📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 অন্তরের কর্তৃত্ব নিজের কাছে ফিরিয়ে নেন

📄 অন্তরের কর্তৃত্ব নিজের কাছে ফিরিয়ে নেন


কেউই ব্যর্থ হতে চায় না। আর খুব কম মানুষই ডুবে যাওয়ার ভাগ্যকে বরণ করে নিতে চাইবে। উত্তাল সমুদ্রের এই জীবন পাড়ি দিতে গেলে কখনো কখনো দুনিয়াকে প্রবেশ করতে না দিয়ে পারা যায় না। কখনো দুনিয়া আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে দুনিয়া আমাদের অন্তরে ঢুকে পড়ে।

আর যেমনিভাবে পানি নৌকাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, তেমনিভাবে দুনিয়া যখন অন্তরে প্রবেশ করে, তখন তা অন্তরকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। সাম্প্রতিককালে ভাঙা নৌকা দেখতে কেমন, তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়; যখন আপনি [দুনিয়ার] সবকিছুকে অন্তরে প্রবেশ করতে দেবেন, তখন কি পরিণতি ঘটে, সেটা আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। আমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, কারণ আমি আমারই মতো একজনকে দেখলাম, যে কিনা এই জীবনের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত মহব্বতে আসক্ত এবং সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে তৃপ্ত করার বাসনায় সে ব্যাকুল। দুনিয়ার সমুদ্র ঠিক যেভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল আমার নৌকাকে, ঠিক সেভাবে তার নৌকাকেও চূর্ণবিচূর্ণ করে এবং সে অথৈ পানিতে পড়ে। কিন্তু সে দীর্ঘ সময় তাতে নিমজ্জিত ছিল, আর কিভাবে সে অতল গহ্বর থেকে উঠে আসবে কিংবা কিসের ওপর ভর দিতে হবে, সেটা তার জানা ছিল না।

তাই সে নিমজ্জিত হলো [এবং দুনিয়া তাকে গ্রাস করে নিলো]।

আপনি যদি দুনিয়াকে আপনার অন্তরে প্রবেশ করতে দেন, তবে সমুদ্র যেমনিভাবে নৌকাকে নিমজ্জিত করে, ঠিক তেমনিভাবে দুনিয়াও আপনার অন্তরকে গ্রাস করে ফেলে। আপনি ডুবে যান সমুদ্রের অতল গহ্বরে, এমনকি সমুদ্রের গহীন তলদেশে। আপনি অনুভব করেন যে, আপনি আপনার নিম্নতর স্তরে পৌঁছে গেছেন। পাপ আর এ জীবনের মহব্বতের জালে আপনি আটকে পড়ে অনুভব করবেন হতাশার কালো মেঘ আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, আপনাকে ঘিরে ধরেছে অন্ধকার। সমুদ্রের তলদেশের বৈশিষ্ট্য এটাই। কোনো আলো সেখানে পৌঁছে না।

যাহোক এই আঁধারঘন স্থানই কিন্তু আপনার জীবনের শেষ অবস্থান নয়। মনে রাখবেন, রাতের আঁধারই ভোরের আলোর পথ দেখায়। যতক্ষণ বইছে আপনার হৃদয়ের স্পন্দন, ততক্ষণ আপনি মৃত নন। আপনাকে এখানেই মরতে হবে না। কখনো কখনো সমুদ্র তলদেশ যাত্রাপথের বিরতির মতো। আর যখনই আপনি আপনার সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছে যান, তখনই আপনার দুটো বিকল্পের একটা গ্রহণের সুযোগ এসে যায়। আপনার হাতে দুটো সুযোগ আছে। হয় আপনি সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তলদেশেই পড়ে থাকবেন; আর না হয় সেখান থেকে মণি-মুক্তা আহরণ করে আবার উঠে দাঁড়াবেন -সাঁতারের এ অভিজ্ঞতা আপনাকে করবে দৃঢ়তর, আর সে রত্নরাজি আপনাকে করে তুলবে আগের চেয়ে ধনী (বিজ্ঞতা ও পরিপক্কতায়)।

আপনি যদি আল্লাহকে চান, তবে তিনি আপনাকে সে অবস্থা থেকে তুলে আনবেন এবং সমুদ্রের তলদেশের আঁধারকে তিনি বদলে দেবেন তাঁর পক্ষ থেকে সূর্যের আলোর উজ্জ্বলতা দিয়ে। যা ছিল এক সময় আপনার চরম দুর্বলতা, তিনি পারেন সেটাকে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করতে। বানিয়ে দিতে পারেন সেটাকে আপনার সমৃদ্ধি, পরিশুদ্ধি এবং পরিত্রাণের মাধ্যম। মনে রাখবেন, কখনো কখনো পতন দিয়েই রূপান্তরের সূচনা ঘটে। তাই পতনকে কখনো অভিশাপ দেবেন না। কেননা, জমিনের বুকেই নিহিত রয়েছে নম্রতা ও বিনয়। এটাকে মেনে নেন। এটা থেকে শিক্ষা নেন। নিঃশ্বাসের সাথে একে নিজের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নেন। আরও শক্তিশালী, আরও বিনয়ী হয়ে ফিরে আসুন। আল্লাহর প্রতি আপনার নির্ভরশীলতার ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন হয়ে ফিরে আসুন। নিজের অসহায়ত্ব ও তার মহিমা দেখার পর ফিরে আসুন। জেনে রাখুন, আপনি যদি ওই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন, তবে অনেক কিছুই আপনার দেখা হয়েছে। সেই তো সত্যিকার প্রতারণার শিকার হয়েছে, যে নিজ সত্তাকে দেখেছে, কিন্তু স্রষ্টার দেখা পায়নি। বঞ্চিত তো সে, স্বীয় অন্তরে স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তার যে ব্যগ্র কামনা সুপ্ত আছে, তা যার নজরে কখনো পড়ে না। নিজের মাধ্যম বা উপায়ের ওপর সে আস্থাবান, কিন্তু ওই মাধ্যম, তার আত্মা এবং অস্তিত্ববান যাবতীয় বিষয় যে আল্লাহর সৃষ্টি, এটা সে একদমই ভুলে যায়।

স্রষ্টা যেন আপনাকে ওই পতিত অবস্থান থেকে উচ্চে তুলে আনেন, সেটা তাঁর কাছে চান। কেননা, যখন তিনি আপনাকে তুলে আনবেন, তখন আপনার [ভাঙা নৌকা বা] জাহাজটি তিনি মেরামত করে দেবেন। চিরকালের জন্য যে অন্তর ভেঙে চুরমার হয়েছে ভেবে আপনি বসে আছেন, তা আবারো জোড়া লাগবে। যা কিছু ভেঙে খান খান, তা আবার পূর্ণ হবে। জেনে রাখুন, কেবল তিনিই পারেন এগুলো করতে। তাই কেবল তাঁকেই খুঁজে বেড়ান।

যখন তিনি আপনাকে রক্ষা করেন, তখন [নিজের] ওই পতনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, গভীর অনুশোচনা বোধ করুন, কিন্তু হতাশার চাদর গায়ে জড়াবেন না। যেমনটি ইবনে কাইয়্যিম (র.) বলেন: “আদম (আলাইহিস সালাম) যখন জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হন, তখন শয়তান আনন্দ উপভোগ করে। কিন্তু সে জানে না, ডুবুরি যখন সমুদ্রে ডুব দেয়, তখন সে মণি মুক্তা সংগ্রহ করে পুনরায় উপরে ফিরে আসে।"

তওবা (ক্ষমা) ও আল্লাহ (স) তায়ালার কাছে প্রত্যাবর্তন করার মাঝে এক শক্তিশালী ও বিস্ময়কর জিনিস নিহিত রয়েছে। আমাদের পূর্ববর্তীরা আমাদের বলেছেন যে, এটা আত্মার পোলিশ (Polish) বা পরিশুদ্ধির ন্যায়। পালিশ করার অবাক করা দিক হচ্ছে, এটা কেবল পরিষ্কার ও স্বচ্ছই করে না, বরং যে জিনিসকে পালিশ করা হয়, সে জিনিস ময়লা হয়ে যাওয়ার আগের থেকে আরও বেশি উজ্জ্বল ও ঝকমকে হয়। আপনি যদি আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করেন, তাঁর ক্ষমা ভিক্ষা চান এবং তাঁর দিকে নিজের জীবন এবং অন্তরকে পুনরায় নিবদ্ধ করেন, তবে অধঃপতিত হওয়ার আগে আপনি যে অবস্থায় ছিলেন, সে অবস্থার চেয়ে আরও সমৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখেন। অধঃপতিত হওয়ার ফলে কখনো কখনো এমন প্রজ্ঞা ও বিনম্রতা অর্জিত হয়, যা এটার আগে কখনো অর্জিত হয় না। ইবনে কাইয়্যিম (র.) লিখেন:
"আমাদের একজন সালাফ (সদাচারী পূর্বসূরি) বলেন: 'প্রকৃতপক্ষে, বাস্তব কথা হলো একজন বান্দার একটি গোনাহ বা পাপের মাধ্যমে একজন জান্নাতে প্রবেশ করে। আবার অপরজন একটি পুণ্যের কাজ করে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করে।' তাকে প্রশ্ন করা হলো: 'কিভাবে এটা?' এর উত্তরে তিনি বলেন: 'যে পাপ করে, প্রতিনিয়ত সে এটা নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ থাকে, যার ফলে সে এ বিষয়ে ভয় পেতে শুরু করে, অনুশোচনা করে, এটার জন্য কান্না-কাটি করে এবং এই পাপের কারণে সে স্বীয় প্রতিপালক, মহাপবিত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে লজ্জা বোধ করে। সে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, এক ভগ্ন হৃদয় নিয়ে এবং তার মাথা থাকে বিনয়ে অবনত। তাই এই পাপ তার জন্য বহু ইবাদত করার চেয়ে বেশি উপকার বয়ে আনে, যেহেতু এটা তাকে বানিয়েছে নম্র ও বিনয়ী এবং এটা বান্দার জন্য সুখ ও সাফল্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এমনকি ওই পাপ তাকে জান্নাতে প্রবেশের কারণে পরিণত হয়। অন্যদিকে, যিনি ভালো কাজ করলেন, তার করা ওই ভালো কাজটিও যে স্রষ্টারই একটি অনুগ্রহ, তিনি সেটা মনে করেন না, উল্টো তিনি অহংকারে মেতে উঠেন এবং নিজেকে নিয়ে চমৎকৃত বোধ করতে থাকেন, বলতে থাকেন, 'আমি এই এই অর্জন করেছি।' এটা তার মাঝে আরও বেশি করে আত্ম-তোষণ, গর্ব ও অহংকার উসকে দেয় এবং এটা তার ধ্বংসাত্মক পরিণতির কারণে পরিণত হয়।"

আল্লাহ (সুবঃ) কুরআনে আমাদেরকে সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যেন আমরা কখনো আশা না হারাই। তিনি বলেন: “বলো: হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছো, তারা আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা, আল্লাহই সকল পাপ মোচন করেন। তিনিই সর্বময় ক্ষমার আধার ও সবচেয়ে দয়াময়।” (কুরআন, ৩৯:৫৩)

তাই যারা স্বীয় সত্তার স্বেচ্ছাচারীতায় সেটার দাসে পরিণত হয়েছেন, নফসানিয়াতের অন্ধকূপ ও কামনা-বাসনায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন, এটা তাদেরকে [জাগ্রত করার] ডাক। যারা দুনিয়ার সমুদ্রে প্রবেশ করেছেন, যারা এটার গহীনে ডুবে গেছেন এবং এটার উত্তাল তরঙ্গে আটকা পড়ে আছেন, এ আহ্বান তাদের প্রতি। উঠুন। উঠে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেন এবং সমুদ্রের কারাগার থেকে বেরিয়ে সত্যিকার দুনিয়ায় আসুন। নিজের মুক্তির জন্য উঠুন। উঠুন আর ফিরে আসুন জীবনের আঙ্গিনায়। স্বীয় আত্মার মৃত্যুকে পেছনে ফেলে আসুন। আপনার আত্মা এখনো বাঁচতে পারে, হতে পারে আগের থেকে আরও বলিয়ান ও পরিশুদ্ধ। আর তওবা নামক পালিশ কি অন্তরকে আগের থেকে আরও সুন্দর করতে সক্ষম নয়? পাপ করে নিজের অন্তরের ওপর যে পর্দার আবরণ লাগিয়ে রেখেছেন, তা তুলে ফেলুন। জীবন ও নিজের মাঝে, আপনার ও মুক্তির মাঝে এবং আলো ও নিজের মাঝে যে পর্দা তৈরি করে রেখেছেন, সেটাকে সরিয়ে ফেলুন। পর্দার আবরণ সরিয়ে জেগে উঠুন। আপন সত্তার কাছে ফিরে আসুন। যেখান থেকে শুরু করেছেন, আবার সেখানে ফিরে আসুন। বাড়ি ফিরে আসুন। জেনে রাখুন, যখন সকল দরজা আপনার মুখের ওপর বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন একটি দরজা সর্বদাই খোলা থাকে। ওই দরজা সর্বদাই খোলা থাকে। সেটার অন্বেষণ করুন। তাঁকে খুঁজুন এবং তিনিই আপনাকে নির্মম সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন তাঁর অপার করুণার সূর্যের কাছে।

এই দুনিয়া আপনাকে ভাঙতে পারে না, যদি না আপনি তাকে সেটার অনুমতি দেন। দুনিয়া আপনাকে আয়ত্ত করতে পারে না, যদি না আপনি নিজে থেকে চাবির গোছা তার হাতে তুলে দেন, যদি না আপনি নিজের অন্তরকে দুনিয়ার হাতে তুলে দেন। যদি তেমনটিই হয়ে থাকে, যদি আপনি নিজের ওই চাবিগুলো কিছু সময়ের জন্য তুলে দিয়ে থাকেন দুনিয়ার হাতে, তবে সেটা ফিরিয়ে নেন। এটাই শেষ নয়। এ অবস্থাতেই আপনাকে মরতে হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। নিজের অন্তরকে পুনরুদ্ধার করুন এবং এটাকে তার উপযুক্ত মালিকের হাতে সমর্পণ করুন, আর সেই মালিক হলেন -আল্লাহ।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 প্রেম

📄 প্রেম


'অনুরাগ' ও 'প্রেম'কে একসাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। অনুরাগের সাথে ভয় ও নির্ভরশীলতা জড়িয়ে থাকে এবং এখানে থাকে অন্যের চেয়ে আত্মপ্রীতির আধিক্য। অনুরাগহীন প্রেমই নিখাঁদ প্রেম, কারণ এই প্রেমে থাকে না অন্যের থেকে পাবার বাসনা, যেহেতু আপনার অন্তর [সকল চাওয়া-পাওয়া থেকে] শূন্য। এই প্রেমে থাকে অন্যকে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কেননা, আপনি যে [রুহানিভাবে] পূর্ণ।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কয়েকদানা থেকে পলায়ন

📄 অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কয়েকদানা থেকে পলায়ন


সারা যখন আহমদকে দেখে, তখনই সে বুঝতে পারে। এতদিন যাবৎ সে যা যা স্বপ্ন দেখেছিল, আহমদের মাঝে তার সবই আছে। আহমদের সাথে সাক্ষাত ছিল তুষার ঝড়ের মাঝে সূর্যোদয়ের মতো। তার উষ্ণতা হিম-শীতল বরফকে গলিয়ে দেয়। শীঘ্রই এই গুণগ্রাহিতা উপাসনায় রূপ নেয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারা বন্দি হয়ে পড়ে। তার আরাধ্য জিনিসের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও কামনার জালে সে আটকা পড়ে। যে দিকে তাকায় সে আহমদ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। আহমদের অসন্তুষ্টিই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়। সারার সবটুকু জুড়ে ছিল আহমদ। আহমদ-বিহীন জীবনে সুখ বলে কিছু নেই, সে ছাড়া জীবন তো একেবারে নিরর্থক। তাকে ছেড়ে যাওয়া যেন সারার জীবন্ত অস্তিত্ব থেকে আত্মা বের হয়ে আসার মতো। তার হৃদয় জুড়ে আছে আহমদের চেহারাখানি এবং আহমদ ছাড়া সে কিছুই অনুভব করে না। সারার জীবনে আহমদ যেন ধমনীতে বহমান রক্তের মতো। (সারার কাছে) আহমদ ছাড়া বেঁচে থাকাটা অসহনীয়। কারণ, আহমদের সঙ্গ ছাড়া সুখ অস্তিত্বহীন।

সারা ভাবে সে প্রেমে পড়েছে।

সারা জীবনের বহু ঘাটের জল খেয়েছে। কিশোর বয়সে তার বাবা তাকে ছেড়ে চলে যায়। ১৬ বছর বয়সে সে বাড়ি থেকে পালায়। শুরু হয় মাদক ও মদের আসক্তির সাথে তার লড়াই। জেলের ঘানিও সে টেনেছে। যাইহোক, তার নিজের হাতে বানানো নতুন কয়েদখানার জ্বালা যে আগের সকল জ্বালা ও যন্ত্রণাকে হার মানাবে, শীঘ্রই সে তা টের পাবে। সারা নিজের কামনার বন্দীতে পরিণত হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া (র.) এই দাসত্বের কথা আলোচনা করে বলেন, “প্রকৃত কারারুদ্ধ তো সে-ই, যাকে আল্লাহর (নৈকট্য ও সান্নিধ্য) থেকে ফিরিয়ে রাখা হয়েছে এবং প্রকৃত বন্দী তো সে-ই, যার কামনা-বাসনা তাকে দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করেছে।” (ইবনে কাইয়্যিম, আল-ওয়াবিল, পৃ. ৬৯)

সারার এই আহমদ উপাসনা তার আগের সকল যন্ত্রনার চেয়েও মর্মকাতর। এটা তাকে গ্রাস করে, কিন্তু তাকে পূর্ণতা দেয় না। মরুভূমির মধ্যে পানিশূন্য পিপাসার্ত দগ্ধ একজন মানুষের মতো সারা মরীচিকার পেছনে ছুটে বেড়ায়। তার থেকে ভয়াবহ হলো- সেই যন্ত্রণা, যার উদ্ভব ঘটে যখন স্রষ্টার আসনে অন্য কিছুকে রাখা হয়।

সারার ঘটনা বেশ মর্মভেদী। কেননা, তা জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে চিত্রিত করে। মানুষ হিসেবে আমাদেরকে একটি বিশেষ সহজাত প্রবৃত্তি বা ফিতরাতের ওপর পয়দা করা হয়েছে। সেই ফিতরাত [বা সহজাত প্রবৃত্তি] হচ্ছে আল্লাহর একত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এই সত্যকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করা। ফলশ্রুতিতে, আমাদের জীবনে কিংবা আমাদের হৃদয়ে কোনো কিছুকে আল্লাহর সমতুল্য বানানোর যন্ত্রণার সামনে কিছুই তুল্য হতে পারে না। না কোনো মুসিবত, না কোনো লোকসান, আর না কিছুই এই যন্ত্রণার সামনে দাঁড়াতে পারে। যেকোনো পর্যায়ের শির্ক যেভাবে মানব আত্মাকে ভেঙে চুরমার করে, দুনিয়ার কোনো ট্রাজেডিই তেমনটি করতে পারে না। কোনো কিছুকে আল্লাহর মতো করে ভালোবাসা, ভক্তি করা কিংবা সেটার নিকট নিজেকে সঁপে দেওয়ার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে আপনি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যেটার জন্য আপনি সৃজিত হননি, আর না সেটা আপনার সহজাত প্রবৃত্তির অনুকূল। যদি এর বাস্তব চিত্র দেখতে চান, তবে ওই ব্যক্তির দিকে ভালো করে দেখুন, উপাসনার বস্তু হারালে কিভাবে সে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।

২০১০ সালের ২২ জুলাই দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া রিপোর্ট করে, ৪০ বছর বয়স্ক এক মহিলা নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে নিজ গৃহে আত্মহত্যা করে। পুলিশ জানায়, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে 'বিবাহের ১৯ পার হয়ে গেলেও কোনো সন্তান জন্ম দিতে না পারায় তিনি এ রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।'

এরকিছু দিন আগেই ১৬ জুলাই পুলিশের রিপোর্ট মোতাবেক ২২ বছরের এক ভারতীয় যুবক প্রেমিকা তাকে ছেড়ে যাওয়ার জের ধরে আত্মহত্যা করে।'

বেশিরভাগ মানুষই, এ সকল মানুষের যন্ত্রণার প্রতি সমবেদনা অনুভব করবেন এবং বেশিরভাগই এমন পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়বেন। কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়া কিংবা আমাদের জীবনে বিশেষ কোনো মানুষের উপস্থিতিই যদি আমাদের অস্তিত্ব বা বেঁচে থাকার সবকিছুতে পরিণত হয়, তবে বুঝতে হবে আমাদের চিন্তার মধ্যে ভয়াবহ রকমের গলদ রয়ে গেছে। সসীম, ক্ষণস্থায়ী ও ক্ষীয়মান কিছু যদি আমাদের জীবনের মূল বিষয়ে পরিণত হয় এবং সেটাই বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমাদের পতন অনিবার্য। অপূর্ণাঙ্গ যে জিনিসটাকে আমরা নিজেদের জীবনের কেন্দ্রে এনে বসিয়েছি, সংজ্ঞা মোতাবেকই সেটা বিবর্ণ, সেটা আমাদেরকে হতাশ করে কিংবা হারিয়ে যায়। আর এমনটি ঘটার সাথে সাথেই আমাদের পতন ঘটে। পাহাড়ে আরোহণের সময় আপনি যদি নিজের সকল ভারকে একটি ছোট ডালের ওপর স্থাপন করেন, তখন কি হবে একবার ভাবুন তো? পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র বলছে, ওই ছোট ডাল তো এমন ভারের কারণে ভেঙে যাবে, যেহেতু এমন ভার বহনের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। মধ্যাকর্ষণ বলের নিয়ম বলছে, এমন পরিস্থিতিতে আপনি নিশ্চিতভাবে নিচে পতিত হবেন। এটা কেবল তত্ত্বকথা নয়। বরং এটাই বস্তুগত পৃথিবীর অমোঘ নিয়ম। রুহানি দুনিয়াতেও এই বাস্তবতা অনিবার্য এবং কুরআনে আমাদেরকে এই সত্যটিই বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
"হে লোক সকল, এখানে একটি উপমা দেওয়া হলো, তাই মনোযোগ দিয়ে শোনো, তোমাদের যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে আহ্বান করো, তারা একত্র হয়ে একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, আর একটি মাছিও যদি তাদের থেকে কিছু সরিয়ে ফেলে, তবে তারা সেটাও প্রতিহত করতে পারবে না। কতো দুর্বল যারা আকুল আবেদন করছে এবং কতো দুর্বল যাদের কাছে আকুল আবেদন করা হচ্ছে।”
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ (কুরআন, ২২:৭৩)

এই আয়াতের মর্মবাণী বেশ গভীর। যতবারই আপনি দুর্বল বা ক্ষীয়মান কিছুর পেছনে ছুটেন, কামনা করেন কিংবা তেমন কিছুর প্রতি আবেদন করেন (সংজ্ঞা অনুসারে আল্লাহ ভিন্ন সবই এটার অন্তর্ভুক্ত), তখন আপনি নিজেও দুর্বল ও বিবর্ণে পরিণত হন। এমনকি আপনি যেটার অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন, সেটা যদি পেয়েও যান, তা কখনোই যথেষ্ট হবে না। শীঘ্রই আপনাকে অন্য কিছুর পেছনে ছুটতে হবে। আপনি কখনো সত্যিকার তুষ্টি অথবা তৃপ্তির পরশ পাবেন না। এই কারণে আমরা কেনাবেচা ও নবায়নের এক দুনিয়াতে বসবাস করি। এখানে আপনার ফোন, আপনার গাড়ি, আপনার কম্পিউটার, আপনার সঙ্গীনী, আপনার সঙ্গী সবই নতুন ও উন্নত মডেলের বিনিময়ে বদলানো যায়।

এতদসত্ত্বেও, এই দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ রয়েছে। যখন আপনি নিজের সমস্ত ভারকে এমন কিছুর ওপর রাখেন, যেটা অনমনীয়, অভঙ্গুর এবং সীমাহীন, তখন আপনি পতিত হতে পারবেন না। আপনি তখন ভেঙে পড়বেন না। কুরআনে আল্লাহ আমাদের সামনে এই সত্যটি তুলে ধরেন, যখন তিনি বলেন:
"ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তাই যে ব্যক্তি তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহতে ঈমান আনে, সে এমন এক দৃঢ় হাতল ধারণ করে, যা কখনো ভেঙে যায় না। আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ।"
لَا إكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (কুরআন, ২:২৫৬)

আপনি যা ধরে থাকেন, সেটা যদি মজবুত হয়, তখন আপনিও শক্তিশালী বনে যান এবং এই শক্তির সাহায্যেই প্রকৃত মুক্তির পথ সামনে চলে আসে। এই মুক্তির ব্যাপারেই ইবনে তাইমিয়া (র.) বলেন, "আমার দুশমন আমার আর কি ক্ষতি করবে? আরে আমার বুকের মাঝেই তো আমার আসমান ও আমার বাগান উভয়ই। আমি যদি ভ্রমণ করি, সেগুলো আমার সাথেই ভ্রমণে সঙ্গি হয় এবং কখনো আমার সঙ্গ ত্যাগ করে না। কারাবন্দি হওয়া আদতে তো আমার জন্য স্বীয় প্রতিপালকের সাথে একাকি সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়। নিহত হলে সেটা শহিদের মর্যাদা এনে দেবে এবং নিজভূমি থেকে নির্বাসিত হওয়া তো রুহানি ভ্রমণের ন্যায়।” (ইবনে কাইয়্যিম, আল-ওয়াবিল, পৃ. ৬৯)

ত্রুটিহীন, সমাপ্তিহীন এবং সমস্ত দুর্বলতা থেকে মুক্ত সেই সত্তাকে তার উপাসনা বা ইবাদতের একমাত্র সত্তা হিসেবে গ্রহণ করাকে ইবনে তাইমিয়া এই জীবনের কয়েদখানা থেকে মুক্তির রাস্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন একজন ঈমানদারের বর্ণনা দিয়েছেন, যার অন্তর মুক্ত। এই অন্তর পার্থিব জীবন এবং এটাতে থাকা সবকিছুর দাসত্বের মায়াজাল থেকে মুক্ত। এই অন্তর ভালো করেই জানে তাওহিদ (তথা আল্লাহর একত্ববাদের) সাথে আপোস করাটাই সত্যিকার ট্রাজেডি এবং ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত সেই সত্তা ছাড়া (মহান আল্লাহ তা'আলা) অন্য কিছু বা অন্য কারো উপাসনা করার মাঝেই পাহাড়সম মুসিবত লুকিয়ে আছে। এটা এমন এক আত্মা, যা জানে, আল্লাহকে সরিয়ে অন্য কিছুকে নিজের মধ্যে স্থান দেওয়াটাই সত্যিকার কয়েদখানার বন্দিদশা ডেকে আনে। [উপাসনার। ওই বস্তু কারো নিজের নফসানিয়াত (Ego), ধনসম্পদ, চাকুরি, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান অথবা নিজের জীবন যা-ই হোক না কেন, এসব মিথ্যা উপাস্য আপনাকে ফাঁদে ফেলবে এবং আপনাকে তাদের গোলাম বানাবে, যদি আপনি সেগুলোকে জীবনের মূল লক্ষ্য মনে করেন। এ ধরনের দাসত্বের যন্ত্রণা এই জীবনে আঘাত হানা সব ধরনের ট্রাজেডির থেকেও ভয়াবহ, গাঢ় এবং সুদূর প্রসারী হবে।

নবি ইউনুস (আলাইহিস সালাম)-এর যে অভিজ্ঞতা (এক্ষেত্রে), সেটাকে আত্মস্থ করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিমির পেটে যখন তিনি আটকে যান, তখন তা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা রাস্তা তার কাছে ছিল, তা হলো: আল্লাহর কাছে পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে দেওয়া, আল্লাহর একত্ব এবং নিজের মানবীয় দুর্বলতাকে উপলব্ধি করা। তার দু’আ এই সত্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যের সাথে ফুটিয়ে তুলেছে: "আপনি ছাড়া ভিন্ন কোনো ইলাহ নেই, মহিমা আপনার এবং আমি ভুল করেছি।” (কুরআন, ২১:৮৭)

আমাদের অনেকেই নিজেদের কামনা ও বাসনারূপী তিমির পেটে এবং এসব উপাসনার বস্তুর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছি। আমরা তখন নিজেদের আমিত্বের গোলামে পরিণত হই। বস্তুত নিজেদের অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে স্থান দেওয়ার কারণেই এমন দাসত্বের আবির্ভাব ঘটে। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ভীষণ যন্ত্রণার কয়েদখানাতে আবদ্ধ করি। কেননা, দুনিয়ার কয়েদখানা আমাদের থেকে শুধু ক্ষণস্থায়ী ও নিখুঁত নয় এমন জিনিসই ছিনিয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে রুহানি কয়েদখানা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়, যা কিছু পরম, অসীম ও পরিপূর্ণ: মহান আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক।

টিকাঃ
* )مِن دُونِ اللهِ ( : আল্লাহ ভিন্ন সবই 'মিন দুনিল্লাহ' পরিভাষার সীমাভুক্ত -(সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 আমি যা অনুভব করছি, তা কি প্রেম?

📄 আমি যা অনুভব করছি, তা কি প্রেম?


'প্রেম চরম মাত্রার এক মানসিক ব্যাধি' প্লেটো প্রেমকে এ ভঙ্গিতেই চিত্রিত করেছেন। কেউ যদি কখনো 'প্রেমে পড়ে' থাকেন, তবে তিনি এই বক্তব্যে কিছুটা সত্যতা দেখতে পাবেন, তথাপি এখানে বড় ধরনের ভ্রান্তি রয়ে গেছে, আসলে প্রেম মানসিক ব্যাধি নয়, বরং কামনা হচ্ছে মানসিক ব্যাধি।

'প্রেমে পড়ার' মানে যদি হয় আমাদের জীবন হবে বিধ্বস্ত এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়বো, দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়বো, একেবারে নিঃশেষিত হবো, স্বাভাবিক কাজকর্মে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়বো এবং এর (অর্থাৎ ভালোবাসার) জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে যাবো, তবে এটা আর যাই হোক প্রেম নয়। আমাদের চারপাশের সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদেরকে যে ধারণা দেয় তা সত্ত্বেও আসল কথা হলো, সত্যিকার প্রেম আমাদের মাদকাসক্তের মতো করে তুলবে না।

আর তাই বেড়ে ওঠার সময়কালে আমাদের দেখা চলচ্চিত্রে সর্বগ্রাসী মোহ হিসেবে প্রেমকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়, সেটা আসলে প্রেম নয়। এর নাম ভিন্ন। এটা হচ্ছে 'হাওয়া': একজন ব্যক্তির নিচু স্তরের কামনা, অনর্থক বাসনা এবং কামস্পৃহাকে বোঝাতে কুরআন এই শব্দটি ব্যবহার করেছে। যারা এসব কামনাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে, তাদেরকে আল্লাহ সবচেয়ে পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন: "তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয়, তবে জেনে রাখুন, বস্তুত তারা নিজেদের কামনা (হাওয়া) ছাড়া আর কিছুরই অনুসরণ করে না। আল্লাহর কাছ থেকে আসা হেদায়েতকে বাদ দিয়ে নিজের কামনাকে যে অনুসরণ করে, তার থেকে পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে?" (কুরআন, ২৮:৫০)

আল্লাহর হেদায়েতের ওপর যখন আমরা আমাদের কামনা ও বাসনাকে প্রাধান্য দেই, বস্তুত তখন আমরা ওইসব কামনা-বাসনার উপাসনাকে বেছে নেই। পরম কাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রতি আমাদের ভালোবাসা যখন আমাদের কাছে 'আল্লাহর প্রেম' থেকেও শক্তিশালী হয়ে যায়, বস্তুত তখন আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটিকে আমাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ বলেন: "এমনও মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে সমতুল্যরূপে (উপাসনা) করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করেই তারা ওদের ভালোবাসে। অন্যদিকে ঈমানদারগণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় দৃঢ়।” (কুরআন, ২:১৬৫)

কোনো কিছুর প্রতি প্রেম যদি আমাদেরকে আমাদের পরিবার, আমাদের সম্মান, আমাদের আত্মমর্যাদা বোধ, আমাদের দেহ, আমাদের বিবেক, আমাদের মানসিক শান্তি, আমাদের দ্বীন, এমনকি আমাদের স্রষ্টা, যিনি আমাদেরকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, এসব কিছুকে পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করে, তবে জেনে রাখুন, আমরা 'প্রেমে পড়িনি', বরং আমরা দাসে পরিণত হয়েছি। এ ধরনের লোক সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "আপনি কি তাকে দেখেন না, যে নিজের কামনা ও বাসনাকে (হাওয়া) নিজের প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে পথভ্রষ্ট হতে দেন এবং তার কর্ণে ও অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন এবং তার দৃষ্টিশক্তির ওপর পর্দা ঢেলে দেন।” (কুরআন, ৪৫:২৩)

কারো দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণেন্দ্রিয় এবং অন্তর সবকিছুর ওপর মোহর লেগে আছে, এ রকম পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা একটিবার ভাবুন তো। বস্তুত হাওয়া কোনো তৃপ্তি বয়ে আনে না। এটা এক কয়েদখানা। এটা দেহ, মন ও আত্মার দাসত্ব। এটা এক ধরনের আসক্তি (Addiction) এবং এক ধরনের উপাসনা। সাহিত্যের জগতে এই বাস্তবতার ভুরি ভুরি উদাহরণ চোখে পড়বে। চার্লস ডিকেন্সের Great Expectations-এ Pip এই বাস্তবতার উজ্জ্বল উপমা। এসথেলার প্রতি নিজের মোহকে সে এভাবে বর্ণনা করে: "দুঃখজনক হলেও আমি জানতাম যে, সব সময় না হলেও প্রায়শই আমি তাকে ভালোবাসতাম, সকল যুক্তি, প্রতিজ্ঞা, শান্তি, আশা, সুখ ও সমস্ত নিরুৎসাহিতা সত্ত্বেও (আমি তাকে ভালোবাসতাম)।”

চার্লস ডিকেন্সের সৃষ্ট চরিত্র Miss Havisham এটাকে আরও বিস্তৃত করেন: "আমি তোমাকে বলবো... সত্যিকার প্রেম কি জিনিস। এটা হলো অন্ধভক্তি, প্রশ্নহীন আত্মবিসর্জন, চরমভাবে নিজেকে সঁপে দেওয়া, নিজ সত্তা এবং গোটা দুনিয়ার থেকে বিশ্বাস ও আস্থা তুলে নেওয়া এবং নিজের অন্তর ও আত্মাকে প্রেমাস্পদের কাছে সমর্পণ করা (যে তোমাকে উপর্যুপুরি আঘাত করে চলেছে)।”

চার্লস ডিকেন্সের সৃষ্ট চরিত্র Miss Havisham-এর বর্ণনা নির্জলা সত্য হলেও এটা সত্যিকার প্রেম নয়, বরং এটা 'হাওয়া'। প্রকৃত প্রেম যেটা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, সেটা না কোনো ব্যাধি আর না কোনো নেশা বা মোহ। আল্লাহ তাঁর মহাগ্রন্থ [কুরআনে] বলেন: “এটা তাঁর নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গি-সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছ থেকে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মাঝে প্রেম ও মমত্ববোধ স্থাপন করেছেন। চিন্তাশীল লোকদের জন্য এসবের মাঝে নিদর্শন আছে।” (কুরআন, ৩০:২১)

সত্যিকার প্রেম আনে প্রশান্তি, আত্মিক যন্ত্রণা নয়। সত্যিকার প্রেম আপনার নিজের সাথে এবং আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কে প্রশান্তি দান করে। এজন্য আল্লাহ বলেন: “যাতে তোমরা প্রশান্তিতে বাস করতে পারো।" অন্যদিকে 'হাওয়া' এটার বিপরীত। 'হাওয়া' আপনার জীবনকে অসহনীয় বানাবে। একটা নেশার মতো আপনি পাগলপারা হয়ে তা খুঁজে ফিরবেন, কিন্তু কখনো তৃপ্ত হবেন না। নিজের পতন ঘটা পর্যন্ত আপনি এটার পেছনে ছুটেই যাবেন, কিন্তু কখনোই এর নাগাল পাবেন না। আর নিজের পুরো সত্তাকেও যদি এটার কাছে সঁপে দেন, তথাপিও এটা আপনাকে কখনো সুখের সন্ধান দেবেন না।

পরম সুখই যখন সকলের লক্ষ্য, তখন মোহজাল অতিক্রম করা এবং প্রেমকে 'হাওয়া' (প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা) থেকে পৃথক করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে অব্যর্থ একটি পথ হচ্ছে, নিজেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা: আমি যাকে 'ভালোবাসি', তার কাছাকাছি হওয়াটা কি আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, নাকি আমাকে আল্লাহর কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়? সহজভাবে বললে, ওই ব্যক্তি কি আমার অন্তরে আল্লাহর স্থান দখল করেছে?

প্রকৃত বা নিখাঁদ প্রেম না কখনো আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রেমের সাথে সংঘর্ষ বাধাবে, আর না কখনো সেটার সাথে প্রতিযোগিতা করবে। ওই প্রেম বরং আল্লাহর প্রতি নিবেদিত ভালোবাসা ও সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। এই কারণে আল্লাহর বেঁধে দেওয়া বৈধ সীমার মাঝে থেকেই সত্যিকার প্রেম সম্ভব। ওই সীমার বাইরে যা আছে, তার সবই 'হাওয়া', যেটার কাছে হয় আমরা নিজেদেরকে সঁপে দেই, আর না হয় আমরা সেটাকে প্রত্যাখ্যান করি। হয় আমরা আল্লাহর গোলাম, নইলে আমরা 'হাওয়া' তথা প্রবৃত্তির দাস। একসাথে দুটো কখনো সম্ভব নয়।

মিথ্যা আমোদ-প্রমোদের সাথে সংগ্রাম করেই আমরা সত্যিকার প্রশান্তি পেতে পারি। কেননা, এই দুটো তাদের সংজ্ঞা মোতাবেকই পারস্পরিকভাবে একচেটিয়া। এই কারণে নিজেদের কামনা ও বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা জান্নাত লাভের পূর্ব শর্ত। আল্লাহ বলেন: “স্বীয় প্রভুর সামনে দাঁড়ানোর যে ভয় করে এবং নিজের আত্মাকে যে পাপ থেকে বিরত রাখে, প্রকৃতপক্ষে, জান্নাতই তার আবাসস্থল।” (কুরআন, ৭৯:৪০-৪১)

টিকাঃ
Mutually exclusive: পারস্পরিকভাবে একচেটিয়া অর্থাৎ একটি থাকলে অপরটির স্থান হবে না- (সম্পাদক)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00