📄 জা'ফার পরিবারের প্রতি নবিজির সম্মান প্রদর্শন
জা'ফারের শাহাদাতের পর আল্লাহর রাসূল আসমা বিনতে উমাইসের ঘরে প্রবেশ করেন। ছেলেরা অন্য কোথাও ছিল। তাদের ডাকতে বললেন, 'জা'ফারের ছেলেদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' ছেলেরা আসার পর নবিজি তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন, চুমু খান। এ সময় স্নেহের আবেশে তাঁর আবেগের অশ্রু ঝরছিল।
আসমা বললেন, 'জা'ফার ও তার সাথিদের ব্যাপারে আপনি কিছু জানতে পেরেছেন?' নবিজি বললেন, 'হ্যাঁ। তারা আজ শহিদ হয়েছে।' স্বামীর মৃত্যু-সংবাদ শুনতেই আসমা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাঁদতে থাকেন শব্দ করে। আল্লাহর রাসূল এই ভারাক্রান্ত পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখবার জন্য বললেন, ‘জা’ফরের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করতে তোমরা ভুলে যেয়ো না। কারণ, তারা আজ ব্যথায় কাতর।’
আল্লাহর রাসূলের এই সহমর্মিতার আচরণ থেকে আমরা যা শিখি—
ক. স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী কান্না করতে পারে:
আল্লাহর রাসূল ﷺ জা’ফার ও তার সাথিদের শাহাদাতের সংবাদ আসমাকে বলার পর তিনি যে শব্দ করে কেঁদেছেন, তার কান্না দেখে নবিজি বারণ করেননি, কাজটাকে অপছন্দও করেননি, এতে প্রমাণ হয় এটা নিষিদ্ধ হলে নবিজি অবশ্যই বারণ করতেন। তবে ইসলামে যে কান্নাকে নিষেধ করা হয়েছে তা হলো জাহিলি যুগের চিল্লাচিল্লি, মাতম করা, আল্লাহকে অভিযুক্ত করা, লাথি মারা, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ফায়সালা ও তাঁর পূর্ব নির্ধারণের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা নিশ্চয় বড় অবাধ্যতা।
খ. মৃতের পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করা মুস্তাহাব:
আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবিদেরকে জা’ফারের পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করতে বলেছেন। এটা এক দিক থেকে মৃতের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া, যেন শোকসন্তপ্ত পরিবারে খাবারের চিন্তা কিছুটা হলেও লাঘব হয় কিংবা শোকে উপোস থাকতে না হয়। আজ কিছু ইসলামি ভূখণ্ডে এই সুন্নাহর পরিপন্থি কাজ দেখা যায়। মৃতের পরিবারকে রান্না করে খাওয়ানোর পরিবর্তে উলটো আগতদের জন্য শোকাহত পরিবারকে রান্না করতে হয়। এরপর আবার দিন ধার্য করে পুরো পাড়া ঢোল পিটিয়ে খাওয়াতে হয়। এগুলো খুব নিন্দনীয় কাজ। মুসলিমদের উচিত এসব অন্যায্য কাজ পরিহার করে চলা।
আল্লাহর রাসূল ﷺ তিন দিন পর কাঁদতে নিষেধ করেছেন। তিন দিন পরেও আসমাকে কাঁদতে দেখে নবিজি তাকে বলেছেন, ‘আজকের পরে আমার ভাইয়ের জন্য আর কাঁদবে না। আর আমার ভাতিজাদেরকে ডাকো।’ ওদেরকে নবিজির সামনে আনা হলো। উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল ওদের। আল্লাহর রাসূল নরসুন্দর ডেকে ওদের মাথা মুণ্ডিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘মুহাম্মাদ হয়েছে আমার চাচা আবু তালিবের মতো, আর আবদুল্লাহ চরিত্রে আকৃতিতে হয়েছে আমার মতো।
এরপর আবদুল্লাহর ডানহাত ধরে তিনবার বললেন, 'হে আল্লাহ, জা'ফারের প্রতিনিধি তার পরিবারে দিয়ে দাও, আর আবদুল্লাহর সৎ বাণিজ্যে তুমি বারাকাহ দান করো।' এদের মা নবিজির কাছে দুর্বলতা ও আশ্রয়হীনতার কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, 'তুমি তাদের ক্ষেত্রে দারিদ্রতার ভয় পাচ্ছ; অথচ দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তাদের অভিভাবক।'
শহিদদের পরিবার ও সন্তানদের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে এমনই ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনের সুরভিত কর্মপন্থা। তিনি চেয়েছেন উম্মাহ যেন আজীবন তাঁর প্রদর্শিত পথ আঁকড়ে থাকে।
গ. আবু বাকরের সাথে আসমা বিনতে উমাইসের বিয়ে:
আসমা বিনতে উমাইসের ইদ্দত শেষ হলে আবু বাকর তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সহজেই তাদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। তাদের সংসারে জন্ম নিয়েছিলেন মুহাম্মাদ ইবনু আবি বাকর। আবু বাকরের মৃত্যুর পর আসমাকে বিয়ে করেছিলেন 'আলি। 'আলির ঔরশে তিনি কয়েকটি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন।
📄 পাঁচ. নেতৃত্বের গভীরতা
মৃতা যুদ্ধের কথা: আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা শহিদ হওয়ার পর সাবিত ইবনু আকরাম পতাকা তুলে নেন। সে মুহূর্তে এটাই ছিল তার আবশ্যকীয় কাজ। কেননা, পতাকার পতন মানে গোটা বাহিনীর পরাজয়। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি মুসলিমদের একজন আমীর নির্বাচন করতে বলেছেন। উপস্থিত সবাই তার পরামর্শ দিলে তিনি না করেন। এরপর মুজাহিদরা খালিদকে নির্বাচন করেন। সাবিত ইবনু আকরাম আমাদেরকে এখানে এক মহান শিক্ষায় ঋদ্ধ করেছেন।
আরেক বর্ণনায় আছে, সাবিত খালিদের কাছে পতাকা নিয়ে আসেন; কিন্তু তিনি বারণ করে বলেন, 'এটা আপনার কাছ থেকে আমি নিতে পারব না। কেননা, আপনিই এর সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।' সাবিত বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, এটা আমি আপনার জন্যই তুলে নিয়েছি।'
উভয় বর্ণনার বিষয় একটাই, তা হলো, সাবিত প্রথমে মুসলিমদেরকে একত্রিত করেছেন। মুসলিমরা বলেছিলেন, 'আপনিই আমাদের আমীর।' কিন্তু তিনি এটা গ্রহণ না করে খালিদ ইবনু ওয়ালিদকে নির্বাচন করেছেন। কেননা, তিনি আগে দেখেছেন, উপস্থিত মুজাহিদদের মধ্যে এই কাজে কে সবচেয়ে উপযুক্ত। এটাও হয়ে থাকে যে, উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে কাজ অর্পিত না হলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর কাজ যখন হয় আল্লাহর জন্য, তখন সেখানে প্রবৃত্তির কোনো দখল থাকে না।
আসলে সাবিত ইবনু আকরাম নেতৃত্বে অক্ষম ছিলেন না। অধিকন্তু তিনি ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ ও একজন মহান বদরি সাহাবি; কিন্তু তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেননি; বরং দেখেছেন কে বেশি উপযুক্ত, আবার নির্বাচনও করেছেন এমন ব্যক্তিকে, যার ইসলাম গ্রহণের বয়স এখনো তিন মাসের বেশি হয়নি। তবুও ইসলামে নবাগত এই খালিদকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, তার মূল লক্ষ্য যেমন ছিল আল্লাহর নির্দেশকে সম্ভাব্য সুন্দরতম পন্থায় কার্যকর করা। তেমনি খালিদ নতুন হলেও সেই জাহিলি যুগ থেকেই তিনি সামরিক অভিজ্ঞতায় প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন।
📄 ছয়. সেনাপতির সম্মানে আল্লাহর রাসূল সা.
আউফ ইবনু মালিক আশজাঈ বলেন, 'আমি যাইদ ইবনু হারিসার সাথে মুতা অভিযানে বের হলাম। ইয়েমেনি এক ব্যক্তি আমাকে তার সাথে নিয়ে চলছিল। এক সময় রোমান সৈন্য ও মুসলিম বাহিনীর মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়। সুন্দর কেশবিশিষ্ট এক অশ্বারোহী রোমান সেনাকে দেখলাম, তার অশ্বপৃষ্ঠের জিন ও অস্ত্রে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া। মুসলিমদের সাথে বেশ বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল।
ইয়েমেনি লোকটা তাকে ধরাশায়ী করতে একটি পাথরের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকে। সেই সৈন্য পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় ঘোড়ার রগ কেটে দেয় ইয়েমেনি। সৈন্য পলায়নে উদ্যত হয়; কিন্তু সে সুযোগ পায় না। ইয়েমেনি কাছে এসে তাকে হত্যা করে, নিয়ে নেয় তার ঘোড়া ও অস্ত্র।
📄 আল্লাহ এ যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় দানের পরের কথা
খালিদ ইবনু ওয়ালিদ ইয়েমেনির কাছে লোক পাঠিয়ে কিছু গানীমাত নিয়ে নেয়। আউফ বলেন, 'আমি খালিদকে বললাম, 'তুমি কি জানো না, নিহত ব্যক্তির সম্পদগুলো আল্লাহর রাসূল হত্যাকারীর জন্য নির্ধারণ করেছেন?' খালিদ বলল, 'হ্যাঁ জানি, তবে আমার কাছে ওগুলো বেশি মনে হয়েছে। আমি বললাম, 'ওর জিনিস ওকে ফিরিয়ে দাও, নয়তো আল্লাহর রাসূলের কাছে এ নিয়ে নালিশ করব।' কিন্তু খালিদ তার কথায় অটল।
আউফ বলেন, 'মাদীনায় প্রত্যার্পণের পর আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে সমবেত হলাম। সুযোগ মতো নবিজির কাছে খুলে বললাম ইয়েমেনি লোকটার ঘটনা ও খালিদের কাজ।' আল্লাহর রাসূল খালিদের দিকে ফিরে বললেন, 'কী ব্যাপার খালিদ, তুমি এ কাজ করলে কেন?' খালিদ বলল, 'আমার কাছে ওরগুলো বেশি মনে হয়েছে'। নবিজি বললেন, 'ওর জিনিস ওকে ফিরিয়ে দাও।'
আউফ বলেন, 'আমি বললাম, 'খালিদ, দেখলে—আমার কথা আমি রেখেছি।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সেটা আবার কী?' আমি নবিজিকে খুলে বললাম।' আল্লাহর রাসূল রাগতস্বরে বললেন, 'খালিদ, ওর জিনিসটা আর ফিরিয়ে দেবে না। তোমরা কি আমার সেনাপতিদেরকে আমার খাতিরে ক্ষমা করতে পারো না? তাদের নির্দেশপালন তোমাদের জন্য আবশ্যক। তবে তারা ভুল করলে এর দায় তাদের ওপরই বর্তাবে।'
মনে রাখতে হবে, আমীরও একজন মানুষ। ভুল তারও হতে পারে; কিন্তু সেই ভুলের কারণে তাকে তাচ্ছিল্য করা থেকে রক্ষায় আল্লাহর রাসূলের সচেতনতার অবস্থান সবিশেষ লক্ষণীয়। তারা ভুল করলেও তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে কিন্তু তাচ্ছিল্য কিংবা সম্মানহানিকর কিছু করা সংগত নয়।
খালিদ ইবনু ওয়ালিদ ইয়েমেনি লোকটার ব্যক্তিগত গানীমাতের কিছু অংশ নিয়ে তাকে কষ্ট দিতে চাননি। তার ভাবনায় সাধারণের জন্য কল্যাণকর দিকটা প্রাধান্যযোগ্য মনে হয়েছে। আর এদিকে দেখছেন, এক ব্যক্তির কাছে ব্যক্তিগত অতিরিক্ত গানীমাত, এখন এগুলো সাধারণ গানীমাতের মধ্যে শামিল করে নিলে তা মুজাহিদদের জন্য লাভজনক হয়। ওদিকে আউফ বিন মালিক জ্ঞান অনুযায়ী খালিদকে নিষেধ করেছেন। যখন দেখলেন খালিদ তার কথা মানছে না, তখন মামলা দায়ের করলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। এখানেই তার দায়িত্ব শেষ; কিন্তু সংশোধনী এই দায়িত্ব পালনে ব্যক্তি বিশেষের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। ফলে খালিদের প্রতি প্রকাশ পেয়েছে এক ধরনের হেয়তা। আল্লাহর রাসূল এটাকেই কঠোরভাবে অস্বীকার করে স্পষ্ট করেন সেনাদের ওপর সেনাপতির দায়িত্ব কী?
পরে নবিজি খালিদকে ইয়েমেনি ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া থেকে বারণ করেন। এখানে তিনি এ কথা বোঝাননি যে, মুজাহিদের অধিকার নষ্ট করা হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব যে, তিনি একজন মুসলিমের অধিকার নষ্ট করবেন! অবশ্যই এমন হয়ে থাকবে যে, আল্লাহর রাসূল সেই মুজাহিদ সাহাবির সম্মতিতে নিয়েছেন; কিংবা তার সম্পদের বিনিময়ে কিছু দিয়েছেন। অথবা সমাধান করেছেন অন্য কোনোভাবে যা হাদীসে আসেনি।
যে উম্মাহ পুরুষের মর্যাদা দিতে জানে না, করে না সম্মান, সে জাতির মাঝে কোনো শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হয় না; কিন্তু আল্লাহর রাসূলের আদর্শ শিক্ষা—তিনি এই উম্মাহকে একটি উন্নত ও টনটনে বিবেচনাবোধ সম্পন্ন জাতিরূপে নির্মাণ করতে চেয়েছেন। তাই প্রত্যেকের উচিত, ব্যক্তির অবস্থান বিবেচনা করে তাকে সম্মান করা। ধর্মীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে অবশ্যই অগ্রগণ্য। সর্বোপরি ব্যক্তি নিজের সীমানা সম্পর্কে অবহিত থাকাও অবশ্যক বটে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলছেন—
হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়ী হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ—তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। (সূরা মায়েদা: ৫৪)
নবিজি বলেছেন, 'তোমরা কি আমার আমীরদেরকে আমার খাতিরে ক্ষমা করতে পারো না?' এখানে খালিদ-এর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, আর তাকে গণ্য করা হয়েছে আল্লাহর রাসূলের একজন আমীর হিসেবে। মানুষের সম্মানে এটাই ছিল আল্লাহর রাসূলের চিরায়ত পন্থা।