📄 এক. যেভাবে সূচনা হলো বিদায় হাজ্জের
১০ম হিজরির জিলকদ মাস। আল্লাহর রাসূল ঘোষণা করলেন যে, এই বছর তিনি হজ্জব্রত পালনের সংকল্প করেছেন। জিলকদ মাসের এখনো পাঁচদিন বাকি আছে। দিনটি শনিবার। যোহরের চার রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর রাসূল সবাইকে নিয়ে রওনা করেন। নবিজির সাথে তালবিয়া পাঠে সাহাবিরা কেউ কম করছেন কেউ বেশি করছেন। নবিজি মেনে নিয়ে সেভাবেই পড়তে বলছেন, কাউকে মন্দ বলছেন না। জিলহাজ্জ মাসের চারদিন গত হয়েছে। আজ রবিবার রাত। শুভ্র কাফেলা নিয়ে নবিজি এখানে রাত্রি যাপন করেন। ভোরের স্নিগ্ধ আবেশে আদায় করেন ফজরের সালাত।
নবিজি কা'বার চত্বরে এসে তাওয়াফ শুরু করেন। সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাঈ শেষ হলে তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে নির্দেশ দিলেন যাদের সাথে হাদি নেই তারা যেন উমরা করে হালাল হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার দ্বিপ্রহরের আগে তিনি সঙ্গীদের নিয়ে মিনার প্রান্তরে চলে আসেন। নবিজি সোজা আরাফায় চলে আসেন। সূর্য হেলে পড়ার পর তিনি উপত্যকার সমতল ভূমিতে এসে তিনি লোকদের উদ্দেশ্য ভাষণ দেন। তিনি বললেন—'তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ তেমন হারাম, যেমন আজকের দিনে, এই মাসে তোমাদের এই নগরীতে হারাম। মনে রেখো, জাহিলি যুগের সমস্ত কিছু এখন আমার পদতলে সমাধিত। তোমাদের মাঝে একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, এটাকে আঁকড়ে ধরলে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব।'
এই প্রেক্ষাপটেই কুরআনের আয়াত নাযিল হয়—'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম...'। সূর্যাস্তের পর আল্লাহর রাসূল আরাফা থেকে নেমে আসেন। মুযদালিফায় এসে মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করেন। কুরবানির দিন জামরাতুল আকাবায় এসে কংকর নিক্ষেপ করেন। মিনার প্রান্তরে আবার সারগর্ভ একটি ভাষণ দেন। তিনি নিজ হাতে ৬৩টি উট কুরবানি করেন। নবিজি মাক্কায় ফিরে বিদায়ী তাওয়াফ করেন। বিদায় হাজ্জ থেকে ফেরার পথে গাদীরে খুম্মা নামক স্থানে আল্লাহর রাসূল আরেকবার খুতবা দেন। তিনি বললেন—'আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব এবং দ্বিতীয়টি হলো আমার পরিবার।'
বিদায় হাজ্জের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ এক পূর্ণতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল ﷺ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল পাপ ও জাহেলি সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভ্রাতৃত্ব, সাম্য এবং আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। নবিজি হাতে-কলমে ও বারংবার আলোচনার মাধ্যমে সাহাবিদেরকে ইসলামের বিধানসমূহ শিক্ষা দিয়েছেন।
টিকাঃ
[১০৩৪] সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৬৬৪
[১০৩৫] বুখারি, ১৫৪৯
[১০৩৬] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৮৬
[১০৩৭] মুসলিম, ১২২৭
[১০৩৮] প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১২১৮
[১০৩৯] প্রাগুক্ত; সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৬৫৯
[১০৪০] সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৬৬১; মুসলিম, ১২১৮
[১০৪১] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৮৯
[১০৪২] সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৬৬২
[১০৪৩] সাহীহুস সীরাহ, পৃ. ৬৬২
[১০৪৪] সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৮৯
[১০৪৫] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০
[১০৪৬] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ২/৫৫০
[১০৪৭] হাজ্জের ফরজ বিধান
[১০৪৮] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৯০
[১০৪৯] মুসলিম, ১২১৮
[১০৫০] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৯০
[১০৫১] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/৫৭৯
[১০৫২] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৯০
[১০৫৩] মুসলিম, ২০৪৮
[১০৫৪] আন-নাসাই ফি খাসাইসি আলি, পৃ. ২১
[১০৫৫] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ২/৫৫০
[১০৫৬] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫/২০৯
[১০৫৭] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ২/৫৫১
[১০৫৮] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/৫৮১
[১০৫৯] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ৩৯১
[১০৬০] আল-আসাসু ফিস-সুন্নাহ, ২/১০৫৪
[১০৬১] ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ৩৩১
[১০৬২] কিরাআতু সিয়াসিয়্যাহ, পৃ. ৩০৩
[১০৬৩] প্রাগুক্ত
[১০৬৪] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৪
[১০৬৫] দাওলাতুর রাসূলি মিনাত তাকউইনি ইলাত তামকীন, পৃ. ৫৭৫
[১০৬৬] ফিকহুস সীরাহ, আল-বুতি, পৃ. ৩৩২
[১০৬৭] দাওলাতুর রাসূলি মিনাত তাকউইনি ইলাত তামকীন, পৃ. ৫৭৬
[১০৬৮] ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ৩৩৩
[১০৬৯] আল-মাউসূআহ ফি সামাহাতিল ইসলাম, উرজুন, ২/৮-৭৬
[১০৭০] ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ৩৩৩
[১০৭১] আল-জানিবুস সিয়াসি ফি হায়াতির রাসূলি, পৃ. ১৩১
[১০৭২] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ২/৫৪৯; মুসলিম ২/৯৪২
[১০৭৩] আল-মুসতাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/৫১৮
[১০৭৪] প্রাগুক্ত, ২/৫১৭, ৫১৮
[১০৭৫] প্রাগুক্ত, ২/৫১৮
[১০৭৬] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ২/৫৪৯
[১০৭৭] বুখারি, ১৯৮৯
[১০৭৮] বুখারি, ১২৬৫
[১০৭৯] বুখারি, ১৫১৩
[১০৮০] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ ফি যাউইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৬৮১
[১০৮১] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/৫৭৯
📄 নবিজির মৃত্যুব্যাধি, অতঃপর মহামহিম বন্ধুর সান্নিধ্যে
এক. নবিজির ওফাতের ইঙ্গিতবাহী সমূহ আয়াত ও হাদীস
১. আয়াতসমূহ
'আর মুহাম্মদ একজন রাসূল বই তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?' (সূরা আলে ইমরান: ১৪৪)। ইবনু কাসীর বলেন, এই আয়াতটি আবু বাকর সিদ্দীক আল্লাহর রাসূলের মৃত্যুর পর উপস্থাপন করেছিলেন।
২. মৃত্যুর ইঙ্গিতবাহী হাদীসগুলো
আয়িশা বলেন, একবার আল্লাহর রাসূল ﷺ ফাতিমাকে কানে কানে বললেন—'জিবরাঈল প্রতি বছর আমাকে কুরআন একবার শোনায়, এ বছর ইতোমধ্যে দুইবার শুনিয়েছে। তার মানে হলো আমার অন্তিম মুহূর্ত খুব কাছে।' জাবির বলেন, বিদায় হাজ্জে নবিজি বলেছিলেন, 'হয়তো এই হাজ্জের পর আর কোনো হাজ্জ করতে পারব না।' আবু সাঈদ খুদরি বলেন, আল্লাহর রাসূল সমবেত লোকদের সামনে বয়ান করতে গিয়ে বলেন, 'এক বান্দাকে আল্লাহ তাঁর জন্য নির্বাচন করেছেন।' শুনে আবু বাকর কান্নায় ভেঙে পড়েন, কারণ তিনি ইঙ্গিতটি বুঝতে পেরেছিলেন।
টিকাঃ
[১০৮৪] তাফসীরে কুরতুবি, ৪/২২২
[১০৮৫] তাফসীর ইবন কাসীর, ৪/৫৩
[১০৮৬] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫/৯৫।
[১০৮৭] বুখারি, ৪৪০৩
[১০৮৮] মুজমাউয যাওয়াইদ ৯/২৬
[১০৮৯] বুখারি, ৬২৮৫, ৬২৮৬
[১০৯০] মারযুন নাবি ওয়া ওয়াফাতুহু, পৃ. ৩৫
[১০৯১] মুসলিম, ১২৯৭
[১০৯২] শারহুন নাওয়াউই আলা সাহীহি মুসলিম, ৯/৪৫
[১০৯৩] লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ১০৫
[১০৯৪] বুখারি, ৩৬৫৪
[১০৯৫] ফাতহুল বারি, ७/১৬
[১০৯৬] আল-বাযযার, ১/৩৯৭; হাদীস নং ৮৪৪
[১০৯৭] মারযুন নাবি ওয়া ওয়াফাতুহু, পৃ. ৩৭
[১০৯৮] মুজমাউয যাওয়াইদ ৯/২২; আল-বানি, হাদীস নং ২৪৯৭
[১০৯৯] মারযুন নাবি ওয়া ওয়াফাতুহু, পৃ. ৩৮
📄 দুই. আল্লাহর রাসূলের মরণব্যাধি
দশম হিজরি সনে উসামার বাহিনী গঠনের প্রাক্কালে আল্লাহর রাসূল মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অসুস্থতার সূচনা হওয়ার আগে তিনি জান্নাতুল বাকির অধিবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন। তিনি উহুদ শহিদদের কবর যিয়ারত করেন এবং মিম্বারে ওঠে সাহাবিদের সতর্ক করেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি আয়িশার ঘরে কাটানোর জন্য স্ত্রীদের থেকে অনুমতি নেন। আব্বাস ও আরেকজন ব্যক্তির কাঁধে ভর করে তিনি আয়িশার ঘরে আসেন। যন্ত্রণার তীব্রতায় তিনি সাত বালতি পানি দিয়ে গোসল করেন।
টিকাঃ
[১১০০] আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ২/৫৫২
[১১০১] বুখারি, ৪/২১৩
[১১০২] মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/৫৫, ৫৬
[১১০৩] বুখারি, ১৩৪৪
[১১০৪] বুখারি, ১৯৮
[১১০৫] সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৬৯৫
[১১০৬] বুখারি, ৫৬৪৭
📄 তিন. শেষ দিনগুলোতে আল্লাহর রাসূলের বিদায়ী উপদেশ
১. আনসার সাহাবিদের ক্ষেত্রে অসিয়ত
আল্লাহর রাসূল মিম্বারে আরোহণ করে বললেন—'আমি তোমাদেরকে আনসারদের ব্যাপারে অসিয়ত করছি, তারা আমার অতি ঘনিষ্ট ও আপনজন। তাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে।'
২. প্রতিনিধিদের সাদরে গ্রহণের উপদেশ
নবিজি নির্দেশ দেন যেন প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় গ্রহণ করা হয় এবং মুশরিকদের আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দেওয়া হয়।
৩. তাঁর সমাধিকে সিজদার স্থান বানানো নিষেধ
নবিজি কড়াভাবে নিষেধ করেছেন যেন তাঁর কবরের স্থানকে কেউ মাসজিদ বানিয়ে না নেয়।
৪. আল্লাহর প্রতি সুধারণা
মৃত্যুর আগে আল্লাহর রাসূল ﷺ তিন বার বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে সুধারণা রাখবে।'
৫. সালাত ও কৃতদাসদের ব্যাপারে অসিয়ত
আনাস ইবনু মালিক বলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আল্লাহর রাসূল বলছিলেন, 'সালাত এবং কৃতদাসদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে।'
টিকাঃ
[১১০৭] বুখারি, ৩৭৯৯
[১১০৮] মারযুন নাবি ওয়া ওয়াফাতুহু, পৃ. ৬৫
[১১০৯] ড. সাল্লাবি রচিত আলি ইবনু আবি তালিব জীবনীতে বিস্তারিত আলাপ রয়েছে
[১১১০] বুখারি, ৩০৩৫
[১১১১] সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৭১২; বুখারি, ৪৩৫
[১১১২] মুসলিম, ১৬৩৭
[১১১৩] ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেছেন
[১১১৪] মুসলিম, ১/৩৪8, হাদীস নং ২০৭