📄 উৎসর্গ
মায়ের গর্ভে থাকার বহু আগেই যিনি আমাকে লালন করেছেন, এই গ্রন্থের পুরোটাই সেই মহান সত্তার জন্য নিবেদিত। যিনি আমাকে শিখিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং জীবনভর যিনি আমাকে সুপথ দেখিয়েছেন, এটা তাঁর জন্যই উৎসর্গিত। এই বিনীত প্রচেষ্টাটুকু আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি এবং আমার অক্ষমতা সত্ত্বেও আমি দু'আ করি, হয়তো এটা [মহান আল্লাহর দরবারে] কবুল হবে এবং সেইসাথে আমি আমার পরিবারের জন্য দু'আ করি, যারা আমাকে [জীবনের] এই যাত্রায় সহায়তা করে গেছেন।
📄 প্রারম্ভিকা
Reclaim Your Heart শুধুমাত্র একটা আত্মোন্নয়নমূলক গ্রন্থ নয়। বরং এটা জীবন সমুদ্রের ভেতর ও বাহিরে আত্মার সফরের জন্য এক ম্যানুয়েল। এই সাগরের গভীরে আপনার অন্তর যাতে নিমজ্জিত না হয়ে যায়, তার পথ বাতলে দেবে এই গ্রন্থ। আর যদি সেরকমটিই ঘটে, তখন কি করা দরকার তাও বলে দেবে। এই গ্রন্থ মুক্তির কথা বলে, আশার কথা আর বলে জীবনকে নবায়নের কথা। প্রতিটি অন্তরই সেরে উঠতে সক্ষম এবং প্রতিটি মুহূর্তকে বানানোই হয়েছে আমাদের পরিবর্তিত পরিবর্তনের কাছে নিয়ে যেতে। সবকিছু যখন থমকে দাঁড়ায়, মনে হয় হঠাৎ সব বদলে গেছে, তখন পরিবর্তনের ওই মুহূর্তটি খুঁজে পাওয়াই হলো নিজের অন্তরকে পুনরুদ্ধার করা -Reclaim Your Heart। নিজের জাগরণকে খুঁজে পাওয়ার মতোই এটা। এরপর নিজের অধিকতর সমৃদ্ধ, সত্যনিষ্ঠ এবং মুক্ত রূপের কাছে ফিরে আসা।
📄 আবেগ-অনুরাগ-আসক্তি
এই দুনিয়া আপনাকে ভাঙতে পারে না, যদি না আপনি তাকে সেটার অনুমতি দেন। দুনিয়া আপনাকে আয়ত্ত করতে পারে না, যদি না আপনি নিজে থেকে চাবির গোছা তার হাতে তুলে দেন, যদি না আপনি নিজের আত্মাকে দুনিয়ার কাছে বন্ধক রাখেন। যদি তেমনটিই হয়ে থাকে, যদি আপনি নিজের ওই চাবিগুলো কিছু সময়ের জন্য তুলেই দিয়ে থাকেন দুনিয়ার হাতে, তবে সেটা ফিরিয়ে নেন। এটাই শেষ নয়। এ অবস্থাতেই আপনাকে মরতে হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। নিজের আত্মাকে পুনরুদ্ধার করুন এবং এটাকে তার উপযুক্ত মালিকের হাতে সমর্পণ করুন, আর সেই মালিক হলেন -আল্লাহ।
📄 মানুষ কেন অপরকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়?
আমার বয়স তখন ১৭। আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম। আমি স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা মসজিদের ভিতর এবং ছোট্ট একটা মেয়ে ছুটে এসে আমাকে প্রশ্ন করে। তার প্রশ্ন ছিল, “মানুষ কেন অপরকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়?” যদিও প্রশ্নটি ছিল ব্যক্তিগত, কিন্তু বেছে বেছে আমাকে এই প্রশ্ন কেন করা হলো, তা আমার কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।
কারণ আমিই অনুরাগ ও আসক্তির মোহে আচ্ছন্ন ছিলাম।
ছেলেবেলা থেকেই আমার এই মেজাজ বা স্বভাবটি আমার কাছে স্পষ্ট ছিল। প্রিস্কুলে [বা কিন্ডারগার্টেনে] অন্য শিশুরা পিতামাতার অনুপস্থিতিকে খুব সহজেই মেনে নিতে পারতো, কিন্তু আমি পারতাম না। একবার আমার চোখের পানি বের হওয়া শুরু হলে, তা আর থামানো যেতো না। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে চারপাশের সবকিছুর সাথে কেমন করে যেন মায়ার এক বন্ধনে আটকে যেতাম। প্রথম গ্রেডে পড়ার সময় আমার প্রয়োজন ছিল একজন ভালো বন্ধুর। বয়স বাড়ার সাথে সাথে যদি কোনো বন্ধুর সাথে ঝগড়া হতো, তবে সেটা আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতো। কোনো কিছুর চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারতাম না। মানুষ, স্থান, ঘটনা, ফটোগ্রাফ, মুহূর্ত -এমনকি ফলাফলও আমার শক্ত আবেগ-অনুরাগের বস্তুতে পরিণত হতো। আমি যেভাবে চেয়েছি কিংবা যেমনটি ভেবেছি, বিষয়াদি যদি সেভাবে না হতো, তবে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যেতাম। হতাশা আমার জন্য কোনো সাধারণ আবেগ ছিল না, বরং এটা ছিল আমার জন্য সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। একবার ভেঙে পড়লে, সেখান থেকে পুরোপুরি উঠে দাঁড়াতে পারতাম না। আমি ভুলতে পারতাম না, তাই ভাঙন কখনো সারতো না। যেন টেবিলের কোণায় রাখা কাঁচের ফুলদানি, যদি একবার ভাঙ্গে, আর তা জোড়া লাগে না।
যাইহোক, ফুলদানি নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না, আর সেটার বারবার ভেঙে যাওয়াটাও মূল সমস্যা ছিল না। সমস্যাটা ছিল আমি সব সময় সেগুলোকে টেবিলের কোণাতেই রাখতাম। অনুরাগ ও আবেগের মাধ্যমে স্বীয় প্রয়োজন মেটাতে আমি আমার সম্পর্কগুলোর ওপর বেশ নির্ভরশীল ছিলাম। আমি সুযোগ করে দিয়েছিলাম যেন আমার সম্পর্কগুলোই নির্ধারণ করবে আমার সুখ, আমার দুঃখ, আমার পূর্ণতা, আমার শূন্যতা, আমার নিরাপত্তা, এমনকি আমার নিজের সত্তার মূল্যায়ন। টেবিলের কোণায় ফুলদানি রাখলে যেমন সেটা পড়বেই ঠিক সেভাবেই। এসব নির্ভরশীলতার মাধ্যমে আমি নিজেকে হতাশায় নিমজ্জিত হওয়ার ব্যবস্থা করে রাখতাম। আর আমি তাই পেতাম: এক হতাশার পরে আরেক হতাশা এবং একের পর এক ভেঙে পড়া।
তথাপি যারা আমার ভেঙে পড়ার পেছনে দায়ী, তাদেরকে দোষ দেওয়ার অর্থ হবে ফুলদানি পড়ে ভাঙার জন্য মধ্যাকর্ষণকে দোষারোপ করার মতো। আমাদের ভর দেওয়ার জন্য যদি গাছের নরম ডালটি ভেঙে যায়, তবে পদার্থবিদ্যার নিয়ম কি এর জন্য দোষী? গাছের নরম ডাল তো কখনো আমাদেরকে বহন করার জন্য সৃষ্ট হয়নি।
স্রষ্টাই কেবল পারেন আমাদের অবলম্বন হতে। এজন্য কুরআনে আমাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছে: "... যে তাগুতকে* প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে এমন এক মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ভাঙ্গে না। আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ।” (কুরআন, ২:২৫৬)
এই আয়াতটিতে নিহিত রয়েছে এক তা্যময় শিক্ষা, অর্থাৎ: এমন এক হাতল আছে যা কখনো ভাঙ্গে না। আছে এমন এক জায়গা, যার ওপর আমরা সর্বাবস্থায় নিশ্চিন্তে নির্ভর করতে পারি। কেবল একটি সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে আমাদের মূল্যমান, আর কেবল একজনই আছেন যাঁর কাছে চূড়ান্ত সুখের আশা করা যায়, আশা করা যায় পূর্ণতা ও নিরাপত্তার। সেই আশার ও ভরসাস্থল হলেন: আল্লাহ।
যাহোক, এই দুনিয়াটা এমনই যে, মানুষ এই সুখ, নির্ভরতা, পূর্ণতা এবং নিরাপত্তাকে খুঁজে ফিরে অন্য কোথাও। কেউ এগুলোকে খুঁজে ক্যারিয়ারের মাঝে, কেউ খুঁজে বেড়ায় ধনসম্পদের মাঝে, আবার কেউবা প্রতিপত্তির মাঝে এগুলো হাতড়ে বেড়ায়। আর আমার মতো কেউ এগুলো খুঁজে বেড়ায় সম্পর্কের মাঝে। এলিজাবেথ গিলবার্ট তার Eat, Pray, Love গ্রন্থে তিনি কিভাবে সুখের সন্ধান করেন, তার বিবরণ তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এবং সেগুলো থেকে বেড়িয়ে আসা এবং এমনকি এই সুখের সন্ধানে পৃথিবী ভ্রমণের আদ্যোপন্ত পর্যন্ত তিনি তুলে ধরেন। তিনি ওই সুখকে খুঁজে বেড়িয়েছেন তার সম্পর্কগুলোর মাঝে, ধ্যানের মাঝে, এমনকি খাবারের মাঝেও তিনি সুখ তালাশ করেছেন এবং সবই তার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
ঠিক এগুলোর পেছনেই আমি আমার জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছি: চেয়েছি নিজের আত্মিক শূন্যতা মেটানোর একটি পথ খুঁজে পেতে। তাই স্বপ্নের ওই ছোট্ট শিশু আমাকে যে এই প্রশ্নটি করেছে, সেটা তেমন অবাক করা কোনো ব্যাপার নয়। প্রশ্নটি হলো আশাহত হওয়া প্রসঙ্গে। প্রশ্নটা হলো কোনো কিছু খুঁজে ফেরা এবং দিনশেষে খালি হাতে ফেরা প্রসঙ্গে। যখন আপনি খালি হাতে চুন, সুড়কির কংক্রিটের মিশ্রণকে খুঁড়তে থাকেন, তখন কিন্তু আপনি কেবল শূন্য হাতেই ফিরেন না, সেইসাথে নিজের আঙ্গুলগুলোকে ভেঙে আনেন – এই প্রশ্ন ছিল এই রূঢ় বাস্তবতা প্রসঙ্গে। না কোনো কিছু পড়ে, আর না কোনো বিজ্ঞ দরবেশের কাছ থেকে শুনে আমি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। বারবার, বারবার এবং বারবার চেষ্টার মাধ্যমেই আমি এই প্রশ্নের জবাব আমি পেয়েছি।
ওই ছোট্ট শিশুর প্রশ্ন আসলে ছিল আমার নিজের প্রশ্ন ... যে প্রশ্ন আমি নিজেকেই করেছি।
চূড়ান্তভাবে এ প্রশ্নের আসল উদ্দেশ্য ছিল, দ্রুত বয়ে চলা মুহূর্তগুলো এবং ক্ষণস্থায়ী অনুরাগ ও আসক্তির এই দুনিয়ার প্রকৃতি কেমন, তার স্বরূপ জানা। যেহেতু দুনিয়া এমন এক স্থান, যেখানে আজ যারা আপনার সাথে আছেন, তারা হয় আজ বা কাল চলে যাবেন কিংবা চলে যাবেন না ফেরার দেশে। কিন্তু এই বাস্তবতা আমাদের সত্তাকে আঘাত করে, যেহেতু এটা আমাদের প্রকৃতি বিরুদ্ধ। মানুষ হিসেবে যা কিছু পূর্ণ ও স্থায়ী তার অনুসন্ধান, তাকে ভালোবাসা এবং তার পিছে ছুটে বেড়ানোর স্বভাব দিয়েই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদেরকে বানানোই হয়েছে অসীমের পানে ছুটার জন্য। আমরা তো এগুলোই খুঁজে বেড়াই, যেহেতু আমরা এই দুনিয়ার জন্য সৃষ্ট হইনি। আমাদের প্রথম ও সত্যিকার নিবাস তো জান্নাত, যা একইসাথে পূর্ণতা ও স্থায়ীত্বের নিবাস। তাই এমন জীবনের জন্য আমাদের ব্যাকুলতা আসলে আমাদের সত্তারই একটি অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই বাঁধে, যখন আমরা ওই জীবনকে এই দুনিয়াতে খোঁজার চেষ্টা করি। তাই আমরা মরিয়া হয়ে যৌবনকে ধরে রাখার জন্য ক্রিম ও কসমেটিক সার্জারির শরণাপন্ন হই – দুনিয়াকে আঁকড়ে থাকার উদ্দেশ্যে। এটা হলো দুনিয়াকে ওই ছাঁচে পরিণত করার প্রয়াস, বাস্তবে যা দুনিয়ার প্রকৃতি নয় এবং না কখনো দুনিয়া সেরূপ হবে।
ঠিক এই কারণে, যখন আমরা মন উজাড় করে দুনিয়াতে বাস করতে থাকি, তখন এটা আমাদেরকে দেউলিয়া করে দেয়। আসলেই এই দুনিয়া কষ্ট দেয়। অস্থায়ীত্ব ও অপূর্ণতাই দুনিয়ার আসল মর্ম এবং যা কিছুর জন্য আমরা সৃষ্টিগতভাবে ব্যাকুল, এই দুনিয়া তার বিপরীত। আল্লাহ আমাদের মনে এমনই এক ব্যাকুলতা দিয়েছেন, যা অসীম ও পূর্ণতার ছোঁয়া ছাড়া কোনোভাবেই মিটে না। অস্থায়ী কোনো কিছুর মধ্যে পূর্ণতাকে খুঁজতে গিয়ে বস্তুত: আমরা একটা হলোগ্রাম ... তথা মরীচিকার পেছনেই ছুটছি মাত্র। আমাদের অবস্থা হয়েছে নাঙ্গা হাতে চুন, সুড়কির কংক্রিট খোঁড়ারই মতো। প্রকৃতিগতভাবে কোনো ক্ষণস্থায়ী জিনিসকে অসীমে পরিণত করতে চাওয়া আগুন থেকে পানি বের করার মতই অসম্ভব। এতে আগুনে দগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। দুনিয়াকে যখন আমরা আর নিজেদের আশার কেন্দ্র বানাবো না, দুনিয়া যা নয় এবং যা কখনো হবে না অর্থাৎ দুনিয়াকে জান্নাত বানানোর চেষ্টা যখন আমরা থামাবো, কেবল তখনই দুনিয়ার এই জীবন আমাদের মন ভাঙা বন্ধ করবে।
উদ্দেশ্য ছাড়া কিছুই ঘটে না, একেবারে কিছুই না - এই বিষয়টি উপলব্ধি করা আমাদের জন্য আবশ্যক। এমনকি ভগ্ন হৃদয় এবং দুঃখের পেছনেও নিহিত থাকে কোনো না কোনো হেতু। ওই ভগ্ন হৃদয়, ওই দুঃখ আমাদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশের বার্তা নিয়ে আসে। কোথাও কোনো ভুল আছে, এরা আমাদেরকে এই সতর্কবার্তা দেয়। আমাদের পরিবর্তনের সময় হয়েছে, এগুলো আমাদের হুশিয়ার করে। যেমনিভাবে আগুনে হাত রাখলে আমরা যন্ত্রণাবোধ করি এবং এই যন্ত্রণা আমাদেরকে আগুন থেকে হাত সরাতে বলে। আবেগঘন যন্ত্রণা ও দুঃখ আমাদেরকে আত্মিক পরিবর্তনের জরুরি বার্তা দেয়। আমাদের প্রয়োজন হয় (যন্ত্রণার কারণ থেকে) সরে আসার। যন্ত্রণা আমাদেরকে সরে আসতে বাধ্য করে। ভালোবাসার মানুষ যেমন করে আপনাকে একের পর এক কষ্ট দেয়, তেমনি দুনিয়াও আমাদেরকে এভাবেই কষ্ট দিতে থাকে, ফলে অবশ্যম্ভাবীরূপে আমরা এর থেকে সরে আসি। দুনিয়া আমাদেরকে যতই বেদনাগ্রন্থ করবে, আমরাও অবধারিতভাবে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ততই কমাতে থাকবো।
এই দুঃখ ও বেদনা, আমাদের অনুরাগ ও আসক্তির একটি সূচক বা নির্দেশক। যা আমাদেরকে কাঁদায়, যা আমাদেরকে সবচেয়ে বেদনাগ্রন্থ করে, সেখানেই মূলত আমাদের মিথ্যা অনুরাগ ও আসক্তিগুলি বিরাজ করে। এগুলোর পরিবর্তে আল্লাহর সাথেই আমাদের গভীর সম্পর্ক থাকা দরকার। আর বস্তুত: যে জিনিসগুলোতে আমাদের অনুরাগ ও আসক্তি থাকে, সেগুলোই আল্লাহর পথে আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখ ও বেদনাই আমাদের মাঝে নিহিত থাকা মিথ্যা অনুরাগ ও আসক্তিগুলোকে দৃশ্যমান করে। বেদনা আমাদের জীবনে পরিবর্তনের মনোবৃত্তি তৈরি করে এবং নিজের অবস্থার মাঝে যদি অপছন্দনীয় কিছু পাওয়া যায়, তবে সেটা পরিবর্তনের আল্লাহর দেওয়া ফর্মূলা রয়েছে। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ কখনো কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করে।” (কুরআন, ১৩:১১)
একই ধরনের নৈরাশ্য ও মর্মবেদনার সাগরে বছরের পর বছর ডুবে থাকার পর, অবশেষে আমি গভীরভাবে কিছু জিনিস উপলব্ধি করতে থাকি। আমি সব সময় মনে করতাম, বস্তুগত জিনিসের মোহে আসক্ত থাকাই হচ্ছে দুনিয়ার প্রেমের আসল মর্ম। আর আমি বস্তুগত জিনিসের মোহে আচ্ছন্ন ছিলাম না। আমার আসক্তি-অনুরাগ ছিল মানুষের সাথে। আমি আসক্ত থাকতাম ভালোবাসার মুহূর্তগুলো আর আবেগের সাথে। তাই মনে করতাম, দুনিয়া প্রেমের এই কথাটি অন্তত আমার বেলায় প্রযোজ্য নয়। মানুষ, সময়, আবেগ সবই যে দুনিয়ার একটি অংশ, এটা আমার মাথায় ছিল না। আমি উপলব্ধি করতে পারিনি যে, জীবনে আমি যত দুঃখ ও বেদনার সাক্ষী হয়েছি, সেগুলোর পেছনে যে কেবল একটি জিনিসই দায়ী, আর তা হলো: দুনিয়ার প্রেম।
বিষয়গুলো যখন আমি আত্মস্থ করতে শুরু করি, আমার চোখের থেকে পর্দার আবরণ তখন সরে যেতে থাকে। সমস্যার মূল উপলব্ধি করতে আমি শুরু করি। এই জীবনের কাছে সে যা নয়, যা কখনো হতে পারবে না, তাই আমি আশা করেছিলাম। আমি সেই [অপূর্ণ] জীবনটাকে নিখুঁত, পূর্ণ ভাবতাম। একজন আদর্শবাদী মানুষ হিসেবে আমি আমার দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে একে নিখুঁত বা পূর্ণ করার জন্য সংগ্রাম করতাম। একে নিখুঁত হতেই হবে, আর সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমি আমার সংগ্রাম বহাল রাখবো, এই ছিল আমার মনোভাব। আমি আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু, ঘাম ও অশ্রু দিয়ে চেয়েছি এই দুনিয়াকে জান্নাত বানাতে। আমি চাইতাম আমার আশেপাশের লোকগুলো নিখুঁত ও ত্রুটিহীন হোক। চাইতাম আমার সম্পর্কগুলোর পূর্ণতা। আমার চারপাশের মানুষ ও জীবন থেকে আমি অনেক বেশি আশা করতাম। প্রত্যাশা, প্রত্যাশা আর শুধুই প্রত্যাশা। আর অসুখী হওয়ার যদি কোনো শ্রেষ্ঠ রেসিপি থাকে, তবে তা হচ্ছে: প্রত্যাশা। আর এখানেই ছিল আমার সবচেয়ে মারাত্মক ভুল। মানুষ হিসেবে প্রত্যাশাটা আমার ভুল ছিল না, বরং আমাদের সব সময়ই আশাবাদী থাকতে হবে। সমস্যা হলো: 'কোথায়' আমি ওই আশাকে রেখেছি এবং 'কোথায়' আমি আমার প্রত্যাশার ফানুস জ্বেলেছি। কেননা, দিন শেষে আমার আশা ও প্রত্যাশার ফানুস যে আমি আল্লাহর জন্য জ্বালিনি। আমার সকল আশা ও প্রত্যাশা ছিল মানুষদের ওপর, সম্পর্ক ও নানাবিধ অবলম্বনেরই মাঝে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এই দুনিয়ার উপরেই ছিল আমার ভরসা।
আর তাই আমি এক চরম সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। আমার হৃদয় জুড়ে কুরআনের একটি আয়াত ঘুরপাক খেতে থাকে। ওই আয়াতটি আমি আগেও শুনেছি, কিন্তু প্রথমবারের মতো ওই আয়াত আমি উপলব্ধি করি। উপলব্ধি করে চমকে উঠি যে, আরে ওই আয়াত তো আমার কথাই বলছেঃ "যারা আমাদের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না, উল্টো তারা পার্থিব জীবন নিয়েই তুষ্ট এবং উৎফুল্ল, তারা আমাদের নিদর্শনসমূহ থেকে আসলেই গাফেল।” (কুরআন, ১০:৭)
আমি এই দুনিয়াতেই সব পেতে পারি, এমনটি ভেবে আমি তো আমার আশাকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য নিবেদিত করিনি। আমার আশা ও ভরসা তো কেবল দুনিয়া কেন্দ্রীক। কিন্তু নিজের আশা-ভরসাকে দুনিয়া কেন্দ্রীক করার তাৎপর্য কি? কিভাবে এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? অর্থাৎ আপনার বন্ধুবান্ধবরা আপনার শূন্যতা মেটাবে, অন্তত এই প্রত্যাশাটুকু করবেন না। বিবাহ করলে স্বামী বা স্ত্রী আপনার সকল প্রয়োজন মেটাবে, অন্তত এই প্রত্যাশা করবেন না। সক্রিয় আন্দোলন কর্মী হলে পরিণতির ওপর নির্ভর করবেন না। বিপদে পড়লে না নিজের ওপর আর না লোকজনের ওপর ভরসা করবেন, ভরসা শুধু আল্লাহর ওপরই করবেন।
হ্যাঁ, মানুষের কাছে সাহায্য চান -কিন্তু সেইসাথে মনে রাখবেন মানুষ (এমনকি আপনার নিজ সত্তা) আপনাকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়। কেবল আল্লাহই পারেন আপনাকে রক্ষা করতে। লোকজন তো শুধু উসিলা, যেটা আল্লাহ [আপনাকে রক্ষার জন্য] ব্যবহার করেন। কিন্তু তারা কখনো সাহায্য, আনুকূল্য ও নাজাতের উৎস নয়। কেবল আল্লাহই এসবের উৎস। আরে মানুষ তো একটি মাছির পাখা বানানোরও ক্ষমতা রাখে না (কুরআন, ২২:৭৩)। এজন্য যতই বাহ্যিকভাবে মানুষের সাথে লেনাদেনা করুন না কেন, আত্মিকভাবে নিজের অন্তরকে আল্লাহর কাছে নিবেদিত রাখুন। কেবল আল্লাহর মুখাপেক্ষী হন, যেমটি নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন: "আমি স্বীয় মুখমণ্ডলকে তাঁরই পানে নিবেদিত করেছি, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (কুরআন, ৬:৭৯)
নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) কিভাবে এই সত্য উপলব্ধিতে উপনীত হলেন? চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ করেন এবং উপলব্ধি করেন এগুলোর কিছুই স্থায়ী তো নয়ই, বরং এগুলোর সবই অন্তশীল।*
আসলে এগুলো আমাদেরকে কেবল হতাশই করে।
এসব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নবি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর দিকে মুখ করেন। তার মতো করে আমাদেরও উচিত হবে আমাদের সকল আশা, আস্থা ও নির্ভরতাকে আল্লাহ এবং শুধু আল্লাহরই ওপর স্থাপন করা। শান্তির সন্ধান পাওয়া এবং অন্তরের স্থিরতা বলতে কি বুঝায়, সেটা আমরা তখনই বুঝতে পারবো, যখন নিজেদের সকল আশা, আস্থা এবং নির্ভরতাকে আমরা আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করতে সফল হবো। কেবল তখনই বস্তুবাদীতার এই রোলার কোস্টার*, যা আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটবে। কেননা, আমাদের আত্মিক অবস্থা যদি সংজ্ঞাগতভাবেই অস্থিতিশীল কোনো বস্তুর ওপর নির্ভর করে, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আত্মিক অবস্থাও অস্থিতিশীল হবে। আমাদের আত্মিক অবস্থা যদি সদা পরিবর্তনশীল ও ক্ষণস্থায়ী জিনিসের ওপর নির্ভর করে, তবে আমাদের আত্মিক অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই অস্থির, বিক্ষুব্ধ ও উতলা হবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে এক মুহূর্তে আমরা হয়তো সুখী হবো, কিন্তু যখনই ওই বস্তুটি বদলে যাবে, যেটার ওপর আমার সুখ নির্ভর করছিল, তখনই আমাদের সুখও তেমন করে বদলে যাবে। আমরা বিষাদে মুষড়ে পড়বো। এক চরম অবস্থা থেকে প্রতিনিয়ত আমরা আরেক চরম অবস্থাতে ঘুরপাক খেতে থাকি এবং কখনো বুঝতে পারি না, কেন এমনটি হচ্ছে।
আমরা আবেগের এই রোলার কোস্টারে চড়ার অভিজ্ঞতা লাভ করি, কারণ যে পর্যন্ত না আমাদের ভালোবাসা ও নির্ভরতা কোনো স্থিতিশীল ও মজবুত কোনো কিছুর ওপর স্থাপিত না হয়, সে পর্যন্ত আমরা স্থিতিশীল ও স্থায়ী শান্তি পেতে পারি না। কিভাবে আমরা স্থিরতা ও স্থায়িত্বের আশা করবো, যখন আমাদের আঁকড়ে ধরা জিনিসটিই অস্থির ও ক্ষীয়মান? আবু বকরের বক্তব্যে এই সত্যের সার্থকতা ফুটে উঠেছে। নবি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর মৃত্যু সংবাদ লোকদের মনে প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং এই সংবাদ তারা সহ্য করতে পারছিল না। কেউই আবু বকরের মতো করে নবি মুহাম্মদ (ﷺ)-কে ভালোবাসেনি, কিন্তু আবু বকর ঠিকই জানেন নিজের নির্ভরশীলতাকে কোথায় স্থাপন করতে হয়, তাই তো তিনি বলতে পারেন: “তোমরা যদি মুহাম্মদের উপাসনা করে থাকো, তবে জেনে রাখো, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু তোমরা যদি আল্লাহর ইবাদত করে থাকো, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।"
যদি এমন মানসিক অবস্থায় উপনীত হতে চান, তবে আল্লাহর সাথে নিজের সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছুকে কখনো নিজের পরিতৃপ্তির উৎস বানাবেন না। আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছুকে কখনো সফলতা, ব্যর্থতা বা আত্মমর্যাদার মানদণ্ড বানাবেন না (কুরআন, ৪৯:১৩)। আর এমনটি করলে কিছুই আপনাকে ভেঙে চুরমার করতে পারবে না, কারণ আপনি এমন এক হাতল ধরে আছেন, যা কখনো ভাঙ্গে না। ফলশ্রুতিতে আপনি হবেন অজেয়, কারণ আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এক অজেয় সাথি। আপনি কখনো শূন্য বোধ করবেন না, কারণ আপনার পরিতৃপ্তির উৎসের নেই কোনো লয় ও ক্ষয়।
১৭ বছর বয়সে দেখা ওই স্বপ্নের দিকে ফিরে তাকালে, আমার বড়ই অবাক লাগে। অবাক লাগে এই ভেবে, হয়তো ওই ছোট্ট বালিকাটি আমিই ছিলাম। অবাক লাগে, কারণ আমি যে জবাবখানা তাকে দিয়েছি, সেটা ছিল এক শিক্ষনীয় উপদেশ এবং এই শিক্ষা পেতে আমাকে পরবর্তীর্তে বহু যন্ত্রণাকাতর বছর কাটাতে হয়েছে। মানুষ কেন আরেকজনকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়, তার করা এই প্রশ্নের উত্তর: [মানুষ আরেকজনকে ছেড়ে যেতে বাধ্য], “যেহেতু এই দুনিয়ার জীবন পরিপূর্ণ নয়। আর দুনিয়ার জীবন যদি পরিপূর্ণ হয়েই থাকে, তবে আখিরাতের জীবনকে কি বলে সম্বোধন করতে হবে?"
টিকাঃ
* তাগুত: আল্লাহ ছাড়া যেসব সত্তার আনুগত্য করা হয় অথবা যে সত্তা শুধু নিজেই কুফরি করে না, অপরকে কুফরি করতে বাধ্য করতে চায় - (সম্পাদক)।
* সব যুগেই এগুলোর পূজা করা হতো। মানুষের ভাগ্য নিয়ন্তা হিসেবে এদের বিবেচনা করা হয়। আজকের তথাকথিত বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষেরাও রাশিচক্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, Horoscope ইত্যাদি নামে এগুলোকে কেন্দ্র করে শিরক করে চলেছে -(সম্পাদক)।
* রোলার কোস্টার: এক ধরনের বিনোদনমূলক রাইড (Ride) যা বিশ্বের অধিকাংশ Amusement Park গুলোতে দেখা যায়। এর ট্রেনটি অনেক উচ্চতা থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিচে নেমে আসে, আবার খাড়া পথ বেয়ে উপরে উঠে। লেখিকা এখানে মানুষের সাথে সম্পর্কের চড়াই-উতরাইকে 'রোলার কোস্টারে'-এর সাথে তুলনা করেছেন - (সম্পাদক)।