📄 কষ্ট ও দুর্ভোগের প্রতি এক ঈমানদারের প্রতিক্রিয়া
মুসলিমদের জন্য সময়টা এখন দুর্যোগের। কখনো কখনো তো হতাশা না হওয়াটা কষ্টকর। আমাদের অনেকেই অবাক হন, কেন আমাদের সাথে এমন হচ্ছে? আমরা কোনো অন্যায় না করা সত্ত্বেও আমাদের সাথে কিভাবে এসব হচ্ছে? যে দেশটি প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে সকলের জন্য “স্বাধীনতা”, “মুক্তি” ও “ন্যায়বিচারের” অঙ্গীকার নিয়ে, সেখানে আমরা কিভাবে এতোটা বৈষম্যের শিকার হই?
এ ধরনের চিন্তা স্বাভাবিক হলেও এসব কিছুকে ছাড়িয়ে আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। কিছু সময়ের জন্য হলেও আমাদেরকে বিভ্রান্তির মায়াজাল ভেদ করে সামনে তাকাতে হবে এবং এর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃত অবস্থার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। এই হলোগ্রামের ৩২ অপর পাশে বিরাজমান প্রকৃত সত্যকে দেখতে হলে আমাদের দৃষ্টিকে নতুনভাবে নিবদ্ধ করতে হবে।
পবিত্র কুরআন ও নবি (স)-এর শিক্ষায় এ সত্যটি বারবার এসেছে। ওই মৌলিক সত্যটি হচ্ছে, “এই জীবনে যা কিছু আছে, তার সবই পরীক্ষা।”
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন: "যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, এটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” (কুরআন, ৬৭:২)
এখানে জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যটা আমাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর তা হলো: আমাদের পরীক্ষা করার জন্য। ইমারজেন্সি সাইরেনের কথা এক মুহূর্তের জন্য একবার কল্পনা করুন। এটার উদ্দেশ্য কি? বিপজ্জনক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, সেটার ইঙ্গিত ও সতর্কবার্তা এই সাইরেন। এটা শুনলে স্বভাবতই আমরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ি। কিন্তু পরীক্ষার উদ্দেশ্যে যখন তারা সাইরেন বাজায়, তখন কি ঘটে? আমরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, সেটা জানার জন্য অনুশীলন হিসেবে এটা বাজানো হয়, তখন কি ঘটে? পরীক্ষামূলক সাইরেনের শব্দও ঠিক [জরুরি অবস্থার] সাইরেনের মতোই, কিন্তু এটা শুধুই "পরীক্ষামূলক”। যদিও এটা দেখতে ও শুনতে এবং এর অনুভূতি জরুরি অবস্থার সাইরেনের মতোই, তথাপি এটা ওই সাইরেন নয়। এটা শুধুই একটা পরীক্ষা। আর ওই পরীক্ষার ওই গোটা সময় জুড়ে আমাদেরকে বারবার এটাই মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
এই জীবন সম্পর্কে আল্লাহ আমাদেরকে ঠিক এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এটা দেখতে, শুনতে ও অনুভূতির দিক দিয়ে পুরোপুরি আসলের মতোই। সময় সময় এটা আমাদেরকে ভীত করবে। সময় সময় এটা আমাদেরকে কাঁদাবে। নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হওয়ার বদলে সময় সময় এটা আমাদেরকে পালাতে বাধ্য করবে। কিন্তু এই জীবন এবং এর মধ্যে যা আছে, তার সবই পরীক্ষা। এই জীবন সত্যিকার অর্থে আসল জীবন নয়। জরুরি সম্প্রচার ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের মতো এটা আমাদেরকে আসল [জীবনের] জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। পরীক্ষামূলক সাইরেনের অপর পার্শ্বে যে বাস্তব অবস্থা রয়েছে, এটা আমাদেরকে তারই প্রশিক্ষণ দেয়।
এখন, পরীক্ষামূলক সাইরেনের বেজে ওঠাটা যদি কোনো চমক সৃষ্টিকারী বিষয় না হয়, তখন কি হবে? যদি প্রতিটি ঘরে এই আগام বার্তা দিয়ে দেওয়া হয় যে, পরীক্ষামূলক সাইরেন বাজানো হবে, তখন পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে? আল্লাহ (*), (মহিমান্বিত তিনি), আমাদের নিকট এই বার্তা পাঠিয়েছেন, কিছু সময়ের জন্য এটা বিবেচনা করুন:
"আর পার্থিব জীবন এক ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-ঐশ্চর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা সবর ইখতিয়ার করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ়।
(কুরআন, ৩:১৮৬)
সংকল্পের কাজ।”
একবার চিন্তা করুন তো, এই সতর্কবার্তার সাথে সাথে আমাদের পূর্বে গত হওয়া হাজারো সম্প্রদায়, যারা একই ধরনের পরীক্ষার শিকার হয়েছে, তাদের বিবরণও আমাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও তোমাদের নিকট তোমাদের আগেরকার লোকদের অনুরূপ অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। এমনকি রসুল এবং তার সাথের ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল - আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটে।"
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ (কুরআন, ২:২১৪)
অতএব, শুধু সাইরেন বাজার ভবিষ্যদ্বাণীই করা হয়নি এবং এটা নতুন কিছুও নয়। ধরুন, আমাদের জাতিকে একথা জানিয়ে দেওয়া হলো যে, তারা অনন্য কোনো জাতি নয় (অর্থাৎ অন্যান্য জাতিগুলোকে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তাদেরকেও সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হবে)। এসব কিছুর পর, যখন পরীক্ষামূলক সাইরেন বেজে উঠলো, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? সেটা যদি একটা ড্রিল বা অনুশীলন হয়, তবে এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, খটকা লাগারও কিছু নেই। ওই সময় আমরা উদ্বিগ্ন হই না, এমনকি আতঙ্কিতও হই না।
কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা (সেই সাইরেনে) সাড়া দেই।
আর এখানেই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কার জন্য আমরা এহেন আচরণ করি? কে আমাদের পরীক্ষা করছেন? প্রকৃতপক্ষে, কে আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে? CNN, C-Span নাকি আমেরিকান জনগণ? না, [এদের কেউই না]। এরা সবাই সেই ইলিউশন বা বিভ্রমের এক একটি অংশ। সবাই পরীক্ষার এক একটি অংশ। এদের সকলকেই পরীক্ষার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা কাজ করি একজন বিচারকের জন্য, আর কেবলই একজন বিচারকের জন্য। আমরা সেই মহান সত্য সত্তার (আল-হাক্কের) জন্যই শুধু কাজ করি। আমরা কাজ করি, কেননা, আমরা জানি, তিনিই সবকিছু দেখছেন। আর তিনিই সে একক সত্তা, যিনি এই পরীক্ষার বিচার করবেন।
যখনই আমরা এই মৌলিক সত্য উপলব্ধি করবো, তখনই নাটকীয় কিছু ঘটে যায়। এসবই যে একটি পরীক্ষা, বিষয়টি যখনই আমরা আত্মস্থ করে ফেলবো, তখন আমাদের প্রশ্নগুলোই সহসা বদলে যাবে। "কিভাবে এমনটা ঘটতে পারে?" "এটা এতো অন্যায্য কেন?" এ ধরনের প্রশ্ন করার বদলে আমাদের প্রশ্নগুলো হয় এরূপ: “এ অবস্থায় আমার করণীয় কি?” “এই পরীক্ষায় আমি কিভাবে উত্তীর্ণ হবো?" "এখান থেকে আমাকে কি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে?" "এই ভ্রম বা মায়া ভেদ করে, যে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে, আমার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং এই যে পরীক্ষা -এসবের স্রষ্টার নৈকট্য আমি কিভাবে অর্জন করবো?" "একটা জাতি হিসেবে কিভাবে আমরা এই পরীক্ষাকে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবো?” এবং “এই পরীক্ষাতে আমরা কিভাবে ওই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কাজে লাগাবো, যে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অর্থাৎ তাঁর নৈকট্য লাভের একটা উপায় হিসেবে একে (অর্থাৎ এই পরীক্ষাকে) সৃষ্টি করা হয়েছে?” “আল্লাহু আকবার" (আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ)।
আল্লাহ (৫)-এর পরীক্ষার সৌন্দর্য এখানেই নিহিত যে, পরীক্ষা আসছে একথা আমাদের শুধু জানিয়েই দেননি বরং এসব পরীক্ষায় সফল হওয়ার যথার্থ ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন তিনিই বাতলে দিয়েছেন। আর তা হলো: সত্র (ধৈর্য) এবং তাকওয়া (আল্লাহ সচেতনতা)।
আল্লাহ (৫) বলেন:
"দুনিয়ার জীবন এক ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-ঐশ্চর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা সবর ইখতিয়ার করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” (কুরআন, ৩:১৮৫-১৮৬)
অপর এক আয়াতে, আমাদের বিরুদ্ধে করা চক্রান্তগুলির ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা এই দুটো জরুরি উপাদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন:
"তোমাদের কোনো মঙ্গল হলে তা তাদেরকে কষ্ট দেয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তাতে তারা আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্যশীল (সবরকারী) হও এবং মুত্তাকি হও, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।"
إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (কুরআন, ৩:১২০)
এসব পরীক্ষায় আমাদের সাফল্যের ম্যানুয়েলের অংশ হিসেবে পূর্বেকার লোকেরা যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন কিভাবে তারা তাতে সাড়া দিয়েছিল, মহান আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাও জানিয়ে দিচ্ছেন:
"লোকেরা তাদেরকে বললো: 'বিশাল এক সেনাদল তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে, তাই তাদেরকে ভয় করো।' কিন্তু এটা তাদের ঈমানকে আরও মজবুত করলো এবং তারা বলছিল, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।' এরপর তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এলো এবং কোনো ক্ষতিই তাদেরকে স্পর্শ করেনি। আর আল্লাহ যাতে রাজী, তারা তারই অনুসরণ করেছে এবং আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল। এরাই শয়তান, তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো।” (কুরআন, ৩:১৭৩-১৭৫)
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন:
"আর কত নবি যুদ্ধ করেছে, তাদের সাথে বহু আল্লাহওয়ালা লোক ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে তারা দুর্বল হয়নি, নত হয়নি। আল্লাহ সবরকারীদেরকে ভালোবাসেন। একথা ছাড়া তাদের আর কোনো কথা ছিল না - 'হে আমাদের রব! আমাদের পাপ এবং কাজে-কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘনকে তুমি ক্ষমা করো। আমাদের পা সুদৃঢ় রাখো এবং কাফের জাতির বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।' অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কার এবং উত্তম পারলৌকিক পুরস্কার দান করেন। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। হে ঈমানদারগণ! যদি তোমার কাফেরদের আনুগত্য করো, তারা তোমাদেরকে (ঈমানের) বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে এবং তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে। আল্লাহই তো তোমাদের অভিভাবক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।” (কুরআন, ৩:১৪৬-১৫০)
আল্লাহ (৫) এসব ঘটনা আমাদেরকে জানাচ্ছেন, যাতে করে আমাদে পূর্বে যারা গত হয়েছে, তাদের আচরণ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহন করতে পারি তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল: "আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম রক্ষক।' তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল: “হে আমাদের প্রভু, আমাদের পাপ এবং কাজে-কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘনসমূহ ক্ষমা করো, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখুন এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন।" পরীক্ষাটা কি, সেটা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না, বরং তাদের দৃষ্টি চোখের সীমা অতিক্রম করে প্রসারিত ছিল। তারা ইলিউশন বা বিভ্রান্তির মায়াজাল ভেদ করে তাকাতেন এবং নিজেদের মনোযোগ নিবদ্ধ করতেন যিনি আছেন এসবের পেছনে। আর তিনি হলেন মহান আল্লাহ তা'আলা। আল্লাহ তা'আলাই যে এসব পরীক্ষা নিচ্ছেন, তারা শুধু এতটুকুই উপলব্ধি করেনি, বরং এসব থেকে তাদেরকে কেবল আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন, সেটাও তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তারা ক্ষমা, সবর এবং নিজেদের নৈতিক চরিত্র তথা তাকওয়া সমুন্নত করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে তাঁরই সাহায্য লাভের জন্য সবিনয় প্রার্থনা করেছিলেন।
তবে সবচেয়ে আশ্বাসের বিষয় হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মুমিনদেরকে আশ্বাস দিচ্ছেন এবং তাদেরকে সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন:
"তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, তবে একই রকম আঘাত তো তাদেরও (অর্থাৎ বদরে মুশরিকদেরও) লেগেছিল। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলির পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই, যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য হতে কতককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আল আল্লাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন এবং কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেন। তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে (আল্লাহর পথে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছে এবং কে সবর করেছে, তা এখনো প্রকাশ করেননি?" (কুরআন, ৩: ۱۳۹-১৪২)
জীবনকে আমরা যে লেন্স দিয়ে দেখি, একবার যখন আমরা তা বদলে ফেলবো, তখন আমাদের অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার ধরন ব্যাপকভাবে বদলে যাবে। আমাদের পূর্ববর্তী নেককারগণ যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন সেটা তাদের ঈমান ও আনুগত্যকে শুধু বৃদ্ধিই করেছিল। কুরআন বর্ণনা করছে:
"মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো, তারা বলে উঠলো, 'এটা তো তা-ই, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যার ওয়াদা আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল।” (কুরআন, ৩৩:২২)
যতক্ষণ না আমরা ওই লেন্সটি বদলাচ্ছি, ততক্ষণ আমাদের পক্ষে "কিভাবে আমাদের সাথে এমনটি ঘটলো?” এ জাতীয় প্রশ্ন ভেদ করে, পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার জন্য দৃষ্টিকে সম্মুখে প্রসারিত করা সম্ভব হবে না। (বস্তুত এ পরীক্ষা হলো) স্রষ্টার সৃষ্ট এক হাতিয়ার, যার উদ্দেশ্য হলো: (মুমিনদের) পরিশুদ্ধ করা (তাদের ঈমানকে) মজবুত করা এবং আপনার, আমার এবং আমাদের সকল শত্রুর যিনি স্রষ্টা, তাঁর নৈকট্য অর্জন করা।
টিকাঃ
* লেখিকা এখানে আমেরিকার কথা বুঝাচ্ছেন-(সম্পাদক)।
৩২ হলোগ্রাম: এক বিশেষ ধরনের ছবি। লেজার রশ্মি দিয়ে তৈরি করা এ ধরনের ছবিকে ত্রিমাত্রিক বলে মনে হয় -(সম্পাদক)।
**- (সম্পাদক)।
** আমেরকিার প্রেক্ষাপটে লেখা বিধায় এই উদাহরণগুলি এনেছেন লেখিকা। অন্যান্য দেশেও একইভাবে সেসব দেশের সরকার, গোয়েন্দা বিভাগ, মিডিয়া বা জনগণের নাম এ স্থানে আসবে - (সম্পাদক)।
** আল-হাক: মহান আল্লাহ তা'আলার একটি নাম (সম্পাদক)।
📄 এই জীবন: কয়েদখানা নাকি স্বর্গ?
আমি তখন বিমান বন্দরে। নিরাপত্তা লাইনে দাঁড়িয়ে। আর অপেক্ষা করছিলাম আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ছোট একটি মেয়ের দিকে আমার নজর পড়লো। মেয়েটি ছিল তার মায়ের সাথে। ছোট্ট মেয়েটি কাঁদছিল। স্পষ্টত সে ছিল অসুস্থ। তার মা ব্যাগ থেকে বের করে তাকে কিছু ঔষধ দিল। মেয়েটির দুঃখজনক অবস্থা আমাকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছিলো। সহসা আমার কাছে একটা বিষয় ধরা পড়লো। আমার মনে হলো, আমি এমন কাউকে দেখছি, যে একটি ফাঁদে আটকা পড়ে আছে। এই নিষ্পাপ ও পবিত্র আত্মাখানি পার্থিব এক দেহে বন্দি, যাকে অসুস্থ হতে হয়, কষ্ট ভোগ করতে হয় এবং দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়।
আর ঠিক তখনই নবি (ﷺ)-এর ওই হাদিসের কথা আমার মনে পড়ে, যেখানে তিনি বলেন:
"এই দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” [সহিহ মুসলিম]
আর প্রথমবারের মতো এই হাদিসের বক্তব্য আমি আগের চেয়ে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করলাম। কাফিররা এই দুনিয়া ভোগবিলাসে পার করবে, অন্যদিকে মুমিনগণ এই জীবনে হালাল ও হারামের মাঝে আটকে থাকতে বাধ্য এবং নিজেদেরকে উপভোগের জন্য আখিরাত পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই, হাদিসটিকে যারা এভাবে ব্যাখ্যা করেন, তারা একে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করেন না বলে আমি মনে করি। একইভাবে অপরকিছু মানুষের ধারণা এই হাদিসের তাৎপর্য হচ্ছে: এই দুনিয়ার জীবন হবে মুমিনের জন্য হবে দুদর্শায় পরিপূর্ণ এবং কাফিরের জন্য এই দুনিয়া পরম সুখের।
কিন্তু, [হাদিসটির তাৎপর্য এরূপ], আমি আদৌ তা মনে করি না।
সহসাই আমার মনে হলো, আমি যেন ওই ছোট্ট মেয়েটির মাঝে এই হাদিসের প্রকৃত বাস্তবতা দেখতে পাচ্ছি। আমি দেখতে পেলাম এক বন্দী আত্মাকে, বন্দি এই কারণে যে, সে মূলত: এক ভিন্ন জগতের বান্দিা, এক উন্নততর জগতের, যে জগতে তাকে কখনো অসুস্থ হতে হয় না।
কিন্তু [পরিস্থিতি] এটার বিপরীত হলে, কেমন হবে? আত্মা যখন ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করে যে, সে জান্নাতেই আছে। তখন ওই আত্মা কি কখনো অন্য কোথাও যেতে চাইবে? এর চেয়ে ভালো কোথাও? না। সে তো ঠিক সেখানেই আছে, যেখানে সে থাকতে ইচ্ছুক। ওই আত্মার কাছে এর চেয়ে 'উন্নত' কোনো নিবাস থাকতে পারে না। যখন আপনি স্বর্গেই আছেন, তখন আপনি অন্য কোথাও যাওয়ার কল্পনাও করতে পারবেন না। অন্য কিছুর জন্য আকুলভাবে আকাঙ্ক্ষা করবে না। এর চেয়ে অধিক কিছুও চাইবেন না। আপনি যেখানে আছেন, তাতেই আপনি সন্তুষ্ট, পরিতৃপ্ত। এটাই একজন অবিশ্বাসীর মানসিকতা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট এবং এতেই পরিতৃপ্ত থাকে এবং যারা আমার আয়াতগুলো সম্বন্ধে গাফেল।"
إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ (কুরআন, ১০:৭)
অবিশ্বাসী আত্মার জন্য এই অনিবার্যভাবে কষ্টকর, হতাশায় পরিপূর্ণ ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াই হলো স্বর্গ। এতটুকুই তারা জানে। এ অবস্থার কথা একবার ভেবে দেখুন, এমন এক দুনিয়া, যেখানে আপনাকে পতিত হতে হয়, রক্তাক্ত হতে হয় এবং শেষ অবধি সেখানে আপনাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়, সেটাই আপনার জানা একমাত্র স্বর্গ। এর ভয়াবহ যাতনার কথা একবার কল্পনা করুন।
[এই দুনিয়ার চেয়ে] উন্নত কোনো স্থান থাকতে পারে, যারা এটা বিশ্বাস করে না, যারা এই দুনিয়াকেই সর্বোত্তম পাওয়া হিসেবে বিশ্বাস করে, এই দুনিয়ার অপূর্ণতা দেখে খুব সহজেই তারা চরম বিচলিত হয়ে উঠে। খুব সহজেই তারা রাগে ও ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং সহসাই তারা বিধ্বস্ত হয়। কেননা, এই দুনিয়াই তো (তাদের বিবেচনায়) স্বর্গ হওয়ার কথা ছিল। এটার চেয়েও সমৃদ্ধ কিছু যে আছে, তারা সেটা উপলব্ধি করে না। তাই তারা কেবল এটাকেই পেতে চায়। এটার পেছনেই তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। স্রষ্টার দেওয়া প্রতিটি শক্তি, প্রতিটি সামর্থ্য, প্রতিটি সুযোগ এবং প্রতিটি নেয়ামতকে তারা কেবল এই দুনিয়া হাসিলের জন্য ব্যয় করে, (কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো) সেখানে তাদের জন্য (স্রষ্টার তরফ থেকে) যা ধার্য করা হয়েছে, তা ছাড়া কিছুই তাদের কাছে ধরা দেবে না।
তাদের আত্মা এই পার্থিব দেহের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে, যেহেতু তাদের বিবেচনায় এ দেহই তাদের একমাত্র স্বর্গ – বর্তমান ও ভবিষ্যতেও। তাই একে ছেড়ে যেতে চায় না। যেকোনো মূল্যে এই দেহকে সে (অর্থাৎ অবিশ্বাসী আত্মা) আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। (অবিশ্বাসী) আত্মাকে মৃত্যুর সময় তার এই 'স্বর্গ' থেকে তুলে নেওয়াটাই তার জন্য সব থেকে ভয়ংকর আযাব। অবিশ্বাসীদের মৃত্যুকে আল্লাহ এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যেন তাদের আত্মাকে টেনে হিঁচড়ে দেহ থেকে বের করা হচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
"ওই (ফেরেশতাদের) শপথ, যারা (পাপাচারীদের আত্মাকে) ক্ষিপ্রতার সাথে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে।" وَالنَّازِعَاتِ غَرْقًا (কুরআন, ৭৯:১)
এটা ছিন্নভিন্ন হয়। কেননা, আত্মা চায় না দেহকে ছাড়তে। সে তো বিশ্বাস করতো সে স্বর্গেই আছে। এর থেকেও শ্রেষ্ঠতর, আরও বহুগুণে শ্রেষ্ঠতর কিছু আছে, তা সে কখনোই ভাবেনি।
ঈমানদার আত্মার জন্য বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। ঈমানদার ব্যক্তি তো আছে কয়েদখানায়, সে তো কোনো স্বর্গে নেই। কেন? কয়েদি বলতে কি বুঝায়? যে কোথাও আটকা পড়ে আছে, সেই তো কয়েদি। কয়েদিকে নিজের আবাস থেকে দূরে রাখা হয়, এক জায়গাতে আটক অবস্থায়। অপরদিকে তার অবস্থা হলো সে চায় এখান থেকে উত্তম কোথাও যেতে। দুনিয়াবি দেহ ঈমানদারদের জন্য এক কয়েদখানার মতো, এটা এজন্য নয় যে, ঈমানদার আত্মার জন্য দুনিয়ার এই জীবন চরম দুর্দশাগ্র বরঞ্চ বিশ্বাসী আত্মা এর থেকে উন্নততর এবং শ্রেষ্ঠতর কোথাও যাওয়ার জন ভীষণভাবে ব্যাকুল। আপন নিবাসে ফিরে যেতে সে আকুল।
ঈমানদারের জন্য, এই দুনিয়ার জীবন যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, পূর্ণতায় ভরপুর যে জীবন তার জন্য অপেক্ষা করছে, তার তুলনায় এই জীবন কয়েদখানা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ আত্মার যা কিছু অনুরাগ-আসক্তি, তা হলো: মহান আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য এবং তাঁর কাছে যে জান্নাত আছে, তার প্রতি। এটা সেখানেই যেতে চায়। কিন্তু এই দুনিয়ার জীবন আত্মাকে সেখানে ফিরে যাওয়া থেকে আটকে রাখে- ক্ষণিকের জন্য হলেও। এটা একটা বাধা এবং এক কয়েদখানা। যদিও একজন বিশ্বাসীর আত্মাই এই দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত স্বর্গের সন্ধান লাভ করে, তথাপি তার আত্মা এর থেকেও বেশি কিছু কামনা করে। সে আপন গৃহে ফিরতে চায়। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য আত্মাকে দেহ নামক এই কারাগারে থাকতেই হবে। বাড়ির ফিরে যাওয়ার জন্য মুক্তি পাওয়ার আগে, এই 'কারাবাস' তাকে করতেই হবে। ঈমানদার আত্মার অনুরাগ-আকর্ষণ কখনোই তাকে বন্দি করে রাখা এই দেহের সাথে নয়। দণ্ড যখন সমাপ্ত হয় এবং কয়েদিকে যখন বলা হয়, সে এখন বাড়ি ফিরে যেতে পারে, তখন সে কখনো কারাগারের গারদ ধরে বসে থাকবে না। আর তাই আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের মৃত্যুকে একেবারে ভিন্নভাবে চিত্রিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"ওই (ফেরেশতাদের) শপথ, যারা (ঈমানদারদের আত্মাকে) অত্যন্ত মৃদুভাবে বের করে আনে।" وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا (কুরআন, ৭৯:২)
ঈমানদার আত্মা খুব সহজেই দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। 'তার "কারাদণ্ড" সমাপ্ত হয়েছে, আর এখন সে বাড়ি ফিরেছে। কাফিরদের আত্মা যেমন দুনিয়ার দেহকেই সর্বোত্তম আবাস ভেবে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকে, ঈমানদারদের আত্মা তেমনটি কখনোই করে না।
আর, তাই আমাদের প্রিয় নবি (ﷺ) যে নিখুঁত উপমা দিয়েছেন, তার থেকে উত্তম কোনো উপমা আমি কল্পনা করতে পারছি না। সত্যই এই পার্থিব জীবন ঈমানদারদের জন্য কয়েদখানা এবং কাফেরদের জন্য এটা এক স্বর্গ। আমাদেরকে সবাইকে একই আহ্বানকারী আহ্বান জানাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এমনভাবে আমাদের জীবন কাটাবো যে, যখন ডাক আসবে, তখন আমরা কারাগারের গারদ আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইবো? নাকি এমন জীবন কাটাবো, যখন ডাক আসবে, তখন তা হবে আমাদের মুক্তির ডাক। তা হবে ঘরে ফেরার ডাক।
📄 সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক
গড়ার উদ্দেশ্যেই তিনি আপনাকে ভাঙেন। দেওয়ার জন্যই তিনি আপনাকে রাখেন বঞ্চিত। এই জীবনের জন্য আকুল না হয়ে আপনি যেন জান্নাতের জন্য ব্যাকুল হন, সেজন্যই তিনি আপনার অন্তরে সৃষ্টি করেছেন বিরহ ও বেদনা।
📄 স্রষ্টার সন্ধানে
আমার গোটা জীবন আমি স্রষ্টার সন্ধানে ব্যয় করেছি। কিন্তু আমি নিজে তা বুঝতেই পারিনি।
[আমাদের] জীবনে, সম্পর্ক ও সাথির মাঝে, সকল কিছুর মাঝে যে জিনিসগুলো আমরা সবাই খুঁজে ফিরি, আমরা যদি সেগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখি, তবে আমরা দেখতে পাবো, আস্তিক-নাস্তিক সবাই আসলে স্রষ্টাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। গভীরভাবে ভেবে দেখলে উপলব্ধি করবেন স্রষ্টাই সকল কিছুর রূপকার, নকশাকার। আপনি আস্তিক হন বা নাস্তিক, স্রষ্টাই আপনার চাহিদা, আপনার আকর্ষণ, আপনার বাসনা সবকিছুর রূপকার। বস্তুত প্রাকৃতিক বিন্যাসকে সচল রাখতেই অন্তরের মাঝে স্রষ্টা এসব অনুঘটকের জন্ম দিয়েছেন। ওই প্রাকৃতিক বিন্যাসই: তাওহিদ (এক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীকে অন্বেষণ করা, তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা)।
আমি এবং আপনি যেসব জিনিস চাই, এক মুহূর্তের জন্য তা নিয়ে একটু ভাবুন তো। উদাহরণস্বরূপ, একজন সাথির মাঝে আমরা কি দেখতে চাই? (তাদের মাঝে) কোন জিনিসটি পাওয়ার আশায় ছুটছি? আর কোন কথাটুকু শোনার জন্য আমরা সবকিছু দিতেও রাজি?
"আমি তোমার (ভালোমন্দের) দিকে খেয়াল রাখছি।”
"সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"আমি তোমাকে ভালোবাসি, সবসময়। আর ওই ভালোবাসা কখনো শেষ হয়েও যাবে না, বদলেও যাবে না।”
"তুমি আমার ওপর ভরসা করতে পারো।”
"আমি তোমাকে কখনো হতাশ করবো না।”
"আমি তোমাকে কখনো দুঃখ দেবো না।”
"আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবো না।”
“(বিপদে-আপদে) সর্বদা আমাকে তুমি সাথে পাবে।"
"আমি তোমার কদর করি।"
"আমি তোমাকে (তোমার চিন্তা-ভাবনা ও সমস্যাকে) উপলব্ধি করি।"
"আমি তোমাকে বুঝতে পারি।"
"তুমি কে, সেটা আমি জানি।"
"আমি তোমার অতি নিকটে।"
"আমি তোমাকে মার্জনা করবো।"
"তোমাকে নিখুঁত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।"
"আমি কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না।"
"আমি কখনো তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো না।"
“তোমার অসতর্কতায় তোমার কোনো বিপদ না হয়, সেদিকে আমি নজর রাখছি।"
"আমি এটা (অর্থাৎ কোনো ঝামেলা বা মুসিবতের) দেখছি।"
"আমি তোমার কথা শুনছি। সত্য-সত্যই মনোযোগ দিয়েই শুনছি।"
"তাদেরকে আমি তোমাকে আঘাত করতে বা কষ্ট দিতে দেবো না।"
"সর্বদা আমি তোমায় রক্ষা করবো।"
"আমি কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না।"
"তুমি কখনো একা নও।"
"কখনো আমি তোমায় একা রেখে যাবো না।"
“তোমার আশেপাশে সবকিছু যখন একে একে ঝড়ে পড়বে, তখনও আমি তোমায় আগলে রাখবো।"
“তোমার জন্য যা সবচেয়ে ভালো, আমি তোমার জন্য কেবল সেটাই চাই।"
"যখন তুমি কেবল ভুলই করছো, তখনো আমি শুধু তোমায় ক্ষমা করবো।"
"তুমি প্রতিদান দিতে অক্ষম হলেও আমি সব সময় তোমায় শুধু দিয়েই যাবো।"
"যখন তুমি আমার বিরোধিতা করছো, তখনও আমি তোমার প্রতি দয়া করে যাবো। আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না।"
"যাই করো না কেন, আমি তোমাকে সব সময় ক্ষমা করতে সক্ষম।"
"দুর্বলতা ও দোষ সত্ত্বেও আমি তোমাকে ভালোবাসি।"
"আমি তোমাকে দেবো শান্তি ও স্বস্তি।"
"আমি তোমাকে খুশি করে দেবো।"
"আমিই তোমাকে দেবো দৃঢ়তা।"
"আমিই তোমায় দেবো শক্তি ও সাহস।"
"আমিই তোমাকে সারিয়ে তুলবো।"
"আমিই তোমাকে দেবো সম্মান ও প্রতিপত্তি।"
"সর্বদা আমি তোমাকে স্বস্তি দিয়ে যাবো।"
"আমার জন্য তুমি যত সামান্য কিছুই করো না কেন, আমি সেটার কদর করবো এবং তোমাকে সেটার প্রতিদান দেবো।"
"যত যা কিছুই ঘটুক, যখনই তুমি আমার দিকে ফিরবে, আমাকে তোমার জন্য সেখানে উপস্থিত পাবে।"
"আমার বিপক্ষে তুমি যা-ই করো না কেন, আমি তোমাকে সব সময়ই ক্ষমা করতে সক্ষম।"
বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা যখন ভাবছি যে, আমরা একজন ভালো স্বামী কিংবা একজন ভালো স্ত্রী খুঁজছিলাম, অথবা খুঁজছিলাম একটা ভালো চাকুরি কিংবা রাশি রাশি অর্থ বা সম্মান, তখন আমরা সত্যিকার অর্থে আসলে স্রষ্টাকেই খুঁজছিলাম। ফলশ্রুতিতে ওই স্বামী, ওই স্ত্রী, ওই চাকুরি, ওই অর্থ অথবা ওই সম্মান যখন আমাদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ, তখন আমাদের হতাশ হওয়াতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
এমনকি এই শূন্যতা সৃষ্টির পেছনেও উদ্দেশ্য আছে। সে শূন্যতা পূরণের জন্য আমাদের ধাবিত করার জন্য। সমস্যা হচ্ছে, আমরা একে ভুল জিনিস দিয়ে পূর্ণ করি। করতে চাই। আমাদের মাঝে যা কিছু আছে, তার সবকিছুকে সৃষ্টি করা হয়েছে। শূন্যতা পূরণের এই যাত্রায় সত্যিকারের পূর্ণতাকে খুঁজে পেতে, খুঁজে পেতে আল্লাহকে। এমনকি শয়তান ও নফসকেও স্রষ্টার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে যদি এদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ যথাযথ হয়। শয়তান ও নফস আমাদের শত্রু, এতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: নিজেদেরকে আমরা কিভাবে এদের থেকে নিরাপদ রাখবো? মানুষেরা কি এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারে? অর্থবিত্ত পারবে সহায়তা করতে? দুনিয়াবি ক্ষমতা বা অস্ত্র কি পারবে আমাদেরকে এসব চরম শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে? কোথায় পাবো সেই 'একমাত্র' আশ্রয়স্থল, যেখানে আমরা শয়তান এবং নিজেদের নফস থেকে নিরাপদ? আল্লাহই সেই আশ্রয়স্থল। আসলে এসব (অর্থাৎ এই সব শূন্যতা, শয়তান ও নফসের বিরোধিতা, বিপদ-মুসিবত) কিছুর উপমা সেই ঝড়ের মতো, যাকে পাঠানো হয় আমাদেরকে একমাত্র আশ্রয়ের দিকে ধাবিত করে আনবে। আমাদের তাড়িয়ে আনবে সেই মহান সত্তা আল্লাহ (আয্যা ওয়া জালের) দিকে।
এমনকি আপনার পাপও আপনাকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করার মাধ্যমে পরিণত হতে পারে। কেননা, [তিনি ছাড়া আর কে আছে, যিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন? নিজের পাপের বিপর্যয় ও বিভীষিকা হতে বাঁচার জন্য [তিনি ছাড়া] আর কার কাছে আপনি আশ্রয় নেবেন? [তিনি ছাড়া] এমন কেউ কি আছে, যিনি আপনার পাপগুলির যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বা সেগুলো মুছে দিতে, এমনকি সেগুলোকে পুণ্যে রূপান্তরিত করতে সক্ষম?
আপনার ভয়ও হতে পারে স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম। যখন আপনি ভয় পান, তখন (আল্লাহ ছাড়া আর) কে আপনাকে রক্ষা করতে সক্ষম? যখন আপনি অসহায় ও নিরুপায় হয়ে মাঝ দরিয়ায় আটক, তখন আর কে আপনাকে দিতে পারে স্বস্তি ও নিরাপত্তা? যখন আপনি দারিদ্রে নিপতিত, তখন আর কে আছে যে আপনাকে রিযকের যোগান দিতে পারে? যখন আপনি কঠিন শোকে নিমজ্জিত, তখন কে আছে এমন যে আপনাকে টেনে তুলে? যখন আপনি ভেঙে পড়েন, তখন আর কে পারে আপনার চূর্ণ-বিচূর্ণ অন্তর আর জীবনকে সারিয়ে তুলতে? কে আছে এমন যে মৃতের মাঝে সঞ্চার করতে পারে জীবনের আলো? আপনাকে দিতে পারে আরোগ্য, এমন কে আছে? আর কে পারে আপনাকে রক্ষা করতে? যখন আপনি পথহারা, তখন আর কে আছে যে আপনাকে পথের দিশা দিতে সক্ষম?
তিনি (অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলা) ছাড়া আর কে?
আপনি ভেবেছিলেন ঝড়-ঝাপটা, উত্তাল সমুদ্র, ভয়, দুঃখ-বিরহ, ভুলভ্রান্তি, হারানোর বেদনা, হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ এ সবকিছুই আপনার জন্য অমঙ্গলজনক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে: এ সবগুলোই এক একটি মাধ্যম মাত্র। এগুলো সবই স্রষ্টার নৈকট্য লাভের একটি বাহন মাত্র। এগুলো আপনাকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে নেয়। এগুলো আপনাকে পূর্ণতা, সুখ ও নতুন জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে। এগুলো আপনাকে যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, সেখানেই (অর্থাৎ মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে) ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। আপনি মনের গহীনে আসলেই যা খুঁজছিলেন, তার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য।
ফিরিয়ে আনার জন্য আপনাকে সেই মহান সত্তা রব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যে।
টিকাঃ
** এজন্যই আমরা বলি- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন (সম্পাদক)।