📄 সাত. ঈমানের প্রতিযোগিতা, জিহাদে এর প্রভাব
মুসলিম বাহিনী মাআনে অবস্থানের সময় শত্রুদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অনেকে আলোচনা করছিলেন। এই আলোচনা তাদেরকে যুদ্ধে নিবিষ্ট হতে দিচ্ছিল না; কিন্তু পরক্ষণেই তারা নিজেদের স্বভাবজাত নীতি—ঈমানের প্রতিযোগিতায় জেগে উঠলেন। তারা বলছিলেন, 'আমরা এসেছি শাহাদাতের সন্ধ্যানে, এখন সে অভীষ্ট অর্জন না করে কীভাবে পলায়ন করতে পারি!'
যাইদ ইবনু আরকাম বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার কোলে আমি প্রতিপালিত হয়েছি—ইয়াতীম অবস্থায়। অবশেষে; এই মুতার সফরে তিনি আমাকে তার বাহনের পেছনে নিয়ে রওনা করেন। তিনি রাতের আঁধারে বিরামহীন চলছিলেন। আল্লাহর কসম, আমি পেছনে থেকে তার কবিতা আবৃত্তি শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন, 'মুসলিমরা সিরিয়ায় এসেছে, ফিরে যাবে আমাকে এখানে রেখেই'। আমি তার কথা শুনে কেঁদে ফেললাম। তিনি চাবুক দিয়ে আমাকে মৃদু আঘাত করে বললেন, 'আরে নির্বোধ, কী হলো তোমার? আমাকে তো আল্লাহ শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করবেন, আর তুমি ফিরে যাবে আমার বাহন নিয়ে।'
এই বিপুল ব্যবধানের যুদ্ধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে আমাদের বর্তমান মানসিক ও সার্বিক পরাজয়ের কারণ উদঘাটিত হবে। তাদের অমূলক প্রশ্নের উত্তরও আমরা পেয়ে যাব, যারা বলে আমাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো, বর্তমান বিশ্বে আমাদের শত্রুদের সামনে আছে সর্বাধুনিক টেকনোলজি আর অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রসমূহ।
ইবনু কাসীর এই যুদ্ধ সম্পর্কে বলেছেন, 'বিপরীত ধর্মের দুটি বাহিনী যুদ্ধ করছে, একটি দল যুদ্ধ করছে আল্লাহর রাস্তায়, তাদের সংখ্যা মাত্র তিন হাজার। আরেকটি দল কাফির, তাদের সংখ্যা দু লাখ। রোমান সেনাদের সংখ্যা এক লাখ, আর আরব খ্রিষ্টানদের সংখ্যা এক লাখ। যথেষ্ট অস্ত্রে সজ্জিত সবাই। এই বিশাল বাহিনীর বিপরীতে যুদ্ধ করে মুসলিমরা শহিদ হয়েছে মাত্র ১২ জন, আর মুশরিকদের নিহতের সংখ্যা অগণন। এই তো, খালিদ ইবনু ওয়ালিদ-এর একার হাতেই তরবারি ভেঙেছে ৯ টি। তার হাতে অবশিষ্ট ছিল শুধু একটি ইয়েমেনি লোহার পাত। কী মনে হয়, এর প্রত্যেকটি তরবারি দিয়ে শত্রু নিধন হয়নি? অন্যান্য কুরআনের বাহক বীরদের বৃত্তান্তও তো সুবিস্তৃত। তারা সর্বশক্তি ব্যয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই ক্রুশপূজারিদের ওপর, যাদের ওপর এখনো অবিরত আল্লাহর লা'নাত ঝরে।
মাত্র তিন হাজার সৈন্য সামান্য অস্ত্র নিয়ে তদানীন্তন সময়ের সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, যারা ছিল সমকালীন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। বুঝতে পারছি, মুসলিম বাহিনী সংখ্যা, শক্তি ও আধুনিক অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেননি; বরং শুধু ঈমানি শক্তিই তাদের বুকে পাহাড়ের অবিচলতা গ্রথিত করেছে। দান করেছে অসীম সাহসিকতা। ফলে মাত্র তিন হাজার সৈন্য দু লাখ সেনার বিপুল বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। এই ঈমানি শক্তি নিয়ে এখনো বর্তমান পরাশক্তিগুলোকে পরাজিত করা সম্ভব।