দেবো না।”
"আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবো না।”

“(বিপদে-আপদে) সর্বদা আমাকে তুমি সাথে পাবে।"
"আমি তোমার কদর করি।"
"আমি তোমাকে (তোমার চিন্তা-ভাবনা ও সমস্যাকে) উপলব্ধি করি।"
"আমি তোমাকে বুঝতে পারি।"
"তুমি কে, সেটা আমি জানি।"
"আমি তোমার অতি নিকটে।"
"আমি তোমাকে মার্জনা করবো।"
"তোমাকে নিখুঁত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।"
"আমি কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না।"
"আমি কখনো তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো না।"
“তোমার অসতর্কতায় তোমার কোনো বিপদ না হয়, সেদিকে আমি নজর রাখছি।"
"আমি এটা (অর্থাৎ কোনো ঝামেলা বা মুসিবতের) দেখছি।"
"আমি তোমার কথা শুনছি। সত্য-সত্যই মনোযোগ দিয়েই শুনছি।"
"তাদেরকে আমি তোমাকে আঘাত করতে বা কষ্ট দিতে দেবো না।"
"সর্বদা আমি তোমায় রক্ষা করবো।"
"আমি কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না।"
"তুমি কখনো একা নও।"
"কখনো আমি তোমায় একা রেখে যাবো না।"
“তোমার আশেপাশে সবকিছু যখন একে একে ঝড়ে পড়বে, তখনও আমি তোমায় আগলে রাখবো।"
“তোমার জন্য যা সবচেয়ে ভালো, আমি তোমার জন্য কেবল সেটাই চাই।"
"যখন তুমি কেবল ভুলই করছো, তখনো আমি শুধু তোমায় ক্ষমা করবো।"

"তুমি প্রতিদান দিতে অক্ষম হলেও আমি সব সময় তোমায় শুধু দিয়েই যাবো।"
"যখন তুমি আমার বিরোধিতা করছো, তখনও আমি তোমার প্রতি দয়া করে যাবো। আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না।"
"যাই করো না কেন, আমি তোমাকে সব সময় ক্ষমা করতে সক্ষম।"
"দুর্বলতা ও দোষ সত্ত্বেও আমি তোমাকে ভালোবাসি।"
"আমি তোমাকে দেবো শান্তি ও স্বস্তি।"
"আমি তোমাকে খুশি করে দেবো।"
"আমিই তোমাকে দেবো দৃঢ়তা।"
"আমিই তোমায় দেবো শক্তি ও সাহস।"
"আমিই তোমাকে সারিয়ে তুলবো।"
"আমিই তোমাকে দেবো সম্মান ও প্রতিপত্তি।"
"সর্বদা আমি তোমাকে স্বস্তি দিয়ে যাবো।"
"আমার জন্য তুমি যত সামান্য কিছুই করো না কেন, আমি সেটার কদর করবো এবং তোমাকে সেটার প্রতিদান দেবো।"
"যত যা কিছুই ঘটুক, যখনই তুমি আমার দিকে ফিরবে, আমাকে তোমার জন্য সেখানে উপস্থিত পাবে।"
"আমার বিপক্ষে তুমি যা-ই করো না কেন, আমি তোমাকে সব সময়ই ক্ষমা করতে সক্ষম।"

বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা যখন ভাবছি যে, আমরা একজন ভালো স্বামী কিংবা একজন ভালো স্ত্রী খুঁজছিলাম, অথবা খুঁজছিলাম একটা ভালো চাকুরি কিংবা রাশি রাশি অর্থ বা সম্মান, তখন আমরা সত্যিকার অর্থে আসলে স্রষ্টাকেই খুঁজছিলাম। ফলশ্রুতিতে ওই স্বামী, ওই স্ত্রী, ওই চাকুরি, ওই অর্থ অথবা ওই সম্মান যখন আমাদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ, তখন আমাদের হতাশ হওয়াতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

এমনকি এই শূন্যতা সৃষ্টির পেছনেও উদ্দেশ্য আছে। সে শূন্যতা পূরণের জন্য আমাদের ধাবিত করার জন্য। সমস্যা হচ্ছে, আমরা একে ভুল জিনিস দিয়ে পূর্ণ করি। করতে চাই। আমাদের মাঝে যা কিছু আছে, তার সবকিছুকে সৃষ্টি করা হয়েছে। শূন্যতা পূরণের এই যাত্রায় সত্যিকারের পূর্ণতাকে খুঁজে পেতে, খুঁজে পেতে আল্লাহকে। এমনকি শয়তান ও নফসকেও স্রষ্টার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে যদি এদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ যথাযথ হয়। শয়তান ও নফস আমাদের শত্রু, এতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: নিজেদেরকে আমরা কিভাবে এদের থেকে নিরাপদ রাখবো? মানুষেরা কি এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারে? অর্থবিত্ত পারবে সহায়তা করতে? দুনিয়াবি ক্ষমতা বা অস্ত্র কি পারবে আমাদেরকে এসব চরম শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে? কোথায় পাবো সেই 'একমাত্র' আশ্রয়স্থল, যেখানে আমরা শয়তান এবং নিজেদের নফস থেকে নিরাপদ? আল্লাহই সেই আশ্রয়স্থল। আসলে এসব (অর্থাৎ এই সব শূন্যতা, শয়তান ও নফসের বিরোধিতা, বিপদ-মুসিবত) কিছুর উপমা সেই ঝড়ের মতো, যাকে পাঠানো হয় আমাদেরকে একমাত্র আশ্রয়ের দিকে ধাবিত করে আনবে। আমাদের তাড়িয়ে আনবে সেই মহান সত্তা আল্লাহ (আয্যা ওয়া জালের) দিকে।

এমনকি আপনার পাপও আপনাকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করার মাধ্যমে পরিণত হতে পারে। কেননা, [তিনি ছাড়া আর কে আছে, যিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন? নিজের পাপের বিপর্যয় ও বিভীষিকা হতে বাঁচার জন্য [তিনি ছাড়া] আর কার কাছে আপনি আশ্রয় নেবেন? [তিনি ছাড়া] এমন কেউ কি আছে, যিনি আপনার পাপগুলির যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বা সেগুলো মুছে দিতে, এমনকি সেগুলোকে পুণ্যে রূপান্তরিত করতে সক্ষম?

আপনার ভয়ও হতে পারে স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম। যখন আপনি ভয় পান, তখন (আল্লাহ ছাড়া আর) কে আপনাকে রক্ষা করতে সক্ষম? যখন আপনি অসহায় ও নিরুপায় হয়ে মাঝ দরিয়ায় আটক, তখন আর কে আপনাকে দিতে পারে স্বস্তি ও নিরাপত্তা? যখন আপনি দারিদ্রে নিপতিত, তখন আর কে আছে যে আপনাকে রিযকের যোগান দিতে পারে? যখন আপনি কঠিন শোকে নিমজ্জিত, তখন কে আছে এমন যে আপনাকে টেনে তুলে? যখন আপনি ভেঙে পড়েন, তখন আর কে পারে আপনার চূর্ণ-বিচূর্ণ অন্তর আর জীবনকে সারিয়ে তুলতে? কে আছে এমন যে মৃতের মাঝে সঞ্চার করতে পারে জীবনের আলো? আপনাকে দিতে পারে আরোগ্য, এমন কে আছে? আর কে পারে আপনাকে রক্ষা করতে? যখন আপনি পথহারা, তখন আর কে আছে যে আপনাকে পথের দিশা দিতে সক্ষম?

তিনি (অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলা) ছাড়া আর কে?

আপনি ভেবেছিলেন ঝড়-ঝাপটা, উত্তাল সমুদ্র, ভয়, দুঃখ-বিরহ, ভুলভ্রান্তি, হারানোর বেদনা, হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ এ সবকিছুই আপনার জন্য অমঙ্গলজনক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে: এ সবগুলোই এক একটি মাধ্যম মাত্র। এগুলো সবই স্রষ্টার নৈকট্য লাভের একটি বাহন মাত্র। এগুলো আপনাকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে নেয়। এগুলো আপনাকে পূর্ণতা, সুখ ও নতুন জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে। এগুলো আপনাকে যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, সেখানেই (অর্থাৎ মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে) ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। আপনি মনের গহীনে আসলেই যা খুঁজছিলেন, তার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য।

ফিরিয়ে আনার জন্য আপনাকে সেই মহান সত্তা রব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যে।

টিকাঃ
** এজন্যই আমরা বলি- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন (সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সালাত: জীবনের ভুলে যাওয়া উদ্দেশ্য

📄 সালাত: জীবনের ভুলে যাওয়া উদ্দেশ্য


সময়ের পরিক্রমায় মানুষ অনেক সফরই করেছে। কিন্তু একটা সফর এমন, যা দুনিয়ার কেউই করেনি।

কেউই না, তবে একজন ছাড়া।

এমন এক বাহনে করে তিনি সেই ভ্রমণ করেছেন, যাতে কোনো মানুষ কখনো চড়েনি। এমন এক পথে যে পথ কোনো মানবাত্মা কখনো দেখেনি। এমন এক স্থানের উদ্দেশ্যে, যেখানে কোনো সৃষ্টি পা রাখেনি। এটা ছিল একজন মানুষের সফর, মহান স্রষ্টার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। এটা ছিল আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ (ﷺ)-এর সর্বোচ্চ আসমানে গমনের সফর।

এটা ছিল 'আল-ইসরা ওয়াল মিরাজ' (মহিমান্বিত যাত্রা)।

এই সফরে আল্লাহ তাঁর হাবিব রসুল (ﷺ)-কে সপ্ত আসমানে নিয়ে যান, যেখানে জিব্রাইল ফেরেশতারও প্রবেশের অনুমতি নেই। দুনিয়াতে নবি (ﷺ)-এর মিশনে প্রতিটি দিক-নির্দেশনা, প্রতিটি আদেশ পাঠানো হতো ফেরেশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে। কিন্তু একটি আদেশ ছিল এর থেকে ব্যতিক্রম। একটি আদেশ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, ফেরেশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে তা প্রেরণের বদলে আল্লাহ পাক স্বয়ং নবি (ﷺ)-কে নিজের কাছে তুলে নেন।

এ হুকুমটা ছিল সলাত বা নামাজের। নবি (ﷺ)-কে সলাতের প্রথম যে আদেশ দেওয়া হয়, তা ছিল দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্তের। নবি (ﷺ) আল্লাহর কাছে তা সহজ করার আর্জি পেশ করায়, এই আদেশকে পঞ্চাশ থেকে কমিয়ে তিনি পাঁচে নির্ধারণ করেন, তবে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব ঠিকই বহাল রাখেন।

এই ঘটনার পর্যালোচনা করে ইসলামি চিন্তাবিদগণ বলেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে সলাতকে পাঁচ ওয়াক্তে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়া উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিল এবং আমাদের জীবনে সলাতের প্রকৃত গুরুত্ব ও অবস্থান তুলে ধরতেই এমনটি করা হয়েছে। সত্যি সত্যি দিনে পঞ্চাশ বার সলাত আদায়ের দৃশ্যটি একবার কল্পনা করুন। সলাত আদায় ছাড়া আমরা কি অন্য কিছু করতে পারতাম? উত্তর হলো: না।

আর সেটাই হলো আসল কথা (যেদিকে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই)। আমাদের জীবনের সত্যিকার উদ্দেশ্য তুলে ধরার জন্য এর চেয়ে উত্তম কোনো পন্থা আছে কি? প্রকারান্তরে যেন একথাই বলা হচ্ছে: সলাতই আমাদের প্রকৃত জীবন, আর বাদবাকি যা দিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে পূর্ণ করি, সেসবই কেবল আনুষঙ্গিক।

তা সত্ত্বেও আমরা ঠিক এর বিপরীত তরিকায় জীবন যাপন করি। সলাত তো এমন জিনিস, যা খুব কষ্টে-সৃষ্টে আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত করি; যখন সময় পাই – যদি তা পাই। আমাদের জীবন সলাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় না; বরং সলাতই আমাদের 'জীবনের' আশেপাশে ঘুরপাক খায়। যদি আমরা শ্রেণিকক্ষে থাকি, তবে সলাতের চিন্তা মাথায়ই আসে না – আসলেও ঘটনাচক্রে। যদি শপিংমলে থাকি, তবে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের মূল্যছাড়ের চিন্তাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। [সামান্য] বাস্কেটবল (অথবা ফুটবল বা ক্রিকেট) খেলা দেখার জন্য আমরা যদি নিজেদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে (অর্থাৎ মাথাকেই) ভুলে যাই তখন বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও মারাত্মক রকমের সমস্যা রয়েছে।

এতো তো গেল তাদের কথা, যারা কোনো রকম সলাত আদায় করেন। কিন্তু এমনও মানুষ আছে, যারা নিজেদের জীবনের এই উদ্দেশ্য (তথা সলাতকে) কেবল দূরেই নিক্ষেপ করেনি, বরং একে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেছে। অথচ সলাত পরিত্যাগ করার বিষয়ে যে কথাটি আমরা বিবেচনার না, তা হলো: যিনা বা ব্যাভিচার করলে কেউ কাফির হয়ে যায়, এই মত কোনো ইসলামি চিন্তাবিদ কখনো পোষণ করেননি। চুরি করলে, মদ পান করলে বা মাদক গ্রহণ করলে কেউ কাফিরে পরিণত হবে, এমন মত কখনো কোনো ইসলামি স্কলার পোষণ করেননি। খুন করলে কেউ অমুসলিম হয়ে যায়, কোনো আলেম কখনো এরকম দাবি করেননি। কিন্তু সলাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে কিছু আলেমের মত হলো, সে আর মুসলিম থাকে না। নিম্নের হাদিসটির মতো কিছু হাদিসের ওপর ভিত্তি করে এ মতটি প্রতিষ্ঠিত:
"সলাতই আমাদের ও কাফিরদের মাঝে পার্থক্য রেখা। তাই যে এটা পরিত্যাগ করে, সে কাফিরে পরিণত হয়।” [আহমদ]”

একটা কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে নবি (ﷺ) সেটার ব্যাপারে এ ধরনের ভাষা প্রয়োগ করেন। শয়তান কি অপরাধ করেছিল, সেটা একবার ভাবুন তো। সে তো আল্লাহকে মানতে অস্বীকার করেনি। সে তো শুধু একটি সেজদা দিতেই অস্বীকার করেছিল। তাহলে ভেবে দেখুন তো, আমরা যে হাজারো সেজদা দিতে অস্বীকৃতি জানাই, তার কি পরিণতি হবে।

এই অস্বীকৃতির ভয়াবহতা একবার কল্পনা করুন। তারপরও চিন্তা করে দেখুন আমরা সলাতের বিষয়টি কত হালকাভাবেই না গ্রহণ করি। বিচার দিবসে প্রথম যে জিনিস সম্পর্কে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তা হচ্ছে: সলাত, তথাপি সলাত আমাদের কাছে সর্বশেষ বিবেচ্য বিষয়। নবি (ﷺ) বলেন:
"পুনরুত্থান দিবসে বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম সলাতের হিসাব নেওয়া হবে। যদি ঠিক মতো সলাত আদায় হয়ে থাকে, তবে সে সাফল্য ও নাজাত লাভ করবে। কিন্তু এতে যদি তার ঘাটতি থাকে তবে সে ব্যর্থ হবে এবং সে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে শামিল হবে।” [তিরমিযি, হাদিস নং ২৪৯]

ওই দিন জান্নাতবাসীগণ জাহান্নামীদের প্রশ্ন করবেন, কেন তারা এ আগুনে প্রবেশ করেছে। আর কুরআন আমাদের জানিয়ে দিয়েছে তাদের সর্বপ্রথম জবাব কি হবে: "কিসে তোমাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবে: আমরা সলাত আদায়কারী ছিলাম না।” (কুরআন, ৭৪:৪২-৪৩)

আমাদের মাঝে কতজন ওইসব লোকের মধ্যে শামিল হবে, যারা বলবে, "আমরা সলাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না অথবা আমরা ঠিক সময়ে সলাত আদায়কারীদের মধ্যে ছিলাম না অথবা আমরা ওইসব লোকের দলে শামিল নই, যারা সলাতকে তাদের জীবনের সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিতো?" ব্যাপারটা কেমন, আমরা যদি ক্লাসে থাকি কিংবা কর্মক্ষেত্রে অথবা ফজরের সময়ে অসারের মতো ঘুমিয়ে থাকি, তথাপি আমাদেরকে শৌচাগার [বা ওয়াশরুমে] যাওয়ার প্রয়োজন হলে, তার জন্য আমরা ঠিকই সময় বের করে ফেলি? আসলে এই প্রশ্নটি অবান্তর শুনায়। এর জন্য সময় বের না করার বিষয়টি আমরা বিবেচনাই করতে পারি না। এমনকি জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাতে অংশ নেওয়ার সময়ও যখনই (টয়লেটে) যাবার সময় হয়, তখন তাতে আমরা যাবোই। কেন? কারণ তাতে সাড়া না দেওয়ার অবশ্যম্ভাবী লজ্জাকর ও যন্ত্রণাদায়ক পরিণতিই একে একটা অনৈচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করে।

এমন বহু মানুষ আছেন, যারা বলেন, যখন তারা কর্মক্ষেত্রে বা বিদ্যালয়ে কিংবা ঘরের বাহিরে থাকেন, তখন সলাত আদায় করার সময় তারা পান না। কিন্তু আমাদের মাঝে ক'জন কখনো এই কথা বলেছেন যে, যখন তারা বাহিরে থাকেন অথবা কাজে থাকেন অথবা বিদ্যালয়ে থাকেন, তখন শৌচাগারে যাওয়ার সময় তাদের থাকে না, তাই তারা ডাইপার পরাই পছন্দ করেন (এবং তাতেই তাদের প্রয়োজন সারেন)? ক'জন আছেন, যারা ফজরের সময় ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও ঘুম ভেঙে উঠতে চাই না, বরং তার বদলে বিছানা নষ্ট করতে পছন্দ করি? বাস্তবতা হচ্ছে, বিছানা ছেড়ে আমরা সবাই উঠি অথবা শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করি অথবা কাজ রেখে ঠিকই আমরা শৌচাগারে যেতে পারলেও [দুঃখজনকভাবে] আমরা সলাত আদায়ের জন্য সময় করতে পারি না।

বিষয়টা হাস্যকর শুনালেও, বাস্তবতা হচ্ছে আমরা আমাদের দেহের বা শরীরী চাহিদাকে আমরা নিজেদের আত্মার চাহিদার উপরে স্থান দেই। আমরা আমাদের শরীরকে খাওয়াই। কেননা, এমনটি না করলে আমরা মারা পড়বো। কিন্তু আমাদের মাঝে এমন বহু লোক আছে, যারা আত্মাকে অনাহারে রাখে এবং এ কথা একেবারে ভুলে যায় যে, সলাত আদায় না করলে, আমাদের আত্মার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, আমাদের এত যত্নের এই শরীরের স্থায়িত্ব নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, অন্যদিকে আমাদের অবহেলার পাত্র আমাদের আত্মা, যার স্থায়িত্ব চিরকালের।

টিকাঃ
- (সম্পাদক)।
* নিম্নের হাদিসটি এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য: "বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো: সলাত পরিত্যাগ করা।" (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান ১ম খণ্ড, হাদিস নং: ১৪৯, হাদিস একাডেমী প্রকাশিত)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সালাত এবং নিকটতম ছুরি

📄 সালাত এবং নিকটতম ছুরি


সত্য-সঠিক পথ খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, পাওয়ার পর তা হারিয়ে ফেলা। বিচ্যুত হওয়ার অসংখ্য পথ রয়েছে, নিজের দ্বীন [বা ধর্ম] থেকে বিচ্যুত হওয়ার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না। কখনো কোনো বোন তার হিজাব খুলে ফেলে ভিন্ন ধরনের জীবন বেছে নেয়, আবার কখনো কোনো ভাই, যে সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশ সক্রিয় ছিল, সে ভুল লোকদের পাল্লায় পড়ে। কিন্তু এরকম প্রতিটি গল্পেই সর্বোপরি কোনো না কোনোভাবে, কোথাও না কোথাও আমাদের ভাই ও বোনেরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে বহু দূরে চলে যান।

দুঃখজনক হলেও এই গল্পগুলো একেবারেই বিরল নয়। কখনো কখনো তাদের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে এই প্রশ্ন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না যে, কেন এমন হলো? কিভাবে হলো? একথা ভেবে আমাদের অবাক লাগে যে, কিভাবে এরকম একটা মানুষ, যে দ্বীনের ওপর এতো মজবুত ছিল, সে আজ সেখান থেকে এতো দূরে সরে যেতে পারলো।

এ নিয়ে অবাক হওয়ার সময় প্রায়শই আমরা বুঝে উঠতে পারি না যে, আমাদের ভাবনার চেয়েও এসব প্রশ্নের উত্তর বেশ সহজ ও সরল। মানুষ নানা ধরনের পাপে লিপ্ত হয়, কিন্তু এসব মানুষের অধিকাংশের মধ্যেই একটি কমন (Common) পাপ দেখা যায়। যে ব্যক্তি পাপে পূর্ণ জীবন যাপন করে, তার মাঝে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান। ওই ব্যক্তি কখনো সরল পথে ছিল, পরবর্তীতে সেখান থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথবা কখনোই সে সরল পথে ছিল না, যেটাই হোক না কেন, একটি বিষয় উভয় ক্ষেত্রে একই রকম। ওই ব্যক্তি সরল পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আগে সর্বপ্রথম সলাতকে পরিত্যাগ করে, হালকা হিসেবে গ্রহণ করে, অবহেলা করে কিংবা সলাতকে অবজ্ঞা করে।

কেউ যদি সলাত আদায় করে, তথাপি সে পাপাচারে পূর্ণ জীবন অব্যাহত রাখে, তাহলে সে সলাত শুধুই শারীরিক কিছু কাজই থেকে যাচ্ছে, তাতে প্রাণ বা আত্মা নেই। লক্ষ্য করবেন, সলাতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট রয়েছে, প্রায়শই যা উপেক্ষা করা হয়। আমাদের স্রষ্টার সাথে এক পবিত্র সাক্ষাতের পাশাপাশি সলাত সর্বাপেক্ষা বাস্তব এক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

আল্লাহ বলেন:
"তুমি পাঠ করো কিতাব হতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়ে এবং সলাত কায়েম করো। সলাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও খারাপ কাজ হতে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বোত্তম। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা জানেন।” (কুরআন, ২৯:৪৫)

যখন কেউ সলাত পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা একই সাথে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও বর্জন করে। এটা স্মরণে রাখা জরুরি যে, সলাত পরিত্যাগের এই অভ্যাস একদিনে হয় না, বরং তা তৈরি হয় ধাপে ধাপে। নির্ধারিত ওয়াক্ত থেকে দেরী করে সলাত আদায়ের মাধ্যমে তা শুরু হয়। এরপর এক সলাতের সাথে আরেক সলাত মিলিয়ে পড়া শুরু হয়। শীঘ্রই সলাত একেবারেই বাদ পড়তে শুরু করে। কোনো কিছু বুঝার আগেই, ওই ব্যক্তির জন্য সলাত পরিত্যাগ একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়।

এদিকে চোখে দেখা গেলেও এ সময় আরেকটি ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিটি দেরী করে আদায় করা সলাত বা প্রতিটি ছেড়ে দেওয়া সলাতের সাথে সাথে শুরু হয় এক অদৃশ্য লড়াই, শুরু হয় শয়তানের লড়াই। সলাত পরিত্যাগের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর দেওয়া সুরক্ষা বর্ম ফেলে দেয় এবং কোনো নিরাপত্তা বর্ম ছাড়াই তারা যুদ্ধে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে চলে যায়।

এই বাস্তবতা প্রসংগে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর যে দয়াময় আল্লাহর যিকির বা স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সেই হয় তার সাথি।” (কুরআন, ৪৩:৩৬)

অতএব, এ ব্যাপারে কারো অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সলাত পরিত্যাগ করাই হয় অধঃপতিত জীবনের সিঁড়ির প্রথম ধাপ। যারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের প্রয়োজন পেছনে ফিরে দেখা, ফিরে দেখা দরকার কোথা থেকে তাদের এই অধঃপতনের সূচনা হয়েছিল। তাহলে তারা দেখবে যে, এর শুরু হয়েছিল সলাত হতে (অর্থাৎ সলাতের প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলা থেকে)। একই কথা বিপরীত ক্ষেত্রেও সত্য। যারা নিজেদের জীবনকে পরিবর্তন করতে আগ্রহী, তাদের এ কাজও শুরু হয় সলাতের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং যথাযথ হক আদায় করে তা সম্পাদনে সচেষ্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে। যখন আপনি বিদ্যালয়, রিজিকের ধান্দা, বিনোদন, সামাজিক কর্মকাণ্ড, বাজার করা, টিভি দেখা, খেলাধুলা থেকে শুরু করে সবকিছুর ওপর সলাতকে প্রাধান্য দেবেন, কেবল তখনই আপনি পারবেন আপনার জীবনের গতিধারাকে সম্পূর্ণরূপে বদলাতে।

বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হচ্ছে, অনেক লোকই একথা মনে করে প্রতারিত হন যে, সলাত শুরুর আগে প্রথমে তার নিজের জীবনধারাকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে নিতে হবে। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা শয়তানের এক বড় ভয়ংকর কৌশল। কেননা, সে জানে, ওই ব্যক্তির জীবনধারাকে বদলে দেওয়ার চালিকাশক্তি ও দিক-নির্দেশনা দেবে সলাতই। এমন লোকের উপমা ওই গাড়ি চালকের মতো, যার গাড়িতে কোনো গ্যাস বা প্রেট্রোল নেই, কিন্তু কোনো রকম জ্বালানী সংগ্রহের আগে তার সফর শেষ করা জন্য জিদ করছে। ওই ব্যক্তি কোথাও যেতে পারবে না। একইভাবে উল্লিখিত মনোভাবের লোকেরা বছরের পর বছর একই অবস্থানে পড়ে থাকে। সলাত আদায় করে না, আর তার জীবনেরও কোনো পরিবর্তন হয় না। শয়তান তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং সে তাতে জয়ী হয়েছে।

এমনটি করার মাধ্যমে আমরা শয়তানকে আমাদের কাছে তা-ই চুরি করার সুযোগ দিই, যা অমূল্য। আমাদের ঘরবাড়ি এবং আমাদের গাড়ি আমাদের কাছে এতটাই মূল্যবান যে, আমরা সেগুলোকে কখনো অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখার চিন্তাও করি না। তাই সেগুলো সুরক্ষিত রাখার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আমরা শত শত ডলার খরচ করি। আর সেই আমরাই আবার নিজেদের দ্বীন [বা ধর্মকে] একেবারে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখি, যাতে করে সব থেকে নিকৃষ্ট চোর যাতে সেটা চুরি করতে পারে। সেই চোর যে আল্লাহর কাছে ওয়াদা করে এসেছে যে, কিয়ামত-তক সে আমাদের সাথে দুশমনীই করে যাবে। সে এমন চোর যে, কেবল মার্সিডিস চিহ্নিত, ধাতু নির্মিত কোনো বস্তুগত জিনিসই মাত্র (যেমন: গাড়ি) চুরি করছে না। বরং সে এমন এক চোর যে চুরি করছে আমাদের অনন্ত আত্মা এবং জান্নাতে যাওয়ার চিরস্থায়ী টিকেটখানি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00