📘 রউফুর রহীম 📄 এক. কারণ ও ইতিহাস

📄 এক. কারণ ও ইতিহাস


মাদীনা কেন্দ্রিক ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরব-অনারব মুশরিক ও খ্রিষ্টানের বিভিন্নমুখী অপতৎপরতা মৃতায় অভিযান পরিচালনা অনিবার্য করে তুলেছিল। মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুদের চক্রান্তমূলক কার্যবিবরণী ছিল এমন—

শুরুর কথা:
সিরিয়ার আরব্য খ্রিষ্টানরা মুসলিম ও বাইজেনটাইনদের মধ্যে সংঘাত মজবুত করণে প্রলুব্ধ হয়। এদিকে মুসলিমদেরকে সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করতে দাওমাতুল জান্দালে বসতি স্থাপন করে কুদাআর বনু কালব গোত্র। দাওমাতুল জান্দাল হয়ে সিরিয়া থেকে মাদীনায় একান্ত প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য আমদানী হতো। এ পথের যাত্রী মুসলিম ব্যবসায়ী কাফেলাকে কষ্ট দিয়ে মাদীনায় কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট তৈরির চেষ্টা করছিল এই বনু কালব। কাজেই সময়ের দাবি অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল বনু কালবের বিরুদ্ধে দাওমাতুল জান্দালে অভিযান পরিচালনা করেন ৫ম হিজরি সনে; কিন্তু মুসলিম বাহিনী আসার আগেই ওরা সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।

📘 রউফুর রহীম 📄 হুদাইবিয়া সন্ধির পরের কথা

📄 হুদাইবিয়া সন্ধির পরের কথা


ষষ্ট হিজরি। ইসলামের বাণী নিয়ে দিহইয়া কালবি ওয়াদিয়ে কুরার দিকে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে হাসমা নামক স্থান দিয়ে অতিক্রম করার সময় বনু জুযাম ও লাখাম গোত্রের কিছু লোক ডাকাতি করে তার সবকিছু ছিনিয়ে নেয়। এ কারণে হাসমায় যাইদ বিন হারিসার অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এদিকে মাযহাজ ও কুদাআহ গোত্রদ্বয় যাইদ বিন হারিসার বিরুদ্ধে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। এরপর কিছু দিনের মধ্যে রোমান শাসনাধীন বাসরার গভর্নর আল্লাহর রাসূলের দূত হারিস বিন উমাইর আযদীকে হত্যার পর উল্লিখিত গোত্র দুটিও মুসলিমদের সাথে শত্রুতার পথ বেছে নেয়।

সে যুগেও রাষ্ট্রীয় দূত ও বার্তাবাহককে হত্যা করা ছিল জঘন্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও শুরাহবীল বিন আমর আল্লাহর রাসূলের দূতকে গলা কেটে হত্যা করে। এমনইভাবে দামেস্কের শাসক হারিস বিন আবি শামর গাসসানিও আল্লাহর রাসূলের দূতের সাথে দুর্ব্যবহার করে মাদীনার সাথে এক প্রকার যুদ্ধের ঘোষণা করে।

এরপর আরেকটি ঘটনা মুসলিমদের হৃদয়কে ভীষণভাবে আঘাত করে। আমর ইবনু কাআব গিফারির নেতৃত্বে আল্লাহর রাসূল ﷺ একটি অভিযান প্রেরণ করেন জা-তু ইতলা নামক স্থানে। উদ্দেশ্য এখানকার অধিবাসীদেরকে ইসলামের দিকে ডাকা; কিন্তু এখানে ঘটে যায় অপ্রীতিকর মর্মান্তিক ঘটনা। জনপদের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ তো করেইনি, উলটো দাওয়াতি এই সাহাবিদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। শুরু হয় যুদ্ধ। এখানে সবাই শহিদ হন। বেঁচে ফিরতে পারেন কেবল বাহিনীর আমীর আমর ইবনু কাআব গিফারি। তিনি ভীষণ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃতের মতো পড়ে ছিলেন। পরে অতি কষ্টে নিজেকে টেনে মাদীনায় এসে আল্লাহর রাসূলকে বিবরণ শোনান।

টিকাঃ
[৫১৮] তারিখে তবারি, ৩/১০৩; সীরাতে ইবনে হিশাম, ইবনু হাজারের আল ইসাবাহ

📘 রউফুর রহীম 📄 সিরিয়ার খ্রিষ্টানরাও বসে থাকেনি

📄 সিরিয়ার খ্রিষ্টানরাও বসে থাকেনি


মুসলিমদের বিরুদ্ধে রোমানদের প্রস্তুত হতে এরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এ লক্ষ্যেই মাআনের দায়িত্বশীল আমীর ইসলাম গ্রহণের পর ওরা তাকে হত্যা করে। এরই সূত্র ধরে সিরিয়ার ইসলাম গ্রহণকারী অন্যান্য গভর্নরকেও ওরা হত্যা করে।

টিকাঃ
[৫১৯] দেখুন, খাতামুন নাবিয়্যীন, ২/১১৩৯; 'আস সিরা' মাআ সালিবিয়্যীন এর সূত্রে, পৃ. ২০
[৫২০] দেখুন, 'আস সিরা' মাআ সালিবিয়্যীন এর সূত্রে, পৃ. ২০
[৫২১] দেখুন, 'আল মুসলিমুনা ওয়ার রুম ফি আহদিন নুবুওয়াহ' পৃ. ৮৯

📘 রউফুর রহীম 📄 বাজে যুদ্ধের দামামা

📄 বাজে যুদ্ধের দামামা


৮ম হিজরি। আল্লাহর রাসূল ﷺ মুসলিমদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাহাবিরা এই নববি ডাকে এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রবল আগ্রহে সাড়া দিয়ে একত্রিত হলেন যে, ইতঃপূর্বে আর এমনটি ঘটতে দেখা যায়নি। এই অভিযানের সেনা সংখ্যা পৌঁছে যায় তিন হাজারে। নেতৃত্বের জন্য আল্লাহর রাসূল তিনজনকে নির্বাচন করলেন। যাইদ ইবনু হারিসা, জা'ফার ইবনু আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে।

ইমাম বুখারি তার সাহীহ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল মৃতা অভিযানের জন্য যাইদ ইবনু হারিসাকে আমীর নির্ধারণ করে বলেন, যাইদ শহিদ হলে সেনাপতি নির্বাচিত হবে জা'ফার, সেও শহিদ হলে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা।'

মুসলিম বাহিনীকে বিদায় জানানোর আগে আল্লাহর রাসূল তাদেরকে নির্দেশ দেন, 'বাহিনী যেন সেই স্থানে গিয়ে অবস্থান নেয়, যেখানে হারিস বিন উমাইর আযদীকে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানকার অধিবাসীদের ইসলামের দিকে ডাকবে, এ ডাকে সাড়া দিলে তো ভালো কথা, আর অস্বীকার করলে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধ শুরু করবে।'

অন্যান্য অভিযানের অভিযাত্রীদের মতো এই বাহিনীকেও তিনি ইসলামি যুদ্ধের নীতিমালা বয়ান করে নৈতিক পাথেয়র যোগান দেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, 'আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তোমাদের সঙ্গী মুসলিমদের কল্যাণকামী হবে, যারা আল্লাহর সাথে কুফুরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে—আল্লাহর নামে। গাদ্দারি কিংবা প্রতারণা করবে না, নারী ও শিশুকে হত্যা করবে না, অতিশয় বৃদ্ধকেও না। উপাসনালয় ধ্বংস করবে না, খেজুর বাগানের নিকটবর্তীও হবে না, বৃক্ষ কাটবে না, জনপদ বিনাশ করবে না। তোমরা মুশরিক শত্রুদের মুখোমুখি হলে তাদেরকে প্রথমে তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটির দিকে আহ্বান করবে। ইসলাম মানতে বলবে, ইসলাম না মানলে জিযিয়া দিতে বলবে, জিযিয়া না দিলে যুদ্ধ করবে।'

মুসলিম বাহিনীর প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর মুসলিমরা ও আল্লাহর রাসূল তাদের বিদায় দিতে আসেন। সবাই হাত উঠিয়ে মিনতিভরা কণ্ঠে দুআ করছিলেন, আল্লাহ যেন মুসলিম ভাইদের সাহায্য করেন। তারা এই দুআ পড়ে বিদায় জানাচ্ছিলেন, 'আল্লাহ তোমাদেরকে রক্ষা করুন, ফিরিয়ে আনুন নিরাপদে সমৃদ্ধ করে।'

লোকজন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে যখন বিদায়ী সালাম জানায়, তখন তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন, বৃষ্টি-ফোঁটার মতো অশ্রু পড়ছিল টুপটুপ করে। অন্যান্য সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার ইবনু রাওয়াহা, তুমি এভাবে কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'পার্থিব জীবনের ভালোবাসা ও মোহের কারণে কাঁদছি না। আমি আল্লাহর রাসূলের মুখে শুনেছি, তাঁর পঠিত একটি কুরআনের আয়াতে জাহান্নামের আলোচনা এভাবে এসেছে, 'তোমাদের প্রত্যেককেই সেখানে উপনীত হতে হবে।' আমি জানি না, অতিক্রমের সময় আমার অন্তরের অবস্থা কেমন হবে?' সাহাবিরা আবার দুআ করে বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের সঙ্গী হোন, রক্ষা করুন, আমাদের কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে আনুন।'

আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা কবিতা আবৃত্তি করেন—
'কিন্তু আমি প্রভু রাহমানের কাছে মাগফিরাত চাই এবং শত্রুর একটি আঘাতে মুছে ফেলতে ফেনিল পাপ/ মৃত্যু অবধারিত হয় এমন একটি আঘাত যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিদীর্ণ হবে কলিজা ও বুকের কপাট।/ পথচারী যাবে, মোরে বলবে লক্ষ করে আল্লাহ তাকে উঠিয়েছেন সরল ঘাটের পারে।

আল্লাহর রাসূলও নিজে এগিয়ে এসে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে বিদায় জানান। ইবনু রাওয়াহা আবেগাপ্লুত হয়ে নবিজির ব্যাপারে বলেন—
'আপনার সুমহান দায়িত্বে আল্লাহ আপনাকে সুদৃঢ় রাখুন মূসার মতো, আপনি তেমন সাহায্যে আবৃত হন যেমন সাহায্য পেয়েছিলেন তিনি।/ আপনার মাঝে অপরিমেয় কল্যাণ দেখতে পাচ্ছি এ কল্যাণ লাভ করবে আপনার পরবর্তীরাও।/ আপনি আল্লাহর রাসূল, যে বঞ্চিত হবে আপনার কল্যাণ থেকে তার চেহারা হবে ধূলিমলিন, অপমানিত।

টিকাঃ
[৫২২] দেখুন, 'আস সিরা' মাআ সালিবিয়্যীন, পৃ. ২০
[৫২৩] বুখারি, ৪২৬১
[৫২৪] দেখুন, আস সীরাতুল হালবিয়্যাহ, ২/৭৮৭
[৫২৫] দেখুন, 'আস সিরা' মাআ সালিবিয়্যীন পৃ. ২১
[৫২৬] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৭৫৭-৭৫৮
[৫২৭] সীরাতে ইবনে হিশাম, ৪/২১
[৫২৮] দেখুন, উরওয়া ইবনু যুবাইর সংকলিত 'আল্লাহর রাসুলের মাগাযি, পৃ. ২০৪-২০৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px