📄 প্রেমে পড়ুন সত্যিকারের জিনিসের
ছেড়ে দেওয়াটা কখনোই সহজ নয়। আসলেই কি তাই? আমাদের অধিকাংশই একমত হবো যে, আমরা যা ভালোবাসি, তা ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে কঠিন কাজ কমই আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কখনো কখনো আমাদেরকে সেটাই করতে হয়। আমরা কখনো এমন কিছুকে আমরা ভালোবাসি, যা পাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কখনো এমন জিনিস চাই, যা আমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। ভালোবেসে ফেলি এমন জিনিসকে, যা আল্লাহ ভালোবাসেন না। (ভালোবাসার) এসব জিনিসকে ছেড়ে দেওয়া আসলেই কঠিন। মন যা পেতে ব্যাকুল, তা ছেড়ে দেওয়া, আমাদের সংগ্রামগুলোর মাঝে সবচেয়ে কঠিন।
কিন্তু এটা যদি এমন কঠিন সংগ্রামের একটা বিষয় না হতো? এগুলোকে ছেড়ে দেওয়াটা যদি এ রকম কষ্টকর না হতো? এ সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করার সহজ কোনো রাস্তা কি আছে?
হ্যাঁ, অবশ্যই আছে! এর থেকে ভালো কিছু খুঁজে নেন।
বলা হয়, যতক্ষণ না আপনি পূর্বের চেয়ে উত্তম কিছু বা কাউকে না পাচ্ছেন, ততক্ষণ আপনি পূর্বের ভালোবাসার স্মৃতি কাটিয়ে উঠতে পারেন না। মানুষ হিসেবে আমরা শূন্যতাকে ভালোভাবে সামলাতে পারি না। যেকোনো শূন্য স্থান পূরণ করতেই হবে, অবিলম্বে। শূন্যতার কষ্ট বড়ই কঠিন। যন্ত্রণা ভুক্তভোগীকে ওই শূন্যস্থান পূরণে বাধ্য করে। এক মুহূর্তের এক বিন্দু শূন্যতা ডেকে আনে দুঃসহ যন্ত্রণা। তাই আমরা ছুটে চলি এক মানসিক পেরেশানি থেকে আরেক মানসিক পেরেশানিতে, ছুটে ফিরি এক আসক্তি থেকে আরেক আসক্তির দিকে।
অন্তরের মুক্তির আশায় আমরা প্রায়שই বলি, এজন্য আমাদেরকে মিথ্যা নির্ভরশীলতার বাঁধ ভেঙে ফেলতে হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে, 'কিভাবে' [আমরা এসব বাঁধ ভেঙে ফেলবো?] মনের মাঝে একবার যখন মিথ্যা অনুরাগ তৈরি হয়, তখন কিভাবে আমরা তার মায়াজাল ছিন্ন করবো? প্রায়শই এটা বেশ কঠিন বলে মনে হয়। যেসব জিনিসে আমরা মোহগ্রস্থ হয়ে পড়ি, সেগুলো যেন আমরা ছেড়ে দিতে পারি না। এমনকি যখন সেগুলো আমাদেরকে কষ্ট দিচ্ছে, এমনকি যখন সেগুলো আমাদের জীবন এবং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্থ করছে, এমনকি যখন সেগুলো আমাদের জন্য চরম অনিষ্টকর, তখনও আমরা আমাদের আসক্তিগুলোকে ছাড়তে পারি না। সেগুলোর ওপর আমরা চরমভাবে নির্ভরশীল। আমরা সেগুলোকে অত্যন্ত ভালোবাসি এবং সেটা অবশ্যই ভুলভাবে। এসব জিনিস আমাদের অন্তরকে এমন কিছু দিয়ে পূর্ণ করে দেয়, যা আমরা অপরিহার্য ভাবি... ভাবি ওটা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারবো না। এমনকি যখন আমরা সেগুলো ত্যাগ করার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হই, প্রায়শই তা খুবই কঠিন -এই বিবেচনায় আমরা সে প্রচেষ্টাই বন্ধ করি।
এমনটি কেন হয়? আল্লাহ যা ভালোবাসেন সেটার স্বার্থে আমরা যা ভালোবাসি, সেটাকে কেন কুরবানি দিতে আমাদের এতো সমস্যা হয়? আমরা কেন ওই জিনিসগুলোকে ছেড়ে দিতে পারি না? আমার মনে হয়, আমাদের ভালোবাসার জিনিসগুলোকে ছেড়ে দিতে আমাদের এতো কষ্টের কারণ হলো: আমরা তা প্রতিস্থাপন করার জন্য অধিকতর ভালোবাসার কোনো বস্তু এখনো খুঁজে পাইনি।
একটা শিশু যখন খেলনা গাড়ির প্রেমে পড়ে, তখন ওই গাড়ির প্রতি আকর্ষণ তাকে একেবারে গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু গাড়িটি পাওয়া যদি তার পক্ষে সম্ভব না হয়? কেমন লাগবে তার যখন সে প্রতিদিন ওই দোকানের পাশ দিয়ে যাবে, আর পছন্দের খেলনাটি দেখবে? যতবারই সে তার পাশ দিয়ে যাবে, ততবারই সে কষ্ট পাবে। সেটা ঘন সে চুরি করে না ফেলে, সেজন্য হয়তো বেশ কষ্ট করে নিজেকে সংবরণ করতে হবে। কিন্তু শিশুটি যদি দোকানের জানালার দিকে তাকিয়ে সত্যিকারের একটা গাড়ি দেখতে পায়, তখন তার কেমন লাগবে? কেমন হবে তার অনুভূতি, যদি সে সত্যিকারের ফেরারি গাড়ি দেখতে পায়? তবে সে কি আর খেলনা গাড়ির জন্য কষ্ট করবে? ওই খেলনা গাড়ি চুরি থেকে নিজেকে সংবরণের জন্য নিজের সাথে যুদ্ধ করবে? নাকি সে ওই খেলনা গাড়ির পাশ দিয়ে স্বাচ্ছন্দেই হেঁটে যাবে? চমৎকারিত্বের ভারসাম্যের কারণে সংগ্রামের স্পৃহা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে।
আমরা ভালোবাসা চাই, চাই অর্থ, চাই প্রতিপত্তি, চাই এই জীবন। ওই শিশুর মতো আমরাও এসবের প্রেমে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। যখন আমরা এসবের নাগাল পাই না, আমাদের অবস্থা দাঁড়ায় দোকানে যাওয়া ওই শিশুর মতো, যে খেলনা গাড়ি চুরি করা থেকে নিজেকে সামলে রাখতে লড়ে যায়। আমাদের ভালোবাসার জিনিসের জন্য আমরা হারাম কাজে লিপ্ত না হওয়ার জন্য লড়ে যাই। হারাম সম্পর্ক, হারাম ব্যবসায়িক লেনদেন, হারাম কাজ ও বেশভূষাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হয়। আসলে এই জীবনের প্রতি আমাদের যে মহব্বত, তা ছেড়ে দিতেই আমাদের সংগ্রাম করতে হয়। আমাদের অবস্থা ওই হোঁচট খাওয়া বান্দার মতো, যাকে সামান্য একটি খেলনার মোহ ছেড়ে দেওয়ার সংগ্রাম করতে হচ্ছে ...কারণ আমরা কেবল এতটুকুই দেখি!
এই জীবন এবং যা কিছু আছে, তার সবই ওই খেলনা গাড়ির মতো। আমরা একে ছাড়তে পারি না। কারণ এর থেকেও উত্তম ও মহত্তর কোনো জিনিসের সন্ধান আমরা পাইনি। প্রকৃত বিষয় আমরা দেখতে পাই না, না পুরো দৃশ্যপট, না প্রকৃত নক্সাখানি।
আল্লাহ (৫) বলেন: "এই দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। বস্তুত আখিরাতের জীবনই তো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানতো।"
এই দুনিয়ার জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা আরবি শব্দ ‘الحية ব্যবহার করেছেন। কিন্তু আখিরাতের জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা জীবনের জন্য ব্যবহৃত আধিক্যসুলভ আরবি পরিভাষা ‘الحيوان’ ব্যবহার করেছেন কারণ, আখিরাতের জীবনই সত্যিকারের জীবন। ওটাই আসল জীবন। জীবনের প্রকৃত সংস্করণ। 'যদি তারা জানতো' এই বলে আল্লাহ অত্র আয়াতের সমাপ্তি টানেন। আমরা যদি সত্যিকার অবস্থা দেখতে পেতাম, তবে ক্ষীণ ও সারবত্তাহীন এই মডেলের (অর্থাৎ দুনিয়া ও তার মধ্যবর্তী যাবতীয় জিনিসের) ২৬ প্রতি আমাদের যে গভীর মোহ রয়েছে, আমরা তা সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারতাম। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন:
"কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতের জীবনই হচ্ছে উৎকৃষ্টতর।"
(জীবনের এই প্রকৃত) সংস্করণ যেমন গুণগতভাবে উত্তম (خَيْرٌ), তেমনিভাবে পরিমাণের দিক থেকেও সেটা উত্তম (أَدْنَى)। দুনিয়ার এই জীবনের কোনো জিনিস, যা আমরা ভালোবাসি, তা যতই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, তাতে সর্বাবস্থায়ই গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিক থেকেই কোনো না কোনো ত্রুটি ও কমতি থেকেই যাবে। গুণগত দিক দিয়ে তাতে থাকবে অপূর্ণতা, আর পরিমাণগত দিক দিয়ে তা হবে অস্থায়ী।
এর মানে এই নয় যে, এই দুনিয়ার জীবনের কিছুই আমরা ভোগ করতে বা ভালোবাসতে পারবো না। কেননা, মুমিন হিসেবে আমাদের এই দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথাপি এই দুটো জীবনের তুলনা খেলনা গাড়ি ও সত্যিকার গাড়ির মতো। খেলনা গাড়িটি যতই আমাদের হোক, এমনকি সেটা নিয়ে যতই খেলায় মত্ত হই না কেন, দুটো গাড়ির পার্থক্যটা আমরা ঠিকই বুঝি। নকল মডেল (দুনিয়া: এই শব্দটি 'দানইয়া' ধাতু থেকে নির্গত, যার অর্থই হলো: 'নিম্ন')। আর বিপরীত দিকে আছে আখিরাত, যা জীবনের প্রকৃত মডেল বা সংস্করণ।
কিন্তু এই উপলব্ধি কিভাবে আমাদের এই জীবনে সাহায্য করতে পারে? এটা আসলেই আমাদেরকে সাহায্য করে, কারণ হালাল মোতাবেক জীবন পরিচালনার সংগ্রাম এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকাকে এটাকে সহজতর করে। সত্যিকার বিষয় (অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত চিত্র) ২৭ যতই আমরা দেখতে পাই, প্রয়োজনের মুহূর্তে "অপ্রকৃত" পরিত্যাগ করা আমাদের জন্য ততই সহজ হয়ে যায়। এর মানে এই নয় যে, "অপ্রকৃত"-কে আপনাকে সম্পূর্ণভাবে বা সব সময়ের জন্য ছেড়ে দিতে হবে। বরং এর ফলে, আমাদেরকে নকল মডেল (অর্থাৎ দুনিয়ার) সাথে এমন ধরনের সম্পর্ক তৈরি হবে যে, যখন আমাদেরকে আসল মডেলের স্বার্থে নকল মডেলের কিছু একটা অংশ ছেড়ে দিতে বলা হবে, তখন তা ছেড়ে দেওয়া আর আমাদের জন্য কষ্টকর হবে না। যদি বলা হয়, কোনো হারাম কাজ, যা আমরা কামনা করছি, তা থেকে বিরত থাকতে, তবে ওই হারাম কাজ থেকে বিরত থাকাটা আমাদের জন্য সহজতর হয়ে যায়। (একইভাবে) যদি বলা হয় মনে না চাইলেও কোনো নির্দেশ পালনে দৃঢ়তা অবলম্বন করো, তবে ওই আদেশ পালন আমাদের জন্য সহজতর হয়ে যায়। আমরা যেন ওই পরিণত শিশু, খেলনা গাড়িকে যে পছন্দ করে, কিন্তু তাকে যদি কখনো বলা হয় খেলনা গাড়ি ও সত্যিকার গাড়ির মধ্য থেকে যে কোনো একটি বেছে নাও, তবে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তার 'দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না।' উদাহরণস্বরূপ, নবি (ﷺ)-এর বহু সাহাবিরই ধনসম্পদ ছিল, কিন্তু প্রয়োজনের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ওই সম্পদের অর্ধেক বা পুরোটা বিলিয়ে দিতে তারা বিন্দু মাত্র কার্পণ্যবোধ করেননি।
এভাবে (প্রকৃত বিষয়ের দিকে) মনোযোগী হওয়ায়, আমাদের সাহায্য বা অনুমোদনের বিষয়ও পরিবর্তন হয়ে যায়। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে পড়লে, আমরা তখনই একজন গোলামের কাছে এর জন্য আবেদন করবো, যখন আমরা প্রকৃত বাদশাহকে দেখি না বা তাকে চিনি না। বাদশাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তার প্রাসাদে যাওয়ার পথে যদি তার দাসের সাথে আমাদের সাক্ষাত হয়, তবে হয়তো আমরা ওই দাসকে সম্ভাষণ জানাবো, তার প্রতি দয়াপরশ হবো, এমনকি আমরা ওই দাসকে হয়তো ভালোবেসেও ফেলতে পারি; তথাপি আমরা ওই দাসকে খুশি করার জন্য সময় নষ্ট করবো না, যখন রাজাকে খুশি করাটাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা কখনো ওই দাসের কাছে আমাদের আবেদন পেশ করে সময় নষ্ট করবো না, যখন বাদশাহই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাদশাহ ওই দাসকে যদি কিছু ক্ষমতা দিয়েও থাকেন, তবু আমরা ভালো করেই জানি যে, ওই ক্ষমতা তুলে নেওয়া এবং প্রদান করার অধিকার কেবল বাদশাহরই এবং বাদশাহ নামদারই কেবল তা করার অধিকার রাখেন। এই জ্ঞান অর্জিত হয় কেবল প্রকৃত বাদশাহকে চেনা ও জানার মাধ্যমে। আর এই জ্ঞানের ফলে দাসের সাথে আমাদের আচরণের ধরনও সম্পূর্ণ বদলে যায়।
প্রকৃত বিষয়টি উপলব্ধির কারণে আমাদের ভালোবাসার ধরনটাই বদলে যায়। ইবনে তাইমিয়া এই ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: “আপনার অন্তর যদি কারো জন্য নিবেদিত হয়ে যায়, যে আপনার জন্য হারাম, তবে (বুঝতে হবে) আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরাটাই এমন মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টির অন্যতম মূল কারণ। কেননা, আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর প্রতি আন্তরিকতার স্বাদ যে অন্তর একবার পেয়েছে, তার কাছে তখন এটার চেয়ে কিছুই আর মধুর লাগবে না এবং অপর কিছুই আর তার কাছে না আনন্দের লাগবে, আর না মূল্যবান মনে হবে। কেউই তার ভালোবাসার পাত্রকে পরিত্যাগ করে না, যদি না সে এরচেয়েও উত্তম কাউকে ভালোবাসে, অথবা অন্য কারো ভয়ে সে ভীত হয়। সত্যিকার প্রেমের টানে কিংবা হারামের ভয়ে অন্তর তখন ভ্রান্ত প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করে।”
“ওয়াহ্ন” তথা 'দুনিয়ার প্রতি মোহাচ্ছন্ন থাকা এবং মৃত্যুর প্রতি বিতৃষ্ণ হওয়া' -উম্মত হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা, যেমনটি নবি (ﷺ) একটি হাদিসে আমাদের জানিয়েছেন। আসলে আমরা দুনিয়ার মহব্বতে জড়িয়ে পড়েছি।
যখনই আপনি কোনো কিছুর প্রেমে পড়েন, তখন ওই প্রেমের বন্ধনকে ছিন্ন করা কিংবা সেটার মায়া ত্যাগ করা আপনার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যতক্ষণ না আপনি সেটার থেকে উত্তম কিছুকে ভালোবাসেন। দুনিয়ার এই ধ্বংসাত্মক প্রেমকে আমাদের অন্তর থেকে উৎখাত করাটা প্রায় অসম্ভব, যদি না আমরা এটার প্রতিস্থাপক হিসেবে উত্তম কিছু পাচ্ছি। উচ্চতর প্রেমের সন্ধান লাভই আমাদের জন্য অপর ভালোবাসার পাত্রটি পরিত্যাগ করাকে সহজ করে দেয়। আল্লাহর প্রেম, তাঁর প্রেরিত রসুলের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে জান্নাতে বাস করার অনন্ত বাসনা যখন দৃশ্যমান হয়, তখন সেটা অন্তরের অন্যসব প্রেম ও ভালোবাসাকে হটিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে পরাস্ত করে। এমন ভালোবাসা যতই দৃশ্যমান হবে, ততই তা প্রবল হবে। এবং এর মাধ্যমে নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালামের) বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন নিজের জীবনে ফুটিয়ে তোলাটা হবে বেশ সহজ:
"বলো, 'নিশ্চয়ই আমার সলাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।"
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
(কুরআন, ৬:১৬২)
তাই ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই নিহিত রয়েছে ভালোবাসার (সমস্যার) উত্তর। তাই ভালোবাসুন। এমন কিছুকে ভালোবাসুন, যা সকল কিছুর চাইতে মহান। সত্যিকার জিনিসের প্রেমে পড়ুন। (জান্নাতের) বালাখানাকে চোখের সামনে রাখুন। কেবল তখনই পুতুলের ঘর নিয়ে এ খেলা বন্ধ করতে আমরা সক্ষম হবো।
টিকাঃ
২* এক ধরনের আকর্ষণীয় দামি গাড়ি।
২৬ - (সম্পাদক)।
২৭ - (সম্পাদক)।
📄 একটি সফল বিবাহের হারানো সূত্র
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রবন্ধে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ন্যূনতম পর্যায়ের হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। শ্রদ্ধাবোধের ধারণা কখনোই নিপীড়নকে অনুমোদন করে না, হোক তা শারীরিক, আবেগ কিংবা মানসিক পর্যায়ের নিপীড়ন। নিজের বিরুদ্ধে কিংবা নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে চালানো নিপীড়নকে হজম করাটা 'সবর' (ধৈর্য ধারণ) করা নয়। আল্লাহ (৬) কখনোই অবিচার ও নিপীড়নকে অনুমোদন করেন না, আমাদেরও সেটা করা উচিত নয়।।
“এটা তাঁর নির্দশন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছ থেকে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমত্ববোধ সৃষ্টি করেছেন। বস্তুত চিন্তাশীল লোকদের জন্য এসবের মাঝে নিহিত রয়েছে নিদর্শন।” (কুরআন, ৩০:২১)
অগণিত বিয়ের দাওয়াতপত্রে আমরা এই আয়াতটি প্রায় সবাই পড়েছি। কিন্তু ক'জনে এটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছি? আমাদের ক'জনেরই বিবাহ আল্লাহর বর্ণিত এই প্রেম ও মমতাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করে? কি সেই সমস্যা, যার কারণে আমাদের এতো অধিক সংখ্যক বিবাহ শেষমেশ ডিভোর্স বা তালাকের মাধ্যমে সেগুলোর সমাপ্তি ঘটছে?
Love & Respect: The Love She Most Desires; The Respect He Desperately Needs গ্রন্থের লেখক ড. এমারসন এগরিচেস-এর মতে উত্তরটি খুবই সহজ। এগরিচেস তার গ্রন্থে ব্যাখ্যা করে বলেন, ব্যাপক গবেষনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একজন পুরুষের প্রাথমিক চাহিদা যেখানে হচ্ছে সম্মান, সেখানে একজন নারীর প্রাথমিক চাহিদা হচ্ছে প্রেম বা ভালোবাসা। স্ত্রী যখন স্বামীকে সম্মান দেয় না এবং স্বামী যখন স্ত্রীকে ভালোবাসে না, তখন তর্কাতর্কির যে নমুনা তাদের মাঝে দৃশ্যমান হয়, সেটাকে তিনি তার ভাষায় 'Crazy Cycle' বা 'পাগলা চক্র' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিভাবে এ দুটো একে অপরকে জোরদার করে ও একটা অন্যটার কারণ হিসেবে কাজ করে, সেটার ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন। অন্য ভাষায়, স্ত্রী যখন স্বামীর মধ্যে ভালোবাসার অভাব বোধ করে, তখন প্রতিক্রিয়া স্বরূপ স্ত্রী স্বামীর প্রতি অসম্মানসূচক আচরণ করে, অসম্মান দেখিয়ে সেটার পাল্টা জবাব দেয়। ফলশ্রুতিতে স্বামী আরও বেশি অনুরাগহীনতা প্রদর্শন করে।
এগরিচেস জোর দিয়ে বলেন, 'Crazy Cycle' বা 'পাগলা চক্র'-এর সমাধান হচ্ছে: স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি অগাধ সম্মান প্রদর্শন করবে এবং স্বামীও তার স্ত্রীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার স্বাক্ষর রাখবে। এর অর্থ হলো: স্ত্রীর এমনটি বলা যথাযথ হবে না যে, স্বামী যদি তাকে আগে ভালোবাসে, তবেই সে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা, এমনটি করার মাধ্যমে সে স্বামীর পক্ষ থেকে আরও বেশি অনুরাগহীন আচরণ ডেকে আনছে। অন্যদিকে স্বামীরও এটা বলা উচিত হবে না যে, স্ত্রীকে ভালোবাসার আগে স্ত্রীর প্রথম কর্তব্য হচ্ছে তাকে সম্মান করা। কেননা, এমনটি করে সে শুধু অসম্মানসূচক আচরণ বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। দুটোকেই [অর্থাৎ সম্মান ও প্রেমকে] হতে হবে শর্তহীন।
এই বিষয়টি নিয়ে যখন আমি গভীরভাবে চিন্তা করি, তখন উপলব্ধি করি, কুরআন ও নবির হিকমত বা প্রজ্ঞাকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বৈবাহিক সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত এই দুটো বিষয়ের চেয়ে অন্য কোনো বিষয়কে এতো গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি। স্বামীগণের উদ্দেশ্য নবি (ﷺ) বলেন:
“নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো, যেহেতু তারা পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্ট এবং পাঁজরের উপরের অংশই সবচেয়ে বাঁকানো। সোজা করতে গেলে এটা ভেঙে যাবে। আর যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দিলে তা বাঁকানোই থেকে যাবে। তাই নারীদের সাথে সদাচারণ করো। [বুখারি ও মুসলিম]
এ ব্যাপারে তিনি (ﷺ) আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন:
"সে-ই প্রকৃত ঈমানদার যার আখলাক বা চরিত্র সর্বোত্তম এবং তোমাদের মাঝে সেই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোচ্চ আচরণ করে।” [আত-তিরমিযি]
নবি (ﷺ) আরও বলেন:
"একজন ঈমানদার স্বামী যেন ঈমানদার স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। সে যদি তার চরিত্রের একটি দিক অপছন্দ করে, তবে তার চরিত্রের আরেকটি দিক তাকে সন্তুষ্ট করবে।” [মুসলিম]
আল্লাহ বলেন: “... তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, হয়তো তোমরা এমন জিনিসই অপছন্দ করছো, যার মধ্যে আল্লাহ বিপুল কল্যাণ রেখেছেন।” (কুরআন, ৪:১৯)
হীরা-জহরত ও মনিমুক্তার চেয়ে মূল্যবান এই প্রজ্ঞা বা হিকমত বাণীতে পুরুষদেরকে তাদের স্ত্রীদের প্রতি সদয় ও প্রেমময় হতে জোর দেওয়া হয়েছে। তদপুরি প্রেম ও সদয় আচরণ প্রদর্শনের সময় তারা যেন নিজেদের স্ত্রীদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপক্ষো করে, সে দিকেও জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে।
অপরদিকে স্ত্রীদেরকে সম্বোধন করার সময় মনোযোগের কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে। স্বামীর প্রতি সদয় এবং প্রেমময় হতে কেন স্ত্রীদেরকে বারংবার বলা হলো না? সম্ভবত নারীরা স্বভাবগতভাবে অকৃত্রিম প্রেমের অধিকারী হয়ে থাকে বলেই হয়তো এমনটি করা হয়েছে। খুব কম স্বামীই অভিযোগ করে যে, তার স্ত্রী তাকে ভালোবাসে না। কিন্তু বহু স্বামীরই অভিযোগ যে, তাদের স্ত্রীরা তাদেরকে সম্মান দেখায় না। আর তাই স্ত্রীদের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহতে এই মানসিকতার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
নানাভাবেই সম্মান দেখানো যায়। কাউকে সম্মান দেখানোর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে, তার ইচ্ছাকে সম্মান করা। যখন কেউ বলে, "আমি তোমার পরামর্শকে সম্মান করি" তখন তার এই কথার মর্ম হচ্ছে, "আমি তোমার পরামর্শ মেনে চলি।" কোনো নেতাকে সম্মান করার মানে হচ্ছে, তিনি যা বলেন সেটা করা। আমাদের পিতামাতাকে সম্মান করার তাৎপর্য হচ্ছে, তাদের ইচ্ছা বা মতের বিরুদ্ধে না যাওয়া। আর স্বামীকে সম্মান করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্বামীর ইচ্ছাকে সম্মান করা। নবি () বলেন:
"যখন কোনো নারী তার [ওপর ফরয হওয়া] পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে, সিয়াম বা রোজা রাখে, নিজের ইজ্জত-আবরুকে সুরক্ষিত রাখে এবং নিজের স্বামীকে মেনে চলে, তাকে বলা হবে: 'জান্নাতে প্রবেশ করো, যে দরজা দিয়ে তোমার মন চায়।” [আত-তিরমিযি]
কেন আমরা যারা নারী, আমাদেরকে নিজেদের স্বামীর ইচ্ছাকে সম্মান করা এবং সেটাকে মেনে চলতে বলা হলো? এটার কারণ, পুরুষদেরকে কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ বলেন: “পুরুষেরা নারীদের রক্ষক এবং তাদের তত্ত্বাবধায়ক [কাওয়্যামুন]। কেননা, একজনের চেয়ে অপরজনকে আল্লাহ বেশি [সামর্থ্য] প্রদান করেছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের উপার্জন থেকে খরচ করে ...” (কুরআন, ৪:৩৪)
কিন্তু স্বামীর প্রতি এ ধরনের নিঃশর্ত সম্মান কি একজন নারী হিসেবে আমাদেরকে দুর্বল এবং অধঃস্তন পর্যায়ে নামিয়ে আনে না? আমরা কি নিজেদের এমন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি না, যেখানে [পুরুষরা] আমাদের এ অবস্থার সুযোগ নেবে এবং আমাদের নিপীড়ন করবে? বাস্তবতা তো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআন, নবির আদর্শ, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা ঠিক এর উল্টোটাই প্রমাণ করে। স্ত্রী যত বেশি করে স্বামীকে সম্মান করবে, স্বামী তত বেশি প্রেম ও সদয় আচরণ করবে। প্রকৃতপক্ষে, স্ত্রী যত বেশি অসম্মান দেখাবে, স্বামী তত বেশি রূঢ় হবে এবং তার আচরণে প্রীতি ভালোবাসা ততই কমতে থাকবে।
একইভাবে, একজন পুরুষ প্রশ্ন করতে পারে, কেন সে স্ত্রীর প্রতি দয়াশীল ও প্রেমময় হবে, যদিওবা ওই স্ত্রীর আচরণ তার প্রতি অসম্মানজনক হয়? এই প্রশ্নের উত্তর লাভের জন্য কেউ উমর ইবনে খাত্তাবের উদাহরণের দিকে দৃষ্টি দিতে পারে। হযরত উমর যখন খলিফা ছিলেন, তখন এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে এসেছিলেন। এসে দেখে উমরের স্ত্রীই উমরের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলছে। ওই লোকটি যখন ফিরে যাবে, ঠিক তখনই উমর তাকে ডেকে আনেন। লোকটি জানায়, উমর তার স্ত্রীর সাথে যে সমস্যায় পড়েছেন, ঠিক তেমন সমস্যা নিয়েই সে উমরের কাছে হাজির হয়েছে। এটা শুনে উমর বলেন, তার স্ত্রীকে তাকে সহ্য করে, তার জামা কাপড় ধুয়ে দেয়, তার বাড়ি-ঘর পরিষ্কার করে, তাকে আরাম ও সুখ দেয় এবং তার সন্তানদের লালন পালন করে। সে যদি তার জন্য এতো কিছু করতে পারে, তবে যখন সে তার গলার স্বর উঁচু করে, তখন সেটা কেন সহ্য করা যাবে না?
কেবল পুরুষ নয়, বরং আমাদের সকলের জন্যই এই ঘটনাতে চমৎকার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যের মতো গুণাবলি, যেগুলো একটি সফল বিবাহের পূর্ব শর্ত, সেগুলোরই অমূল্য চিত্রায়ন হয়েছে এই ঘটনায়। উপরন্তু, ধৈর্যধারণকারীর জন্য আখিরাতে যে ধরনের প্রতিদানের ব্যবস্থা আছে, সেটাও একবার বিবেচনা করুন। আল্লাহ বলেন, "যারা ধৈর্য ধারণ করে, তারা বেহিসাব (অগণিত) পুরস্কার লাভ করবে।” (কুরআন, ৩৯:১০)
টিকাঃ
২৮ 'প্রেম ও সম্মান: যে প্রেম স্ত্রীর সর্বোচ্চ কামনা এবং যে সম্মান আবশ্যকভাবে স্বামীর প্রাপ্য।'
📄 কষ্ট ও দুর্ভোগ
নিজেদের কষ্ট ও দুর্ভোগ দূর করতে আমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলি, কিন্তু আমরা কখনোই বিবেচনা করে দেখি না যে, আমাদের কষ্টগুলো আসলে আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করছে।
📄 ঝড়ের মাঝে একমাত্র আশ্রয়
ঝড় যখন আসে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাটা কখনোই সহজ হয় না। বৃষ্টি শুরুর ক্ষণিক পরেই বিজলী চমকাতে থাকে। আঁধার কালো মেঘ সূর্যকে ঢেকে দেয় এবং এক সময়ের শান্ত সমুদ্রের সমস্ত তরঙ্গ হঠাৎ করেই আপনাকে ঘিরে ধরে। কোনোভাবেই আর নিজের পথ আপনি তখন খুঁজে না পেয়ে সাহায্যের আশায় হাত বাড়িয়ে দেন।
কোস্ট গার্ডকে দিয়েই আপনি শুরু করেন। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। আপনি নৌকাকে অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আপনি লাইফবোট খুঁজতে থাকেন, কিন্তু সেটার কোনো পাত্তা নেই। এই পরিস্থিতিতে আপনি হন্যে হয়ে লাইফ জ্যাকেটের সন্ধান করেন। কিন্তু হায়, সেটাও ছেঁড়া। একটা উপায় খুঁজতে খুঁজতে যখন আপনি আপনার সামর্থের সবটুকু নিঃশেষ করে ফেলেন, ঠিক তখনই আপনি আসমানের দিকে দৃষ্টি ফেরান।
আর আল্লাহকে ডাকেন।
যাইহোক, ওই মুহূর্তের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য আছে, যা সম্পূর্ণরূপে অনন্য। এই পরিস্থিতিতে আপনি এমন কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করেন, অন্য সময় যেটা আপনি কেবল তাত্ত্বিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। হ্যাঁ, ওই মুহূর্তে আপনি প্রকৃত তাওহিদের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। লাভ করেন প্রকৃত একত্ববাদের স্বাদ। লক্ষ্য করুন, তীরে থাকা অবস্থায় আপনি হয়তো আল্লাহকেই ডাকতেন, কিন্তু আপনি আরও অনেকের সাথে সাথে তাঁকে ডাকতেন। আপনি হয়তো আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন, কিন্তু আরও অনেক কিছুর সাথে সাথে তাঁর ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এই একটি মুহূর্তে সবকিছুই বন্ধ। হ্যাঁ, সবকিছু। ডাকার মতো তো আর কেউ নেই। নির্ভর করার মতো কিছুই বাকি নেই। [হ্যাঁ], শুধু তিনিই রয়ে গেছেন।
আর এটাই হচ্ছে মূল বিষয়।
আপনি কি কখনো এটা ভেবে অবাক হয়েছেন যে, আপনার সব থেকে প্রয়োজনের সময়ে সৃষ্টির যে যে দুয়ারে সাহায্যের জন্য আপনি পা বাড়ান, সেগুলো বন্ধ থাকে কেন? আপনি এক দুয়ারে কড়া নাড়েন, কিন্তু সেটা সজোড়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরেক দুয়ারে যান। সেটাও বন্ধ। আপনি এক দুয়ার থেকে আরেক দুয়ারে যান, কড়া নাড়তে থাকেন, আর প্রত্যেক দুয়ারে আঘাত করতে থাকেন, কিন্তু কিছুই খুলে না। এমনকি যে যেসব দুয়ারের ওপর আপনি এক সময় নির্ভর করতেন, আচমকাই সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কেন? কেন এমনটি ঘটে?
খেয়াল করুন, মানুষ হিসেবে আমাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, আল্লাহ যেগুলো ভালো করেই জানেন। আমরা সর্বদাই চাহিদার একটি অবস্থাতে থাকি। আমরা দুর্বল। কিন্তু একইসাথে আমরা তাড়াহুড়ো প্রবণ ও অধৈর্য। যখন আমরা বিপদে থাকি, তখন আমরা সাহায্য তালাশের জন্য এক প্রকার বাধ্য হই। এটাই [তাঁর সৃষ্ট] নকশা [বা ডিজাইন]। দিন যখন রোদেলা, আর আবহাওয়া যখন মনোরম, তখন আমরা আশ্রয় খুঁজতে যাবো কেন? কখন আমরা আশ্রয় খুঁজি? যখন ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে, কেবল তখনই আমরা আশ্রয় খুঁজি। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত তিনি) ঝড় বইয়ে দেন, এমন পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রয়োজন তৈরি করেন, যাতে করে আমরা আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হই।
যখন আমরা সাহায্য তালাশ করি, তখন আমাদের মধ্যস্থিত অধৈর্য বৈশিষ্ট্যের জন্য যা নিকটে আর যেটা সহজ মনে হয়, তার থেকেই আমরা সাহায্য চাই। যা দেখতে পাই, শুনতে ও ছুঁতে পারি, সেটার কাছেই আমরা সাহায্য চাই। আমরা সোজা পথ খুঁজি। সৃষ্টির কাছে আমরা সাহায্য খুঁজি। এমনকি নিজ সত্তার কাছেও আমরা সাহায্য চাই। সবচেয়ে নিকটবর্তী যেটা, সাহায্যের জন্য আমরা সেটাই খুঁজি। দুনিয়া (তথা পার্থিব জীবন) বলতে কি ঠিক এটাই বুঝায় না? যা কাছের মনে হয় [সেটাই কি দুনিয়া নয়?]। 'দুনিয়া' শব্দটির মানে: 'যা নিচু'। যা সব থেকে কাছের মনে হয়, সেটাই দুনিয়া। কিন্তু এটা এক মোহ বা ভ্রম মাত্র।
কিন্তু এটার থেকে নিকটবর্তী কিছু আছে। এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন তো, কোন জিনিসটি আপনার সবচেয়ে নিকটে আছে। যদি এই প্রশ্নটি করা হয়, তবে অনেকেই হয়তো বলবেন, আমাদের অন্তর ও সত্তাই সবচেয়ে নিকটবর্তী।
কিন্তু আল্লাহ (৫) বলেন: "আমরাই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং [মানুষ] তার নফস (তথা মনের মাঝে) যে কুচিন্তা করে, তা আমরা জানি। কেননা, তার গ্রীবাহ ধমনীর চেয়েও আমরা অধিক নিকটবর্তী।” وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ (কুরআন, ৫০:১৬)
এই আয়াতটি আল্লাহ (স) শুরু করেছেন এটা দেখিয়ে যে, তিনি আমাদের চেষ্টা ও সাধনাগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। কেউ আমাদের চেষ্টা ও সাধনাগুলোর খবর রাখেন, সেটা স্বস্তির এক সংবাদ। নিজ সত্তা আমাদেরকে কি বলে, তিনি সেটা জানেন। তিনি আমাদের গ্রীবাস্থ ধমনীর চেয়েও নিকটে। গ্রীবাস্থ ধমনী কেন? আমাদের [দেহের] ওই অঙ্গে কি এমন আকর্ষণীয় জিনিস আছে, যার জন্য এটার উল্লেখ হয়েছে? গ্রীবাস্থ ধমনী ওই মহাগুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যেটা হৃদয়ে রক্ত সরবরাহ করে। এটা যদি কেটে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা মারা যাবো। আক্ষরিকভাবে এটা আমাদের জীবন। কিন্তু আল্লাহ (স) নিকটে অবস্থান করেন। আল্লাহ (স) আমাদের জীবন, আমাদের নিজ সত্তা এবং আমাদের নিজ নফস থেকেও অধিক নিকটে অবস্থান করেন। আমাদের হৃদয়ের মহাগুরুত্বপূর্ণ গতিপথ থেকেও তিনি অধিক নিকটবর্তী।
অন্য আয়াতে আল্লাহ (স) বলেন: "তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে ওই কাজের দিকে আহ্বান করেন, যেটা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখো আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অবস্থান করেন। বস্তুত তাঁর কাছেই তোমরা সকলে সমবেত হবে।" يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ (কুরআন, ৮:২৪)
আল্লাহ (স) জানেন, আমাদের নফস রয়েছে। আল্লাহ জানেন, আমাদের হৃদয় রয়েছে। এই জিনিসগুলো যে আমাদেরকে চালিত করে, আল্লাহ তা জানেন। তা সত্ত্বেও, আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, এসব থেকেও তিনি আমাদের অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং, যখন আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে ছুটি, তখন আমরা কেবল দুর্বলের কাছে যাই না, বরং সেইসাথে যিনি সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করেন, তাঁকে উপেক্ষা করে, যা দূরে এবং বহুদূরে অবস্থান করে, তার কাছে ছুটে যাই। সুবহান আল্লাহ (সমস্ত মহিমা আল্লাহর)।
এটাই যেহেতু আমাদের প্রকৃতি এবং আল্লাহ (স) ভালোভাবেই তা জানেন, তাই ঝড়ের সময় আশ্রয় লাভের অন্য সকল দরজা বন্ধ করে, তিনি আমাদেরকে রক্ষা করেন এবং আমাদেরকে [তাঁর অভিমুখে] পুনরায় চালিত করেন। প্রতিটি মিথ্যা দুয়ারের পেছনে রয়েছে এক একটি গহ্বর, এটা তিনি জানেন। সেখানে পা দিলে, আমাদের পতন নিশ্চিত। তাঁর অপার করুণা ও রহমতের বলে তিনি ওই মিথ্যা দুয়ারগুলো বন্ধ করে রাখেন।
তাঁর অপার করুণার বলে, তিনিই ঝড় বইয়ে দেন, যাতে করে আমরা সাহায্য তালাশ করি। আর তিনি জানেন আমরা ভুল জায়গাতে পা দেবো, তাই তিনি আমাদের বহু নির্বাচনী পরীক্ষা নেন, যাতে কেবল একটি উত্তর বাছাইয়ের সুযোগ থাকে এবং ওটাই সঠিক উত্তর। এই যে কষ্ট, সেটা আসলে আরামের [জন্য]। তাই আঁকড়ে ধরার সকল হাতল এবং অন্য সব উত্তরকে সরিয়ে দিয়ে তিনি পরীক্ষাকে একেবারে সহজ করে দেন।
ঝড় যখন আসে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাটা কখনোই সহজ হয় না। এবং এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঝড়ো হাওয়া পাঠিয়ে তিনি আমাদেরকে নিজেদের হাঁটুর ওপর নামিয়ে আনেন এবং [আল্লাহর] কাছে প্রার্থনা জানানোর এটাই সর্বোত্তম ভঙ্গি।