📄 দুই. অভিযানের প্রস্তুতি
সুসংহত রাষ্ট্র বিনির্মাণ, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা, অভিযান প্রেরণ এবং সর্বোপরি তিনি নিজে যুদ্ধে গমন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কাজের প্রক্রিয়া ও বাহ্যিক উপকরণ গ্রহণ সুন্নাহ। এই মাক্কা অভিযানের বেলাতেও আমরা এই নীতির ব্যাপারটি লক্ষ করেছি। ইতিহাস বলে, আল্লাহর রাসূল মাক্কা অভিযানের সিদ্ধান্ত স্থির করবার পর তার পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে গোপন রেখেছেন, যেন কুরাইশের কাছে এ খবর পৌঁছে না যায়।
১. চুড়ান্ত গোপনীয়তা রক্ষা
অভিযানের আগে আল্লাহর রাসূল বিষয়টি কঠিনভাবে গোপন রেখেছেন। এমনকি একান্ত কাছের মানুষের কাছেও প্রকাশ করেননি। যেমন, সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে নিকটতম ছিলেন আবু বাকর সিদ্দীক। স্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালোবাসার আয়িশা সিদ্দীকা। তাদের একজনও আল্লাহর রাসূলের লক্ষ্য ও অভিযানের দিক সম্পর্কে জানতে পারেননি।
২. বাতনে ইদাম নামক স্থানে আবু কাতাদার বাহিনি প্রেরণ
মাক্কা অভিযানের কিছুটা আগে আল্লাহর রাসূল আট সদস্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী গঠন করে বাতনে ইদামের দিকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য হলো, আসল উদ্দেশ্য তখন পর্যন্ত গোপন রাখা। শত্রুকে বিভ্রান্ত করা, মুসলিম বাহিনীর আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর জন্য এমনই ছিল আল্লাহর রাসূলের কর্মপন্থা।
৩. শত্রুদের কাছে তথ্য ফাঁস রোধে গোয়েন্দা প্রেরণ
আল্লাহর রাসূল মাদীনার গোয়েন্দা বাহিনীকে মাদীনার অভ্যন্তরে ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে দেন। বিশেষ করে গিরিপথগুলোতে নবিজি নিশ্চিদ্র প্রহরা রাখার প্রতি গুরুত্ব দেন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব এই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
৪. কুরাইশের চোখে ও কানে পর্দা ফেলে দিতে নবিজির দুআ
সাধ্য মতো মানবীয় উপকরণগুলো গ্রহণ করার পর আল্লাহর রাসূল মিনতিপূর্ণ কণ্ঠে বিনম্রচিত্তে দুআ করে বলছিলেন, 'হে আল্লাহ, ওদের চোখ ও কানে পর্দা ঢেলে দিন। ওরা যেন আমাদেরকে অকস্মাৎ তাদের সামনে দেখে, আচমকা আমাদের খবর পায়।'
৫. মাক্কা অভিযান
অভিযানের লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূলের সমস্ত আয়োজন ও প্রস্তুতি শেষ হয়েছে কেবল, এমন সময় হাতিব ইবনু আবি বালতাআ মাক্কার লোকদের কাছে চিঠি লেখেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ওয়াহির মাধ্যমে তাঁর নবিকে এই চিঠির বিষয়ে অবগত করেন। নবিজি চিঠির বাহককে ধরতে 'আলি ও মিকদাদ-কে দ্রুত প্রেরণ করেন। তারা রওজায়ে খাখ নামক স্থানে চিঠির বাহক মহিলাকে ধরে ফেলেন। হাতিবকে ডাকা হলে তিনি বলেন, 'আমি কুরাইশের সাথে আমার পরিবারকে সুরক্ষা দিতে চেয়েছি। আমি দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে একাজ করিনি।' আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'হাতিব তোমাদেরকে সত্য বলেছে।'
টিকাঃ
[৫৫৩] দেখুন, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/২৮২
[৫৫৪] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৩৯৫, ৩৯৬
[৫৫৫] ওয়াদিয়ে কুরার একটি জায়গা
[৫৫৭] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৯৮
[৫৫৮] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬৫
[৫৫৯] দেখুন, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/ ২৮২
[৫৬০] দেখুন, তাফসীর ফি যিলালিল কুরআন ৬/৩৫৮
📄 তিন. মাক্কা অভিযাত্রার ঘটনাপ্রবাহ
১. ৮ম হিজরির মাঝামাঝির দিকে রমযান মাসের দশ তারিখে আল্লাহর রাসূল মাক্কা অভিমুখে রওনা করেন। তাঁর সাথে দশ হাজার সাহাবি। মাক্কা মাদীনার মধ্যবর্তী যেকোনো পথ দিয়ে অতিক্রমের সময় পার্শ্ববর্তী জনপদের অধিবাসীরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে এই অপার বিস্ময়ে অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখছিল। পথিমধ্যে জুহফা নামক স্থানে আব্বাস ইবনু আব্দিল মুত্তালিব নবিজির সাথে এসে মিলিত হন।
২. আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়া ও আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসের ইসলাম গ্রহণ
আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়া মাক্কা থেকে বের হয়ে আসে। পথে সানিয়্যাতুল ইকাব নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিলিত হয়। এরা নবিজিকে মক্কায় অনেক কষ্ট দিয়েছিল। তবুও আল্লাহর রাসূল তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে ইসলামে গ্রহণ করেন।
৩. মাররুয যাহরানে অবতরণ, কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনু হারবের ইসলাম গ্রহণ
আল্লাহর রাসূল মাররুয যাহরানে এসে পৌঁছেন। এখানে রাতের প্রথম প্রহরে যাত্রা বিরতি করে সাহাবিদেরকে মশাল জ্বালানোর নির্দেশ দেন। এক বিস্তৃর্ণ ভূমিতে একসাথে জ্বলে ওঠে দশ হাজার মশাল। আব্বাস আল্লাহর রাসূলের সাদা খচ্চর নিয়ে বাইরে আসেন যদি মাক্কার কাউকে খবর দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া যায়। এমন সময় আবু সুফিয়ান ইবনু হারব ও বুদাইল ইবনু ওয়ারাকার সাথে দেখা হয়। আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নিয়ে নবিজির কাছে আসেন।
পরদিন সকালে আবু সুফিয়ান আল্লাহর রাসূলের সামনে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবিজি বললেন, 'যে আবু সুফিয়ানের ঘরে অবস্থান নেবে, সে নিরাপদ। যে নিজের দরজা বন্ধ রাখবে, সে নিরাপদ। যে মাসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।' আল্লাহর রাসূল আব্বাসকে বললেন, তাকে পাহাড়ের সেই স্থানে দাঁড় করিয়ে দিন যেন সে আমাদের বাহিনী মাক্কায় প্রবেশের দৃশ্য দেখতে পায়।
অতঃপর বিভিন্ন গোত্র তাদের ঝান্ডা নিয়ে অতিক্রম করছিল। এক সময় আল্লাহর রাসূল মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের নিয়ে অতিক্রম করছিলেন। আবু সুফিয়ান অবাক হয়ে বললেন, 'আবুল ফজল, এদের সাথে মোকাবিলা করবার কারও সাহস ও সামর্থ্য নেই। আবুল ফজল, আল্লাহর কসম, তোমার ভাতিজা তো বিশাল রাজত্বের মালিক হয়ে গেল।' আব্বাস বললেন, 'আবু সুফিয়ান, এটা রাজত্ব নয়, নবুওয়াত।' ও বলল, 'হ্যাঁ, এটাই ঠিক—নবুওয়াত।'
টিকাঃ
[৫৬১] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫৬০
[৫৬২] প্রাগুক্ত
[৫৬৩] বুখারি, ৪২৭৫; মুসলিম, ১১৩
[৫৬৪] দেখুন, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/২৮৬
[৫৬৫] দেখুন, তাআম্মুলাত ফিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃঃ ২৫৪
[৫৬৬] দেখুন, ইবনু হিশাম, পৃ. ১/২৯৫-৩০০
[৫৬৭] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৭/১৮২
[৫৬৮] মক্কার উত্তরে একটি উপত্যকার নাম এটি
[৫৬৯] দেখুন, মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৮৭
[৫৭০] বুখারি, ৪২৮০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ৫/৩৭৪-৩৭৮; ইবনু সাআদ, ২/১৩৪-১৩৭। সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৫১৮-৫২০
[৫৭১] প্রাগুক্ত
[৫৭২] আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন, ২/৪০৩
[৫৭৩] 'কিরাআতুন সিয়াসিয়্যাহ লিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৪৫
[৫৭৪] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৪/৫২
[৫৭৫] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৪৯
[৫৭৬] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৪/৫২