📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 কষ্ট, ক্ষতি এবং আল্লাহর পথ

📄 কষ্ট, ক্ষতি এবং আল্লাহর পথ


আমি আজও আমার মরিয়া হয়ে ওঠার সময়ের কথা স্মরণ করি। তীব্র নৈরাশ্যের পরই আসে আত্ম উপলব্ধি, তাই মিনতি করার জন্য আমি স্রষ্টার দিকে প্রত্যাবর্তন করি। যে জিনিস মাপা যাবে, কেনা যাবে, বিক্রি করা যাবে কিংবা যে জিনিস নিয়ে বাণিজ্য করা যায়, আমার মিনতি সেরকম কিছুর জন্য ছিল না। এটা ছিল অধিকতর সত্য এক জিনিসের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা। নিজের ভুলত্রুটিগুলো হঠাৎ করেই আমার কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে পড়ে এবং আপন নফস তথা প্রবৃত্তির স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্ত হতে আমি মরিয়া হয়ে উঠি। মরিয়া হয়ে উঠি একজন উত্তম মানুষে পরিণত হতে।

আর তাই, নিজের অন্তরকে আল্লাহ (স)-এর হাতে সমর্পণ করে নিজের পরিশুদ্ধির জন্য দু'আ করি। যদিও আমি সব সময় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম যে, আল্লাহ অবশ্যই সকল দু'আ শোনেন, তথাপি ওই দু'আ কখন-অথবা কিভাবে- কবুল হবে, তার ধারণা আমার ছিল না।

এই দু'আর পরপরই, আমি আমার জীবনের অন্যতম এক কঠিন সময় পার করি। এই অভিজ্ঞতা লাভকালে নিজেকে আমি উজ্জীবিত রাখতাম, হেদায়েত ও শক্তি সঞ্চারের জন্য দু'আ করতাম। কিন্তু আমার আগের দু'আর সাথে এ অবস্থার কোনো যোগসূত্র আমি কখনো খুঁজে পেতাম না। ওই কঠিন সময়টুকু পার হওয়ার পর যখনই আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম, কেবল তখনই আমি উপলব্ধি করলাম, কিভাবে আমি পরিণত হয়ে উঠেছি। হঠাৎ করেই আমার দু'আর কথা আমার মনে পড়লো। সহসাই আমি অনুভব করি যে, এই কঠিন পরিস্থিতি নিজেই ছিল আমার ওই দু'আর জবাব, যা আমি এতো কাতরভাবে করেছিলাম।

রুমির বর্ণনার কারুকার্যে বিষয় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে:

"যখন কেউ লাঠি দিয়ে কম্বলে আঘাত করতে থাকেন, তার উদ্দেশ্য কম্বলকে আঘাত করা নয়, বরং তিনি চান কম্বল থেকে ধূলাবালি সরাতে। তোমার অন্তরাত্মা 'আমিত্বের' চাদরের ধূলাবালিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে, আর এই ধূলাবালি একবারে সরে যাবে না। প্রতিটি নির্দয় প্রহার এবং প্রতিটি আঘাতের মাধ্যমে একটু একটু করে অন্তর থেকে [এই আমিত্বের ধূলা] সরে যাবে, কখনো অবচেতনভাবে, আবার কখনো সচেতনভাবে।"

প্রায়শই আমরা জীবনে নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই এবং এসব ঘটনার মধ্যস্থ সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই না। যখন আমাদের ওপর কষ্ট ও দুর্ভোগ নেমে আসে কিংবা আমরা দুঃখ অনুভব করি, তখন প্রায়শই আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই যে, এগুলো অন্য কোনো কাজ বা অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ কারণ বা ফলাফল। আমাদের জীবনের কষ্ট ও দুর্ভোগ এবং আল্লাহ (স)-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক, এই দুটোর মধ্যে যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান, কখনো কখনো আমরা এটা উপলব্ধি করতে পারি না।

ওই কষ্ট এবং ওই প্রতিকূলতা জীবনে বহু উদ্দেশ্য সাধন করে, কষ্ট ও দুর্ভোগের সময়গুলো স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের অবস্থা যাচাই এবং তা সংশোধন করে নেওয়ার জন্য কাজ করতে পারে।

জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলো আমাদের ঈমান, আমাদের আত্মসংযম এবং আমাদের সামর্থ্যের পরীক্ষা নেয়। এই সময়গুলোতেই আমাদের ঈমানের স্তর সুস্পষ্ট হয়। বালা-মুসিবত আমাদের মুখোশ খুলে দেয় এবং ঈমানের নিছক মৌখিক স্বীকৃতির পেছনে লুকানো সত্যকে উন্মোচন করে। কষ্টকর পরিস্থিতি সাচ্চা ঈমানদারদেরকে মেকি ঈমানদারদের থেকে পৃথক করে দেয়। আল্লাহ বলেন:
"মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' শুধু এই কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? আমি তো এদের আগেরকার লোকদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন, (ঈমানের দাবিতে) কারা সত্যবাদী এবং তিনি অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন, কারা (ঈমানের দাবিতে) মিথ্যাবাদী।” (কুরআন, ২৯:২-৩)

কষ্টকর পরিস্থিতি অবশ্যই আমাদেরকে পরীক্ষা করে। আবার এই কষ্ট ও দুর্ভোগ হতে পারে আশীর্বাদ ও আল্লাহর ভালোবাসার এক আলামত। নবি মুহাম্মদ (ﷺ) বলেন:
"যখন আল্লাহ কোনো ব্যক্তির কল্যাণ চান, তখন তাকে কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেন।” [বুখারি]

তবুও কষ্ট ও দুর্ভোগ কিভাবে জীবনে আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, সেটার গভীরতা অধিকাংশ মানুষই আঁচ করতে পারেন না। অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না যে, কষ্ট ও দুর্ভোগ প্রকৃতপক্ষে [আত্মাকে] পরিশুদ্ধ করার এক হাতিয়ার, যেটা মানুষকে তাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরিয়ে আনে। ওই দাম্ভিক লোকের অবস্থা কেমন দাঁড়ায়, হঠাৎ করেই যে নিজেকে এমন পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করে, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? ওই লোকের অবস্থা কেমন হয়, যে প্রবল ঝড়ের মাঝে নিজেকে মাঝ সমুদ্রে আবিষ্কার করে? "ডুবা সম্ভব নয়" বলে দাবিদার ওই জাহাজের অবস্থা কি দাঁড়ায়, যার পরিণতি হয় "টাইটানিক”-এর মতো?

দুর্ভাগ্য বলে মনে হলেও এগুলো অবচেতনার ঘুম থেকে জেগে ওঠার আহ্বান। এগুলো [আমাদেরকে] বিনয়ী করে তোলে। আমাদের ঝাঁকুনি দেয়। আমরা যে কতোটা তুচ্ছ ও নগণ্য এবং আল্লাহ যে কত মহান, এগুলো আমাদেরকে এটাই মনে করিয়ে দেয়। এগুলো আমাদেরকে আমাদের প্রবঞ্চনা, উপেক্ষা ও অবহেলা এবং এলোমেলো চিন্তাধারার আলস্য থেকে জাগিয়ে তোলে এবং আপন স্রষ্টার পানে আমাদের ফিরিয়ে আনে। কষ্ট আমাদের চোখ থেকে আরাম ও আয়েশের পর্দা সরিয়ে ফেলে এবং আমরা কি এবং কোথায় যাচ্ছি, আমাদেরকে তা মনে করায়। আল্লাহ (স.) বলেন:
“... এবং আমরা তাদেরকে ভালো (সময়) এবং মন্দ (সময়) দ্বারা পরীক্ষা করেছি, এই কারণে যে, সম্ভবত তারা (আনুগত্যে) ফিরে আসবে।” (কুরআন, ৭:১৬৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ (স) বলেন:
"যখনই আমরা কোনো নবি কোনো জনপদে পাঠিয়েছি, তখনই আমরা সে জনপদের লোকদেরকে কষ্ট এবং দুর্ভোগে ফেলি, যাতে করে তারা বিনম্র হতে শিখে।” (কুরআন, ৭:৯৪)

বিনম্রতার এই শিক্ষা মানব আত্মাকে এতোটাই পরিশুদ্ধ করে যে, [স্বয়ং] আল্লাহ (স) কুরআনে মুমিনগণকে আশ্বস্ত করেন এবং এই নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, এই জীবনে যে কষ্টেরই তারা মুখোমুখি হয়, সেগুলোর উদ্দেশ্য তাদেরকে সমৃদ্ধ ও উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করা। তিনি বলেন:
"তোমরা যদি আঘাত পেয়ে থাকো, একই রকম আঘাত তো অপর লোকদেরও (অর্থাৎ মুশরিকদের) লেগেছিল। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলো পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই, যাতে করে আল্লাহ মুমিনদের জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে শহীদ (সত্যের সাক্ষী) হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালোবাসেন না।” (কুরআন, ৩:১৪০-১৪২)

আত্মশুদ্ধির এই সংগ্রামই আল্লাহর দিকে উত্তোরণের পথের সার নির্যাস। ত্যাগের মাধ্যমে এর সূচনা ঘটে আর সংগ্রামের ঘাম দিয়েই বাধিয়ে নিতে হয়। এটাই সে পথ, যে পথের বর্ণনা আল্লাহ এভাবে দেন:
"হে মানুষ! তুমি তোমার রবের নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাকো, অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করবে।” (কুরআন, ৮৪:৬)

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 কষ্ট ও দুর্ভোগের প্রতি এক ঈমানদারের প্রতিক্রিয়া

📄 কষ্ট ও দুর্ভোগের প্রতি এক ঈমানদারের প্রতিক্রিয়া


মুসলিমদের জন্য সময়টা এখন দুর্যোগের। কখনো কখনো তো হতাশা না হওয়াটা কষ্টকর। আমাদের অনেকেই অবাক হন, কেন আমাদের সাথে এমন হচ্ছে? আমরা কোনো অন্যায় না করা সত্ত্বেও আমাদের সাথে কিভাবে এসব হচ্ছে? যে দেশটি প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে সকলের জন্য “স্বাধীনতা”, “মুক্তি” ও “ন্যায়বিচারের” অঙ্গীকার নিয়ে, সেখানে আমরা কিভাবে এতোটা বৈষম্যের শিকার হই?

এ ধরনের চিন্তা স্বাভাবিক হলেও এসব কিছুকে ছাড়িয়ে আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। কিছু সময়ের জন্য হলেও আমাদেরকে বিভ্রান্তির মায়াজাল ভেদ করে সামনে তাকাতে হবে এবং এর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃত অবস্থার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। এই হলোগ্রামের ৩২ অপর পাশে বিরাজমান প্রকৃত সত্যকে দেখতে হলে আমাদের দৃষ্টিকে নতুনভাবে নিবদ্ধ করতে হবে।

পবিত্র কুরআন ও নবি (স)-এর শিক্ষায় এ সত্যটি বারবার এসেছে। ওই মৌলিক সত্যটি হচ্ছে, “এই জীবনে যা কিছু আছে, তার সবই পরীক্ষা।”

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন: "যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, এটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” (কুরআন, ৬৭:২)

এখানে জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যটা আমাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর তা হলো: আমাদের পরীক্ষা করার জন্য। ইমারজেন্সি সাইরেনের কথা এক মুহূর্তের জন্য একবার কল্পনা করুন। এটার উদ্দেশ্য কি? বিপজ্জনক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, সেটার ইঙ্গিত ও সতর্কবার্তা এই সাইরেন। এটা শুনলে স্বভাবতই আমরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ি। কিন্তু পরীক্ষার উদ্দেশ্যে যখন তারা সাইরেন বাজায়, তখন কি ঘটে? আমরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, সেটা জানার জন্য অনুশীলন হিসেবে এটা বাজানো হয়, তখন কি ঘটে? পরীক্ষামূলক সাইরেনের শব্দও ঠিক [জরুরি অবস্থার] সাইরেনের মতোই, কিন্তু এটা শুধুই "পরীক্ষামূলক”। যদিও এটা দেখতে ও শুনতে এবং এর অনুভূতি জরুরি অবস্থার সাইরেনের মতোই, তথাপি এটা ওই সাইরেন নয়। এটা শুধুই একটা পরীক্ষা। আর ওই পরীক্ষার ওই গোটা সময় জুড়ে আমাদেরকে বারবার এটাই মনে করিয়ে দেওয়া হয়।

এই জীবন সম্পর্কে আল্লাহ আমাদেরকে ঠিক এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এটা দেখতে, শুনতে ও অনুভূতির দিক দিয়ে পুরোপুরি আসলের মতোই। সময় সময় এটা আমাদেরকে ভীত করবে। সময় সময় এটা আমাদেরকে কাঁদাবে। নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হওয়ার বদলে সময় সময় এটা আমাদেরকে পালাতে বাধ্য করবে। কিন্তু এই জীবন এবং এর মধ্যে যা আছে, তার সবই পরীক্ষা। এই জীবন সত্যিকার অর্থে আসল জীবন নয়। জরুরি সম্প্রচার ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের মতো এটা আমাদেরকে আসল [জীবনের] জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। পরীক্ষামূলক সাইরেনের অপর পার্শ্বে যে বাস্তব অবস্থা রয়েছে, এটা আমাদেরকে তারই প্রশিক্ষণ দেয়।

এখন, পরীক্ষামূলক সাইরেনের বেজে ওঠাটা যদি কোনো চমক সৃষ্টিকারী বিষয় না হয়, তখন কি হবে? যদি প্রতিটি ঘরে এই আগام বার্তা দিয়ে দেওয়া হয় যে, পরীক্ষামূলক সাইরেন বাজানো হবে, তখন পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে? আল্লাহ (*), (মহিমান্বিত তিনি), আমাদের নিকট এই বার্তা পাঠিয়েছেন, কিছু সময়ের জন্য এটা বিবেচনা করুন:
"আর পার্থিব জীবন এক ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-ঐশ্চর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা সবর ইখতিয়ার করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ়।
(কুরআন, ৩:১৮৬)

সংকল্পের কাজ।”

একবার চিন্তা করুন তো, এই সতর্কবার্তার সাথে সাথে আমাদের পূর্বে গত হওয়া হাজারো সম্প্রদায়, যারা একই ধরনের পরীক্ষার শিকার হয়েছে, তাদের বিবরণও আমাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও তোমাদের নিকট তোমাদের আগেরকার লোকদের অনুরূপ অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। এমনকি রসুল এবং তার সাথের ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল - আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটে।"
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ (কুরআন, ২:২১৪)

অতএব, শুধু সাইরেন বাজার ভবিষ্যদ্বাণীই করা হয়নি এবং এটা নতুন কিছুও নয়। ধরুন, আমাদের জাতিকে একথা জানিয়ে দেওয়া হলো যে, তারা অনন্য কোনো জাতি নয় (অর্থাৎ অন্যান্য জাতিগুলোকে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তাদেরকেও সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হবে)। এসব কিছুর পর, যখন পরীক্ষামূলক সাইরেন বেজে উঠলো, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? সেটা যদি একটা ড্রিল বা অনুশীলন হয়, তবে এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, খটকা লাগারও কিছু নেই। ওই সময় আমরা উদ্বিগ্ন হই না, এমনকি আতঙ্কিতও হই না।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা (সেই সাইরেনে) সাড়া দেই।

আর এখানেই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কার জন্য আমরা এহেন আচরণ করি? কে আমাদের পরীক্ষা করছেন? প্রকৃতপক্ষে, কে আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে? CNN, C-Span নাকি আমেরিকান জনগণ? না, [এদের কেউই না]। এরা সবাই সেই ইলিউশন বা বিভ্রমের এক একটি অংশ। সবাই পরীক্ষার এক একটি অংশ। এদের সকলকেই পরীক্ষার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা কাজ করি একজন বিচারকের জন্য, আর কেবলই একজন বিচারকের জন্য। আমরা সেই মহান সত্য সত্তার (আল-হাক্কের) জন্যই শুধু কাজ করি। আমরা কাজ করি, কেননা, আমরা জানি, তিনিই সবকিছু দেখছেন। আর তিনিই সে একক সত্তা, যিনি এই পরীক্ষার বিচার করবেন।

যখনই আমরা এই মৌলিক সত্য উপলব্ধি করবো, তখনই নাটকীয় কিছু ঘটে যায়। এসবই যে একটি পরীক্ষা, বিষয়টি যখনই আমরা আত্মস্থ করে ফেলবো, তখন আমাদের প্রশ্নগুলোই সহসা বদলে যাবে। "কিভাবে এমনটা ঘটতে পারে?" "এটা এতো অন্যায্য কেন?" এ ধরনের প্রশ্ন করার বদলে আমাদের প্রশ্নগুলো হয় এরূপ: “এ অবস্থায় আমার করণীয় কি?” “এই পরীক্ষায় আমি কিভাবে উত্তীর্ণ হবো?" "এখান থেকে আমাকে কি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে?" "এই ভ্রম বা মায়া ভেদ করে, যে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে, আমার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং এই যে পরীক্ষা -এসবের স্রষ্টার নৈকট্য আমি কিভাবে অর্জন করবো?" "একটা জাতি হিসেবে কিভাবে আমরা এই পরীক্ষাকে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবো?” এবং “এই পরীক্ষাতে আমরা কিভাবে ওই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কাজে লাগাবো, যে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অর্থাৎ তাঁর নৈকট্য লাভের একটা উপায় হিসেবে একে (অর্থাৎ এই পরীক্ষাকে) সৃষ্টি করা হয়েছে?” “আল্লাহু আকবার" (আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ)।

আল্লাহ (৫)-এর পরীক্ষার সৌন্দর্য এখানেই নিহিত যে, পরীক্ষা আসছে একথা আমাদের শুধু জানিয়েই দেননি বরং এসব পরীক্ষায় সফল হওয়ার যথার্থ ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন তিনিই বাতলে দিয়েছেন। আর তা হলো: সত্র (ধৈর্য) এবং তাকওয়া (আল্লাহ সচেতনতা)।

আল্লাহ (৫) বলেন:
"দুনিয়ার জীবন এক ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-ঐশ্চর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা সবর ইখতিয়ার করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” (কুরআন, ৩:১৮৫-১৮৬)

অপর এক আয়াতে, আমাদের বিরুদ্ধে করা চক্রান্তগুলির ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা এই দুটো জরুরি উপাদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন:
"তোমাদের কোনো মঙ্গল হলে তা তাদেরকে কষ্ট দেয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তাতে তারা আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্যশীল (সবরকারী) হও এবং মুত্তাকি হও, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।"
إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (কুরআন, ৩:১২০)

এসব পরীক্ষায় আমাদের সাফল্যের ম্যানুয়েলের অংশ হিসেবে পূর্বেকার লোকেরা যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন কিভাবে তারা তাতে সাড়া দিয়েছিল, মহান আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাও জানিয়ে দিচ্ছেন:
"লোকেরা তাদেরকে বললো: 'বিশাল এক সেনাদল তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে, তাই তাদেরকে ভয় করো।' কিন্তু এটা তাদের ঈমানকে আরও মজবুত করলো এবং তারা বলছিল, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।' এরপর তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এলো এবং কোনো ক্ষতিই তাদেরকে স্পর্শ করেনি। আর আল্লাহ যাতে রাজী, তারা তারই অনুসরণ করেছে এবং আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল। এরাই শয়তান, তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো।” (কুরআন, ৩:১৭৩-১৭৫)

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন:
"আর কত নবি যুদ্ধ করেছে, তাদের সাথে বহু আল্লাহওয়ালা লোক ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে তারা দুর্বল হয়নি, নত হয়নি। আল্লাহ সবরকারীদেরকে ভালোবাসেন। একথা ছাড়া তাদের আর কোনো কথা ছিল না - 'হে আমাদের রব! আমাদের পাপ এবং কাজে-কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘনকে তুমি ক্ষমা করো। আমাদের পা সুদৃঢ় রাখো এবং কাফের জাতির বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।' অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কার এবং উত্তম পারলৌকিক পুরস্কার দান করেন। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। হে ঈমানদারগণ! যদি তোমার কাফেরদের আনুগত্য করো, তারা তোমাদেরকে (ঈমানের) বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে এবং তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে। আল্লাহই তো তোমাদের অভিভাবক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।” (কুরআন, ৩:১৪৬-১৫০)

আল্লাহ (৫) এসব ঘটনা আমাদেরকে জানাচ্ছেন, যাতে করে আমাদে পূর্বে যারা গত হয়েছে, তাদের আচরণ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহন করতে পারি তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল: "আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম রক্ষক।' তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল: “হে আমাদের প্রভু, আমাদের পাপ এবং কাজে-কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘনসমূহ ক্ষমা করো, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখুন এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন।" পরীক্ষাটা কি, সেটা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না, বরং তাদের দৃষ্টি চোখের সীমা অতিক্রম করে প্রসারিত ছিল। তারা ইলিউশন বা বিভ্রান্তির মায়াজাল ভেদ করে তাকাতেন এবং নিজেদের মনোযোগ নিবদ্ধ করতেন যিনি আছেন এসবের পেছনে। আর তিনি হলেন মহান আল্লাহ তা'আলা। আল্লাহ তা'আলাই যে এসব পরীক্ষা নিচ্ছেন, তারা শুধু এতটুকুই উপলব্ধি করেনি, বরং এসব থেকে তাদেরকে কেবল আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন, সেটাও তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তারা ক্ষমা, সবর এবং নিজেদের নৈতিক চরিত্র তথা তাকওয়া সমুন্নত করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে তাঁরই সাহায্য লাভের জন্য সবিনয় প্রার্থনা করেছিলেন।

তবে সবচেয়ে আশ্বাসের বিষয় হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মুমিনদেরকে আশ্বাস দিচ্ছেন এবং তাদেরকে সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন:

"তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, তবে একই রকম আঘাত তো তাদেরও (অর্থাৎ বদরে মুশরিকদেরও) লেগেছিল। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলির পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই, যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য হতে কতককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আল আল্লাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন এবং কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেন। তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে (আল্লাহর পথে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছে এবং কে সবর করেছে, তা এখনো প্রকাশ করেননি?" (কুরআন, ৩: ۱۳۹-১৪২)

জীবনকে আমরা যে লেন্স দিয়ে দেখি, একবার যখন আমরা তা বদলে ফেলবো, তখন আমাদের অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার ধরন ব্যাপকভাবে বদলে যাবে। আমাদের পূর্ববর্তী নেককারগণ যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন সেটা তাদের ঈমান ও আনুগত্যকে শুধু বৃদ্ধিই করেছিল। কুরআন বর্ণনা করছে:
"মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো, তারা বলে উঠলো, 'এটা তো তা-ই, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যার ওয়াদা আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল।” (কুরআন, ৩৩:২২)

যতক্ষণ না আমরা ওই লেন্সটি বদলাচ্ছি, ততক্ষণ আমাদের পক্ষে "কিভাবে আমাদের সাথে এমনটি ঘটলো?” এ জাতীয় প্রশ্ন ভেদ করে, পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার জন্য দৃষ্টিকে সম্মুখে প্রসারিত করা সম্ভব হবে না। (বস্তুত এ পরীক্ষা হলো) স্রষ্টার সৃষ্ট এক হাতিয়ার, যার উদ্দেশ্য হলো: (মুমিনদের) পরিশুদ্ধ করা (তাদের ঈমানকে) মজবুত করা এবং আপনার, আমার এবং আমাদের সকল শত্রুর যিনি স্রষ্টা, তাঁর নৈকট্য অর্জন করা।

টিকাঃ
* লেখিকা এখানে আমেরিকার কথা বুঝাচ্ছেন-(সম্পাদক)।
৩২ হলোগ্রাম: এক বিশেষ ধরনের ছবি। লেজার রশ্মি দিয়ে তৈরি করা এ ধরনের ছবিকে ত্রিমাত্রিক বলে মনে হয় -(সম্পাদক)।
**- (সম্পাদক)।
** আমেরকিার প্রেক্ষাপটে লেখা বিধায় এই উদাহরণগুলি এনেছেন লেখিকা। অন্যান্য দেশেও একইভাবে সেসব দেশের সরকার, গোয়েন্দা বিভাগ, মিডিয়া বা জনগণের নাম এ স্থানে আসবে - (সম্পাদক)।
** আল-হাক: মহান আল্লাহ তা'আলার একটি নাম (সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 এই জীবন: কয়েদখানা নাকি স্বর্গ?

📄 এই জীবন: কয়েদখানা নাকি স্বর্গ?


আমি তখন বিমান বন্দরে। নিরাপত্তা লাইনে দাঁড়িয়ে। আর অপেক্ষা করছিলাম আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ছোট একটি মেয়ের দিকে আমার নজর পড়লো। মেয়েটি ছিল তার মায়ের সাথে। ছোট্ট মেয়েটি কাঁদছিল। স্পষ্টত সে ছিল অসুস্থ। তার মা ব্যাগ থেকে বের করে তাকে কিছু ঔষধ দিল। মেয়েটির দুঃখজনক অবস্থা আমাকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছিলো। সহসা আমার কাছে একটা বিষয় ধরা পড়লো। আমার মনে হলো, আমি এমন কাউকে দেখছি, যে একটি ফাঁদে আটকা পড়ে আছে। এই নিষ্পাপ ও পবিত্র আত্মাখানি পার্থিব এক দেহে বন্দি, যাকে অসুস্থ হতে হয়, কষ্ট ভোগ করতে হয় এবং দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়।

আর ঠিক তখনই নবি (ﷺ)-এর ওই হাদিসের কথা আমার মনে পড়ে, যেখানে তিনি বলেন:
"এই দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” [সহিহ মুসলিম]

আর প্রথমবারের মতো এই হাদিসের বক্তব্য আমি আগের চেয়ে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করলাম। কাফিররা এই দুনিয়া ভোগবিলাসে পার করবে, অন্যদিকে মুমিনগণ এই জীবনে হালাল ও হারামের মাঝে আটকে থাকতে বাধ্য এবং নিজেদেরকে উপভোগের জন্য আখিরাত পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই, হাদিসটিকে যারা এভাবে ব্যাখ্যা করেন, তারা একে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করেন না বলে আমি মনে করি। একইভাবে অপরকিছু মানুষের ধারণা এই হাদিসের তাৎপর্য হচ্ছে: এই দুনিয়ার জীবন হবে মুমিনের জন্য হবে দুদর্শায় পরিপূর্ণ এবং কাফিরের জন্য এই দুনিয়া পরম সুখের।

কিন্তু, [হাদিসটির তাৎপর্য এরূপ], আমি আদৌ তা মনে করি না।

সহসাই আমার মনে হলো, আমি যেন ওই ছোট্ট মেয়েটির মাঝে এই হাদিসের প্রকৃত বাস্তবতা দেখতে পাচ্ছি। আমি দেখতে পেলাম এক বন্দী আত্মাকে, বন্দি এই কারণে যে, সে মূলত: এক ভিন্ন জগতের বান্দিা, এক উন্নততর জগতের, যে জগতে তাকে কখনো অসুস্থ হতে হয় না।

কিন্তু [পরিস্থিতি] এটার বিপরীত হলে, কেমন হবে? আত্মা যখন ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করে যে, সে জান্নাতেই আছে। তখন ওই আত্মা কি কখনো অন্য কোথাও যেতে চাইবে? এর চেয়ে ভালো কোথাও? না। সে তো ঠিক সেখানেই আছে, যেখানে সে থাকতে ইচ্ছুক। ওই আত্মার কাছে এর চেয়ে 'উন্নত' কোনো নিবাস থাকতে পারে না। যখন আপনি স্বর্গেই আছেন, তখন আপনি অন্য কোথাও যাওয়ার কল্পনাও করতে পারবেন না। অন্য কিছুর জন্য আকুলভাবে আকাঙ্ক্ষা করবে না। এর চেয়ে অধিক কিছুও চাইবেন না। আপনি যেখানে আছেন, তাতেই আপনি সন্তুষ্ট, পরিতৃপ্ত। এটাই একজন অবিশ্বাসীর মানসিকতা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট এবং এতেই পরিতৃপ্ত থাকে এবং যারা আমার আয়াতগুলো সম্বন্ধে গাফেল।"
إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ (কুরআন, ১০:৭)

অবিশ্বাসী আত্মার জন্য এই অনিবার্যভাবে কষ্টকর, হতাশায় পরিপূর্ণ ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াই হলো স্বর্গ। এতটুকুই তারা জানে। এ অবস্থার কথা একবার ভেবে দেখুন, এমন এক দুনিয়া, যেখানে আপনাকে পতিত হতে হয়, রক্তাক্ত হতে হয় এবং শেষ অবধি সেখানে আপনাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়, সেটাই আপনার জানা একমাত্র স্বর্গ। এর ভয়াবহ যাতনার কথা একবার কল্পনা করুন।

[এই দুনিয়ার চেয়ে] উন্নত কোনো স্থান থাকতে পারে, যারা এটা বিশ্বাস করে না, যারা এই দুনিয়াকেই সর্বোত্তম পাওয়া হিসেবে বিশ্বাস করে, এই দুনিয়ার অপূর্ণতা দেখে খুব সহজেই তারা চরম বিচলিত হয়ে উঠে। খুব সহজেই তারা রাগে ও ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং সহসাই তারা বিধ্বস্ত হয়। কেননা, এই দুনিয়াই তো (তাদের বিবেচনায়) স্বর্গ হওয়ার কথা ছিল। এটার চেয়েও সমৃদ্ধ কিছু যে আছে, তারা সেটা উপলব্ধি করে না। তাই তারা কেবল এটাকেই পেতে চায়। এটার পেছনেই তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। স্রষ্টার দেওয়া প্রতিটি শক্তি, প্রতিটি সামর্থ্য, প্রতিটি সুযোগ এবং প্রতিটি নেয়ামতকে তারা কেবল এই দুনিয়া হাসিলের জন্য ব্যয় করে, (কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো) সেখানে তাদের জন্য (স্রষ্টার তরফ থেকে) যা ধার্য করা হয়েছে, তা ছাড়া কিছুই তাদের কাছে ধরা দেবে না।

তাদের আত্মা এই পার্থিব দেহের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে, যেহেতু তাদের বিবেচনায় এ দেহই তাদের একমাত্র স্বর্গ – বর্তমান ও ভবিষ্যতেও। তাই একে ছেড়ে যেতে চায় না। যেকোনো মূল্যে এই দেহকে সে (অর্থাৎ অবিশ্বাসী আত্মা) আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। (অবিশ্বাসী) আত্মাকে মৃত্যুর সময় তার এই 'স্বর্গ' থেকে তুলে নেওয়াটাই তার জন্য সব থেকে ভয়ংকর আযাব। অবিশ্বাসীদের মৃত্যুকে আল্লাহ এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যেন তাদের আত্মাকে টেনে হিঁচড়ে দেহ থেকে বের করা হচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
"ওই (ফেরেশতাদের) শপথ, যারা (পাপাচারীদের আত্মাকে) ক্ষিপ্রতার সাথে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে।" وَالنَّازِعَاتِ غَرْقًا (কুরআন, ৭৯:১)

এটা ছিন্নভিন্ন হয়। কেননা, আত্মা চায় না দেহকে ছাড়তে। সে তো বিশ্বাস করতো সে স্বর্গেই আছে। এর থেকেও শ্রেষ্ঠতর, আরও বহুগুণে শ্রেষ্ঠতর কিছু আছে, তা সে কখনোই ভাবেনি।

ঈমানদার আত্মার জন্য বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। ঈমানদার ব্যক্তি তো আছে কয়েদখানায়, সে তো কোনো স্বর্গে নেই। কেন? কয়েদি বলতে কি বুঝায়? যে কোথাও আটকা পড়ে আছে, সেই তো কয়েদি। কয়েদিকে নিজের আবাস থেকে দূরে রাখা হয়, এক জায়গাতে আটক অবস্থায়। অপরদিকে তার অবস্থা হলো সে চায় এখান থেকে উত্তম কোথাও যেতে। দুনিয়াবি দেহ ঈমানদারদের জন্য এক কয়েদখানার মতো, এটা এজন্য নয় যে, ঈমানদার আত্মার জন্য দুনিয়ার এই জীবন চরম দুর্দশাগ্র বরঞ্চ বিশ্বাসী আত্মা এর থেকে উন্নততর এবং শ্রেষ্ঠতর কোথাও যাওয়ার জন ভীষণভাবে ব্যাকুল। আপন নিবাসে ফিরে যেতে সে আকুল।

ঈমানদারের জন্য, এই দুনিয়ার জীবন যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, পূর্ণতায় ভরপুর যে জীবন তার জন্য অপেক্ষা করছে, তার তুলনায় এই জীবন কয়েদখানা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ আত্মার যা কিছু অনুরাগ-আসক্তি, তা হলো: মহান আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য এবং তাঁর কাছে যে জান্নাত আছে, তার প্রতি। এটা সেখানেই যেতে চায়। কিন্তু এই দুনিয়ার জীবন আত্মাকে সেখানে ফিরে যাওয়া থেকে আটকে রাখে- ক্ষণিকের জন্য হলেও। এটা একটা বাধা এবং এক কয়েদখানা। যদিও একজন বিশ্বাসীর আত্মাই এই দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত স্বর্গের সন্ধান লাভ করে, তথাপি তার আত্মা এর থেকেও বেশি কিছু কামনা করে। সে আপন গৃহে ফিরতে চায়। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য আত্মাকে দেহ নামক এই কারাগারে থাকতেই হবে। বাড়ির ফিরে যাওয়ার জন্য মুক্তি পাওয়ার আগে, এই 'কারাবাস' তাকে করতেই হবে। ঈমানদার আত্মার অনুরাগ-আকর্ষণ কখনোই তাকে বন্দি করে রাখা এই দেহের সাথে নয়। দণ্ড যখন সমাপ্ত হয় এবং কয়েদিকে যখন বলা হয়, সে এখন বাড়ি ফিরে যেতে পারে, তখন সে কখনো কারাগারের গারদ ধরে বসে থাকবে না। আর তাই আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের মৃত্যুকে একেবারে ভিন্নভাবে চিত্রিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"ওই (ফেরেশতাদের) শপথ, যারা (ঈমানদারদের আত্মাকে) অত্যন্ত মৃদুভাবে বের করে আনে।" وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا (কুরআন, ৭৯:২)

ঈমানদার আত্মা খুব সহজেই দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। 'তার "কারাদণ্ড" সমাপ্ত হয়েছে, আর এখন সে বাড়ি ফিরেছে। কাফিরদের আত্মা যেমন দুনিয়ার দেহকেই সর্বোত্তম আবাস ভেবে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকে, ঈমানদারদের আত্মা তেমনটি কখনোই করে না।

আর, তাই আমাদের প্রিয় নবি (ﷺ) যে নিখুঁত উপমা দিয়েছেন, তার থেকে উত্তম কোনো উপমা আমি কল্পনা করতে পারছি না। সত্যই এই পার্থিব জীবন ঈমানদারদের জন্য কয়েদখানা এবং কাফেরদের জন্য এটা এক স্বর্গ। আমাদেরকে সবাইকে একই আহ্বানকারী আহ্বান জানাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এমনভাবে আমাদের জীবন কাটাবো যে, যখন ডাক আসবে, তখন আমরা কারাগারের গারদ আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইবো? নাকি এমন জীবন কাটাবো, যখন ডাক আসবে, তখন তা হবে আমাদের মুক্তির ডাক। তা হবে ঘরে ফেরার ডাক।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক

📄 সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক


গড়ার উদ্দেশ্যেই তিনি আপনাকে ভাঙেন। দেওয়ার জন্যই তিনি আপনাকে রাখেন বঞ্চিত। এই জীবনের জন্য আকুল না হয়ে আপনি যেন জান্নাতের জন্য ব্যাকুল হন, সেজন্যই তিনি আপনার অন্তরে সৃষ্টি করেছেন বিরহ ও বেদনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00