📄 মানুষ কেন অপরকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়?
আমার বয়স তখন ১৭। আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম। আমি স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা মসজিদের ভিতর এবং ছোট্ট একটা মেয়ে ছুটে এসে আমাকে প্রশ্ন করে। তার প্রশ্ন ছিল, “মানুষ কেন অপরকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়?” যদিও প্রশ্নটি ছিল ব্যক্তিগত, কিন্তু বেছে বেছে আমাকে এই প্রশ্ন কেন করা হলো, তা আমার কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।
কারণ আমিই অনুরাগ ও আসক্তির মোহে আচ্ছন্ন ছিলাম।
ছেলেবেলা থেকেই আমার এই মেজাজ বা স্বভাবটি আমার কাছে স্পষ্ট ছিল। প্রিস্কুলে [বা কিন্ডারগার্টেনে] অন্য শিশুরা পিতামাতার অনুপস্থিতিকে খুব সহজেই মেনে নিতে পারতো, কিন্তু আমি পারতাম না। একবার আমার চোখের পানি বের হওয়া শুরু হলে, তা আর থামানো যেতো না। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে চারপাশের সবকিছুর সাথে কেমন করে যেন মায়ার এক বন্ধনে আটকে যেতাম। প্রথম গ্রেডে পড়ার সময় আমার প্রয়োজন ছিল একজন ভালো বন্ধুর। বয়স বাড়ার সাথে সাথে যদি কোনো বন্ধুর সাথে ঝগড়া হতো, তবে সেটা আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতো। কোনো কিছুর চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারতাম না। মানুষ, স্থান, ঘটনা, ফটোগ্রাফ, মুহূর্ত -এমনকি ফলাফলও আমার শক্ত আবেগ-অনুরাগের বস্তুতে পরিণত হতো। আমি যেভাবে চেয়েছি কিংবা যেমনটি ভেবেছি, বিষয়াদি যদি সেভাবে না হতো, তবে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যেতাম। হতাশা আমার জন্য কোনো সাধারণ আবেগ ছিল না, বরং এটা ছিল আমার জন্য সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। একবার ভেঙে পড়লে, সেখান থেকে পুরোপুরি উঠে দাঁড়াতে পারতাম না। আমি ভুলতে পারতাম না, তাই ভাঙন কখনো সারতো না। যেন টেবিলের কোণায় রাখা কাঁচের ফুলদানি, যদি একবার ভাঙ্গে, আর তা জোড়া লাগে না।
যাইহোক, ফুলদানি নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না, আর সেটার বারবার ভেঙে যাওয়াটাও মূল সমস্যা ছিল না। সমস্যাটা ছিল আমি সব সময় সেগুলোকে টেবিলের কোণাতেই রাখতাম। অনুরাগ ও আবেগের মাধ্যমে স্বীয় প্রয়োজন মেটাতে আমি আমার সম্পর্কগুলোর ওপর বেশ নির্ভরশীল ছিলাম। আমি সুযোগ করে দিয়েছিলাম যেন আমার সম্পর্কগুলোই নির্ধারণ করবে আমার সুখ, আমার দুঃখ, আমার পূর্ণতা, আমার শূন্যতা, আমার নিরাপত্তা, এমনকি আমার নিজের সত্তার মূল্যায়ন। টেবিলের কোণায় ফুলদানি রাখলে যেমন সেটা পড়বেই ঠিক সেভাবেই। এসব নির্ভরশীলতার মাধ্যমে আমি নিজেকে হতাশায় নিমজ্জিত হওয়ার ব্যবস্থা করে রাখতাম। আর আমি তাই পেতাম: এক হতাশার পরে আরেক হতাশা এবং একের পর এক ভেঙে পড়া।
তথাপি যারা আমার ভেঙে পড়ার পেছনে দায়ী, তাদেরকে দোষ দেওয়ার অর্থ হবে ফুলদানি পড়ে ভাঙার জন্য মধ্যাকর্ষণকে দোষারোপ করার মতো। আমাদের ভর দেওয়ার জন্য যদি গাছের নরম ডালটি ভেঙে যায়, তবে পদার্থবিদ্যার নিয়ম কি এর জন্য দোষী? গাছের নরম ডাল তো কখনো আমাদেরকে বহন করার জন্য সৃষ্ট হয়নি।
স্রষ্টাই কেবল পারেন আমাদের অবলম্বন হতে। এজন্য কুরআনে আমাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছে: "... যে তাগুতকে* প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে এমন এক মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ভাঙ্গে না। আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ।” (কুরআন, ২:২৫৬)
এই আয়াতটিতে নিহিত রয়েছে এক তা্যময় শিক্ষা, অর্থাৎ: এমন এক হাতল আছে যা কখনো ভাঙ্গে না। আছে এমন এক জায়গা, যার ওপর আমরা সর্বাবস্থায় নিশ্চিন্তে নির্ভর করতে পারি। কেবল একটি সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে আমাদের মূল্যমান, আর কেবল একজনই আছেন যাঁর কাছে চূড়ান্ত সুখের আশা করা যায়, আশা করা যায় পূর্ণতা ও নিরাপত্তার। সেই আশার ও ভরসাস্থল হলেন: আল্লাহ।
যাহোক, এই দুনিয়াটা এমনই যে, মানুষ এই সুখ, নির্ভরতা, পূর্ণতা এবং নিরাপত্তাকে খুঁজে ফিরে অন্য কোথাও। কেউ এগুলোকে খুঁজে ক্যারিয়ারের মাঝে, কেউ খুঁজে বেড়ায় ধনসম্পদের মাঝে, আবার কেউবা প্রতিপত্তির মাঝে এগুলো হাতড়ে বেড়ায়। আর আমার মতো কেউ এগুলো খুঁজে বেড়ায় সম্পর্কের মাঝে। এলিজাবেথ গিলবার্ট তার Eat, Pray, Love গ্রন্থে তিনি কিভাবে সুখের সন্ধান করেন, তার বিবরণ তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এবং সেগুলো থেকে বেড়িয়ে আসা এবং এমনকি এই সুখের সন্ধানে পৃথিবী ভ্রমণের আদ্যোপন্ত পর্যন্ত তিনি তুলে ধরেন। তিনি ওই সুখকে খুঁজে বেড়িয়েছেন তার সম্পর্কগুলোর মাঝে, ধ্যানের মাঝে, এমনকি খাবারের মাঝেও তিনি সুখ তালাশ করেছেন এবং সবই তার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
ঠিক এগুলোর পেছনেই আমি আমার জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছি: চেয়েছি নিজের আত্মিক শূন্যতা মেটানোর একটি পথ খুঁজে পেতে। তাই স্বপ্নের ওই ছোট্ট শিশু আমাকে যে এই প্রশ্নটি করেছে, সেটা তেমন অবাক করা কোনো ব্যাপার নয়। প্রশ্নটি হলো আশাহত হওয়া প্রসঙ্গে। প্রশ্নটা হলো কোনো কিছু খুঁজে ফেরা এবং দিনশেষে খালি হাতে ফেরা প্রসঙ্গে। যখন আপনি খালি হাতে চুন, সুড়কির কংক্রিটের মিশ্রণকে খুঁড়তে থাকেন, তখন কিন্তু আপনি কেবল শূন্য হাতেই ফিরেন না, সেইসাথে নিজের আঙ্গুলগুলোকে ভেঙে আনেন – এই প্রশ্ন ছিল এই রূঢ় বাস্তবতা প্রসঙ্গে। না কোনো কিছু পড়ে, আর না কোনো বিজ্ঞ দরবেশের কাছ থেকে শুনে আমি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। বারবার, বারবার এবং বারবার চেষ্টার মাধ্যমেই আমি এই প্রশ্নের জবাব আমি পেয়েছি।
ওই ছোট্ট শিশুর প্রশ্ন আসলে ছিল আমার নিজের প্রশ্ন ... যে প্রশ্ন আমি নিজেকেই করেছি।
চূড়ান্তভাবে এ প্রশ্নের আসল উদ্দেশ্য ছিল, দ্রুত বয়ে চলা মুহূর্তগুলো এবং ক্ষণস্থায়ী অনুরাগ ও আসক্তির এই দুনিয়ার প্রকৃতি কেমন, তার স্বরূপ জানা। যেহেতু দুনিয়া এমন এক স্থান, যেখানে আজ যারা আপনার সাথে আছেন, তারা হয় আজ বা কাল চলে যাবেন কিংবা চলে যাবেন না ফেরার দেশে। কিন্তু এই বাস্তবতা আমাদের সত্তাকে আঘাত করে, যেহেতু এটা আমাদের প্রকৃতি বিরুদ্ধ। মানুষ হিসেবে যা কিছু পূর্ণ ও স্থায়ী তার অনুসন্ধান, তাকে ভালোবাসা এবং তার পিছে ছুটে বেড়ানোর স্বভাব দিয়েই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদেরকে বানানোই হয়েছে অসীমের পানে ছুটার জন্য। আমরা তো এগুলোই খুঁজে বেড়াই, যেহেতু আমরা এই দুনিয়ার জন্য সৃষ্ট হইনি। আমাদের প্রথম ও সত্যিকার নিবাস তো জান্নাত, যা একইসাথে পূর্ণতা ও স্থায়ীত্বের নিবাস। তাই এমন জীবনের জন্য আমাদের ব্যাকুলতা আসলে আমাদের সত্তারই একটি অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই বাঁধে, যখন আমরা ওই জীবনকে এই দুনিয়াতে খোঁজার চেষ্টা করি। তাই আমরা মরিয়া হয়ে যৌবনকে ধরে রাখার জন্য ক্রিম ও কসমেটিক সার্জারির শরণাপন্ন হই – দুনিয়াকে আঁকড়ে থাকার উদ্দেশ্যে। এটা হলো দুনিয়াকে ওই ছাঁচে পরিণত করার প্রয়াস, বাস্তবে যা দুনিয়ার প্রকৃতি নয় এবং না কখনো দুনিয়া সেরূপ হবে।
ঠিক এই কারণে, যখন আমরা মন উজাড় করে দুনিয়াতে বাস করতে থাকি, তখন এটা আমাদেরকে দেউলিয়া করে দেয়। আসলেই এই দুনিয়া কষ্ট দেয়। অস্থায়ীত্ব ও অপূর্ণতাই দুনিয়ার আসল মর্ম এবং যা কিছুর জন্য আমরা সৃষ্টিগতভাবে ব্যাকুল, এই দুনিয়া তার বিপরীত। আল্লাহ আমাদের মনে এমনই এক ব্যাকুলতা দিয়েছেন, যা অসীম ও পূর্ণতার ছোঁয়া ছাড়া কোনোভাবেই মিটে না। অস্থায়ী কোনো কিছুর মধ্যে পূর্ণতাকে খুঁজতে গিয়ে বস্তুত: আমরা একটা হলোগ্রাম ... তথা মরীচিকার পেছনেই ছুটছি মাত্র। আমাদের অবস্থা হয়েছে নাঙ্গা হাতে চুন, সুড়কির কংক্রিট খোঁড়ারই মতো। প্রকৃতিগতভাবে কোনো ক্ষণস্থায়ী জিনিসকে অসীমে পরিণত করতে চাওয়া আগুন থেকে পানি বের করার মতই অসম্ভব। এতে আগুনে দগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। দুনিয়াকে যখন আমরা আর নিজেদের আশার কেন্দ্র বানাবো না, দুনিয়া যা নয় এবং যা কখনো হবে না অর্থাৎ দুনিয়াকে জান্নাত বানানোর চেষ্টা যখন আমরা থামাবো, কেবল তখনই দুনিয়ার এই জীবন আমাদের মন ভাঙা বন্ধ করবে।
উদ্দেশ্য ছাড়া কিছুই ঘটে না, একেবারে কিছুই না - এই বিষয়টি উপলব্ধি করা আমাদের জন্য আবশ্যক। এমনকি ভগ্ন হৃদয় এবং দুঃখের পেছনেও নিহিত থাকে কোনো না কোনো হেতু। ওই ভগ্ন হৃদয়, ওই দুঃখ আমাদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশের বার্তা নিয়ে আসে। কোথাও কোনো ভুল আছে, এরা আমাদেরকে এই সতর্কবার্তা দেয়। আমাদের পরিবর্তনের সময় হয়েছে, এগুলো আমাদের হুশিয়ার করে। যেমনিভাবে আগুনে হাত রাখলে আমরা যন্ত্রণাবোধ করি এবং এই যন্ত্রণা আমাদেরকে আগুন থেকে হাত সরাতে বলে। আবেগঘন যন্ত্রণা ও দুঃখ আমাদেরকে আত্মিক পরিবর্তনের জরুরি বার্তা দেয়। আমাদের প্রয়োজন হয় (যন্ত্রণার কারণ থেকে) সরে আসার। যন্ত্রণা আমাদেরকে সরে আসতে বাধ্য করে। ভালোবাসার মানুষ যেমন করে আপনাকে একের পর এক কষ্ট দেয়, তেমনি দুনিয়াও আমাদেরকে এভাবেই কষ্ট দিতে থাকে, ফলে অবশ্যম্ভাবীরূপে আমরা এর থেকে সরে আসি। দুনিয়া আমাদেরকে যতই বেদনাগ্রন্থ করবে, আমরাও অবধারিতভাবে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ততই কমাতে থাকবো।
এই দুঃখ ও বেদনা, আমাদের অনুরাগ ও আসক্তির একটি সূচক বা নির্দেশক। যা আমাদেরকে কাঁদায়, যা আমাদেরকে সবচেয়ে বেদনাগ্রন্থ করে, সেখানেই মূলত আমাদের মিথ্যা অনুরাগ ও আসক্তিগুলি বিরাজ করে। এগুলোর পরিবর্তে আল্লাহর সাথেই আমাদের গভীর সম্পর্ক থাকা দরকার। আর বস্তুত: যে জিনিসগুলোতে আমাদের অনুরাগ ও আসক্তি থাকে, সেগুলোই আল্লাহর পথে আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখ ও বেদনাই আমাদের মাঝে নিহিত থাকা মিথ্যা অনুরাগ ও আসক্তিগুলোকে দৃশ্যমান করে। বেদনা আমাদের জীবনে পরিবর্তনের মনোবৃত্তি তৈরি করে এবং নিজের অবস্থার মাঝে যদি অপছন্দনীয় কিছু পাওয়া যায়, তবে সেটা পরিবর্তনের আল্লাহর দেওয়া ফর্মূলা রয়েছে। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ কখনো কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করে।” (কুরআন, ১৩:১১)
একই ধরনের নৈরাশ্য ও মর্মবেদনার সাগরে বছরের পর বছর ডুবে থাকার পর, অবশেষে আমি গভীরভাবে কিছু জিনিস উপলব্ধি করতে থাকি। আমি সব সময় মনে করতাম, বস্তুগত জিনিসের মোহে আসক্ত থাকাই হচ্ছে দুনিয়ার প্রেমের আসল মর্ম। আর আমি বস্তুগত জিনিসের মোহে আচ্ছন্ন ছিলাম না। আমার আসক্তি-অনুরাগ ছিল মানুষের সাথে। আমি আসক্ত থাকতাম ভালোবাসার মুহূর্তগুলো আর আবেগের সাথে। তাই মনে করতাম, দুনিয়া প্রেমের এই কথাটি অন্তত আমার বেলায় প্রযোজ্য নয়। মানুষ, সময়, আবেগ সবই যে দুনিয়ার একটি অংশ, এটা আমার মাথায় ছিল না। আমি উপলব্ধি করতে পারিনি যে, জীবনে আমি যত দুঃখ ও বেদনার সাক্ষী হয়েছি, সেগুলোর পেছনে যে কেবল একটি জিনিসই দায়ী, আর তা হলো: দুনিয়ার প্রেম।
বিষয়গুলো যখন আমি আত্মস্থ করতে শুরু করি, আমার চোখের থেকে পর্দার আবরণ তখন সরে যেতে থাকে। সমস্যার মূল উপলব্ধি করতে আমি শুরু করি। এই জীবনের কাছে সে যা নয়, যা কখনো হতে পারবে না, তাই আমি আশা করেছিলাম। আমি সেই [অপূর্ণ] জীবনটাকে নিখুঁত, পূর্ণ ভাবতাম। একজন আদর্শবাদী মানুষ হিসেবে আমি আমার দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে একে নিখুঁত বা পূর্ণ করার জন্য সংগ্রাম করতাম। একে নিখুঁত হতেই হবে, আর সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমি আমার সংগ্রাম বহাল রাখবো, এই ছিল আমার মনোভাব। আমি আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু, ঘাম ও অশ্রু দিয়ে চেয়েছি এই দুনিয়াকে জান্নাত বানাতে। আমি চাইতাম আমার আশেপাশের লোকগুলো নিখুঁত ও ত্রুটিহীন হোক। চাইতাম আমার সম্পর্কগুলোর পূর্ণতা। আমার চারপাশের মানুষ ও জীবন থেকে আমি অনেক বেশি আশা করতাম। প্রত্যাশা, প্রত্যাশা আর শুধুই প্রত্যাশা। আর অসুখী হওয়ার যদি কোনো শ্রেষ্ঠ রেসিপি থাকে, তবে তা হচ্ছে: প্রত্যাশা। আর এখানেই ছিল আমার সবচেয়ে মারাত্মক ভুল। মানুষ হিসেবে প্রত্যাশাটা আমার ভুল ছিল না, বরং আমাদের সব সময়ই আশাবাদী থাকতে হবে। সমস্যা হলো: 'কোথায়' আমি ওই আশাকে রেখেছি এবং 'কোথায়' আমি আমার প্রত্যাশার ফানুস জ্বেলেছি। কেননা, দিন শেষে আমার আশা ও প্রত্যাশার ফানুস যে আমি আল্লাহর জন্য জ্বালিনি। আমার সকল আশা ও প্রত্যাশা ছিল মানুষদের ওপর, সম্পর্ক ও নানাবিধ অবলম্বনেরই মাঝে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এই দুনিয়ার উপরেই ছিল আমার ভরসা।
আর তাই আমি এক চরম সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। আমার হৃদয় জুড়ে কুরআনের একটি আয়াত ঘুরপাক খেতে থাকে। ওই আয়াতটি আমি আগেও শুনেছি, কিন্তু প্রথমবারের মতো ওই আয়াত আমি উপলব্ধি করি। উপলব্ধি করে চমকে উঠি যে, আরে ওই আয়াত তো আমার কথাই বলছেঃ "যারা আমাদের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না, উল্টো তারা পার্থিব জীবন নিয়েই তুষ্ট এবং উৎফুল্ল, তারা আমাদের নিদর্শনসমূহ থেকে আসলেই গাফেল।” (কুরআন, ১০:৭)
আমি এই দুনিয়াতেই সব পেতে পারি, এমনটি ভেবে আমি তো আমার আশাকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য নিবেদিত করিনি। আমার আশা ও ভরসা তো কেবল দুনিয়া কেন্দ্রীক। কিন্তু নিজের আশা-ভরসাকে দুনিয়া কেন্দ্রীক করার তাৎপর্য কি? কিভাবে এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? অর্থাৎ আপনার বন্ধুবান্ধবরা আপনার শূন্যতা মেটাবে, অন্তত এই প্রত্যাশাটুকু করবেন না। বিবাহ করলে স্বামী বা স্ত্রী আপনার সকল প্রয়োজন মেটাবে, অন্তত এই প্রত্যাশা করবেন না। সক্রিয় আন্দোলন কর্মী হলে পরিণতির ওপর নির্ভর করবেন না। বিপদে পড়লে না নিজের ওপর আর না লোকজনের ওপর ভরসা করবেন, ভরসা শুধু আল্লাহর ওপরই করবেন।
হ্যাঁ, মানুষের কাছে সাহায্য চান -কিন্তু সেইসাথে মনে রাখবেন মানুষ (এমনকি আপনার নিজ সত্তা) আপনাকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়। কেবল আল্লাহই পারেন আপনাকে রক্ষা করতে। লোকজন তো শুধু উসিলা, যেটা আল্লাহ [আপনাকে রক্ষার জন্য] ব্যবহার করেন। কিন্তু তারা কখনো সাহায্য, আনুকূল্য ও নাজাতের উৎস নয়। কেবল আল্লাহই এসবের উৎস। আরে মানুষ তো একটি মাছির পাখা বানানোরও ক্ষমতা রাখে না (কুরআন, ২২:৭৩)। এজন্য যতই বাহ্যিকভাবে মানুষের সাথে লেনাদেনা করুন না কেন, আত্মিকভাবে নিজের অন্তরকে আল্লাহর কাছে নিবেদিত রাখুন। কেবল আল্লাহর মুখাপেক্ষী হন, যেমটি নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন: "আমি স্বীয় মুখমণ্ডলকে তাঁরই পানে নিবেদিত করেছি, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (কুরআন, ৬:৭৯)
নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) কিভাবে এই সত্য উপলব্ধিতে উপনীত হলেন? চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ করেন এবং উপলব্ধি করেন এগুলোর কিছুই স্থায়ী তো নয়ই, বরং এগুলোর সবই অন্তশীল।*
আসলে এগুলো আমাদেরকে কেবল হতাশই করে।
এসব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর দিকে মুখ করেন। তার মতো করে আমাদেরও উচিত হবে আমাদের সকল আশা, আস্থা ও নির্ভরতাকে আল্লাহ এবং শুধু আল্লাহরই ওপর স্থাপন করা। শান্তির সন্ধান পাওয়া এবং অন্তরের স্থিরতা বলতে কি বুঝায়, সেটা আমরা তখনই বুঝতে পারবো, যখন নিজেদের সকল আশা, আস্থা এবং নির্ভরতাকে আমরা আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করতে সফল হবো। কেবল তখনই বস্তুবাদীতার এই রোলার কোস্টার*, যা আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটবে। কেননা, আমাদের আত্মিক অবস্থা যদি সংজ্ঞাগতভাবেই অস্থিতিশীল কোনো বস্তুর ওপর নির্ভর করে, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আত্মিক অবস্থাও অস্থিতিশীল হবে। আমাদের আত্মিক অবস্থা যদি সদা পরিবর্তনশীল ও ক্ষণস্থায়ী জিনিসের ওপর নির্ভর করে, তবে আমাদের আত্মিক অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই অস্থির, বিক্ষুব্ধ ও উতলা হবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে এক মুহূর্তে আমরা হয়তো সুখী হবো, কিন্তু যখনই ওই বস্তুটি বদলে যাবে, যেটার ওপর আমার সুখ নির্ভর করছিল, তখনই আমাদের সুখও তেমন করে বদলে যাবে। আমরা বিষাদে মুষড়ে পড়বো। এক চরম অবস্থা থেকে প্রতিনিয়ত আমরা আরেক চরম অবস্থাতে ঘুরপাক খেতে থাকি এবং কখনো বুঝতে পারি না, কেন এমনটি হচ্ছে।
আমরা আবেগের এই রোলার কোস্টারে চড়ার অভিজ্ঞতা লাভ করি, কারণ যে পর্যন্ত না আমাদের ভালোবাসা ও নির্ভরতা কোনো স্থিতিশীল ও মজবুত কোনো কিছুর ওপর স্থাপিত না হয়, সে পর্যন্ত আমরা স্থিতিশীল ও স্থায়ী শান্তি পেতে পারি না। কিভাবে আমরা স্থিরতা ও স্থায়িত্বের আশা করবো, যখন আমাদের আঁকড়ে ধরা জিনিসটিই অস্থির ও ক্ষীয়মান? আবু বকরের বক্তব্যে এই সত্যের সার্থকতা ফুটে উঠেছে। নবি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর মৃত্যু সংবাদ লোকদের মনে প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং এই সংবাদ তারা সহ্য করতে পারছিল না। কেউই আবু বকরের মতো করে নবি মুহাম্মদ (ﷺ)-কে ভালোবাসেনি, কিন্তু আবু বকর ঠিকই জানেন নিজের নির্ভরশীলতাকে কোথায় স্থাপন করতে হয়, তাই তো তিনি বলতে পারেন: “তোমরা যদি মুহাম্মদের উপাসনা করে থাকো, তবে জেনে রাখো, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু তোমরা যদি আল্লাহর ইবাদত করে থাকো, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।"
যদি এমন মানসিক অবস্থায় উপনীত হতে চান, তবে আল্লাহর সাথে নিজের সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছুকে কখনো নিজের পরিতৃপ্তির উৎস বানাবেন না। আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছুকে কখনো সফলতা, ব্যর্থতা বা আত্মমর্যাদার মানদণ্ড বানাবেন না (কুরআন, ৪৯:১৩)। আর এমনটি করলে কিছুই আপনাকে ভেঙে চুরমার করতে পারবে না, কারণ আপনি এমন এক হাতল ধরে আছেন, যা কখনো ভাঙ্গে না। ফলশ্রুতিতে আপনি হবেন অজেয়, কারণ আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এক অজেয় সাথি। আপনি কখনো শূন্য বোধ করবেন না, কারণ আপনার পরিতৃপ্তির উৎসের নেই কোনো লয় ও ক্ষয়।
১৭ বছর বয়সে দেখা ওই স্বপ্নের দিকে ফিরে তাকালে, আমার বড়ই অবাক লাগে। অবাক লাগে এই ভেবে, হয়তো ওই ছোট্ট বালিকাটি আমিই ছিলাম। অবাক লাগে, কারণ আমি যে জবাবখানা তাকে দিয়েছি, সেটা ছিল এক শিক্ষনীয় উপদেশ এবং এই শিক্ষা পেতে আমাকে পরবর্তীর্তে বহু যন্ত্রণাকাতর বছর কাটাতে হয়েছে। মানুষ কেন আরেকজনকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়, তার করা এই প্রশ্নের উত্তর: [মানুষ আরেকজনকে ছেড়ে যেতে বাধ্য], “যেহেতু এই দুনিয়ার জীবন পরিপূর্ণ নয়। আর দুনিয়ার জীবন যদি পরিপূর্ণ হয়েই থাকে, তবে আখিরাতের জীবনকে কি বলে সম্বোধন করতে হবে?"
টিকাঃ
* তাগুত: আল্লাহ ছাড়া যেসব সত্তার আনুগত্য করা হয় অথবা যে সত্তা শুধু নিজেই কুফরি করে না, অপরকে কুফরি করতে বাধ্য করতে চায় - (সম্পাদক)।
* সব যুগেই এগুলোর পূজা করা হতো। মানুষের ভাগ্য নিয়ন্তা হিসেবে এদের বিবেচনা করা হয়। আজকের তথাকথিত বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষেরাও রাশিচক্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, Horoscope ইত্যাদি নামে এগুলোকে কেন্দ্র করে শিরক করে চলেছে -(সম্পাদক)।
* রোলার কোস্টার: এক ধরনের বিনোদনমূলক রাইড (Ride) যা বিশ্বের অধিকাংশ Amusement Park গুলোতে দেখা যায়। এর ট্রেনটি অনেক উচ্চতা থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিচে নেমে আসে, আবার খাড়া পথ বেয়ে উপরে উঠে। লেখিকা এখানে মানুষের সাথে সম্পর্কের চড়াই-উতরাইকে 'রোলার কোস্টারে'-এর সাথে তুলনা করেছেন - (সম্পাদক)।
📄 মানুষ চলে যায়, কিন্তু তারা ফিরে আসে কি?
চলে যাওয়াটা কষ্টের। হারানোটা আরও বেদনার। 'মানুষ কেন আরেকজনকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়?' কয়েক সপ্তাহ আগেই আমি এই প্রশ্নটি করেছিলাম। এর উত্তর আমাকে আমার জীবনের গভীরতম কিছু উপলব্ধি ও চড়াই উতরাইয়ের ময়দান ঘুরিয়ে আনে। এদিকে এই প্রশ্ন আমাকে আরেকটি বিষয় নিয়ে ভাবিয়ে তোলো, আর তা হলো: চলে যাওয়ার পর মানুষ কি আবার ফিরে আসে? আমাদের ভালোবাসার বস্তুকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার পর, সেটা কি আবার ফিরে আসে? হারানোটা কি চিরস্থায়ী -কিংবা এটা উচ্চতর লক্ষ্য হাসিলের একটি মাধ্যম? হারানোটা কি স্বয়ং সমাপ্তি, নাকি এটা আমাদের আত্মিক অসুস্থতার এক সাময়িক চিকিৎসা?
এই জীবনের একটি অবাক করা দিক রয়েছে। এই দুনিয়ার যে সমস্ত বিষয়গুলো আমাদেরকে যন্ত্রণা দেয়, সেগুলোই আবার আমাদের যন্ত্রণা লাঘব করে: কেননা, এখানে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এটার মানে কি? আমার ফুলদানিতে থাকা নজর কাড়া সৌন্দর্যের গোলাপটি আগামীকালই শুকিয়ে যাবে। এটার মানে, আমার যৌবন এক সময় আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আবার এটার মানে, আজ আমি যে দুঃখ অনুভব করছি, কাল সেটা থাকবে না। আমার যন্ত্রণার মৃত্যু হবে। আমার হাসি যেমন চিরকাল থাকবে না, তেমনি আমার কান্নার অশ্রু চিরকাল বইবে না। আমরা বলি, এই জীবন পরিপূর্ণ নয়। আসলেই এটা পরিপূর্ণ নয়। না এটা সম্পূর্ণরূপে ভালো, আর না এটা একইভাবে পুরোপুরি মন্দ।
মহিমান্বিত আল্লাহ তাৎপর্যপূর্ণ এক আয়াতে আমাদেরকে বলে দিচ্ছেন: "বস্তুত কষ্টের সাথেই আসে সুখ।” (কুরআন, ৯৪:৫) বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বোধোদয় হয়, ভুলভাবে আমি এই আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করেছি। আমি ভাবতাম এটার মর্ম এরূপ: কষ্টের পর আসে সুখ। একটু ভিন্নভাবে বললে, আমি ভাবতাম ভালো সময় ও মন্দ সময় দিয়েই জীবন গঠিত। মন্দ সময়ের পর আসে ভালো সময়। আমি ভাবতাম জীবন হয় সম্পূর্ণ ভালো আর না হয় জীবন সম্পূর্ণ মন্দ। কিন্তু আয়াতটি তা বলছে না। এই আয়াত বলছে, কষ্টের সাথে আসে সুখ। কষ্ট যে সময়ে আসে, সুখ ঠিক সে সময়ে আসে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, এই পার্থিব জীবনে কিছুই সম্পূর্ণরূপে মন্দ না (আর নয় সম্পূর্ণরূপে ভালো)। আমাদের মুখোমুখি হওয়া প্রতিটি মন্দ অবস্থার মাঝেও এমন কিছু জিনিস আছে, যেটার মধ্যে সব সময় এমন কিছু থাকে, যার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। বিপদ-মুসিবতের সাথে সাথে সেসবকে সহ্য করার শক্তি ও ধৈর্যও মহান আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে দিয়ে থাকেন।
আমরা যদি আমাদের কঠিন সময়গুলো পর্যালোচনা করি, তবে দেখবো, কঠিন পরিস্থিতিগুলোও বহু কল্যাণে পরিপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে-আমরা কোন বিষয়টার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করবো? আমার মনে হয়, আমরা যে ফাঁদে পা দেই, সেটার মূলভিত্তি এই মিথ্যা বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, এই জীবন সম্পূর্ণরূপে নিখুঁত হবে -হয় একদম ভালো, আর না হয় একদম মন্দ। কিন্তু দুনিয়া (তথা এই জীবনের) প্রকৃতি এমন নয়। আখিরাতের প্রকৃতি এরূপ। আখিরাতকে বানানোই হয়েছে সকল জিনিস পূর্ণতা দেওয়ার জন্য। জান্নাত পরিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণরূপে ভালো। এটাতে মন্দ বলে কিছুই নেই। অন্যদিকে জাহান্নাম পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণরূপে মন্দ। ভালোর ছিটে ফোঁটাও এটাতে নেই। (মহান আল্লাহতায়ালা তা হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন)।
এই বাস্তবতাকে সত্যিকারভাবে উপলব্ধি না করার ফলশ্রুতিতে, নিজের জীবনের ক্ষণস্থায়ী পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর দ্বারা আমি আপ্লুত হয়ে পড়তাম (সেটা ভালোই হোক বা মন্দ)। প্রতিটি পরিস্থিতিকে আমি প্রবলভাবে অনুভব করতাম -যেন এটাই চূড়ান্ত, কিংবা এটা কখনো শেষ হবে না। ওই মুহূর্তে আমার আবেগের আতিশায্যে গোটা দুনিয়া ও এর সকল কিছুকে বদলে দিতো। আমি যদি ওই মুহূর্তে খুশি হতাম, তবে অতীত, বর্তমান, নিকট ও দূর তথা গোটা জগৎ ওই মুহূর্তে খুশিতে ভরে যেতো। যেন সেখানে বিরাজ করতো পূর্ণতা। মন্দ পরিস্থিতির বেলাতেও একই জিনিস ঘটতো। নেতিবাচকতা আচ্ছন্ন করে ফেলতো আমার সব কিছুকে। এটা পরিণত হতো আমার গোটা দুনিয়া, অতীত-বর্তমানে এবং ওই মুহূর্তে আমার জন্য গোটা বিশ্ব-সংসার মন্দে বদলে যেত। কেননা, এটাই যে আমার দুনিয়া, এর বাইরে যে আমি কিছুই দেখতে পেতাম না, ওই মুহূর্তে অন্য কোনো কিছুরই অস্তিত্ব থাকতো না। আপনি যদি আমার সাথে আজ খারাপ আচরণ করেন, তবে সেটা এজন্য যে, আপনি আর আমাকে পছন্দ করেন না – এবং সেটা এজন্য নয় যে, অসীম সংখ্যক মুহূর্তের মাঝে একটি মুহূর্তে এমনটি ঘটে গেছে অথবা আপনি ও আমি এবং এই দুনিয়ার কোনোটাই নিখুঁত নয়। ওই মুহূর্তে আমার অনুভূতি হতো পূর্বাপর সম্বন্ধের সাথে সম্পর্কহীন। কেননা, এ ঘটনা আমার গোটা জীবন দর্শনকে বদলে দিতো।
আমি মনে করি, ব্যবহারিক জীবনে আমাদের অনেকে বিশেষভাবে এমন মনোভাব ধারণ করেন, সম্ভবত: এজন্যই আমরা 'আমি তোমার থেকে কখনো ভালোকিছু দেখিনি' ধরনের মনোভাবের শিকার হয়ে পড়তে পারি, যেটার ইশারা নবি (ﷺ) তার এক হাদিসে দিয়েছেন। আমাদের কেউ কেউ এমনটি বলে ফেলেন, কিংবা এমনটি অনুভব করেন, সম্ভবত এজন্য যে, কার্যত ওই মুহূর্তে আমরা ভালো কিছুই দেখতে পাই না। কারণ ওই মুহূর্তে আমাদের তাৎক্ষণিক অনুভূতি সব কিছুকে প্রতিস্থাপিত ও সংজ্ঞায়িত করে এবং সেটাই সব কিছু বনে যায়। একটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা তখন অতীত ও বর্তমানের সব কিছুকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
এই জীবনের কিছুই সম্পূর্ণ নয়, এই সত্যের যথাযথ উপলব্ধি, জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। সহসাই কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা ক্ষণ আর আমাদের আচ্ছন্ন করতে পারে না। কিছুই এখানে সীমাহীন নয়, এখানে কিছুই কামিল (পূর্নাঙ্গ ও সম্পূর্ণ) নয়, এই [সত্য] উপলব্ধি করলে, আল্লাহ আমাদেরকে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডির বাইরে পা রাখার যোগ্যতা দান করেন এবং এগুলোর প্রকৃত যে রূপ, তা আমাদেরকে দেখতে সক্ষম করেন। এগুলো আসলে: না মহাবিশ্ব, না একমাত্র বাস্তবতা, না অতীত ও বর্তমান, বস্তুত এগুলো অসীম মুহূর্তের মাঝে একটি মূহূর্ত মাত্র ... এবং এগুলোও অতিক্রান্ত হয়ে যাবে।
আমি কাঁদি অথবা হেরে যাই বা আঘাতপ্রাপ্ত হই, যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, ততক্ষণ কিছুই চূড়ান্ত নয়। যতক্ষণ আগামীকাল আছে, আছে পরবর্তী মুহূর্ত, ততক্ষণ আছে আশা, আছে পরিবর্তনের সুযোগ এবং রয়েছে উত্তরণের পথ। যা হারিয়ে গেছে, সেটা চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়নি।
যা হারায়, তা ফিরে আসে কি আসে না, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় চমৎকার সব উদাহরণ আমার অধ্যয়নে পাই। ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) কি তার বাবার কাছে ফিরে গিয়েছিলেন? মুসা (আলাইহিস সালাম) কি তার মায়ের কাছে ফিরে গেছেন? বিবি হাজেরা কি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে ফিরেছিলেন? স্বাস্থ্য, সম্পদ ও সন্তান কি আইয়ুব (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে ফিরেছিল? এসব ঘটনা থেকে আমরা তাৎপর্যপূর্ণ ও চমৎকার কিছু শিক্ষা পাই। তা হলো: আল্লাহ যা তুলে নেন, তা কখনো হারায় না। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর সাথে যা থাকে সেটাই রয়ে যায়। বাকি সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়।
আল্লাহ (*) বলেন:
"তোমাদের সাথে যা কিছু আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং যা আছে আল্লাহর কাছে, তা রয়ে যাবে চিরকালের জন্য। যারা ধৈর্য ধারণ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তারা যা করে, তার থেকে উত্তম পুরস্কার দান করবো।" (কুরআন, ১৬:৯৬)
তাই, যা কিছু আল্লাহর সাথে আছে, সেগুলো কখনো হারায় না। প্রকৃতপক্ষে, নবি (ﷺ) বলেন:
“আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছু তুমি ছেড়ে দাও, তবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার পরিবর্তে এমন কিছু দেন, যেটা তোমাদের কাছে থাকা ওই বস্তুর থেকেও উত্তম হয়।” [আহমদ]
আল্লাহ কি উম্মে সালমার স্বামীকে তুলে নিয়ে, [ওই স্বামীর] স্থলে নবি (ﷺ)-কে প্রতিস্থাপন করেননি?*
কখনো কিছু দেওয়ার জন্য আল্লাহ কিছু জিনিস তুলে নেন। কিন্তু এটা উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা যেভাবে চাই, তিনি আমাদেরকে সব সময় সেভাবে দান করেন না। কোনটা উত্তম, সেটা তিনিই ভালো জানেন। আল্লাহ বলেন: "হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হয়তো তোমরা কোনো জিনিস পছন্দ করো, কিন্তু সেটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। বস্তুত আল্লাহই জানেন এবং তোমরা জানো না।” (কুরআন, ২:২১৬)
কোনো জিনিসকে যখন এক রূপে বা অন্য রূপে ফেরতই দেওয়া হবে, তবে সেটা তুলে নেওয়া হয় কেন? সুবহানাল্লাহ। বস্তুত "হারানোর” এই প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে [কোনো কিছু] দেওয়া হয়।
আল্লাহ আমাদেরকে উপহার দান করেন এবং এরপর আমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে ওই দানকৃত বস্তুর ওপর নির্ভর করতে শুরু করি। তিনি আমাদেরকে অর্থ দেন, আর আমরা তাঁকে বাদ দিয়ে অর্থের ওপর নির্ভর করতে শুরু করি। যখন তিনি আমাদেরকে আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধু-সহযোগী দিয়ে সাহায্য করেন, তখন তাঁকে বাদ দিয়ে আমরা সেসব মানুষের ওপর নির্ভর করতে শুরু করি। যখন তিনি আমাদেরকে প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতা দান করেন, তখন আমরা সেগুলোর ওপর ভরসা করি এবং সেগুলোর দ্বারা বিভ্রান্ত হই। যখন তিনি আমাদেরকে স্বাস্থ্য দেন, তখন আমরা প্রতারিত হই। ভাবতে শুরু করি, আমরা বুঝি কখনো মরবো না।
আল্লাহ আমাদেরকে উপহার দিয়ে ধন্য করেন, কিন্তু আল্লাহকে যেভাবে ভালোবাসা প্রয়োজন, আমরা সেটা না করে উল্টো ওই উপহারগুলিকে সেভাবে ভালোবাসতে শুরু করি। আমরা ওই উপহারগুলো গ্রহণ করি এবং সেগুলো নিজেদের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান দিতে থাকি, যতক্ষণ না আমাদের হৃদয় সেগুলি দিয়ে পূর্ণ হচ্ছে। শীঘ্রই অবস্থা এমন হয় যে, আমরা ওই জিনিসগুলো ছাড়া চলতে পারি না। আমাদের প্রতিটি জাগ্রত মুহূর্ত ওই জিনিসগুলোর চিন্তায় বিভোড় থাকি। সেগুলোর কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করি এবং সেগুলোর আরাধনা শুরু করি। যে মন ও অন্তরকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, কেবল তাঁরই জন্য, সেটা তখন অন্য কিছুর বা অন্যের সম্পত্তি বনে যায়। এরপর আসে ভয়, হারানো ভয় আমাদেরকে যেন পঙ্গু করে ফেলে। যে উপহারের থাকার কথা ছিল আমাদের হাতে, আমাদের গোটা সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, আর তাই সেটা হারানোর ভয় আমাদেরকে গ্রাস করে। এক সময়ের উপহার, শীঘ্রই একটা নির্যাতনের হাতিয়ার ও নিজেদের গড়া এক কারাগারে পরিণত হয়। কিভাবে আমরা এটার হাত থেকে মুক্তি পাবো? মাঝে মাঝে আল্লাহর অসীম করুণা বলে তিনি আমাদেরকে মুক্তি দেন ওই উপহারটি তুলে নিয়ে।
ওই উপহার তুলে নেওয়ার ফলশ্রুতিতে আমরা সম্পূর্ণ মনপ্রাণ দিয়ে আমরা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। ওই হতাশা ও প্রয়োজনের সময় আমরা [তাঁর কাছে] প্রার্থনা করি, মিনতি করি এবং দু'আ করি। হারানোর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা, বিনয় এবং তাঁর ওপর নির্ভর করার এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছাই, অন্য কোনোভাবে যেখানে পৌঁছানো আমাদের জন্য সম্ভব ছিল না -যদি না সেই আরাধ্য প্রিয় বস্তুটি আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া না হতো। হারানোর মাধ্যমে আমাদের অন্তর সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ মুখী হয়।
সন্তানকে যখন আপনি কোনো খেলনা বা নতুন কোনো ভিডিও গেম দেন, যেটা সে সব সময় চাইতো, তখন কি ঘটে? সারাদিন সে ওইসব নিয়েই পড়ে থাকে। শীঘ্রই তার আর কিছুই করতে মন চায় না। অন্য কিছু তার চোখে পড়ে না। সে তার জরুরি কাজগুলি এমনকি নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দেয়। নিজের ক্ষতির জিনিসটি নিয়ে সে সম্মোহিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে স্নেহময়ী পিতামাতা হিসেবে আপনি কি করেন? সে যে নেশা বা মোহতে আচ্ছন্ন হয়েছে এবং সে যেভাবে মনোযোগ ও ভারসাম্যকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়েছে, আপনি কি তাকে সেটাতে ডুবে যেতে দেবেন? না।
আপনি [ওই খেলনা বা ভিডিও গেম] সরিয়ে নেবেন।
আর যখনই ওই শিশু নিজের অগ্রাধিকারকে ঠিক মতো বুঝে নেয়, মানসিক সুস্থতা ও ভারসাম্য ফিরে পায় এবং যখন তার হৃদয়, মন ও জীবনে যথাযথ মর্যাদা ও সবকিছুকে গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়, তখন কি ঘটে? আপনি ওই উপহার ফিরিয়ে দেন। অথবা সেটার চেয়ে ভালো কিছু দেন। কিন্তু এই সময় উপহার আর তার অন্তরকে দখল করে ফেলে না। এটা তার উপযুক্ত স্থানে থাকে। হ্যাঁ, তখন সেটা তার হাতে অবস্থান করে।
তদপুরি সরিয়ে নেওয়া বা তুলে নেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি ঘটে। উপহার হারানো এবং সেটা ফেরত পাওয়াটা সামান্য কিছু নয়। আপনার গাফেলতি, আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভর করা এবং মনোযোগ নিবদ্ধ করাকে কেড়ে নিয়ে, সেগুলোর স্থানে আল্লাহর স্মরণ, তাঁর ওপর নির্ভরশীলতা এবং কেবল তাঁর দিকেই মনোযোগ নিবদ্ধ করার যে গুণ দান করা হয়, সেটাই প্রকৃত উপহার। এজন্যই আল্লাহ তাঁর দানগুলো আটকে রাখেন।
আর তাই কখনো কখনো “আরও ভালো কিছু” পরিণত হয় সর্বোত্তম উপহারে, [আর তা হলো]: তাঁর নৈকট্য। আল্লাহ মালিক বিন দিনারের' কন্যাকে তুলে নিয়ে তাকে রক্ষা করেন। আল্লাহ তার কন্যাকে তুলে নিয়ে, সে স্থানে তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন, তাকে পাপের জীবন থেকে মুক্তি দেন এবং মহান স্রষ্টার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া থেকে তাকে বাঁচান। প্রাণপ্রিয় কন্যা হারানো সত্ত্বেও তিনি এমন এক জীবনের সন্ধান লাভ করেন, যে জীবনে তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে কাটান। এমনকি যে কন্যাকে তার কাছ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, চিরকালের জন্য সে জান্নাতে মালিক বিন দিনারের সাথেই থাকবে।
ইবনে কাইয়্যিম (আল্লাহ তার প্রতি রাজি থাকুন) তার 'মাদারিজ আস-সালিকিন' গ্রন্থে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন:
"মুমিনদের জন্য যে ঐশ্বরিক ফয়সালা নির্ধারিত, সেটা সর্বদাই এক নেয়ামত, যদিও সেটা কখনো (কামনাকৃত জিনিসকে) আটকে রাখার মতো হয় এবং এটা এক আশীর্বাদ, যদিও সেটা পরীক্ষা ও বিপদ-আপদের মতো মনে হয়, যেটা ওই মুমিনকে আক্রান্ত করে। সে আসলে তার জন্য প্রতিষেধকের মতো, যদিও সেটা রোগের বেশে আবির্ভূত হয়।”
'একবার যা হারায়, সেটা কি পুনরায় ফিরে আসে' এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ, সেটা ফিরে আসে। আরও উত্তম রূপে। কখনো এখানে, কখনো সেখানে, কখনো ভিন্ন রূপে। তুলে নেওয়া এবং ফেরত দেওয়ার অন্তরালে নিহিত থাকে সর্বোত্তম উপহারটি। আল্লাহ আমাদেরকে বলেন:
"বলো, 'এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতে। সুতরাং তারা এতে আনন্দিত হোক। কেননা, তারা যা জমা করে বা গচ্ছিত রাখে, সেগুলো থেকে এটাই উত্তম।” (কুরআন, ১০:৫৮)
টিকাঃ
* উম্মে সালমা (রা.)-এর স্বামী আবু সালমার (রা.)-এর মৃত্যুর পর রসুল (ﷺ) উম্মে সালমা (রা.)-কে বিয়ে করেন। (সম্পাদক)।
' মালিক বিন দিনার (র.) ছিলেন ভারতে আগত একজন বিখ্যাত তাবেয়ি। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি ভারতের কেরালায় মৃত্যুবরণ করেন। কেরালার কাসারাগোদে 'Kasaragod' মালিক বিন দিনার মসজিদ সংলগ্ন স্থানে তার কবর অবস্থিত। প্রাথমিক জীবনে মালিক বিন দিনার উশৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন। তিনি ছিলেন একজন মদ্যপ। তার প্রিয়তমা শিশু কন্যার মৃত্যুতে তিনি গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি তার অধঃপতিত জীবনের চরম পরিণাম সম্পর্কে এক স্বপ্ন দেখেন। সেখানে তিনি দেখেন তার প্রিয়তম কন্যা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ দেখায়। ঘুম ভেঙে তিনি তওবা করেন এবং পরবর্তীতে উম্মতের এক আদর্শস্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার উন্মাদ ইমাম ইবনুল কুদামা কিতাব 'আত-তাওওয়াবিন'-এ মালিক বিন দিনারের বিস্তারিত কাহিনী বর্ণনা করেন (সম্পাদক)।
📄 আত্মিক শূন্যতা পূরণ ও বাড়ি ফেরা
আমরা আপন নিবাসে আছি।
আবার আমরা সেখানে নেইও। নিজেদের [সত্যিকার] উৎসস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা সময় ও স্থান অতিক্রম করে ভিন্ন আরেক জগতে চলে আসি। চলে আসি অপেক্ষাকৃত হীনতর এক জগতে। কিন্তু এই বিচ্ছেদের সময় বেদনার একটি ব্যাপার ঘটে। বাস্তব জগতে আমরা আর [সরাসরি] আল্লাহর সাথে নেই। নিজেদের চর্ম চোখে আমরা আর তাঁকে দেখতে করতে পারি না, পারি না সরাসরি তাঁর সাথে আলাপচারিতা করতে। আমাদের পিতা আদম (আলাইহিস সালাম -সালাম বর্ষিত হোক তার ওপর) যেভাবে পেতেন, আমরা ওই একই রকম শান্তি আর অনুভব করি না।
আমরা জমিনে নেমে আসি। তাঁর থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হই। আর বিচ্ছেদের ওই যন্ত্রণাতে আমরা রক্তাক্ত হই। এই প্রথমবারের মতো আমরা রক্তাক্ত হই। আমাদের সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ওই ঘটনা [আমাদের মাঝে] এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ওই গভীর ক্ষত সাথে নিয়েই আমরা জন্ম গ্রহণ করি। আর যখন আমরা বড় হতে থাকি, আমাদের ওই ক্ষতের যন্ত্রণা ততই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। কিন্তু সময় যতই পার হতে থাকে, আমাদের ফিতরাত বা সহজাত প্রকৃতির মধ্যে নিহিত এর প্রতিষেধক থেকে আমরা কেবল দূরেই সরতে থাকি। আর সে এন্টিডোট বা প্রতিষেধক হচ্ছে: মন, অন্তর ও আত্মা দিয়ে তাঁর নিকট থেকে নিকটতর হওয়া।
আর যতই দিন পার হতে থাকে, আমরাও ওই শূন্যতা পূরণের জন্য ব্যাকুল থেকে ব্যাকুলতর হতে থাকি। কিন্তু শূন্যতা পূরণের এই অনুসন্ধানে আমরা হোঁচট খেয়ে বসি। আমাদের প্রত্যেকে বিভিন্ন জিনিসে হোঁচট খাই। আবার অনেকেই ওই শূণ্যতার অনুভূতিকে অসাড় করে দিতে চায়। আর তাই মানুষের মাঝে কেউ হোঁচট খায় মদ বা মাদকে, আবার কেউ হোঁচট খায় উত্তেজনা প্রশমনকারী ওষুধে (Sedatives)। আবার কেউ হোঁচট খায় বস্তুগত ভোগ-বিলাসে বা প্রতিপত্তি ও অর্থের উপাসনায়। কেউবা আবার নিজ নিজ ক্যারিয়ারের আবর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
অথবা কেউ কেউ হোঁচট খায় অন্য মানুষে (অর্থাৎ সম্পর্ক ও ভালোবাসায়) এবং সেখানেই নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু প্রতিটি হোঁচট, প্রতিটি চ্যালেঞ্জ, আমাদের জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার উদ্দেশ্যই যদি হয় আমাদেরকে আপন উৎসের নিকট ফিরিয়ে আনার জন্য? যদি প্রতিটি জয়, প্রতিটি পরাজয়, প্রতিটি সৌন্দর্য, প্রতিটি পতন, প্রতিটি নিষ্ঠুরতা ও প্রতিটি হাসির প্রকৃত উদ্দেশ্য হয় আমাদের ও মহান আল্লাহর মাঝে আরেকটি বাধা উন্মোচন করার জন্য? যদি এসবের উদ্দেশ্য হয় আমাদের ও আমাদের সেই উৎস, যেখানে ফেরার জন্য আমরা অবিরাম প্রচেষ্টা করে যাচ্ছি, তার পথে আরেকটি প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য?
এসব কিছুই যদি শুধুমাত্র তাঁকে দেখার জন্যেই হয়ে থাকে, তবে কেমন হবে?
আমাদেরকে এটা জানা খুবই জরুরি যে, এই জীবনে আমরা যত অভিজ্ঞতাই লাভ করি না কেন, তাদের একটিও উদ্দেশ্যবিহীন নয়। আর ওই উদ্দেশ্য উপলব্ধি করবো কি করবো না, তার সিদ্ধান্ত আমরাই নিয়ে থাকি। উদাহরণ হিসেবে সৌন্দর্যের বিষয়টিই বিবেচনা করি। এমনও মানুষ আছে, যাদের চোখের সামনে সৌন্দর্য থাকলেও তারা সেটা উপলব্ধি করতে পারে না। তারা চমৎকার সূর্যোদয় কিংবা সৌন্দর্যে ভরপুর কমলা বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাবে, কিন্তু তারা এসব সৌন্দর্যের কিছুই খেয়াল করবে না।
অন্যরা সৌন্দর্য দেখে এবং সেটার মূল্যায়ন করে। তারা সেখানে থামবে এবং সে সৌন্দর্য উপভোগ করবে। এমনকি তারা হয়তো ওই সৌন্দর্যে অভিভূতও হবে। কিন্তু সেটা সেখানেই শেষ। এদের উপমা ওই লোকের মতো, যে শিল্পকে কদর করলেও শিল্পীর খোঁজ জানতে চায় না। বস্তুত শিল্পকর্ম এমন এক মাধ্যম, যার সাহায্যে শিল্পী কোনো বার্তা দিতে চায়, কিন্তু শিল্পের প্রেমিক যদি ওই শিল্পকর্মতেই হারিয়ে যান এবং ওই বার্তাকে কখনো চোখ মেলে না দেখেন, তবে ওই শিল্পকর্মটি তার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে পূরণ করতে পারেনি।
আলোকজ্জ্বল সূর্য, প্রথম ঝরা তুষার, নবচন্দ্র এবং শ্বাসরুদ্ধকর সমুদ্র কেবল এই নিঃসঙ্গ গ্রহকে সজ্জিত করতে সৃজিত হয়নি। এগুলোর উদ্দেশ্য পৃথিবীকে সজ্জিতকরণের চেয়েও আরও গভীর ও তাৎপর্যমণ্ডিত। কুরআনে আল্লাহ আমাদেরকে এসবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন:
“বস্তুত আসমান ও জমিনের সৃষ্টি, রাত ও দিনের আবর্তন তাদের জন্য নিদর্শন, যাদের উপলব্ধি শক্তি রয়েছে।"
"যারা দাঁড়িয়ে বা বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহর যিকির বা স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে, (তারা বলে), “হে আমাদের প্রতিপালক, কিছুই আপনি উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। (অর্থহীনভাবে কোনো কিছু করা থেকে) আপনি পবিত্র, আর আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।"
সকল সৌন্দর্যকে সৃষ্টিই করা হয়েছে এক নিদর্শন হিসেবে, কিন্তু ওই নিদর্শন কেবল বিশেষ একদল মানুষই উপলব্ধি করে: যারা চিন্তা করে (ভাবে, উপলব্ধি করে এবং নিজেদের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগায়) এবং প্রতিটি মানবীয় অবস্থাতে (দাঁড়িয়ে, বসে, শায়িত অবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে।
তাই সূর্যাস্তের [সৌন্দর্য] ভেদ করে আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। এমনকি সেখানেও আমরা নিজেদেরকে হারাতো পারবো না। চোখ ঝলকানো সৌন্দর্য ও বর্ণচ্ছটার ওপারে তাকাতে হবে। কেননা, এসবের পেছনে যে সৌন্দর্য লুকায়িত, সেটাই প্রকৃত সৌন্দর্য, সকল সৌন্দর্যের উৎস। আমরা যা কিছুই দেখি, সেটা এক প্রতিফলন মাত্র।
আমাদেরকে তারকা পুঞ্জ, বৃক্ষরাজি, তুষারাবৃত পর্বতসমূহ নিয়ে চিন্তা- গবেষণা করতে হবে, যাতে করে এগুলোর অন্তরালে যে বার্তা নিহিত আছে, সেগুলো আমরা পাঠ করতে পারি। এমনটি না করলে আমাদের অবস্থা হবে ওই ব্যক্তির মতোই, যে সুন্দরভাবে সজ্জিত একটি বোতলে একটি বার্তা পায়, কিন্তু সে ওই বোতলের সৌন্দর্যে এতোটাই মোহিত হয় যে, বোতল খুলে সে আর ওই বার্তাটি পড়ার প্রয়োজন বোধ করে না।
তারকাপুঞ্জের আতিশয্যের মাঝে কি এমন বার্তা লুকিয়ে আছে? সেখানে একটা নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু সেটা কিসের নিদর্শন? এসব নিদর্শন তাঁর দিকে এক একটি নিদের্শক, এগুলো তাঁর বড়ত্ব, তাঁর পরাক্রমশীলতা, তাঁর সৌন্দর্যের দিকে ইশারা করে। এগুলো তাঁর শক্তি এবং তাঁর ক্ষমতার দিকে নির্দেশ করে। সৃষ্টির সৌন্দর্য ও মহিমা নিয়ে ভাবুন, গবেষণা করুন, তাতে গভীরভাবে নিমগ্ন হোন, কিন্তু সেখানে যেন আটকে যাবেন না। সৌন্দর্যের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না। এগুলো অতিক্রম করে সামনে দেখুন এবং একবার ভাবুন তো, সৃষ্টি যদি এতো রাজকীয় হয়, সৃষ্টি যদি হয় এতো সুন্দর, তবে স্রষ্টা কতটা রাজকীয় হবেন, কতটা সুন্দর ও মহান হবেন তিনি।
সবশেষে, উপলব্ধি করুন, আত্মস্থ করুন [কুরআনের এই বাক্য]: رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ “হে আমাদের প্রতিপালক, কিছুই আপনি উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। মহিমা আপনারই।” (কুরআন, ৩:১৯১)
সবকিছুরই একটি উদ্দেশ্য আছে। আসমান বা জমিন, কিংবা আমার বা আপনার মাঝে যা কিছু আছে, তার কিছুই উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্ট হয়নি। না আপনার জীবনের কোনো ঘটনা, না কোনো দুঃখ, না কোনো আনন্দ, না কষ্ট, না সুখ ... না কোনো ক্ষতি সর্বোপরি কিছুই উদ্দেশ্যবিহীন নয়। তাই সূর্য, চন্দ্র ও আসমানরূপী বোতলে মাঝে 'যে বার্তা দেওয়া হয়েছে', আমাদেরকে সে বার্তাগুলি যেমন পাঠ করতে হবে, তেমনিভাবে আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোর মাঝে যে বার্তা আছে, তাও পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।
আমরা সর্বদাই নিদর্শন চাই। আল্লাহর কাছে আমরা সর্বদা এই প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সাথে 'কথা বলেন'। কিন্তু ওই নিদর্শনগুলো আমাদের চারদিকেই আছে। তারা সব কিছুর মধ্যেই বিদ্যমান। আল্লাহ প্রতিনিয়ত 'কথা বলেই যাচ্ছেন'। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি [আল্লাহর ওই কথাগুলো] শুনতে পাচ্ছি? আল্লাহ বলেন:
"যারা জানে না, তারা বলে, 'আল্লাহ কেন আমাদের সাথে কথা বলেন না কিংবা আমাদের কাছে কেন কোনো নিদর্শন আসে না? আর এদের পূর্বের লোকেরাও এরূপ কথা বলেছিল। এদের অন্তরগুলি একই রকম। দৃঢ়বিশ্বাসীদের জন্য আমরা নির্দশনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করেছি।” وَقَالَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللَّهُ أَوْ تَأْتِينَا آيَةٌ كَذَلِكَ قَالَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِم مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوبُهُمْ قَدْ بَيَّنَا الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ (কুরআন, ২:১১৮)
আমরা যদি দৃষ্টি সীমা ছাড়িয়ে নেপথ্যে যেতে পারি এবং আমাদের এই জীবনে আমাদের সাথে যাই ঘটুক না কেন, যা কিছুই আমরা করি -কিংবা করতে ব্যর্থ হই- তার সবকিছু ভেদ করে যদি আমরা আল্লাহকে দেখি (অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনাকে), তবেই আমরা আমাদের [জীবনের সত্যিকার] উদ্দেশ্যকে পেয়ে যাবো। আপনি পছন্দ করেন এমন কিছু যদি আপনার জীবনে ঘটে, সাবধান থাকুন, এই ঘটনার আসল উদ্দেশ্য যেন আপনার দৃষ্টির আড়াল চলে না যায়। মনে রাখবেন, কোনো কারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না। তাই ওই কারণ খুঁজে বের করুন। আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন, সেটার উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করুন। আপনাকে দান করা জিনিসের মধ্য দিয়ে তিনি নিজ সত্তা বা যাতের কোন দিকটি তুলে ধরতে চাচ্ছেন? তিনি আপনার কাছ থেকে কি চান?
একইভাবে, আপনি যেটা অপছন্দ করেন, আপনার সাথে তেমন কিছু যদি ঘটে কিংবা এমন কিছু যেটা আপনাকে কষ্ট দেয়, তবে ওই বেদনায় আপ্লুত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না। এই কষ্ট ভেদ করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন। "বোতালের” মাঝে যে বার্তা আছে, সেটা খুঁজে বের করুন। খুঁজে বের করুন এটার উদ্দেশ্য। এবং এটা যেন আপনাকে স্রষ্টার সত্তা ও পরিচয়ের দিকে আরেকটু ধাবিত করে।
যদি আপনার পা পিছলে যায়, এমনকি দ্বীনের কোনো বিষয়ে আপনি পতনেরও শিকার হন, তবুও আপনাকে প্রতারিত করার কোনো সুযোগ শয়তানকে দেবেন না। ওই পতন যেন আপনাকে স্রষ্টার রহমত আরও গভীরতার সাথে এবং পর্যালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে সহায়তা করে। এরপর ওই রহমত কামনা করুন, যে রহমত আপনাকে আপনার পাপ ও নিজ সত্তার বিরুদ্ধে করা যুলুম থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। বিষয়টি যদি সমাধানের অযোগ্য হয়ে থাকে, তবে হতাশ হবেন না। বরং যিনি তাঁর বান্দার জন্য যেকোনো জটিল ও আবদ্ধ বিষয়কে উন্মুক্ত করে থাকেন, সেই "আল-ফাত্তাহ"র ঝলক প্রত্যক্ষ করুন। আর তা যদি ভয়াবহ ঝড় হয়ে থাকে, তবে নিজেকে তলিয়ে যেতে দেবেন না। যখন আপনার পাশে কেউই নেই, তখন ওই ঝড়ের কবল থেকে কিভাবে তিনি তাঁর বান্দাকে এককভাবে উদ্ধার করেন, এই বিপদ যেন আপনাকে সেটাই প্রত্যক্ষ করায়।
এবং স্মরণ রাখবেন, যখন সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং যখন কোনো কিছুরই অস্তিত্ব থাকবে না, কেবল তিনি ছাড়া, তখন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন: لمن الْمُلْكُ الْيَوْمَ “রাজত্ব আজ কার হাতে?" (কুরআন, ৪০:১৬)
আল্লাহ বলেন: "ওই দিন তারা বের হবে এবং তাদের يَوْمَ هُم بَارِزُونَ لَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ কিছুই সেদিন আল্লাহর কাছ থেকে গোপন থাকবে না। আজকের এই দিনে সার্বভৌমত্ব কার হাতে? আল্লাহর, যিনি একক [সত্তা] ও প্রবল পরাক্রমশালী।” مِنْهُمْ شَيْءٌ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ (কুরআন, ২:১১৮)
সার্বভৌমত্ব আজ কার হাতে? এই জীবনে ওই সত্যটার সামান্য একটি অংশ হলেও প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করুন। রাজত্ব আজ কার হাতে? আপনাকে রক্ষার ক্ষমতা কার আছে? কে পারে আপনাকে সুস্থ করতে? কে আপনার ভাঙা অন্তরকে জোড়া দিতে পারে? কে আপনাকে রিযিকের সন্ধান দিতে পারে? কার প্রতি আপনি ধাবিত হতে পারেন? কে তিনি? কর্তৃত্ব আজ কার হাতে? লি মানিল মুলকু আল-ইয়াওম?
লি ওয়াহিদিল কাহ্হার। [সার্বভৌমত্ব আজ তাঁরই হাতে, যিনি] একক এবং অদম্য। [আল্লাহ ছাড়া] অন্য কিছুর দিকে দৌড়ানো অনেকটা অপ্রতিরোধ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো। আল-ওয়াহিদ, একক সেই সত্তাকে বাদ দিয়ে অন্যকে অন্বেষণ করার পরিণতি ছিন্নভিন্ন হওয়া ছাড়া আর কিছু নয় এবং [ছিন্নভিন্ন ওই অন্তর] কখনো পূর্ণতার দেখা পাবে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে কিভাবে আমরা অন্তর বা আত্মা বা মনের ঐক্য ও পূর্ণতার সন্ধান পাবো?
যেখান থেকে আমরা এই পথের যাত্রা আরম্ভ করেছি, আল্লাহ ছাড়া] সেখানে ফেরার জন্য আমরা আর কার কাছে ছুটে যাবো? আমরা আর কি কামনা করতে পারি? সর্বোপরি, আমরা সকলে এই একটি জিনিসই চাই: পূর্ণ হতে, সুখী হতে এবং চাই পুনর্বার এই কথা উচ্চারণ করতে:
আমরা আপন নিবাসেই আছি।
টিকাঃ
*) الفتاح(-আল-ফাত্তাহ: উন্মোচনকারী। মহান আল্লাহতায়ালার অন্যতম সিফাত এটা (সম্পাদক)।
📄 প্যারাটিকে খালি করা
কোনো পাত্র ভরার আগে আপনাকে অবশ্যই ওই পাত্র খালি করে নিতে হবে। অন্তর এক পাত্রের ন্যায়। অন্যসব পাত্রের ন্যায় অন্তরকে পূর্ণ করার আগে এটাকে অবশ্যই খালি করে নিতে হবে। যতক্ষণ কারো অন্তর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা (মহিমান্বিত যিনি) ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা পূর্ণ থাকে, ততক্ষণ সে তার অন্তরকে আল্লাহ দ্বারা পূর্ণ করার আশা কখনো করতে পারে না।
অন্তরকে খালি করার মানে এই নয় যে, আপনি ভালোবাসবেন না। সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকৃত ভালোবাসা ততক্ষণ বিশুদ্ধ থাকে, যতক্ষণ না এটা মিথ্যা অনুরাগের ওপর ভিত্তিশীল হয়। প্রথমত, অন্তরকে খালি করার প্রক্রিয়া শাহাদা (কালেমার ঘোষণা)-এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে, ঈমানের ঘোষনার এই বাক্য শুরু হয়েছে, একটা তাৎপর্যপূর্ণ অস্বীকৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ শূন্যকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা। সত্যিকার তাওহিদ (তথা সত্যিকার একত্ববাদে) পৌঁছানোর আগে, একক প্রভুতে আমাদের ঈমান রয়েছে, এই দাবিকে দৃঢ় করার পূর্বে, আমরা সবার আগে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করি: "লা ইলাহা” (কোনো ইলাহ নেই)। উপাসনার বস্তুকে ইলাহ বলে। কিন্তু এটা উপলব্ধি করা জরুরি যে, ইলাহ এমন কিছু নয় যে, যার কাছে আমরা শুধু প্রার্থনা করি। ইলাহ এমন এক জিনিস, যাকে কেন্দ্র করে আমাদের জীবন আবর্তিত হয়, যাকে আমরা মান্য করি এবং আমাদের কাছে যার গুরুত্ব সবকিছুর উপরে এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
এটা এমন এক জিনিস, যেটার জন্য আমরা বেঁচে থাকি – যেটা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
নাস্তিক, সংশয়বাদী, মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি থেকে আরম্ভ করে প্রত্যেক ব্যক্তিরই একজন ইলাহ আছে। আমাদের সকলেই কিছু না কিছুর উপাসনা করি। অধিকাংশ মানুষের জন্য উপাসনার বস্তু এই পার্থিব জীবন তথা দুনিয়া থেকে নেওয়া। কিছু মানুষ সম্পদের উপাসনা করে, কেউ করে প্রতিপত্তির উপাসনা, কেউ খ্যাতির উপাসনা করে, আবার কেউ উপাসনা করে নিজের মেধার। কিছু মানুষ আবার অন্যের উপাসনা করে। আবার কুরআনের বর্ণনা মোতাবেক অনেকেই স্বীয় সত্তা, স্বীয় কামনা ও খেয়াল-खुশির উপাসনা করে। আল্লাহ বলেন:
"আপনি কি তাকে দেখেন না, যে (নিজের) কামনা ও বাসনাকে নিজের ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে পথভ্রষ্ট হতে দেন এবং তার কর্ণে ও অন্তরে (এবং তার উপলব্ধিতে) মোহর লাগিয়ে দেন এবং তার দৃষ্টিশক্তির ওপর পর্দা ঢেলে দেন। আল্লাহ ছাড়া এমন কে আছে, যে তাকে পথ দেখাতে পারে (যখন আল্লাহ তার থেকে হেদায়েতকে সরিয়ে রেখেছেন)? এরপরেও কি এরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?" أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (কুরআন, ৪৫:২৩)
এই উপাসনার বস্তুগুলি এমন জিনিস যেগুলো প্রতি আমরা অনুরক্ত বা আসক্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের আসক্তির বস্তুটি কেবল আমাদের ভালোবাসার বস্তুই নয়। বরং গূঢ় দৃষ্টিতে, এটা আমাদের খুবই প্রয়োজনের বস্তু। এটা এমন এক জিনিস, যা হারিয়ে গেলে আমরা চরমভাবে ভেঙে পড়ি। আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু বা কেউ যদি থেকে থাকে, যেটাকে পরিত্যাগ করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়, তবে [বুঝে নিতে হবে] আমরা মিথ্যা আসক্তির মাঝে আছি। নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে কেন তার সন্তানকে কুরবানি করতে বলা হলো? তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই এমন আদেশ দেওয়া হয়েছে। এটা ছিল মিথ্যা আসক্তির কবল থেকে তাকে মুক্ত করার উপায়। একবার যখন তিনি (এ থেকে) মুক্ত হয়ে গেলেন, তখন (তার অনুরাগের বস্তুকে নয়), বরং তার ভালোবাসার বস্তুকে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু বা কেউ যদি থেকে থাকে, যা হারালে আমরা চরমভাবে ভেঙে পড়ি, [তখন বুঝতে হবে], আমরা মিথ্যা আসক্তির কবলে রয়েছি। মিথ্যা আসক্তি হলো ওইসব জিনিস, যেগুলো হারালে আমরা অনেকটা অস্বাভাবিকভাবে আকুল হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হই। এটা এমন এক জিনিস, যেটা হারানো সামান্য সম্ভাবনাও যদি আমাদের অন্তরে সৃষ্টি হয়, তবে আমরা সেটার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি। আমরা সেটার পেছনে হন্যে হয়ে ছুটতে থাকি। কেননা, অনুরাগ বা আসক্তির জিনিস হারানোর মানেই হচ্ছে: চরমভাবে ভেঙে পড়া। অর্থবিত্ত, অর্জিত বিষয়াদি, অন্য মানুষজন, কোনো চিন্তা, দৈহিক আনন্দ, নেশার দ্রব্য, প্রতিপত্তির নিশানা (Status Symbol), আমাদের ক্যারিয়ার, আমাদের ভাবমূর্তি, অন্য লোকেরা কিভাবে আমাদেরকে দেখে বা মূল্যায়ন করে, আমাদের বাহ্যিক প্রকাশ বা সৌন্দর্য, যেভাবে আমরা পোশাক পরিধান করি কিংবা অন্যের সামনে উপস্থিত হই, আমাদের ডিগ্রিসমূহ, আমাদের চাকুরির পদ, [অন্যকে] নিয়ন্ত্রণ করার সুপ্ত ইচ্ছা কিংবা আমাদের বুদ্ধি বা যুক্তি, এসবই হতে পারে [আমাদের] অনুরাগ বা আসক্তির বস্তু। যতক্ষণ না আমরা এসব মিথ্যা অনুরাগ বা আসক্তিকে ভেঙে ফেলতে সমর্থ হচ্ছি, ততক্ষণ আমরা আমাদের অন্তরের পাত্রকে খালি করতে সক্ষম হবো না। পাত্রকে (তথা অন্তরকে) খালি করতে না পারলে, আল্লাহর দ্বারা সত্যিকার অর্থে আমরা সেটা কখনো পূর্ণ করতে সমর্থ হবো না।
অন্তরকে সমস্ত মিথ্যা অনুরাগ বা আসক্তি থেকে মুক্ত করার এই সংগ্রাম, পাত্রকে খালি করার এই সংগ্রামই পার্থিব জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। এই সংগ্রামই তাওহিদ (তথা সত্যিকার একত্ববাদের) প্রাণসত্তা। আপনি যদি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভকে গভীরভাবে যাচাই করে থাকেন, তবে দেখবেন, এগুলো মূলত [আপনার মাঝে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও আসক্তি] থেকে নির্লিপ্ত বা অনাসক্ত থাকার ব্যবস্থা এবং এর প্রক্রিয়াকে সচল করে:
শাহাদা (কালেমার ঘোষণা): ঈমানের ঘোষণা হলো (বস্তুগত আকর্ষণগুলির প্রতি) অনাসক্তির সেই মৌখিক ঘোষণা, যা অর্জনের জন্য আমরা সচেষ্ট থাকি; যার দাবি হলো আমাদের ইবাদত, পরিপূর্ণ ইখলাস, ভালোবাসা, ভয়-ভীতি এবং আশার কেন্দ্রবিন্দু হবেন আল্লাহতায়ালা। শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালাই। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য সমস্ত জিনিসের আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাফল্যের মাঝেই তাওহিদের সত্যিকার রূপের বিকাশ ঘটে।
সলাত (দৈনিক ৫ ওয়াক্তের সলাত): দৈনিক পাঁচবার আমরা আবশ্যিকভাবে নিজেদেরকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাদের স্রষ্টা ও জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের ব্যাপারে গভীর মনোযোগে নিবিষ্ট হই। দুনিয়াবী যে কাজে আমরা ব্যস্ত থাকি না কেন, দৈনিক পাঁচবার আমরা সবকিছু থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। দিনে একবার, আর না হয় সপ্তাহে একবার কিংবা পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের সবগুলোকে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়েও আদায়ের বিধান দেওয়া যেতো, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি, বরং সলাতকে গোটা দিনের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি যথা সময়ে তাদের সলাতগুলো আদায় করে, তবে [দুনিয়াতে] আসক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। যখনই আমরা দুনিয়ার কোনো বিষয়ে মশগুল হতে থাকি, (মশগুল হতে থাকি আমাদের চাকরির কাজে, আমাদের উপভোগ করা অনুষ্ঠানগুলোতে, আমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে, ওই ব্যক্তির চিন্তাতে, যাকে আমাদের মন থেকে সরাতে পারছি না), তখনই আমাদেরকে ওইসব জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে এবং নিজেদের মনোযোগকে একমাত্র সত্যিকার আসক্তির বস্তুতে (অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি) নিবদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়।
সিয়াম (রোজা রাখা): নিজেকে [দুনিয়ার মোহ] থেকে বিচ্ছিন্ন করার নামই রোজা। খাবার, পানি, যৌন চাহিদা, অসার কথাবার্তা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখাই সিয়াম বা রোজা। দৈহিক সত্তাকে [এসব থেকে] বিরত রাখার মাধ্যমে আমরা আমাদের রুহানি সত্তাকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ, পরিশুদ্ধ ও মর্যাদাময় করি। রোজার মাধ্যমে নিজেদেরকে আমরা দৈহিক প্রয়োজন, কামনা ও বাসনা থেকে মুক্ত রাখতে বাধ্য হই।
যাকাত (সাদাকা বা দান): যাকাত হচ্ছে নিজেদেরকে নিজেদের [উপার্জিত] সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ খরচ করা। দানের মাধ্যমে [নিজেদের অন্তরে বিদ্যমান] সম্পদের আসক্তিকে আমরা ভেঙে চুরমার করতে বাধ্য হই।
হজ (তীর্থযাত্রা): [দুনিয়া থেকে নিজেকে] বিচ্ছিন্ন করার সবচেয়ে ব্যাপক ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আমল হচ্ছে হজ। হজের উদ্দেশ্যে যিনি রওনা দেন, তিনি তার জীবনের সব কিছুকে পেছনে ফেলে আসেন। তিনি তার পরিবার, তার বাড়ি, তার ছয় সংখ্যার বেতন, তার উষ্ণ বিছানা, তার আরামদায়ক জুতা এবং ব্র্যান্ড জামা, কাপড় থেকে শুরু করে সবকিছু ত্যাগ করার বিনিময়ে গ্রহণ করেন দুটুকরো কাপড় পড়ে মাটিতে কিংবা জনসমুদ্রে তাবু টাঙ্গিয়ে শোয়া। হজের মাঝে প্রতিপত্তির কোনো নিশানা নেই। না কোনো টমি হিলফিগার° ইহরাম, আর না কোনো ফাইভ স্টার তাবু (হজের যেসব প্যাকেজ ৫ স্টার হোটেলের কথা বলে, তারা হজের আগে ও পরে এসব সুবিধা দেওয়ার কথা বলে। কেননা, হজের সময় আপনি মিনাতে তাবু পাতেন এবং মুজদালিফাতে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে ঘুমান)।
চিন্তা করে দেখুন যে, আল্লাহ তাঁর অসীম প্রজ্ঞা ও রহমত হিসেবে আমাদেরকে কেবল দুনিয়া থেকে নিরাসক্ত হতে বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং কিভাবে সেটা করতে হবে, সেটাও বলে দিয়েছেন। [ইসলামের] এই পাঁচটি স্তম্ভ ছাড়াও আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ থেকেও [দুনিয়া] বিমুখতার এই ঝলক প্রতিফলিত হয়। নবি (ﷺ) আমাদেরকে আর সব মানুষ থেকে পৃথক হতে বলেছেন, এমনকি সেটা যদি বেশভূষাতেও হয়। হিজাব, কুফি” পরিধানের মাধ্যমে কিংবা দাড়ি রাখার মাধ্যমে আপনি চাইলেও সবার সাথে মিশে যেতে পারেন না। নবি (ﷺ) বলেন:
“ইসলামের সূচনা হয়েছে অপরিচিতের মতো এবং খুব শীঘ্রই এটা শুরুর মতো অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে, তাই সেই অপরিচিতদের জন্য রইলো সুসংবাদ।” [মুসলিম]
এই দুনিয়াতে “অপরিচিত” হওয়ার মাধ্যমে দুনিয়াতে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে না গিয়ে আমরা এর মধ্যে বসবাস করতে পারি। [দুনিয়া প্রতি] নিরাসক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই আমরা পারি আমাদের অন্তরের পাত্রকে খালি করতে এবং ওই জিনিসের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত করতে, যেটা অন্তরকে দেয় পুষ্টি ও জীবনীশক্তি। অন্তরকে [দুনিয়ার ভোগ বিলাস থেকে] শূন্য করে আমরা এটাকে সত্যিকার পুষ্টি হাসিলের জন্য প্রস্তুত করি।
[আর তা হলেন] আল্লাহ (অর্থাৎ তাঁর মহব্বত)।
টিকাঃ
* লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) এই ঘোষণা কালিমা শাহাদাতের প্রথম অংশ। যেহেতু নবি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর মাধ্যমে আমরা কালিমা শাহাদাতের এই অংশটুকু লাভ করেছি, তাই স্বাভাবিকভাবে বাকি অংশ হবে -মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর রসুল।
বস্তুত, এটা নিছক কোনো ঘোষনা নয়, বরং এটা জীবনের এক সিদ্ধান্ত - Policy Declaration। যে সিদ্ধান্ত মোতাবেক একজন মুসলিমের গোটা জিন্দেগি পরিচালিত হওয়ার কথা। যেটার উজ্জ্বল নমুনা আমরা নবি (ﷺ)-এর সাহাবিগণের মাঝে দেখতে পাই। এই কালেমা তাদের জীবনকে এতটাই আন্দোলিত করেছিল যে, তারা এই কালেমার বাস্তবায়নের জন্য নিজের জীবনকে পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন, আর এ কারণেই তারা হয়েছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম ও আল্লাহর সুসংবাদপ্রাপ্ত জাতি এবং যাদের কাছে হার মেনেছিল গোটা বিশ্ব (সম্পাদক)।
১০ পাশ্চাত্যের একটি ব্র্যান্ড।
১” এক ধরনের টুপি, যা বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা পরিধান করেন- (সম্পাদক)।