📄 চার. আল্লাহর রাসূলের মু'জিযা
এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও আল্লাহর রাসূলের মু'জিযা প্রকাশিত হয়েছে। মাদীনার মুসলিমদেরকে তিনি যাইদ, জা'ফার ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার শাহাদাতের সংবাদ দিয়েছেন, তাদের খবর আসার আগেই। যুদ্ধ শুরুর পর তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছেন, চোখদুটি হয়েছে অশ্রুসজল। শেষে তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্ব গ্রহণের বিষয়ে অবহিত করেছেন। তার হাতে বিজয়ের সুবার্তা দিয়ে তার নাম রেখেছেন সাইফুল্লাহ—আল্লাহর তরবারি। পরে যখন যুদ্ধের সংবাদ আসে, তখন তা আল্লাহর রাসূলের সংবাদের সাথে হুবহু মিলে গেছে, বিন্দুমাত্রও কমবেশ হয়নি।
খালিদ-বাহিনী মাদীনার উপকণ্ঠে এলে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাক্ষাতের জন্য চলে আসেন। শিশুরা তাদের দিকে দৌড়ে এগিয়ে আসছিল। আল্লাহর রাসূল লোকদের সাথে আসছিলেন একটি বাহনে করে। তিনি বললেন, 'শিশুদেরকে নিয়ে বাহনে ওঠাও, আর আমাকে দাও জা'ফারের ছেলেকে।' আবদুল্লাহকে আনা হলে তিনি নিজ হাতে তাকে উঠিয়ে নেন। অন্যান্য লোকেরা বাহিনীর দিকে ধুলো ছিটিয়ে বলছিল, 'আরে, তোমরা কি আল্লাহর রাস্তা (জিহাদ) থেকে পালিয়ে এসেছ?' কিন্তু আল্লাহর রাসূল বলছিলেন, 'ওরা পালিয়ে আসেনি; বরং আল্লাহ চাহেন তো ওরা আবার ফিরে যাবে।'
ছোট শিশুদের সাথে আল্লাহর রাসূলের এই স্নেহের আচরণ মানুষকে মুগ্ধ করেছে। আবার দৃশ্যত হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ থেকে শহিদ না হয়ে ফিরে আসাকে তারা আল্লাহর রাস্তা থেকে পলায়ন হিসেবে দেখছেন। তাদের কাছে এর প্রতিদান হলো যোদ্ধাদের মুখে ধুলো ছিটানো।
আমাদের আজকের রাস্তার উদ্ভ্রান্ত যুবকেরা এই উচ্চ মনোবলসম্পন্ন প্রজন্মের কথা কি জানে? বর্তমান উম্মাহ আল্লাহর রাসূলের হাতে গড়া এই প্রজন্মের অনুসরণ ব্যতীত এমন উন্নত অভীষ্ট অর্জন করতে পারবে না।
📄 যা কিছু শিক্ষণীয়
ক. এ যুদ্ধের তাৎপর্য
আরব-অনারব খ্রিষ্টানদের সম্মিলত রোমানবাহিনী ও মুসলিমদের মাঝে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের মাঝে মুতার যুদ্ধ অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই দুই বাহিনীর মধ্যে এটাই প্রথম সংঘর্ষ। রোমান সাম্রাজ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে এই যুদ্ধ। বলতে পারি সিরিয়া বিজয় ও রোমানদের মাঝে কম্পন সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা ছিল এই যুদ্ধের। এই যুদ্ধ সেই কার্যকরি পরিকল্পনার ফল, যার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সিরিয়ান শহরগুলোর সাহায্যে পরাক্রমশালী রোম সাম্রাজ্যে নাড়া দিয়েছিলেন। আরবদের অন্তরে আল্লাহর রাসূলের ক্ষমতা ও প্রতাপ গ্রথিত হয়, মুসলিমদের মানসিক ভাবনায় শক্তিশালী পরিবর্তন আসে। অন্য দিকে ক্রুশীয় খ্রিষ্টানরা যুদ্ধক্ষেত্রে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি এই যুদ্ধ মুসলিমদেরকে সুযোগ দিয়েছে রোমানদের সামরিক শক্তি ও যুদ্ধনীতি পরখ করে দেখার।
খ. শাহাদাতের অদম্য আগ্রহ আত্মনিবেদনে অনুপ্রাণিত করে
অসীম ধৈর্য, অবিচলতা ও আত্মত্যাগের মহিমা সেনাপতি ও সেনাদের মাঝে দীপ্তিময় হয়েছিল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শাহাদাতের অতুচ্চ মর্যাদা ও মুজাহিদদের মহাপ্রতিদান লাভ করা। আল্লাহ যেন তাদেরকে নবি, সিদ্দীক, শুহাদা ও সালিহীনদের মিছিলে শামিল করে নিয়ে সম্মানিত করেন। প্রবেশ করান এমন এক জান্নাতে, যার উৎকৃষ্টতা দেখেনি কোনো চোখ, শোনেনি কোনো কান, ভাবতে পারেনি কোনো মানুষের হৃদয়।
গ. এই যুদ্ধটি কেন আলাদা মহিমায় উজ্জ্বল
এই একটি যুদ্ধ, যার সার্বক্ষণিক খবর আল্লাহর রাসূলের কাছে আসমান থেকে এসেছে। রণক্ষেত্র থেকে সংবাদ আসার আগেই আল্লাহর তিন শ্রেষ্ঠ বীরের শাহাদাতের সুবার্তা-সহ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তিনি সাহাবিদের শোনাচ্ছিলেন। যুদ্ধটি এদিক থেকেও আলাদা যে, শুধু এই অভিযানের জন্য নবিজি পর্যায়ক্রমে তিনজন সেনাপতি নির্ধারণ করেছিলেন—যাইদ বিন হারিসা, জা'ফার বিন আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা।
📄 জা'ফার পরিবারের প্রতি নবিজির সম্মান প্রদর্শন
জা'ফারের শাহাদাতের পর আল্লাহর রাসূল আসমা বিনতে উমাইসের ঘরে প্রবেশ করেন। ছেলেরা অন্য কোথাও ছিল। তাদের ডাকতে বললেন, 'জা'ফারের ছেলেদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' ছেলেরা আসার পর নবিজি তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন, চুমু খান। এ সময় স্নেহের আবেশে তাঁর আবেগের অশ্রু ঝরছিল।
আসমা বললেন, 'জা'ফার ও তার সাথিদের ব্যাপারে আপনি কিছু জানতে পেরেছেন?' নবিজি বললেন, 'হ্যাঁ। তারা আজ শহিদ হয়েছে।' স্বামীর মৃত্যু-সংবাদ শুনতেই আসমা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাঁদতে থাকেন শব্দ করে। আল্লাহর রাসূল এই ভারাক্রান্ত পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখবার জন্য বললেন, ‘জা’ফরের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করতে তোমরা ভুলে যেয়ো না। কারণ, তারা আজ ব্যথায় কাতর।’
আল্লাহর রাসূলের এই সহমর্মিতার আচরণ থেকে আমরা যা শিখি—
ক. স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী কান্না করতে পারে:
আল্লাহর রাসূল ﷺ জা’ফার ও তার সাথিদের শাহাদাতের সংবাদ আসমাকে বলার পর তিনি যে শব্দ করে কেঁদেছেন, তার কান্না দেখে নবিজি বারণ করেননি, কাজটাকে অপছন্দও করেননি, এতে প্রমাণ হয় এটা নিষিদ্ধ হলে নবিজি অবশ্যই বারণ করতেন। তবে ইসলামে যে কান্নাকে নিষেধ করা হয়েছে তা হলো জাহিলি যুগের চিল্লাচিল্লি, মাতম করা, আল্লাহকে অভিযুক্ত করা, লাথি মারা, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ফায়সালা ও তাঁর পূর্ব নির্ধারণের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা নিশ্চয় বড় অবাধ্যতা।
খ. মৃতের পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করা মুস্তাহাব:
আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবিদেরকে জা’ফারের পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করতে বলেছেন। এটা এক দিক থেকে মৃতের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া, যেন শোকসন্তপ্ত পরিবারে খাবারের চিন্তা কিছুটা হলেও লাঘব হয় কিংবা শোকে উপোস থাকতে না হয়। আজ কিছু ইসলামি ভূখণ্ডে এই সুন্নাহর পরিপন্থি কাজ দেখা যায়। মৃতের পরিবারকে রান্না করে খাওয়ানোর পরিবর্তে উলটো আগতদের জন্য শোকাহত পরিবারকে রান্না করতে হয়। এরপর আবার দিন ধার্য করে পুরো পাড়া ঢোল পিটিয়ে খাওয়াতে হয়। এগুলো খুব নিন্দনীয় কাজ। মুসলিমদের উচিত এসব অন্যায্য কাজ পরিহার করে চলা।
আল্লাহর রাসূল ﷺ তিন দিন পর কাঁদতে নিষেধ করেছেন। তিন দিন পরেও আসমাকে কাঁদতে দেখে নবিজি তাকে বলেছেন, ‘আজকের পরে আমার ভাইয়ের জন্য আর কাঁদবে না। আর আমার ভাতিজাদেরকে ডাকো।’ ওদেরকে নবিজির সামনে আনা হলো। উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল ওদের। আল্লাহর রাসূল নরসুন্দর ডেকে ওদের মাথা মুণ্ডিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘মুহাম্মাদ হয়েছে আমার চাচা আবু তালিবের মতো, আর আবদুল্লাহ চরিত্রে আকৃতিতে হয়েছে আমার মতো।
এরপর আবদুল্লাহর ডানহাত ধরে তিনবার বললেন, 'হে আল্লাহ, জা'ফারের প্রতিনিধি তার পরিবারে দিয়ে দাও, আর আবদুল্লাহর সৎ বাণিজ্যে তুমি বারাকাহ দান করো।' এদের মা নবিজির কাছে দুর্বলতা ও আশ্রয়হীনতার কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, 'তুমি তাদের ক্ষেত্রে দারিদ্রতার ভয় পাচ্ছ; অথচ দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তাদের অভিভাবক।'
শহিদদের পরিবার ও সন্তানদের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে এমনই ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনের সুরভিত কর্মপন্থা। তিনি চেয়েছেন উম্মাহ যেন আজীবন তাঁর প্রদর্শিত পথ আঁকড়ে থাকে।
গ. আবু বাকরের সাথে আসমা বিনতে উমাইসের বিয়ে:
আসমা বিনতে উমাইসের ইদ্দত শেষ হলে আবু বাকর তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সহজেই তাদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। তাদের সংসারে জন্ম নিয়েছিলেন মুহাম্মাদ ইবনু আবি বাকর। আবু বাকরের মৃত্যুর পর আসমাকে বিয়ে করেছিলেন 'আলি। 'আলির ঔরশে তিনি কয়েকটি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন।
📄 পাঁচ. নেতৃত্বের গভীরতা
মৃতা যুদ্ধের কথা: আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা শহিদ হওয়ার পর সাবিত ইবনু আকরাম পতাকা তুলে নেন। সে মুহূর্তে এটাই ছিল তার আবশ্যকীয় কাজ। কেননা, পতাকার পতন মানে গোটা বাহিনীর পরাজয়। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি মুসলিমদের একজন আমীর নির্বাচন করতে বলেছেন। উপস্থিত সবাই তার পরামর্শ দিলে তিনি না করেন। এরপর মুজাহিদরা খালিদকে নির্বাচন করেন। সাবিত ইবনু আকরাম আমাদেরকে এখানে এক মহান শিক্ষায় ঋদ্ধ করেছেন।
আরেক বর্ণনায় আছে, সাবিত খালিদের কাছে পতাকা নিয়ে আসেন; কিন্তু তিনি বারণ করে বলেন, 'এটা আপনার কাছ থেকে আমি নিতে পারব না। কেননা, আপনিই এর সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।' সাবিত বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, এটা আমি আপনার জন্যই তুলে নিয়েছি।'
উভয় বর্ণনার বিষয় একটাই, তা হলো, সাবিত প্রথমে মুসলিমদেরকে একত্রিত করেছেন। মুসলিমরা বলেছিলেন, 'আপনিই আমাদের আমীর।' কিন্তু তিনি এটা গ্রহণ না করে খালিদ ইবনু ওয়ালিদকে নির্বাচন করেছেন। কেননা, তিনি আগে দেখেছেন, উপস্থিত মুজাহিদদের মধ্যে এই কাজে কে সবচেয়ে উপযুক্ত। এটাও হয়ে থাকে যে, উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে কাজ অর্পিত না হলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর কাজ যখন হয় আল্লাহর জন্য, তখন সেখানে প্রবৃত্তির কোনো দখল থাকে না।
আসলে সাবিত ইবনু আকরাম নেতৃত্বে অক্ষম ছিলেন না। অধিকন্তু তিনি ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ ও একজন মহান বদরি সাহাবি; কিন্তু তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেননি; বরং দেখেছেন কে বেশি উপযুক্ত, আবার নির্বাচনও করেছেন এমন ব্যক্তিকে, যার ইসলাম গ্রহণের বয়স এখনো তিন মাসের বেশি হয়নি। তবুও ইসলামে নবাগত এই খালিদকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, তার মূল লক্ষ্য যেমন ছিল আল্লাহর নির্দেশকে সম্ভাব্য সুন্দরতম পন্থায় কার্যকর করা। তেমনি খালিদ নতুন হলেও সেই জাহিলি যুগ থেকেই তিনি সামরিক অভিজ্ঞতায় প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন।