📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 দুনিয়ার জীবন যেন এক রঙ্গমঞ্চ

📄 দুনিয়ার জীবন যেন এক রঙ্গমঞ্চ


এটা কেবলই একটা স্বপ্ন ছিল। ক্ষণিক কালের জন্য এটা আমাকে আচ্ছন্ন করে। তথাপি ওই দুঃস্বপ্নে আমি যে যন্ত্রণা অনুভব করি, সেটা এক বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। তাও সেটা ক্ষণস্থায়ী। চোখের পলক ফেলার মতো। কিন্তু আমি কেন স্বপ্ন দেখি? আমাকেই বা কেন আমার ঘুমের মাঝে ওই ধরনের ক্ষয়, ভয় ও দুঃখের অনুভূতি অনুভব করতে হবে?

বৃহত্তর পরিমণ্ডলে এটা এমনই এক প্রশ্ন, যা যুগ যুগে জিজ্ঞাসিত হয়ে আসছে। আর অনেকের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর তার ঈমানের দিকে পথচলা কিংবা সেখান থেকে বিচ্যুতি নির্ধারণ করেছে। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, জীবনের উদ্দেশ্যে বিশ্বাস, উচ্চতর ব্যবস্থা বা চূড়ান্ত গন্তব্যে বিশ্বাস রাখা অনেক সময়ই এসব বিষয় নির্ভর করে কেবল এই একটি প্রশ্নের জবাবের ওপর। তাই এই প্রশ্ন করার অর্থ হলো: চূড়ান্ত বিচারে জীবন সম্বন্ধে প্রশ্ন করা।

কেন আমরা কষ্ট ভোগ করি? ভালো লোকদের সাথেই কেন খারাপটি ঘটে? স্রষ্টা যদি থেকেই থাকে, তবে শিশুরা কেন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাবে, আর অপরাধীরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াবে? সর্বপ্রেমময় এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একক স্রষ্টার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া কিভাবে সম্ভব, যিনি এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটতে দেন?

সত্যই যদি আল্লাহ ন্যায়বিচারক ও কল্যাণময় হয়ে থাকেন, তবে ভালো লোকদের সাথে কেবল 'ভালো' এবং মন্দ লোকদের সাথে কেবল 'মন্দ' পরিণতি ঘটার কথা ছিল না কি?

প্রকৃতঅর্থে এর উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ, এটা সম্পূর্ণভাবে খাঁটি কথা। ভালো মানুষেরই পরিণতি কেবল ভালো হয়। মন্দ মানুষের পরিণতি কেবলই মন্দ হয়। কেন? কারণ, আল্লাহই সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ এবং তিনিই সবচেয়ে প্রেমময়। আর তাঁর জ্ঞানে কিংবা তাঁর প্রজ্ঞায় নেই কোনো ঘাটতি বা কমতি।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জ্ঞান ও উপলব্ধিতে আমাদেরই কমতি বা ঘাটতি রয়েছে।

লক্ষ্য করুন, "ভালো মানুষের পরিণতি কেবল ভালো হয়। মন্দ মানুষের পরিণতি কেবল মন্দ হয়" এই বাক্যটির মর্ম উপলব্ধি করতে হলে সবার আগে আমাদেরকে 'ভালো' ও 'মন্দ'-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। যদিও দুনিয়াতে যত লোক রয়েছে, ভালো ও মন্দের সংজ্ঞাও ঠিক তত, তথাপি ভালো ও মন্দের একটি বোধগম্য উপলব্ধি (সবার মাঝে) বিদ্যমান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বা গন্তব্যে পৌঁছানোতে সফল হওয়াকে সবাই 'ভালো' বলে মেনে নিতে একমত হবে। অন্যদিকে নিজের আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বা গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়াটা 'মন্দ' বলে বিবেচিত হবে। ভীষণভাবে ওজনহীন হওয়ার কারণে আমার লক্ষ্য যদি ওজন বাড়ানো হয়, তবে ভারী হওয়াটা আমার জন্য ভালো বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে বিপজ্জনকভাবে মোটা হওয়ার কারণে আমার লক্ষ্য যদি ওজন কমানো হয়, তবে মোটা হওয়াটা হবে মন্দ। আমার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে একই ঘটনা হতে পারে ভালো কিংবা মন্দ। তাই আমার দৃষ্টিতে 'ভালো' নির্ভর করছে আমার ব্যক্তিগত অর্জনের ওপর। এদিকে চূড়ান্ত 'ভালো' নির্ভর করছে আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের ওপর।

কিন্তু আমার লক্ষ্যটা কি?

এ প্রশ্নটা আমাদেরকে জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেহেতু এটা আমাদের অস্তিত্বের উচ্চতর বাস্তবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের বিষয়ে কথা আসলেই অপরিহার্যভাবে দুটো পৃথক বিশ্ব-দর্শনের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম বিশ্ব-দর্শনের মতে, এই জীবনটাই বাস্তবতা, এটাই চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল এবং আমাদের সকল চেষ্টার লক্ষ্যও এই দুনিয়া। দ্বিতীয় বিশ্ব-দর্শনের মতে, এই জীবন কেবল একটি সেতু, একটি মাধ্যম, যা স্রষ্টার অসীম বাস্তবতার মোকাবেলায় একটি ঝলক ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রথম দলভুক্ত লোকদের জন্য এই দুনিয়াটাই সব। সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার লক্ষ্য এই দুনিয়া প্রাপ্তি। অন্যদিকে দ্বিতীয় দলভুক্ত লোকদের জন্য এই জীবন শূন্যের পানে ধেয়ে চলছে। কেন? কারণ অসীমের সাথে যত বড় সংখ্যাই তুলনা করা হোক না কেন, তা শূন্যে পরিণত হয়। এই জীবন [তাদের নিকট] কিছুই না। [তাদের নিকট] এটা যেন ক্ষণিকের স্বপ্ন।

এই দুটো আলাদা বিশ্ব-দর্শন জীবনের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত প্রশ্নকে সরাসরি প্রভাবিত করে। লক্ষ্য করুন, যিনি বিশ্বাস করেন, এই জীবনটাই আসল, এটাই চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল এবং এটাই সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য, তবে তার কাছে জীবনের উদ্দেশ্য হবে, এই জীবনকে সর্বোচ্চ পরিমাণ সুখ ও আনন্দ এবং বস্তুগত সফলতা দিয়ে ভরে ফেলা। এ নমুনা অনুযায়ী প্রকৃতঅর্থেই 'ভালো' লোকগণ প্রতিটি সেকেন্ডে 'মন্দ' পরিণতি বরণ করছে। এরকম নমুনায় লোকজন এই উপসংহারে পৌঁছায় যে, এই দুনিয়ায় ন্যায় বলে কিছুই নেই, তাই হয় স্রষ্টা বলে কেউ নেই, আর থাকলেও তিনি ন্যায়বিচারক নন (ওয়া নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি)। এটা অনেকটা ওই লোকের মতো, যিনি একটা খারাপ স্বপ্ন দেখার কারণে এ উপসংহার টেনেছেন যে, স্রষ্টা বলে কেউ নেই। কিন্তু আমরা আমাদের স্বপ্নের ওই অভিজ্ঞতাকে যথাযথ ওজন দিচ্ছি না কেন? তদপুরি, কিছু স্বপ্নের অভিজ্ঞতা তো বেশ ভয়ানক এবং 'ভালো' লোকের বেলায় প্রায়শই এমনটি ঘটে। আমাদের স্বপ্নে আমরা কি ভয়াবহ ধরনের আতঙ্ক কিংবা চরম মাত্রার প্রশান্তি অনুভব করি না? হ্যাঁ, করি। কিন্তু সেটা এতোটা গুরুত্ব রাখে না কেন?

কারণ, আমাদের "প্রকৃত" জীবনের নিরীখে এটা তেমন কিছুই নয়।

দ্বিতীয় বিশ্ব-দর্শন (তথা ইসলাম অনুযায়ী) এ জীবন একটা স্বপ্নের চেয়ে বেশি কিছু নয়, তাই সর্বোচ্চ পরিমাণ সুখ ও অর্জন দিয়ে ভরে ফেলাটা, এই জীবন সৃষ্টির উদ্দেশ্য নয়। এই বিশ্ব-দর্শনে জীবনের উদ্দেশ্যটা কি, স্রষ্টা তা ঠিক করে দিয়েছেন এবং তিনি আমাদেরকে [সেটা] জানিয়ে দিচ্ছেন:
“আমার ইবাদত করা ছাড়া (অন্য কোনো উদ্দেশ্যে) আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করিনি।” (কুরআন, ৫১:৫৬)

এই বাক্যের বিশেষ গঠন কাঠামোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুরু হয়েছে "অস্বীকৃতি” বা “নাকচ” করার দ্বারা: "আমি সৃষ্টি করিনি জিন ও ইনসানকে।" প্রথমেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জীবনের আর সব উদ্দেশ্যকে প্রত্যাখ্যান করেন; অতঃপর তিনি মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অবগত করেন, “শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করা।" একজন ঈমানদার হিসেবে আমার নিকট এটার মর্ম হচ্ছে: আল্লাহকে জানা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর নৈকট্য অর্জন করা ছাড়া আমার অস্তিত্বের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। এটাই একমাত্র কারণ, যার জন্য আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি, যেহেতু আমার কর্ম ও বিশ্বাস কি হবে, সেটা নির্ধারিত হয় এই উপলব্ধির ভিত্তিতে। আমার চারপাশে যা কিছু আছে এবং জীবনে আমি যত অভিজ্ঞতা লাভ করি, তার সবকিছুই নির্ধারিত হয় এই উপলব্ধির আলোকে।

'ভালো' ও 'মন্দে'র সংজ্ঞার আলোচনায় ফিরলে আমরা দেখতে পাই, চূড়ান্ত বিবেচনায়, যা আমাদেরকে আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত করে, তা 'ভালো' এবং যা আমাদেরকে ওই উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরায়, তাই 'মন্দ'। তুলনামূলকভাবে, বস্তুগত এই দুনিয়াই যার লক্ষ্য, বস্তুগত জিনিসই তাদের 'ভালো' ও 'মন্দ' ঠিক করে দেয়। তাদের জন্য ধনসম্পদ, মর্যাদা, খ্যাতি কিংবা সম্পত্তি অর্জন করাটা অপরিহার্যভাবে 'ভালো' এবং সম্পদ, মর্যাদা, খ্যাতি বা সম্পত্তি হারানো তো অপরিহার্যভাবে 'মন্দ'। এই দৃষ্টান্ত অনুযায়ী, নিরপরাধ ব্যক্তি যখন তার সব বস্তুগত অর্জন হারিয়ে ফেলে, তখন তার মানে দাঁড়াচ্ছে: একজন 'ভালো' লোক 'মন্দ' পরিণতির কবলে পড়েছে। বস্তুত: ত্রুটিযুক্ত বিশ্ব-দর্শনের পরিণতিতেই এমন ভ্রমের সৃষ্টি হয়। লেন্সই যখন ত্রুটিপূর্ণ, তখন ওই লেন্স দিয়ে দেখা সকল ছবিই হবে ত্রুটিতে ভরা।

দ্বিতীয় বিশ্ব-দর্শনের লোকদের নিকট, আল্লাহর ভালোবাসার সান্নিধ্য লাভের যে উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা কিছু এই উদ্দেশ্যের কাছাকাছি আমাদেরকে পৌঁছে দেয়, তা ভালো এবং যা কিছু আমাদেরকে ওই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে, তা মন্দ। বিলিয়ন ডলার জেতাটা হবে আমার জন্য হবে চরম মুসিবতের, যদি সেটা আমাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং আমাকে আমার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরায়। অন্যদিকে চাকরি হারানো, নিজের সকল ধনসম্পদ হারানো, এমনকি অসুস্থ হয়ে পড়াটাও হবে বাস্তবিকপক্ষে আমার জন্য সীমাহীন আশীর্বাদের, যদি সেটা আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, যা চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। কুরআনে আল্লাহ এই বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেছেন, যখন আল্লাহ (৬) বলেন:
"হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হয়তো তোমরা কোনো জিনিস পছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। বস্তুত আল্লাহই জানেন এবং তোমরা জানো না।"
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (কুরআন, ২:২১৬)

একজন ঈমানদার হিসেবে বস্তুগত দৃষ্টির মানদণ্ডে লাভ ও ক্ষতি মাপাটা এখন আর আমার মানদণ্ড নয়। আমার মাপকাঠি এসবের চেয়ে মহান কিছু। পার্থিব বিবেচনায় আমার কি আছে বা নেই, সেগুলো আমাকে কতটুকু আল্লাহর নিকটবর্তী করে কিংবা আমাকে আমার লক্ষ্য তথা আল্লাহ থেকে কতটুকু বিচ্যুত করে, তার ভিত্তিতেই সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতার মূল্যায়ন হবে। এই দুনিয়ার (জীবন) আমার কাছে ওই স্বপ্নের চেয়ে বেশি কিছু নয়, কিছু সময়ের জন্য আমি যেটার অভিজ্ঞতা লাভ করি এবং এরপর আমি জেগে উঠি। ওই স্বপ্নটি কি ভালো ছিল নাকি মন্দ ছিল, সেটা নির্ভর করে জাগ্রত হওয়ার পর আমার অবস্থার ওপর।

অতএব, চূড়ান্ত মানদণ্ডের আল্লাহর ব্যবস্থাপনা পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ শুধু ভালো লোকদেরই মঙ্গল করেন (তথা তাঁর নৈকট্য দিয়ে থাকেন) এবং তিনি শুধু খারাপ লোকেরই কপাল পুড়ান (তথা তাঁর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত করে)। এই পার্থিব জীবন ও আখিরাতের জীবনে আল্লাহর নৈকট্য লাভই সর্বোত্তম মঙ্গল এবং 'ভালো' মানুষের কপালেই শুধু এই সৌভাগ্য জুটে। এই কারণে নবি (স) বলেন:
"ঈমানদারের বিষয়টি আসলেই অবাক করার মতো। সবকিছুতেই তার জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং এটা শুধু ঈমানদারের জন্যই। যদি তার কাছে কোনো কল্যাণ পৌঁছায় সে আল্লাহর শোকর আদায় করে, যেটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” [মুসলিম]

নবি (স)-এর বাণী কিংবা কাজের সংরক্ষিত এই বিবরণ তথা এই হাদিসে ব্যাখ্যা মোতাবেক, বাহ্যিকভাবে যা দৃশ্যমান হয়, 'ভালো' এবং 'মন্দ' সেটার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। এই হাদিসের ব্যাখ্যা অনুসারে, [কোনোকিছুর] 'ভালো' নির্ধারিত হয়, ওই জিনিস অন্তর্নিহিতভাবে যে উত্তম অবস্থা তৈরি করে তার ওপর [যেমন]: ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা -আর এই দুটো গুণই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর প্রশান্তির বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে, এই জীবন ও আখিরাতে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় মুসিবত। আর 'মন্দ' লোকদেরই এর দ্বারা শান্তি দেওয়া হয়। [আল্লাহর নৈকট্য থেকে] 'দূরে সরা বা বিচ্যুত' এসব লোকের সম্পদ বা মর্যাদা বা প্রতিপত্তি বা সম্পত্তি আছে কি নেই, সেগুলো ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। সব থেকে মধুর বা সব থেকে ভয়ানক দুঃস্বপ্নে আপনি কি পেলেন আর কি হারালেন, সেগুলো যেমন বাস্তব নয়, গুরুত্বপূর্ণও নয়। তেমনিভাবে [আল্লাহর নৈকট্য থেকে বিচ্যুত ব্যক্তির অর্জনও] ওই স্বপ্নে পাওয়া জিনিসের মতোই মূল্যহীন ও অনর্থক।

এসব মোহ ও ভ্রম সম্পর্কে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
"এদের বিভিন্ন দলকে পরীক্ষার জন্য পার্থিব জীবনের চাকচিক্যে আচ্ছাদিত ভোগের যেসব সামগ্রী দিয়েছি, সেগুলোর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করবেন না। কেননা, আপনার স্রষ্টার দেওয়া রিযিকই উত্তম ও অধিক স্থায়ী।” (কুরআন, ২০:১৩১)

স্থায়ী জীবন তো সেটাই, যেটার সূচনা তখনই হয়, যখন আমরা এই দুনিয়ার [মায়াজাল থেকে] জাগ্রত হই। আর ওই জাগরণের মাঝেই আমরা উপলব্ধি করি ...
এটা [পার্থিব জীবন] ছিল কেবলই এক স্বপ্ন।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 বদ্ধ দুয়ার এবং যেসব মায়া-মোহ আমাদেরকে অন্ধ করে রাখে

📄 বদ্ধ দুয়ার এবং যেসব মায়া-মোহ আমাদেরকে অন্ধ করে রাখে


গতকাল আমার ২২ মাস বয়সী ছেলে প্রথমবারের মতো তার স্বাধীনতা চর্চা করতে চেয়েছিল। গাড়িতে নিজের আসন থেকে কোনো রকম বের হয়েছে, বড়দের মতো সে গাড়ির দরজা বন্ধ করতে চাইলো। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে তার ওপর নজরদারি করছিলাম। আমি অনুভব করলাম যে, আমি যদি তাকে গাড়ির দরজা বন্ধ করতে দিই, তবে তা করতে গিয়ে তার ছোট্ট মাথাটুকু সজোড়ে আঘাত পেয়ে থেতলে যাবে। তাই আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম এবং নিজেই গাড়ির দরজা বন্ধ করলাম। এটা তাকে ভীষণভাবে মনোঃক্ষুন্ন করে এবং সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। যে কাজ করতে সে এতো ভীষণভাবে উদগ্রীব, তা করতে কিভাবে আমি তাকে বাধা দিলাম?

এই ঘটনা দেখে আমার মনে আশ্চর্যজনক এক চিন্তার উদ্ভব ঘটে। আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া একই রকম ঘটনাগুলি আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো -যখন আমরা ব্যাকুলভাবে কিছু চাই, কিন্তু আল্লাহ সেটা লাভ করার অনুমতি আমাদের দেন না। আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো, সেসব সময়ের কথা, যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে আমরা সবাই এই একই ধরনের হতাশায় ভুগি, যখন আমাদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও পরিস্থিতি আমাদের প্রত্যাশা মোতাবেক হয় না। আর তখন সহসাই বিষয়টি খুব পরিষ্কার হয়ে গেল। [গাড়ির] দরজার আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্যই আমি আমার ছেলেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই। কিন্তু এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণাই ছিল না। আমার ছেলে যেভাবে তার সারল্য ও নিষ্পাপ বোধ থেকে কান্না করেছিল, প্রায়শই আমরা সেভাবে বিলাপ করতে থাকি, যেখানে বাস্তবতা হচ্ছে: [ওই না পাওয়াটাই আমাদেরকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে।

যখন আমরা বিমানের ফ্লাইট মিস করি, চাকরি হারাই কিংবা আমাদের মনের মানুষকে বিবাহ করতে ব্যর্থ হই, তখন একবারের জন্যও আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, হয়তো এমনটি আমাদের মঙ্গলের জন্যই হয়েছে? কুরআনে আল্লাহ আমাদেরকে অবহিত করেন:
“... হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হয়তো তোমরা কোনো জিনিস পছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন এবং তোমরা জানো না।” (কুরআন, ২:২১৬)

তারপরও কোনো জিনিসের বর্হিভাগ ভেদ করে দেখাটা বেশ কঠিন। মায়া ও মোহজাল ভেদ করে অন্তর্নিহিত সত্যের দেখা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট (মানসিক) শক্তির প্রয়োজন হয়, হয়তো আমরা সে সত্য উপলব্ধি করতে পারি, আবার নাও করতে পারি। ঠিক যেভাবে আমার ছেলেটা বুঝতে অক্ষম ছিল যে, ওই মুহূর্তে তার ঐকান্তিক চাওয়া থেকে বিরত করাটাই ছিল তার প্রতি আমার সতর্ক দৃষ্টি রাখার দাবি, ঠিক তেমনি আমরা প্রায়শই একই রকম অন্ধ হয়ে পড়ি।

ফলশ্রুতিতে, আমাদের জীবনের বদ্ধ দুয়ারগুলোতে আমরা অনিশ্চয়তায় ঘেরা চোখ দিয়ে তাকাতে থাকি এবং [আমাদের জন্য] যেসব দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, সেটার দিকে ভ্রুক্ষেপ করতে একদমই ভুলে যাই। যখন আমরা মনের মানুষকে বিয়ে করতে পারি না, তখন [ঘটনার বাহ্যিকতা] ভেদ করে সামনে তাকানোর অক্ষমতা আমাদেরকে এতোটাই অন্ধ বানায় যে, ওই মানুষটির থেকে উত্তম কেউ যে থাকতে পারে, সে ব্যাপারে পুরোপুরি অন্ধ বনে যাই। যখন আমাদেরকে চাকুরিটা দেওয়া হয় না, কিংবা যখন আমরা সাধের কোনো বস্তু হারিয়ে ফেলি, তখন এক পা পেছনে গিয়ে গোটা দৃশ্যটা (The bigger picture) অবলোকন করা আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায়শই আল্লাহ আমাদের থেকে বিভিন্ন জিনিস কেড়ে নেন, যাতে করে সেগুলোর বদলে উত্তম কিছু [আমাদেরকে] দিতে পারেন।

এমনকি ট্রাজেডিও এজন্য ঘটতে পারে। সন্তান হারানোর চেয়ে বড় কোনো বেদনা কেউ কল্পনা করতে পারে না। তথাপি এই ক্ষতিও পারে আমাদেরকে রক্ষা করতে এবং উত্তম কিছু দিতে।

নবি (ﷺ) বলেন:
“(আল্লাহর) কোনো বান্দার সন্তান যখন মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তখন ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন: 'তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানের [প্রাণ] হরণ করে নিয়ে আসলে?' ফেরেশতাগণ উত্তরে বলেন: 'হ্যাঁ।'

আল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'তোমরা কি তার কলিজার টুকরোকে তুলে এনেছো?' তারা উত্তরে বলেন: 'হ্যাঁ।'

আল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'আমার বান্দা তখন কি বলে?'

ফেরেশতাগণ উত্তরে বলেন: 'সে আল্লাহর প্রশংসা করেছে এবং বলেছে: 'আল্লাহর কাছেই আমরা প্রত্যাবর্তন করি।'

আল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'জান্নাতে আমার বান্দার জন্য একটি ঘর নিমার্ণ করো এবং এটার নাম রাখো 'বায়তুল হামদ' (প্রশংসার ঘর)।” [তিরমিযি]

সন্তানের মতো প্রিয় বস্তু যখন আল্লাহ আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেন, হয়তো তিনি আমাদেরকে আরও কল্যাণকর কিছু দিতে চাইছেন, তাই তিনি এমনটি করেছেন। হয়তো ওই হারানোর কারণেই আমাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে এবং সেখানে ওই সন্তানের সাথে পার করবো আমরা চিরকালের জিন্দেগি। দুনিয়ার এই জীবনের মতো ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং এক চিরস্থায়ী জীবন, যেখানে আমাদের সন্তানের না থাকবে কোনো কষ্ট ও ভয়, আর না থাকবে সেখানে কোনো অসুস্থতা।

আমাদের এই জীবনের অসুস্থতা ও রোগ-বালাইও কিন্তু তেমনটি নয়, যেমনটি আমরা সেগুলোকে ভাবছি। এগুলোর মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ আমাদের পাপগুলো ধুয়ে মুছে আমাদের পরিশুদ্ধ করে নিচ্ছেন। যখন নবি () কঠিন জ্বরে ভুগছিলেন, তখন তিনি বলেন:
"মুসলিম যখন কোনো কষ্টে পতিত হয়, এমনকি তা যদি কাঁটার আঘাতও হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ সেটার দ্বারা তার গুনাহগুলো মুছে দেন, যেমনিভাবে গাছ থেকে তার পাতাগুলো ঝরে পড়ে।" [বুখারি]

দুঃখ ও বিরহের বিষয়টিও যে এরূপ, সেটা নবি (স) অন্য এক হাদিসে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:
"মুসলিমের ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, অসুস্থতা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, ক্ষতি কিংবা নৈরাশ্য আসে -এমনকি তা যদি [দেহে] কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও হয়, তবে আল্লাহ সেগুলোর মাধ্যমে তার পাপগুলো মুছে দেন। [বুখারি]

অথবা দারিদ্রের বিষয়টি বিবেচনা করুন। ধনসম্পদ না থাকা যে সম্ভবত একটি আশীর্বাদ হতে পারে, অধিকাংশ মানুষ এটা কল্পনা করতেই পারে না। কিন্তু কারুনের আশেপাশের লোকজনের বেলায় বিষয়টি এমনই ছিল। কারুন নবি মুসা (আলাহিস সালাম)-এর সমসাময়িক ছিল এবং আল্লাহ তাকে এতোটাই অঢেল সম্পদ দান করেন যে, তার ধনভাণ্ডারের চাবিখানাও মহামূল্যবান সম্পদ ছিল। কুরআন বলে:
"অতঃপর স্বীয় জাঁকজমকে সজ্জিত হয়ে কারুন আপন সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো। পার্থিব জীবনের জন্য যাদের অন্তর কামনাতুর ছিল, তারা বললো: 'হায়, কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, আমাদেরকে যদি তা দেওয়া হতো, আসলেই সে চরম ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত।” (কুরআন, ২৮:৭৯)

কিন্তু কারুনের এই সম্পদ তাকে অহংকারীতে পরিণত করে। সে পরিণত হয় অকৃতজ্ঞে এবং সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। আল্লাহ বলেন:
"আর, আমি কারুন ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম। আল্লাহ ছাড়া এমন কেউই ছিল না যে তাকে সাহায্য করতে পারে। আর সেও পারলো না নিজেকে রক্ষা করতে। আগেরদিন যারা তার মতো মান মর্যাদার কামনা করেছিল, তারা বলতে শুরু করলো, 'দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তিনি সেটাকে সংকুচিত করে নেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না দেখাতেন, তবে আমাদেরকেও ভূগর্ভে প্রোথিত করতেন। দেখলে তো কাফিররা সফলকাম হয় না।” (কুরআন, ২৮:৭৯)

কারুনের এই পরিণতি দেখার পরপরই ওই লোকেরা [আল্লাহর প্রতি] কৃতজ্ঞতা জানায় এই কারণে যে, তারা কারুনের সম্পদ থেকে বেঁচে গেছে।

সম্ভবত, এ ব্যাপারে মুসা (আ,) ও খিযিরের ঘটনার চেয়ে ভালো কোনো উদাহরণ হতে পারে না, যে ঘটনার বিবরণ সুরা আল-কাহাফে বর্ণিত হয়েছে। নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন খিযিরের সাথে ভ্রমণ করছিলেন (বিশ্লেষকদের মতে, যিনি মানবরূপী এক ফেরেশতা ছিলেন), তখন নবি মুসা উপলব্ধি করেন যে, পরিস্থিতি যেরূপ দৃশ্যমান হয়, সেটা সব সময় সেরূপ হয় না এবং বাহ্যিকদৃষ্টি দিয়ে আল্লাহর প্রজ্ঞাকে সর্বদা বোঝা সম্ভব হবে না। খিযির ও নবি মুসা এক জনপদে আসেন, যেখানে [আসতে না আসতেই] খিযির লোকদের নৌকাগুলো ফুটো করে দেন।

বাহ্যিকভাবে, এই কাজ নৌকাগুলোর মালিকদেরকে দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে, যেহেতু তারা দরিদ্র। পরবর্তীতে খিযির ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকৃতপক্ষে [তিনি তাদের কোনো ক্ষতিই করেননি, উল্টো] তাদেরকে এবং তাদের নৌকাগুলোকে তিনি রক্ষা করেছেন।

আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন বলেন:
"(খিযির) বলেন, 'এখানেই আমার ও আপনার মাঝে সম্পর্ক শেষ হলো। আমি আপনাকে ওইসব ঘটনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানাবো, যেগুলোর ব্যাপারে আপনি ধৈর্য ধরে রাখতে পারেননি। নৌকার বিষয়টি এরূপ: এটা ওইসব দরিদ্র লোকের মালিকানাধীন ছিল, যারা সমুদ্রে কাজ করতো। তাই আমি নৌকাটি ফুটো করে দেই, যাতে করে তাদের এই নৌকা ওই রাজার হাত থেকে নিরাপদ থাকে, জোর-জবরদস্তি করে যে কিনা সমস্ত (ভালো) নৌকা দখল করে নিতো।” (কুরআন, ১৮:৭৯-৭৯)

নৌকাগুলোর ক্ষতিসাধন করে খিযির এসব নৌকাকে ওই রাজার চোখে এগুলো অকেজো প্রমাণ করেন, যে রাজা জোর জবরদস্তির মাধ্যমে সকল নৌকা দখল করছিল। আর ঠিক এমনটিই কখনো কখনো আমাদের জীবনে ঘটে। [বিপদ থেকে] বাঁচানোর জন্যই আমাদের থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া হয় কিংবা আমাদের মর্জির উল্টো পথে আমাদেরকে কোনো জিনিস দেওয়া হয়। এরপরও আমার ২২ মাসের শিশু বালকটির মতো আমরাও মনে করতে থাকি আমাদের (সৌভাগ্যের) দুয়ার বন্ধ হয়ে আছে।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 কষ্ট, ক্ষতি এবং আল্লাহর পথ

📄 কষ্ট, ক্ষতি এবং আল্লাহর পথ


আমি আজও আমার মরিয়া হয়ে ওঠার সময়ের কথা স্মরণ করি। তীব্র নৈরাশ্যের পরই আসে আত্ম উপলব্ধি, তাই মিনতি করার জন্য আমি স্রষ্টার দিকে প্রত্যাবর্তন করি। যে জিনিস মাপা যাবে, কেনা যাবে, বিক্রি করা যাবে কিংবা যে জিনিস নিয়ে বাণিজ্য করা যায়, আমার মিনতি সেরকম কিছুর জন্য ছিল না। এটা ছিল অধিকতর সত্য এক জিনিসের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা। নিজের ভুলত্রুটিগুলো হঠাৎ করেই আমার কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে পড়ে এবং আপন নফস তথা প্রবৃত্তির স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্ত হতে আমি মরিয়া হয়ে উঠি। মরিয়া হয়ে উঠি একজন উত্তম মানুষে পরিণত হতে।

আর তাই, নিজের অন্তরকে আল্লাহ (স)-এর হাতে সমর্পণ করে নিজের পরিশুদ্ধির জন্য দু'আ করি। যদিও আমি সব সময় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম যে, আল্লাহ অবশ্যই সকল দু'আ শোনেন, তথাপি ওই দু'আ কখন-অথবা কিভাবে- কবুল হবে, তার ধারণা আমার ছিল না।

এই দু'আর পরপরই, আমি আমার জীবনের অন্যতম এক কঠিন সময় পার করি। এই অভিজ্ঞতা লাভকালে নিজেকে আমি উজ্জীবিত রাখতাম, হেদায়েত ও শক্তি সঞ্চারের জন্য দু'আ করতাম। কিন্তু আমার আগের দু'আর সাথে এ অবস্থার কোনো যোগসূত্র আমি কখনো খুঁজে পেতাম না। ওই কঠিন সময়টুকু পার হওয়ার পর যখনই আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম, কেবল তখনই আমি উপলব্ধি করলাম, কিভাবে আমি পরিণত হয়ে উঠেছি। হঠাৎ করেই আমার দু'আর কথা আমার মনে পড়লো। সহসাই আমি অনুভব করি যে, এই কঠিন পরিস্থিতি নিজেই ছিল আমার ওই দু'আর জবাব, যা আমি এতো কাতরভাবে করেছিলাম।

রুমির বর্ণনার কারুকার্যে বিষয় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে:

"যখন কেউ লাঠি দিয়ে কম্বলে আঘাত করতে থাকেন, তার উদ্দেশ্য কম্বলকে আঘাত করা নয়, বরং তিনি চান কম্বল থেকে ধূলাবালি সরাতে। তোমার অন্তরাত্মা 'আমিত্বের' চাদরের ধূলাবালিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে, আর এই ধূলাবালি একবারে সরে যাবে না। প্রতিটি নির্দয় প্রহার এবং প্রতিটি আঘাতের মাধ্যমে একটু একটু করে অন্তর থেকে [এই আমিত্বের ধূলা] সরে যাবে, কখনো অবচেতনভাবে, আবার কখনো সচেতনভাবে।"

প্রায়শই আমরা জীবনে নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই এবং এসব ঘটনার মধ্যস্থ সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই না। যখন আমাদের ওপর কষ্ট ও দুর্ভোগ নেমে আসে কিংবা আমরা দুঃখ অনুভব করি, তখন প্রায়শই আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই যে, এগুলো অন্য কোনো কাজ বা অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ কারণ বা ফলাফল। আমাদের জীবনের কষ্ট ও দুর্ভোগ এবং আল্লাহ (স)-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক, এই দুটোর মধ্যে যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান, কখনো কখনো আমরা এটা উপলব্ধি করতে পারি না।

ওই কষ্ট এবং ওই প্রতিকূলতা জীবনে বহু উদ্দেশ্য সাধন করে, কষ্ট ও দুর্ভোগের সময়গুলো স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের অবস্থা যাচাই এবং তা সংশোধন করে নেওয়ার জন্য কাজ করতে পারে।

জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলো আমাদের ঈমান, আমাদের আত্মসংযম এবং আমাদের সামর্থ্যের পরীক্ষা নেয়। এই সময়গুলোতেই আমাদের ঈমানের স্তর সুস্পষ্ট হয়। বালা-মুসিবত আমাদের মুখোশ খুলে দেয় এবং ঈমানের নিছক মৌখিক স্বীকৃতির পেছনে লুকানো সত্যকে উন্মোচন করে। কষ্টকর পরিস্থিতি সাচ্চা ঈমানদারদেরকে মেকি ঈমানদারদের থেকে পৃথক করে দেয়। আল্লাহ বলেন:
"মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' শুধু এই কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? আমি তো এদের আগেরকার লোকদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন, (ঈমানের দাবিতে) কারা সত্যবাদী এবং তিনি অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন, কারা (ঈমানের দাবিতে) মিথ্যাবাদী।” (কুরআন, ২৯:২-৩)

কষ্টকর পরিস্থিতি অবশ্যই আমাদেরকে পরীক্ষা করে। আবার এই কষ্ট ও দুর্ভোগ হতে পারে আশীর্বাদ ও আল্লাহর ভালোবাসার এক আলামত। নবি মুহাম্মদ (ﷺ) বলেন:
"যখন আল্লাহ কোনো ব্যক্তির কল্যাণ চান, তখন তাকে কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেন।” [বুখারি]

তবুও কষ্ট ও দুর্ভোগ কিভাবে জীবনে আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, সেটার গভীরতা অধিকাংশ মানুষই আঁচ করতে পারেন না। অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না যে, কষ্ট ও দুর্ভোগ প্রকৃতপক্ষে [আত্মাকে] পরিশুদ্ধ করার এক হাতিয়ার, যেটা মানুষকে তাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরিয়ে আনে। ওই দাম্ভিক লোকের অবস্থা কেমন দাঁড়ায়, হঠাৎ করেই যে নিজেকে এমন পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করে, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? ওই লোকের অবস্থা কেমন হয়, যে প্রবল ঝড়ের মাঝে নিজেকে মাঝ সমুদ্রে আবিষ্কার করে? "ডুবা সম্ভব নয়" বলে দাবিদার ওই জাহাজের অবস্থা কি দাঁড়ায়, যার পরিণতি হয় "টাইটানিক”-এর মতো?

দুর্ভাগ্য বলে মনে হলেও এগুলো অবচেতনার ঘুম থেকে জেগে ওঠার আহ্বান। এগুলো [আমাদেরকে] বিনয়ী করে তোলে। আমাদের ঝাঁকুনি দেয়। আমরা যে কতোটা তুচ্ছ ও নগণ্য এবং আল্লাহ যে কত মহান, এগুলো আমাদেরকে এটাই মনে করিয়ে দেয়। এগুলো আমাদেরকে আমাদের প্রবঞ্চনা, উপেক্ষা ও অবহেলা এবং এলোমেলো চিন্তাধারার আলস্য থেকে জাগিয়ে তোলে এবং আপন স্রষ্টার পানে আমাদের ফিরিয়ে আনে। কষ্ট আমাদের চোখ থেকে আরাম ও আয়েশের পর্দা সরিয়ে ফেলে এবং আমরা কি এবং কোথায় যাচ্ছি, আমাদেরকে তা মনে করায়। আল্লাহ (স.) বলেন:
“... এবং আমরা তাদেরকে ভালো (সময়) এবং মন্দ (সময়) দ্বারা পরীক্ষা করেছি, এই কারণে যে, সম্ভবত তারা (আনুগত্যে) ফিরে আসবে।” (কুরআন, ৭:১৬৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ (স) বলেন:
"যখনই আমরা কোনো নবি কোনো জনপদে পাঠিয়েছি, তখনই আমরা সে জনপদের লোকদেরকে কষ্ট এবং দুর্ভোগে ফেলি, যাতে করে তারা বিনম্র হতে শিখে।” (কুরআন, ৭:৯৪)

বিনম্রতার এই শিক্ষা মানব আত্মাকে এতোটাই পরিশুদ্ধ করে যে, [স্বয়ং] আল্লাহ (স) কুরআনে মুমিনগণকে আশ্বস্ত করেন এবং এই নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, এই জীবনে যে কষ্টেরই তারা মুখোমুখি হয়, সেগুলোর উদ্দেশ্য তাদেরকে সমৃদ্ধ ও উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করা। তিনি বলেন:
"তোমরা যদি আঘাত পেয়ে থাকো, একই রকম আঘাত তো অপর লোকদেরও (অর্থাৎ মুশরিকদের) লেগেছিল। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলো পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই, যাতে করে আল্লাহ মুমিনদের জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে শহীদ (সত্যের সাক্ষী) হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালোবাসেন না।” (কুরআন, ৩:১৪০-১৪২)

আত্মশুদ্ধির এই সংগ্রামই আল্লাহর দিকে উত্তোরণের পথের সার নির্যাস। ত্যাগের মাধ্যমে এর সূচনা ঘটে আর সংগ্রামের ঘাম দিয়েই বাধিয়ে নিতে হয়। এটাই সে পথ, যে পথের বর্ণনা আল্লাহ এভাবে দেন:
"হে মানুষ! তুমি তোমার রবের নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাকো, অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করবে।” (কুরআন, ৮৪:৬)

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 কষ্ট ও দুর্ভোগের প্রতি এক ঈমানদারের প্রতিক্রিয়া

📄 কষ্ট ও দুর্ভোগের প্রতি এক ঈমানদারের প্রতিক্রিয়া


মুসলিমদের জন্য সময়টা এখন দুর্যোগের। কখনো কখনো তো হতাশা না হওয়াটা কষ্টকর। আমাদের অনেকেই অবাক হন, কেন আমাদের সাথে এমন হচ্ছে? আমরা কোনো অন্যায় না করা সত্ত্বেও আমাদের সাথে কিভাবে এসব হচ্ছে? যে দেশটি প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে সকলের জন্য “স্বাধীনতা”, “মুক্তি” ও “ন্যায়বিচারের” অঙ্গীকার নিয়ে, সেখানে আমরা কিভাবে এতোটা বৈষম্যের শিকার হই?

এ ধরনের চিন্তা স্বাভাবিক হলেও এসব কিছুকে ছাড়িয়ে আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। কিছু সময়ের জন্য হলেও আমাদেরকে বিভ্রান্তির মায়াজাল ভেদ করে সামনে তাকাতে হবে এবং এর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃত অবস্থার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। এই হলোগ্রামের ৩২ অপর পাশে বিরাজমান প্রকৃত সত্যকে দেখতে হলে আমাদের দৃষ্টিকে নতুনভাবে নিবদ্ধ করতে হবে।

পবিত্র কুরআন ও নবি (স)-এর শিক্ষায় এ সত্যটি বারবার এসেছে। ওই মৌলিক সত্যটি হচ্ছে, “এই জীবনে যা কিছু আছে, তার সবই পরীক্ষা।”

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন: "যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, এটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” (কুরআন, ৬৭:২)

এখানে জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যটা আমাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর তা হলো: আমাদের পরীক্ষা করার জন্য। ইমারজেন্সি সাইরেনের কথা এক মুহূর্তের জন্য একবার কল্পনা করুন। এটার উদ্দেশ্য কি? বিপজ্জনক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, সেটার ইঙ্গিত ও সতর্কবার্তা এই সাইরেন। এটা শুনলে স্বভাবতই আমরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ি। কিন্তু পরীক্ষার উদ্দেশ্যে যখন তারা সাইরেন বাজায়, তখন কি ঘটে? আমরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, সেটা জানার জন্য অনুশীলন হিসেবে এটা বাজানো হয়, তখন কি ঘটে? পরীক্ষামূলক সাইরেনের শব্দও ঠিক [জরুরি অবস্থার] সাইরেনের মতোই, কিন্তু এটা শুধুই "পরীক্ষামূলক”। যদিও এটা দেখতে ও শুনতে এবং এর অনুভূতি জরুরি অবস্থার সাইরেনের মতোই, তথাপি এটা ওই সাইরেন নয়। এটা শুধুই একটা পরীক্ষা। আর ওই পরীক্ষার ওই গোটা সময় জুড়ে আমাদেরকে বারবার এটাই মনে করিয়ে দেওয়া হয়।

এই জীবন সম্পর্কে আল্লাহ আমাদেরকে ঠিক এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এটা দেখতে, শুনতে ও অনুভূতির দিক দিয়ে পুরোপুরি আসলের মতোই। সময় সময় এটা আমাদেরকে ভীত করবে। সময় সময় এটা আমাদেরকে কাঁদাবে। নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হওয়ার বদলে সময় সময় এটা আমাদেরকে পালাতে বাধ্য করবে। কিন্তু এই জীবন এবং এর মধ্যে যা আছে, তার সবই পরীক্ষা। এই জীবন সত্যিকার অর্থে আসল জীবন নয়। জরুরি সম্প্রচার ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের মতো এটা আমাদেরকে আসল [জীবনের] জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। পরীক্ষামূলক সাইরেনের অপর পার্শ্বে যে বাস্তব অবস্থা রয়েছে, এটা আমাদেরকে তারই প্রশিক্ষণ দেয়।

এখন, পরীক্ষামূলক সাইরেনের বেজে ওঠাটা যদি কোনো চমক সৃষ্টিকারী বিষয় না হয়, তখন কি হবে? যদি প্রতিটি ঘরে এই আগام বার্তা দিয়ে দেওয়া হয় যে, পরীক্ষামূলক সাইরেন বাজানো হবে, তখন পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে? আল্লাহ (*), (মহিমান্বিত তিনি), আমাদের নিকট এই বার্তা পাঠিয়েছেন, কিছু সময়ের জন্য এটা বিবেচনা করুন:
"আর পার্থিব জীবন এক ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-ঐশ্চর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা সবর ইখতিয়ার করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ়।
(কুরআন, ৩:১৮৬)

সংকল্পের কাজ।”

একবার চিন্তা করুন তো, এই সতর্কবার্তার সাথে সাথে আমাদের পূর্বে গত হওয়া হাজারো সম্প্রদায়, যারা একই ধরনের পরীক্ষার শিকার হয়েছে, তাদের বিবরণও আমাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও তোমাদের নিকট তোমাদের আগেরকার লোকদের অনুরূপ অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। এমনকি রসুল এবং তার সাথের ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল - আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটে।"
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ (কুরআন, ২:২১৪)

অতএব, শুধু সাইরেন বাজার ভবিষ্যদ্বাণীই করা হয়নি এবং এটা নতুন কিছুও নয়। ধরুন, আমাদের জাতিকে একথা জানিয়ে দেওয়া হলো যে, তারা অনন্য কোনো জাতি নয় (অর্থাৎ অন্যান্য জাতিগুলোকে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তাদেরকেও সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হবে)। এসব কিছুর পর, যখন পরীক্ষামূলক সাইরেন বেজে উঠলো, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? সেটা যদি একটা ড্রিল বা অনুশীলন হয়, তবে এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, খটকা লাগারও কিছু নেই। ওই সময় আমরা উদ্বিগ্ন হই না, এমনকি আতঙ্কিতও হই না।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা (সেই সাইরেনে) সাড়া দেই।

আর এখানেই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কার জন্য আমরা এহেন আচরণ করি? কে আমাদের পরীক্ষা করছেন? প্রকৃতপক্ষে, কে আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে? CNN, C-Span নাকি আমেরিকান জনগণ? না, [এদের কেউই না]। এরা সবাই সেই ইলিউশন বা বিভ্রমের এক একটি অংশ। সবাই পরীক্ষার এক একটি অংশ। এদের সকলকেই পরীক্ষার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা কাজ করি একজন বিচারকের জন্য, আর কেবলই একজন বিচারকের জন্য। আমরা সেই মহান সত্য সত্তার (আল-হাক্কের) জন্যই শুধু কাজ করি। আমরা কাজ করি, কেননা, আমরা জানি, তিনিই সবকিছু দেখছেন। আর তিনিই সে একক সত্তা, যিনি এই পরীক্ষার বিচার করবেন।

যখনই আমরা এই মৌলিক সত্য উপলব্ধি করবো, তখনই নাটকীয় কিছু ঘটে যায়। এসবই যে একটি পরীক্ষা, বিষয়টি যখনই আমরা আত্মস্থ করে ফেলবো, তখন আমাদের প্রশ্নগুলোই সহসা বদলে যাবে। "কিভাবে এমনটা ঘটতে পারে?" "এটা এতো অন্যায্য কেন?" এ ধরনের প্রশ্ন করার বদলে আমাদের প্রশ্নগুলো হয় এরূপ: “এ অবস্থায় আমার করণীয় কি?” “এই পরীক্ষায় আমি কিভাবে উত্তীর্ণ হবো?" "এখান থেকে আমাকে কি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে?" "এই ভ্রম বা মায়া ভেদ করে, যে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে, আমার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং এই যে পরীক্ষা -এসবের স্রষ্টার নৈকট্য আমি কিভাবে অর্জন করবো?" "একটা জাতি হিসেবে কিভাবে আমরা এই পরীক্ষাকে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবো?” এবং “এই পরীক্ষাতে আমরা কিভাবে ওই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কাজে লাগাবো, যে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অর্থাৎ তাঁর নৈকট্য লাভের একটা উপায় হিসেবে একে (অর্থাৎ এই পরীক্ষাকে) সৃষ্টি করা হয়েছে?” “আল্লাহু আকবার" (আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ)।

আল্লাহ (৫)-এর পরীক্ষার সৌন্দর্য এখানেই নিহিত যে, পরীক্ষা আসছে একথা আমাদের শুধু জানিয়েই দেননি বরং এসব পরীক্ষায় সফল হওয়ার যথার্থ ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন তিনিই বাতলে দিয়েছেন। আর তা হলো: সত্র (ধৈর্য) এবং তাকওয়া (আল্লাহ সচেতনতা)।

আল্লাহ (৫) বলেন:
"দুনিয়ার জীবন এক ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-ঐশ্চর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা সবর ইখতিয়ার করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” (কুরআন, ৩:১৮৫-১৮৬)

অপর এক আয়াতে, আমাদের বিরুদ্ধে করা চক্রান্তগুলির ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা এই দুটো জরুরি উপাদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন:
"তোমাদের কোনো মঙ্গল হলে তা তাদেরকে কষ্ট দেয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তাতে তারা আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্যশীল (সবরকারী) হও এবং মুত্তাকি হও, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।"
إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (কুরআন, ৩:১২০)

এসব পরীক্ষায় আমাদের সাফল্যের ম্যানুয়েলের অংশ হিসেবে পূর্বেকার লোকেরা যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন কিভাবে তারা তাতে সাড়া দিয়েছিল, মহান আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাও জানিয়ে দিচ্ছেন:
"লোকেরা তাদেরকে বললো: 'বিশাল এক সেনাদল তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে, তাই তাদেরকে ভয় করো।' কিন্তু এটা তাদের ঈমানকে আরও মজবুত করলো এবং তারা বলছিল, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।' এরপর তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এলো এবং কোনো ক্ষতিই তাদেরকে স্পর্শ করেনি। আর আল্লাহ যাতে রাজী, তারা তারই অনুসরণ করেছে এবং আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল। এরাই শয়তান, তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো।” (কুরআন, ৩:১৭৩-১৭৫)

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন:
"আর কত নবি যুদ্ধ করেছে, তাদের সাথে বহু আল্লাহওয়ালা লোক ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে তারা দুর্বল হয়নি, নত হয়নি। আল্লাহ সবরকারীদেরকে ভালোবাসেন। একথা ছাড়া তাদের আর কোনো কথা ছিল না - 'হে আমাদের রব! আমাদের পাপ এবং কাজে-কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘনকে তুমি ক্ষমা করো। আমাদের পা সুদৃঢ় রাখো এবং কাফের জাতির বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।' অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কার এবং উত্তম পারলৌকিক পুরস্কার দান করেন। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। হে ঈমানদারগণ! যদি তোমার কাফেরদের আনুগত্য করো, তারা তোমাদেরকে (ঈমানের) বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে এবং তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে। আল্লাহই তো তোমাদের অভিভাবক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।” (কুরআন, ৩:১৪৬-১৫০)

আল্লাহ (৫) এসব ঘটনা আমাদেরকে জানাচ্ছেন, যাতে করে আমাদে পূর্বে যারা গত হয়েছে, তাদের আচরণ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহন করতে পারি তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল: "আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম রক্ষক।' তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল: “হে আমাদের প্রভু, আমাদের পাপ এবং কাজে-কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘনসমূহ ক্ষমা করো, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখুন এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন।" পরীক্ষাটা কি, সেটা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না, বরং তাদের দৃষ্টি চোখের সীমা অতিক্রম করে প্রসারিত ছিল। তারা ইলিউশন বা বিভ্রান্তির মায়াজাল ভেদ করে তাকাতেন এবং নিজেদের মনোযোগ নিবদ্ধ করতেন যিনি আছেন এসবের পেছনে। আর তিনি হলেন মহান আল্লাহ তা'আলা। আল্লাহ তা'আলাই যে এসব পরীক্ষা নিচ্ছেন, তারা শুধু এতটুকুই উপলব্ধি করেনি, বরং এসব থেকে তাদেরকে কেবল আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন, সেটাও তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তারা ক্ষমা, সবর এবং নিজেদের নৈতিক চরিত্র তথা তাকওয়া সমুন্নত করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে তাঁরই সাহায্য লাভের জন্য সবিনয় প্রার্থনা করেছিলেন।

তবে সবচেয়ে আশ্বাসের বিষয় হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মুমিনদেরকে আশ্বাস দিচ্ছেন এবং তাদেরকে সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন:

"তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, তবে একই রকম আঘাত তো তাদেরও (অর্থাৎ বদরে মুশরিকদেরও) লেগেছিল। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলির পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই, যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য হতে কতককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আল আল্লাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন এবং কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেন। তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে (আল্লাহর পথে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছে এবং কে সবর করেছে, তা এখনো প্রকাশ করেননি?" (কুরআন, ৩: ۱۳۹-১৪২)

জীবনকে আমরা যে লেন্স দিয়ে দেখি, একবার যখন আমরা তা বদলে ফেলবো, তখন আমাদের অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার ধরন ব্যাপকভাবে বদলে যাবে। আমাদের পূর্ববর্তী নেককারগণ যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন সেটা তাদের ঈমান ও আনুগত্যকে শুধু বৃদ্ধিই করেছিল। কুরআন বর্ণনা করছে:
"মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো, তারা বলে উঠলো, 'এটা তো তা-ই, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যার ওয়াদা আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল।” (কুরআন, ৩৩:২২)

যতক্ষণ না আমরা ওই লেন্সটি বদলাচ্ছি, ততক্ষণ আমাদের পক্ষে "কিভাবে আমাদের সাথে এমনটি ঘটলো?” এ জাতীয় প্রশ্ন ভেদ করে, পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার জন্য দৃষ্টিকে সম্মুখে প্রসারিত করা সম্ভব হবে না। (বস্তুত এ পরীক্ষা হলো) স্রষ্টার সৃষ্ট এক হাতিয়ার, যার উদ্দেশ্য হলো: (মুমিনদের) পরিশুদ্ধ করা (তাদের ঈমানকে) মজবুত করা এবং আপনার, আমার এবং আমাদের সকল শত্রুর যিনি স্রষ্টা, তাঁর নৈকট্য অর্জন করা।

টিকাঃ
* লেখিকা এখানে আমেরিকার কথা বুঝাচ্ছেন-(সম্পাদক)।
৩২ হলোগ্রাম: এক বিশেষ ধরনের ছবি। লেজার রশ্মি দিয়ে তৈরি করা এ ধরনের ছবিকে ত্রিমাত্রিক বলে মনে হয় -(সম্পাদক)।
**- (সম্পাদক)।
** আমেরকিার প্রেক্ষাপটে লেখা বিধায় এই উদাহরণগুলি এনেছেন লেখিকা। অন্যান্য দেশেও একইভাবে সেসব দেশের সরকার, গোয়েন্দা বিভাগ, মিডিয়া বা জনগণের নাম এ স্থানে আসবে - (সম্পাদক)।
** আল-হাক: মহান আল্লাহ তা'আলার একটি নাম (সম্পাদক)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00