📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 উপহারের প্রতি ভালোবাসা

📄 উপহারের প্রতি ভালোবাসা


আমরা সবাই উপহার পেতে ভালোবাসি। যে আশীর্বাদ আমাদের জীবনকে সৌন্দর্যে আলোকিত করে, আমরা সেটাকে ভালোবাসি। আমরা ভালোবাসি আমাদের সন্তান, আমাদের জীবনসঙ্গি, আমাদের পিতামাতা, আমাদের বন্ধু-বান্ধবদেরকে। ভালোবাসি আমাদের যৌবন এবং আমাদের স্বাস্থ্যকে। আমাদের বাড়ি, আমাদের গাড়ি, আমাদের অর্থ এবং আমাদের সৌন্দর্যকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু যখন কোনো উপহার নিছক উপহারের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠে, তখন কি ঘটে? আশা যখন রূপ নেয় প্রয়োজনে এবং অনুগ্রহ যখন নির্ভরশীলতায় পরিণত হয়, তখন কি ঘটে? যখন উপহার আর নিছক কোনো উপহার থাকে না, তখন ব্যাপারটি কেমন দাঁড়ায়?

উপহার আসলে কি? উপহার এমন এক জিনিস, যেটা আমাদের নিজেদের থেকে আসে না। উপহার এমন এক জিনিস, যেটা দেওয়া হয় এবং সেটা আবার ফিরিয়েও নেওয়া যায়। উপহারের আসল মালিক আমরা নই। আর আমাদের টিকে থাকার জন্য উপহার অত্যাবশকীয় নয়। এটা আসে আর যায়। আমরা উপহার পেতে চাই এবং তা পেতে ভালোবাসি -কিন্তু সেসব উপহার আমাদের অস্তিত্বের জন্য আবশ্যক নয়, আর না আমরা সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা সেগুলো পাওয়ার জন্য বেঁচে থাকি না, আর না আমরা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হলে মারা যাই। না সেগুলো আমাদের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস, না আমাদের আহার, কিন্তু আমরা সেগুলো পেতে ভালোবাসি। এমন কে আছে, যে উপহার পেতে ভালোবাসে না? এমন কে আছে, যে রাশি রাশি উপহার পেতে অপছন্দ করবে? আর আমরা 'আল-করিম' তথা সবচেয়ে উদার সত্তার নিকট এই আর্জি পেশ করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর উপহার থেকে কখনো বঞ্চিত না করেন। এতদসত্ত্বেও, উপহার এমন কিছু নয়, যার ওপর আমরা নির্ভর করি, আর না আমরা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হলে মৃত্যুবরণ করি।

মনে রাখবেন, কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার দুটো স্থান আছে – হাত এবং অন্তর। উপহার আমরা কোথায় রাখি? উপহারকে অন্তরে ধরে রাখা হয় না। এটা হাতে ধরে রাখা হয়। আর তাই যখন উপহার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সেটা হারানোর যন্ত্রণা হাতে অনুভব হওয়া উচিত-ওই যন্ত্রণা অন্তরে অনুভূত হওয়ার কথা নয়। এই পার্থিব জীবনে যিনি দীর্ঘ একটা সময় পার করেছেন, তিনি জানেন যে, হাতে অনুভূত হওয়া যন্ত্রণা এবং অন্তরে অনুভূত হওয়া যন্ত্রণা এক নয়। অনুরাগ, নেশা ও নির্ভরতার কোনো জিনিস হারালে অন্তরে যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এই যন্ত্রণা অন্য কোনো যন্ত্রণা মতো নয়। এটা সাধারণ কোনো যন্ত্রণা নয়। এই যন্ত্রণা জানান দেবে যে, আমরা আমাদের আসক্তির কোন বস্তু হারিয়েছে। এটা ছিল এমন এক উপহার, যা ভুল জায়গায় রাখা হয়েছিল।

হাতে অনুভূত হওয়া যন্ত্রণাও এক ধরনের যন্ত্রণা -কিন্তু সেটা ভিন্ন ধরনের। আসলেই ভিন্ন। কোনো কিছু হারানোর ফলে যে ক্ষতি হয়, হাতে সেটারই যন্ত্রণা অনুভূত হয়, কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা এমন কিছু হারাই না, যার ওপর আমরা নির্ভরশীল। যখন আমাদের হাত থেকে কোনো উপহার কেড়ে নেওয়া হয় -বা আমাদেরকে আদৌ কোনো উপহার দেওয়া হয় না- তখন আমরা হারানোর সাধারণ মানবীয় যন্ত্রণা অনুভব করি। আমরা দুঃখ করি। আমরা কাঁদি। কিন্তু ওই যন্ত্রণাটা আমাদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, আমাদের অন্তর স্বাভাবিক ও প্রাণ চঞ্চল থাকে। এটা এজন্য যে, অন্তর শুধু আল্লাহরই জন্য।

এবং শুধুই আল্লাহর জন্য।

যে জিনিস আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয় কিংবা (হারিয়ে ফেলার) ভীতি সৃষ্টি করে, সেই বিষয়গুলো যদি আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করি, তবে যে যে উপহারকে ভুল স্থানে রাখা হয়েছে, সেগুলো আমরা নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবো। আমরা যদি বিবাহ করতে না পারি, নিজের মনের মানুষকে না পাই, চাকুরি খুঁজে না পাই, নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে না পারি, ডিগ্রি অর্জন করতে না পারি কিংবা নির্দিষ্ট Status-এ উপনীত হতে না পারি – এই সবকিছু যদি আমাদের গ্রাস করে ফেলে, তবে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করা জরুরি। উপহারটি যে স্থানে সংরক্ষিত আছে, সেখান থেকে এটাকে সরাতে হবে। ওই উপহারকে আমাদের অন্তর থেকে সরিয়ে এটাকে তার উপযুক্ত স্থান অর্থাৎ আমাদের হাতে ফিরিয়ে আনতে হবে।

আমরা এসব জিনিসকে ভালোবাসতেই পারি। ভালোবাসাটা এক মানবীয় গুণ। যেসব উপহার ভালোবাসি, সেগুলো পেতে চাওয়াটা মানুষের এক সাধারণ প্রকৃতি। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা ওই উপহারকে আমাদের অন্তরে জমা করি, আর আল্লাহকে আমরা আমাদের হাতে স্থান দেই। পরিহাসের বিষয় হলো, আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহকে ছাড়াই আমরা বাঁচতে পারি, কিন্তু যখন আমরা উপহারটি হারিয়ে ফেলি, তখন আমরা ভেঙে পড়ি এবং আমরা দাঁড়াতেও পারি না।

ফলস্বরূপ, সহজেই আমরা আল্লাহকে (আমাদের বাস্তব জীবন থেকে)১২ একপাশে সরিয়ে রাখি কিন্তু আমাদের অন্তর ওই উপহার ছাড়া এক বিন্দু নিঃশ্বাসও নিতে পারে না। বস্তুত উপহারের স্বার্থে আমরা আল্লাহকে পাশে সরিয়ে রাখতেও দ্বিধাবোধ করি না। তাই বিলম্ব করে সলাত আদায় করা, কিংবা সলাত আদায় না করাটা আমাদের জন্য বেশ সহজ ব্যাপার, কিন্তু আমার কাজের মিটিং বা সভা, আমার সিনেমা, আমার ছুটি কাটানো, আমার কেনাকাটা, আমার ক্লাস, আমার পার্টি কিংবা আমার বাস্কেটবল (অথবা ক্রিকেট বা ফুটবল) ১৩ খেলা দেখাটা কোনোভাবেই মিস করা বা বাদ দেওয়া যাবে না। সুদের ভিত্তিতে ঋণ নেওয়া কিংবা মদ বা অ্যালকোহল বিক্রি করা বেশ সহজ, কিন্তু আমাকে আমার লাভের পরিমাণ এবং সম্মানজনক ক্যারিয়ার থেকে বঞ্চিত করো না। আমাকে বঞ্চিত করো না আমার নতুন মডেলের গাড়ি এবং বিলাসবহুল বাড়ি থেকে। কোনো হারাম সম্পর্ক বা ডেটে যাওয়া সহজ, কিন্তু আমাকে আমরা ভালোবাসার মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে রেখো না। হিজাব পরিধান না করাটা বা খুলে ফেলা সহজ ব্যাপার, কিন্তু আমাকে আমার সৌন্দর্য, আমার বাহ্যিক অবয়ব, আমার বিবাহের প্রস্তাব কিংবা লোকদের সামনে আমার ছবি বা ইমেজ থেকে বঞ্চিত করো না। আল্লাহ যে শালীনতাকে সুন্দর বলেছেন, সেটাকে দূরে নিক্ষেপ করাটা বেশ সহজ, কিন্তু আমাকে আমার সরু, আঁটসাঁট জিন্স পড়া থেকে বঞ্চিত করো না, কারণ সমাজ এটাকে সৌন্দর্যের প্রতীক বলে আখ্যা দিয়েছে।

এমনটি ঘটে, কারণ উপহারটি আমাদের অন্তরে অবস্থান করছে, যেখানে আল্লাহ রয়েছেন আমাদের হাতে। আর যে জিনিস হাতে থাকে, সেটাকে তো খুব সহজেই এক পাশে সরিয়ে রাখা যায় (তথা উপেক্ষা/অবহেলা করা যায়)। আর যে জিনিসের অবস্থান অন্তরে, সে জিনিস ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না এবং সেটা পাওয়ার জন্য আমরা যেকোনো কিছু কুরবানি পর্যন্ত দিতে পারি। কিন্তু আজ হোক, আর কাল হোক, নিজেদেরকে এই প্রশ্ন করা আবশ্যক যে, আসলে আমরা কোন জিনিসের ইবাদত করি: উপহার না উপহার দাতার? আমরা কি সৌন্দর্যের উপাসনা করি, নাকি আমরা যাবতীয় সৌন্দর্যের উৎস ও তাঁর "আধার"-এর ইবাদত করি? আমরা কি রিযিকের উপাসনা করি, নাকি আমরা রিযিক দাতার ইবাদত করি?

সৃষ্টির না স্রষ্টার -কার ইবাদত করি?

আমরা যা পছন্দ করি, তার ট্রাজেডি হচ্ছে: [কোনো বস্তুর অনুরাগ বা আসক্তির শিকল দিয়ে আমরা আমাদের ঘাড়কে আবদ্ধ করার পর আমরা প্রশ্ন করি, আমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কেন। (জীবন রক্ষাকারী)" "সত্যিকার বাতাস"-কে আমরা উপেক্ষা করি এবং এরপর অবাক হয়ে [বলি], আমরা কেন শ্বাস নিতে পারছি না। আমরা আমাদের (আত্মার) একমাত্র খোরাককে ফেলে দেই এবং এরপর অভিযোগের সুরে চিৎকার করতে থাকি, আমরা অনাহারে কেন মরছি। সর্বোপরি, ছুরি দিয়ে আমরা নিজেদের বুকেই আঘাত করার পর আমরা নিজেরাই কান্না শুরু করি, কেননা, এটা সত্যিই ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু আমরা যাই করি না কেন, তা আমরা নিজেদের সাথেই করি। আল্লাহ বলেন:
"এবং তোমাদের ওপর যেসব বিপদ মুসিবত আপতিত হয়, সেগুলো তোমাদের নিজেদের হাতেরই কামাই, তথাপি তিনি তোমাদের (অধিকাংশ পাপকে) মার্জনা করে থাকেন।" وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
(কুরআন, ৪২:৩০)

হ্যাঁ, আমরা যা কিছুই করি না কেন, তা আমরা নিজেদের সাথেই করি। কিন্তু লক্ষ্য করুন আয়াতটি কিভাবে শেষ হয়েছে: "তিনি অধিকাংশ পাপ ক্ষমা করেন।” এখানে ব্যবহৃত 'ইয়া'ফু'১৬ শব্দটি আল্লাহর "আল-আ'ফু” নাম থেকে উৎসারিত। এটার মর্ম কেবল ক্ষমা বা মার্জনা করাই নয়, বরং এটা সম্পূর্ণরূপে মুছে দেওয়ার মর্মকেও ধারণ করে, আর, তাই যতবারই আমরা নিজেদের বুকে ছুরি চালাই না কেন, ততবারই আল্লাহ আমাদেরকে এমনভাবে সারিয়ে তুলতে পারেন যে, মনে হবে যেন ছুরির আঘাত কখনোই পড়েনি! আর 'আল-জাব্বার' (যিনি মেরামত করেন), একমাত্র তিনিই পারেন এ ক্ষত সারিয়ে তুলতে।

যদি আপনি তাঁকে খুঁজেন, তাঁকে অন্বেষণ করেন।

শ্বাস নেওয়ার বাতাসের বিনিময়ে যিনি গলার হার বেছে নেন, তার বোকামির মাত্রা কতটুকু? এরূপ ব্যক্তিই বলে: "আমাকে গলার হার দাও, তারপর তুমি আমার থেকে শ্বাস নেওয়ার বাতাস নিয়ে নিতে পারো। আমার শ্বাসরোধ করো, কিন্তু মরার সময় আমার গলায় হারটি যেন ঝুলতে থাকে, সেটা নিশ্চিত করো।" আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হচ্ছে, ওই হারটিই আমাদের শ্বাসরোধ করে। আমাদের অনুরাগের বস্তু, যেটাকে আমরা আল্লাহর চেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেটাই আমাদের ধ্বংস করে।

আমাদের সমস্যার সূত্রপাত ঘটে তখন, যখন আমরা উপহারকে নিছক একটি উপহার না ভেবে, সেটাকে আমাদের শ্বাস নেওয়ার বাতাস ভাবতে শুরু করি। আর, আমাদের অন্ধত্বের কারণে আমরা ওই উপহারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সত্যিকার বাতাসকে উপেক্ষা করি। ফলশ্রুতিতে, যখন আমাদের থেকে ওই উপহার কেড়ে নেওয়া হয় -কিংবা আমাদেরকে যদি আদৌ ওই উপহার দেওয়া না হয়- তখন আমরা ভাবি, আমাদের বেঁচে থাকাটাই বুঝি দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই মিথ্যাটাকে অবিরতভাবে আমরা নিজেদেরকে বলে যাই, যতক্ষণ না আমরা এটা বিশ্বাস করতে শুরু করি। এটা কোনোভাবেই সত্য নয়। আমাদের জন্য হারানোর মতো কেবল একটিই জিনিস আছে, যেটা [হারালে] উদ্ধার করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। জীবনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের একটিই কারণ আছে, যেটার সাহায্য ছাড়া আমরা সামনে এগুতেই পারবো না [আর সেটা হচ্ছে: নিজেদের জীবনে আল্লাহকে হারিয়ে ফেলা। কিন্তু ভাগ্যের নিদারুন পরিহাস হচ্ছে, আমাদের অনেকেই তাদের জীবন থেকে আল্লাহকে হারিয়ে ফেলেছি, অথচ আমরা কিনা ভেবে বসে আছি যে, আমরা এখনো বেঁচে আছি। তাঁর উপহার তথা নেয়ামতের প্রতি আমাদের ভ্রমাত্মক নির্ভরশীলতা আমাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছে। আসলেই বড় ধরনের ধোঁকা।

আল্লাহই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়স্থল। তাঁর দেওয়া উপহারসমূহ নয়। আল্লাহই আমাদের ভরসা এবং তিনিই আমাদের সত্যিকার প্রয়োজন, তিনিই আমাদের একমাত্র প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন: "আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নয়? অথচ তারা আপনাকে তাঁর পরিবর্তে অন্য (ইলাহের) ভয় দেথায়! আল্লাহ যাকে গোমরাহিতে ছেড়ে দিতে চান, তাকে পথ দেখানোর মতো কেউ আছে কি?"
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ وَیُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ (কুরআন, ৩৯:৩৬)

আমাদের সবারই প্রয়োজন আছে এবং আমাদের সবারই আছে চাহিদা। আমাদের সত্যিকার ভোগান্তি তখনই আরম্ভ হয়, যখন আকাঙ্ক্ষাকে আমরা নিজেদের অপরিহার্য প্রয়োজনে রূপান্তরিত করি এবং আমাদের সত্যিকার প্রয়োজন (তথা আল্লাহকে) এমন বস্তুতে রূপান্তরিত করি, যেটা না হলে আমাদের তেমন কিছু যায় আসে না। আমাদের আসল ভোগান্তির সূচনা তখনই, যখন আমরা মাধ্যমকে গন্তব্যের সাথে গুলিয়ে ফেলি। আল্লাহই আমাদের একমাত্র গন্তব্য। অন্য সবকিছুই মাধ্যম। আমাদের ভোগান্তির সূচনা তখনই হবে, যখন আমরা নিজেদের চোখকে গন্তব্য থেকে সরিয়ে ফেলে, মাধ্যমের মাঝেই নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলি।

প্রকৃতপক্ষে, উপহারের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা। [আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর] এক মাধ্যমে এই উপহার। উদাহরণস্বরূপ, নবি (ﷺ) কি বলেননি যে, বিবাহ দ্বীনের অর্ধেক? কেন? কারণ জীবনের খুব কম ক্ষেত্রই আছে, যা বিবাহের মতো একজনের চরিত্র গঠনের ওপর সামগ্রিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, দয়া, বিনম্রতা, উদারতা, আত্মত্যাগ এবং নিজের বদলে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার গুণগুলো সম্বন্ধে আপনি পড়তে পারেন, কিন্তু আপনি কখনো এই গুণগুলোর বিকাশ সাধন করতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনি এমন পরিবেশে পড়ছেন, যে পরিবেশ এসব গুণের পরীক্ষা নেয়।

বিবাহের মতো একটা নেয়ামত আপনাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মাধ্যমে হতে পারে, যতক্ষণ এটা নিছক একটি মাধ্যম থাকে এবং এটা জীবনের লক্ষ্যে পরিণত না হয়। আল্লাহর দেওয়া এসব নেয়ামত তাঁর কাছে পৌঁছানোর এক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে, যতক্ষণ এগুলোর অবস্থান অন্তরে না হয়ে [আমাদের] হাতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার অন্তরে যা বাস করে, সেটাই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অন্তরের ওই জিনিসটি তখন আপনার পরম আরাধ্য বস্তুতে পরিণত হয় এবং ওই জিনিসটি পেতে এবং ধরে রাখতে আপনি যেকোনো ধরনের কুরবানি পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত থাকেন। ওই বস্তুটি তখন আপনার নির্ভরতার মৌলিক ভিত্তিতে পরিণত হয়। আর, তাই এটা এমন এক জিনিস হতে হবে, যা হবে চিরন্তন, যার শ্রান্তি বা অবসাদ বলে কিছু থাকবে না এবং যা ভেঙে যাবে না। আর এটা এমন জিনিস হবে, যা কখনো ছেড়ে চলে যায় না। কেবল একটি জিনিসই এমন হতে পারে: [এবং তিনিই] স্রষ্টা।

টিকাঃ
১২ (সম্পাদক)।

১০ - (সম্পাদক)।
* - (সম্পাদক)।

* - (সম্পাদক)।

* মূল আরবি: يَعْفُو - (সম্পাদক)।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 প্রশান্তির প্রগাঢ় মুহূর্ত

📄 প্রশান্তির প্রগাঢ় মুহূর্ত


আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে কিছু প্রগাঢ় মুহূর্ত আছে। আমার বেলায় ওই মুহূর্তটি উপস্থিত হয়, মাসজিদুল হারামের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। আমার ওপরে আকাশ, নিচে কাবার সুন্দরতম দৃশ্য। এ সময় (আমি প্রত্যক্ষ করি) আল্লাহর এক অপূর্ব নিদর্শন – এই [পার্থিব] জীবন এবং আখিরাতের জীবন। আমার চারদিকে মানুষের ভিড়, যা এ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। কিন্তু আমার জন্য অবস্থা এমন হলো যেন, আমি সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে আছি শুধুই আল্লাহপাকের একান্ত সান্নিধ্যে।

ওই ছাদে আমি আমার সঙ্গে করে একরাশ অন্তর্জালা, সন্দেহ ও দ্বিধা নিয়ে এসেছিলাম। এসেছিলাম সীমাহীন দুর্বলতা, মানবীয় ত্রুটি এবং কষ্ট নিয়ে। জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে; সামনের দিনগুলোতে কি আসতে যাচ্ছে, তার ভয়, আর যা ঘটতে পারে, তার আশা নিয়ে আমি সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। এখানে দাঁড়ানো অবস্থায় নবি মুসা (আলাইহিস সালামের) লোহিত সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনা আমার মনে পড়ে। চর্মচক্ষে কেবল পানির প্রাচীর ছাড়া তিনি কিছুই দেখছিলেন না, কিন্তু তার রুহানি চোখ শুধু আল্লাহকেই দেখছিল এবং তিনি যে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ পাবেন, তাতে এতোটাই নিশ্চিত ছিলেন, যেন তিনি সেটা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছেন। যেখানে তার জাতির আস্থা কিংবা আশা হারানো লোকজনের কণ্ঠে কেবল (ফেরাউনের হাতে) পাকড়াও হওয়ার আশংকার কথাই ধ্বনিত হচ্ছে, তখনও মুসা (আলাইহিস সালাম) নিজের অবস্থানে অনঢ়।

আমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছি, আর দূরবর্তী কণ্ঠস্বরগুলো সামনে কি আসতে যাচ্ছে, তার সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে, কিন্তু আমার কান শুধু শুনে যাচ্ছে: "ইন্না মায়িআ' রাব্বি সা ইয়াহদিন ... নিশ্চয়ই আমার রব আমার সাথেই আছেন এবং তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।” (কুরআন, ২৬:৬২)

আমাদেরকে গ্রাস করা এই কষ্ট, বিভ্রান্তি এবং যন্ত্রণা ভেদ করে দৃষ্টিকে সামনের দিকে প্রসারিত করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন আমরা আমাদের অন্তরকে ফোকাস করতে বা মনোযোগ নিবদ্ধ করতে সুযোগ দেবো। তাওহিদ হচ্ছে ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ, কিন্তু শুধু "আল্লাহ এক” বলার নামই তাওহিদ নয়। [তাওহিদের] এই বিষয়টি বেশ গভীর ও প্রগাঢ়। এটা জীবনের উদ্দেশ্য, ভয়ভীতি, ইবাদত এবং স্রষ্টার প্রতি পরম ভালোবাসার ক্ষেত্রে একত্ববাদ [প্রতিষ্ঠা করার সাথে সম্পৃক্ত]। এটা কল্পনা শক্তি ও মনোযোগের বেলায় একত্ববাদ [প্রতিষ্ঠা করার সাথে জড়িত]। তওহিদের মানে একজনের দৃষ্টিকে নির্দিষ্ট একটি বিন্দুতে নিবদ্ধ করা, যাতে বাকি সবকিছুই নিজ নিজ উপযুক্ত স্থানে জায়গা করে নিতে পারে।

নবি (ﷺ) থেকে বর্ণিত চমৎকার এক হাদিস এই বিষয়টিকে যথার্থভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। নবি (ﷺ) বলেন:
“যে ব্যক্তির আখিরাত নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আল্লাহ তার অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন, তার সকল বিষয়াদি একত্র করবেন এবং দুনিয়া তার নিকট চলে আসবে, যদিও সে দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী নয়। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আল্লাহ তার চোখের সামনে অভাব ও অনটন লাগিয়ে দেন, তার বিষয়াদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবেন এবং তার জন্য দুনিয়ার যতটুকু নির্দিষ্ট হয়ে আছে, ততটুকু অংশ ছাড়া দুনিয়ার কিছুই তার কাছে আসবে না।” [তিরমিযি]

আপনি যদি কখনো 'ম্যাজিক আই' (magic eye)¹⁷ ছবি দেখে থাকেন, তবে আপনি এই সত্যটির এক চমৎকার উপমা দেখতে পাবেন। প্রথম দেখায় মনে হবে কতগুলো আকৃতির সমাহার ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটার কোনো যথাযথ বিন্যাস বা উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু আপনি যদি ছবিটিকে মুখের সামনে এনে ধরেন, নিজের চোখকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিবদ্ধ বা ফোকাস করেন এবং ছবিটিকে যখন আপনি ধীরে ধীরে মুখের সামনে থেকে সরাতে থাকবেন, হঠাৎ করেই ছবিটি আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু যখনই আপনি ওই নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে মনোযোগ সরিয়ে ফেলবেন, সাথে সাথেই ছবিটি হারিয়ে যাবে এবং আপনার কাছে সেটা (বিশৃঙ্খল) আকৃতির এক সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।

একইভাবে, যতই আমরা দুনিয়ার দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করি, আমাদের বিষয়াদি ততই বিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে। যতই আমরা দুনিয়ার পেছনে দৌড়াতে থাকি, ততই এটা আমাদের থেকে পালাতে থাকে। যতই আমরা সম্পদের পিছু ধাওয়া করি না কেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসস্বরূপ, আমরা ততই দারিদ্র্য অনুভব করতে থাকি। মনোযোগ বা ফোকাস যদি হয় অর্থ, তবে যত অর্থই আপনি উপার্জন করুন না কেন, আপনি প্রতিনিয়ত এটা হারানোর ভয়ে ভীত থাকবেন। এই মোহাচ্ছন্নতাই স্বয়ং দারিদ্র্য। এই কারণেই নবি (ﷺ) এ ধরনের লোক সম্পর্কে মন্তব্য করেন, তাদের চোখের সামনে কেবল দারিদ্রই থাকবে। আর তারা শুধু এটাই দেখবে। তাদের যতই থাকুক না কেন, তারা পরিতৃপ্ত নয়, তারা কেবল আরও পাওয়ার লোভে মত্ত এবং এসব হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি মনোযোগ বা ফোকাস করেন, তাদের কাছেও দুনিয়া আসে এবং আল্লাহ তাদের অন্তরে তৃপ্তির ঐশ্বর্য ঢেলে দেন। এমনকি তাদের যদি সামান্য [সম্পদও] থাকে, তারা নিজেদেরকে ধনী ভাবে এবং ওই সম্পদ থেকে আরও বেশি করে দান করতে আগ্রহী থাকে।

এ ধরনের লোকেরা যখন পার্থিব জীবন, আর্থিক দৈন্যতা, কষ্ট, একাকিত্ব, ভয়, হৃদয় ভেঙে যাওয়া কিংবা দুঃখ ও বিরহের মতো জিনিস দ্বারা আটকা পড়ে, তখন তাঁদেরকে শুধু আল্লাহর দিকে মুখ ফেরাতে হবে এবং তিনি তাদেরকে ওইসব মুসিবত থেকে সর্বদাই বের করে আনেন। জেনে রাখুন এটা নিজেকে স্বস্তি দেওয়ার কোনো থিওরি বা তত্ত্ব নয়, বরং এটা এক প্রতিশ্রুতি। এটা আল্লাহর দেওয়া এক প্রতিশ্রুতি, যিনি কুরআনে বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য একটি পথ বানিয়ে দেন এবং ধারণাতীত স্থান থেকে তার জন্য তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। যিনি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখেন, (আল্লাহই) তার জন্য যথেষ্ট ..." (কুরআন, ৩:১৯০)

আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহই যথেষ্ট। যারা আল্লাহকে নিজেদের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের জীবনে শান্তি বিরাজ করে। কেননা, তাদের এই জীবনে যাই ঘটুক না কেন, তারা সেটাকে ভালো মনে করেন এবং সেটাকে তারা আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে মেনে নেন। আপনার জীবনে শুধু ভালো দিনই পার হচ্ছে, এই বিষয়টি একবার ভাবুন তো। এ ধরনের ঈমানদারগণের অবস্থা এটাই, যেমনটি নবি (ﷺ) বলে গেছেন,
"ঈমানদারের বিষয়টি আসলেই অবাক করার মতো। সবকিছুতেই তার জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং এটা শুধু ঈমানদারের জন্যই। যদি তার কাছে কোনো কল্যাণ আসে সে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, যেটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণকর।” [মুসলিম]

সত্যই এ ধরনের ঈমানদারগণের অন্তর এক প্রকারের জান্নাত। এই জান্নাতের কথাই ইবনে তাইমিয়া (আল্লাহ তার আত্মার ওপর রহমত বর্ষণ করুন) তুলে ধরেন, যখন তিনি বলেন:
"বস্তুত এই দুনিয়াতে এক জান্নাত রয়েছে, (আর) যে ব্যক্তি ওই জান্নাতে প্রবেশ করে না, আখিরাতের জান্নাতেও সে প্রবেশ করবে না।”

ওই জান্নাতে পরিপূর্ণ শান্তি ক্ষণিক মুহূর্তের ন্যায় হবে না, বরং তা হবে এক [রুহানি] অবস্থা, যা চিরস্থায়ী।

টিকাঃ
¹⁷ ম্যাজিক আই: N.E. Thing Enterprises (১৯৯৬ সালে নাম পরিবর্তন করে Magic Eye Inc.) প্রকাশিত একটি পুস্তক সিরিজ। এতে প্রকাশিত অটোস্টেরিওগ্রাম ইমেজসমূহ কেউ কেউ 2D ইমেজ-এর উপর focus করে 3D তথা ত্রিমাত্রিক ইমেজ দেখতে পান।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 সমুদ্ররূপী দুনিয়া

📄 সমুদ্ররূপী দুনিয়া


গতকাল আমি সমুদ্রতীরে গিয়েছিলাম। বসে বসে যখন আমি ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল বিশাল ঢেউ উপভোগ করছিলাম, তখন বিস্ময়কর কিছু একটা আমি উপলব্ধি করি। সমুদ্র শ্বাসরুদ্ধকরভাবে সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু এটা যেমন সুন্দর, তেমনি ভয়ঙ্করও বটে। সম্মোহন শক্তিময় উত্তাল ঢেউ, যা আমরা সমুদ্রতীর থেকে ভালোই উপভোগ করি, কিন্তু সেটাই কেড়ে নিতে পারে আমাদের প্রাণ, যদি আমরা ওই ঢেউয়ের কবলে পড়ি। পানি নামক যে উপাদান আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য, সেই পানিতেই ডুবে গেলে আমাদের জীবন লীলা সাঙ্গ হতে পারে। যে সমুদ্র জাহাজকে ভাসিয়ে রাখে, সেই সমুদ্রই পারে জাহাজকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে।

এই পার্থিব জীবন, এই দুনিয়া, ঠিক সমুদ্রেরই মতো। আমাদের অন্তরগুলো জাহাজের মতো। সমুদ্রকে আমরা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করতে এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু এই সমুদ্র একটা মাধ্যম মাত্র। আহার সংগ্রহের জন্য সমুদ্র একটা মাধ্যম। এটা ভ্রমণের এক মাধ্যম। উচ্চতর লক্ষ্য পূরণের এটা এক মাধ্যম। তথাপি এটা এমন এক জিনিস, যেটা আমরা অতিক্রম করতে চাই, এতে থেকে যাওয়ার কথা কখনো চিন্তা করি না। একবার ভাবুন তো, সমুদ্র যদি আমাদের মাধ্যম হওয়ার বদলে হয়ে যায় আমাদের শেষ ঠিকানা, তবে কেমন হবে?

শেষ অবধি তাতে তো আমাদের ডুবেই মরতে হবে।

সমুদ্রের পানি যতক্ষণ থাকবে আমাদের জাহাজের বাইরে, ঠিক ততক্ষণ জাহাজ নির্বিঘ্নে ভেসে চলবে এবং নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু যেইমাত্র পানি জাহাজে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন কি ঘটে? ঠিক তেমনি দুনিয়া যখন পানির মতো আমাদের অন্তররূপ জাহাজের বাইরে অবস্থান করে না, দুনিয়া যখন নিছক আর মাধ্যম থাকে না, পরিস্থিতি তখন কীরূপ ধারণ করে? দুনিয়া যখন আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে, তখন কি ঘটে?

জাহাজ তখনই ডুবে।

এমন পরিস্থিতিতে অন্তর জিম্মি হয়ে পড়ে এবং সেটা (দুনিয়ার) দাসে পরিণত হয়। আর তখনই যে দুনিয়া এক সময় ছিল আমাদের নিয়ন্ত্রণে, সেটা আমাদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে শুরু করে। সমুদ্রের পানি যখন প্রবেশ করতে আরম্ভ করে এবং জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়, তখন জাহাজ আর [আমাদের] আয়ত্তে থাকেন না। জাহাজটির পরিণাম তখন সমুদ্রের কৃপার ওপর নির্ভর করে।

(দুনিয়ারূপী সমুদ্রে) ভেসে থাকার জন্য, দুনিয়াকে আমাদেরকে ঠিক সেভাবে দেখতে হবে, যেভাবে আল্লাহ আমাদেরকে দেখতে বলেছেন, "বস্তুত আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে রয়েছে নির্দশন, তাদের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে।” (কুরআন, ৩:১৯০)

দুনিয়াতে আমাদের বসবাস। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের ব্যবহারের জন্যই দুনিয়ার সৃষ্টি। দুনিয়ার প্রতি এই নিরাসক্তির (যুহদ) মানে কখনো এই নয় যে, এই দুনিয়ার সাথে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই। বরং কি করা আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয়, নবি (স) আমাদেরকে সেটা শিখিয়ে দিয়েছেন।

আনাস (রা.) বলেন: "নবি (স) কিভাবে ইবাদত করতেন, সেটা জিজ্ঞাসা করতে নবি (স)-এর স্ত্রীদের কাছে তিন ব্যক্তির আগমন ঘটে (আল্লাহ নবির ওপর রহমত বর্ষণ করুন, আর বইয়ে দেন তার ওপর শান্তির ধারা)। যখন তাদেরকে সেটার জানানো হলো, তখন তাদের কাছে সেটা কম মনে হয় এবং তারা বলে, 'নবি (স)-এর সাথে আমাদের কি কোনো তুলনা হতে পারে, যাঁর আগের-পিছের সব ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে?' আনাস বলেন, 'তাদের একজন বলে, 'আমি সলাত আদায় করে সারা রাত কাটাবো।' আরেকজন বলে, 'আমি সারা বছর ধরে রোজা রাখবো, আর তা কখনো ভাঙবো না।' আরেকজন বলে, 'নারী সঙ্গ থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখবো এবং বিবাহ করবো না।' আল্লাহর রসুল তাদের কাছে আসেন এবং বলেন, 'তোমরা কি ওই লোকজন, যারা এরূপ এরূপ কথা বলেছো? আল্লাহর কসম, তোমাদের মাঝে আমিই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমিই সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। কিন্তু আমি রোজা রাখি, আবার রোজা ভাঙ্গি। আমি সলাত আদায় করি, আবার ঘুমাই। আর আমি নারীদেরকে বিবাহ করি। যে আমার সুন্নাহকে উপেক্ষা করে, সে আমার উম্মত নয়।”
[মুত্তাফাকুন আলাইহি]

দুনিয়া থেকে দূরে সরে থাকার জন্য আমাদের নবি (সাঃ) কখনো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হননি, বরং তার এই নিরাসক্তি আরও গভীর। এটা ছিল অন্তরের নিরাসক্তি ও নির্লিপ্ততা। বস্তুত তার চূড়ান্ত অনুরাগ ও আসক্তি কেবল আল্লাহ (স)-এর সাথে ও আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকার প্রতি। কেননা, তিনিই আল্লাহর বাণী সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করেছেন: "পার্থিব জীবন খেল তামাশা ছাড়া আর কি? বস্তুত আখিরাতের আবাসই প্রকৃত জীবন। কিন্তু হায়, যদি তারা জানতো।” (কুরআন, ২৯:৬৪)

দুনিয়া থেকে নির্লিপ্ত থাকার মানে এই নয় যে, আমরা দুনিয়ার কোনো জিনিসের মালিক হতে পারবো না। প্রকৃতপক্ষে, অনেক সাহাবিই বেশ সম্পদশালী ছিলেন। বরং [দুনিয়া থেকে] নির্লিপ্ত থাকার মানে হচ্ছে: দুনিয়া যা, আমরা সেটাকে সেভাবেই মূল্যায়ন করি এবং দুনিয়ার সাথে আমরা সেভাবেই সম্পর্ক রাখি - দুনিয়াকে আমরা কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি। [দুনিয়া থেকে] নির্লিপ্ত থাকার মানে: দুনিয়া আমাদের যেন হাতে থাকে -আমাদের অন্তরে প্রবেশ না করে যায়। বিষয়টি আলি (রা.) অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন: "[দুনিয়া থেকে] নির্লিপ্ত থাকার মানে এই নয় যে, তুমি কিছুর মালিক হতে পারবে না, বরং এটার অর্থ হচ্ছেঃ (দুনিয়ার) কোনো কিছুই যেন তোমার মালিক হয়ে না বসে।"

জাহাজে সমুদ্রের পানি প্রবেশের ন্যায়, যখন আমরা দুনিয়াকে আমাদের অন্তরে প্রবেশ করতে দেবো, তখনই আমরা নিমজ্জিত হবো। জাহাজের মধ্যে সমুদ্রের পানি প্রবেশ করবে, এমনটি হওয়ার কথা ছিল না, বরং কথা ছিল সমুদ্র হবে [গন্তব্যে পৌঁছানোর] এক মাধ্যম এবং আবশ্যিকভাবে এটা জাহাজের বাইরে থাকবে। ঠিক একইভাবে আমাদের অন্তরে দুনিয়ার প্রবেশের কথা ছিল না। এটা কেবল এক মাধ্যম, যা কোনো অবস্থাতেই যেন আমাদের অন্তরে প্রবেশ না করে, আর না কখনো আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই কারণে আল্লাহ কুরআনে দুনিয়াকে ‘মাতা'আ' হিসেবে উল্লেখ করেন। ‘মাতা'আ' শব্দের অনুবাদ এমন হতে পারে: "ক্ষণস্থায়ী পার্থিব আনন্দের উপকরণ"। দুনিয়া এক উপকরণ মাত্র। এটা এক হাতিয়ার। এটা একটি পথ -এটা গন্তব্য নয়।

ঠিক এই সত্যটি নবি (ﷺ) অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যখন তিনি বলেন: "এই দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? এই দুনিয়াতে আমি তো এক মুসাফিরের মতো, যে কিনা গাছের ছায়াতে অল্প কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নেয় এবং ক্ষাণিকটা আরামের পর, ওই গাছকে পেছনে ফেলে পুনরায় সে পথ চলতে শুরু করে।” [আহমদ, তিরমিযি]

একজন মুসাফিরের উপমাটি একবার চিন্তা করুন। যখন আপনি ভ্রমণ করেন কিংবা আপনি জানেন যে, ওই স্থানে আপনি স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করবেন, তখন কি ঘটে? এক রাতের জন্য যখন আপনি কোনো শহর অতিক্রম করছেন, তখন ওই শহরের প্রতি আপনি কেমন আসক্তি বোধ করেন? যদি জানেন, এটা স্বল্প সময়ের ভ্রমণ, তখন আপনি (কোনো একটা মোটেল, যেমন) 'মোটেল ৬'-এ উঠতে চাইবেন। কিন্তু আপনি কি সেখানে থেকে যাবেন? সম্ভবত না। ধরুন, আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপনাকে স্বল্প মেয়াদের এক প্রকল্পের কাজে নতুন এক শহরে পাঠিয়েছে। এটাও ধরে নেন, ওই প্রকল্প কখন শেষ হবে, তিনি আপনাকে সেটা বলে দেননি। কিন্তু আপনি তো জানেন যে, যেকোনো দিন আপনাকে বাড়ি ফিরে আসতে হবে। এমনটি হলে আপনি ওই শহরে কিভাবে দিন কাটাবেন? আপনি কি সেখানে ব্যাপক হারে সম্পদ বিনিয়োগ করবেন এবং দামি আসবাবপত্র ও গাড়ির পেছনে নিজের পুরো সঞ্চয় উড়িয়ে দেবেন? স্বাভাবিকভাবেই না। এমনকি কেনাকাটার ক্ষেত্রে আপনি কি গাড়ি ভরে খাবার এবং অন্যান্য পচনশীল দ্রব্যাদি ক্রয় করবেন? না। বরং কয়েকটি দিনের জন্য আপনার যতটুকু প্রয়োজন হবে, আপনি ঠিক ততটুকুই ক্রয় করবেন -কেননা, যেকোনো দিন ফিরে আসার জন্য আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপনাকে ডাক দিতে পারেন।

এটাই একজন মুসাফিরের মন-মানসিকতা। যখন এই উপলব্ধি আসে যে, অমুক জিনিসটি ক্ষণস্থায়ী, ওই জিনিসটা প্রতি তখন স্বাভাবিক এক অনাসক্তি চলে আসে। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই হাদিসে নবি (ﷺ) আপন প্রজ্ঞাতে এই সত্যটি চমৎকারভাবে চিত্রিত করেছেন। দুনিয়ার এই জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হওয়ার মাঝে যে বিপদ, তিনি সেটা ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জন্য তিনি এর চেয়ে অন্য কোনো কিছুকে ভয় পেতেন না। তিনি (ﷺ) বলেন: “আল্লাহর কসম, তোমাদের ব্যাপারে আমি দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রাচুর্যে ভরে যাবে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য এটা প্রাচুর্যে ভরে গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে তোমরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করবে, যেভাবে তারা করেছিল। আর যেভাবে তারা ধ্বংস হয়েছিল, তোমরাও সেভাবে ধ্বংস হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহি]

আশীর্বাদে ধন্য নবি (ﷺ) এই পার্থিব জীবনের আসল সত্যকে চিহ্নিত করেছেন। দুনিয়াতে আসক্ত না হয়েই তিনি দুনিয়াতে অবস্থানের সত্যিকার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন। তিনিও ওই একই সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, আমাদের সকলকে সেটা পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু তার জাহাজ ভালোভাবেই জানতো যে, এটা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় এটার গন্তব্য। তার জাহাজ ছিল শুকনো। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যে সমুদ্র সূর্যের আলোতে করে ঝলমল, সেই সমুদ্র যে জাহাজে একবার প্রবেশ করে, সেটাকে (অন্ধকার) মৃত্যুপুরী বানিয়ে ছাড়ে।

📘 রিক্লেইম ইয়োর হার্ট > 📄 অন্তরের কর্তৃত্ব নিজের কাছে ফিরিয়ে নেন

📄 অন্তরের কর্তৃত্ব নিজের কাছে ফিরিয়ে নেন


কেউই ব্যর্থ হতে চায় না। আর খুব কম মানুষই ডুবে যাওয়ার ভাগ্যকে বরণ করে নিতে চাইবে। উত্তাল সমুদ্রের এই জীবন পাড়ি দিতে গেলে কখনো কখনো দুনিয়াকে প্রবেশ করতে না দিয়ে পারা যায় না। কখনো দুনিয়া আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে দুনিয়া আমাদের অন্তরে ঢুকে পড়ে।

আর যেমনিভাবে পানি নৌকাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, তেমনিভাবে দুনিয়া যখন অন্তরে প্রবেশ করে, তখন তা অন্তরকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। সাম্প্রতিককালে ভাঙা নৌকা দেখতে কেমন, তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়; যখন আপনি [দুনিয়ার] সবকিছুকে অন্তরে প্রবেশ করতে দেবেন, তখন কি পরিণতি ঘটে, সেটা আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। আমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, কারণ আমি আমারই মতো একজনকে দেখলাম, যে কিনা এই জীবনের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত মহব্বতে আসক্ত এবং সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে তৃপ্ত করার বাসনায় সে ব্যাকুল। দুনিয়ার সমুদ্র ঠিক যেভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল আমার নৌকাকে, ঠিক সেভাবে তার নৌকাকেও চূর্ণবিচূর্ণ করে এবং সে অথৈ পানিতে পড়ে। কিন্তু সে দীর্ঘ সময় তাতে নিমজ্জিত ছিল, আর কিভাবে সে অতল গহ্বর থেকে উঠে আসবে কিংবা কিসের ওপর ভর দিতে হবে, সেটা তার জানা ছিল না।

তাই সে নিমজ্জিত হলো [এবং দুনিয়া তাকে গ্রাস করে নিলো]।

আপনি যদি দুনিয়াকে আপনার অন্তরে প্রবেশ করতে দেন, তবে সমুদ্র যেমনিভাবে নৌকাকে নিমজ্জিত করে, ঠিক তেমনিভাবে দুনিয়াও আপনার অন্তরকে গ্রাস করে ফেলে। আপনি ডুবে যান সমুদ্রের অতল গহ্বরে, এমনকি সমুদ্রের গহীন তলদেশে। আপনি অনুভব করেন যে, আপনি আপনার নিম্নতর স্তরে পৌঁছে গেছেন। পাপ আর এ জীবনের মহব্বতের জালে আপনি আটকে পড়ে অনুভব করবেন হতাশার কালো মেঘ আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, আপনাকে ঘিরে ধরেছে অন্ধকার। সমুদ্রের তলদেশের বৈশিষ্ট্য এটাই। কোনো আলো সেখানে পৌঁছে না।

যাহোক এই আঁধারঘন স্থানই কিন্তু আপনার জীবনের শেষ অবস্থান নয়। মনে রাখবেন, রাতের আঁধারই ভোরের আলোর পথ দেখায়। যতক্ষণ বইছে আপনার হৃদয়ের স্পন্দন, ততক্ষণ আপনি মৃত নন। আপনাকে এখানেই মরতে হবে না। কখনো কখনো সমুদ্র তলদেশ যাত্রাপথের বিরতির মতো। আর যখনই আপনি আপনার সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছে যান, তখনই আপনার দুটো বিকল্পের একটা গ্রহণের সুযোগ এসে যায়। আপনার হাতে দুটো সুযোগ আছে। হয় আপনি সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তলদেশেই পড়ে থাকবেন; আর না হয় সেখান থেকে মণি-মুক্তা আহরণ করে আবার উঠে দাঁড়াবেন -সাঁতারের এ অভিজ্ঞতা আপনাকে করবে দৃঢ়তর, আর সে রত্নরাজি আপনাকে করে তুলবে আগের চেয়ে ধনী (বিজ্ঞতা ও পরিপক্কতায়)।

আপনি যদি আল্লাহকে চান, তবে তিনি আপনাকে সে অবস্থা থেকে তুলে আনবেন এবং সমুদ্রের তলদেশের আঁধারকে তিনি বদলে দেবেন তাঁর পক্ষ থেকে সূর্যের আলোর উজ্জ্বলতা দিয়ে। যা ছিল এক সময় আপনার চরম দুর্বলতা, তিনি পারেন সেটাকে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করতে। বানিয়ে দিতে পারেন সেটাকে আপনার সমৃদ্ধি, পরিশুদ্ধি এবং পরিত্রাণের মাধ্যম। মনে রাখবেন, কখনো কখনো পতন দিয়েই রূপান্তরের সূচনা ঘটে। তাই পতনকে কখনো অভিশাপ দেবেন না। কেননা, জমিনের বুকেই নিহিত রয়েছে নম্রতা ও বিনয়। এটাকে মেনে নেন। এটা থেকে শিক্ষা নেন। নিঃশ্বাসের সাথে একে নিজের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নেন। আরও শক্তিশালী, আরও বিনয়ী হয়ে ফিরে আসুন। আল্লাহর প্রতি আপনার নির্ভরশীলতার ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন হয়ে ফিরে আসুন। নিজের অসহায়ত্ব ও তার মহিমা দেখার পর ফিরে আসুন। জেনে রাখুন, আপনি যদি ওই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন, তবে অনেক কিছুই আপনার দেখা হয়েছে। সেই তো সত্যিকার প্রতারণার শিকার হয়েছে, যে নিজ সত্তাকে দেখেছে, কিন্তু স্রষ্টার দেখা পায়নি। বঞ্চিত তো সে, স্বীয় অন্তরে স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তার যে ব্যগ্র কামনা সুপ্ত আছে, তা যার নজরে কখনো পড়ে না। নিজের মাধ্যম বা উপায়ের ওপর সে আস্থাবান, কিন্তু ওই মাধ্যম, তার আত্মা এবং অস্তিত্ববান যাবতীয় বিষয় যে আল্লাহর সৃষ্টি, এটা সে একদমই ভুলে যায়।

স্রষ্টা যেন আপনাকে ওই পতিত অবস্থান থেকে উচ্চে তুলে আনেন, সেটা তাঁর কাছে চান। কেননা, যখন তিনি আপনাকে তুলে আনবেন, তখন আপনার [ভাঙা নৌকা বা] জাহাজটি তিনি মেরামত করে দেবেন। চিরকালের জন্য যে অন্তর ভেঙে চুরমার হয়েছে ভেবে আপনি বসে আছেন, তা আবারো জোড়া লাগবে। যা কিছু ভেঙে খান খান, তা আবার পূর্ণ হবে। জেনে রাখুন, কেবল তিনিই পারেন এগুলো করতে। তাই কেবল তাঁকেই খুঁজে বেড়ান।

যখন তিনি আপনাকে রক্ষা করেন, তখন [নিজের] ওই পতনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, গভীর অনুশোচনা বোধ করুন, কিন্তু হতাশার চাদর গায়ে জড়াবেন না। যেমনটি ইবনে কাইয়্যিম (র.) বলেন: “আদম (আলাইহিস সালাম) যখন জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হন, তখন শয়তান আনন্দ উপভোগ করে। কিন্তু সে জানে না, ডুবুরি যখন সমুদ্রে ডুব দেয়, তখন সে মণি মুক্তা সংগ্রহ করে পুনরায় উপরে ফিরে আসে।"

তওবা (ক্ষমা) ও আল্লাহ (স) তায়ালার কাছে প্রত্যাবর্তন করার মাঝে এক শক্তিশালী ও বিস্ময়কর জিনিস নিহিত রয়েছে। আমাদের পূর্ববর্তীরা আমাদের বলেছেন যে, এটা আত্মার পোলিশ (Polish) বা পরিশুদ্ধির ন্যায়। পালিশ করার অবাক করা দিক হচ্ছে, এটা কেবল পরিষ্কার ও স্বচ্ছই করে না, বরং যে জিনিসকে পালিশ করা হয়, সে জিনিস ময়লা হয়ে যাওয়ার আগের থেকে আরও বেশি উজ্জ্বল ও ঝকমকে হয়। আপনি যদি আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করেন, তাঁর ক্ষমা ভিক্ষা চান এবং তাঁর দিকে নিজের জীবন এবং অন্তরকে পুনরায় নিবদ্ধ করেন, তবে অধঃপতিত হওয়ার আগে আপনি যে অবস্থায় ছিলেন, সে অবস্থার চেয়ে আরও সমৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখেন। অধঃপতিত হওয়ার ফলে কখনো কখনো এমন প্রজ্ঞা ও বিনম্রতা অর্জিত হয়, যা এটার আগে কখনো অর্জিত হয় না। ইবনে কাইয়্যিম (র.) লিখেন:
"আমাদের একজন সালাফ (সদাচারী পূর্বসূরি) বলেন: 'প্রকৃতপক্ষে, বাস্তব কথা হলো একজন বান্দার একটি গোনাহ বা পাপের মাধ্যমে একজন জান্নাতে প্রবেশ করে। আবার অপরজন একটি পুণ্যের কাজ করে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করে।' তাকে প্রশ্ন করা হলো: 'কিভাবে এটা?' এর উত্তরে তিনি বলেন: 'যে পাপ করে, প্রতিনিয়ত সে এটা নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ থাকে, যার ফলে সে এ বিষয়ে ভয় পেতে শুরু করে, অনুশোচনা করে, এটার জন্য কান্না-কাটি করে এবং এই পাপের কারণে সে স্বীয় প্রতিপালক, মহাপবিত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে লজ্জা বোধ করে। সে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, এক ভগ্ন হৃদয় নিয়ে এবং তার মাথা থাকে বিনয়ে অবনত। তাই এই পাপ তার জন্য বহু ইবাদত করার চেয়ে বেশি উপকার বয়ে আনে, যেহেতু এটা তাকে বানিয়েছে নম্র ও বিনয়ী এবং এটা বান্দার জন্য সুখ ও সাফল্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এমনকি ওই পাপ তাকে জান্নাতে প্রবেশের কারণে পরিণত হয়। অন্যদিকে, যিনি ভালো কাজ করলেন, তার করা ওই ভালো কাজটিও যে স্রষ্টারই একটি অনুগ্রহ, তিনি সেটা মনে করেন না, উল্টো তিনি অহংকারে মেতে উঠেন এবং নিজেকে নিয়ে চমৎকৃত বোধ করতে থাকেন, বলতে থাকেন, 'আমি এই এই অর্জন করেছি।' এটা তার মাঝে আরও বেশি করে আত্ম-তোষণ, গর্ব ও অহংকার উসকে দেয় এবং এটা তার ধ্বংসাত্মক পরিণতির কারণে পরিণত হয়।"

আল্লাহ (সুবঃ) কুরআনে আমাদেরকে সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যেন আমরা কখনো আশা না হারাই। তিনি বলেন: “বলো: হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছো, তারা আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা, আল্লাহই সকল পাপ মোচন করেন। তিনিই সর্বময় ক্ষমার আধার ও সবচেয়ে দয়াময়।” (কুরআন, ৩৯:৫৩)

তাই যারা স্বীয় সত্তার স্বেচ্ছাচারীতায় সেটার দাসে পরিণত হয়েছেন, নফসানিয়াতের অন্ধকূপ ও কামনা-বাসনায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন, এটা তাদেরকে [জাগ্রত করার] ডাক। যারা দুনিয়ার সমুদ্রে প্রবেশ করেছেন, যারা এটার গহীনে ডুবে গেছেন এবং এটার উত্তাল তরঙ্গে আটকা পড়ে আছেন, এ আহ্বান তাদের প্রতি। উঠুন। উঠে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেন এবং সমুদ্রের কারাগার থেকে বেরিয়ে সত্যিকার দুনিয়ায় আসুন। নিজের মুক্তির জন্য উঠুন। উঠুন আর ফিরে আসুন জীবনের আঙ্গিনায়। স্বীয় আত্মার মৃত্যুকে পেছনে ফেলে আসুন। আপনার আত্মা এখনো বাঁচতে পারে, হতে পারে আগের থেকে আরও বলিয়ান ও পরিশুদ্ধ। আর তওবা নামক পালিশ কি অন্তরকে আগের থেকে আরও সুন্দর করতে সক্ষম নয়? পাপ করে নিজের অন্তরের ওপর যে পর্দার আবরণ লাগিয়ে রেখেছেন, তা তুলে ফেলুন। জীবন ও নিজের মাঝে, আপনার ও মুক্তির মাঝে এবং আলো ও নিজের মাঝে যে পর্দা তৈরি করে রেখেছেন, সেটাকে সরিয়ে ফেলুন। পর্দার আবরণ সরিয়ে জেগে উঠুন। আপন সত্তার কাছে ফিরে আসুন। যেখান থেকে শুরু করেছেন, আবার সেখানে ফিরে আসুন। বাড়ি ফিরে আসুন। জেনে রাখুন, যখন সকল দরজা আপনার মুখের ওপর বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন একটি দরজা সর্বদাই খোলা থাকে। ওই দরজা সর্বদাই খোলা থাকে। সেটার অন্বেষণ করুন। তাঁকে খুঁজুন এবং তিনিই আপনাকে নির্মম সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন তাঁর অপার করুণার সূর্যের কাছে।

এই দুনিয়া আপনাকে ভাঙতে পারে না, যদি না আপনি তাকে সেটার অনুমতি দেন। দুনিয়া আপনাকে আয়ত্ত করতে পারে না, যদি না আপনি নিজে থেকে চাবির গোছা তার হাতে তুলে দেন, যদি না আপনি নিজের অন্তরকে দুনিয়ার হাতে তুলে দেন। যদি তেমনটিই হয়ে থাকে, যদি আপনি নিজের ওই চাবিগুলো কিছু সময়ের জন্য তুলে দিয়ে থাকেন দুনিয়ার হাতে, তবে সেটা ফিরিয়ে নেন। এটাই শেষ নয়। এ অবস্থাতেই আপনাকে মরতে হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। নিজের অন্তরকে পুনরুদ্ধার করুন এবং এটাকে তার উপযুক্ত মালিকের হাতে সমর্পণ করুন, আর সেই মালিক হলেন -আল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00