📄 জায়নামাজে নিজের যন্ত্রণার দেয়াল: আল্লাহর সাহায্য কামনা প্রসঙ্গে
আমি একটা গল্প জানি, যা নেহাত কোনো গল্প নয়। এমন এক নারীর গল্প এটা, যিনি এই জীবনের চাকচিক্য থেকে অন্য কিছুকে অনেক বেশি ভালোবেসেছিলেন। নিজেকে যিনি তার চারপাশের কষ্টকর পরিস্থিতি দ্বারা কখনো সংজ্ঞায়িত বা সীমাবদ্ধ হতে দেননি। নিজের মাঝে তার এমন প্রগাঢ় ঈমান লালন করেছিলেন, যার জন্য তিনি হাসিমুখে মৃত্যুকে পর্যন্ত বরণ করে নিতে রাজি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন রাণী, তথাপি তিনি এই দুনিয়ার সিংহাসন ও রাজপ্রাসাদের মোহ ভেদ করে এর সত্যিকার বাস্তবতা দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার এই রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে তিনি দৃষ্টি প্রসারিত করেছিলেন আখিরাতে তার জন্য [নির্মিত] রাজপ্রাসাদের দিকে। কিন্তু ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার জন্য এটা অন্তর্চক্ষুর কোনো রূপক চাহনি ছিল না। বরং আসিয়ার জন্য ছিল এটা তার চর্ম চক্ষের দৃষ্টির মতোই বাস্তব।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) বলেন:
"ফেরাউনের স্ত্রীর মাঝে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য একটি উপমা রেখেছেন, যে বলেছিল: 'হে আমার প্রতিপালক, আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করুন এবং ফেরাউন ও তার কর্মকাণ্ড থেকে আমাকে পরিত্রাণ দেন এবং আমাকে জালিম লোকদের থেকে রক্ষা করুন।” (কুরআন, ৬৬:১১)
আসিয়ার এই কাহিনী আমি বহুবার শুনেছি। আমাকে প্রতিবারই এটা নাড়া দেয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে আসিয়ার এই কাহিনী আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি কারণে দারুনভাবে নাড়া দেয়। কয়েক মাস আগে আমি কঠিন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। পুণ্যবান ও ফেরেশতা স্বভাবে আত্মাদের সাহায্যের মাধুর্য সত্যই অমূল্য। যখন আপনি কঠিন সময় পার করবেন, তখন একটি টেক্সট মেসেজ (Text message), ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস আপডেট, সুহাইব ওয়েব লিস্টারেভের (Suhaib Webb Listserv) কাছে একটি ইমেইল পাঠানো [আপনার জন্য ফলপ্রসু হতে পারে] এবং দেখবেন পুণ্যবান আত্মার এক বাহিনী আপনার জন্য দু'আ করা আরম্ভ করে দিয়েছে। সুবহানাল্লাহ (মহিমা শুধু তাঁরই)।
আমি তাই এই অনুরোধটা করি। একজন মানুষ আরেকজনকে সর্বোত্তম যে উপহারটা দিতে পারে, আমি সেটারই অনুরোধ করি। আমি [তাদের কাছে। আন্তরিক দু'আ কামনা করি। আমি যা লাভ করি, তা ছিল অভিভূত করারই মতো। আল্লাহর ওই উপহারের কথা আমি কখনো ভুলবো না। আমি এমনসব লোকের দেখা পেয়েছি, যারা কিয়াম (তথা রাতের সলাতে) দাঁড়িয়ে আমার জন্য দু'আ করেছে, যারা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আমার জন্য দু'আ করেছে। ভ্রমণরত অবস্থায়, এমনকি সন্তান জন্মদানের সময়ও [তারা আমার জন্য দু'আ করেছে। এতো এতো দু'আ পাওয়ার পরও একটি দু'আ মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। এটা সাধারণ একটা টেক্সট মেসেজ ছিল, যাতে লেখা ছিল: 'জান্নাতে আপনার বাড়ি আপনাকে দেখানো হোক, যাতে করে যেকোনো কষ্ট আপনার জন্য সহজ হয়ে যায়।” আমি এটা পাঠ করি এবং এটা আমায় নাড়া দেয়। হ্যাঁ, এটা আমাকে দারুনভাবে নাড়া দেয়।
ঠিক তখনই আসিয়ার কাহিনী আমার স্মরণে আসে, আর হঠাৎ করে বিস্ময়কর কিছু আমার মনে দোলা দেয়। বস্তুত একজন মানুষ যা কল্পনা করতে পারে, আসিয়া ঠিক সেরূপ ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুনিয়ার বুকে বিচরণকারী জঘন্যতম স্বৈরাচার ছিল ফেরাউন। আসিয়ার জন্য সে কেবল তার শাসক মাত্র ছিল না, সে ছিল তার স্বামী। আর আসিয়ার শেষ সময়ে ফেরাউন তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাতে শুরু করে। কিন্তু অবাক করা কিছু একটা ঘটে। আসিয়া মুচকি হাসতে থাকেন। একজন মানুষ যতটুকু কল্পনা করতে পারে, আসিয়া সে রকম ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন হাস্যোজ্বল।
এটা কিভাবে সম্ভব? কঠিন নির্যাতনের সময় কিভাবে তিনি হাসতে পারছিলেন? অথচ যখন আমরা সামান্য ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ি কিংবা আমাদের দিকে কেউ যদি বাজেভাবে তাকায়, তখন আমরা তা সামলাতে পারি না। নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) -আল্লাহ তার প্রতি সলাত এবং সালাম বর্ষণ করুন- তিনি কঠিনতম বিপদে নিপতিত হন, আর তা সত্ত্বেও আগুন তার কাছে ঠাণ্ডা অনুভূত হলো? কিছু লোকের কিছু না থাকার পরও, তারা অভিযোগ উত্থাপনের কোনো কারণ খুঁজে পায় না, অন্যদিকে যাদের 'সবকিছু' থাকার পরও, অভিযোগ ছাড়া তাদের থেকে কিছুই শোনা যায় না, কেন এমনটি ঘটে? কখনো আমরা জীবনের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেশ ধৈর্য ধারণ করি, অথচ আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলোতে খুব একটা ধৈর্য ধরতে পারি না, কিভাবে এমনটি ঘটে?
বিপদ-মুসিবতকে আমি কঠিন মনে করতাম। কেননা, কিছু জিনিস বহন করাটা বাস্তবিকই কঠিন। আমি একটি মৌলিক তালিকার কথা চিন্তা করতাম, যেখানে বিপদ-আপদের একটি আদর্শক্রম থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ প্রিয়জন হারানোর বেদনা সব সময় ট্রাফিকের টিকিট সংগ্রহ করার ঝামেলা থেকে কঠিনতর। এটাই যথাযথ বলে প্রতীয়মান হয়। এটিই আমাদের কাছে যথাযথ মনে হয়।
কিন্তু, বাস্তবে এটা ঠিক নয়।
যেকোনো ধরনের বিপদ সহ্য করাটা কঠিন কাজ নয়, যেহেতু স্বয়ং বিপদই কঠিন। বিপদের সময় কষ্ট কতটা কঠিন কিংবা কতটা সহজ, সেটার মাপার মানদণ্ড আছে -অদৃশ্য এক মানদণ্ড। জীবনে আমি যা কিছুরই মুখোমুখি হই না কেন, সেটা সহজ হবে নাকি কঠিন হবে, তা ওই বিষয়টির কঠিন বা সহজ হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বরং বিষয়টি সহজ হবে নাকি কঠিন হবে, তা নির্ভর করে আল্লাহর সাহায্যের মাত্রা ও স্তরের ওপর। কোনো কিছুই সহজ না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার জন্য সেটা সহজ না বানাচ্ছেন। না কোনো ট্রাফিক জ্যাম, না কোনো কাগজের টুকরো, [কিছুই সহজ নয়]। আল্লাহ যা আমার জন্য সহজ করে দেন, তার কিছুই কঠিন নয়। না অসুস্থতা, না মৃত্যু, না আগুনে ফেলে দেওয়া, আর না স্বৈরাচারের যুলুমের শিকার হওয়া, [কিছুই আমার জন্য কঠিন হবে না]।
ইবনে আতায়িল্লাহ আল-সিকান্দারি খুব সুন্দর করে বলেন:
"কিছুই কঠিন নয়, যদি তুমি সেটা তোমার প্রতিপালকের মাধ্যমে চাও। কিছুই সহজ নয়, যদি তুমি সেটা চাও তোমার যোগ্যতায়।”
ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনে ফেলা হয়। আল্লাহ এই জীবনে আমাদের কাউকে এমন ভয়াবহ পরীক্ষার মুখোমুখি না করুন। কিন্তু এমন কোনো মানুষ নেই, যারা তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে আবেগ, মানসিক বা সামাজিক আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন। আর এটা ভাববেন না যে, আল্লাহ আমাদের জন্য ওইসব আগুনকে ঠাণ্ডা করতে অক্ষম। আসিয়া শারীরিকভাবে নির্যাতিত ছিলেন, কিন্তু জান্নাতে তার জন্য নির্মিত বাড়ি আল্লাহ তাকে দেখিয়ে দেন। তাই তিনি হেসে দেন। আমাদের চর্ম চক্ষু এই জীবনে জান্নাতের দেখা পাবে না। কিন্তু আল্লাহ চাইলে, স্রষ্টার সান্নিধ্যে নির্মিত বাড়ির ওই দৃশ্য অন্তরের দৃষ্টিকে দেখানো যায়, যাতে করে প্রতিটি কষ্ট হয়ে যায় সহজ। হয়তো আমরাও ওই রকম কঠিন পরিস্থিতিতে হাসতে পারবো।
তাই স্বয়ং পরীক্ষাটা সমস্যা নয়। না ক্ষুধা, আর না শীত। বরং ক্ষুধা ও শীত মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমাদের আছে কিনা, সেটাই আসল সমস্যা। যদি থেকে থাকে, তবে না ক্ষুধা, আর না শীত আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে। এগুলো আমাদেরকে কষ্ট দেবে না। সমস্যা তখনই আবির্ভূত হয়, যখন ক্ষুধা আসে, তখন যদি খাবার না থাকে। সমস্যা তখনই আসে, যখন তুষার ঝড়ে চারদিক নুয়ে পড়ে, তখন যদি কোথাও আশ্রয় পাওয়া না যায়।
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে চান, বানাতে চান আমাদেরকে বলীয়ান এবং তিনি চান, আমরা যেন তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন, ওইসব ক্ষুধা, পিপাসা ও শীত পাঠানোর সাথে সাথে আল্লাহ খাবার, পানি এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করে থাকেন। আল্লাহই পরীক্ষা দিয়ে থাকেন, কিন্তু এটার সাথে তিনি পাঠাতে পারেন সবর (ধৈর্য), এমনকি উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি এটার সাথে পাঠাতে পারেন রিদা (তথা তুষ্টির) মতো গুণকে। হ্যাঁ, আল্লাহ (স)-ই আদমকে এই দুনিয়াতে নামিয়ে দেন, যেখানে তাকে চেষ্টা, সংগ্রাম করতে হবে এবং তাকে মুখোমুখি হতে হবে পরীক্ষার। কিন্তু সেইসাথে তিনি তার ঐশ্বরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে বলে:
“তিনি বলেন (অর্থাৎ আল্লাহ বলেন), 'জান্নাত থেকে নেমে যাও -সবাই, তোমরা একে অপরের দুশমন। এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়েত আসবে, -যারাই সেটার (অর্থাৎ আমার হেদায়েতকে) অনুসরণ করবে, না তারা (এই দুনিয়াতে) গোমরাহ হবে, আর না তারা (আখিরাতে) কষ্ট ভোগ করবে।” (কুরআন, ২০:১২৩)
নবি (ﷺ) তায়েফের প্রান্তরে যে দু'আ করেছেন, সম্ভবত সেটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দু'আ। রক্তাক্ত ও আঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি আপন প্রতিপালককে ডাকেন:
أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
"আমি তোমার চেহারার দীপ্তির মাঝে আশ্রয় চাচ্ছি, যে দীপ্তিতে বিদায় নেয় আঁধার এবং এই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিটি বিষয় লাভ করে পূর্ণতা।”
বস্তুত আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে পরীক্ষা করেন এবং ওই ব্যক্তির ঈমানের স্তরের অনুপাতে তিনি সে পরীক্ষা নেন। কিন্তু সেইসাথে আল্লাহ তাঁর ঐশ্বরিক সহায়তাও পাঠিয়ে থাকেন, যেকোনো পরীক্ষাকে যেটা বানিয়ে দেয় সহজ এবং যেকোনো আগুনকে যেটা আরামদায়ক শীতল করে দেয়। আর এভাবেই শীঘ্রই তিনি পাঠাতে পারেন স্বীয় ঐশ্বরিক মদদ, যেটার বলে কঠিন অগ্নি পরীক্ষার মাঝেও আমরা তাঁর আলোর ঝলকে হবো ধন্য এবং তাঁর সান্নিধ্যে জান্নাতে নির্মিত বাড়ি করবে আমাদেরকে হাস্যোজ্জ্বল।
টিকাঃ
* কুর'আনের বর্ণনা মোতাবেক আসিয়া ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন। যখন শিশু মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে সিন্দুকে করে তার মা নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন, তখন ওই সিন্দুক ফেরাউনের রাজ দরবারের ঘাটে থামে, তখন আসিয়া ওই সিন্দুক থেকে শিশু মুসাকে নিজ দায়িত্বে নেন এবং তার স্বামী ফেরাউনকে রাজি করিয়ে শিশু মুসাকে লালন- পালন করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ফেরাউনের দরবারে নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন, তখন তিনি নবি মুসার প্রতি ঈমান আনেন। ঈমান আনায়নের পর ফেরাউন তার প্রতি নির্যাতনের স্টিম রোলার চালালেও তিনি স্বীয় ঈমানে অটল থাকেন এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। -(সম্পাদক)।
৩০ ১৯৭২ সালে জন্ম নেয়া সুহাইব ওয়েব ১৯৯২ সালে ইসলামে দীক্ষিত হন। মিসরের আল-আযহারে তিনি উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। তিনি একজন ইমাম ও বেশ জনপ্রিয় বক্তা। -(সম্পাদক)।
📄 অন্যের দ্বারা পাওয়া আঘাত: কিভাবে মানাবেন ও সারাবেন
আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, বিশ্ব তখন এক যথার্থ অবস্থানে ছিল। তবে একমাত্র সমস্যা ছিল, আসলে কিন্তু তা সে রকমটা ছিল না। আমি বিশ্বাস করতাম, সব কিছুই সর্বদা "ন্যায্যতার" ভিত্তিতে হবে। আমার কাছে এটার মর্ম ছিল, কারো প্রতি কোনো রকম অন্যায় করা হবে না এবং যদিবা করা হয়, তবে তিনি ন্যায়বিচার লাভ করবেন। আমার বিশ্বাস মোতাবেক বিষয়াদি হওয়ার জন্য আমি কঠিন লড়াই করেছি। তদপুরি, আমার সংগ্রামে আমি এই জীবনের একটি মৌলিক সত্যকে উপেক্ষা করে গেছি। আমার শিশুসুলভ আদর্শবাদে আমি এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি যে, এই দুনিয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্পূর্ণ। মানুষ হিসেবে আমরাও স্বাভাবিকভাবে অসম্পূর্ণ। তাই আমরা সর্বদা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করি। আর ওইসব বিশৃঙ্খলাতে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমরা অনিবার্যভাবে অন্যকে আঘাত দিয়ে থাকি। এই দুনিয়া তাই সব সময় ন্যায্য হবে না।
এর মানে কি এই নয় যে, আমরা সবাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থামিয়ে দেবো বা সত্যকে পরিত্যাগ করবো? অবশ্যই না, বরং এটার অর্থ হচ্ছে: এই দুনিয়া -এবং অন্য কিছুকে- আমরা অবাস্তব মানদণ্ডের ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো না। কিন্তু সেটা সব সময় সহজ নয়। এরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতিময় এক দুনিয়াতে কিভাবে আমরা বাস করবো, যেখানে লোকজন আমাদেরকে হতাশ করে, এমনকি আমাদের নিজেদের পরিবারও আমাদের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে? এবং সম্ভবত, সবচেয়ে কঠিনতম বিষয় হলো: কিভাবে আমাদের প্রতি অন্যায় করা সত্ত্বেও আমরা ক্ষমা করবো? আর কঠোর না হয়েও কিভাবে আমরা শক্তিশালী হবো, অন্যদিকে দুর্বল না হয়েও কিভাবে নরম থাকবো? কখন আমরা আঁকড়ে ধরবো, আর কখন আমরা ছেড়ে দেবো? মাত্রাতিরিক্ত যত্ন, তদারকি কখন তার মাত্রা ছাড়ায়? আমাদের যতটুকু ভালাবাসা উচিত, তার থেকে বেশি ভালোবাসা বলে কিছু আছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার আগে, সবার আগে আমাদেরকে নিজেদের গতানুগতিক জীবনের বাইরে পা রাখতে হবে। পরীক্ষা করে দেখা দরকার যে, কষ্ট পাওয়া বা অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষ আমরাই প্রথম না আমরাই শেষ। আমাদের পূর্বে যারা দুনিয়াতে পা রেখেছেন, তাদের সংগ্রাম এবং তাদের সাফল্যগুলো অধ্যয়ন করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কষ্ট ছাড়া কখনো সমৃদ্ধি আসে না এবং সাফল্য কেবল আপ্রাণ চেষ্টারই ফসল, আমাদেরকে এটার স্বীকৃতি দিতেই হবে। আর ওই সংগ্রামে সর্বদা অন্তর্ভুক্ত থাকে, অন্যের দেওয়া আঘাত প্রতিরোধ ও তা উতরে ওঠা।
আমাদের কষ্ট ও দুর্ভোগ যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, আমাদের নবিগণের দীপ্তিময় উদাহরণসমূহের স্মৃতিচারণ আমাদেরকে সেটাই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করুন, নবি নুহ (আলাইহিস সালাম) স্বীয় জনগোষ্ঠী দ্বারা ৯৫০ বছর নির্যাতিত হয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে বলে:
"তাদের পূর্বে নুহের সম্প্রদায়ও (তাদের রসুলকে) প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা আমাদের বান্দাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, 'সে তো এক বিকারগ্রন্থ!' এবং তাঁকে বের করে দেওয়া হয়।” (কুরআন, ৫৪:৯)
নুহ এতোটই আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন যে, শেষমেশ তিনি স্বীয় প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেন:
"আমি তো অসহায়, এখন আপনি (আমাকে) সাহায্য করুন।" (কুরআন, ৫৪:১০)
অথবা আমরা স্মরণ করতে পারি, কিভাবে নবি (ঈ)-এর ওপর যে পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল এবং রক্তাক্ত হওয়া পর্যন্ত এই বর্ষণ অব্যাহত ছিল এবং [আমরা স্মরণ করতে পারি] কিভাবে সাহাবিগণকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং কিভাবে তাদেরকে অনাহারে রাখা হয়েছিল। এসবই ছিল অন্যের হাতে নির্যাতনের নমুনা। এমনকি আমাদের সৃষ্টি হওয়ার আগেই ফেরেশতারা পর্যন্ত মানুষের এই প্রকৃতিকে ঠিক উপলব্ধি করেছিল। আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি ফেরেশতাদেরকে জানান, তখন তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল মানুষের এই সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকটির ব্যাপারে। আল্লাহ আমাদেরকে বলেন:
"স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বলেন: 'আমি পৃথিবীতে খলিফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।' তখন তারা বলে, 'আপনি কি এমন কাউকে সেখানে পাঠাতে যাচ্ছেন, যে কিনা সেখানে ফাসাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে?” (কুরআন, ২:৩০)
একে অপরের প্রতি জঘন্য পর্যায়ের অন্যায় করার যে সম্ভাবনা মানুষের আছে, সেটাই এই জীবনের দুঃখজনক বাস্তবতা। এবং এরপরেও আমাদের অনেকেই বেশ আশীর্বাদপুষ্ট। আমাদের অনেকেই এমন ধরনের বিপদের মুখোমুখি হয়নি, যা অন্যরা সারা জীবন জুড়ে ভোগ করেছে। আমাদের চোখের সামনে আমাদের পরিবারকে নির্যাতন করা হচ্ছে কিংবা তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে, এমন দৃশ্য আমাদের অনেককেই দেখতে হবে না। তদপুরি, আমাদের মাঝে খুব কম লোকই বলতে পারবে যে, কোনো না কোনোভাবে অন্যের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। অনাহারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া কিংবা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার দৃশ্য দেখার যে অনুভূতি, আমাদের অনেককে কখনোই সেটা ভোগ করতে হবে না, তথাপি আহত হৃদয়ের কান্নার অনুভূতি কেমন, আমাদের অনেকেই সেটা জানে।
এগুলো এড়ানো কি সম্ভব? আমার মতে, হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলো এড়ানো সম্ভব। সকল ধরনের কষ্ট ও ভোগান্তিকে আমরা কখনো এড়িয়ে যেতে পারবো না, কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের প্রতিক্রিয়া এবং আমাদের মনোযোগের সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে আমরা বড় ধরনের বিপর্যয়কে প্রতিহত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সকল আস্থা, নির্ভরতা ও প্রত্যাশা অপর একজন মানুষের স্থাপন করাটা হবে অবাস্তব ধর্মী ও নিরেট বোকামিতুল্য কাজ। মানুষ মাত্রই ভুল করে, এই বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের জন্য কাম্য হবে নিজেদের আস্থা, নির্ভরতা ও প্রত্যাশাকে শুধু আল্লাহর ওপর স্থাপন করা। আল্লাহ বলেন:
"... যে তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে এমন এক মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ভাঙ্গে না। আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ।” (কুরআন, ২:২৫৬)
এটা জানা যে, আল্লাহই হলেন একমাত্র হাতল, যা কখনো ভেঙে যাবে না, তিনিই আমাদেরকে অপ্রয়োজনীয় নৈরাশ্যের কবল থেকে রক্ষা করবেন।
তদপুরি, একথা বলার অর্থ এই নয় যে, আমরা ভালোবাসতে পারবো না, কিংবা আমাদের ভালোবাসা কমানো উচিত। আমরা কিভাবে ভালোবাসি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ ছাড়া কিছুই যেন আমাদের ভালোবাসার চূড়ান্ত বস্তু না হয়। কিছুই যেন আমাদের অন্তরে আল্লাহর আগে চলে না আসে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান যেন ওই পর্যায়ে না পৌঁছায়, যেখানে ওই বস্তু ছাড়া আমাদের পক্ষে বেঁচে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন 'ভালোবাসা' আসলে ভালোবাসা নয়, বরং এ ধরনের ভালোবাসাই ইবাদত এবং কষ্ট ছাড়া এটা অন্য কিছুই সৃষ্টি করে না।
কিন্তু যখন আমরা উল্লেখিত সবকিছুই ঠিকঠাক মতো করি, তথাপি অন্যের দ্বারা আমরা আঘাত পাই - আর বাস্তবে অপরিহার্যভাবে এ রকমটাই ঘটে থাকে, তখনকার ব্যাপারটা কি? যেটা সব থেকে কঠিন, কিভাবে আমরা সেটা করবো? কিভাবে আমরা ক্ষমা করতে শিখবো? কিভাবে আমরা নিজেদের ক্ষত চিহ্ন মুছে দিয়ে মানুষের প্রতি সদয় হতে শিখবো, যদিও ওই মানুষগুলো আমাদের প্রতি সদয় নয়?
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু (আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন)-এর ঘটনাতে ঠিক এটারই এক অনুপম দৃষ্টান্ত রয়েছে। তার কন্যা আয়েশা (রা.)-এর প্রতি সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপভাবে অপবাদ আরোপ করা হয়। আবু বকর (রা.) লক্ষ্য করেন যে, এই গুজব রটানোর পেছনে তার খালাতো ভাই মিসতাহ জড়িত ছিলেন, যাকে তিনি এতদিন আর্থিকভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে আসছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আবু বকর ওই অপবাদ রটনাকারীকে আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেন। এর ঠিক পরপরই আল্লাহ নিচের আয়াতটি নাযিল করেন:
"তোমাদের মাঝে যারা উচ্চ মর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এই কসম খেয়ে না বসে যে, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজন, অভাবী ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীগণকে কোনো সাহায্য করবে না। [বরং] তাদেরকে ক্ষমা ও উপেক্ষা করো। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? বস্তুত আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (কুরআন, ২৪:২২)
এই আয়াত শ্রবণের পর আবু বকর (রা.) ঠিক করে ফেলেন যে, তিনি আল্লাহর ক্ষমা চান, তাই তিনি ওই লোককে অর্থ দেওয়া আবার চালুই করেননি, বরং সেটার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেন।
এ ধরনের ক্ষমার গুণ একজন ঈমানদার ব্যক্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের ঈমানদারদের বিবরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন:
"যারা বড় ধরনের অপরাধ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে এবং যারা রাগান্বিত অবস্থাতেও ক্ষমা করতে প্রস্তুত থাকে।” (কুরআন, ৪২:৩৭)
অন্যের প্রতি আমরা যে ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতি ও ভুলভ্রান্তি করি, সেই সচেতনতা বোধই যেন সানন্দে ক্ষমা করতে আমাদের ধাবিত করে। সর্বোপরি আমাদের মানবতা এই বাস্তবতা দ্বারা চালিত হওয়া উচিত যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্তে নানাবিধ পাপের কাজ করে আমরা আল্লাহর সাথে অন্যায় করি। আল্লাহর তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়? তা সত্ত্বেও আল্লাহ, যিনি মহাবিশ্বের মালিক, তিনি প্রতিটি দিন ও প্রতিটি রাতে [আমাদেরকে] কেবল ক্ষমাই করে যান। ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানানোর আমরা কে? আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করবেন, এই আশা যদি করি, তবে আমরা কেন অন্যদেরকে ক্ষমা করতে পারবো না? এই কারণে নবি (ﷺ) আমাদেরকে এভাবে শিক্ষা দেন:
"অন্যের প্রতি যারা দয়া দেখায় না, আল্লাহও তাদের প্রতি কোনো দয়া দেখাবেন না।” [মুসলিম]
আল্লাহর এই দয়া লাভের আশা যেন আমাদেরকে অন্যকে ক্ষমা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং এটা যেন আমাদেরকে একদিন এমন দুনিয়াতে প্রবেশ করায়, যেটা সত্যিকার অর্থেই নিখুঁত ও যথার্থ।
📄 দুনিয়ার জীবন যেন এক রঙ্গমঞ্চ
এটা কেবলই একটা স্বপ্ন ছিল। ক্ষণিক কালের জন্য এটা আমাকে আচ্ছন্ন করে। তথাপি ওই দুঃস্বপ্নে আমি যে যন্ত্রণা অনুভব করি, সেটা এক বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। তাও সেটা ক্ষণস্থায়ী। চোখের পলক ফেলার মতো। কিন্তু আমি কেন স্বপ্ন দেখি? আমাকেই বা কেন আমার ঘুমের মাঝে ওই ধরনের ক্ষয়, ভয় ও দুঃখের অনুভূতি অনুভব করতে হবে?
বৃহত্তর পরিমণ্ডলে এটা এমনই এক প্রশ্ন, যা যুগ যুগে জিজ্ঞাসিত হয়ে আসছে। আর অনেকের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর তার ঈমানের দিকে পথচলা কিংবা সেখান থেকে বিচ্যুতি নির্ধারণ করেছে। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, জীবনের উদ্দেশ্যে বিশ্বাস, উচ্চতর ব্যবস্থা বা চূড়ান্ত গন্তব্যে বিশ্বাস রাখা অনেক সময়ই এসব বিষয় নির্ভর করে কেবল এই একটি প্রশ্নের জবাবের ওপর। তাই এই প্রশ্ন করার অর্থ হলো: চূড়ান্ত বিচারে জীবন সম্বন্ধে প্রশ্ন করা।
কেন আমরা কষ্ট ভোগ করি? ভালো লোকদের সাথেই কেন খারাপটি ঘটে? স্রষ্টা যদি থেকেই থাকে, তবে শিশুরা কেন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাবে, আর অপরাধীরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াবে? সর্বপ্রেমময় এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একক স্রষ্টার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া কিভাবে সম্ভব, যিনি এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটতে দেন?
সত্যই যদি আল্লাহ ন্যায়বিচারক ও কল্যাণময় হয়ে থাকেন, তবে ভালো লোকদের সাথে কেবল 'ভালো' এবং মন্দ লোকদের সাথে কেবল 'মন্দ' পরিণতি ঘটার কথা ছিল না কি?
প্রকৃতঅর্থে এর উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ, এটা সম্পূর্ণভাবে খাঁটি কথা। ভালো মানুষেরই পরিণতি কেবল ভালো হয়। মন্দ মানুষের পরিণতি কেবলই মন্দ হয়। কেন? কারণ, আল্লাহই সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ এবং তিনিই সবচেয়ে প্রেমময়। আর তাঁর জ্ঞানে কিংবা তাঁর প্রজ্ঞায় নেই কোনো ঘাটতি বা কমতি।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জ্ঞান ও উপলব্ধিতে আমাদেরই কমতি বা ঘাটতি রয়েছে।
লক্ষ্য করুন, "ভালো মানুষের পরিণতি কেবল ভালো হয়। মন্দ মানুষের পরিণতি কেবল মন্দ হয়" এই বাক্যটির মর্ম উপলব্ধি করতে হলে সবার আগে আমাদেরকে 'ভালো' ও 'মন্দ'-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। যদিও দুনিয়াতে যত লোক রয়েছে, ভালো ও মন্দের সংজ্ঞাও ঠিক তত, তথাপি ভালো ও মন্দের একটি বোধগম্য উপলব্ধি (সবার মাঝে) বিদ্যমান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বা গন্তব্যে পৌঁছানোতে সফল হওয়াকে সবাই 'ভালো' বলে মেনে নিতে একমত হবে। অন্যদিকে নিজের আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বা গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়াটা 'মন্দ' বলে বিবেচিত হবে। ভীষণভাবে ওজনহীন হওয়ার কারণে আমার লক্ষ্য যদি ওজন বাড়ানো হয়, তবে ভারী হওয়াটা আমার জন্য ভালো বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে বিপজ্জনকভাবে মোটা হওয়ার কারণে আমার লক্ষ্য যদি ওজন কমানো হয়, তবে মোটা হওয়াটা হবে মন্দ। আমার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে একই ঘটনা হতে পারে ভালো কিংবা মন্দ। তাই আমার দৃষ্টিতে 'ভালো' নির্ভর করছে আমার ব্যক্তিগত অর্জনের ওপর। এদিকে চূড়ান্ত 'ভালো' নির্ভর করছে আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের ওপর।
কিন্তু আমার লক্ষ্যটা কি?
এ প্রশ্নটা আমাদেরকে জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেহেতু এটা আমাদের অস্তিত্বের উচ্চতর বাস্তবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের বিষয়ে কথা আসলেই অপরিহার্যভাবে দুটো পৃথক বিশ্ব-দর্শনের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম বিশ্ব-দর্শনের মতে, এই জীবনটাই বাস্তবতা, এটাই চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল এবং আমাদের সকল চেষ্টার লক্ষ্যও এই দুনিয়া। দ্বিতীয় বিশ্ব-দর্শনের মতে, এই জীবন কেবল একটি সেতু, একটি মাধ্যম, যা স্রষ্টার অসীম বাস্তবতার মোকাবেলায় একটি ঝলক ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রথম দলভুক্ত লোকদের জন্য এই দুনিয়াটাই সব। সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার লক্ষ্য এই দুনিয়া প্রাপ্তি। অন্যদিকে দ্বিতীয় দলভুক্ত লোকদের জন্য এই জীবন শূন্যের পানে ধেয়ে চলছে। কেন? কারণ অসীমের সাথে যত বড় সংখ্যাই তুলনা করা হোক না কেন, তা শূন্যে পরিণত হয়। এই জীবন [তাদের নিকট] কিছুই না। [তাদের নিকট] এটা যেন ক্ষণিকের স্বপ্ন।
এই দুটো আলাদা বিশ্ব-দর্শন জীবনের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত প্রশ্নকে সরাসরি প্রভাবিত করে। লক্ষ্য করুন, যিনি বিশ্বাস করেন, এই জীবনটাই আসল, এটাই চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল এবং এটাই সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য, তবে তার কাছে জীবনের উদ্দেশ্য হবে, এই জীবনকে সর্বোচ্চ পরিমাণ সুখ ও আনন্দ এবং বস্তুগত সফলতা দিয়ে ভরে ফেলা। এ নমুনা অনুযায়ী প্রকৃতঅর্থেই 'ভালো' লোকগণ প্রতিটি সেকেন্ডে 'মন্দ' পরিণতি বরণ করছে। এরকম নমুনায় লোকজন এই উপসংহারে পৌঁছায় যে, এই দুনিয়ায় ন্যায় বলে কিছুই নেই, তাই হয় স্রষ্টা বলে কেউ নেই, আর থাকলেও তিনি ন্যায়বিচারক নন (ওয়া নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি)। এটা অনেকটা ওই লোকের মতো, যিনি একটা খারাপ স্বপ্ন দেখার কারণে এ উপসংহার টেনেছেন যে, স্রষ্টা বলে কেউ নেই। কিন্তু আমরা আমাদের স্বপ্নের ওই অভিজ্ঞতাকে যথাযথ ওজন দিচ্ছি না কেন? তদপুরি, কিছু স্বপ্নের অভিজ্ঞতা তো বেশ ভয়ানক এবং 'ভালো' লোকের বেলায় প্রায়শই এমনটি ঘটে। আমাদের স্বপ্নে আমরা কি ভয়াবহ ধরনের আতঙ্ক কিংবা চরম মাত্রার প্রশান্তি অনুভব করি না? হ্যাঁ, করি। কিন্তু সেটা এতোটা গুরুত্ব রাখে না কেন?
কারণ, আমাদের "প্রকৃত" জীবনের নিরীখে এটা তেমন কিছুই নয়।
দ্বিতীয় বিশ্ব-দর্শন (তথা ইসলাম অনুযায়ী) এ জীবন একটা স্বপ্নের চেয়ে বেশি কিছু নয়, তাই সর্বোচ্চ পরিমাণ সুখ ও অর্জন দিয়ে ভরে ফেলাটা, এই জীবন সৃষ্টির উদ্দেশ্য নয়। এই বিশ্ব-দর্শনে জীবনের উদ্দেশ্যটা কি, স্রষ্টা তা ঠিক করে দিয়েছেন এবং তিনি আমাদেরকে [সেটা] জানিয়ে দিচ্ছেন:
“আমার ইবাদত করা ছাড়া (অন্য কোনো উদ্দেশ্যে) আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করিনি।” (কুরআন, ৫১:৫৬)
এই বাক্যের বিশেষ গঠন কাঠামোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুরু হয়েছে "অস্বীকৃতি” বা “নাকচ” করার দ্বারা: "আমি সৃষ্টি করিনি জিন ও ইনসানকে।" প্রথমেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জীবনের আর সব উদ্দেশ্যকে প্রত্যাখ্যান করেন; অতঃপর তিনি মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অবগত করেন, “শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করা।" একজন ঈমানদার হিসেবে আমার নিকট এটার মর্ম হচ্ছে: আল্লাহকে জানা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর নৈকট্য অর্জন করা ছাড়া আমার অস্তিত্বের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। এটাই একমাত্র কারণ, যার জন্য আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি, যেহেতু আমার কর্ম ও বিশ্বাস কি হবে, সেটা নির্ধারিত হয় এই উপলব্ধির ভিত্তিতে। আমার চারপাশে যা কিছু আছে এবং জীবনে আমি যত অভিজ্ঞতা লাভ করি, তার সবকিছুই নির্ধারিত হয় এই উপলব্ধির আলোকে।
'ভালো' ও 'মন্দে'র সংজ্ঞার আলোচনায় ফিরলে আমরা দেখতে পাই, চূড়ান্ত বিবেচনায়, যা আমাদেরকে আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত করে, তা 'ভালো' এবং যা আমাদেরকে ওই উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরায়, তাই 'মন্দ'। তুলনামূলকভাবে, বস্তুগত এই দুনিয়াই যার লক্ষ্য, বস্তুগত জিনিসই তাদের 'ভালো' ও 'মন্দ' ঠিক করে দেয়। তাদের জন্য ধনসম্পদ, মর্যাদা, খ্যাতি কিংবা সম্পত্তি অর্জন করাটা অপরিহার্যভাবে 'ভালো' এবং সম্পদ, মর্যাদা, খ্যাতি বা সম্পত্তি হারানো তো অপরিহার্যভাবে 'মন্দ'। এই দৃষ্টান্ত অনুযায়ী, নিরপরাধ ব্যক্তি যখন তার সব বস্তুগত অর্জন হারিয়ে ফেলে, তখন তার মানে দাঁড়াচ্ছে: একজন 'ভালো' লোক 'মন্দ' পরিণতির কবলে পড়েছে। বস্তুত: ত্রুটিযুক্ত বিশ্ব-দর্শনের পরিণতিতেই এমন ভ্রমের সৃষ্টি হয়। লেন্সই যখন ত্রুটিপূর্ণ, তখন ওই লেন্স দিয়ে দেখা সকল ছবিই হবে ত্রুটিতে ভরা।
দ্বিতীয় বিশ্ব-দর্শনের লোকদের নিকট, আল্লাহর ভালোবাসার সান্নিধ্য লাভের যে উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা কিছু এই উদ্দেশ্যের কাছাকাছি আমাদেরকে পৌঁছে দেয়, তা ভালো এবং যা কিছু আমাদেরকে ওই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে, তা মন্দ। বিলিয়ন ডলার জেতাটা হবে আমার জন্য হবে চরম মুসিবতের, যদি সেটা আমাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং আমাকে আমার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরায়। অন্যদিকে চাকরি হারানো, নিজের সকল ধনসম্পদ হারানো, এমনকি অসুস্থ হয়ে পড়াটাও হবে বাস্তবিকপক্ষে আমার জন্য সীমাহীন আশীর্বাদের, যদি সেটা আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, যা চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। কুরআনে আল্লাহ এই বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেছেন, যখন আল্লাহ (৬) বলেন:
"হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হয়তো তোমরা কোনো জিনিস পছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। বস্তুত আল্লাহই জানেন এবং তোমরা জানো না।"
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (কুরআন, ২:২১৬)
একজন ঈমানদার হিসেবে বস্তুগত দৃষ্টির মানদণ্ডে লাভ ও ক্ষতি মাপাটা এখন আর আমার মানদণ্ড নয়। আমার মাপকাঠি এসবের চেয়ে মহান কিছু। পার্থিব বিবেচনায় আমার কি আছে বা নেই, সেগুলো আমাকে কতটুকু আল্লাহর নিকটবর্তী করে কিংবা আমাকে আমার লক্ষ্য তথা আল্লাহ থেকে কতটুকু বিচ্যুত করে, তার ভিত্তিতেই সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতার মূল্যায়ন হবে। এই দুনিয়ার (জীবন) আমার কাছে ওই স্বপ্নের চেয়ে বেশি কিছু নয়, কিছু সময়ের জন্য আমি যেটার অভিজ্ঞতা লাভ করি এবং এরপর আমি জেগে উঠি। ওই স্বপ্নটি কি ভালো ছিল নাকি মন্দ ছিল, সেটা নির্ভর করে জাগ্রত হওয়ার পর আমার অবস্থার ওপর।
অতএব, চূড়ান্ত মানদণ্ডের আল্লাহর ব্যবস্থাপনা পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ শুধু ভালো লোকদেরই মঙ্গল করেন (তথা তাঁর নৈকট্য দিয়ে থাকেন) এবং তিনি শুধু খারাপ লোকেরই কপাল পুড়ান (তথা তাঁর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত করে)। এই পার্থিব জীবন ও আখিরাতের জীবনে আল্লাহর নৈকট্য লাভই সর্বোত্তম মঙ্গল এবং 'ভালো' মানুষের কপালেই শুধু এই সৌভাগ্য জুটে। এই কারণে নবি (স) বলেন:
"ঈমানদারের বিষয়টি আসলেই অবাক করার মতো। সবকিছুতেই তার জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং এটা শুধু ঈমানদারের জন্যই। যদি তার কাছে কোনো কল্যাণ পৌঁছায় সে আল্লাহর শোকর আদায় করে, যেটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” [মুসলিম]
নবি (স)-এর বাণী কিংবা কাজের সংরক্ষিত এই বিবরণ তথা এই হাদিসে ব্যাখ্যা মোতাবেক, বাহ্যিকভাবে যা দৃশ্যমান হয়, 'ভালো' এবং 'মন্দ' সেটার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। এই হাদিসের ব্যাখ্যা অনুসারে, [কোনোকিছুর] 'ভালো' নির্ধারিত হয়, ওই জিনিস অন্তর্নিহিতভাবে যে উত্তম অবস্থা তৈরি করে তার ওপর [যেমন]: ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা -আর এই দুটো গুণই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর প্রশান্তির বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে, এই জীবন ও আখিরাতে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় মুসিবত। আর 'মন্দ' লোকদেরই এর দ্বারা শান্তি দেওয়া হয়। [আল্লাহর নৈকট্য থেকে] 'দূরে সরা বা বিচ্যুত' এসব লোকের সম্পদ বা মর্যাদা বা প্রতিপত্তি বা সম্পত্তি আছে কি নেই, সেগুলো ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। সব থেকে মধুর বা সব থেকে ভয়ানক দুঃস্বপ্নে আপনি কি পেলেন আর কি হারালেন, সেগুলো যেমন বাস্তব নয়, গুরুত্বপূর্ণও নয়। তেমনিভাবে [আল্লাহর নৈকট্য থেকে বিচ্যুত ব্যক্তির অর্জনও] ওই স্বপ্নে পাওয়া জিনিসের মতোই মূল্যহীন ও অনর্থক।
এসব মোহ ও ভ্রম সম্পর্কে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
"এদের বিভিন্ন দলকে পরীক্ষার জন্য পার্থিব জীবনের চাকচিক্যে আচ্ছাদিত ভোগের যেসব সামগ্রী দিয়েছি, সেগুলোর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করবেন না। কেননা, আপনার স্রষ্টার দেওয়া রিযিকই উত্তম ও অধিক স্থায়ী।” (কুরআন, ২০:১৩১)
স্থায়ী জীবন তো সেটাই, যেটার সূচনা তখনই হয়, যখন আমরা এই দুনিয়ার [মায়াজাল থেকে] জাগ্রত হই। আর ওই জাগরণের মাঝেই আমরা উপলব্ধি করি ...
এটা [পার্থিব জীবন] ছিল কেবলই এক স্বপ্ন।
📄 বদ্ধ দুয়ার এবং যেসব মায়া-মোহ আমাদেরকে অন্ধ করে রাখে
গতকাল আমার ২২ মাস বয়সী ছেলে প্রথমবারের মতো তার স্বাধীনতা চর্চা করতে চেয়েছিল। গাড়িতে নিজের আসন থেকে কোনো রকম বের হয়েছে, বড়দের মতো সে গাড়ির দরজা বন্ধ করতে চাইলো। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে তার ওপর নজরদারি করছিলাম। আমি অনুভব করলাম যে, আমি যদি তাকে গাড়ির দরজা বন্ধ করতে দিই, তবে তা করতে গিয়ে তার ছোট্ট মাথাটুকু সজোড়ে আঘাত পেয়ে থেতলে যাবে। তাই আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম এবং নিজেই গাড়ির দরজা বন্ধ করলাম। এটা তাকে ভীষণভাবে মনোঃক্ষুন্ন করে এবং সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। যে কাজ করতে সে এতো ভীষণভাবে উদগ্রীব, তা করতে কিভাবে আমি তাকে বাধা দিলাম?
এই ঘটনা দেখে আমার মনে আশ্চর্যজনক এক চিন্তার উদ্ভব ঘটে। আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া একই রকম ঘটনাগুলি আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো -যখন আমরা ব্যাকুলভাবে কিছু চাই, কিন্তু আল্লাহ সেটা লাভ করার অনুমতি আমাদের দেন না। আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো, সেসব সময়ের কথা, যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে আমরা সবাই এই একই ধরনের হতাশায় ভুগি, যখন আমাদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও পরিস্থিতি আমাদের প্রত্যাশা মোতাবেক হয় না। আর তখন সহসাই বিষয়টি খুব পরিষ্কার হয়ে গেল। [গাড়ির] দরজার আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্যই আমি আমার ছেলেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই। কিন্তু এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণাই ছিল না। আমার ছেলে যেভাবে তার সারল্য ও নিষ্পাপ বোধ থেকে কান্না করেছিল, প্রায়শই আমরা সেভাবে বিলাপ করতে থাকি, যেখানে বাস্তবতা হচ্ছে: [ওই না পাওয়াটাই আমাদেরকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে।
যখন আমরা বিমানের ফ্লাইট মিস করি, চাকরি হারাই কিংবা আমাদের মনের মানুষকে বিবাহ করতে ব্যর্থ হই, তখন একবারের জন্যও আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, হয়তো এমনটি আমাদের মঙ্গলের জন্যই হয়েছে? কুরআনে আল্লাহ আমাদেরকে অবহিত করেন:
“... হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হয়তো তোমরা কোনো জিনিস পছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন এবং তোমরা জানো না।” (কুরআন, ২:২১৬)
তারপরও কোনো জিনিসের বর্হিভাগ ভেদ করে দেখাটা বেশ কঠিন। মায়া ও মোহজাল ভেদ করে অন্তর্নিহিত সত্যের দেখা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট (মানসিক) শক্তির প্রয়োজন হয়, হয়তো আমরা সে সত্য উপলব্ধি করতে পারি, আবার নাও করতে পারি। ঠিক যেভাবে আমার ছেলেটা বুঝতে অক্ষম ছিল যে, ওই মুহূর্তে তার ঐকান্তিক চাওয়া থেকে বিরত করাটাই ছিল তার প্রতি আমার সতর্ক দৃষ্টি রাখার দাবি, ঠিক তেমনি আমরা প্রায়শই একই রকম অন্ধ হয়ে পড়ি।
ফলশ্রুতিতে, আমাদের জীবনের বদ্ধ দুয়ারগুলোতে আমরা অনিশ্চয়তায় ঘেরা চোখ দিয়ে তাকাতে থাকি এবং [আমাদের জন্য] যেসব দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, সেটার দিকে ভ্রুক্ষেপ করতে একদমই ভুলে যাই। যখন আমরা মনের মানুষকে বিয়ে করতে পারি না, তখন [ঘটনার বাহ্যিকতা] ভেদ করে সামনে তাকানোর অক্ষমতা আমাদেরকে এতোটাই অন্ধ বানায় যে, ওই মানুষটির থেকে উত্তম কেউ যে থাকতে পারে, সে ব্যাপারে পুরোপুরি অন্ধ বনে যাই। যখন আমাদেরকে চাকুরিটা দেওয়া হয় না, কিংবা যখন আমরা সাধের কোনো বস্তু হারিয়ে ফেলি, তখন এক পা পেছনে গিয়ে গোটা দৃশ্যটা (The bigger picture) অবলোকন করা আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায়শই আল্লাহ আমাদের থেকে বিভিন্ন জিনিস কেড়ে নেন, যাতে করে সেগুলোর বদলে উত্তম কিছু [আমাদেরকে] দিতে পারেন।
এমনকি ট্রাজেডিও এজন্য ঘটতে পারে। সন্তান হারানোর চেয়ে বড় কোনো বেদনা কেউ কল্পনা করতে পারে না। তথাপি এই ক্ষতিও পারে আমাদেরকে রক্ষা করতে এবং উত্তম কিছু দিতে।
নবি (ﷺ) বলেন:
“(আল্লাহর) কোনো বান্দার সন্তান যখন মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তখন ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন: 'তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানের [প্রাণ] হরণ করে নিয়ে আসলে?' ফেরেশতাগণ উত্তরে বলেন: 'হ্যাঁ।'
আল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'তোমরা কি তার কলিজার টুকরোকে তুলে এনেছো?' তারা উত্তরে বলেন: 'হ্যাঁ।'
আল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'আমার বান্দা তখন কি বলে?'
ফেরেশতাগণ উত্তরে বলেন: 'সে আল্লাহর প্রশংসা করেছে এবং বলেছে: 'আল্লাহর কাছেই আমরা প্রত্যাবর্তন করি।'
আল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'জান্নাতে আমার বান্দার জন্য একটি ঘর নিমার্ণ করো এবং এটার নাম রাখো 'বায়তুল হামদ' (প্রশংসার ঘর)।” [তিরমিযি]
সন্তানের মতো প্রিয় বস্তু যখন আল্লাহ আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেন, হয়তো তিনি আমাদেরকে আরও কল্যাণকর কিছু দিতে চাইছেন, তাই তিনি এমনটি করেছেন। হয়তো ওই হারানোর কারণেই আমাদেরকে প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে এবং সেখানে ওই সন্তানের সাথে পার করবো আমরা চিরকালের জিন্দেগি। দুনিয়ার এই জীবনের মতো ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং এক চিরস্থায়ী জীবন, যেখানে আমাদের সন্তানের না থাকবে কোনো কষ্ট ও ভয়, আর না থাকবে সেখানে কোনো অসুস্থতা।
আমাদের এই জীবনের অসুস্থতা ও রোগ-বালাইও কিন্তু তেমনটি নয়, যেমনটি আমরা সেগুলোকে ভাবছি। এগুলোর মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ আমাদের পাপগুলো ধুয়ে মুছে আমাদের পরিশুদ্ধ করে নিচ্ছেন। যখন নবি () কঠিন জ্বরে ভুগছিলেন, তখন তিনি বলেন:
"মুসলিম যখন কোনো কষ্টে পতিত হয়, এমনকি তা যদি কাঁটার আঘাতও হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ সেটার দ্বারা তার গুনাহগুলো মুছে দেন, যেমনিভাবে গাছ থেকে তার পাতাগুলো ঝরে পড়ে।" [বুখারি]
দুঃখ ও বিরহের বিষয়টিও যে এরূপ, সেটা নবি (স) অন্য এক হাদিসে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:
"মুসলিমের ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, অসুস্থতা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, ক্ষতি কিংবা নৈরাশ্য আসে -এমনকি তা যদি [দেহে] কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও হয়, তবে আল্লাহ সেগুলোর মাধ্যমে তার পাপগুলো মুছে দেন। [বুখারি]
অথবা দারিদ্রের বিষয়টি বিবেচনা করুন। ধনসম্পদ না থাকা যে সম্ভবত একটি আশীর্বাদ হতে পারে, অধিকাংশ মানুষ এটা কল্পনা করতেই পারে না। কিন্তু কারুনের আশেপাশের লোকজনের বেলায় বিষয়টি এমনই ছিল। কারুন নবি মুসা (আলাহিস সালাম)-এর সমসাময়িক ছিল এবং আল্লাহ তাকে এতোটাই অঢেল সম্পদ দান করেন যে, তার ধনভাণ্ডারের চাবিখানাও মহামূল্যবান সম্পদ ছিল। কুরআন বলে:
"অতঃপর স্বীয় জাঁকজমকে সজ্জিত হয়ে কারুন আপন সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো। পার্থিব জীবনের জন্য যাদের অন্তর কামনাতুর ছিল, তারা বললো: 'হায়, কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, আমাদেরকে যদি তা দেওয়া হতো, আসলেই সে চরম ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত।” (কুরআন, ২৮:৭৯)
কিন্তু কারুনের এই সম্পদ তাকে অহংকারীতে পরিণত করে। সে পরিণত হয় অকৃতজ্ঞে এবং সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। আল্লাহ বলেন:
"আর, আমি কারুন ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম। আল্লাহ ছাড়া এমন কেউই ছিল না যে তাকে সাহায্য করতে পারে। আর সেও পারলো না নিজেকে রক্ষা করতে। আগেরদিন যারা তার মতো মান মর্যাদার কামনা করেছিল, তারা বলতে শুরু করলো, 'দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তিনি সেটাকে সংকুচিত করে নেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না দেখাতেন, তবে আমাদেরকেও ভূগর্ভে প্রোথিত করতেন। দেখলে তো কাফিররা সফলকাম হয় না।” (কুরআন, ২৮:৭৯)
কারুনের এই পরিণতি দেখার পরপরই ওই লোকেরা [আল্লাহর প্রতি] কৃতজ্ঞতা জানায় এই কারণে যে, তারা কারুনের সম্পদ থেকে বেঁচে গেছে।
সম্ভবত, এ ব্যাপারে মুসা (আ,) ও খিযিরের ঘটনার চেয়ে ভালো কোনো উদাহরণ হতে পারে না, যে ঘটনার বিবরণ সুরা আল-কাহাফে বর্ণিত হয়েছে। নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন খিযিরের সাথে ভ্রমণ করছিলেন (বিশ্লেষকদের মতে, যিনি মানবরূপী এক ফেরেশতা ছিলেন), তখন নবি মুসা উপলব্ধি করেন যে, পরিস্থিতি যেরূপ দৃশ্যমান হয়, সেটা সব সময় সেরূপ হয় না এবং বাহ্যিকদৃষ্টি দিয়ে আল্লাহর প্রজ্ঞাকে সর্বদা বোঝা সম্ভব হবে না। খিযির ও নবি মুসা এক জনপদে আসেন, যেখানে [আসতে না আসতেই] খিযির লোকদের নৌকাগুলো ফুটো করে দেন।
বাহ্যিকভাবে, এই কাজ নৌকাগুলোর মালিকদেরকে দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে, যেহেতু তারা দরিদ্র। পরবর্তীতে খিযির ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকৃতপক্ষে [তিনি তাদের কোনো ক্ষতিই করেননি, উল্টো] তাদেরকে এবং তাদের নৌকাগুলোকে তিনি রক্ষা করেছেন।
আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন বলেন:
"(খিযির) বলেন, 'এখানেই আমার ও আপনার মাঝে সম্পর্ক শেষ হলো। আমি আপনাকে ওইসব ঘটনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানাবো, যেগুলোর ব্যাপারে আপনি ধৈর্য ধরে রাখতে পারেননি। নৌকার বিষয়টি এরূপ: এটা ওইসব দরিদ্র লোকের মালিকানাধীন ছিল, যারা সমুদ্রে কাজ করতো। তাই আমি নৌকাটি ফুটো করে দেই, যাতে করে তাদের এই নৌকা ওই রাজার হাত থেকে নিরাপদ থাকে, জোর-জবরদস্তি করে যে কিনা সমস্ত (ভালো) নৌকা দখল করে নিতো।” (কুরআন, ১৮:৭৯-৭৯)
নৌকাগুলোর ক্ষতিসাধন করে খিযির এসব নৌকাকে ওই রাজার চোখে এগুলো অকেজো প্রমাণ করেন, যে রাজা জোর জবরদস্তির মাধ্যমে সকল নৌকা দখল করছিল। আর ঠিক এমনটিই কখনো কখনো আমাদের জীবনে ঘটে। [বিপদ থেকে] বাঁচানোর জন্যই আমাদের থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া হয় কিংবা আমাদের মর্জির উল্টো পথে আমাদেরকে কোনো জিনিস দেওয়া হয়। এরপরও আমার ২২ মাসের শিশু বালকটির মতো আমরাও মনে করতে থাকি আমাদের (সৌভাগ্যের) দুয়ার বন্ধ হয়ে আছে।