📘 রউফুর রহীম 📄 ছয়. সেনাপতির সম্মানে আল্লাহর রাসূল সা.

📄 ছয়. সেনাপতির সম্মানে আল্লাহর রাসূল সা.


আউফ ইবনু মালিক আশজাঈ বলেন, 'আমি যাইদ ইবনু হারিসার সাথে মুতা অভিযানে বের হলাম। ইয়েমেনি এক ব্যক্তি আমাকে তার সাথে নিয়ে চলছিল। এক সময় রোমান সৈন্য ও মুসলিম বাহিনীর মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়। সুন্দর কেশবিশিষ্ট এক অশ্বারোহী রোমান সেনাকে দেখলাম, তার অশ্বপৃষ্ঠের জিন ও অস্ত্রে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া। মুসলিমদের সাথে বেশ বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল।

ইয়েমেনি লোকটা তাকে ধরাশায়ী করতে একটি পাথরের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকে। সেই সৈন্য পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় ঘোড়ার রগ কেটে দেয় ইয়েমেনি। সৈন্য পলায়নে উদ্যত হয়; কিন্তু সে সুযোগ পায় না। ইয়েমেনি কাছে এসে তাকে হত্যা করে, নিয়ে নেয় তার ঘোড়া ও অস্ত্র।

📘 রউফুর রহীম 📄 আল্লাহ এ যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় দানের পরের কথা

📄 আল্লাহ এ যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় দানের পরের কথা


খালিদ ইবনু ওয়ালিদ ইয়েমেনির কাছে লোক পাঠিয়ে কিছু গানীমাত নিয়ে নেয়। আউফ বলেন, 'আমি খালিদকে বললাম, 'তুমি কি জানো না, নিহত ব্যক্তির সম্পদগুলো আল্লাহর রাসূল হত্যাকারীর জন্য নির্ধারণ করেছেন?' খালিদ বলল, 'হ্যাঁ জানি, তবে আমার কাছে ওগুলো বেশি মনে হয়েছে। আমি বললাম, 'ওর জিনিস ওকে ফিরিয়ে দাও, নয়তো আল্লাহর রাসূলের কাছে এ নিয়ে নালিশ করব।' কিন্তু খালিদ তার কথায় অটল।

আউফ বলেন, 'মাদীনায় প্রত্যার্পণের পর আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে সমবেত হলাম। সুযোগ মতো নবিজির কাছে খুলে বললাম ইয়েমেনি লোকটার ঘটনা ও খালিদের কাজ।' আল্লাহর রাসূল খালিদের দিকে ফিরে বললেন, 'কী ব্যাপার খালিদ, তুমি এ কাজ করলে কেন?' খালিদ বলল, 'আমার কাছে ওরগুলো বেশি মনে হয়েছে'। নবিজি বললেন, 'ওর জিনিস ওকে ফিরিয়ে দাও।'

আউফ বলেন, 'আমি বললাম, 'খালিদ, দেখলে—আমার কথা আমি রেখেছি।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সেটা আবার কী?' আমি নবিজিকে খুলে বললাম।' আল্লাহর রাসূল রাগতস্বরে বললেন, 'খালিদ, ওর জিনিসটা আর ফিরিয়ে দেবে না। তোমরা কি আমার সেনাপতিদেরকে আমার খাতিরে ক্ষমা করতে পারো না? তাদের নির্দেশপালন তোমাদের জন্য আবশ্যক। তবে তারা ভুল করলে এর দায় তাদের ওপরই বর্তাবে।'

মনে রাখতে হবে, আমীরও একজন মানুষ। ভুল তারও হতে পারে; কিন্তু সেই ভুলের কারণে তাকে তাচ্ছিল্য করা থেকে রক্ষায় আল্লাহর রাসূলের সচেতনতার অবস্থান সবিশেষ লক্ষণীয়। তারা ভুল করলেও তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে কিন্তু তাচ্ছিল্য কিংবা সম্মানহানিকর কিছু করা সংগত নয়।

খালিদ ইবনু ওয়ালিদ ইয়েমেনি লোকটার ব্যক্তিগত গানীমাতের কিছু অংশ নিয়ে তাকে কষ্ট দিতে চাননি। তার ভাবনায় সাধারণের জন্য কল্যাণকর দিকটা প্রাধান্যযোগ্য মনে হয়েছে। আর এদিকে দেখছেন, এক ব্যক্তির কাছে ব্যক্তিগত অতিরিক্ত গানীমাত, এখন এগুলো সাধারণ গানীমাতের মধ্যে শামিল করে নিলে তা মুজাহিদদের জন্য লাভজনক হয়। ওদিকে আউফ বিন মালিক জ্ঞান অনুযায়ী খালিদকে নিষেধ করেছেন। যখন দেখলেন খালিদ তার কথা মানছে না, তখন মামলা দায়ের করলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। এখানেই তার দায়িত্ব শেষ; কিন্তু সংশোধনী এই দায়িত্ব পালনে ব্যক্তি বিশেষের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। ফলে খালিদের প্রতি প্রকাশ পেয়েছে এক ধরনের হেয়তা। আল্লাহর রাসূল এটাকেই কঠোরভাবে অস্বীকার করে স্পষ্ট করেন সেনাদের ওপর সেনাপতির দায়িত্ব কী?

পরে নবিজি খালিদকে ইয়েমেনি ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া থেকে বারণ করেন। এখানে তিনি এ কথা বোঝাননি যে, মুজাহিদের অধিকার নষ্ট করা হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব যে, তিনি একজন মুসলিমের অধিকার নষ্ট করবেন! অবশ্যই এমন হয়ে থাকবে যে, আল্লাহর রাসূল সেই মুজাহিদ সাহাবির সম্মতিতে নিয়েছেন; কিংবা তার সম্পদের বিনিময়ে কিছু দিয়েছেন। অথবা সমাধান করেছেন অন্য কোনোভাবে যা হাদীসে আসেনি।

যে উম্মাহ পুরুষের মর্যাদা দিতে জানে না, করে না সম্মান, সে জাতির মাঝে কোনো শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হয় না; কিন্তু আল্লাহর রাসূলের আদর্শ শিক্ষা—তিনি এই উম্মাহকে একটি উন্নত ও টনটনে বিবেচনাবোধ সম্পন্ন জাতিরূপে নির্মাণ করতে চেয়েছেন। তাই প্রত্যেকের উচিত, ব্যক্তির অবস্থান বিবেচনা করে তাকে সম্মান করা। ধর্মীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে অবশ্যই অগ্রগণ্য। সর্বোপরি ব্যক্তি নিজের সীমানা সম্পর্কে অবহিত থাকাও অবশ্যক বটে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলছেন—
হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়ী হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ—তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। (সূরা মায়েদা: ৫৪)

নবিজি বলেছেন, 'তোমরা কি আমার আমীরদেরকে আমার খাতিরে ক্ষমা করতে পারো না?' এখানে খালিদ-এর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, আর তাকে গণ্য করা হয়েছে আল্লাহর রাসূলের একজন আমীর হিসেবে। মানুষের সম্মানে এটাই ছিল আল্লাহর রাসূলের চিরায়ত পন্থা।

📘 রউফুর রহীম 📄 সাত. ঈমানের প্রতিযোগিতা, জিহাদে এর প্রভাব

📄 সাত. ঈমানের প্রতিযোগিতা, জিহাদে এর প্রভাব


মুসলিম বাহিনী মাআনে অবস্থানের সময় শত্রুদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অনেকে আলোচনা করছিলেন। এই আলোচনা তাদেরকে যুদ্ধে নিবিষ্ট হতে দিচ্ছিল না; কিন্তু পরক্ষণেই তারা নিজেদের স্বভাবজাত নীতি—ঈমানের প্রতিযোগিতায় জেগে উঠলেন। তারা বলছিলেন, 'আমরা এসেছি শাহাদাতের সন্ধ্যানে, এখন সে অভীষ্ট অর্জন না করে কীভাবে পলায়ন করতে পারি!'

যাইদ ইবনু আরকাম বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার কোলে আমি প্রতিপালিত হয়েছি—ইয়াতীম অবস্থায়। অবশেষে; এই মুতার সফরে তিনি আমাকে তার বাহনের পেছনে নিয়ে রওনা করেন। তিনি রাতের আঁধারে বিরামহীন চলছিলেন। আল্লাহর কসম, আমি পেছনে থেকে তার কবিতা আবৃত্তি শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন, 'মুসলিমরা সিরিয়ায় এসেছে, ফিরে যাবে আমাকে এখানে রেখেই'। আমি তার কথা শুনে কেঁদে ফেললাম। তিনি চাবুক দিয়ে আমাকে মৃদু আঘাত করে বললেন, 'আরে নির্বোধ, কী হলো তোমার? আমাকে তো আল্লাহ শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করবেন, আর তুমি ফিরে যাবে আমার বাহন নিয়ে।'

এই বিপুল ব্যবধানের যুদ্ধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে আমাদের বর্তমান মানসিক ও সার্বিক পরাজয়ের কারণ উদঘাটিত হবে। তাদের অমূলক প্রশ্নের উত্তরও আমরা পেয়ে যাব, যারা বলে আমাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো, বর্তমান বিশ্বে আমাদের শত্রুদের সামনে আছে সর্বাধুনিক টেকনোলজি আর অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রসমূহ।

ইবনু কাসীর এই যুদ্ধ সম্পর্কে বলেছেন, 'বিপরীত ধর্মের দুটি বাহিনী যুদ্ধ করছে, একটি দল যুদ্ধ করছে আল্লাহর রাস্তায়, তাদের সংখ্যা মাত্র তিন হাজার। আরেকটি দল কাফির, তাদের সংখ্যা দু লাখ। রোমান সেনাদের সংখ্যা এক লাখ, আর আরব খ্রিষ্টানদের সংখ্যা এক লাখ। যথেষ্ট অস্ত্রে সজ্জিত সবাই। এই বিশাল বাহিনীর বিপরীতে যুদ্ধ করে মুসলিমরা শহিদ হয়েছে মাত্র ১২ জন, আর মুশরিকদের নিহতের সংখ্যা অগণন। এই তো, খালিদ ইবনু ওয়ালিদ-এর একার হাতেই তরবারি ভেঙেছে ৯ টি। তার হাতে অবশিষ্ট ছিল শুধু একটি ইয়েমেনি লোহার পাত। কী মনে হয়, এর প্রত্যেকটি তরবারি দিয়ে শত্রু নিধন হয়নি? অন্যান্য কুরআনের বাহক বীরদের বৃত্তান্তও তো সুবিস্তৃত। তারা সর্বশক্তি ব্যয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই ক্রুশপূজারিদের ওপর, যাদের ওপর এখনো অবিরত আল্লাহর লা'নাত ঝরে।

মাত্র তিন হাজার সৈন্য সামান্য অস্ত্র নিয়ে তদানীন্তন সময়ের সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, যারা ছিল সমকালীন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। বুঝতে পারছি, মুসলিম বাহিনী সংখ্যা, শক্তি ও আধুনিক অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেননি; বরং শুধু ঈমানি শক্তিই তাদের বুকে পাহাড়ের অবিচলতা গ্রথিত করেছে। দান করেছে অসীম সাহসিকতা। ফলে মাত্র তিন হাজার সৈন্য দু লাখ সেনার বিপুল বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। এই ঈমানি শক্তি নিয়ে এখনো বর্তমান পরাশক্তিগুলোকে পরাজিত করা সম্ভব।

ফন্ট সাইজ
15px
17px