📄 দুই. মুসলিম বাহিনীর মাআনে অবতরণ, তিন সেনাপতির বীরত্বগাথা ও শাহাদাতবরণ
মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার মাআন নামক স্থানে পৌঁছে যায়। বর্তমানে এটি উর্দুনের সংরক্ষিত এলাকা। তারা এখানে এসে খবর পান, আরব-অনারব ক্রুশীয় খ্রিষ্টানরা যুদ্ধের জন্য ব্যাপক সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে। লাখাম, জুযাম, বাহরা ও বালি গোত্রের এক লাখ সৈন্য সমবেত হয়েছে, সেনাপতি নির্ধারণ করা হয়েছে মালিক বিন রাফিলাকে। এদের সাহায্যার্থে রোমের বাদশা আরও এক লাখ খ্রিষ্টান সৈন্য পাঠিয়েছে, ফলে শত্রুদের মোট সেনা সংখ্যা দাঁড়ায় দু লাখ। এরা ছিল পূর্ণ সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত, লৌহবর্ম ও শিরস্ত্রাণ পরিহিত।
মাআনে মুসলিম মুজাহিদরা দুদিন পর্যন্ত মাশওয়ারা করেন কীভাবে বিশাল সংখ্যার বাহিনীকে প্রতিহত করা যাবে। অনেকে বললেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে দূত পাঠিয়ে শত্রুদের সেনা সমাবেশ সম্পর্কে অবগত করব। তিনি চাইলে আমাদের জন্য সাহায্য পাঠাবেন, চাইলে আমাদেরকে এভাবেই যুদ্ধের নির্দেশ দিতে পারেন। বাহিনীর সেনাপতি যাইদ বিন হারিসাকে অনেকে বললেন, 'আপনি অনেক শহর পদানত করে সেখানকার অধিবাসীদের মাঝে ভীতি সঞ্চারিত করেছেন, এবার আপনি ফিরে চলুন, কেননা আমাদের জীবন নিরাপদ নয়।
কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা বললেন, 'মুজাহিদ সাথিরা, তোমরা যে শাহাদাতের জন্য বেরিয়েছ, এখন তা অপছন্দ করছ। আল্লাহর কসম, আমরা শত্রুদের সাথে সংখ্যা কিংবা শক্তির আধিক্য দিয়ে যুদ্ধ করি না। আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়ে সম্মানিত করেছেন, আমরা কেবল সেই সম্মানের প্রত্যাশায় জিহাদ করি। তোমরা সামনে অগ্রসর হও, যেকোনো একটি কল্যাণ আমাদের লাভ হবেই। বিজয়; নয়তো শাহাদাত।'
মুজাহিদদের অন্তরে ইবনু রাওয়াহার কথাগুলো বজ্রের মতো আঘাত হানে। যাইদ ইবনু হারিসা মুজাহিদদের নিয়ে মুতা প্রান্তরের দিকে ধাবিত হন। এখানেই রোমানদের সাথে সংঘর্ষ হয়। তুমুল যুদ্ধের মাঝে মুসলিমদের তিন সেনাপতিই প্রবল বীরত্বে লড়াই চালিয়ে শাহাদাতের মধ্য দিয়ে তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
যাইদ ইবনু হারিসা বহন করছিলেন আল্লাহর রাসূলের দেওয়া পতাকা। তিনি প্রচণ্ড বিক্রমে শত্রুব্যুহ ভেদ করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার তীব্রতা মুজাহিদের বর্শায় সাহসের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তার শাহাদাতের পর পতাকা হাতে তুলে নেন জা'ফার ইবনু আবি তালিব। নির্ভীকচিত্তে মুশরিকদের প্রতিরোধ ভেদ করে অগ্রসর হন। তার হাতে পতাকা দেখে এবার খ্রিষ্টানরা তাকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে। দেয়ালের মতো চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তাকে; কিন্তু তার সংকল্প ও অবিচলতায় বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন আসেনি। তিনি যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। অগ্রসরতার একপর্যায়ে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে তার গলা কেটে দেন। আবৃত্তি করে বলেন—
'এই তো জান্নাতের মোহন ছায়া, মনোহর লাগে অমীয় শীতল তার পানীয়।/ রোমানদের জীবনে ভয়াবহতা নামবে অচিরেই সৌভাগ্যের স্পর্শ থেকে তারা যে বহুদূরে/ আমার মুখোমুখি হলে ওদের আর রক্ষা নেই।
তিনি ডান হাতে পতাকা নিয়েছিলেন, সেটা কাটা পড়ায় বাম হাতে পতাকা ধারণ করেন। শত্রুরা তার বাম হাতটাও কেটে ফেললে দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরেন। শেষে শাহাদাত বরণ করেন তিনি। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৩৩ বছর। প্রচুর আঘাতে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন। তির বর্শা আর তরবারির ৯০টিরও বেশি আঘাত ছিল শরীরে। আশ্চর্য বিষয়! একটি আঘাতও পেছনে ছিল না, সবগুলো পড়েছিল বুকে—মাটির দেয়ালে।
ইমাম বুখারি বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন, 'মৃতার যুদ্ধে আমিও অংশী হয়েছিলাম। এক যুদ্ধ-বিরতিতে খুঁজছিলাম জা'ফারকে। শহিদদের মধ্যে তাকে খুঁজে পেলাম। দেখলাম তার দেহের সম্মুখভাগে ৯০টির অধিক বর্শা ও তরবারির ক্ষতচিহ্ন।'
আল্লাহ তাআলা জা'ফার ইবনু আবি তালিবকে যথার্থ বিনিময় দিয়েছেন, তার বীরত্ব ও আত্মত্যাগের মহিমাকে স্মরণীয় করে চির অম্লান সম্মানে ভূষিত করেছেন, জান্নাতে তাকে দিয়েছেন দুটি ডানা, তিনি যেখানে ইচ্ছা উড়তে পারছেন। বুখারি উল্লেখ করেছেন, আমির বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার প্রতিবার জা'ফারের ছেলেকে সম্বোধন করে বলতেন, 'ওহে দুই ডানা বিশিষ্টের ছেলে, আপনাকে সালাম।'
জা'ফারের শাহাদাতের পর পতাকা তুলে নেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আনসারি। এরপর অশ্বারোহণের সময় তিনি একটি উদ্দীপক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার এক ভাতিজা উল্লেখ করেছেন, 'দিনের শেষের দিকে ইবনু রাওয়াহার সামনে এক টুকরো গোশত পেশ করা হলো। তিনি টুকরোটা নিয়ে কেবল একটি কামড় বসিয়েছেন, এমন সময় যুদ্ধের শোর তার কানে এলো। তিনি টুকরোর কথা যেন একদম ভুলে গেলেন। নিজেকে সম্বোধন করে বলছিলেন—'তুই এখনো দুনিয়া নিয়ে আছিস?'
এটাই তার শেষ কথা। গোশতের টুকরোটা ফেলে দিয়ে শত্রু সারিতে ঢুকে পড়েন। বিরতিহীন লড়াই করে তিনি যখন শহিদ হয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানান, তখন দিনটাও আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছিল।
📄 তিন. খালিদ ইবনু ওয়ালিদকে সেনাপতি নির্বাচন
আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা শহিদ হওয়ার পর পতাকা ভূপাতিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে তা উঠিয়ে নেন সাবিত ইবনু আকরাম আনসারি। তিনি হাঁক ছেড়ে বলছিলেন, 'মুসলিম ভাইয়েরা, একজনকে আমীর নির্বাচন করো। পাশের সাহাবিরা বললেন, 'আপনি এ দায়িত্ব নিচ্ছেন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমি এমনটা করব না।'
মুসলিমরা খালিদ ইবনু ওয়ালিদের দিকে ইঙ্গিত করলেন। যুদ্ধের সংক্ষুব্ধতা ও তরবারির ঝনঝনানির মাঝেও সাবিত ইবনু আকরাম খালিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওহে আবু সুলাইমান, মুসলিমদের পতাকা গ্রহণ করুন।'
খালিদ একটু অবকাশ নিয়ে বললেন, 'এটা আপনিই গ্রহণ করুন, আপনিই এর উপযুক্ত। আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ; সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনি একজন বদরি সাহাবি।' সাবিত বললেন, 'ভাই আপনিই গ্রহণ করুন, আল্লাহর কসম, এটা আমি আপনার জন্যেই উঠিয়েছি।' অগত্যা খালিদ-কেই নিতে হলো সেনাপতিত্বের দায়িত্ব।
leadership গ্রহণের পর তিনি বিভিন্ন সম্ভাব্য দিক গভীরভাবে চিন্তা করেন। যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি পূর্ণরূপে নিরীখ করে দেখেন। পরিণতি তার কাছে স্পষ্ট হয়। তিনি নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করেন, বাহিনীর যারা আছে তাদের আপাতত পিছু হটা কৌশলগত দিক থেকে তুলনামূলক কম ক্ষতির এবং এটাই সর্বোত্তম সমাধান; নাহয় শত্রুদের কাছে মুসলিমদের শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। এখন তাই মুসলিম বাহিনীর সামনে কৌশলগত পশ্চাদপসরণ ছাড়া আর কোনো পন্থা বাকি নেই। এ লক্ষ্যেই খালিদ ইবনু ওয়ালিদ নিম্নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
ক. নিরাপদে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে আসতে রোমান ও মুসলিম বাহিনীর মাঝে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে।
খ. এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আবশ্যক হলো শত্রুকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে হবে। ওদের মনে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাতে হবে যে, মুসলিমদের সাহায্যে রিজার্ভে থাকা সৈন্যরা এসে যুক্ত হয়েছে। এতে ওদের মনে ভীতি সঞ্চারিত হবে। এই সুযোগে ময়দান থেকে সরে আসা যাবে।
রাত নামে। যুদ্ধ বিরতি চলে আসে। রাতের এই অন্ধকারে তিনি বাহিনীতে পরিবর্তন আনেন। ডানপাশের যোদ্ধাদের বামদিকে নিয়ে আসেন, আর বাম পাশের যোদ্ধাদের ডানপাশে। সামনের যোদ্ধাদেরকে পেছনে, পেছনের যোদ্ধাদেরকে সামনে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি যেন নতুন শক্তির বিস্ফোরণ ঘটান। এরপর ভোরের আলো ফুটতেই তিনি শত্রুদের ওপর তীব্র বেগে প্রবল শক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে আক্রমণ করে বসেন। যেন ওরা এ কথা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, মুসলিম বাহিনীতে বিপুল সেনাশক্তি যুক্ত হয়েছে।
পরিকল্পনা শতভাগ কাজে লাগে। ভোরের কোমল আলোয় শত্রুদের সামনে সম্পূর্ণ নতুন যোদ্ধাদের মুখ ও নতুন পতাকাধারী দৃশ্যত হয়। আগের দিনগুলোতে এদের কখনো দেখা যায়নি। মুসলিমরা দাঁড়িয়েছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে। ফলে ওরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে মুসলিমরা সাহায্য পেয়েছে, নতুন এক বাহিনী অবতীর্ণ হয়েছে যুদ্ধ ক্ষেত্রে। মুসলিমদের গৃহীত এই নিপুণ পরিকল্পনা রোমান ও তাদের মিত্রদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করে। ওরা উপলব্ধি করে, মুসলিমদের সাহায্যে আসা এই অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধাদের প্রতিরোধ করা অসম্ভব। ফলে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ে, অব্যাহতভাবে আক্রমণ চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। উদ্যম ও প্রতিরোধ-ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। চাপ কমে আসে মুসলিম বাহিনীর ওপর।
খালিদ ইবনু ওয়ালিদ এই সুযোগটাই কাজে লাগান। বাহিনী ফিরিয়ে আনার দিকে মনোযোগী হন। মৃতা যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে খালিদ কর্তৃক প্রত্যাবর্তনের জন্য গৃহীত যুদ্ধকৌশল ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে। বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার এই সংকল্প সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হয়। খালিদ প্রথমে সম্মুখের মূল বাহিনীর সাহায্যে দুই প্রান্তের সেনাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন। এরপর উভয় প্রান্তের সেনা বেষ্টনির সাহায্যে মূল বাহিনীকে বের করে আনেন। এভাবে গোটা বাহিনীকে তিনি সরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
ঐতিহাসিকগণ মুসলিম বাহিনীর ক্ষতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, 'এই যুদ্ধে মুসলিম শহিদদের সংখ্যা ১২-এর বেশি ছিল না। খালিদ বলেছেন, 'মৃতা যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তরবারি ভেঙে গেছে। শেষ পর্যন্ত হাতে ছিল শুধু একটি ইয়েমেনি লোহার পাত।'
এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, খালিদের দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে আল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে লাঞ্ছনাকর এক পরাজয় ও নিশ্চিত মৃত্যুকূপ থেকে রক্ষা করেছেন। নিশ্চয় বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া ছিল যুদ্ধের সৃষ্ট জটিলতায় সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। তার এই বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত উপমা হয়ে থাকবে।
📄 চার. আল্লাহর রাসূলের মু'জিযা
এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও আল্লাহর রাসূলের মু'জিযা প্রকাশিত হয়েছে। মাদীনার মুসলিমদেরকে তিনি যাইদ, জা'ফার ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার শাহাদাতের সংবাদ দিয়েছেন, তাদের খবর আসার আগেই। যুদ্ধ শুরুর পর তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছেন, চোখদুটি হয়েছে অশ্রুসজল। শেষে তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্ব গ্রহণের বিষয়ে অবহিত করেছেন। তার হাতে বিজয়ের সুবার্তা দিয়ে তার নাম রেখেছেন সাইফুল্লাহ—আল্লাহর তরবারি। পরে যখন যুদ্ধের সংবাদ আসে, তখন তা আল্লাহর রাসূলের সংবাদের সাথে হুবহু মিলে গেছে, বিন্দুমাত্রও কমবেশ হয়নি।
খালিদ-বাহিনী মাদীনার উপকণ্ঠে এলে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাক্ষাতের জন্য চলে আসেন। শিশুরা তাদের দিকে দৌড়ে এগিয়ে আসছিল। আল্লাহর রাসূল লোকদের সাথে আসছিলেন একটি বাহনে করে। তিনি বললেন, 'শিশুদেরকে নিয়ে বাহনে ওঠাও, আর আমাকে দাও জা'ফারের ছেলেকে।' আবদুল্লাহকে আনা হলে তিনি নিজ হাতে তাকে উঠিয়ে নেন। অন্যান্য লোকেরা বাহিনীর দিকে ধুলো ছিটিয়ে বলছিল, 'আরে, তোমরা কি আল্লাহর রাস্তা (জিহাদ) থেকে পালিয়ে এসেছ?' কিন্তু আল্লাহর রাসূল বলছিলেন, 'ওরা পালিয়ে আসেনি; বরং আল্লাহ চাহেন তো ওরা আবার ফিরে যাবে।'
ছোট শিশুদের সাথে আল্লাহর রাসূলের এই স্নেহের আচরণ মানুষকে মুগ্ধ করেছে। আবার দৃশ্যত হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ থেকে শহিদ না হয়ে ফিরে আসাকে তারা আল্লাহর রাস্তা থেকে পলায়ন হিসেবে দেখছেন। তাদের কাছে এর প্রতিদান হলো যোদ্ধাদের মুখে ধুলো ছিটানো।
আমাদের আজকের রাস্তার উদ্ভ্রান্ত যুবকেরা এই উচ্চ মনোবলসম্পন্ন প্রজন্মের কথা কি জানে? বর্তমান উম্মাহ আল্লাহর রাসূলের হাতে গড়া এই প্রজন্মের অনুসরণ ব্যতীত এমন উন্নত অভীষ্ট অর্জন করতে পারবে না।
📄 যা কিছু শিক্ষণীয়
ক. এ যুদ্ধের তাৎপর্য
আরব-অনারব খ্রিষ্টানদের সম্মিলত রোমানবাহিনী ও মুসলিমদের মাঝে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের মাঝে মুতার যুদ্ধ অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই দুই বাহিনীর মধ্যে এটাই প্রথম সংঘর্ষ। রোমান সাম্রাজ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে এই যুদ্ধ। বলতে পারি সিরিয়া বিজয় ও রোমানদের মাঝে কম্পন সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা ছিল এই যুদ্ধের। এই যুদ্ধ সেই কার্যকরি পরিকল্পনার ফল, যার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সিরিয়ান শহরগুলোর সাহায্যে পরাক্রমশালী রোম সাম্রাজ্যে নাড়া দিয়েছিলেন। আরবদের অন্তরে আল্লাহর রাসূলের ক্ষমতা ও প্রতাপ গ্রথিত হয়, মুসলিমদের মানসিক ভাবনায় শক্তিশালী পরিবর্তন আসে। অন্য দিকে ক্রুশীয় খ্রিষ্টানরা যুদ্ধক্ষেত্রে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি এই যুদ্ধ মুসলিমদেরকে সুযোগ দিয়েছে রোমানদের সামরিক শক্তি ও যুদ্ধনীতি পরখ করে দেখার।
খ. শাহাদাতের অদম্য আগ্রহ আত্মনিবেদনে অনুপ্রাণিত করে
অসীম ধৈর্য, অবিচলতা ও আত্মত্যাগের মহিমা সেনাপতি ও সেনাদের মাঝে দীপ্তিময় হয়েছিল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শাহাদাতের অতুচ্চ মর্যাদা ও মুজাহিদদের মহাপ্রতিদান লাভ করা। আল্লাহ যেন তাদেরকে নবি, সিদ্দীক, শুহাদা ও সালিহীনদের মিছিলে শামিল করে নিয়ে সম্মানিত করেন। প্রবেশ করান এমন এক জান্নাতে, যার উৎকৃষ্টতা দেখেনি কোনো চোখ, শোনেনি কোনো কান, ভাবতে পারেনি কোনো মানুষের হৃদয়।
গ. এই যুদ্ধটি কেন আলাদা মহিমায় উজ্জ্বল
এই একটি যুদ্ধ, যার সার্বক্ষণিক খবর আল্লাহর রাসূলের কাছে আসমান থেকে এসেছে। রণক্ষেত্র থেকে সংবাদ আসার আগেই আল্লাহর তিন শ্রেষ্ঠ বীরের শাহাদাতের সুবার্তা-সহ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তিনি সাহাবিদের শোনাচ্ছিলেন। যুদ্ধটি এদিক থেকেও আলাদা যে, শুধু এই অভিযানের জন্য নবিজি পর্যায়ক্রমে তিনজন সেনাপতি নির্ধারণ করেছিলেন—যাইদ বিন হারিসা, জা'ফার বিন আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা।