📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 একটি সফল বিবাহের হারানো সূত্র

📄 একটি সফল বিবাহের হারানো সূত্র


[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রবন্ধে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ন্যূনতম পর্যায়ের হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। শ্রদ্ধাবোধের ধারণা কখনোই নিপীড়নকে অনুমোদন করে না, হোক তা শারীরিক, আবেগ কিংবা মানসিক পর্যায়ের নিপীড়ন। নিজের বিরুদ্ধে কিংবা নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে চালানো নিপীড়নকে হজম করাটা 'সবর' (ধৈর্য ধারণ) করা নয়। আল্লাহ (৬) কখনোই অবিচার ও নিপীড়নকে অনুমোদন করেন না, আমাদেরও সেটা করা উচিত নয়।।

“এটা তাঁর নির্দশন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছ থেকে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমত্ববোধ সৃষ্টি করেছেন। বস্তুত চিন্তাশীল লোকদের জন্য এসবের মাঝে নিহিত রয়েছে নিদর্শন।” (কুরআন, ৩০:২১)

অগণিত বিয়ের দাওয়াতপত্রে আমরা এই আয়াতটি প্রায় সবাই পড়েছি। কিন্তু ক'জনে এটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছি? আমাদের ক'জনেরই বিবাহ আল্লাহর বর্ণিত এই প্রেম ও মমতাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করে? কি সেই সমস্যা, যার কারণে আমাদের এতো অধিক সংখ্যক বিবাহ শেষমেশ ডিভোর্স বা তালাকের মাধ্যমে সেগুলোর সমাপ্তি ঘটছে?

Love & Respect: The Love She Most Desires; The Respect He Desperately Needs গ্রন্থের লেখক ড. এমারসন এগরিচেস-এর মতে উত্তরটি খুবই সহজ। এগরিচেস তার গ্রন্থে ব্যাখ্যা করে বলেন, ব্যাপক গবেষনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একজন পুরুষের প্রাথমিক চাহিদা যেখানে হচ্ছে সম্মান, সেখানে একজন নারীর প্রাথমিক চাহিদা হচ্ছে প্রেম বা ভালোবাসা। স্ত্রী যখন স্বামীকে সম্মান দেয় না এবং স্বামী যখন স্ত্রীকে ভালোবাসে না, তখন তর্কাতর্কির যে নমুনা তাদের মাঝে দৃশ্যমান হয়, সেটাকে তিনি তার ভাষায় 'Crazy Cycle' বা 'পাগলা চক্র' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিভাবে এ দুটো একে অপরকে জোরদার করে ও একটা অন্যটার কারণ হিসেবে কাজ করে, সেটার ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন। অন্য ভাষায়, স্ত্রী যখন স্বামীর মধ্যে ভালোবাসার অভাব বোধ করে, তখন প্রতিক্রিয়া স্বরূপ স্ত্রী স্বামীর প্রতি অসম্মানসূচক আচরণ করে, অসম্মান দেখিয়ে সেটার পাল্টা জবাব দেয়। ফলশ্রুতিতে স্বামী আরও বেশি অনুরাগহীনতা প্রদর্শন করে।

এগরিচেস জোর দিয়ে বলেন, 'Crazy Cycle' বা 'পাগলা চক্র'-এর সমাধান হচ্ছে: স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি অগাধ সম্মান প্রদর্শন করবে এবং স্বামীও তার স্ত্রীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার স্বাক্ষর রাখবে। এর অর্থ হলো: স্ত্রীর এমনটি বলা যথাযথ হবে না যে, স্বামী যদি তাকে আগে ভালোবাসে, তবেই সে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা, এমনটি করার মাধ্যমে সে স্বামীর পক্ষ থেকে আরও বেশি অনুরাগহীন আচরণ ডেকে আনছে। অন্যদিকে স্বামীরও এটা বলা উচিত হবে না যে, স্ত্রীকে ভালোবাসার আগে স্ত্রীর প্রথম কর্তব্য হচ্ছে তাকে সম্মান করা। কেননা, এমনটি করে সে শুধু অসম্মানসূচক আচরণ বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। দুটোকেই [অর্থাৎ সম্মান ও প্রেমকে] হতে হবে শর্তহীন।

এই বিষয়টি নিয়ে যখন আমি গভীরভাবে চিন্তা করি, তখন উপলব্ধি করি, কুরআন ও নবির হিকমত বা প্রজ্ঞাকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বৈবাহিক সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত এই দুটো বিষয়ের চেয়ে অন্য কোনো বিষয়কে এতো গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি। স্বামীগণের উদ্দেশ্য নবি (ﷺ) বলেন:
“নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো, যেহেতু তারা পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্ট এবং পাঁজরের উপরের অংশই সবচেয়ে বাঁকানো। সোজা করতে গেলে এটা ভেঙে যাবে। আর যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দিলে তা বাঁকানোই থেকে যাবে। তাই নারীদের সাথে সদাচারণ করো। [বুখারি ও মুসলিম]

এ ব্যাপারে তিনি (ﷺ) আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন:
"সে-ই প্রকৃত ঈমানদার যার আখলাক বা চরিত্র সর্বোত্তম এবং তোমাদের মাঝে সেই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোচ্চ আচরণ করে।” [আত-তিরমিযি]

নবি (ﷺ) আরও বলেন:
"একজন ঈমানদার স্বামী যেন ঈমানদার স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। সে যদি তার চরিত্রের একটি দিক অপছন্দ করে, তবে তার চরিত্রের আরেকটি দিক তাকে সন্তুষ্ট করবে।” [মুসলিম]

আল্লাহ বলেন: “... তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, হয়তো তোমরা এমন জিনিসই অপছন্দ করছো, যার মধ্যে আল্লাহ বিপুল কল্যাণ রেখেছেন।” (কুরআন, ৪:১৯)

হীরা-জহরত ও মনিমুক্তার চেয়ে মূল্যবান এই প্রজ্ঞা বা হিকমত বাণীতে পুরুষদেরকে তাদের স্ত্রীদের প্রতি সদয় ও প্রেমময় হতে জোর দেওয়া হয়েছে। তদপুরি প্রেম ও সদয় আচরণ প্রদর্শনের সময় তারা যেন নিজেদের স্ত্রীদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপক্ষো করে, সে দিকেও জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে।

অপরদিকে স্ত্রীদেরকে সম্বোধন করার সময় মনোযোগের কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে। স্বামীর প্রতি সদয় এবং প্রেমময় হতে কেন স্ত্রীদেরকে বারংবার বলা হলো না? সম্ভবত নারীরা স্বভাবগতভাবে অকৃত্রিম প্রেমের অধিকারী হয়ে থাকে বলেই হয়তো এমনটি করা হয়েছে। খুব কম স্বামীই অভিযোগ করে যে, তার স্ত্রী তাকে ভালোবাসে না। কিন্তু বহু স্বামীরই অভিযোগ যে, তাদের স্ত্রীরা তাদেরকে সম্মান দেখায় না। আর তাই স্ত্রীদের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহতে এই মানসিকতার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

নানাভাবেই সম্মান দেখানো যায়। কাউকে সম্মান দেখানোর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে, তার ইচ্ছাকে সম্মান করা। যখন কেউ বলে, "আমি তোমার পরামর্শকে সম্মান করি" তখন তার এই কথার মর্ম হচ্ছে, "আমি তোমার পরামর্শ মেনে চলি।" কোনো নেতাকে সম্মান করার মানে হচ্ছে, তিনি যা বলেন সেটা করা। আমাদের পিতামাতাকে সম্মান করার তাৎপর্য হচ্ছে, তাদের ইচ্ছা বা মতের বিরুদ্ধে না যাওয়া। আর স্বামীকে সম্মান করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্বামীর ইচ্ছাকে সম্মান করা। নবি () বলেন:
"যখন কোনো নারী তার [ওপর ফরয হওয়া] পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে, সিয়াম বা রোজা রাখে, নিজের ইজ্জত-আবরুকে সুরক্ষিত রাখে এবং নিজের স্বামীকে মেনে চলে, তাকে বলা হবে: 'জান্নাতে প্রবেশ করো, যে দরজা দিয়ে তোমার মন চায়।” [আত-তিরমিযি]

কেন আমরা যারা নারী, আমাদেরকে নিজেদের স্বামীর ইচ্ছাকে সম্মান করা এবং সেটাকে মেনে চলতে বলা হলো? এটার কারণ, পুরুষদেরকে কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ বলেন: “পুরুষেরা নারীদের রক্ষক এবং তাদের তত্ত্বাবধায়ক [কাওয়‍্যামুন]। কেননা, একজনের চেয়ে অপরজনকে আল্লাহ বেশি [সামর্থ্য] প্রদান করেছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের উপার্জন থেকে খরচ করে ...” (কুরআন, ৪:৩৪)

কিন্তু স্বামীর প্রতি এ ধরনের নিঃশর্ত সম্মান কি একজন নারী হিসেবে আমাদেরকে দুর্বল এবং অধঃস্তন পর্যায়ে নামিয়ে আনে না? আমরা কি নিজেদের এমন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি না, যেখানে [পুরুষরা] আমাদের এ অবস্থার সুযোগ নেবে এবং আমাদের নিপীড়ন করবে? বাস্তবতা তো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআন, নবির আদর্শ, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা ঠিক এর উল্টোটাই প্রমাণ করে। স্ত্রী যত বেশি করে স্বামীকে সম্মান করবে, স্বামী তত বেশি প্রেম ও সদয় আচরণ করবে। প্রকৃতপক্ষে, স্ত্রী যত বেশি অসম্মান দেখাবে, স্বামী তত বেশি রূঢ় হবে এবং তার আচরণে প্রীতি ভালোবাসা ততই কমতে থাকবে।

একইভাবে, একজন পুরুষ প্রশ্ন করতে পারে, কেন সে স্ত্রীর প্রতি দয়াশীল ও প্রেমময় হবে, যদিওবা ওই স্ত্রীর আচরণ তার প্রতি অসম্মানজনক হয়? এই প্রশ্নের উত্তর লাভের জন্য কেউ উমর ইবনে খাত্তাবের উদাহরণের দিকে দৃষ্টি দিতে পারে। হযরত উমর যখন খলিফা ছিলেন, তখন এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে এসেছিলেন। এসে দেখে উমরের স্ত্রীই উমরের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলছে। ওই লোকটি যখন ফিরে যাবে, ঠিক তখনই উমর তাকে ডেকে আনেন। লোকটি জানায়, উমর তার স্ত্রীর সাথে যে সমস্যায় পড়েছেন, ঠিক তেমন সমস্যা নিয়েই সে উমরের কাছে হাজির হয়েছে। এটা শুনে উমর বলেন, তার স্ত্রীকে তাকে সহ্য করে, তার জামা কাপড় ধুয়ে দেয়, তার বাড়ি-ঘর পরিষ্কার করে, তাকে আরাম ও সুখ দেয় এবং তার সন্তানদের লালন পালন করে। সে যদি তার জন্য এতো কিছু করতে পারে, তবে যখন সে তার গলার স্বর উঁচু করে, তখন সেটা কেন সহ্য করা যাবে না?

কেবল পুরুষ নয়, বরং আমাদের সকলের জন্যই এই ঘটনাতে চমৎকার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যের মতো গুণাবলি, যেগুলো একটি সফল বিবাহের পূর্ব শর্ত, সেগুলোরই অমূল্য চিত্রায়ন হয়েছে এই ঘটনায়। উপরন্তু, ধৈর্যধারণকারীর জন্য আখিরাতে যে ধরনের প্রতিদানের ব্যবস্থা আছে, সেটাও একবার বিবেচনা করুন। আল্লাহ বলেন, "যারা ধৈর্য ধারণ করে, তারা বেহিসাব (অগণিত) পুরস্কার লাভ করবে।” (কুরআন, ৩৯:১০)

টিকাঃ
২৮ 'প্রেম ও সম্মান: যে প্রেম স্ত্রীর সর্বোচ্চ কামনা এবং যে সম্মান আবশ্যকভাবে স্বামীর প্রাপ্য।'

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 কষ্ট ও দুর্ভোগ

📄 কষ্ট ও দুর্ভোগ


নিজেদের কষ্ট ও দুর্ভোগ দূর করতে আমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলি, কিন্তু আমরা কখনোই বিবেচনা করে দেখি না যে, আমাদের কষ্টগুলো আসলে আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করছে।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 ঝড়ের মাঝে একমাত্র আশ্রয়

📄 ঝড়ের মাঝে একমাত্র আশ্রয়


ঝড় যখন আসে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাটা কখনোই সহজ হয় না। বৃষ্টি শুরুর ক্ষণিক পরেই বিজলী চমকাতে থাকে। আঁধার কালো মেঘ সূর্যকে ঢেকে দেয় এবং এক সময়ের শান্ত সমুদ্রের সমস্ত তরঙ্গ হঠাৎ করেই আপনাকে ঘিরে ধরে। কোনোভাবেই আর নিজের পথ আপনি তখন খুঁজে না পেয়ে সাহায্যের আশায় হাত বাড়িয়ে দেন।

কোস্ট গার্ডকে দিয়েই আপনি শুরু করেন। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। আপনি নৌকাকে অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আপনি লাইফবোট খুঁজতে থাকেন, কিন্তু সেটার কোনো পাত্তা নেই। এই পরিস্থিতিতে আপনি হন্যে হয়ে লাইফ জ্যাকেটের সন্ধান করেন। কিন্তু হায়, সেটাও ছেঁড়া। একটা উপায় খুঁজতে খুঁজতে যখন আপনি আপনার সামর্থের সবটুকু নিঃশেষ করে ফেলেন, ঠিক তখনই আপনি আসমানের দিকে দৃষ্টি ফেরান।

আর আল্লাহকে ডাকেন।

যাইহোক, ওই মুহূর্তের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য আছে, যা সম্পূর্ণরূপে অনন্য। এই পরিস্থিতিতে আপনি এমন কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করেন, অন্য সময় যেটা আপনি কেবল তাত্ত্বিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। হ্যাঁ, ওই মুহূর্তে আপনি প্রকৃত তাওহিদের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। লাভ করেন প্রকৃত একত্ববাদের স্বাদ। লক্ষ্য করুন, তীরে থাকা অবস্থায় আপনি হয়তো আল্লাহকেই ডাকতেন, কিন্তু আপনি আরও অনেকের সাথে সাথে তাঁকে ডাকতেন। আপনি হয়তো আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন, কিন্তু আরও অনেক কিছুর সাথে সাথে তাঁর ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এই একটি মুহূর্তে সবকিছুই বন্ধ। হ্যাঁ, সবকিছু। ডাকার মতো তো আর কেউ নেই। নির্ভর করার মতো কিছুই বাকি নেই। [হ্যাঁ], শুধু তিনিই রয়ে গেছেন।

আর এটাই হচ্ছে মূল বিষয়।

আপনি কি কখনো এটা ভেবে অবাক হয়েছেন যে, আপনার সব থেকে প্রয়োজনের সময়ে সৃষ্টির যে যে দুয়ারে সাহায্যের জন্য আপনি পা বাড়ান, সেগুলো বন্ধ থাকে কেন? আপনি এক দুয়ারে কড়া নাড়েন, কিন্তু সেটা সজোড়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরেক দুয়ারে যান। সেটাও বন্ধ। আপনি এক দুয়ার থেকে আরেক দুয়ারে যান, কড়া নাড়তে থাকেন, আর প্রত্যেক দুয়ারে আঘাত করতে থাকেন, কিন্তু কিছুই খুলে না। এমনকি যে যেসব দুয়ারের ওপর আপনি এক সময় নির্ভর করতেন, আচমকাই সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কেন? কেন এমনটি ঘটে?

খেয়াল করুন, মানুষ হিসেবে আমাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, আল্লাহ যেগুলো ভালো করেই জানেন। আমরা সর্বদাই চাহিদার একটি অবস্থাতে থাকি। আমরা দুর্বল। কিন্তু একইসাথে আমরা তাড়াহুড়ো প্রবণ ও অধৈর্য। যখন আমরা বিপদে থাকি, তখন আমরা সাহায্য তালাশের জন্য এক প্রকার বাধ্য হই। এটাই [তাঁর সৃষ্ট] নকশা [বা ডিজাইন]। দিন যখন রোদেলা, আর আবহাওয়া যখন মনোরম, তখন আমরা আশ্রয় খুঁজতে যাবো কেন? কখন আমরা আশ্রয় খুঁজি? যখন ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে, কেবল তখনই আমরা আশ্রয় খুঁজি। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) ঝড় বইয়ে দেন, এমন পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রয়োজন তৈরি করেন, যাতে করে আমরা আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হই।

যখন আমরা সাহায্য তালাশ করি, তখন আমাদের মধ্যস্থিত অধৈর্য বৈশিষ্ট্যের জন্য যা নিকটে আর যেটা সহজ মনে হয়, তার থেকেই আমরা সাহায্য চাই। যা দেখতে পাই, শুনতে ও ছুঁতে পারি, সেটার কাছেই আমরা সাহায্য চাই। আমরা সোজা পথ খুঁজি। সৃষ্টির কাছে আমরা সাহায্য খুঁজি। এমনকি নিজ সত্তার কাছেও আমরা সাহায্য চাই। সবচেয়ে নিকটবর্তী যেটা, সাহায্যের জন্য আমরা সেটাই খুঁজি। দুনিয়া (তথা পার্থিব জীবন) বলতে কি ঠিক এটাই বুঝায় না? যা কাছের মনে হয় [সেটাই কি দুনিয়া নয়?]। 'দুনিয়া' শব্দটির মানে: 'যা নিচু'। যা সব থেকে কাছের মনে হয়, সেটাই দুনিয়া। কিন্তু এটা এক মোহ বা ভ্রম মাত্র।

কিন্তু এটার থেকে নিকটবর্তী কিছু আছে। এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন তো, কোন জিনিসটি আপনার সবচেয়ে নিকটে আছে। যদি এই প্রশ্নটি করা হয়, তবে অনেকেই হয়তো বলবেন, আমাদের অন্তর ও সত্তাই সবচেয়ে নিকটবর্তী।

কিন্তু আল্লাহ (৫) বলেন: "আমরাই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং [মানুষ] তার নফস (তথা মনের মাঝে) যে কুচিন্তা করে, তা আমরা জানি। কেননা, তার গ্রীবাহ ধমনীর চেয়েও আমরা অধিক নিকটবর্তী।” وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ (কুরআন, ৫০:১৬)

এই আয়াতটি আল্লাহ (স) শুরু করেছেন এটা দেখিয়ে যে, তিনি আমাদের চেষ্টা ও সাধনাগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। কেউ আমাদের চেষ্টা ও সাধনাগুলোর খবর রাখেন, সেটা স্বস্তির এক সংবাদ। নিজ সত্তা আমাদেরকে কি বলে, তিনি সেটা জানেন। তিনি আমাদের গ্রীবাস্থ ধমনীর চেয়েও নিকটে। গ্রীবাস্থ ধমনী কেন? আমাদের [দেহের] ওই অঙ্গে কি এমন আকর্ষণীয় জিনিস আছে, যার জন্য এটার উল্লেখ হয়েছে? গ্রীবাস্থ ধমনী ওই মহাগুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যেটা হৃদয়ে রক্ত সরবরাহ করে। এটা যদি কেটে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা মারা যাবো। আক্ষরিকভাবে এটা আমাদের জীবন। কিন্তু আল্লাহ (স) নিকটে অবস্থান করেন। আল্লাহ (স) আমাদের জীবন, আমাদের নিজ সত্তা এবং আমাদের নিজ নফস থেকেও অধিক নিকটে অবস্থান করেন। আমাদের হৃদয়ের মহাগুরুত্বপূর্ণ গতিপথ থেকেও তিনি অধিক নিকটবর্তী।

অন্য আয়াতে আল্লাহ (স) বলেন: "তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে ওই কাজের দিকে আহ্বান করেন, যেটা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখো আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অবস্থান করেন। বস্তুত তাঁর কাছেই তোমরা সকলে সমবেত হবে।" يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ (কুরআন, ৮:২৪)

আল্লাহ (স) জানেন, আমাদের নফস রয়েছে। আল্লাহ জানেন, আমাদের হৃদয় রয়েছে। এই জিনিসগুলো যে আমাদেরকে চালিত করে, আল্লাহ তা জানেন। তা সত্ত্বেও, আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, এসব থেকেও তিনি আমাদের অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং, যখন আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে ছুটি, তখন আমরা কেবল দুর্বলের কাছে যাই না, বরং সেইসাথে যিনি সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করেন, তাঁকে উপেক্ষা করে, যা দূরে এবং বহুদূরে অবস্থান করে, তার কাছে ছুটে যাই। সুবহান আল্লাহ (সমস্ত মহিমা আল্লাহর)।

এটাই যেহেতু আমাদের প্রকৃতি এবং আল্লাহ (স) ভালোভাবেই তা জানেন, তাই ঝড়ের সময় আশ্রয় লাভের অন্য সকল দরজা বন্ধ করে, তিনি আমাদেরকে রক্ষা করেন এবং আমাদেরকে [তাঁর অভিমুখে] পুনরায় চালিত করেন। প্রতিটি মিথ্যা দুয়ারের পেছনে রয়েছে এক একটি গহ্বর, এটা তিনি জানেন। সেখানে পা দিলে, আমাদের পতন নিশ্চিত। তাঁর অপার করুণা ও রহমতের বলে তিনি ওই মিথ্যা দুয়ারগুলো বন্ধ করে রাখেন।

তাঁর অপার করুণার বলে, তিনিই ঝড় বইয়ে দেন, যাতে করে আমরা সাহায্য তালাশ করি। আর তিনি জানেন আমরা ভুল জায়গাতে পা দেবো, তাই তিনি আমাদের বহু নির্বাচনী পরীক্ষা নেন, যাতে কেবল একটি উত্তর বাছাইয়ের সুযোগ থাকে এবং ওটাই সঠিক উত্তর। এই যে কষ্ট, সেটা আসলে আরামের [জন্য]। তাই আঁকড়ে ধরার সকল হাতল এবং অন্য সব উত্তরকে সরিয়ে দিয়ে তিনি পরীক্ষাকে একেবারে সহজ করে দেন।

ঝড় যখন আসে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাটা কখনোই সহজ হয় না। এবং এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঝড়ো হাওয়া পাঠিয়ে তিনি আমাদেরকে নিজেদের হাঁটুর ওপর নামিয়ে আনেন এবং [আল্লাহর] কাছে প্রার্থনা জানানোর এটাই সর্বোত্তম ভঙ্গি।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 জায়নামাজে নিজের যন্ত্রণার দেয়াল: আল্লাহর সাহায্য কামনা প্রসঙ্গে

📄 জায়নামাজে নিজের যন্ত্রণার দেয়াল: আল্লাহর সাহায্য কামনা প্রসঙ্গে


আমি একটা গল্প জানি, যা নেহাত কোনো গল্প নয়। এমন এক নারীর গল্প এটা, যিনি এই জীবনের চাকচিক্য থেকে অন্য কিছুকে অনেক বেশি ভালোবেসেছিলেন। নিজেকে যিনি তার চারপাশের কষ্টকর পরিস্থিতি দ্বারা কখনো সংজ্ঞায়িত বা সীমাবদ্ধ হতে দেননি। নিজের মাঝে তার এমন প্রগাঢ় ঈমান লালন করেছিলেন, যার জন্য তিনি হাসিমুখে মৃত্যুকে পর্যন্ত বরণ করে নিতে রাজি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন রাণী, তথাপি তিনি এই দুনিয়ার সিংহাসন ও রাজপ্রাসাদের মোহ ভেদ করে এর সত্যিকার বাস্তবতা দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার এই রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে তিনি দৃষ্টি প্রসারিত করেছিলেন আখিরাতে তার জন্য [নির্মিত] রাজপ্রাসাদের দিকে। কিন্তু ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার জন্য এটা অন্তর্চক্ষুর কোনো রূপক চাহনি ছিল না। বরং আসিয়ার জন্য ছিল এটা তার চর্ম চক্ষের দৃষ্টির মতোই বাস্তব।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) বলেন:
"ফেরাউনের স্ত্রীর মাঝে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য একটি উপমা রেখেছেন, যে বলেছিল: 'হে আমার প্রতিপালক, আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করুন এবং ফেরাউন ও তার কর্মকাণ্ড থেকে আমাকে পরিত্রাণ দেন এবং আমাকে জালিম লোকদের থেকে রক্ষা করুন।” (কুরআন, ৬৬:১১)

আসিয়ার এই কাহিনী আমি বহুবার শুনেছি। আমাকে প্রতিবারই এটা নাড়া দেয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে আসিয়ার এই কাহিনী আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি কারণে দারুনভাবে নাড়া দেয়। কয়েক মাস আগে আমি কঠিন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। পুণ্যবান ও ফেরেশতা স্বভাবে আত্মাদের সাহায্যের মাধুর্য সত্যই অমূল্য। যখন আপনি কঠিন সময় পার করবেন, তখন একটি টেক্সট মেসেজ (Text message), ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস আপডেট, সুহাইব ওয়েব লিস্টারেভের (Suhaib Webb Listserv) কাছে একটি ইমেইল পাঠানো [আপনার জন্য ফলপ্রসু হতে পারে] এবং দেখবেন পুণ্যবান আত্মার এক বাহিনী আপনার জন্য দু'আ করা আরম্ভ করে দিয়েছে। সুবহানাল্লাহ (মহিমা শুধু তাঁরই)।

আমি তাই এই অনুরোধটা করি। একজন মানুষ আরেকজনকে সর্বোত্তম যে উপহারটা দিতে পারে, আমি সেটারই অনুরোধ করি। আমি [তাদের কাছে। আন্তরিক দু'আ কামনা করি। আমি যা লাভ করি, তা ছিল অভিভূত করারই মতো। আল্লাহর ওই উপহারের কথা আমি কখনো ভুলবো না। আমি এমনসব লোকের দেখা পেয়েছি, যারা কিয়াম (তথা রাতের সলাতে) দাঁড়িয়ে আমার জন্য দু'আ করেছে, যারা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আমার জন্য দু'আ করেছে। ভ্রমণরত অবস্থায়, এমনকি সন্তান জন্মদানের সময়ও [তারা আমার জন্য দু'আ করেছে। এতো এতো দু'আ পাওয়ার পরও একটি দু'আ মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। এটা সাধারণ একটা টেক্সট মেসেজ ছিল, যাতে লেখা ছিল: 'জান্নাতে আপনার বাড়ি আপনাকে দেখানো হোক, যাতে করে যেকোনো কষ্ট আপনার জন্য সহজ হয়ে যায়।” আমি এটা পাঠ করি এবং এটা আমায় নাড়া দেয়। হ্যাঁ, এটা আমাকে দারুনভাবে নাড়া দেয়।

ঠিক তখনই আসিয়ার কাহিনী আমার স্মরণে আসে, আর হঠাৎ করে বিস্ময়কর কিছু আমার মনে দোলা দেয়। বস্তুত একজন মানুষ যা কল্পনা করতে পারে, আসিয়া ঠিক সেরূপ ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুনিয়ার বুকে বিচরণকারী জঘন্যতম স্বৈরাচার ছিল ফেরাউন। আসিয়ার জন্য সে কেবল তার শাসক মাত্র ছিল না, সে ছিল তার স্বামী। আর আসিয়ার শেষ সময়ে ফেরাউন তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাতে শুরু করে। কিন্তু অবাক করা কিছু একটা ঘটে। আসিয়া মুচকি হাসতে থাকেন। একজন মানুষ যতটুকু কল্পনা করতে পারে, আসিয়া সে রকম ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন হাস্যোজ্বল।

এটা কিভাবে সম্ভব? কঠিন নির্যাতনের সময় কিভাবে তিনি হাসতে পারছিলেন? অথচ যখন আমরা সামান্য ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ি কিংবা আমাদের দিকে কেউ যদি বাজেভাবে তাকায়, তখন আমরা তা সামলাতে পারি না। নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) -আল্লাহ তার প্রতি সলাত এবং সালাম বর্ষণ করুন- তিনি কঠিনতম বিপদে নিপতিত হন, আর তা সত্ত্বেও আগুন তার কাছে ঠাণ্ডা অনুভূত হলো? কিছু লোকের কিছু না থাকার পরও, তারা অভিযোগ উত্থাপনের কোনো কারণ খুঁজে পায় না, অন্যদিকে যাদের 'সবকিছু' থাকার পরও, অভিযোগ ছাড়া তাদের থেকে কিছুই শোনা যায় না, কেন এমনটি ঘটে? কখনো আমরা জীবনের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেশ ধৈর্য ধারণ করি, অথচ আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলোতে খুব একটা ধৈর্য ধরতে পারি না, কিভাবে এমনটি ঘটে?

বিপদ-মুসিবতকে আমি কঠিন মনে করতাম। কেননা, কিছু জিনিস বহন করাটা বাস্তবিকই কঠিন। আমি একটি মৌলিক তালিকার কথা চিন্তা করতাম, যেখানে বিপদ-আপদের একটি আদর্শক্রম থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ প্রিয়জন হারানোর বেদনা সব সময় ট্রাফিকের টিকিট সংগ্রহ করার ঝামেলা থেকে কঠিনতর। এটাই যথাযথ বলে প্রতীয়মান হয়। এটিই আমাদের কাছে যথাযথ মনে হয়।

কিন্তু, বাস্তবে এটা ঠিক নয়।

যেকোনো ধরনের বিপদ সহ্য করাটা কঠিন কাজ নয়, যেহেতু স্বয়ং বিপদই কঠিন। বিপদের সময় কষ্ট কতটা কঠিন কিংবা কতটা সহজ, সেটার মাপার মানদণ্ড আছে -অদৃশ্য এক মানদণ্ড। জীবনে আমি যা কিছুরই মুখোমুখি হই না কেন, সেটা সহজ হবে নাকি কঠিন হবে, তা ওই বিষয়টির কঠিন বা সহজ হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বরং বিষয়টি সহজ হবে নাকি কঠিন হবে, তা নির্ভর করে আল্লাহর সাহায্যের মাত্রা ও স্তরের ওপর। কোনো কিছুই সহজ না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার জন্য সেটা সহজ না বানাচ্ছেন। না কোনো ট্রাফিক জ্যাম, না কোনো কাগজের টুকরো, [কিছুই সহজ নয়]। আল্লাহ যা আমার জন্য সহজ করে দেন, তার কিছুই কঠিন নয়। না অসুস্থতা, না মৃত্যু, না আগুনে ফেলে দেওয়া, আর না স্বৈরাচারের যুলুমের শিকার হওয়া, [কিছুই আমার জন্য কঠিন হবে না]।

ইবনে আতায়িল্লাহ আল-সিকান্দারি খুব সুন্দর করে বলেন:
"কিছুই কঠিন নয়, যদি তুমি সেটা তোমার প্রতিপালকের মাধ্যমে চাও। কিছুই সহজ নয়, যদি তুমি সেটা চাও তোমার যোগ্যতায়।”

ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনে ফেলা হয়। আল্লাহ এই জীবনে আমাদের কাউকে এমন ভয়াবহ পরীক্ষার মুখোমুখি না করুন। কিন্তু এমন কোনো মানুষ নেই, যারা তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে আবেগ, মানসিক বা সামাজিক আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন। আর এটা ভাববেন না যে, আল্লাহ আমাদের জন্য ওইসব আগুনকে ঠাণ্ডা করতে অক্ষম। আসিয়া শারীরিকভাবে নির্যাতিত ছিলেন, কিন্তু জান্নাতে তার জন্য নির্মিত বাড়ি আল্লাহ তাকে দেখিয়ে দেন। তাই তিনি হেসে দেন। আমাদের চর্ম চক্ষু এই জীবনে জান্নাতের দেখা পাবে না। কিন্তু আল্লাহ চাইলে, স্রষ্টার সান্নিধ্যে নির্মিত বাড়ির ওই দৃশ্য অন্তরের দৃষ্টিকে দেখানো যায়, যাতে করে প্রতিটি কষ্ট হয়ে যায় সহজ। হয়তো আমরাও ওই রকম কঠিন পরিস্থিতিতে হাসতে পারবো।

তাই স্বয়ং পরীক্ষাটা সমস্যা নয়। না ক্ষুধা, আর না শীত। বরং ক্ষুধা ও শীত মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমাদের আছে কিনা, সেটাই আসল সমস্যা। যদি থেকে থাকে, তবে না ক্ষুধা, আর না শীত আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে। এগুলো আমাদেরকে কষ্ট দেবে না। সমস্যা তখনই আবির্ভূত হয়, যখন ক্ষুধা আসে, তখন যদি খাবার না থাকে। সমস্যা তখনই আসে, যখন তুষার ঝড়ে চারদিক নুয়ে পড়ে, তখন যদি কোথাও আশ্রয় পাওয়া না যায়।

প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে চান, বানাতে চান আমাদেরকে বলীয়ান এবং তিনি চান, আমরা যেন তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন, ওইসব ক্ষুধা, পিপাসা ও শীত পাঠানোর সাথে সাথে আল্লাহ খাবার, পানি এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করে থাকেন। আল্লাহই পরীক্ষা দিয়ে থাকেন, কিন্তু এটার সাথে তিনি পাঠাতে পারেন সবর (ধৈর্য), এমনকি উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি এটার সাথে পাঠাতে পারেন রিদা (তথা তুষ্টির) মতো গুণকে। হ্যাঁ, আল্লাহ (স)-ই আদমকে এই দুনিয়াতে নামিয়ে দেন, যেখানে তাকে চেষ্টা, সংগ্রাম করতে হবে এবং তাকে মুখোমুখি হতে হবে পরীক্ষার। কিন্তু সেইসাথে তিনি তার ঐশ্বরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে বলে:
“তিনি বলেন (অর্থাৎ আল্লাহ বলেন), 'জান্নাত থেকে নেমে যাও -সবাই, তোমরা একে অপরের দুশমন। এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়েত আসবে, -যারাই সেটার (অর্থাৎ আমার হেদায়েতকে) অনুসরণ করবে, না তারা (এই দুনিয়াতে) গোমরাহ হবে, আর না তারা (আখিরাতে) কষ্ট ভোগ করবে।” (কুরআন, ২০:১২৩)

নবি (ﷺ) তায়েফের প্রান্তরে যে দু'আ করেছেন, সম্ভবত সেটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দু'আ। রক্তাক্ত ও আঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি আপন প্রতিপালককে ডাকেন:
أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
"আমি তোমার চেহারার দীপ্তির মাঝে আশ্রয় চাচ্ছি, যে দীপ্তিতে বিদায় নেয় আঁধার এবং এই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিটি বিষয় লাভ করে পূর্ণতা।”

বস্তুত আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে পরীক্ষা করেন এবং ওই ব্যক্তির ঈমানের স্তরের অনুপাতে তিনি সে পরীক্ষা নেন। কিন্তু সেইসাথে আল্লাহ তাঁর ঐশ্বরিক সহায়তাও পাঠিয়ে থাকেন, যেকোনো পরীক্ষাকে যেটা বানিয়ে দেয় সহজ এবং যেকোনো আগুনকে যেটা আরামদায়ক শীতল করে দেয়। আর এভাবেই শীঘ্রই তিনি পাঠাতে পারেন স্বীয় ঐশ্বরিক মদদ, যেটার বলে কঠিন অগ্নি পরীক্ষার মাঝেও আমরা তাঁর আলোর ঝলকে হবো ধন্য এবং তাঁর সান্নিধ্যে জান্নাতে নির্মিত বাড়ি করবে আমাদেরকে হাস্যোজ্জ্বল।

টিকাঃ
* কুর'আনের বর্ণনা মোতাবেক আসিয়া ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন। যখন শিশু মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে সিন্দুকে করে তার মা নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন, তখন ওই সিন্দুক ফেরাউনের রাজ দরবারের ঘাটে থামে, তখন আসিয়া ওই সিন্দুক থেকে শিশু মুসাকে নিজ দায়িত্বে নেন এবং তার স্বামী ফেরাউনকে রাজি করিয়ে শিশু মুসাকে লালন- পালন করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ফেরাউনের দরবারে নবি মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন, তখন তিনি নবি মুসার প্রতি ঈমান আনেন। ঈমান আনায়নের পর ফেরাউন তার প্রতি নির্যাতনের স্টিম রোলার চালালেও তিনি স্বীয় ঈমানে অটল থাকেন এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। -(সম্পাদক)।
৩০ ১৯৭২ সালে জন্ম নেয়া সুহাইব ওয়েব ১৯৯২ সালে ইসলামে দীক্ষিত হন। মিসরের আল-আযহারে তিনি উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। তিনি একজন ইমাম ও বেশ জনপ্রিয় বক্তা। -(সম্পাদক)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00