📄 কষ্ট ও দুর্ভোগ
নিজেদের কষ্ট ও দুর্ভোগ দূর করতে আমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলি, কিন্তু আমরা কখনোই বিবেচনা করে দেখি না যে, আমাদের কষ্টগুলো আসলে আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করছে।
📄 ঝড়ের মাঝে একমাত্র আশ্রয়
ঝড় যখন আসে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাটা কখনোই সহজ হয় না। বৃষ্টি শুরুর ক্ষণিক পরেই বিজলী চমকাতে থাকে। আঁধার কালো মেঘ সূর্যকে ঢেকে দেয় এবং এক সময়ের শান্ত সমুদ্রের সমস্ত তরঙ্গ হঠাৎ করেই আপনাকে ঘিরে ধরে। কোনোভাবেই আর নিজের পথ আপনি তখন খুঁজে না পেয়ে সাহায্যের আশায় হাত বাড়িয়ে দেন।
কোস্ট গার্ডকে দিয়েই আপনি শুরু করেন। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। আপনি নৌকাকে অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আপনি লাইফবোট খুঁজতে থাকেন, কিন্তু সেটার কোনো পাত্তা নেই। এই পরিস্থিতিতে আপনি হন্যে হয়ে লাইফ জ্যাকেটের সন্ধান করেন। কিন্তু হায়, সেটাও ছেঁড়া। একটা উপায় খুঁজতে খুঁজতে যখন আপনি আপনার সামর্থের সবটুকু নিঃশেষ করে ফেলেন, ঠিক তখনই আপনি আসমানের দিকে দৃষ্টি ফেরান।
আর আল্লাহকে ডাকেন।
যাইহোক, ওই মুহূর্তের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য আছে, যা সম্পূর্ণরূপে অনন্য। এই পরিস্থিতিতে আপনি এমন কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করেন, অন্য সময় যেটা আপনি কেবল তাত্ত্বিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। হ্যাঁ, ওই মুহূর্তে আপনি প্রকৃত তাওহিদের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। লাভ করেন প্রকৃত একত্ববাদের স্বাদ। লক্ষ্য করুন, তীরে থাকা অবস্থায় আপনি হয়তো আল্লাহকেই ডাকতেন, কিন্তু আপনি আরও অনেকের সাথে সাথে তাঁকে ডাকতেন। আপনি হয়তো আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন, কিন্তু আরও অনেক কিছুর সাথে সাথে তাঁর ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এই একটি মুহূর্তে সবকিছুই বন্ধ। হ্যাঁ, সবকিছু। ডাকার মতো তো আর কেউ নেই। নির্ভর করার মতো কিছুই বাকি নেই। [হ্যাঁ], শুধু তিনিই রয়ে গেছেন।
আর এটাই হচ্ছে মূল বিষয়।
আপনি কি কখনো এটা ভেবে অবাক হয়েছেন যে, আপনার সব থেকে প্রয়োজনের সময়ে সৃষ্টির যে যে দুয়ারে সাহায্যের জন্য আপনি পা বাড়ান, সেগুলো বন্ধ থাকে কেন? আপনি এক দুয়ারে কড়া নাড়েন, কিন্তু সেটা সজোড়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরেক দুয়ারে যান। সেটাও বন্ধ। আপনি এক দুয়ার থেকে আরেক দুয়ারে যান, কড়া নাড়তে থাকেন, আর প্রত্যেক দুয়ারে আঘাত করতে থাকেন, কিন্তু কিছুই খুলে না। এমনকি যে যেসব দুয়ারের ওপর আপনি এক সময় নির্ভর করতেন, আচমকাই সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কেন? কেন এমনটি ঘটে?
খেয়াল করুন, মানুষ হিসেবে আমাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, আল্লাহ যেগুলো ভালো করেই জানেন। আমরা সর্বদাই চাহিদার একটি অবস্থাতে থাকি। আমরা দুর্বল। কিন্তু একইসাথে আমরা তাড়াহুড়ো প্রবণ ও অধৈর্য। যখন আমরা বিপদে থাকি, তখন আমরা সাহায্য তালাশের জন্য এক প্রকার বাধ্য হই। এটাই [তাঁর সৃষ্ট] নকশা [বা ডিজাইন]। দিন যখন রোদেলা, আর আবহাওয়া যখন মনোরম, তখন আমরা আশ্রয় খুঁজতে যাবো কেন? কখন আমরা আশ্রয় খুঁজি? যখন ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে, কেবল তখনই আমরা আশ্রয় খুঁজি। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) ঝড় বইয়ে দেন, এমন পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রয়োজন তৈরি করেন, যাতে করে আমরা আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হই।
যখন আমরা সাহায্য তালাশ করি, তখন আমাদের মধ্যস্থিত অধৈর্য বৈশিষ্ট্যের জন্য যা নিকটে আর যেটা সহজ মনে হয়, তার থেকেই আমরা সাহায্য চাই। যা দেখতে পাই, শুনতে ও ছুঁতে পারি, সেটার কাছেই আমরা সাহায্য চাই। আমরা সোজা পথ খুঁজি। সৃষ্টির কাছে আমরা সাহায্য খুঁজি। এমনকি নিজ সত্তার কাছেও আমরা সাহায্য চাই। সবচেয়ে নিকটবর্তী যেটা, সাহায্যের জন্য আমরা সেটাই খুঁজি। দুনিয়া (তথা পার্থিব জীবন) বলতে কি ঠিক এটাই বুঝায় না? যা কাছের মনে হয় [সেটাই কি দুনিয়া নয়?]। 'দুনিয়া' শব্দটির মানে: 'যা নিচু'। যা সব থেকে কাছের মনে হয়, সেটাই দুনিয়া। কিন্তু এটা এক মোহ বা ভ্রম মাত্র।
কিন্তু এটার থেকে নিকটবর্তী কিছু আছে। এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন তো, কোন জিনিসটি আপনার সবচেয়ে নিকটে আছে। যদি এই প্রশ্নটি করা হয়, তবে অনেকেই হয়তো বলবেন, আমাদের অন্তর ও সত্তাই সবচেয়ে নিকটবর্তী।
কিন্তু আল্লাহ (৫) বলেন: "আমরাই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং [মানুষ] তার নফস (তথা মনের মাঝে) যে কুচিন্তা করে, তা আমরা জানি। কেননা, তার গ্রীবাহ ধমনীর চেয়েও আমরা অধিক নিকটবর্তী।” وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ (কুরআন, ৫০:১৬)
এই আয়াতটি আল্লাহ (স) শুরু করেছেন এটা দেখিয়ে যে, তিনি আমাদের চেষ্টা ও সাধনাগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। কেউ আমাদের চেষ্টা ও সাধনাগুলোর খবর রাখেন, সেটা স্বস্তির এক সংবাদ। নিজ সত্তা আমাদেরকে কি বলে, তিনি সেটা জানেন। তিনি আমাদের গ্রীবাস্থ ধমনীর চেয়েও নিকটে। গ্রীবাস্থ ধমনী কেন? আমাদের [দেহের] ওই অঙ্গে কি এমন আকর্ষণীয় জিনিস আছে, যার জন্য এটার উল্লেখ হয়েছে? গ্রীবাস্থ ধমনী ওই মহাগুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যেটা হৃদয়ে রক্ত সরবরাহ করে। এটা যদি কেটে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা মারা যাবো। আক্ষরিকভাবে এটা আমাদের জীবন। কিন্তু আল্লাহ (স) নিকটে অবস্থান করেন। আল্লাহ (স) আমাদের জীবন, আমাদের নিজ সত্তা এবং আমাদের নিজ নফস থেকেও অধিক নিকটে অবস্থান করেন। আমাদের হৃদয়ের মহাগুরুত্বপূর্ণ গতিপথ থেকেও তিনি অধিক নিকটবর্তী।
অন্য আয়াতে আল্লাহ (স) বলেন: "তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে ওই কাজের দিকে আহ্বান করেন, যেটা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখো আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অবস্থান করেন। বস্তুত তাঁর কাছেই তোমরা সকলে সমবেত হবে।" يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ (কুরআন, ৮:২৪)
আল্লাহ (স) জানেন, আমাদের নফস রয়েছে। আল্লাহ জানেন, আমাদের হৃদয় রয়েছে। এই জিনিসগুলো যে আমাদেরকে চালিত করে, আল্লাহ তা জানেন। তা সত্ত্বেও, আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, এসব থেকেও তিনি আমাদের অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং, যখন আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে ছুটি, তখন আমরা কেবল দুর্বলের কাছে যাই না, বরং সেইসাথে যিনি সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করেন, তাঁকে উপেক্ষা করে, যা দূরে এবং বহুদূরে অবস্থান করে, তার কাছে ছুটে যাই। সুবহান আল্লাহ (সমস্ত মহিমা আল্লাহর)।
এটাই যেহেতু আমাদের প্রকৃতি এবং আল্লাহ (স) ভালোভাবেই তা জানেন, তাই ঝড়ের সময় আশ্রয় লাভের অন্য সকল দরজা বন্ধ করে, তিনি আমাদেরকে রক্ষা করেন এবং আমাদেরকে [তাঁর অভিমুখে] পুনরায় চালিত করেন। প্রতিটি মিথ্যা দুয়ারের পেছনে রয়েছে এক একটি গহ্বর, এটা তিনি জানেন। সেখানে পা দিলে, আমাদের পতন নিশ্চিত। তাঁর অপার করুণা ও রহমতের বলে তিনি ওই মিথ্যা দুয়ারগুলো বন্ধ করে রাখেন।
তাঁর অপার করুণার বলে, তিনিই ঝড় বইয়ে দেন, যাতে করে আমরা সাহায্য তালাশ করি। আর তিনি জানেন আমরা ভুল জায়গাতে পা দেবো, তাই তিনি আমাদের বহু নির্বাচনী পরীক্ষা নেন, যাতে কেবল একটি উত্তর বাছাইয়ের সুযোগ থাকে এবং ওটাই সঠিক উত্তর। এই যে কষ্ট, সেটা আসলে আরামের [জন্য]। তাই আঁকড়ে ধরার সকল হাতল এবং অন্য সব উত্তরকে সরিয়ে দিয়ে তিনি পরীক্ষাকে একেবারে সহজ করে দেন।
ঝড় যখন আসে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাটা কখনোই সহজ হয় না। এবং এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঝড়ো হাওয়া পাঠিয়ে তিনি আমাদেরকে নিজেদের হাঁটুর ওপর নামিয়ে আনেন এবং [আল্লাহর] কাছে প্রার্থনা জানানোর এটাই সর্বোত্তম ভঙ্গি।
📄 জায়নামাজে নিজের যন্ত্রণার দেয়াল: আল্লাহর সাহায্য কামনা প্রসঙ্গে
আমি একটা গল্প জানি, যা নেহাত কোনো গল্প নয়। এমন এক নারীর গল্প এটা, যিনি এই জীবনের চাকচিক্য থেকে অন্য কিছুকে অনেক বেশি ভালোবেসেছিলেন। নিজেকে যিনি তার চারপাশের কষ্টকর পরিস্থিতি দ্বারা কখনো সংজ্ঞায়িত বা সীমাবদ্ধ হতে দেননি। নিজের মাঝে তার এমন প্রগাঢ় ঈমান লালন করেছিলেন, যার জন্য তিনি হাসিমুখে মৃত্যুকে পর্যন্ত বরণ করে নিতে রাজি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন রাণী, তথাপি তিনি এই দুনিয়ার সিংহাসন ও রাজপ্রাসাদের মোহ ভেদ করে এর সত্যিকার বাস্তবতা দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার এই রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে তিনি দৃষ্টি প্রসারিত করেছিলেন আখিরাতে তার জন্য [নির্মিত] রাজপ্রাসাদের দিকে। কিন্তু ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার জন্য এটা অন্তর্চক্ষুর কোনো রূপক চাহনি ছিল না। বরং আসিয়ার জন্য ছিল এটা তার চর্ম চক্ষের দৃষ্টির মতোই বাস্তব।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) বলেন:
"ফেরাউনের স্ত্রীর মাঝে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য একটি উপমা রেখেছেন, যে বলেছিল: 'হে আমার প্রতিপালক, আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করুন এবং ফেরাউন ও তার কর্মকাণ্ড থেকে আমাকে পরিত্রাণ দেন এবং আমাকে জালিম লোকদের থেকে রক্ষা করুন।” (কুরআন, ৬৬:১১)
আসিয়ার এই কাহিনী আমি বহুবার শুনেছি। আমাকে প্রতিবারই এটা নাড়া দেয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে আসিয়ার এই কাহিনী আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি কারণে দারুনভাবে নাড়া দেয়। কয়েক মাস আগে আমি কঠিন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। পুণ্যবান ও ফেরেশতা স্বভাবে আত্মাদের সাহায্যের মাধুর্য সত্যই অমূল্য। যখন আপনি কঠিন সময় পার করবেন, তখন একটি টেক্সট মেসেজ (Text message), ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস আপডেট, সুহাইব ওয়েব লিস্টারেভের (Suhaib Webb Listserv) কাছে একটি ইমেইল পাঠানো [আপনার জন্য ফলপ্রসু হতে পারে] এবং দেখবেন পুণ্যবান আত্মার এক বাহিনী আপনার জন্য দু'আ করা আরম্ভ করে দিয়েছে। সুবহানাল্লাহ (মহিমা শুধু তাঁরই)।
আমি তাই এই অনুরোধটা করি। একজন মানুষ আরেকজনকে সর্বোত্তম যে উপহারটা দিতে পারে, আমি সেটারই অনুরোধ করি। আমি [তাদের কাছে। আন্তরিক দু'আ কামনা করি। আমি যা লাভ করি, তা ছিল অভিভূত করারই মতো। আল্লাহর ওই উপহারের কথা আমি কখনো ভুলবো না। আমি এমনসব লোকের দেখা পেয়েছি, যারা কিয়াম (তথা রাতের সলাতে) দাঁড়িয়ে আমার জন্য দু'আ করেছে, যারা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আমার জন্য দু'আ করেছে। ভ্রমণরত অবস্থায়, এমনকি সন্তান জন্মদানের সময়ও [তারা আমার জন্য দু'আ করেছে। এতো এতো দু'আ পাওয়ার পরও একটি দু'আ মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। এটা সাধারণ একটা টেক্সট মেসেজ ছিল, যাতে লেখা ছিল: 'জান্নাতে আপনার বাড়ি আপনাকে দেখানো হোক, যাতে করে যেকোনো কষ্ট আপনার জন্য সহজ হয়ে যায়।” আমি এটা পাঠ করি এবং এটা আমায় নাড়া দেয়। হ্যাঁ, এটা আমাকে দারুনভাবে নাড়া দেয়।
ঠিক তখনই আসিয়ার কাহিনী আমার স্মরণে আসে, আর হঠাৎ করে বিস্ময়কর কিছু আমার মনে দোলা দেয়। বস্তুত একজন মানুষ যা কল্পনা করতে পারে, আসিয়া ঠিক সেরূপ ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুনিয়ার বুকে বিচরণকারী জঘন্যতম স্বৈরাচার ছিল ফেরাউন। আসিয়ার জন্য সে কেবল তার শাসক মাত্র ছিল না, সে ছিল তার স্বামী। আর আসিয়ার শেষ সময়ে ফেরাউন তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাতে শুরু করে। কিন্তু অবাক করা কিছু একটা ঘটে। আসিয়া মুচকি হাসতে থাকেন। একজন মানুষ যতটুকু কল্পনা করতে পারে, আসিয়া সে রকম ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন হাস্যোজ্বল।
এটা কিভাবে সম্ভব? কঠিন নির্যাতনের সময় কিভাবে তিনি হাসতে পারছিলেন? অথচ যখন আমরা সামান্য ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ি কিংবা আমাদের দিকে কেউ যদি বাজেভাবে তাকায়, তখন আমরা তা সামলাতে পারি না। নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) -আল্লাহ তার প্রতি সলাত এবং সালাম বর্ষণ করুন- তিনি কঠিনতম বিপদে নিপতিত হন, আর তা সত্ত্বেও আগুন তার কাছে ঠাণ্ডা অনুভূত হলো? কিছু লোকের কিছু না থাকার পরও, তারা অভিযোগ উত্থাপনের কোনো কারণ খুঁজে পায় না, অন্যদিকে যাদের 'সবকিছু' থাকার পরও, অভিযোগ ছাড়া তাদের থেকে কিছুই শোনা যায় না, কেন এমনটি ঘটে? কখনো আমরা জীবনের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেশ ধৈর্য ধারণ করি, অথচ আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলোতে খুব একটা ধৈর্য ধরতে পারি না, কিভাবে এমনটি ঘটে?
বিপদ-মুসিবতকে আমি কঠিন মনে করতাম। কেননা, কিছু জিনিস বহন করাটা বাস্তবিকই কঠিন। আমি একটি মৌলিক তালিকার কথা চিন্তা করতাম, যেখানে বিপদ-আপদের একটি আদর্শক্রম থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ প্রিয়জন হারানোর বেদনা সব সময় ট্রাফিকের টিকিট সংগ্রহ করার ঝামেলা থেকে কঠিনতর। এটাই যথাযথ বলে প্রতীয়মান হয়। এটিই আমাদের কাছে যথাযথ মনে হয়।
কিন্তু, বাস্তবে এটা ঠিক নয়।
যেকোনো ধরনের বিপদ সহ্য করাটা কঠিন কাজ নয়, যেহেতু স্বয়ং বিপদই কঠিন। বিপদের সময় কষ্ট কতটা কঠিন কিংবা কতটা সহজ, সেটার মাপার মানদণ্ড আছে -অদৃশ্য এক মানদণ্ড। জীবনে আমি যা কিছুরই মুখোমুখি হই না কেন, সেটা সহজ হবে নাকি কঠিন হবে, তা ওই বিষয়টির কঠিন বা সহজ হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বরং বিষয়টি সহজ হবে নাকি কঠিন হবে, তা নির্ভর করে আল্লাহর সাহায্যের মাত্রা ও স্তরের ওপর। কোনো কিছুই সহজ না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার জন্য সেটা সহজ না বানাচ্ছেন। না কোনো ট্রাফিক জ্যাম, না কোনো কাগজের টুকরো, [কিছুই সহজ নয়]। আল্লাহ যা আমার জন্য সহজ করে দেন, তার কিছুই কঠিন নয়। না অসুস্থতা, না মৃত্যু, না আগুনে ফেলে দেওয়া, আর না স্বৈরাচারের যুলুমের শিকার হওয়া, [কিছুই আমার জন্য কঠিন হবে না]।
ইবনে আতায়িল্লাহ আল-সিকান্দারি খুব সুন্দর করে বলেন:
"কিছুই কঠিন নয়, যদি তুমি সেটা তোমার প্রতিপালকের মাধ্যমে চাও। কিছুই সহজ নয়, যদি তুমি সেটা চাও তোমার যোগ্যতায়।”
ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনে ফেলা হয়। আল্লাহ এই জীবনে আমাদের কাউকে এমন ভয়াবহ পরীক্ষার মুখোমুখি না করুন। কিন্তু এমন কোনো মানুষ নেই, যারা তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে আবেগ, মানসিক বা সামাজিক আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন। আর এটা ভাববেন না যে, আল্লাহ আমাদের জন্য ওইসব আগুনকে ঠাণ্ডা করতে অক্ষম। আসিয়া শারীরিকভাবে নির্যাতিত ছিলেন, কিন্তু জান্নাতে তার জন্য নির্মিত বাড়ি আল্লাহ তাকে দেখিয়ে দেন। তাই তিনি হেসে দেন। আমাদের চর্ম চক্ষু এই জীবনে জান্নাতের দেখা পাবে না। কিন্তু আল্লাহ চাইলে, স্রষ্টার সান্নিধ্যে নির্মিত বাড়ির ওই দৃশ্য অন্তরের দৃষ্টিকে দেখানো যায়, যাতে করে প্রতিটি কষ্ট হয়ে যায় সহজ। হয়তো আমরাও ওই রকম কঠিন পরিস্থিতিতে হাসতে পারবো।
তাই স্বয়ং পরীক্ষাটা সমস্যা নয়। না ক্ষুধা, আর না শীত। বরং ক্ষুধা ও শীত মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমাদের আছে কিনা, সেটাই আসল সমস্যা। যদি থেকে থাকে, তবে না ক্ষুধা, আর না শীত আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে। এগুলো আমাদেরকে কষ্ট দেবে না। সমস্যা তখনই আবির্ভূত হয়, যখন ক্ষুধা আসে, তখন যদি খাবার না থাকে। সমস্যা তখনই আসে, যখন তুষার ঝড়ে চারদিক নুয়ে পড়ে, তখন যদি কোথাও আশ্রয় পাওয়া না যায়।
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে চান, বানাতে চান আমাদেরকে বলীয়ান এবং তিনি চান, আমরা যেন তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন, ওইসব ক্ষুধা, পিপাসা ও শীত পাঠানোর সাথে সাথে আল্লাহ খাবার, পানি এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করে থাকেন। আল্লাহই পরীক্ষা দিয়ে থাকেন, কিন্তু এটার সাথে তিনি পাঠাতে পারেন সবর (ধৈর্য), এমনকি উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি এটার সাথে পাঠাতে পারেন রিদা (তথা তুষ্টির) মতো গুণকে। হ্যাঁ, আল্লাহ (স)-ই আদমকে এই দুনিয়াতে নামিয়ে দেন, যেখানে তাকে চেষ্টা, সংগ্রাম করতে হবে এবং তাকে মুখোমুখি হতে হবে পরীক্ষার। কিন্তু সেইসাথে তিনি তার ঐশ্বরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে বলে:
“তিনি বলেন (অর্থাৎ আল্লাহ বলেন), 'জান্নাত থেকে নেমে যাও -সবাই, তোমরা একে অপরের দুশমন। এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়েত আসবে, -যারাই সেটার (অর্থাৎ আমার হেদায়েতকে) অনুসরণ করবে, না তারা (এই দুনিয়াতে) গোমরাহ হবে, আর না তারা (আখিরাতে) কষ্ট ভোগ করবে।” (কুরআন, ২০:১২৩)
নবি (ﷺ) তায়েফের প্রান্তরে যে দু'আ করেছেন, সম্ভবত সেটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দু'আ। রক্তাক্ত ও আঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি আপন প্রতিপালককে ডাকেন:
أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
"আমি তোমার চেহারার দীপ্তির মাঝে আশ্রয় চাচ্ছি, যে দীপ্তিতে বিদায় নেয় আঁধার এবং এই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিটি বিষয় লাভ করে পূর্ণতা।”
বস্তুত আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে পরীক্ষা করেন এবং ওই ব্যক্তির ঈমানের স্তরের অনুপাতে তিনি সে পরীক্ষা নেন। কিন্তু সেইসাথে আল্লাহ তাঁর ঐশ্বরিক সহায়তাও পাঠিয়ে থাকেন, যেকোনো পরীক্ষাকে যেটা বানিয়ে দেয় সহজ এবং যেকোনো আগুনকে যেটা আরামদায়ক শীতল করে দেয়। আর এভাবেই শীঘ্রই তিনি পাঠাতে পারেন স্বীয় ঐশ্বরিক মদদ, যেটার বলে কঠিন অগ্নি পরীক্ষার মাঝেও আমরা তাঁর আলোর ঝলকে হবো ধন্য এবং তাঁর সান্নিধ্যে জান্নাতে নির্মিত বাড়ি করবে আমাদেরকে হাস্যোজ্জ্বল।
টিকাঃ
* কুর'আনের বর্ণনা মোতাবেক আসিয়া ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন। যখন শিশু মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে সিন্দুকে করে তার মা নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন, তখন ওই সিন্দুক ফেরাউনের রাজ দরবারের ঘাটে থামে, তখন আসিয়া ওই সিন্দুক থেকে শিশু মুসাকে নিজ দায়িত্বে নেন এবং তার স্বামী ফেরাউনকে রাজি করিয়ে শিশু মুসাকে লালন- পালন করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ফেরাউনের দরবারে নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন, তখন তিনি নবি মুসার প্রতি ঈমান আনেন। ঈমান আনায়নের পর ফেরাউন তার প্রতি নির্যাতনের স্টিম রোলার চালালেও তিনি স্বীয় ঈমানে অটল থাকেন এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। -(সম্পাদক)।
৩০ ১৯৭২ সালে জন্ম নেয়া সুহাইব ওয়েব ১৯৯২ সালে ইসলামে দীক্ষিত হন। মিসরের আল-আযহারে তিনি উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। তিনি একজন ইমাম ও বেশ জনপ্রিয় বক্তা। -(সম্পাদক)।
📄 অন্যের দ্বারা পাওয়া আঘাত: কিভাবে মানাবেন ও সারাবেন
আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, বিশ্ব তখন এক যথার্থ অবস্থানে ছিল। তবে একমাত্র সমস্যা ছিল, আসলে কিন্তু তা সে রকমটা ছিল না। আমি বিশ্বাস করতাম, সব কিছুই সর্বদা "ন্যায্যতার" ভিত্তিতে হবে। আমার কাছে এটার মর্ম ছিল, কারো প্রতি কোনো রকম অন্যায় করা হবে না এবং যদিবা করা হয়, তবে তিনি ন্যায়বিচার লাভ করবেন। আমার বিশ্বাস মোতাবেক বিষয়াদি হওয়ার জন্য আমি কঠিন লড়াই করেছি। তদপুরি, আমার সংগ্রামে আমি এই জীবনের একটি মৌলিক সত্যকে উপেক্ষা করে গেছি। আমার শিশুসুলভ আদর্শবাদে আমি এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি যে, এই দুনিয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্পূর্ণ। মানুষ হিসেবে আমরাও স্বাভাবিকভাবে অসম্পূর্ণ। তাই আমরা সর্বদা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করি। আর ওইসব বিশৃঙ্খলাতে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমরা অনিবার্যভাবে অন্যকে আঘাত দিয়ে থাকি। এই দুনিয়া তাই সব সময় ন্যায্য হবে না।
এর মানে কি এই নয় যে, আমরা সবাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থামিয়ে দেবো বা সত্যকে পরিত্যাগ করবো? অবশ্যই না, বরং এটার অর্থ হচ্ছে: এই দুনিয়া -এবং অন্য কিছুকে- আমরা অবাস্তব মানদণ্ডের ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো না। কিন্তু সেটা সব সময় সহজ নয়। এরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতিময় এক দুনিয়াতে কিভাবে আমরা বাস করবো, যেখানে লোকজন আমাদেরকে হতাশ করে, এমনকি আমাদের নিজেদের পরিবারও আমাদের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে? এবং সম্ভবত, সবচেয়ে কঠিনতম বিষয় হলো: কিভাবে আমাদের প্রতি অন্যায় করা সত্ত্বেও আমরা ক্ষমা করবো? আর কঠোর না হয়েও কিভাবে আমরা শক্তিশালী হবো, অন্যদিকে দুর্বল না হয়েও কিভাবে নরম থাকবো? কখন আমরা আঁকড়ে ধরবো, আর কখন আমরা ছেড়ে দেবো? মাত্রাতিরিক্ত যত্ন, তদারকি কখন তার মাত্রা ছাড়ায়? আমাদের যতটুকু ভালাবাসা উচিত, তার থেকে বেশি ভালোবাসা বলে কিছু আছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার আগে, সবার আগে আমাদেরকে নিজেদের গতানুগতিক জীবনের বাইরে পা রাখতে হবে। পরীক্ষা করে দেখা দরকার যে, কষ্ট পাওয়া বা অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষ আমরাই প্রথম না আমরাই শেষ। আমাদের পূর্বে যারা দুনিয়াতে পা রেখেছেন, তাদের সংগ্রাম এবং তাদের সাফল্যগুলো অধ্যয়ন করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কষ্ট ছাড়া কখনো সমৃদ্ধি আসে না এবং সাফল্য কেবল আপ্রাণ চেষ্টারই ফসল, আমাদেরকে এটার স্বীকৃতি দিতেই হবে। আর ওই সংগ্রামে সর্বদা অন্তর্ভুক্ত থাকে, অন্যের দেওয়া আঘাত প্রতিরোধ ও তা উতরে ওঠা।
আমাদের কষ্ট ও দুর্ভোগ যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, আমাদের নবিগণের দীপ্তিময় উদাহরণসমূহের স্মৃতিচারণ আমাদেরকে সেটাই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করুন, নবি নুহ (আলাইহিস সালাম) স্বীয় জনগোষ্ঠী দ্বারা ৯৫০ বছর নির্যাতিত হয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে বলে:
"তাদের পূর্বে নুহের সম্প্রদায়ও (তাদের রসুলকে) প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা আমাদের বান্দাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, 'সে তো এক বিকারগ্রন্থ!' এবং তাঁকে বের করে দেওয়া হয়।” (কুরআন, ৫৪:৯)
নুহ এতোটই আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন যে, শেষমেশ তিনি স্বীয় প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেন:
"আমি তো অসহায়, এখন আপনি (আমাকে) সাহায্য করুন।" (কুরআন, ৫৪:১০)
অথবা আমরা স্মরণ করতে পারি, কিভাবে নবি (ঈ)-এর ওপর যে পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল এবং রক্তাক্ত হওয়া পর্যন্ত এই বর্ষণ অব্যাহত ছিল এবং [আমরা স্মরণ করতে পারি] কিভাবে সাহাবিগণকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং কিভাবে তাদেরকে অনাহারে রাখা হয়েছিল। এসবই ছিল অন্যের হাতে নির্যাতনের নমুনা। এমনকি আমাদের সৃষ্টি হওয়ার আগেই ফেরেশতারা পর্যন্ত মানুষের এই প্রকৃতিকে ঠিক উপলব্ধি করেছিল। আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি ফেরেশতাদেরকে জানান, তখন তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল মানুষের এই সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকটির ব্যাপারে। আল্লাহ আমাদেরকে বলেন:
"স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বলেন: 'আমি পৃথিবীতে খলিফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।' তখন তারা বলে, 'আপনি কি এমন কাউকে সেখানে পাঠাতে যাচ্ছেন, যে কিনা সেখানে ফাসাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে?” (কুরআন, ২:৩০)
একে অপরের প্রতি জঘন্য পর্যায়ের অন্যায় করার যে সম্ভাবনা মানুষের আছে, সেটাই এই জীবনের দুঃখজনক বাস্তবতা। এবং এরপরেও আমাদের অনেকেই বেশ আশীর্বাদপুষ্ট। আমাদের অনেকেই এমন ধরনের বিপদের মুখোমুখি হয়নি, যা অন্যরা সারা জীবন জুড়ে ভোগ করেছে। আমাদের চোখের সামনে আমাদের পরিবারকে নির্যাতন করা হচ্ছে কিংবা তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে, এমন দৃশ্য আমাদের অনেককেই দেখতে হবে না। তদপুরি, আমাদের মাঝে খুব কম লোকই বলতে পারবে যে, কোনো না কোনোভাবে অন্যের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। অনাহারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া কিংবা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার দৃশ্য দেখার যে অনুভূতি, আমাদের অনেককে কখনোই সেটা ভোগ করতে হবে না, তথাপি আহত হৃদয়ের কান্নার অনুভূতি কেমন, আমাদের অনেকেই সেটা জানে।
এগুলো এড়ানো কি সম্ভব? আমার মতে, হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলো এড়ানো সম্ভব। সকল ধরনের কষ্ট ও ভোগান্তিকে আমরা কখনো এড়িয়ে যেতে পারবো না, কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের প্রতিক্রিয়া এবং আমাদের মনোযোগের সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে আমরা বড় ধরনের বিপর্যয়কে প্রতিহত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সকল আস্থা, নির্ভরতা ও প্রত্যাশা অপর একজন মানুষের স্থাপন করাটা হবে অবাস্তব ধর্মী ও নিরেট বোকামিতুল্য কাজ। মানুষ মাত্রই ভুল করে, এই বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের জন্য কাম্য হবে নিজেদের আস্থা, নির্ভরতা ও প্রত্যাশাকে শুধু আল্লাহর ওপর স্থাপন করা। আল্লাহ বলেন:
"... যে তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে এমন এক মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ভাঙ্গে না। আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ।” (কুরআন, ২:২৫৬)
এটা জানা যে, আল্লাহই হলেন একমাত্র হাতল, যা কখনো ভেঙে যাবে না, তিনিই আমাদেরকে অপ্রয়োজনীয় নৈরাশ্যের কবল থেকে রক্ষা করবেন।
তদপুরি, একথা বলার অর্থ এই নয় যে, আমরা ভালোবাসতে পারবো না, কিংবা আমাদের ভালোবাসা কমানো উচিত। আমরা কিভাবে ভালোবাসি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ ছাড়া কিছুই যেন আমাদের ভালোবাসার চূড়ান্ত বস্তু না হয়। কিছুই যেন আমাদের অন্তরে আল্লাহর আগে চলে না আসে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান যেন ওই পর্যায়ে না পৌঁছায়, যেখানে ওই বস্তু ছাড়া আমাদের পক্ষে বেঁচে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন 'ভালোবাসা' আসলে ভালোবাসা নয়, বরং এ ধরনের ভালোবাসাই ইবাদত এবং কষ্ট ছাড়া এটা অন্য কিছুই সৃষ্টি করে না।
কিন্তু যখন আমরা উল্লেখিত সবকিছুই ঠিকঠাক মতো করি, তথাপি অন্যের দ্বারা আমরা আঘাত পাই - আর বাস্তবে অপরিহার্যভাবে এ রকমটাই ঘটে থাকে, তখনকার ব্যাপারটা কি? যেটা সব থেকে কঠিন, কিভাবে আমরা সেটা করবো? কিভাবে আমরা ক্ষমা করতে শিখবো? কিভাবে আমরা নিজেদের ক্ষত চিহ্ন মুছে দিয়ে মানুষের প্রতি সদয় হতে শিখবো, যদিও ওই মানুষগুলো আমাদের প্রতি সদয় নয়?
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু (আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন)-এর ঘটনাতে ঠিক এটারই এক অনুপম দৃষ্টান্ত রয়েছে। তার কন্যা আয়েশা (রা.)-এর প্রতি সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপভাবে অপবাদ আরোপ করা হয়। আবু বকর (রা.) লক্ষ্য করেন যে, এই গুজব রটানোর পেছনে তার খালাতো ভাই মিসতাহ জড়িত ছিলেন, যাকে তিনি এতদিন আর্থিকভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে আসছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আবু বকর ওই অপবাদ রটনাকারীকে আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেন। এর ঠিক পরপরই আল্লাহ নিচের আয়াতটি নাযিল করেন:
"তোমাদের মাঝে যারা উচ্চ মর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এই কসম খেয়ে না বসে যে, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজন, অভাবী ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীগণকে কোনো সাহায্য করবে না। [বরং] তাদেরকে ক্ষমা ও উপেক্ষা করো। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? বস্তুত আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (কুরআন, ২৪:২২)
এই আয়াত শ্রবণের পর আবু বকর (রা.) ঠিক করে ফেলেন যে, তিনি আল্লাহর ক্ষমা চান, তাই তিনি ওই লোককে অর্থ দেওয়া আবার চালুই করেননি, বরং সেটার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেন।
এ ধরনের ক্ষমার গুণ একজন ঈমানদার ব্যক্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের ঈমানদারদের বিবরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন:
"যারা বড় ধরনের অপরাধ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে এবং যারা রাগান্বিত অবস্থাতেও ক্ষমা করতে প্রস্তুত থাকে।” (কুরআন, ৪২:৩৭)
অন্যের প্রতি আমরা যে ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতি ও ভুলভ্রান্তি করি, সেই সচেতনতা বোধই যেন সানন্দে ক্ষমা করতে আমাদের ধাবিত করে। সর্বোপরি আমাদের মানবতা এই বাস্তবতা দ্বারা চালিত হওয়া উচিত যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্তে নানাবিধ পাপের কাজ করে আমরা আল্লাহর সাথে অন্যায় করি। আল্লাহর তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়? তা সত্ত্বেও আল্লাহ, যিনি মহাবিশ্বের মালিক, তিনি প্রতিটি দিন ও প্রতিটি রাতে [আমাদেরকে] কেবল ক্ষমাই করে যান। ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানানোর আমরা কে? আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করবেন, এই আশা যদি করি, তবে আমরা কেন অন্যদেরকে ক্ষমা করতে পারবো না? এই কারণে নবি (ﷺ) আমাদেরকে এভাবে শিক্ষা দেন:
"অন্যের প্রতি যারা দয়া দেখায় না, আল্লাহও তাদের প্রতি কোনো দয়া দেখাবেন না।” [মুসলিম]
আল্লাহর এই দয়া লাভের আশা যেন আমাদেরকে অন্যকে ক্ষমা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং এটা যেন আমাদেরকে একদিন এমন দুনিয়াতে প্রবেশ করায়, যেটা সত্যিকার অর্থেই নিখুঁত ও যথার্থ।