📄 আমি যা অনুভব করছি, তা কি প্রেম?
'প্রেম চরম মাত্রার এক মানসিক ব্যাধি' প্লেটো প্রেমকে এ ভঙ্গিতেই চিত্রিত করেছেন। কেউ যদি কখনো 'প্রেমে পড়ে' থাকেন, তবে তিনি এই বক্তব্যে কিছুটা সত্যতা দেখতে পাবেন, তথাপি এখানে বড় ধরনের ভ্রান্তি রয়ে গেছে, আসলে প্রেম মানসিক ব্যাধি নয়, বরং কামনা হচ্ছে মানসিক ব্যাধি।
'প্রেমে পড়ার' মানে যদি হয় আমাদের জীবন হবে বিধ্বস্ত এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়বো, দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়বো, একেবারে নিঃশেষিত হবো, স্বাভাবিক কাজকর্মে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়বো এবং এর (অর্থাৎ ভালোবাসার) জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে যাবো, তবে এটা আর যাই হোক প্রেম নয়। আমাদের চারপাশের সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদেরকে যে ধারণা দেয় তা সত্ত্বেও আসল কথা হলো, সত্যিকার প্রেম আমাদের মাদকাসক্তের মতো করে তুলবে না।
আর তাই বেড়ে ওঠার সময়কালে আমাদের দেখা চলচ্চিত্রে সর্বগ্রাসী মোহ হিসেবে প্রেমকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়, সেটা আসলে প্রেম নয়। এর নাম ভিন্ন। এটা হচ্ছে 'হাওয়া': একজন ব্যক্তির নিচু স্তরের কামনা, অনর্থক বাসনা এবং কামস্পৃহাকে বোঝাতে কুরআন এই শব্দটি ব্যবহার করেছে। যারা এসব কামনাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে, তাদেরকে আল্লাহ সবচেয়ে পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন: "তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয়, তবে জেনে রাখুন, বস্তুত তারা নিজেদের কামনা (হাওয়া) ছাড়া আর কিছুরই অনুসরণ করে না। আল্লাহর কাছ থেকে আসা হেদায়েতকে বাদ দিয়ে নিজের কামনাকে যে অনুসরণ করে, তার থেকে পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে?" (কুরআন, ২৮:৫০)
আল্লাহর হেদায়েতের ওপর যখন আমরা আমাদের কামনা ও বাসনাকে প্রাধান্য দেই, বস্তুত তখন আমরা ওইসব কামনা-বাসনার উপাসনাকে বেছে নেই। পরম কাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রতি আমাদের ভালোবাসা যখন আমাদের কাছে 'আল্লাহর প্রেম' থেকেও শক্তিশালী হয়ে যায়, বস্তুত তখন আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটিকে আমাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ বলেন: "এমনও মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে সমতুল্যরূপে (উপাসনা) করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করেই তারা ওদের ভালোবাসে। অন্যদিকে ঈমানদারগণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় দৃঢ়।” (কুরআন, ২:১৬৫)
কোনো কিছুর প্রতি প্রেম যদি আমাদেরকে আমাদের পরিবার, আমাদের সম্মান, আমাদের আত্মমর্যাদা বোধ, আমাদের দেহ, আমাদের বিবেক, আমাদের মানসিক শান্তি, আমাদের দ্বীন, এমনকি আমাদের স্রষ্টা, যিনি আমাদেরকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, এসব কিছুকে পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করে, তবে জেনে রাখুন, আমরা 'প্রেমে পড়িনি', বরং আমরা দাসে পরিণত হয়েছি। এ ধরনের লোক সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "আপনি কি তাকে দেখেন না, যে নিজের কামনা ও বাসনাকে (হাওয়া) নিজের প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে পথভ্রষ্ট হতে দেন এবং তার কর্ণে ও অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন এবং তার দৃষ্টিশক্তির ওপর পর্দা ঢেলে দেন।” (কুরআন, ৪৫:২৩)
কারো দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণেন্দ্রিয় এবং অন্তর সবকিছুর ওপর মোহর লেগে আছে, এ রকম পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা একটিবার ভাবুন তো। বস্তুত হাওয়া কোনো তৃপ্তি বয়ে আনে না। এটা এক কয়েদখানা। এটা দেহ, মন ও আত্মার দাসত্ব। এটা এক ধরনের আসক্তি (Addiction) এবং এক ধরনের উপাসনা। সাহিত্যের জগতে এই বাস্তবতার ভুরি ভুরি উদাহরণ চোখে পড়বে। চার্লস ডিকেন্সের Great Expectations-এ Pip এই বাস্তবতার উজ্জ্বল উপমা। এসথেলার প্রতি নিজের মোহকে সে এভাবে বর্ণনা করে: "দুঃখজনক হলেও আমি জানতাম যে, সব সময় না হলেও প্রায়শই আমি তাকে ভালোবাসতাম, সকল যুক্তি, প্রতিজ্ঞা, শান্তি, আশা, সুখ ও সমস্ত নিরুৎসাহিতা সত্ত্বেও (আমি তাকে ভালোবাসতাম)।”
চার্লস ডিকেন্সের সৃষ্ট চরিত্র Miss Havisham এটাকে আরও বিস্তৃত করেন: "আমি তোমাকে বলবো... সত্যিকার প্রেম কি জিনিস। এটা হলো অন্ধভক্তি, প্রশ্নহীন আত্মবিসর্জন, চরমভাবে নিজেকে সঁপে দেওয়া, নিজ সত্তা এবং গোটা দুনিয়ার থেকে বিশ্বাস ও আস্থা তুলে নেওয়া এবং নিজের অন্তর ও আত্মাকে প্রেমাস্পদের কাছে সমর্পণ করা (যে তোমাকে উপর্যুপুরি আঘাত করে চলেছে)।”
চার্লস ডিকেন্সের সৃষ্ট চরিত্র Miss Havisham-এর বর্ণনা নির্জলা সত্য হলেও এটা সত্যিকার প্রেম নয়, বরং এটা 'হাওয়া'। প্রকৃত প্রেম যেটা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, সেটা না কোনো ব্যাধি আর না কোনো নেশা বা মোহ। আল্লাহ তাঁর মহাগ্রন্থ [কুরআনে] বলেন: “এটা তাঁর নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গি-সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছ থেকে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মাঝে প্রেম ও মমত্ববোধ স্থাপন করেছেন। চিন্তাশীল লোকদের জন্য এসবের মাঝে নিদর্শন আছে।” (কুরআন, ৩০:২১)
সত্যিকার প্রেম আনে প্রশান্তি, আত্মিক যন্ত্রণা নয়। সত্যিকার প্রেম আপনার নিজের সাথে এবং আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কে প্রশান্তি দান করে। এজন্য আল্লাহ বলেন: “যাতে তোমরা প্রশান্তিতে বাস করতে পারো।" অন্যদিকে 'হাওয়া' এটার বিপরীত। 'হাওয়া' আপনার জীবনকে অসহনীয় বানাবে। একটা নেশার মতো আপনি পাগলপারা হয়ে তা খুঁজে ফিরবেন, কিন্তু কখনো তৃপ্ত হবেন না। নিজের পতন ঘটা পর্যন্ত আপনি এটার পেছনে ছুটেই যাবেন, কিন্তু কখনোই এর নাগাল পাবেন না। আর নিজের পুরো সত্তাকেও যদি এটার কাছে সঁপে দেন, তথাপিও এটা আপনাকে কখনো সুখের সন্ধান দেবেন না।
পরম সুখই যখন সকলের লক্ষ্য, তখন মোহজাল অতিক্রম করা এবং প্রেমকে 'হাওয়া' (প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা) থেকে পৃথক করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে অব্যর্থ একটি পথ হচ্ছে, নিজেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা: আমি যাকে 'ভালোবাসি', তার কাছাকাছি হওয়াটা কি আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, নাকি আমাকে আল্লাহর কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়? সহজভাবে বললে, ওই ব্যক্তি কি আমার অন্তরে আল্লাহর স্থান দখল করেছে?
প্রকৃত বা নিখাঁদ প্রেম না কখনো আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রেমের সাথে সংঘর্ষ বাধাবে, আর না কখনো সেটার সাথে প্রতিযোগিতা করবে। ওই প্রেম বরং আল্লাহর প্রতি নিবেদিত ভালোবাসা ও সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। এই কারণে আল্লাহর বেঁধে দেওয়া বৈধ সীমার মাঝে থেকেই সত্যিকার প্রেম সম্ভব। ওই সীমার বাইরে যা আছে, তার সবই 'হাওয়া', যেটার কাছে হয় আমরা নিজেদেরকে সঁপে দেই, আর না হয় আমরা সেটাকে প্রত্যাখ্যান করি। হয় আমরা আল্লাহর গোলাম, নইলে আমরা 'হাওয়া' তথা প্রবৃত্তির দাস। একসাথে দুটো কখনো সম্ভব নয়।
মিথ্যা আমোদ-প্রমোদের সাথে সংগ্রাম করেই আমরা সত্যিকার প্রশান্তি পেতে পারি। কেননা, এই দুটো তাদের সংজ্ঞা মোতাবেকই পারস্পরিকভাবে একচেটিয়া। এই কারণে নিজেদের কামনা ও বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা জান্নাত লাভের পূর্ব শর্ত। আল্লাহ বলেন: “স্বীয় প্রভুর সামনে দাঁড়ানোর যে ভয় করে এবং নিজের আত্মাকে যে পাপ থেকে বিরত রাখে, প্রকৃতপক্ষে, জান্নাতই তার আবাসস্থল।” (কুরআন, ৭৯:৪০-৪১)
টিকাঃ
Mutually exclusive: পারস্পরিকভাবে একচেটিয়া অর্থাৎ একটি থাকলে অপরটির স্থান হবে না- (সম্পাদক)।
📄 বাতাসে প্রেমের আভাস
বাতাসে প্রেমের আভাস! ... কিংবা কম করে হলেও এটাই আপনি ভাবুন, বিজ্ঞাপন নির্মাতারা ফেব্রুয়ারি মাসে এটাই চায়। ভালোবাসা প্রকাশ করাটা ভালো, কিন্তু ভ্যালেনটাইন ডে (ভালোবাসা দিবস) তো বছরে একবারই আসে, আর এ সময় হয় আপনাকে ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে, আর না হয় হৃদয়হীন পাষাণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। এদিকে ফেব্রুয়ারি আসলে বুটিকের শোরুম আর চকলেটের দোকানগুলোতে যেন ঈদের আমেজ সৃষ্টি হয়।
তথাপি, এমনি বাণিজ্যিক প্রেমের ভিড়েও কেউ নিজের ভালোবাসার মানুষদের কথা না ভেবে পারেন না। আমরা যখন এসবে ব্যতিব্যস্ত হই, তখনই আমরা অনিবার্যভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হই।
ঠিক এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি এক সময় আমিও হয়েছিলাম, যখন আমার এক বন্ধুর কিছু কথা নিয়ে আমি গভীরভাবে চিন্তা করলাম। ভালোবাসার ওই মানুষটির সাথে থাকার অনুভূতি কেমন, সে আমাকে ব্যাখ্যা করছিল। তার ভাষায়, যখন তারা (অর্থাৎ সে আর তার ভালোবাসার মানুষটি) একত্র হয়, গোটা দুনিয়া তখন তাদের ভাবনা থেকে হারিয়ে যায়। তার এই বক্তব্য নিয়ে আমি যতই ভাবতে থাকি, এটা আমাকে ততই বিচলিত করে এবং একই সাথে এটা আমাকে বেশ অবাকও করে।
মানুষ হিসেবে আমরা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও আকর্ষণ অনুভব করবো, আমাদেরকে এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা আমাদের মানবীয় প্রকৃতির একটি অংশ। একদিকে অপর একজন মানুষের প্রতি আমরা এমনটি অনুভব করি, একই সময় প্রতিদিন পাঁচবার আমাদের স্রষ্টা ও প্রভুর সাথে আমরা সাক্ষাৎকারে মিলিত হই? আমি ভাবি, (সলাতরত অবস্থায়) স্রষ্টার উপস্থিতিতে কতবার আমরা অনুভব করেছি যে, গোটা দুনিয়া আমাদের সামনে থেকে হারিয়ে গেছে, অন্য কারো থেকে বা অন্য কিছুর প্রতি ভালোবাসা থেকে আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসা বেশি, আমরা কি আসলেই সে দাবি করতে পারি?
আমরা প্রায়ই ভাবি আল্লাহ আমাদেরকে শুধু বালা-মুসিবতের দ্বারাই পরীক্ষা করেন, এটা সত্য নয়। আরাম-আয়েশ, সুখ ও স্বস্তি দিয়েও আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা করেন। তিনি আমাদেরকে নেয়ামত (অনুগ্রহ) এবং আমাদের ভালোবাসার বস্তু দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং সচরাচর আমাদের অনেকেই এসব পরীক্ষায় অকৃতকার্য হই। আমরা অকৃতকার্য হই, কারণ আল্লাহ যখন আমাদেরকে এসব অনুগ্রহ দান করেন, তখন মনের অজান্তেই এগুলোকে আমরা মনে মিথ্যা উপাস্যে রূপ দেই।
আল্লাহ যখন আমাদেরকে অর্থ দিয়ে আশীর্বাদপুষ্ট করেন, তখন আমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অর্থের ওপর ভরসা করতে শুরু করি। আমরা ভুলে যাই আমাদের রিযিকের উৎস কখনোই অর্থ সম্পদ নয়, বরং তিনিই রিযিকের উৎস যিনি (আমাদেরকে) অর্থ দিয়েছেন। এই বিভ্রান্তির ফলেই হঠাৎ করেই আমরা ব্যবসার ক্ষতির আশংকায় এলকোহল জাতীয় পণ্যও বিক্রি শুরু করি কিংবা ব্যবসায় নিরাপত্তার জন্য আমরা সুদে ঋণ নেই। পরিহাসের বিষয় হলো, রিযিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতাবশতঃ আমরা কিনা রিযিকদাতাকেই অমান্য করতে শুরু করি!
আল্লাহ যখন আমাদেরকে ভালোবাসার মানুষ দিয়ে ধন্য করেন, তখন আমরা ভুলে যাই যে, আল্লাহই হলেন এই অনুগ্রহের দাতা এবং আমরা ওই মানুষটিকে ঠিক তেমনিভাবে ভালোবাসতে থাকি, যেমনিভাবে আল্লাহকে ভালোবাসা উচিত। ওই মানুষটি তখন আমাদের সবকিছুর কেন্দ্রে পরিণত হয়। আমাদের সকল চিন্তা, পরিকল্পনা, আশা ও ভয় সবকিছু ওই মানুষটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে। ওই মানুষটি যদি আমাদের বিবাহিত সঙ্গি না হয়, তখন আমরা তার সঙ্গ লাভের জন্য কখনো কখনো হারাম পন্থা বেছে নিতেও পিছপা হই না। তারা যদি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চায়, তবে আমাদের গোটা দুনিয়া ভেঙে পড়তে চায়। অনুগ্রহদাতাকে বাদ দিয়ে আমরা উল্টো অনুগ্রহকেই আরাধনা করতে শুরু করি।
এমন লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন: “এমনও মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহ ছাড়া অপরকে [তাঁর] সমতুল্যরূপে গ্রহণ করে। [বস্তুত] তারা তাদেরকে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে ভালোবাসে। অন্যদিকে ঈমানদারগণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় সুদৃঢ়।” (কুরআন, ২:১৬৫) আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহে ধন্য হওয়ার পর এভাবে পথচ্যুত হওয়ার প্রবণতার কারণে আল্লাহ কুরআনে আমাদের প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন: “বলো, [হে মুহাম্মদ], 'যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের সঙ্গী/সঙ্গিনীগণ, তোমাদের আত্মীয়স্বজন, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যার মন্দা পড়ার আশংকা তোমরা করো এবং তোমাদের বাসস্থানগুলো - যা তোমরা ভালোবাসো, যদি আল্লাহ, তাঁর রসুল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা এগুলো প্রিয় হয়, তবে আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। এবং আল্লাহ কোনো অবাধ্য জাতিকে হেদায়েতের রাস্তা দেখান না।" (কুরআন, ৯:২৪)
এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, উপরে উল্লিখিত আয়াতে যেসব জিনিসের তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা হালাল (বৈধ) এবং এগুলো تو স্বয়ং আল্লাহরই অনুগ্রহ ও নেয়ামত। এসব অনুগ্রহের কিছু কিছু তো আল্লাহর নিদর্শনও বটে। একদিকে আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তাঁর নিদর্শনের অন্যতম হচ্ছে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গি পয়দা করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের থেকে শান্তি লাভ করো এবং তিনিই তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এসবের মাঝে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।” (কুরআন, ৩০:২১)
অন্যদিকে আবার আল্লাহ হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানাদির মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের দুশমন, তাই তাদের ব্যাপারে সতর্ক হও।” (কুরআন, ৬৪:১৪)
এই আয়াতের হুঁশিয়ারী অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। আমাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং আমাদের সন্তানাদিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেহেতু এগুলো হচ্ছে ওই অনুগ্রহ, যেগুলোকে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আপনি যে জিনিসকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, দেখবেন সেখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে সব থেকে বড় পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হওয়ার অর্থ যদি হয়, হাজারো শুভেচ্ছা কার্ড ও গোলাপের ভিড়ের ওপারে অপেক্ষমান সত্যিকার ও বৃহত্তর ভালোবাসাকে উপলব্ধি করা, তবে তাই হোক। আর তার উপযুক্ত ও প্রাসঙ্গিক সময় এখনই নয় কি? কেননা, এতকিছুর পরেও বাতাসে যে ভালোবাসার আভাস পাওয়া যায়।
টিকাঃ
প্রকৃত ও বৃহত্তর ভালোবাসা হলো: আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। কারণ তিনিই অনুগ্রহ করে আমাদের ভালোবাসার মানুষ এবং ভালোবাসার জিনিসগুলি দান করেছেন। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা উপলব্ধি ও প্রকাশ কোনো দিন বা সময়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। তার উপযুক্ত সময় এখনই – এ মুহূর্তে – (সম্পাদক)।
📄 ভালোবাসার সন্ধানে
আমি আমার গোটা জীবন সৃষ্টির পেছনে ছুটে কাটিয়েছি। আসলে আমি এমন একজন, যাকে আপনারা 'কাঙাল' বলে থাকেন। আমি বন্ধু-বান্ধবের কাঙাল, আমি লোকজনের সঙ্গের কাঙাল। হতাশাকে কিভাবে সামাল দিতে হয়, আমি তা জানি না।
আমাদেরকে সৃষ্টির পেছনে তাড়িয়ে বেড়ানোর মূলে ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। ভালোবাসার আদান ও প্রদানের এই জরুরত, আসলে সৃষ্টিকর্তা আমাদের মাঝে ঢেলে দিয়েছেন। প্রতিটি প্রয়োজন, যা আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন, তার পেছনে রয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্য। ভালোবাসার এই আদান ও প্রদানকে একটা চালিকা শক্তি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ এমনই এক চালিকা শক্তি, যা আমাদেরকে আল্লাহর কাছে টেনে নেয়। আপনি দেখুন, আমাদের সূচনা হয়েছে আল্লাহর দ্বারা এবং আল্লাহ চান আমরা যেন আখিরাতে তাঁর কাছে ফেরার আগেই এই দুনিয়াতেই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। তাই তিনি আমাদের অন্তরে বিভিন্ন চালিকা শক্তি স্থাপন করেছেন, প্রতিনিয়ত যা আমাদের ফিরিয়ে নিতে চায়। ফিরিয়ে নিতে চায় আমাদের নিজ বাড়িতে।
কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, পথ চলতে চলতে আমরা পথের দিশা হারিয়ে ফেলি।
আমাদের মধ্যে (ফিরে আসার) এই তাড়নাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না, কিন্তু আমরা পথ হারাই। কারণ, আমরা ভুলভাবে এ চাহিদা পূর্ণ করতে চাই। আমরা ভুল জায়গায় এই চাহিদা পূরণ করতে চাই। আল্লাহই আমাদের মধ্যে এই চালক সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে সে আমাদের আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এর পরিবর্তে আমাদেরকে সে সৃষ্টির দিকে নিয়ে যায়। আর এখানেই আমরা পথ হারিয়ে ফেলি।
আমরা কেনইবা অন্যের পেছনে ছুটি? কেনইবা আমরা অর্থের পেছনে দৌড়াই? যশ-খ্যাতি কিংবা ক্ষমতার পেছনে কেন আমরা ছুটছি? আমরা এগুলোর পেছনে দৌড়াই, কারণ আমরা ভালোবাসা পেতে চাই, পেতে চাই সম্মান। আমরা ভাবি এগুলো অর্জন করতে পারলেই প্রেম-ভালোবাসা ও সম্মান উভয়ই আমাদের ভাগ্যে জুটবে।
অন্যদিকে জগৎ পরিচালিত হয় এক চিত্তাকর্ষক ফর্মূলায়। আর তা বেশ সরল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায় অধিকাংশ সময় আমরা এই ফর্মূলাটা ভুল বুঝি। হ্যাঁ, আমাদের সকলের মাঝেই একই তাড়না রয়েছে। কিন্তু (থাকলে কি হবে) মানুষ খুবই তাড়াহুড়োপ্রবণ। বিলম্বের চেয়ে তাৎক্ষণিক, অদৃশ্যের চেয়ে দৃশ্যমান, আত্মিক বিষয়ের চেয়ে বৈষয়িক বা বস্তুগত বিষয়ই আমরা পছন্দ করি। যা কিছু দেখা যায়, অনুভব করা যায় এবং ছোঁয়া যায়, সেগুলোর দিকেই আমরা হন্যে হয়ে ছুটি। আমরা তার দিকেই দ্রুত ধাবিত হই, যা আমাদের "ধারণায়” নিকটতর। আমরা এমনটা করি, কারণ মানুষ যেমন কাঙাল আর নির্ভরশীল, তেমনি সে বড়ই ধৈর্যহারা ও দুর্বল। যা কিছু নিকট, সহজ ও দ্রুততর, আমরা কেবল তার প্রতি ধাবিত হই।
তাই আমরা কেবল সৃষ্ট বস্তুর দিকে ছুটি।
দেখুন তো, আমরা ভাবি -এই দুনিয়ার পেছনে যতই দৌড়াবো, অন্যের ভালোবাসার পেছনে যতই ছুটবো এবং ধন, সৌন্দর্য আর প্রতিপত্তির পেছনে যতই হন্যে হয়ে দৌড়াবো, সেগুলো ততই আমাদের হাতের নাগালে আসবে। আমরা ভাবি, জিনিসটা আমরা যত ব্যাকুলভাবে চাইবো, সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়বে। যখন আমরা সেটা পাই না, তখন ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হই সৃষ্টিকর্তার প্রতি। যেন আমার চাওয়ার 'ব্যাকুলতাই' আমাকে ওই জিনিসটার যোগ্য দাবিদার বানিয়ে দিয়েছে।
এমন ভ্রান্ত হিসাব-নিকাশে আমরা যতই ডুবতে থাকি, নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমরা ততই ব্যর্থ হতে থাকি এবং ততই আমরা ভালোবাসা ও জিন্দেগির সত্য-সঠিক অথচ সরল সূত্র থেকে বিচ্যুত হতে থাকি। ওই সূত্রটি বেশ পরিষ্কার: আমরা যতই ব্যাকুলভাবে সৃষ্টিকে পেতে চাইবো, সেটা হাসিলের সম্ভাবনা আমাদের ততই হ্রাস পেতে থাকবে। আপনার যদি ভালোবাসার প্রয়োজন হয় এবং আপনি যদি সেটা সৃষ্টির কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন, 'সত্যিকার' অর্থে আপনি কখনোই সেটা পাবেন না, কিংবা সেটা যথেষ্টরূপে পাবেন না। সৃষ্টির যা কিছুই লক্ষ্য বানাবেন, সেটাই আপনার থেকে পালিয়ে বেড়াবে।
এবং সেটা কখনো আপনাকে তৃপ্ত করবে না।
এমনকি স্বয়ং সুখও -যতই আপনি তার পেছনে ছুটবেন, ততই তা আপনার থেকে কেবলই পালিয়ে বেড়াবে। কিন্তু আপনি যদি এসব বাদ দিয়ে মহান আল্লাহর পানে ছুটেন, সুখ আপনার পেছন পেছন দৌড়াবে। আপনি যদি মহান আল্লাহর দিকে ধাবিত হোন, মানুষের ভালোবাসা আপনার দিকে ধাবিত হবে। যদি আপনি মহান আল্লাহর দিকে দৌড়ান, সফলতা আপনার পিছে দৌড়াবে -এই দুনিয়া ও পরবর্তী জীবনের প্রকৃত সফলতা। আপনি আল্লাহর পানে ধাবিত হলে রিযিক আপনার পানে ছুটবে। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এটাই সে গোপন সূত্র যার জন্য অত্যাচারীরা জ্বালিয়ে দিয়েছে শহরের পর শহর, আর রাজারা খুঁজে বেড়িয়েছে দুনিয়া, কিন্তু পায়নি তার সন্ধান।
এটাই সেই গোপন রহস্য। এই ফর্মূলাই আপনার প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে সুগভীর জ্ঞানপূর্ণ একটি হাদিসে রয়েছে, এক লোক নবি (ﷺ)-এর কাছে এসে বলে: “হে আল্লাহর রসুল, আমাকে এমন এক আমলের সন্ধান দেন, যেটা করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবে এবং লোকজনও আমাকে ভালোবাসবে।” তিনি (ﷺ) বলেন: "দুনিয়া থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে।” [ইবনে মাজাহ]
পরিহাসের বিষয় হলো: আমরা লোকজনের স্বীকৃতি ও ভালোবাসার পেছনে ছুটানো কমাই, ততই আমরা সেগুলো পেতে শুরু করি। যতই আমরা অন্যের থেকে নির্লিপ্ত হই, ততই তারা আমাদের পানে ছুটে আসে এবং পেতে চায় আমাদের সান্নিধ্য। এই হাদিস আমাদেরকে এক নিগূঢ় সত্যের সাথে পরিচয় করায়। যখনই আমরা সৃষ্টি কেন্দ্রিক আবর্তনের এই কক্ষপথকে ভেদ করবো, কেবল তখনই আমরা আল্লাহ এবং মানুষ উভয়েরই সাথে সম্পর্কে সফলতা লাভ করবো।
আল্লাহর অভিমুখে ছুটাই হলো অন্তরের সজীবতা। আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন, সেগুলোর সাথে প্রাণপণ সংগ্রাম করাই তাঁর পানে ছুটা। আল্লাহর পানে দৌড়ানো মানেই অন্তরের গতিশীলতা। আপনি যদি এক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় হোন, তবে আপনি আল্লাহর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন না। আপনি অধঃপতিত হচ্ছেন। আল্লাহর অভিমুখে দৌড়ানো, তাঁর পানে ছুটে চলতে হলে জীবনের প্রতিটি চলমান মূহূর্তে নিজের অন্তরকে তাঁরই অভিমুখে ঝুঁকিয়ে দিতে হয়। প্রতিটি উদ্দেশ্য, প্রতিটি নিয়ত এবং প্রতিটি গন্তব্যকে আল্লাহমুখী করাই তাঁর পানে ছুটার মর্ম। আপনার সকল সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হবেন আল্লাহ। আপনার সংগ্রামের তিনিই নিমিত্ত। আপনার লড়াইয়ের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য তিনি। তাই আপনাকে অব্যাহতভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আপনার সাধ্য মতো শ্রেষ্ঠ মা হওয়ার সংগ্রাম, শ্রেষ্ঠ বাবা, শ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী, শ্রেষ্ঠ ছাত্র, কন্যা, পুত্র, কর্মজীবি - সবক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।
এসবই আমাদের নবিগণের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার, তাদের সকলের ওপর সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক। তাদের দেহ ছিল এই দুনিয়াতে সংগ্রামমুখর। নবি (ﷺ) ছিলেন সর্বোত্তম নেতা, সর্বোত্তম পিতা, সর্বোত্তম স্বামী এবং শ্রেষ্ঠ বন্ধু। তার দেহ ছিল এই দুনিয়াতে কঠোর পরিশ্রমরত, আর তার আত্মা সর্বাবস্থায় ছিল আল্লাহর সাথে। যদিও তার দেহ ছিল কিছু সময়ের জন্য এই দুনিয়াতে, কিন্তু তার আত্মা ছিল ইতোমধ্যেই আখিরাতের অভিমুখে। বস্তুত তার আত্মা নিজ আবাসেই ছিল। তার আত্মা জীবনের মায়াজাল ভেদ করে দেখতে সক্ষম হয়েছিল। তার অঙ্গ-প্রতঙ্গসমূহ কঠিন পরিশ্রম করেছে, খুবই কঠিন। তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন, কেঁদেছেন, তথাপি অবিরাম সংগ্রামে রত থেকেছেন। তার দেহ (তাহাজ্জুদে) দাঁড়িয়ে থেকেছে, এমনকি তার পা দুটো ফেটে গেছে। তার দেহ তায়েফের ময়দানে নির্যাতিত হয়েছে। তার দেহ নির্ঘুম থেকেছে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা, জ্বর, কষ্ট আর হারানোর বেদনাতে তিনি বারবার কাতর হয়েছেন।
এতো কিছুর পরও তার আত্মা ছিল কেবলই আল্লাহমুখী।
আর আল্লাহর সান্নিধ্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণা, কষ্ট এবং হারানোর বেদনা কিছুই না। একজন পিতা, একজন নেতা, একজন বন্ধু এবং একজন স্বামী হিসেবে তার এই দৈহিক সত্তাকে নানামুখী সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। যদিও তার দেহকে এইসব বহুমুখী সংগ্রামে রত থাকতে হয়েছে, তথাপি তার অন্তর আল্লাহর অভিমুখ থেকে একচুলও সরে আসেনি। এই দিকেই ফিরে ছিল তার পুরো সত্তা। তার অন্তর ছিল কেবলই আল্লাহমুখী। ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) কতই না সুন্দর করে বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরাচ্ছি, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আর আমি কোনো অবস্থাতেই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।”
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (কুরআন, ৬:৭৯)
ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) স্বীয় অন্তরকে পুরোপুরি আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ করেছেন। সম্পূর্ণভাবে। বিশুদ্ধভাবে। সম্পূর্ণ বিশুদ্ধভাবে। আপনার আত্মাকে আংশিকভাবে আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ করার পরিণামে শুধু কষ্টই ভোগ করতে হবে। আর সেই ভোগান্তি হবে আল্লাহর সমীপে আংশিক সমর্পণের পরিমাণ অনুযায়ী। আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনে জানিয়ে দিচ্ছেন:
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে (তথা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণে) দাখিল হও, আর শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ (কুরআন, ২:২০৮)
শুধু আংশিক আত্মসমর্পণেই নিহিত রয়েছে যন্ত্রণা। “শান্তি ও নিরাপত্তা” বলতে যা বুঝায়, তা আছে শুধুমাত্র আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মধ্যেই। নিজের গোটা সত্তাকে আল্লাহর আনুগত্যে সমর্পিত করার মধ্যে। আর আংশিক সেজদা (তথা আত্মসমর্পণে) আছে শুধুই যন্ত্রণা। নিজের অন্তরকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার মাঝে আছে শুধুই যন্ত্রণা, যদিওবা তা কেবল আংশিকভাবে হয়। ওই যন্ত্রণা অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না আপনি নিজের সম্পূর্ণ অন্তরকে 'কেবল' একটি দিকেই ফেরাচ্ছেন, যতক্ষণ না আপনি নিজের সম্পূর্ণ অন্তরকে 'কেবলই' মহান স্রষ্টার পানে নিবেদিত করছেন এবং যতক্ষণ না তিনি পরিণত হচ্ছেন আপনার সকল চেষ্টা ও সংগ্রামের মূল লক্ষ্যে।
আমরা তো দিনে কম করে ১৭ বার হলেও বলি: "আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং আমরা শুধু আপনারই কাছে সাহায্য ভিক্ষা চাই।” (১:৫)। আল্লাহই সত্যিকার অর্থে চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং তিনিই হলেন ওই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রকৃত মাধ্যম। আল্লাহকে বাদ দিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছানো অলীক কল্পনা মাত্র। লা হাওলা ওয়া লা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ: “আল্লাহর সাহায্য ছাড়া (পাপ থেকে দূরে থাকার) কোনো উপায় এবং (সৎকাজ করার) কোনো শক্তি কারো নেই।”
এমনিভাবে যে নিজের অন্তরকে পূর্ণরূপে আল্লাহর পানে ঝুঁকিয়ে দেয়, সেই সত্যিকারের মুক্তির স্বাদ পায়। আর তখন ওই ব্যক্তি সৃষ্টির দ্বারা কোনো ক্ষতির মুখোমুখি হয় না। আগুন নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। যার অন্তর শুধু আল্লাহর পানে নিবিষ্ট, সৃষ্টির “আগুন” (তথা ক্ষতি”) তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর্থিক, দৈহিক, আবেগপূর্ণ, সামাজিক এবং মানসিক কোনো আগুনই ওই ব্যক্তির কোনো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে না, যার অন্তর ‘কেবল' আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকে। হ্যাঁ, বাইরে থেকে তাকে ক্ষতিগ্রস্থই মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে ওই ব্যক্তি আদৌ ক্ষতির শিকার হননি। এমন পরিস্থিতির হাকিকত মূলত ক্ষতি নয়, বরং কল্যাণ, যেমনটি আমরা নবি (ﷺ)-এর বাণী থেকে জানতে পারি:
“ঈমানদারের বিষয়টি আসলেই অবাক করার মতো। সবকিছুতেই তার জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং এটা শুধু ঈমানদারের জন্যই। সে কোনো কল্যাণ লাভ করলে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, যেটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” [মুসলিম]
এই অনুগ্রহ কেবলই ঈমানদারের জন্যই। যার অন্তর সম্পূর্ণরূপে কেবল একটি দিকে ফিরে (তথা আল্লাহর দিকে) থাকে, এই অনুগ্রহ তারই জন্যে। মনে রাখবেন, আল্লাহ বলেন:
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে (তথা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণে) দাখিল হও, আর শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ (কুরআন, ২:২০৮)
শান্তি ও নিরাপত্তাতে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে। 'পূর্ণতার সাথে' যে প্রবেশ করে, সে-ই "পূর্ণ নিরাপত্তা" লাভ করে। মনে রাখবেন অন্তর কোনো নিশ্চল-স্থির সত্তা নয়। স্বয়ং সংজ্ঞা মোতাবেক যা পরিবর্তিত হয়, তাই অন্তর (এই কারণে অন্তরের আরবি শব্দ 'কুলবে'র উৎপত্তি ওই ধাতু থেকে হয়েছে, যার মর্ম 'পরিবর্তিত হওয়া')। অন্তর তাই যা পরিবর্তিত হয়, ঝুঁকে পড়ে। তাই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্তরকে প্রতিনিয়ত মনোযোগের চূড়াতে ফিরিয়ে আনা, কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা এবং আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করানো।
আর এই কাজে আমরা প্রতিনিয়ত আল্লাহর সাহায্য কামনা করি, যেমনিভাবে নবি (স) সর্বদা দু'আ করতেন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ “হে অন্তরের পরিবর্তনকারী, আমাদের অন্তরকে আপনার দ্বীনে (পথে) দৃঢ় রাখুন।"
বারবারের এই নবায়নকৃত অবস্থাই তওবা, প্রত্যাবর্তন। বারবার, বারবার এবং বারবার, যতক্ষণ না আমরা স্রষ্টার সামনে উপস্থিত হচ্ছি। সেই তো ব্যর্থ, যে এই সংগ্রাম ছেড়ে পালায়। আত্মতুষ্টি বা হতাশার কারণে অন্তরকে (স্রষ্টার প্রতি) মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে যে হাল ছেড়ে দেয়, কেবল সেই এই দুনিয়া ও আখিরাতে ব্যর্থ হয়।
আমরা সবাই ভালোবাসা চাই। চাই আল্লাহ ও সৃষ্টির কাছ থেকে এই ভালোবাসা পেতে। আমরা সবাই কিছু না কিছুর পেছনে ছুটছি। পরিহাসের বিষয় হলো, যতই আমরা সৃষ্টির পেছনে দৌড়াই না কেন, সৃষ্টি ততই আমাদের কাছে থেকে দূরে সরে যেতে থাকে! যখনই আমরা সৃষ্টির পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করি এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হই, তখন সৃষ্টিই আমাদের পেছনে ছুটতে আরম্ভ করে। এটা নিতান্তই সহজ ও সরল একটা সূত্র:
সৃষ্টির পেছনে দৌড়ান, সৃষ্টি ও স্রষ্টা উভয়কেই হারাবেন। স্রষ্টার দিকে ধাবিত হোন। আপনি স্রষ্টা 'এবং' সৃষ্টি উভয়কেই পাবেন।
আল্লাহ হলেন 'আল-ওয়াদুদ' (ভালোবাসার উৎস)। এ কারণে স্রষ্টার কাছ থেকেই ভালোবাসা উৎসারিত হয়, মানুষের কাছ থেকে নয়। আরেক লেখক চার্লস এফ হানেল বিষয়টিকে এভাবে বলেছেন, "ভালোবাসা পেতে হলে ... নিজেকে ভালোবাসায় পূর্ণ করুন, যতক্ষণ না আপনি চুম্বকে রূপান্তরিত হচ্ছেন।”
যখন নিজেকে আপনি পূর্ণ করবেন সকল ভালোবাসার উৎস আল-ওয়াদুদ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা দিয়ে, তখন আপনি পরিণত হবেন ভালোবাসার চুম্বকে। ভীষণ সুন্দর এক হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ আমাদেরকে এটার শিক্ষা দিয়েছেন:
"আল্লাহ যখন তাঁর কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তিনি তখন জিব্রাইল (আলাইহিস সালাম)-কে ডেকে বলেন: 'আমি অমুককে ভালোবাসি, তাই তাকে ভালোবাসো।" নবি (ﷺ) বলেন: “তখন জিব্রাইল ওই বান্দাকে ভালোবাসে। এরপর সে আসমানে চিৎকার করে বলতে শুরু করে: 'আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসে, তাই তোমরাও তাকে ভালোবাসো।' আসমানের অধিবাসীগণ তখন ওই বান্দাকে ভালোবাসে। নবি (ﷺ) বলেন: “এরপর দুনিয়াতে তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।” [মুসলিম, বুখারি, মালিক ও তিরমিযি]
আমরা সবাই ছুটছি। কিন্তু আমাদের মধ্য থেকে খুব কম লোকই সঠিক গন্তব্যের পানে ছুটছে। আমাদের সবার উদ্দেশ্য এক। কিন্তু সেখানে যেতে হলে আমাদেরকে থামতে হবে। আমাদেরকে যাচাই করে দেখতে হবে, আমরা কি উৎসের দিকে দৌড়াচ্ছি নাকি মরীচিকার দিকে ছুটছি।
টিকাঃ
- (সম্পাদক)।
- (সম্পাদক)।
২০ - (সম্পাদক)।
📄 এরই নাম ভালোবাসা
আর এমনও মানুষ আছেন, যারা তাদের সারাটা জীবন কেবল অনুসন্ধান ও তালাশের পেছনে কাটিয়ে দেন। কখনো দেন, কখনো নেন। কখনো বা কোনো কিছুর পেছনে ছুটেন, তবে প্রায়শই অপেক্ষায় কাটিয়ে দেন। তারা মনে করেন, ভালোবাসা একটা স্থানের নাম, যাতে পৌঁছাতে হয়: এমন এক গন্তব্য, যার অবস্থান এক লম্বা পথের শেষ প্রান্তে। লক্ষ্যে উপনীত হয়ে এ পথের সমাপ্তি ঘটার জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। এরা হচ্ছে ওইসব লোক, যারা আত্মার আন্দোলনে প্রবলভাবে আন্দোলিত হোন। এরা আশাহত রোমান্টিকের দল, সেই সব অতি সরল মানুষ, যারা কোনো প্রেম কাহিনী অথবা ভক্তির আন্তরিক অভিব্যক্তিতে আপুত থাকেন। তাদের জন্য এই অনুসন্ধান জীবনব্যাপী মোহের মতো। কিন্তু বিয়োগান্তক এই 'অনুসন্ধানে'র জন্যও মূল্য দিতে হয়, আবার অন্যদিকে এর ফায়দাও রয়েছে।
প্রত্যাশা এবং 'ভালোবাসার প্রেমে পড়ে যাওয়া' সত্যই যন্ত্রণার এক পথ, তথাপি এই পথে চলে যথেষ্ট শিক্ষাও লাভ করা সম্ভব। ভালোবাসার প্রকৃতি, এই দুনিয়া, এখানের লোকজন এবং নিজের আত্মা প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা এই যন্ত্রণাদায়ক পথের আস্তর তৈরি করে। সর্বোপরি ভালোবাসা জিনিসটা স্রষ্টা সম্পর্কে এই পথে তার নিজস্ব শিক্ষাও বয়ে আনতে পারে।
যারা এই পথ বেছে নেয়, প্রায়শই তারা এই জ্ঞান লাভ করে যে, মানুষের ভালোবাসা -যা তারা অন্বেষণ করছে, সেটা সত্যিকার লক্ষ্য নয়। কিছু মানবীয় প্রেম আশীর্বাদ হতে পারে, তা (জীবন পথের) একটা উপকরণ হতে পারে, কিন্তু যখনই আপনি সেটাকে লক্ষ্যে পরিণত করবেন, তখনই আপনার পতন ঘটবে। একটি ভুল বস্তুতে নিজের মনোযোগকে নিবিষ্ট করে আপনি তখন আপনার গোটা জীবন কাটাতে থাকবেন। "উপকরণ"-এর স্বার্থে আপনি নিজের "উদ্দেশ্য”-কে পর্যন্ত বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত হবেন না। আপনি তখন দুনিয়াবী পূর্ণতার এক অবাস্তব 'গন্তব্যে' পৌঁছানোর জন্য আপনার জীবন শেষ করবেন।
আর যে মরীচিকার পেছনে ঘুরে, সে কখনো তার নাগাল পায় না, বরং সে অনবরত ছুটতেই থাকে। একইভাবে আপনিও কেবলই ছুটতে থাকবেন, প্রস্তুত থাকবেন নিদ্রা বিসর্জন দিতে, কাঁদতে, রক্তাক্ত হতে এবং আপন সত্তার মূল্যবান অংশ এমনকি ওই সময়টিতে নিজের আত্মমর্যাদাকে উৎসর্গ করতেও আপনি পিছপা হবেন না। এই দুনিয়াতে আপনি যা খুঁজে ফিরছেন, তার নিকটে কখনোই পৌঁছাতে পারবেন না। কেননা, আপনি যা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, সেটা দুনিয়াবী কোনো লক্ষ্য নয়। আপনি যে ধরনের পূর্ণতার সন্ধান করছেন, সেটা এই বস্তুগত দুনিয়াতে কখনোই পাবেন না। সেটা কেবল আল্লাহর মাঝেই খুঁজে পাওয়া যাবে।
আপনি মানবীয় প্রেমের যে ছবি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, সেটা জীবন নামক মরুভূমিতে একটা মরীচিকা বৈ কিছুই নয়। এটাই যদি হয় আপনার অনুসন্ধান, তবে আপনি এর পেছনে কেবল ছুটেই যাবেন। মরীচিকার যত কাছেই আপনি যান না কেন, সেটাকে তো আর আপনি ছুঁয়ে দেখতে পারবেন না। আপনি কোনো কল্পনার ছবির মালিক হতে পারেন না। আপনি নিজের মনের সৃষ্ট কোনো কাল্পনিক জিনিসকে ধরে দেখতে পারেন না।
এতো কিছুর পরেও আপনি নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেবেন শুধু ওই ‘স্থানে’ পৌঁছানোর জন্য। আপনি এমনটি করেন, কারণ রূপকথার গল্পে সেখানেই ওই কাহিনী শেষ হয়। সেখানে সমাপ্তি হয় সন্ধান লাভ, মিলন ও বিবাহের মধ্য দিয়ে। দুটো আত্মার মিলনের মধ্যে এই স্থানের সন্ধান মিলে। আপনার আশেপাশের সবাই আপনাকে ধারণা দেবে যে, যেখানে আপনি আপনার মনের মানুষের সন্ধান পান, খুঁজে পান আপনার অর্ধাঙ্গকে এবং পথের যে সীমানায় গিয়ে আপনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন, সেখানেই আপনার পথের সমাপ্তি। এরপর এবং কেবল এরপর তারা আপনাকে বলবে, হ্যাঁ, তুমি এবার সম্পূর্ণ হয়েছো। নিশ্চিতভাবে এটা মিথ্যা। কেননা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে কখনোই পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব নয়।
তথাপি একেবারে শিশুকাল থেকেই প্রতিটি গল্পে, প্রতিটি গানে, প্রতিটি চলচ্চিত্রে, প্রতিটি বিজ্ঞাপনে এবং প্রত্যেক শুভানুধ্যায়ী খালা-চাচীগণ আপনাকে শুধু এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, এসব ছাড়া আপনি অসম্পূর্ণ। আল্লাহ না করুক, আপনি যদি হোন 'হতভাগ্য' কোনো অবিবাহিত বা তালাকপ্রাপ্ত কেউ, তবে আপনাকে কোনো না কোনোভাবে অসম্পূর্ণ অথবা ত্রুটিপূর্ণ মানুষ মনে করা হয়।
আপনাকে শেখানো হয় যে, বিবাহের মাধ্যমে কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে এবং তখনই জান্নাতের সূচনা ঘটে। তখনই আপনি মুক্তি পাবেন, পূর্ণ হবেন এবং যা এক সময় ভেঙে গিয়েছিল, তার সবই ওই সময় ঠিক হয়ে যাবে। একমাত্র সমস্যা হলো যে, এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। বরং এখান থেকেই কাহিনীর শুরু। এখান থেকেই হয় গড়ে ওঠার সূচনা: গড়ে উঠে জীবন, গড়ে উঠে আপনার চরিত্র, গড়ে উঠে মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি: সবর, ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং কুরবানির ভিত্তি। গড়ে উঠে আত্মত্যাগের মতো মহান এক গুণ। গড়ে উঠে সত্যিকার ভালোবাসা।
এবং সেই সাথে গড়ে উঠে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার রাস্তা।
কিন্তু আপনি যাকে বিবাহ করেছেন, আপনার সমগ্র মনোযোগ যদি তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়, তবে আপনার দুর্দশার সূচনা হলো মাত্র। আপনার স্বামী বা স্ত্রীই তখন আপনার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার ক্ষেত্রে পরিণত হবে। যতক্ষণ না আপনার অন্তরের যে স্থানে কেবল আল্লাহরই থাকার কথা, সেই স্থান থেকে ওই মানুষটিকে না সরাবেন, ততক্ষণ তা আপনাকে কেবল যন্ত্রণাই দিয়ে যাবে। পরিহাসের বিষয় হলো, আপনার স্বামী বা স্ত্রীই হবে এই যন্ত্রণাদায়ক নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার হাতিয়ার এবং তা চলবে যতক্ষণ না আপনি উপলব্ধি করছেন যে, মানব হৃদয়ে এমন কিছু স্থান আছে, যা আল্লাহ তা'আলা শুধু তাঁর নিজের জন্যই বানিয়েছেন।
লাভ-লোকসান, সফলতা-ব্যর্থতা এবং হাজারো ভুলের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আপনি অন্যান্য শিক্ষার সাথে সাথে অপর যে শিক্ষা লাভ করেন, তা হচ্ছেঃ অন্ততপক্ষে দু' ধরনের ভালোবাসা রয়েছে। এমনকিছু মানুষ রয়েছে, যাদের আপনি ভালোবাসেন। কারণ আপনি তাদের থেকে কিছু পান – তারা আপনাকে যা দেয় কিংবা তারা আপনার মধ্যে যে ধরনের আবেগ-অনুভূতি সৃষ্টি করে (তার কারণে আপনি তাদেরকে ভালোবাসেন)। বেশিরভাগ ভালোবাসাই সম্ভবত এমন ধরনের হয়ে থাকে, যা ভালোবাসার একটা বড় অংশকেই এতো অস্থিতিশীল করে ফেলে। একজন মানুষের দেওয়ার ক্ষমতা অস্থিতিশীল ও পরিবর্তনশীল। আপনাকে যা দেওয়া হচ্ছে, তার প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়াও অস্থিতিশীল ও পরিবর্তনশীল। তাই আপনি যদি কোনো একটা বিশেষ আবেগের পেছনে ছুটতে থাকেন, তবে আপনি সেটার পেছনেই আজীবন হন্যে হয়ে ছুটবেন। কোনো আবেগই স্থির নয়। আর প্রেম-ভালোবাসা যদি হয় এরই ওপর নির্ভরশীল, সেটাও হয়ে পড়বে অস্থিতিশীল ও পরিবর্তনশীল। এই দুনিয়ার সবকিছুর মতো, যতই আপনি এসবের পেছনে দৌড়াবেন, ততই সেগুলো আপনার থেকে দূরে সরে যাবে।
কিন্তু কখনো কখনো আপনার জীবনে এমন কিছু কিছু মানুষ আসে, যাদের আপনি ভালোবাসেন - তারা কেমন সেই ভিত্তিতে, তারা আপনাকে কি দিল, সেজন্য নয়। তাদের মধ্যে যে সৌন্দর্য আপনি উপলব্ধি করেন, তা মহান সৃষ্টিকর্তার সৌন্দর্যের প্রতিফলন মাত্র। এজন্যই আপনি তাদের ভালোবাসেন। আর তখন সহসাই আপনি কি পাচ্ছেন, সে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, বরং মুখ্য হয়ে উঠে আপনি তাদেরকে কি দিতে পারছেন, সেটা। এটাই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এটাই দ্বিতীয় ধরনের ভালোবাসা, যেটা খুবই দুষ্প্রাপ্য। এই ভালোবাসা যদি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে হয় এবং যদি তা কখনো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে, তবে এ ধরনের ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি আনন্দ উপহার দেয়। এমন প্রেম ছাড়া অন্যসব প্রেমই ভিক্ষুকে পরিণত করে, বানায় নির্ভরশীল এবং সৃষ্টি করে অসম্ভব সব প্রত্যাশা - যা হলো: যাবতীয় যন্ত্রণা এবং নৈরাশ্য সৃষ্টির উপাদান।
যারা তাদের গোটা জীবন কেবল খুঁজে ফিরছেন, তারা নিশ্চিন্তে জানবেন যে, যেকোনো জিনিসের বিশুদ্ধতা পাওয়া যাবে কেবল তার উৎসে। আপনি যদি ভালোবাসারই সন্ধান করেন, তবে আল্লাহর মাধ্যমেই তা খুঁজুন। আল্লাহর প্রেমের ভিত্তি ছাড়া যত ঝর্ণা আছে, তার সবই পানকারীর মধ্যে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে দেয়। পানকারী তা পান করতেই থাকবে, যতক্ষণ না বিষক্রিয়ায় সে মারা পড়ছে। আত্মিকভাবে সে কেবল মারা যেতেই থাকবে, যতক্ষণ না সে থামছে এবং বিশুদ্ধ পানির ঝর্ণা খুঁজে পাচ্ছে।
যখন আপনি সুন্দর সবকিছুকে আল্লাহর সৌন্দর্যের প্রতিফলন ভাবতে শুরু করেন, তখনই আপনি সঠিক পথে অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসতে শিখেন। তখন আপনি যা কিছু ভালোবাসেন এবং যাকেই ভালোবাসেন না কেন, তা হবে আল্লাহরই জন্য, আল্লাহরই মাধ্যমে এবং আল্লাহরই কারণে। এমন ভালোবাসার বুনিয়াদ হলেন আল্লাহ তা'আলা। এ ধরনের ভালোবাসাতে আপনি যা আঁকড়ে ধরেন, না সেটা কোনো অস্থির আবেগ, আর না সেটা ক্ষণস্থায়ী কোনো অনুভূতি। আর যার দিকে আপনি ধাবিত হচ্ছেন, তা আর কোনো সাময়িক মত্ততা নয়। এমন অবস্থায় আপনি যা আঁকড়ে ধরেন, যার পেছনে আপনি ছুটেন এবং যা আপনি ভালোবাসেন, তার সবটুকুই আল্লাহ কেন্দ্রিক: যিনি হলেন একমাত্র স্থিতিশীল ও অবিচল সত্তা। অতঃপর, আর যা কিছুই ঘটবে, তার সবই হবে আল্লাহর মাধ্যমে। আপনি যা কিছু দিবেন অথবা নিবেন, ভালোবাসবেন অথবা ঘৃণা করবেন, তার সবই হবে আল্লাহর অধীন (অর্থাৎ তাঁর হেদায়েত অনুযায়ী) ২৪। এগুলোর কিছুই আপনার নফসের অনুসরণে হবে না। সবই হবে মহান স্রষ্টার জন্য নিবেদিত। কিছুই আপনার নফসের খায়েশের জন্য নয়।
এসবের মর্ম দাঁড়াচ্ছে, আপনি তা-ই ভালোবাসবেন, যা আল্লাহ ভালোবাসেন এবং যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তা আপনিও কোনো অবস্থাতেই ভালোবাসবেন না। আর যখন আপনি এভাবে ভালোবাসবেন, তখন সৃষ্টিকে দান করবেন, তার থেকে প্রতিদানে কি পাবেন, তার আশায় নয়। আপনি ভালোবাসবেন, আপনি বিলিয়ে যাবেন, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার প্রয়োজন মেটানো হবে। আর যার প্রয়োজন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা মেটান, সকল প্রেমিকের মাঝে সেই তো সবচেয়ে ধনী ও মহৎ। আপনার ভালোবাসা হবে আল্লাহরই অধীন, আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহরই কারণে। এটাই সৃষ্ট বস্তুর দাসত্ব থেকে আত্মার মুক্তি। এটাই প্রকৃত স্বাধীনতা। এটাই প্রকৃত সুখ। এটাই প্রকৃত ভালোবাসা।
টিকাঃ
২৪ - (সম্পাদক)।