📄 দুই. বিজয়ী বেশে, বিনম্রচিত্তে মক্কা প্রবেশ
অবশেষে আল্লাহর রাসূল ﷺ বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। মাথায় শোভা পাচ্ছিল কালো পাগড়ি। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার স্নিগ্ধ আবেশে নম্রতায় তিনি ছিলেন নতমুখী। আল্লাহ তাঁকে বিজয়ী করে সম্মানিত করেছেন, তাঁর হৃদয়ে এই অনুভূতি ছুঁয়ে যাওয়ার পর বিনয়ের আবহে চেহারা নিম্নমুখী করেন, তিনি এতটাই নতমুখী ছিলেন যে, তাঁর থুতনি প্রায় বাহন স্পর্শ করছিল। বিজয়ের নিয়ামাত, ক্ষমা ও সাহায্যের অনুভূতি অন্তরে জাগরূক রেখে মুখে তিলাওয়াত করছিলেন সূরা ফাতহ।
আরব উপদ্বীপের এই প্রাণকেন্দ্রে বিজয়ী বেশে প্রবেশের সময় ন্যায়পরায়ণতা, সমতা ও উদারতার সুমহান দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেন। জড়িয়ে নিয়েছিলেন বিনয় ও নম্রতার কোমল চাদর। এদিন তিনি নিজের পেছনে বসিয়েছিলেন আজাদকৃত গোলামের ছেলে উসামা ইবনু যাইদকে। বনু হাশিমের কোনো সন্তান কিংবা কুরাইশের সম্ভ্রান্ত কাউকে পেছনে বসাননি। দিনটি ছিল ৮ম হিজরির বিশ রমযান জুমুআবার।
মাক্কায় প্রবেশের সময় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতেও তিনি সজাগ দৃষ্টি রেখেছিলেন। তিনি যখন শুনতে পেলেন, সাআদ ইবনু উবাদা আবু সুফিয়ানকে লক্ষ করে বলেছিলেন, 'আজ রক্ত ঝারানোর দিন, আজ কা'বার বিধিনিষেধকে হালাল করে নেব।' এ প্রেক্ষিতে নবিজি বললেন, 'আজকের দিনে আল্লাহ কা'বাকে মহিমান্বিত করবেন, আজই কা'বায় জড়ানো হবে পোশাক।' এরপর তিনি সাআদ ইবনু উবাদার কাছ থেকে পতাকা নিয়ে তা তুলে দেন ছেলে কাইস ইবনু সা'দের হাতে। এই কাজের ক্ষেত্রেও আল্লাহর রাসূল বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।
মাক্কা প্রবেশের পর সাহাবায়ে কেরাম এখন অনেকটা স্থির, প্রশান্ত ও নিশ্চিন্ত। নবিজি আর অপেক্ষা করলেন না। কা'বার চত্বরে এসে তাওয়াফ করেন। তখন বাইতুল্লাহর চারপাশে ও ভেতরে বিদ্যমান ছিল ৩৬০টি মূর্তি। নবিজি হাতের লাঠি দিয়ে প্রতিটি মূর্তিতে আঘাত করার সময় বলছিলেন—
'সত্য সমাগত আর বাতিল পরাভূত, বাতিল তো ধ্বংস হওয়ারই ছিল।' (সূরা বানি ইসরাঈল: ৮১)
'বলুন—সত্য এসে গেছে, আর মিথ্যা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, পারবে না প্রত্যাবর্তন করতে।' (সূরা সাবা: ৪৯)
লাঠির সামান্য স্পর্শেই মূর্তিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছিল। নবিজির প্রতি আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তার উজ্জ্বল দৃশ্য এখানে প্রকাশিত হয়। তিনি কা'বার চারপাশের এই মিথ্যা ইলাহারূপী মূর্তিগুলোকে লাঠি দিয়ে সামান্য আঘাত করতেই সেগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছিল।
নবিজি দেখলেন কা'বার ভেতরে বহুসংখ্যক মূর্তি। এগুলোর বিদ্যমানতায় তিনি ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছিলেননা। তাই প্রথমে এগুলোকে ভাঙার নির্দেশ দেন। এখানে আরও একটি মূর্তি ছিল, ধারণা করা হয়, সেখানে ছিল ইবরাহীম ও ইসমাঈল-এর মূর্তি, তাদের দুজনের হাতে ছিল ভাগ্য নির্ণয়ের তির। এগুলো দেখে নবিজি বললেন, 'ওরা কত নির্বোধ, ওরা ভালো করেই জানত, তারা (ইবরাহীম-ইসমাঈল) এর মাধ্যমে কোনো কিছু নির্ণয় করেননি।' তাদের ব্যাপারে এমন ধারণা করাও জঘন্য অন্যায়।
mূর্তির অপবিত্রতা থেকে বাইতুল্লাহর অভ্যন্তর পবিত্র করার পর নবিজি ভেতরে ঢোকেন। প্রতিটি কোনায় তাকবীর বলে সালাত আদায় করেন। আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বর্ণনা করেন, 'এদিন আল্লাহর রাসূলের সাথে কা'বার ভেতর প্রবেশ করেন উসামা, বিলাল ও উসমান বিন তালহা। তারপর দরজা বন্ধ করে দেন। ইবনু 'উমার বলেন, 'বের হওয়ার পর বিলালকে বললাম, আল্লাহর রাসূল ভেতরে কী করেছেন? বিলাল বলল, 'নবিজি বামপাশে দুটি খুঁটি রেখেছেন, ডানপাশে একটি। এরপর পেছনে তিনটি খুঁটি রেখে নামাজ পড়েছেন। সে সময় কা'বার ভেতরে ছয়টি খুঁটি ছিল।
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কা'বার চাবি ছিল উসমান ইবনু তালহার হাতে। 'আলি চাবিটি তার কাছে রাখতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু নবিজি কা'বা থেকে বের হয়ে চাবি আবার উসমানের কাছেই ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন, 'আজকের দিনটি ক্ষমা ও কল্যাণের।
নবিজি মাদীনায় হিজরাতের পূর্বের কাহিনি: তিনি একদিন উসমানের কাছে কা'বার চাবি চেয়েছিলেন। উসমান কঠিন কথা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। নবিজি তার রূঢ় আচরণ সহ্য করে বলেছিলেন, 'উসমান, সেদিন খুব কাছে, তুমি দেখবে এই চাবি আমার হাতে। আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দেবো।' উসমান বলল, 'সেদিন কুরাইশ লাঞ্ছিত ও ধ্বংস হবে।' নবিজি বললেন, 'না, সেদিন তুমি বরং সম্মানিত হবে।'
উসমানকে বলা কথা মাক্কা বিজয়ের পর বাস্তবে পরিণত হয়। উসমান মনে করল, আজ বুঝি অতীত কথার পরিণতি ঘটতে চলল; কিন্তু আল্লাহর রাসূল সেই উসমানকেই কা'বার চাবিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, 'উসমান—এই নাও তোমার চাবি। আজকের দিনটি ক্ষমা ও কল্যাণের। বংশ পরম্পরায় চিরদিন তোমরা এই চাবি সংরক্ষণ করবে, জালিম ব্যতীত কেউ তোমাদের থেকে চাবি নেবে না।' নবিজি কা'বার চাবি চিরদিনের জন্য রাখতে চাননি, আবার বনু হাশিমের কারও কাছেও তিনি রাখা পছন্দ করেননি। তাই পুনরায় তার কাছেই ফিরিয়ে দেন।
সালাতের সময় ঘনিয়ে আসে। বিলালকে কা'বার ওপর ওঠে আযানের নির্দেশ দেন নবিজি। বিলাল ওপরে ওঠে ইথার প্রকম্পিত করে সুর তোলেন আযানের। নতুনের জয়গানে মাক্কার লোকদের মাঝে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। আল্লাহর বড়ত্বের এই ঘোষণা শয়তানদের অন্তরে অগ্নি আতঙ্ক সঞ্চারিত করে, সহ্য করতে না পেরে তারা পলায়ন করে ঊর্ধ্বশ্বাসে। বিলালের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।' এই কণ্ঠই একদিন পৈশাচিক শাস্তির নিচে দেহের শেষ শক্তিটুকু ব্যয় করে বলছিল—'আহাদ, আহাদ, আহাদ।' আজ সেই তিনি স্বাধীনতার মুক্ত আবহে আল্লাহর কা'বার ওপরে ওঠে মনের মাধুরী মিশিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে বলছেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।'
টিকাঃ
[৫৮৮] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৫২৪
[৫৮৯] দেখুন, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/৩০৯
[৫৯০] আহমাদ, ১/৩৬৩; মুসলিম, ১৩৫৮
[৫৯১] বাইহাকি ফিদ দালায়িল, ৫/৬৮; হাকিম, ৩/৪৭
[৫৯২] দেখুন, সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ৩৯৬। বুখারি, ৪২৮১
[৫৯৩] দেখুন, নদভী রচিত, সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৩৭
[৫৯৪] দেখুন, কিয়াদাতুর রাসূল, আস সিয়াসিয়্যাহ আল আসকারিয়্যাহ, পৃ. ১৯৬
[৫৯৫] দেখুন, বৃতি রচিত ফিকহুস সীরাহ পৃ. ২৮২
[৫৯৬] দেখুন, নদভী রচিত, সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৩৯
[৫৯৭] আহমাদ, ১/৩৬৫; বুখারি, ৪২৮৮
[৫৯৮] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৪/৬১, ৬২
[৫৯৯] প্রাগুক্ত
[৬০০] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৪/৬২
[৬০১] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৮৩৮
[৬০২] দেখুন, সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ৪০১
[৬০৩] দেখুন গাযালি রচিত ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৩৮৩
📄 তিন. সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা
১. কোনো সন্দেহ নেই এই মাক্কার লোকেরাই আল্লাহর রাসূল ও তাঁর দাওয়াতের পথে বাধার কাঁটা বিছিয়েছিল। এসবের বিপরীতে আজ তারা নবিজির কাছ থেকে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা পায়। কা'বার চত্বরে সমবেত বহু মুশরিক, মাক্কার অধিবাসী। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশের অপেক্ষায় কাটছে প্রতিটি প্রহর।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'কী মনে হয়, আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব?' সবাই বলল, 'একজন মহানুভব উত্তম চরিত্রের মানুষ থেকে আমরা শুধু কল্যাণেরই আশা করতে পারি।' নবিজি বললেন, 'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।'
এই সাধারণ ক্ষমার মধ্য দিয়ে প্রাণ বন্দিত্ব ও মৃত্যু থেকে সুরক্ষা পেয়েছে, স্থানান্তরযোগ্য সম্পদ ও ভূমি মালিকের হাতেই থেকেছে, কারও ওপর ভূমিত্যাগ অনিবার্য হয়নি। এই কা'বার সীমানা ইবাদাতের স্থান, আল্লাহ নির্ধারিত এমন পবিত্র সীমানা, যেখানে যৌক্তিক হত্যাকাণ্ড-ও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
২. কিছু অপরাধীকে হত্যার নির্দেশ
সাধারণ ক্ষমার পাশাপাশি দৃঢ় সংকল্পেরও একটি বিষয় এখানে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আল্লাহর রাসূল ﷺ সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা থেকে দশের অধিক ব্যক্তিকে আলাদা করেছেন, এদের ব্যাপারে দিয়েছেন হত্যার নির্দেশ, যদিও এরা কা'বার গিলাফ ধরে থাকে। কারণ, আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও ইসলামের ব্যাপারে এদের অপরাধ এতটাই জঘন্য ছিল যে, আশঙ্কা ছিল বিজয়ের পরেও এরা লোকদের মাঝে ফিতনার বিস্তৃতি ঘটাবে। হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানি বলেন—আবদুল উযযা বিন খাতাল, আবদুল্লাহ বিন সাআদ বিন আবি সার্হ, ইকরিমা ইবনু আবি জাহিল, হুওয়াইরিস ইবনু নুকাইদ, মাকীস ইবনু হাব্বাবাহ, হাব্বার ইবনুল আসওয়াদ, ইবনুল খাতালের দুই দাসী, ফুরনাতা ও কুরাইবা, বনু আবদুল মুত্তালিবের আজাদকৃত দাসী সারা। কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে, বাকি অনেকে আত্মসমর্পণ করে ফিরে এসেছে। নবিজি সমর্পিতদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।
৩. নবিজির খুতবা, মাক্কার লোকদের ব্যাপক ইসলামগ্রহণ
পরদিন সকালে নবিজি জানতে পারলেন, জাহিলি যুগের শত্রুতার সূত্র ধরে মুসলিমদের মিত্র গোত্র বনু খুযাআহ হুজাইলের এক লোককে হত্যা করেছে। আল্লাহর রাসূল ﷺ ভীষণ রাগ করলেন। লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে পরিতাপ নিয়ে বললেন, 'ওহে মানবমণ্ডলী, আল্লাহ তাআলা আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে এই মাক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। কিয়ামাত পর্যন্ত আল্লাহর নির্ধারিত এই সম্মানিত স্থানে যুদ্ধবিগ্রহ হারাম। আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কারও জন্য এখানে রক্তপাত ঘটানো কিংবা বৃক্ষনিধন বৈধ নয়। আমার পূর্বে যেমন হালাল ছিল না, আমার পরেও কখনো কারও জন্য হালাল হবে না। আমার জন্য সাময়িক হালাল করা হয়েছিল এর অধিবাসীদের শায়েস্তা করার জন্য। কালকের মতো মাক্কার হুরমাত আবারও ফিরে এসেছে। তোমাদের উপস্থিতরা অনুপস্থিতদের কাছে আমার এই কথা পৌঁছে দেবে। তোমাদেরকে যে বলবে, 'আল্লাহর রাসূলও তো এখানে হত্যা করেছেন', তাদেরকে বলবে, আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্য বিশেষ কারণে হালাল করেছিলেন, তোমাদের জন্য এর কোনো সুযোগ নেই।
ওহে খুযাআহ সম্প্রদায়, হত্যাকাণ্ড থেকে তোমরা বিরত হও। অনেক রক্ত ঝরেছে। তোমরা যাকে হত্যা করেছ, এবারের রক্তপণ আমি দেবো। পরে কেউ হত্যা করলে নিহতের পরিবারই এর যথার্থ পদক্ষেপ নেবে, তারা চাইলে হত্যা করবে, চাইলে রক্তপণ নিয়ে দাবি ছাড়তে পারে।’
আল্লাহর রাসূল-এর অপার উদারতা, ব্যাপক ক্ষমার ঘোষণা, সাজাপ্রাপ্তদের অনেককেই ক্ষমা করে দেওয়া মাক্কার লোকদেরকে বিপুলভাবে নাড়া দিয়েছে। চির সুন্দরের দিকে পরিবর্তনের সুমধুর সুর তুলেছে হৃদয় বীণায়। নারী-পুরুষ, স্বাধীন-মাওলা—জোয়ারের মতো নবিজির কাছে আসছে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে। এদিন নারী পুরুষ, ছোট বড়, সবাইকে তিনি বাইআত প্রদান করেন। শুরু করেন পুরুষদের দিয়ে। সাফা পাহাড়ে বসে ইসলাম ও আল্লাহর জন্য সাধ্য অনুযায়ী শোনা ও মান্য করার শর্তে বাইআত প্রদান করেন।
বিজয়ের দিন মুজাশি ইবনু মাসঊদ তার ভাই মুজালিদকে নিয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে এলেন। ভাইয়ের ব্যাপারে তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার ভাইকে নিয়ে এসেছি হিজরাতের শর্তে বাইআত করাতে।' নবিজি বললেন, 'কিন্তু এখান থেকে হিজরাতের অনিবার্যতা রহিত হয়েছে!'
'তা হলে কীসের ওপর ওকে বাইআত প্রদান করবেন?'
'এখন তাকে বাইআত দিতে পারি ঈমান ও জিহাদের ভিত্তিতে।'
হিজরাত রহিত হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মাক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে এখান থেকে হিজরাতের ওয়াজিব বিধান রহিত হয়েছে। কারণ, এখানে ইসলাম ক্ষমতাশীল হয়েছে। তবে কুফুরির রাষ্ট্র থেকে ইসলামের ভূমির দিকে হিজরাতের অনুমতি কিয়ামাত পর্যন্ত থাকবে। তবে জিহাদ ও আল্লাহর রাস্তায় খরচের বিধান কিয়ামাত পর্যন্ত থাকবে, আবার সেই জিহাদ এ খরচও মাক্কা বিজয়ের পূর্বেকার মতো হবে না। মর্যাদাগত তফাত থাকবে।
পুরুষদের বাইআতের পালা শেষে নবিজি নারীদের বাইআত গ্রহণ করেন। নারীদের মধ্যে হিন্দ বিনতে উতবাও ছিলেন। নবিজি যখন বললেন, 'তোমরা চুরি করবে না।' হিন্দ বিনতে উতবা বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আবু সুফিয়ান কৃপণ প্রকৃতির মানুষ। সে আমার ও বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট খোরাক দেয় না। এ অবস্থায় তাকে না জানিয়ে কিছু নিতে পারব না কি?' নবিজি বললেন, 'হুম, তোমার ও বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট হওয়া পরিমাণ ন্যায়ভাবে নিতে পারবে।'
নারীরা আল্লাহর রাসূলের কাছে বাইআত গ্রহণ করেছেন, কেউ মুসাফাহা করেননি। আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর জন্য হালাল অথবা তাঁর মাহরাম ছাড়া অন্য কোনো নারীর সাথে মুসাফাহা করতেন না এবং তাকে স্পর্শও করতেন না। আয়িশা সিদ্দীকা বলেন, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের হাত কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি।'
টিকাঃ
[৬০৪] দেখুন, বৃতি রচিত ফিকহুস সীরাহ পৃ. ২৬৯
[৬০৫] বাইহাকি ফিল কুবরা, ৯/১১৮; ইবনু সাআদ, ২/১৪১-১৪২
[৬০৬] দেখুন, আল মুজতামাউল মুদনা, পৃ. ১৮০
[৬০৭] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪৫১
[৬০৮] ফাতহুল বারি, হাদিস নং ৪২৮০
[৬০৯] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪৫১
[৬১০] প্রাগুক্ত
[৬১১] প্রাগুক্ত
[৬১২] আহমাদ, ৩/৪৬৯; বুখারি, ৪৩০৫
[৬১৩] বুখারি, ১৮৩৪; মুসলিম, ১৩৫৩
[৬১৪] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪৫৭
📄 চার. বনু জুযাইমায় খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রা.
হিজরি ৮ম বছরের শাওয়াল মাসে নবিজি বনু জুযাইমাকে ইসলামের দিকে ডাকতে খালিদ ইবনু ওয়ালিদকে প্রেরণ করেন। এটি হুনাইন যুদ্ধের কিছুটা আগের কথা। তার বাহিনীতে ছিল বনু সালীম, মুদলিজ, মুহাজির ও আনসার সাহাবিরা মিলে প্রায় ৩৫০ জন মুজাহিদ। খালিদের নেতৃত্বে সাহাবিদের বাহিনী দেখে বনু জুযাইমা অস্ত্র ধরে যুদ্ধের জন্য। খালিদ বললেন, 'অস্ত্র নামাও। দেখো—অন্যান্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে।'
ওদের জাহদার নামের একলোক বলল, 'বনু জুযাইমা, দেখো, ইনি খালিদ। আল্লাহর কসম, আমরা অস্ত্র রেখে দিলে বন্দিত্ব নেমে আসবে, আর বন্দি হলে অনিবার্যভাবে গর্দান উড়বে। আল্লাহর কসম, আমি অস্ত্র ছাড়ব না।'
কিন্তু শেষে জাহদারও অস্ত্রসমর্পণ করে। খালিদ সবাইকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ইসলাম মানতে বলেন। 'আমরা ইসলাম মানলাম,' একথা ওরা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি। বরং ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা ওরা আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশ করে বলল, 'আমারা ধর্মান্তরিত হয়েছি!' খালিদ ওদেরকে বন্দি করে হত্যা করতে চাইলেন; কিন্তু কিছু সাহাবি এ কাজে তাকে বাধা দেন। ফলে খালিদ বন্দিদেরকে সাথের সাহাবিদের হাতে অর্পণ করেন। একদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও ওদের মাঝে কোনো পরিবর্তন না দেখে খালিদ প্রত্যেক সাথিকে নির্দেশ দেন অধীন বন্দিদের হত্যা করতে। কিছু সাথি তার নির্দেশ পালনে হত্যা করলেও আবদুল্লাহ ইবনু 'উমারের সাথে অনেকেই বন্দিদের হত্যা করা থেকে বিরত থাকেন।
অভিযান শেষে বাহিনী ফিরে আসে। বিস্তারিত শুনে নবিজি ভীষণ রাগ করেন। আসমানের দিকে দুহাত তুলে বলেন, 'হে আল্লাহ, খালিদের কাজের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।'
এ বিষয়ে খালিদ ও আবদুর রহমান ইবনু আউফ-এর মাঝে আলোচনা হয়, এক সময় তা নিন্দনীয় বিতর্কে রূপ নেয়। জাহিলি যুগে বনু জুযাইমা খালিদের এক চাচা ফাকিহ ইবনু মুগীরাকে হত্যা করেছিল, ইবনু আউফ-এর সন্দেহ হচ্ছিল, হয়তো এ কারণে খালিদ থেকে এ কাজ প্রকাশ পেয়েছে।
বনু জুযাইমার ক্ষেত্রে খালিদের কাজের সাথে নবিজির সম্পর্কহীনতার কথা স্পষ্ট করছে, খালিদ-এর কাজটা সংগত হয়নি। তাই অল্প সময়ের মধ্যে 'আলি-কে তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন সহমর্মিতা প্রকাশ ও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। সবিশেষ একথাও বোঝানোর জন্য যে, হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনার সাথে আল্লাহর রাসূলের কোনো সম্পর্ক নেই। এভাবেই নবিজি বনু জুযাইমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, তাদের অন্তর থেকে দুশ্চিন্তা ও বেদনার কালো মেঘ সরিয়ে দিয়েছেন। আর বনু জুযাইমায় খালিদের হত্যার সিদ্ধান্ত—এটা তার ইজতিহাদি ভুল। হ্যাঁ, তার এই ভুলটা ইজতিহাদিই ছিল, কেননা এই কাজের বিপরীতে আল্লাহর রাসূল তাকে কোনো শাস্তি দেননি।
টিকাঃ
[৬১৫] বুখারি, ৫২৮৮; মুসলিম, ১৮৬৬
[৬১৬] দেখুন, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/৩১৯
[৬১৭] দেখুন, আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৪৮
[৬১৮] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪৬৪
[৬১৯] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫৭৯
[৬২০] প্রাগুক্ত
[৬২১] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪৬৫
[৬২২] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫৭৯
📄 পাঁচ. প্রতিমালয় ধ্বংসে অভিযান
বাইতুল্লাহ শরিফ মূর্তির পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হওয়ার পর অন্যান্য প্রতিমা ঘরগুলোও ধ্বংস করে দেওয়া আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো বহুকাল ধরে জাহিলিয়্যাতের নিদর্শন বহন করছিল। আরব উপদ্বীপকে এসব থেকে পবিত্র করতে আল্লাহর রাসূল ﷺ বেশ কয়েকটি অভিযান প্রেরণ করেন।
১. উযযা প্রতিমা ধ্বংসে খালিদ ইবনু ওয়ালিদের অভিযান
কুরাইশ-সহ গোটা আরবের কাছে অবস্থান ও মর্যাদার দিকে থেকে সবচেয়ে বড় দেবীমূর্তি ছিল উযযা। এর অস্তিত্ব একদম মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে খালিদ ইবনু ওয়ালিদ ত্রিশজন অশ্বারোহী নিয়ে রওনা করেন। নাখলা নামক এলাকায় পৌঁছে উযযার মন্দিরের দিকে অগ্রসর হন খালিদ। মূর্তি জাতীয় সামনের সবকিছু বিনাশ করে উযযার ঘরটি ধ্বংস করেন। এ সময় তিনি বলছিলেন, 'তোকে অবিশ্বাস করছি, তোর মাঝে কোনো পবিত্রতা নেই, আর আজ তো দেখলাম, আল্লাহ তোকে কীভাবে লাঞ্ছিত করেছেন।'
লক্ষ্য বাস্তবায়নের পর খালিদ সাথিদের নিয়ে ফিরে আসেন। সফলতার কথা উপস্থাপন করেন নবিজির সামনে; কিন্তু আল্লাহর রাসূল অভিযানের সেনাপতিকে ডেকে বলেন, 'তুমি কি সেখানে কিছু দেখতে পেয়েছ?' খালিদ বললেন, না। নবিজি বললেন, 'যাও, তুমি কিছুই করতে পারনি।
খালিদ আবার ফিরে চললেন। তিনি নাখলায় পৌঁছার পর পুরোহিতরা তাকে দেখে বুঝতে পারল, এবার তিনি রফাদফা না করে ফিরছেন না। খালিদ ভেতরে ঢুকে দেখলেন এক নগ্ন নারী চুল ছড়িয়ে আছে, তার মাথায় মাটি ছিটিয়ে দেওয়া। খালিদ এই বিবসনা নারীর দিকে এগিয়ে গেলেন চেনা সাহসিকতা ও শৌর্যে। তরবারির একটা কোপ বসিয়ে মস্তক দ্বিখণ্ডিত করেন। এবার প্রশস্তি আসে তার মনে। আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে সংবাদ বলেন। নবিজি বললেন, 'হুম, এটাই সেই উযযা।'
২. মানাতের দিকে সাআদ ইবনু যাইদ আশহালির অভিযান
মানাত একটি মূর্তির নাম। মাক্কা-মাদীনার মধ্যবর্তী স্থানে লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকা মিশলাল নামক স্থানে এটা অবস্থিত ছিল। আউস, খাযরাজ, গাসসান ও তাদের কাছাকাছি মতাদর্শের লোকেরা জাহিলি যুগে এর পূজা করত। মাক্কা বিজয়ের পর এটার সমাপ্তির সময় ঘনিয়ে আসে। আল্লাহর রাসূল মানাত ধ্বংসে অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। এই অভিযানে এমন সাহাবিকে প্রেরণ করেন, যিনি জাহিলি যুগে নিজে এটাকে সম্মান করতেন। তিনি হলেন সাআদ ইবনু যাইদ আশহালি।
সাআদ বের হয়ে মানাত ধ্বংস করতে যান। মন্দিরের সীমানায় পৌঁছার পর পুরোহিত তাকে জিজ্ঞেস করে, 'কী জন্য এসেছ?' সাআদ বললেন, 'মানাত ধ্বংস করতে এসেছি।' সাআদ মানাতের দিকে এগিয়ে যান। একটু এগুতেই তার পথ রোধ করতে এক কালো নগ্ননারী বেরিয়ে আসে, বুক চাপড়িয়ে তাকে অভিশাপ দিতে থাকে। সাআদ তরবারির এক আঘাতেই মহিলার গর্দান ফেলে দেন। তারপর সাথিদের নিয়ে এগিয়ে মানাত মূর্তি ধ্বংস করেন।
৩. সুওয়াআ মূর্তি ধ্বংসে আমর ইবনুল আ'সের অভিযান
নূহ ﷺ-এর গোত্রের মূর্তির নাম ছিল সুওয়াআ। পরবর্তী সময়ে হুজাইল গোত্রের লোকেরা এই মূর্তিটি গ্রহণ করে। মাক্কা বিজয়ের পর এটার সমাপ্তির সময় ঘনিয়ে আসে। আল্লাহর রাসূল এই মূর্তি ধ্বংসে আমর ইবনুল আ'সের নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করেন।
আমর ইবনুল আ'স বলেন, 'আমি মূর্তির কাছে গিয়ে ভেঙে ফেললাম। সাথিদের বললাম খাযানা ঘর ভেঙে ফেলতে। আশ্চর্য! ভাঙার পর সেখানে কিছুই পাওয়া গেলো না। শেষে পুরোহিতকে বললাম, 'এতক্ষণ কী দেখলে?' সে বলল, 'আমি আল্লাহর জন্য ইসলাম গ্রহণ করলাম।'
mূর্তিও প্রতিমা ধ্বংসে আল্লাহর রাসূলের অভিযান প্রেরণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, শির্ক ও তাগূতের নিদর্শন নিশ্চিহ্ন করার শক্তি অর্জিত হওয়ার পর সেগুলো একদিনও বিদ্যমান রাখা জায়েয নেই। কবরের ওপর নির্মিত যে কোনো ধরনের মূর্তি ও তাগূতের ক্ষেত্রেও একই বিধান।
টিকাঃ
[৬২৩] ৫৭৯ আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৮২
[৬২৪] প্রগুক্ত
[৬২৫] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৮৭৪
[৬২৬] আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৮২
[৬২৭] আবু ইয়া'লা, ৯০২; আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৮২
[৬status] আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৮৭
[৬২৯] তাবাকাত, ২/১৪৬
[৬৩০] আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৮৮
[৬৩১] প্রাগুক্ত
[৬৩২] দেখুন, শামি রচিত সুবুলুর রাশাদ, ৬/৩০৩
[৬৩৩] দেখুন, ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৮৭০