📄 প্যারাটিকে খালি করা
কোনো পাত্র ভরার আগে আপনাকে অবশ্যই ওই পাত্র খালি করে নিতে হবে। অন্তর এক পাত্রের ন্যায়। অন্যসব পাত্রের ন্যায় অন্তরকে পূর্ণ করার আগে এটাকে অবশ্যই খালি করে নিতে হবে। যতক্ষণ কারো অন্তর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত যিনি) ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা পূর্ণ থাকে, ততক্ষণ সে তার অন্তরকে আল্লাহ দ্বারা পূর্ণ করার আশা কখনো করতে পারে না।
অন্তরকে খালি করার মানে এই নয় যে, আপনি ভালোবাসবেন না। সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকৃত ভালোবাসা ততক্ষণ বিশুদ্ধ থাকে, যতক্ষণ না এটা মিথ্যা অনুরাগের ওপর ভিত্তিশীল হয়। প্রথমত, অন্তরকে খালি করার প্রক্রিয়া শাহাদা (কালেমার ঘোষণা)-এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে, ঈমানের ঘোষনার এই বাক্য শুরু হয়েছে, একটা তাৎপর্যপূর্ণ অস্বীকৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ শূন্যকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা। সত্যিকার তাওহিদ (তথা সত্যিকার একত্ববাদে) পৌঁছানোর আগে, একক প্রভুতে আমাদের ঈমান রয়েছে, এই দাবিকে দৃঢ় করার পূর্বে, আমরা সবার আগে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করি: "লা ইলাহা” (কোনো ইলাহ নেই)। উপাসনার বস্তুকে ইলাহ বলে। কিন্তু এটা উপলব্ধি করা জরুরি যে, ইলাহ এমন কিছু নয় যে, যার কাছে আমরা শুধু প্রার্থনা করি। ইলাহ এমন এক জিনিস, যাকে কেন্দ্র করে আমাদের জীবন আবর্তিত হয়, যাকে আমরা মান্য করি এবং আমাদের কাছে যার গুরুত্ব সবকিছুর উপরে এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
এটা এমন এক জিনিস, যেটার জন্য আমরা বেঁচে থাকি – যেটা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
নাস্তিক, সংশয়বাদী, মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি থেকে আরম্ভ করে প্রত্যেক ব্যক্তিরই একজন ইলাহ আছে। আমাদের সকলেই কিছু না কিছুর উপাসনা করি। অধিকাংশ মানুষের জন্য উপাসনার বস্তু এই পার্থিব জীবন তথা দুনিয়া থেকে নেওয়া। কিছু মানুষ সম্পদের উপাসনা করে, কেউ করে প্রতিপত্তির উপাসনা, কেউ খ্যাতির উপাসনা করে, আবার কেউ উপাসনা করে নিজের মেধার। কিছু মানুষ আবার অন্যের উপাসনা করে। আবার কুরআনের বর্ণনা মোতাবেক অনেকেই স্বীয় সত্তা, স্বীয় কামনা ও খেয়াল-खुশির উপাসনা করে। আল্লাহ বলেন:
"আপনি কি তাকে দেখেন না, যে (নিজের) কামনা ও বাসনাকে নিজের ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে পথভ্রষ্ট হতে দেন এবং তার কর্ণে ও অন্তরে (এবং তার উপলব্ধিতে) মোহর লাগিয়ে দেন এবং তার দৃষ্টিশক্তির ওপর পর্দা ঢেলে দেন। আল্লাহ ছাড়া এমন কে আছে, যে তাকে পথ দেখাতে পারে (যখন আল্লাহ তার থেকে হেদায়েতকে সরিয়ে রেখেছেন)? এরপরেও কি এরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?" أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (কুরআন, ৪৫:২৩)
এই উপাসনার বস্তুগুলি এমন জিনিস যেগুলো প্রতি আমরা অনুরক্ত বা আসক্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের আসক্তির বস্তুটি কেবল আমাদের ভালোবাসার বস্তুই নয়। বরং গূঢ় দৃষ্টিতে, এটা আমাদের খুবই প্রয়োজনের বস্তু। এটা এমন এক জিনিস, যা হারিয়ে গেলে আমরা চরমভাবে ভেঙে পড়ি। আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু বা কেউ যদি থেকে থাকে, যেটাকে পরিত্যাগ করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়, তবে [বুঝে নিতে হবে] আমরা মিথ্যা আসক্তির মাঝে আছি। নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে কেন তার সন্তানকে কুরবানি করতে বলা হলো? তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই এমন আদেশ দেওয়া হয়েছে। এটা ছিল মিথ্যা আসক্তির কবল থেকে তাকে মুক্ত করার উপায়। একবার যখন তিনি (এ থেকে) মুক্ত হয়ে গেলেন, তখন (তার অনুরাগের বস্তুকে নয়), বরং তার ভালোবাসার বস্তুকে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু বা কেউ যদি থেকে থাকে, যা হারালে আমরা চরমভাবে ভেঙে পড়ি, [তখন বুঝতে হবে], আমরা মিথ্যা আসক্তির কবলে রয়েছি। মিথ্যা আসক্তি হলো ওইসব জিনিস, যেগুলো হারালে আমরা অনেকটা অস্বাভাবিকভাবে আকুল হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হই। এটা এমন এক জিনিস, যেটা হারানো সামান্য সম্ভাবনাও যদি আমাদের অন্তরে সৃষ্টি হয়, তবে আমরা সেটার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি। আমরা সেটার পেছনে হন্যে হয়ে ছুটতে থাকি। কেননা, অনুরাগ বা আসক্তির জিনিস হারানোর মানেই হচ্ছে: চরমভাবে ভেঙে পড়া। অর্থবিত্ত, অর্জিত বিষয়াদি, অন্য মানুষজন, কোনো চিন্তা, দৈহিক আনন্দ, নেশার দ্রব্য, প্রতিপত্তির নিশানা (Status Symbol), আমাদের ক্যারিয়ার, আমাদের ভাবমূর্তি, অন্য লোকেরা কিভাবে আমাদেরকে দেখে বা মূল্যায়ন করে, আমাদের বাহ্যিক প্রকাশ বা সৌন্দর্য, যেভাবে আমরা পোশাক পরিধান করি কিংবা অন্যের সামনে উপস্থিত হই, আমাদের ডিগ্রিসমূহ, আমাদের চাকুরির পদ, [অন্যকে] নিয়ন্ত্রণ করার সুপ্ত ইচ্ছা কিংবা আমাদের বুদ্ধি বা যুক্তি, এসবই হতে পারে [আমাদের] অনুরাগ বা আসক্তির বস্তু। যতক্ষণ না আমরা এসব মিথ্যা অনুরাগ বা আসক্তিকে ভেঙে ফেলতে সমর্থ হচ্ছি, ততক্ষণ আমরা আমাদের অন্তরের পাত্রকে খালি করতে সক্ষম হবো না। পাত্রকে (তথা অন্তরকে) খালি করতে না পারলে, আল্লাহর দ্বারা সত্যিকার অর্থে আমরা সেটা কখনো পূর্ণ করতে সমর্থ হবো না।
অন্তরকে সমস্ত মিথ্যা অনুরাগ বা আসক্তি থেকে মুক্ত করার এই সংগ্রাম, পাত্রকে খালি করার এই সংগ্রামই পার্থিব জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। এই সংগ্রামই তাওহিদ (তথা সত্যিকার একত্ববাদের) প্রাণসত্তা। আপনি যদি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভকে গভীরভাবে যাচাই করে থাকেন, তবে দেখবেন, এগুলো মূলত [আপনার মাঝে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও আসক্তি] থেকে নির্লিপ্ত বা অনাসক্ত থাকার ব্যবস্থা এবং এর প্রক্রিয়াকে সচল করে:
শাহাদা (কালেমার ঘোষণা): ঈমানের ঘোষণা হলো (বস্তুগত আকর্ষণগুলির প্রতি) অনাসক্তির সেই মৌখিক ঘোষণা, যা অর্জনের জন্য আমরা সচেষ্ট থাকি; যার দাবি হলো আমাদের ইবাদত, পরিপূর্ণ ইখলাস, ভালোবাসা, ভয়-ভীতি এবং আশার কেন্দ্রবিন্দু হবেন আল্লাহতায়ালা। শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালাই। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য সমস্ত জিনিসের আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাফল্যের মাঝেই তাওহিদের সত্যিকার রূপের বিকাশ ঘটে।
সলাত (দৈনিক ৫ ওয়াক্তের সলাত): দৈনিক পাঁচবার আমরা আবশ্যিকভাবে নিজেদেরকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাদের স্রষ্টা ও জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের ব্যাপারে গভীর মনোযোগে নিবিষ্ট হই। দুনিয়াবী যে কাজে আমরা ব্যস্ত থাকি না কেন, দৈনিক পাঁচবার আমরা সবকিছু থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। দিনে একবার, আর না হয় সপ্তাহে একবার কিংবা পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের সবগুলোকে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়েও আদায়ের বিধান দেওয়া যেতো, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি, বরং সলাতকে গোটা দিনের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি যথা সময়ে তাদের সলাতগুলো আদায় করে, তবে [দুনিয়াতে] আসক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। যখনই আমরা দুনিয়ার কোনো বিষয়ে মশগুল হতে থাকি, (মশগুল হতে থাকি আমাদের চাকরির কাজে, আমাদের উপভোগ করা অনুষ্ঠানগুলোতে, আমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে, ওই ব্যক্তির চিন্তাতে, যাকে আমাদের মন থেকে সরাতে পারছি না), তখনই আমাদেরকে ওইসব জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে এবং নিজেদের মনোযোগকে একমাত্র সত্যিকার আসক্তির বস্তুতে (অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি) নিবদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়।
সিয়াম (রোজা রাখা): নিজেকে [দুনিয়ার মোহ] থেকে বিচ্ছিন্ন করার নামই রোজা। খাবার, পানি, যৌন চাহিদা, অসার কথাবার্তা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখাই সিয়াম বা রোজা। দৈহিক সত্তাকে [এসব থেকে] বিরত রাখার মাধ্যমে আমরা আমাদের রুহানি সত্তাকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ, পরিশুদ্ধ ও মর্যাদাময় করি। রোজার মাধ্যমে নিজেদেরকে আমরা দৈহিক প্রয়োজন, কামনা ও বাসনা থেকে মুক্ত রাখতে বাধ্য হই।
যাকাত (সাদাকা বা দান): যাকাত হচ্ছে নিজেদেরকে নিজেদের [উপার্জিত] সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ খরচ করা। দানের মাধ্যমে [নিজেদের অন্তরে বিদ্যমান] সম্পদের আসক্তিকে আমরা ভেঙে চুরমার করতে বাধ্য হই।
হজ (তীর্থযাত্রা): [দুনিয়া থেকে নিজেকে] বিচ্ছিন্ন করার সবচেয়ে ব্যাপক ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আমল হচ্ছে হজ। হজের উদ্দেশ্যে যিনি রওনা দেন, তিনি তার জীবনের সব কিছুকে পেছনে ফেলে আসেন। তিনি তার পরিবার, তার বাড়ি, তার ছয় সংখ্যার বেতন, তার উষ্ণ বিছানা, তার আরামদায়ক জুতা এবং ব্র্যান্ড জামা, কাপড় থেকে শুরু করে সবকিছু ত্যাগ করার বিনিময়ে গ্রহণ করেন দুটুকরো কাপড় পড়ে মাটিতে কিংবা জনসমুদ্রে তাবু টাঙ্গিয়ে শোয়া। হজের মাঝে প্রতিপত্তির কোনো নিশানা নেই। না কোনো টমি হিলফিগার° ইহরাম, আর না কোনো ফাইভ স্টার তাবু (হজের যেসব প্যাকেজ ৫ স্টার হোটেলের কথা বলে, তারা হজের আগে ও পরে এসব সুবিধা দেওয়ার কথা বলে। কেননা, হজের সময় আপনি মিনাতে তাবু পাতেন এবং মুজদালিফাতে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে ঘুমান)।
চিন্তা করে দেখুন যে, আল্লাহ তাঁর অসীম প্রজ্ঞা ও রহমত হিসেবে আমাদেরকে কেবল দুনিয়া থেকে নিরাসক্ত হতে বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং কিভাবে সেটা করতে হবে, সেটাও বলে দিয়েছেন। [ইসলামের] এই পাঁচটি স্তম্ভ ছাড়াও আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ থেকেও [দুনিয়া] বিমুখতার এই ঝলক প্রতিফলিত হয়। নবি (ﷺ) আমাদেরকে আর সব মানুষ থেকে পৃথক হতে বলেছেন, এমনকি সেটা যদি বেশভূষাতেও হয়। হিজাব, কুফি” পরিধানের মাধ্যমে কিংবা দাড়ি রাখার মাধ্যমে আপনি চাইলেও সবার সাথে মিশে যেতে পারেন না। নবি (ﷺ) বলেন:
“ইসলামের সূচনা হয়েছে অপরিচিতের মতো এবং খুব শীঘ্রই এটা শুরুর মতো অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে, তাই সেই অপরিচিতদের জন্য রইলো সুসংবাদ।” [মুসলিম]
এই দুনিয়াতে “অপরিচিত” হওয়ার মাধ্যমে দুনিয়াতে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে না গিয়ে আমরা এর মধ্যে বসবাস করতে পারি। [দুনিয়া প্রতি] নিরাসক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই আমরা পারি আমাদের অন্তরের পাত্রকে খালি করতে এবং ওই জিনিসের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত করতে, যেটা অন্তরকে দেয় পুষ্টি ও জীবনীশক্তি। অন্তরকে [দুনিয়ার ভোগ বিলাস থেকে] শূন্য করে আমরা এটাকে সত্যিকার পুষ্টি হাসিলের জন্য প্রস্তুত করি।
[আর তা হলেন] আল্লাহ (অর্থাৎ তাঁর মহব্বত)।
টিকাঃ
* লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) এই ঘোষণা কালিমা শাহাদাতের প্রথম অংশ। যেহেতু নবি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর মাধ্যমে আমরা কালিমা শাহাদাতের এই অংশটুকু লাভ করেছি, তাই স্বাভাবিকভাবে বাকি অংশ হবে -মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর রসুল।
বস্তুত, এটা নিছক কোনো ঘোষনা নয়, বরং এটা জীবনের এক সিদ্ধান্ত - Policy Declaration। যে সিদ্ধান্ত মোতাবেক একজন মুসলিমের গোটা জিন্দেগি পরিচালিত হওয়ার কথা। যেটার উজ্জ্বল নমুনা আমরা নবি (ﷺ)-এর সাহাবিগণের মাঝে দেখতে পাই। এই কালেমা তাদের জীবনকে এতটাই আন্দোলিত করেছিল যে, তারা এই কালেমার বাস্তবায়নের জন্য নিজের জীবনকে পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন, আর এ কারণেই তারা হয়েছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম ও আল্লাহর সুসংবাদপ্রাপ্ত জাতি এবং যাদের কাছে হার মেনেছিল গোটা বিশ্ব (সম্পাদক)।
১০ পাশ্চাত্যের একটি ব্র্যান্ড।
১” এক ধরনের টুপি, যা বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা পরিধান করেন- (সম্পাদক)।
📄 উপহারের প্রতি ভালোবাসা
আমরা সবাই উপহার পেতে ভালোবাসি। যে আশীর্বাদ আমাদের জীবনকে সৌন্দর্যে আলোকিত করে, আমরা সেটাকে ভালোবাসি। আমরা ভালোবাসি আমাদের সন্তান, আমাদের জীবনসঙ্গি, আমাদের পিতামাতা, আমাদের বন্ধু-বান্ধবদেরকে। ভালোবাসি আমাদের যৌবন এবং আমাদের স্বাস্থ্যকে। আমাদের বাড়ি, আমাদের গাড়ি, আমাদের অর্থ এবং আমাদের সৌন্দর্যকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু যখন কোনো উপহার নিছক উপহারের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠে, তখন কি ঘটে? আশা যখন রূপ নেয় প্রয়োজনে এবং অনুগ্রহ যখন নির্ভরশীলতায় পরিণত হয়, তখন কি ঘটে? যখন উপহার আর নিছক কোনো উপহার থাকে না, তখন ব্যাপারটি কেমন দাঁড়ায়?
উপহার আসলে কি? উপহার এমন এক জিনিস, যেটা আমাদের নিজেদের থেকে আসে না। উপহার এমন এক জিনিস, যেটা দেওয়া হয় এবং সেটা আবার ফিরিয়েও নেওয়া যায়। উপহারের আসল মালিক আমরা নই। আর আমাদের টিকে থাকার জন্য উপহার অত্যাবশকীয় নয়। এটা আসে আর যায়। আমরা উপহার পেতে চাই এবং তা পেতে ভালোবাসি -কিন্তু সেসব উপহার আমাদের অস্তিত্বের জন্য আবশ্যক নয়, আর না আমরা সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা সেগুলো পাওয়ার জন্য বেঁচে থাকি না, আর না আমরা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হলে মারা যাই। না সেগুলো আমাদের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস, না আমাদের আহার, কিন্তু আমরা সেগুলো পেতে ভালোবাসি। এমন কে আছে, যে উপহার পেতে ভালোবাসে না? এমন কে আছে, যে রাশি রাশি উপহার পেতে অপছন্দ করবে? আর আমরা 'আল-করিম' তথা সবচেয়ে উদার সত্তার নিকট এই আর্জি পেশ করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর উপহার থেকে কখনো বঞ্চিত না করেন। এতদসত্ত্বেও, উপহার এমন কিছু নয়, যার ওপর আমরা নির্ভর করি, আর না আমরা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হলে মৃত্যুবরণ করি।
মনে রাখবেন, কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার দুটো স্থান আছে – হাত এবং অন্তর। উপহার আমরা কোথায় রাখি? উপহারকে অন্তরে ধরে রাখা হয় না। এটা হাতে ধরে রাখা হয়। আর তাই যখন উপহার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সেটা হারানোর যন্ত্রণা হাতে অনুভব হওয়া উচিত-ওই যন্ত্রণা অন্তরে অনুভূত হওয়ার কথা নয়। এই পার্থিব জীবনে যিনি দীর্ঘ একটা সময় পার করেছেন, তিনি জানেন যে, হাতে অনুভূত হওয়া যন্ত্রণা এবং অন্তরে অনুভূত হওয়া যন্ত্রণা এক নয়। অনুরাগ, নেশা ও নির্ভরতার কোনো জিনিস হারালে অন্তরে যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এই যন্ত্রণা অন্য কোনো যন্ত্রণা মতো নয়। এটা সাধারণ কোনো যন্ত্রণা নয়। এই যন্ত্রণা জানান দেবে যে, আমরা আমাদের আসক্তির কোন বস্তু হারিয়েছে। এটা ছিল এমন এক উপহার, যা ভুল জায়গায় রাখা হয়েছিল।
হাতে অনুভূত হওয়া যন্ত্রণাও এক ধরনের যন্ত্রণা -কিন্তু সেটা ভিন্ন ধরনের। আসলেই ভিন্ন। কোনো কিছু হারানোর ফলে যে ক্ষতি হয়, হাতে সেটারই যন্ত্রণা অনুভূত হয়, কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা এমন কিছু হারাই না, যার ওপর আমরা নির্ভরশীল। যখন আমাদের হাত থেকে কোনো উপহার কেড়ে নেওয়া হয় -বা আমাদেরকে আদৌ কোনো উপহার দেওয়া হয় না- তখন আমরা হারানোর সাধারণ মানবীয় যন্ত্রণা অনুভব করি। আমরা দুঃখ করি। আমরা কাঁদি। কিন্তু ওই যন্ত্রণাটা আমাদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, আমাদের অন্তর স্বাভাবিক ও প্রাণ চঞ্চল থাকে। এটা এজন্য যে, অন্তর শুধু আল্লাহরই জন্য।
এবং শুধুই আল্লাহর জন্য।
যে জিনিস আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয় কিংবা (হারিয়ে ফেলার) ভীতি সৃষ্টি করে, সেই বিষয়গুলো যদি আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করি, তবে যে যে উপহারকে ভুল স্থানে রাখা হয়েছে, সেগুলো আমরা নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবো। আমরা যদি বিবাহ করতে না পারি, নিজের মনের মানুষকে না পাই, চাকুরি খুঁজে না পাই, নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে না পারি, ডিগ্রি অর্জন করতে না পারি কিংবা নির্দিষ্ট Status-এ উপনীত হতে না পারি – এই সবকিছু যদি আমাদের গ্রাস করে ফেলে, তবে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করা জরুরি। উপহারটি যে স্থানে সংরক্ষিত আছে, সেখান থেকে এটাকে সরাতে হবে। ওই উপহারকে আমাদের অন্তর থেকে সরিয়ে এটাকে তার উপযুক্ত স্থান অর্থাৎ আমাদের হাতে ফিরিয়ে আনতে হবে।
আমরা এসব জিনিসকে ভালোবাসতেই পারি। ভালোবাসাটা এক মানবীয় গুণ। যেসব উপহার ভালোবাসি, সেগুলো পেতে চাওয়াটা মানুষের এক সাধারণ প্রকৃতি। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা ওই উপহারকে আমাদের অন্তরে জমা করি, আর আল্লাহকে আমরা আমাদের হাতে স্থান দেই। পরিহাসের বিষয় হলো, আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহকে ছাড়াই আমরা বাঁচতে পারি, কিন্তু যখন আমরা উপহারটি হারিয়ে ফেলি, তখন আমরা ভেঙে পড়ি এবং আমরা দাঁড়াতেও পারি না।
ফলস্বরূপ, সহজেই আমরা আল্লাহকে (আমাদের বাস্তব জীবন থেকে)১২ একপাশে সরিয়ে রাখি কিন্তু আমাদের অন্তর ওই উপহার ছাড়া এক বিন্দু নিঃশ্বাসও নিতে পারে না। বস্তুত উপহারের স্বার্থে আমরা আল্লাহকে পাশে সরিয়ে রাখতেও দ্বিধাবোধ করি না। তাই বিলম্ব করে সলাত আদায় করা, কিংবা সলাত আদায় না করাটা আমাদের জন্য বেশ সহজ ব্যাপার, কিন্তু আমার কাজের মিটিং বা সভা, আমার সিনেমা, আমার ছুটি কাটানো, আমার কেনাকাটা, আমার ক্লাস, আমার পার্টি কিংবা আমার বাস্কেটবল (অথবা ক্রিকেট বা ফুটবল) ১৩ খেলা দেখাটা কোনোভাবেই মিস করা বা বাদ দেওয়া যাবে না। সুদের ভিত্তিতে ঋণ নেওয়া কিংবা মদ বা অ্যালকোহল বিক্রি করা বেশ সহজ, কিন্তু আমাকে আমার লাভের পরিমাণ এবং সম্মানজনক ক্যারিয়ার থেকে বঞ্চিত করো না। আমাকে বঞ্চিত করো না আমার নতুন মডেলের গাড়ি এবং বিলাসবহুল বাড়ি থেকে। কোনো হারাম সম্পর্ক বা ডেটে যাওয়া সহজ, কিন্তু আমাকে আমরা ভালোবাসার মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে রেখো না। হিজাব পরিধান না করাটা বা খুলে ফেলা সহজ ব্যাপার, কিন্তু আমাকে আমার সৌন্দর্য, আমার বাহ্যিক অবয়ব, আমার বিবাহের প্রস্তাব কিংবা লোকদের সামনে আমার ছবি বা ইমেজ থেকে বঞ্চিত করো না। আল্লাহ যে শালীনতাকে সুন্দর বলেছেন, সেটাকে দূরে নিক্ষেপ করাটা বেশ সহজ, কিন্তু আমাকে আমার সরু, আঁটসাঁট জিন্স পড়া থেকে বঞ্চিত করো না, কারণ সমাজ এটাকে সৌন্দর্যের প্রতীক বলে আখ্যা দিয়েছে।
এমনটি ঘটে, কারণ উপহারটি আমাদের অন্তরে অবস্থান করছে, যেখানে আল্লাহ রয়েছেন আমাদের হাতে। আর যে জিনিস হাতে থাকে, সেটাকে তো খুব সহজেই এক পাশে সরিয়ে রাখা যায় (তথা উপেক্ষা/অবহেলা করা যায়)। আর যে জিনিসের অবস্থান অন্তরে, সে জিনিস ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না এবং সেটা পাওয়ার জন্য আমরা যেকোনো কিছু কুরবানি পর্যন্ত দিতে পারি। কিন্তু আজ হোক, আর কাল হোক, নিজেদেরকে এই প্রশ্ন করা আবশ্যক যে, আসলে আমরা কোন জিনিসের ইবাদত করি: উপহার না উপহার দাতার? আমরা কি সৌন্দর্যের উপাসনা করি, নাকি আমরা যাবতীয় সৌন্দর্যের উৎস ও তাঁর "আধার"-এর ইবাদত করি? আমরা কি রিযিকের উপাসনা করি, নাকি আমরা রিযিক দাতার ইবাদত করি?
সৃষ্টির না স্রষ্টার -কার ইবাদত করি?
আমরা যা পছন্দ করি, তার ট্রাজেডি হচ্ছে: [কোনো বস্তুর অনুরাগ বা আসক্তির শিকল দিয়ে আমরা আমাদের ঘাড়কে আবদ্ধ করার পর আমরা প্রশ্ন করি, আমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কেন। (জীবন রক্ষাকারী)" "সত্যিকার বাতাস"-কে আমরা উপেক্ষা করি এবং এরপর অবাক হয়ে [বলি], আমরা কেন শ্বাস নিতে পারছি না। আমরা আমাদের (আত্মার) একমাত্র খোরাককে ফেলে দেই এবং এরপর অভিযোগের সুরে চিৎকার করতে থাকি, আমরা অনাহারে কেন মরছি। সর্বোপরি, ছুরি দিয়ে আমরা নিজেদের বুকেই আঘাত করার পর আমরা নিজেরাই কান্না শুরু করি, কেননা, এটা সত্যিই ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু আমরা যাই করি না কেন, তা আমরা নিজেদের সাথেই করি। আল্লাহ বলেন:
"এবং তোমাদের ওপর যেসব বিপদ মুসিবত আপতিত হয়, সেগুলো তোমাদের নিজেদের হাতেরই কামাই, তথাপি তিনি তোমাদের (অধিকাংশ পাপকে) মার্জনা করে থাকেন।" وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
(কুরআন, ৪২:৩০)
হ্যাঁ, আমরা যা কিছুই করি না কেন, তা আমরা নিজেদের সাথেই করি। কিন্তু লক্ষ্য করুন আয়াতটি কিভাবে শেষ হয়েছে: "তিনি অধিকাংশ পাপ ক্ষমা করেন।” এখানে ব্যবহৃত 'ইয়া'ফু'১৬ শব্দটি আল্লাহর "আল-আ'ফু” নাম থেকে উৎসারিত। এটার মর্ম কেবল ক্ষমা বা মার্জনা করাই নয়, বরং এটা সম্পূর্ণরূপে মুছে দেওয়ার মর্মকেও ধারণ করে, আর, তাই যতবারই আমরা নিজেদের বুকে ছুরি চালাই না কেন, ততবারই আল্লাহ আমাদেরকে এমনভাবে সারিয়ে তুলতে পারেন যে, মনে হবে যেন ছুরির আঘাত কখনোই পড়েনি! আর 'আল-জাব্বার' (যিনি মেরামত করেন), একমাত্র তিনিই পারেন এ ক্ষত সারিয়ে তুলতে।
যদি আপনি তাঁকে খুঁজেন, তাঁকে অন্বেষণ করেন।
শ্বাস নেওয়ার বাতাসের বিনিময়ে যিনি গলার হার বেছে নেন, তার বোকামির মাত্রা কতটুকু? এরূপ ব্যক্তিই বলে: "আমাকে গলার হার দাও, তারপর তুমি আমার থেকে শ্বাস নেওয়ার বাতাস নিয়ে নিতে পারো। আমার শ্বাসরোধ করো, কিন্তু মরার সময় আমার গলায় হারটি যেন ঝুলতে থাকে, সেটা নিশ্চিত করো।" আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হচ্ছে, ওই হারটিই আমাদের শ্বাসরোধ করে। আমাদের অনুরাগের বস্তু, যেটাকে আমরা আল্লাহর চেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেটাই আমাদের ধ্বংস করে।
আমাদের সমস্যার সূত্রপাত ঘটে তখন, যখন আমরা উপহারকে নিছক একটি উপহার না ভেবে, সেটাকে আমাদের শ্বাস নেওয়ার বাতাস ভাবতে শুরু করি। আর, আমাদের অন্ধত্বের কারণে আমরা ওই উপহারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সত্যিকার বাতাসকে উপেক্ষা করি। ফলশ্রুতিতে, যখন আমাদের থেকে ওই উপহার কেড়ে নেওয়া হয় -কিংবা আমাদেরকে যদি আদৌ ওই উপহার দেওয়া না হয়- তখন আমরা ভাবি, আমাদের বেঁচে থাকাটাই বুঝি দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই মিথ্যাটাকে অবিরতভাবে আমরা নিজেদেরকে বলে যাই, যতক্ষণ না আমরা এটা বিশ্বাস করতে শুরু করি। এটা কোনোভাবেই সত্য নয়। আমাদের জন্য হারানোর মতো কেবল একটিই জিনিস আছে, যেটা [হারালে] উদ্ধার করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। জীবনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের একটিই কারণ আছে, যেটার সাহায্য ছাড়া আমরা সামনে এগুতেই পারবো না [আর সেটা হচ্ছে: নিজেদের জীবনে আল্লাহকে হারিয়ে ফেলা। কিন্তু ভাগ্যের নিদারুন পরিহাস হচ্ছে, আমাদের অনেকেই তাদের জীবন থেকে আল্লাহকে হারিয়ে ফেলেছি, অথচ আমরা কিনা ভেবে বসে আছি যে, আমরা এখনো বেঁচে আছি। তাঁর উপহার তথা নেয়ামতের প্রতি আমাদের ভ্রমাত্মক নির্ভরশীলতা আমাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছে। আসলেই বড় ধরনের ধোঁকা।
আল্লাহই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়স্থল। তাঁর দেওয়া উপহারসমূহ নয়। আল্লাহই আমাদের ভরসা এবং তিনিই আমাদের সত্যিকার প্রয়োজন, তিনিই আমাদের একমাত্র প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন: "আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নয়? অথচ তারা আপনাকে তাঁর পরিবর্তে অন্য (ইলাহের) ভয় দেথায়! আল্লাহ যাকে গোমরাহিতে ছেড়ে দিতে চান, তাকে পথ দেখানোর মতো কেউ আছে কি?"
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ وَیُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ (কুরআন, ৩৯:৩৬)
আমাদের সবারই প্রয়োজন আছে এবং আমাদের সবারই আছে চাহিদা। আমাদের সত্যিকার ভোগান্তি তখনই আরম্ভ হয়, যখন আকাঙ্ক্ষাকে আমরা নিজেদের অপরিহার্য প্রয়োজনে রূপান্তরিত করি এবং আমাদের সত্যিকার প্রয়োজন (তথা আল্লাহকে) এমন বস্তুতে রূপান্তরিত করি, যেটা না হলে আমাদের তেমন কিছু যায় আসে না। আমাদের আসল ভোগান্তির সূচনা তখনই, যখন আমরা মাধ্যমকে গন্তব্যের সাথে গুলিয়ে ফেলি। আল্লাহই আমাদের একমাত্র গন্তব্য। অন্য সবকিছুই মাধ্যম। আমাদের ভোগান্তির সূচনা তখনই হবে, যখন আমরা নিজেদের চোখকে গন্তব্য থেকে সরিয়ে ফেলে, মাধ্যমের মাঝেই নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলি।
প্রকৃতপক্ষে, উপহারের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা। [আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর] এক মাধ্যমে এই উপহার। উদাহরণস্বরূপ, নবি (ﷺ) কি বলেননি যে, বিবাহ দ্বীনের অর্ধেক? কেন? কারণ জীবনের খুব কম ক্ষেত্রই আছে, যা বিবাহের মতো একজনের চরিত্র গঠনের ওপর সামগ্রিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, দয়া, বিনম্রতা, উদারতা, আত্মত্যাগ এবং নিজের বদলে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার গুণগুলো সম্বন্ধে আপনি পড়তে পারেন, কিন্তু আপনি কখনো এই গুণগুলোর বিকাশ সাধন করতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনি এমন পরিবেশে পড়ছেন, যে পরিবেশ এসব গুণের পরীক্ষা নেয়।
বিবাহের মতো একটা নেয়ামত আপনাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মাধ্যমে হতে পারে, যতক্ষণ এটা নিছক একটি মাধ্যম থাকে এবং এটা জীবনের লক্ষ্যে পরিণত না হয়। আল্লাহর দেওয়া এসব নেয়ামত তাঁর কাছে পৌঁছানোর এক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে, যতক্ষণ এগুলোর অবস্থান অন্তরে না হয়ে [আমাদের] হাতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার অন্তরে যা বাস করে, সেটাই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অন্তরের ওই জিনিসটি তখন আপনার পরম আরাধ্য বস্তুতে পরিণত হয় এবং ওই জিনিসটি পেতে এবং ধরে রাখতে আপনি যেকোনো ধরনের কুরবানি পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত থাকেন। ওই বস্তুটি তখন আপনার নির্ভরতার মৌলিক ভিত্তিতে পরিণত হয়। আর, তাই এটা এমন এক জিনিস হতে হবে, যা হবে চিরন্তন, যার শ্রান্তি বা অবসাদ বলে কিছু থাকবে না এবং যা ভেঙে যাবে না। আর এটা এমন জিনিস হবে, যা কখনো ছেড়ে চলে যায় না। কেবল একটি জিনিসই এমন হতে পারে: [এবং তিনিই] স্রষ্টা।
টিকাঃ
১২ (সম্পাদক)।
১০ - (সম্পাদক)।
* - (সম্পাদক)।
* - (সম্পাদক)।
* মূল আরবি: يَعْفُو - (সম্পাদক)।
📄 প্রশান্তির প্রগাঢ় মুহূর্ত
আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে কিছু প্রগাঢ় মুহূর্ত আছে। আমার বেলায় ওই মুহূর্তটি উপস্থিত হয়, মাসজিদুল হারামের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। আমার ওপরে আকাশ, নিচে কাবার সুন্দরতম দৃশ্য। এ সময় (আমি প্রত্যক্ষ করি) আল্লাহর এক অপূর্ব নিদর্শন – এই [পার্থিব] জীবন এবং আখিরাতের জীবন। আমার চারদিকে মানুষের ভিড়, যা এ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। কিন্তু আমার জন্য অবস্থা এমন হলো যেন, আমি সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে আছি শুধুই আল্লাহপাকের একান্ত সান্নিধ্যে।
ওই ছাদে আমি আমার সঙ্গে করে একরাশ অন্তর্জালা, সন্দেহ ও দ্বিধা নিয়ে এসেছিলাম। এসেছিলাম সীমাহীন দুর্বলতা, মানবীয় ত্রুটি এবং কষ্ট নিয়ে। জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে; সামনের দিনগুলোতে কি আসতে যাচ্ছে, তার ভয়, আর যা ঘটতে পারে, তার আশা নিয়ে আমি সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। এখানে দাঁড়ানো অবস্থায় নবি মুসা (আলাইহিস সালামের) লোহিত সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনা আমার মনে পড়ে। চর্মচক্ষে কেবল পানির প্রাচীর ছাড়া তিনি কিছুই দেখছিলেন না, কিন্তু তার রুহানি চোখ শুধু আল্লাহকেই দেখছিল এবং তিনি যে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ পাবেন, তাতে এতোটাই নিশ্চিত ছিলেন, যেন তিনি সেটা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছেন। যেখানে তার জাতির আস্থা কিংবা আশা হারানো লোকজনের কণ্ঠে কেবল (ফেরাউনের হাতে) পাকড়াও হওয়ার আশংকার কথাই ধ্বনিত হচ্ছে, তখনও মুসা (আলাইহিস সালাম) নিজের অবস্থানে অনঢ়।
আমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছি, আর দূরবর্তী কণ্ঠস্বরগুলো সামনে কি আসতে যাচ্ছে, তার সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে, কিন্তু আমার কান শুধু শুনে যাচ্ছে: "ইন্না মায়িআ' রাব্বি সা ইয়াহদিন ... নিশ্চয়ই আমার রব আমার সাথেই আছেন এবং তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।” (কুরআন, ২৬:৬২)
আমাদেরকে গ্রাস করা এই কষ্ট, বিভ্রান্তি এবং যন্ত্রণা ভেদ করে দৃষ্টিকে সামনের দিকে প্রসারিত করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন আমরা আমাদের অন্তরকে ফোকাস করতে বা মনোযোগ নিবদ্ধ করতে সুযোগ দেবো। তাওহিদ হচ্ছে ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ, কিন্তু শুধু "আল্লাহ এক” বলার নামই তাওহিদ নয়। [তাওহিদের] এই বিষয়টি বেশ গভীর ও প্রগাঢ়। এটা জীবনের উদ্দেশ্য, ভয়ভীতি, ইবাদত এবং স্রষ্টার প্রতি পরম ভালোবাসার ক্ষেত্রে একত্ববাদ [প্রতিষ্ঠা করার সাথে সম্পৃক্ত]। এটা কল্পনা শক্তি ও মনোযোগের বেলায় একত্ববাদ [প্রতিষ্ঠা করার সাথে জড়িত]। তওহিদের মানে একজনের দৃষ্টিকে নির্দিষ্ট একটি বিন্দুতে নিবদ্ধ করা, যাতে বাকি সবকিছুই নিজ নিজ উপযুক্ত স্থানে জায়গা করে নিতে পারে।
নবি (ﷺ) থেকে বর্ণিত চমৎকার এক হাদিস এই বিষয়টিকে যথার্থভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। নবি (ﷺ) বলেন:
“যে ব্যক্তির আখিরাত নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আল্লাহ তার অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন, তার সকল বিষয়াদি একত্র করবেন এবং দুনিয়া তার নিকট চলে আসবে, যদিও সে দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী নয়। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আল্লাহ তার চোখের সামনে অভাব ও অনটন লাগিয়ে দেন, তার বিষয়াদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবেন এবং তার জন্য দুনিয়ার যতটুকু নির্দিষ্ট হয়ে আছে, ততটুকু অংশ ছাড়া দুনিয়ার কিছুই তার কাছে আসবে না।” [তিরমিযি]
আপনি যদি কখনো 'ম্যাজিক আই' (magic eye)¹⁷ ছবি দেখে থাকেন, তবে আপনি এই সত্যটির এক চমৎকার উপমা দেখতে পাবেন। প্রথম দেখায় মনে হবে কতগুলো আকৃতির সমাহার ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটার কোনো যথাযথ বিন্যাস বা উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু আপনি যদি ছবিটিকে মুখের সামনে এনে ধরেন, নিজের চোখকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিবদ্ধ বা ফোকাস করেন এবং ছবিটিকে যখন আপনি ধীরে ধীরে মুখের সামনে থেকে সরাতে থাকবেন, হঠাৎ করেই ছবিটি আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু যখনই আপনি ওই নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে মনোযোগ সরিয়ে ফেলবেন, সাথে সাথেই ছবিটি হারিয়ে যাবে এবং আপনার কাছে সেটা (বিশৃঙ্খল) আকৃতির এক সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।
একইভাবে, যতই আমরা দুনিয়ার দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করি, আমাদের বিষয়াদি ততই বিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে। যতই আমরা দুনিয়ার পেছনে দৌড়াতে থাকি, ততই এটা আমাদের থেকে পালাতে থাকে। যতই আমরা সম্পদের পিছু ধাওয়া করি না কেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসস্বরূপ, আমরা ততই দারিদ্র্য অনুভব করতে থাকি। মনোযোগ বা ফোকাস যদি হয় অর্থ, তবে যত অর্থই আপনি উপার্জন করুন না কেন, আপনি প্রতিনিয়ত এটা হারানোর ভয়ে ভীত থাকবেন। এই মোহাচ্ছন্নতাই স্বয়ং দারিদ্র্য। এই কারণেই নবি (ﷺ) এ ধরনের লোক সম্পর্কে মন্তব্য করেন, তাদের চোখের সামনে কেবল দারিদ্রই থাকবে। আর তারা শুধু এটাই দেখবে। তাদের যতই থাকুক না কেন, তারা পরিতৃপ্ত নয়, তারা কেবল আরও পাওয়ার লোভে মত্ত এবং এসব হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি মনোযোগ বা ফোকাস করেন, তাদের কাছেও দুনিয়া আসে এবং আল্লাহ তাদের অন্তরে তৃপ্তির ঐশ্বর্য ঢেলে দেন। এমনকি তাদের যদি সামান্য [সম্পদও] থাকে, তারা নিজেদেরকে ধনী ভাবে এবং ওই সম্পদ থেকে আরও বেশি করে দান করতে আগ্রহী থাকে।
এ ধরনের লোকেরা যখন পার্থিব জীবন, আর্থিক দৈন্যতা, কষ্ট, একাকিত্ব, ভয়, হৃদয় ভেঙে যাওয়া কিংবা দুঃখ ও বিরহের মতো জিনিস দ্বারা আটকা পড়ে, তখন তাঁদেরকে শুধু আল্লাহর দিকে মুখ ফেরাতে হবে এবং তিনি তাদেরকে ওইসব মুসিবত থেকে সর্বদাই বের করে আনেন। জেনে রাখুন এটা নিজেকে স্বস্তি দেওয়ার কোনো থিওরি বা তত্ত্ব নয়, বরং এটা এক প্রতিশ্রুতি। এটা আল্লাহর দেওয়া এক প্রতিশ্রুতি, যিনি কুরআনে বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য একটি পথ বানিয়ে দেন এবং ধারণাতীত স্থান থেকে তার জন্য তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। যিনি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখেন, (আল্লাহই) তার জন্য যথেষ্ট ..." (কুরআন, ৩:১৯০)
আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহই যথেষ্ট। যারা আল্লাহকে নিজেদের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের জীবনে শান্তি বিরাজ করে। কেননা, তাদের এই জীবনে যাই ঘটুক না কেন, তারা সেটাকে ভালো মনে করেন এবং সেটাকে তারা আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে মেনে নেন। আপনার জীবনে শুধু ভালো দিনই পার হচ্ছে, এই বিষয়টি একবার ভাবুন তো। এ ধরনের ঈমানদারগণের অবস্থা এটাই, যেমনটি নবি (ﷺ) বলে গেছেন,
"ঈমানদারের বিষয়টি আসলেই অবাক করার মতো। সবকিছুতেই তার জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং এটা শুধু ঈমানদারের জন্যই। যদি তার কাছে কোনো কল্যাণ আসে সে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, যেটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে এবং এটাও তার জন্য কল্যাণকর।” [মুসলিম]
সত্যই এ ধরনের ঈমানদারগণের অন্তর এক প্রকারের জান্নাত। এই জান্নাতের কথাই ইবনে তাইমিয়া (আল্লাহ তার আত্মার ওপর রহমত বর্ষণ করুন) তুলে ধরেন, যখন তিনি বলেন:
"বস্তুত এই দুনিয়াতে এক জান্নাত রয়েছে, (আর) যে ব্যক্তি ওই জান্নাতে প্রবেশ করে না, আখিরাতের জান্নাতেও সে প্রবেশ করবে না।”
ওই জান্নাতে পরিপূর্ণ শান্তি ক্ষণিক মুহূর্তের ন্যায় হবে না, বরং তা হবে এক [রুহানি] অবস্থা, যা চিরস্থায়ী।
টিকাঃ
¹⁷ ম্যাজিক আই: N.E. Thing Enterprises (১৯৯৬ সালে নাম পরিবর্তন করে Magic Eye Inc.) প্রকাশিত একটি পুস্তক সিরিজ। এতে প্রকাশিত অটোস্টেরিওগ্রাম ইমেজসমূহ কেউ কেউ 2D ইমেজ-এর উপর focus করে 3D তথা ত্রিমাত্রিক ইমেজ দেখতে পান।
📄 সমুদ্ররূপী দুনিয়া
গতকাল আমি সমুদ্রতীরে গিয়েছিলাম। বসে বসে যখন আমি ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল বিশাল ঢেউ উপভোগ করছিলাম, তখন বিস্ময়কর কিছু একটা আমি উপলব্ধি করি। সমুদ্র শ্বাসরুদ্ধকরভাবে সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু এটা যেমন সুন্দর, তেমনি ভয়ঙ্করও বটে। সম্মোহন শক্তিময় উত্তাল ঢেউ, যা আমরা সমুদ্রতীর থেকে ভালোই উপভোগ করি, কিন্তু সেটাই কেড়ে নিতে পারে আমাদের প্রাণ, যদি আমরা ওই ঢেউয়ের কবলে পড়ি। পানি নামক যে উপাদান আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য, সেই পানিতেই ডুবে গেলে আমাদের জীবন লীলা সাঙ্গ হতে পারে। যে সমুদ্র জাহাজকে ভাসিয়ে রাখে, সেই সমুদ্রই পারে জাহাজকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে।
এই পার্থিব জীবন, এই দুনিয়া, ঠিক সমুদ্রেরই মতো। আমাদের অন্তরগুলো জাহাজের মতো। সমুদ্রকে আমরা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করতে এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু এই সমুদ্র একটা মাধ্যম মাত্র। আহার সংগ্রহের জন্য সমুদ্র একটা মাধ্যম। এটা ভ্রমণের এক মাধ্যম। উচ্চতর লক্ষ্য পূরণের এটা এক মাধ্যম। তথাপি এটা এমন এক জিনিস, যেটা আমরা অতিক্রম করতে চাই, এতে থেকে যাওয়ার কথা কখনো চিন্তা করি না। একবার ভাবুন তো, সমুদ্র যদি আমাদের মাধ্যম হওয়ার বদলে হয়ে যায় আমাদের শেষ ঠিকানা, তবে কেমন হবে?
শেষ অবধি তাতে তো আমাদের ডুবেই মরতে হবে।
সমুদ্রের পানি যতক্ষণ থাকবে আমাদের জাহাজের বাইরে, ঠিক ততক্ষণ জাহাজ নির্বিঘ্নে ভেসে চলবে এবং নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু যেইমাত্র পানি জাহাজে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন কি ঘটে? ঠিক তেমনি দুনিয়া যখন পানির মতো আমাদের অন্তররূপ জাহাজের বাইরে অবস্থান করে না, দুনিয়া যখন নিছক আর মাধ্যম থাকে না, পরিস্থিতি তখন কীরূপ ধারণ করে? দুনিয়া যখন আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে, তখন কি ঘটে?
জাহাজ তখনই ডুবে।
এমন পরিস্থিতিতে অন্তর জিম্মি হয়ে পড়ে এবং সেটা (দুনিয়ার) দাসে পরিণত হয়। আর তখনই যে দুনিয়া এক সময় ছিল আমাদের নিয়ন্ত্রণে, সেটা আমাদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে শুরু করে। সমুদ্রের পানি যখন প্রবেশ করতে আরম্ভ করে এবং জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়, তখন জাহাজ আর [আমাদের] আয়ত্তে থাকেন না। জাহাজটির পরিণাম তখন সমুদ্রের কৃপার ওপর নির্ভর করে।
(দুনিয়ারূপী সমুদ্রে) ভেসে থাকার জন্য, দুনিয়াকে আমাদেরকে ঠিক সেভাবে দেখতে হবে, যেভাবে আল্লাহ আমাদেরকে দেখতে বলেছেন, "বস্তুত আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে রয়েছে নির্দশন, তাদের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে।” (কুরআন, ৩:১৯০)
দুনিয়াতে আমাদের বসবাস। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের ব্যবহারের জন্যই দুনিয়ার সৃষ্টি। দুনিয়ার প্রতি এই নিরাসক্তির (যুহদ) মানে কখনো এই নয় যে, এই দুনিয়ার সাথে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই। বরং কি করা আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয়, নবি (স) আমাদেরকে সেটা শিখিয়ে দিয়েছেন।
আনাস (রা.) বলেন: "নবি (স) কিভাবে ইবাদত করতেন, সেটা জিজ্ঞাসা করতে নবি (স)-এর স্ত্রীদের কাছে তিন ব্যক্তির আগমন ঘটে (আল্লাহ নবির ওপর রহমত বর্ষণ করুন, আর বইয়ে দেন তার ওপর শান্তির ধারা)। যখন তাদেরকে সেটার জানানো হলো, তখন তাদের কাছে সেটা কম মনে হয় এবং তারা বলে, 'নবি (স)-এর সাথে আমাদের কি কোনো তুলনা হতে পারে, যাঁর আগের-পিছের সব ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে?' আনাস বলেন, 'তাদের একজন বলে, 'আমি সলাত আদায় করে সারা রাত কাটাবো।' আরেকজন বলে, 'আমি সারা বছর ধরে রোজা রাখবো, আর তা কখনো ভাঙবো না।' আরেকজন বলে, 'নারী সঙ্গ থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখবো এবং বিবাহ করবো না।' আল্লাহর রসুল তাদের কাছে আসেন এবং বলেন, 'তোমরা কি ওই লোকজন, যারা এরূপ এরূপ কথা বলেছো? আল্লাহর কসম, তোমাদের মাঝে আমিই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমিই সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। কিন্তু আমি রোজা রাখি, আবার রোজা ভাঙ্গি। আমি সলাত আদায় করি, আবার ঘুমাই। আর আমি নারীদেরকে বিবাহ করি। যে আমার সুন্নাহকে উপেক্ষা করে, সে আমার উম্মত নয়।”
[মুত্তাফাকুন আলাইহি]
দুনিয়া থেকে দূরে সরে থাকার জন্য আমাদের নবি (সাঃ) কখনো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হননি, বরং তার এই নিরাসক্তি আরও গভীর। এটা ছিল অন্তরের নিরাসক্তি ও নির্লিপ্ততা। বস্তুত তার চূড়ান্ত অনুরাগ ও আসক্তি কেবল আল্লাহ (স)-এর সাথে ও আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকার প্রতি। কেননা, তিনিই আল্লাহর বাণী সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করেছেন: "পার্থিব জীবন খেল তামাশা ছাড়া আর কি? বস্তুত আখিরাতের আবাসই প্রকৃত জীবন। কিন্তু হায়, যদি তারা জানতো।” (কুরআন, ২৯:৬৪)
দুনিয়া থেকে নির্লিপ্ত থাকার মানে এই নয় যে, আমরা দুনিয়ার কোনো জিনিসের মালিক হতে পারবো না। প্রকৃতপক্ষে, অনেক সাহাবিই বেশ সম্পদশালী ছিলেন। বরং [দুনিয়া থেকে] নির্লিপ্ত থাকার মানে হচ্ছে: দুনিয়া যা, আমরা সেটাকে সেভাবেই মূল্যায়ন করি এবং দুনিয়ার সাথে আমরা সেভাবেই সম্পর্ক রাখি - দুনিয়াকে আমরা কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি। [দুনিয়া থেকে] নির্লিপ্ত থাকার মানে: দুনিয়া আমাদের যেন হাতে থাকে -আমাদের অন্তরে প্রবেশ না করে যায়। বিষয়টি আলি (রা.) অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন: "[দুনিয়া থেকে] নির্লিপ্ত থাকার মানে এই নয় যে, তুমি কিছুর মালিক হতে পারবে না, বরং এটার অর্থ হচ্ছেঃ (দুনিয়ার) কোনো কিছুই যেন তোমার মালিক হয়ে না বসে।"
জাহাজে সমুদ্রের পানি প্রবেশের ন্যায়, যখন আমরা দুনিয়াকে আমাদের অন্তরে প্রবেশ করতে দেবো, তখনই আমরা নিমজ্জিত হবো। জাহাজের মধ্যে সমুদ্রের পানি প্রবেশ করবে, এমনটি হওয়ার কথা ছিল না, বরং কথা ছিল সমুদ্র হবে [গন্তব্যে পৌঁছানোর] এক মাধ্যম এবং আবশ্যিকভাবে এটা জাহাজের বাইরে থাকবে। ঠিক একইভাবে আমাদের অন্তরে দুনিয়ার প্রবেশের কথা ছিল না। এটা কেবল এক মাধ্যম, যা কোনো অবস্থাতেই যেন আমাদের অন্তরে প্রবেশ না করে, আর না কখনো আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই কারণে আল্লাহ কুরআনে দুনিয়াকে ‘মাতা'আ' হিসেবে উল্লেখ করেন। ‘মাতা'আ' শব্দের অনুবাদ এমন হতে পারে: "ক্ষণস্থায়ী পার্থিব আনন্দের উপকরণ"। দুনিয়া এক উপকরণ মাত্র। এটা এক হাতিয়ার। এটা একটি পথ -এটা গন্তব্য নয়।
ঠিক এই সত্যটি নবি (ﷺ) অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যখন তিনি বলেন: "এই দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? এই দুনিয়াতে আমি তো এক মুসাফিরের মতো, যে কিনা গাছের ছায়াতে অল্প কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নেয় এবং ক্ষাণিকটা আরামের পর, ওই গাছকে পেছনে ফেলে পুনরায় সে পথ চলতে শুরু করে।” [আহমদ, তিরমিযি]
একজন মুসাফিরের উপমাটি একবার চিন্তা করুন। যখন আপনি ভ্রমণ করেন কিংবা আপনি জানেন যে, ওই স্থানে আপনি স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করবেন, তখন কি ঘটে? এক রাতের জন্য যখন আপনি কোনো শহর অতিক্রম করছেন, তখন ওই শহরের প্রতি আপনি কেমন আসক্তি বোধ করেন? যদি জানেন, এটা স্বল্প সময়ের ভ্রমণ, তখন আপনি (কোনো একটা মোটেল, যেমন) 'মোটেল ৬'-এ উঠতে চাইবেন। কিন্তু আপনি কি সেখানে থেকে যাবেন? সম্ভবত না। ধরুন, আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপনাকে স্বল্প মেয়াদের এক প্রকল্পের কাজে নতুন এক শহরে পাঠিয়েছে। এটাও ধরে নেন, ওই প্রকল্প কখন শেষ হবে, তিনি আপনাকে সেটা বলে দেননি। কিন্তু আপনি তো জানেন যে, যেকোনো দিন আপনাকে বাড়ি ফিরে আসতে হবে। এমনটি হলে আপনি ওই শহরে কিভাবে দিন কাটাবেন? আপনি কি সেখানে ব্যাপক হারে সম্পদ বিনিয়োগ করবেন এবং দামি আসবাবপত্র ও গাড়ির পেছনে নিজের পুরো সঞ্চয় উড়িয়ে দেবেন? স্বাভাবিকভাবেই না। এমনকি কেনাকাটার ক্ষেত্রে আপনি কি গাড়ি ভরে খাবার এবং অন্যান্য পচনশীল দ্রব্যাদি ক্রয় করবেন? না। বরং কয়েকটি দিনের জন্য আপনার যতটুকু প্রয়োজন হবে, আপনি ঠিক ততটুকুই ক্রয় করবেন -কেননা, যেকোনো দিন ফিরে আসার জন্য আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপনাকে ডাক দিতে পারেন।
এটাই একজন মুসাফিরের মন-মানসিকতা। যখন এই উপলব্ধি আসে যে, অমুক জিনিসটি ক্ষণস্থায়ী, ওই জিনিসটা প্রতি তখন স্বাভাবিক এক অনাসক্তি চলে আসে। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই হাদিসে নবি (ﷺ) আপন প্রজ্ঞাতে এই সত্যটি চমৎকারভাবে চিত্রিত করেছেন। দুনিয়ার এই জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হওয়ার মাঝে যে বিপদ, তিনি সেটা ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জন্য তিনি এর চেয়ে অন্য কোনো কিছুকে ভয় পেতেন না। তিনি (ﷺ) বলেন: “আল্লাহর কসম, তোমাদের ব্যাপারে আমি দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রাচুর্যে ভরে যাবে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য এটা প্রাচুর্যে ভরে গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে তোমরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করবে, যেভাবে তারা করেছিল। আর যেভাবে তারা ধ্বংস হয়েছিল, তোমরাও সেভাবে ধ্বংস হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
আশীর্বাদে ধন্য নবি (ﷺ) এই পার্থিব জীবনের আসল সত্যকে চিহ্নিত করেছেন। দুনিয়াতে আসক্ত না হয়েই তিনি দুনিয়াতে অবস্থানের সত্যিকার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন। তিনিও ওই একই সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, আমাদের সকলকে সেটা পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু তার জাহাজ ভালোভাবেই জানতো যে, এটা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় এটার গন্তব্য। তার জাহাজ ছিল শুকনো। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যে সমুদ্র সূর্যের আলোতে করে ঝলমল, সেই সমুদ্র যে জাহাজে একবার প্রবেশ করে, সেটাকে (অন্ধকার) মৃত্যুপুরী বানিয়ে ছাড়ে।