📄 উমরাতুল কাযা
৭ম হিজরির জিলকদ মাস। কুরাইশের সাথে হুদাইবিয়া সন্ধির শর্ত অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল ﷺ উমরাতুল কাযা আদায়ের জন্য মাদীনা থেকে মাক্কার উদ্দেশে রওনা করেন। নারী ও শিশুরা ব্যতীত মুসলিমদের সংখ্যা ছিল দুই হাজার। খাইবারে শাহাদাত বরণ ও মৃত্যুবরণকারী সাহাবিরা ছাড়া হুদাইবিয়ায় অংশ নেওয়া কোনো সাহাবি উমরাতুল কাযা থেকে বিরত থাকেননি।
আল্লাহর রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম মাদীনা থেকে মাক্কা অভিমুখে রওনা করেন এক গাম্ভীর্যের আবহে জনপদ ও উত্তপ্ত মরুর বুকে কাঁপন তুলে। মাক্কা মাদীনার মধ্যবর্তী যেকোনো পথ দিয়ে অতিক্রমের সময় পার্শ্ববর্তী জনপদের অধিবাসীরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে এই অপার বিস্ময়ে অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখছিল। সকল সাহাবি ছিলেন ইহরামের শুভ্র পোশাকে আবৃত, উচ্চকিত আওয়াজে পাঠ করছিলেন তালবিয়া,
লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাক।'
দলে দলে তারা কুরবানির পশুগুলো হাঁকিয়ে নিচ্ছিলেন। ইতঃপূর্বে এমন মোহন দৃশ্য আর কারও দৃষ্টিগোচর হয়নি।
এক. কুরাইশি প্রতারণা থেকে সতর্ক অবস্থান
শুধু তরবারিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল। সম্ভাব্য সকল দুর্ঘটনা ও আকস্মিক হামলা প্রতিহত করতেই এই ব্যবস্থা। বিশেষত মুশরিকদের ওপর ভরসা রাখা যায় না, চুক্তি কিংবা অঙ্গীকার ভঙ্গে তাদের বেশ কুখ্যাতি রয়েছে।
আল্লাহর রাসূল সংঘবদ্ধ সাহাবিদের নিয়ে পথ চলছেন, সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র। উমরা অভিমুখী এই কাফেলার শুরুতে আছে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার নেতৃত্বে দুইশো সাহাবির অশ্বারোহী বাহিনী। এ খবর পেয়ে কুরাইশের লোকেরা একটি দলের সাথে মুকরিয বিন হাম্সকে আল্লাহর রাসূলের কাছে পাঠিয়ে দেয়। মাররুয যাহরানের বাতনে ইয়াজুজে এসে ওরা মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়। সরাসরি নবিজির কাছে এসে বলল, 'ইয়া মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, সামান্যতম প্রতারণার কথা আমরা আপনার ব্যাপারে জানি না। আপনার কওমের মাঝে হারাম সীমানায় এই অস্ত্র নিয়েই কি প্রবেশ করবেন? অথচ আমি শর্ত দিয়েছিলাম, প্রতিশ্রুতির বাইরে আপনি প্রবেশ করবেন না। শুধু তরবারি কোষবদ্ধ রেখে হারাম শরীফে ঢোকা যাবে।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা এভাবেই হারামে ঢুকব।' মুকরিয তার সাথিদের নিয়ে দ্রুত মাক্কায় ফিরে আসে। নেতাদের উদ্দেশ্যে বলে, 'মুহাম্মাদ সামগ্রিক অস্ত্র নিয়ে ঢুকবেন না এবং তিনি কৃত শর্তের ওপর বহাল আছেন।'
আল্লাহর রাসূল হারাম সীমানার খুব কাছে অস্ত্র রাখেন, এখানে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার নেতৃত্বে দুইশো সাহাবিকে রাখেন প্রহরায়। যেন তারা এখানে থেকে সবদিকে দৃষ্টি রেখে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে ও প্রয়োজনে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারেন।
নবিজি কুরাইশের মুশরিকদের গাদ্দারি ও খিয়ানাত থেকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদবোধ করতে পারছিলেন না। ওদের প্রবৃত্তি নিরস্ত্র মুসলিমদের ওপর হামলায় প্ররোচিত করতে পারে—এজন্যই আল্লাহর রাসূল নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন, সতর্ক অবস্থানে থেকেছেন, আবার কুরাইশকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করে উম্মাহকে শিক্ষা দিয়েছেন শত্রু থেকে যেন উদাসীন না হয়। সাহাবিদের একটি দলকে অস্ত্রের দায়িত্বে রেখে জানিয়েছেন, মুসলিমরা আসন্ন প্রতিটি পদক্ষেপে যেন গভীর দৃষ্টি রাখে, দীনের সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদাতের মর্ম বাস্তবায়নে যেন অনুপ্রাণিত হয়।
টিকাঃ
[২৪১] দেখুন, ইমাম নববীর আল মাজমু' গ্রন্থ; ৭/৭৮
[২৪২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৩৪
[২৪৩] দেখুন, 'নবীজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের বর্ণনা', ২/৪৯০,
[২৪৪] দেখুন নদভী রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৭৩
[২৪৫] দেখুন, মুহাম্মাদ কালআজি রচিত 'কিরাআতুন সিয়াসিয়্যাহ লিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২১৩, ২১৪
[২৪৬] দেখুন মারবিয়্যাতুল হুদাইবিয়্যাহ, পৃ. ৫৫
[২৪৭] দেখুন হাকামী রচিত মারবিয়্যাতু গাযওয়াতিল হুদাইবিয়্যাহ, পৃ. ৫৮, ৫৯
[২৪৮] দেখুন, ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৯৭৪
[২৪৯] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৩০৯
[২৫০] দেখুন, তারিখে তাবারি, ২/৬২২
[২৫১] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮৯
[২৫২] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮৯
[২৫৩] দেখুন, শাইখ আদনান নাহভী রচিত 'মালামিহুশ শূরা ফিদ দা'ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬০
[২৫৪] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৩৮
[২৫৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া, পৃ. ৩৯
[২৫৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৭৪
[২৫৭] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৮] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৯] ফাতহুল বারি, ৪/৭০৮
[২৬০] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৬১] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৩
[২৬২] ফাতহুল বারি, ৬/৬১
[২৬৩] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৭
[২৬৪] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৫
[২৬৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৫
[২৬৬] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪০
[২৬৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৬৭
[২৬৮] প্রাগুক্ত পৃ. ৬৮
[২৬৯] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১৩১, ১৩২
[২৭০] দেখুন ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৫৯৮
[২৭১] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১৪৫
[২৭২] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৮
[২৭৩] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১০৮
[২৭৪] ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৫] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১১১
[২৭৬] দেখুন, আবকারিয়্যাতু মুহাম্মাদ, পৃ. ৪৯
[২৭৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৩
[২৭৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৯] যাদুল মাআদ, ৩/ ২৯০ সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/ ৩৪৪
[২৮০] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪৪
[২৮১] যাদুল মাআদ, ৩/২৯০
[২৮২] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৫
[২৮৩] যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৮৪] তাফসিরে ইবনে কাসীর, ৪/ ১৯২
[২৮৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়াহ, পৃ. ৪৮৬
[২৮৬] প্রাগুক্ত,
[২৮৭] প্রাগুক্ত
[২৮৮] প্রাগুক্ত
[২৮৯] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৯০] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৪০৪
[২৯১] বুখারি, ৩৬৯৮, তিরমিযি, ৩৭০৬
[২৯২] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮২
[২৯৩] দেখুন, নাসির হাসান রচিত, 'আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ ফিস সাহাবা, ১/২০৫
[২৯৪] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ২১৪
[২৯৫] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ২১৬
[২৯৬] দেখুন, আত তারিখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারি, পৃ. ৩৩৯, ৩৪০
[২৯৭] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০২, ৬০৪, ৬০৫
[২৯৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬১০
[২৯৯] দেখুন, আল মুস্তাফাদ মিন কিসাসিল কুরআন লিদ দা’ওয়াহ ওয়াদ দুআ ২/৩৪২
[৩০০] দেখুন, মুহাম্মাদ আদদীক রচিত, আল মুআহাদাত ফিশ শারীআতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়াল কানুনিদ দাওলা' পৃ. ২৭০, ২৭১
[৩০১] প্রাগুক্ত
[৩০২] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩০৬
[৩০৩] প্রাগুক্ত
[৩০৪] দেখুন, মুহাম্মাদ আদদীক রচিত, আল মুআহাদাত ফিশ শারীআতিল ইসলামিয়্যাহ পৃ. ২৭২
[৩০৫] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ২৮০
[৩০৬] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ১৯৯-২০০
[৩০৭] দেখুন, আল মুআহাদাত ফিশ শারীআতিল ইসলামিয়্যাহ পৃ. ২৭৩
[৩০৮] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪৭
[৩০৯] সাদিক উরজুন রচিত মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, ৪/২৭৫
📄 যা-তুস সালাসিল অভিযান
মুসলিম বাহিনী মুতা থেকে ফিরে আসার মাত্র কয়েকদিন পরের কথা। যা-তুস সালাসিলে অভিযানের জন্য নবিজি আমর ইবনুল আ'সের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। উদ্দেশ্য কুদাআর লোকদের শায়েস্তা করা, যারা মুতা যুদ্ধে রোমান সৈন্যদের সাথে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এরা সমবেত হয়ে মূলত মাদীনার নিকটবর্তী হতে চাচ্ছিল।
আমর ইবনুল আ'স তিনশো মুহাজির ও আনসার সাহাবির একটি বাহিনী নিয়ে কুদাআহ জনপদের কাছাকাছি চলে আসেন। শত্রুদের সেনা সমাবেশের কাছে এসে জানতে পারেন, এরা প্রচুর সৈন্য সমবেত করেছে। ফলে তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। দ্রুততম সময়ে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর নেতৃত্বে তার সাহায্যে নতুন বাহিনী চলে আসে।
কাফিররা মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধ শুরু করে। আমর ইবনুল আ'স কুদাআর জনপদের একদম গভীরে প্রবেশ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পরাজিত মুখে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। সিরিয়া প্রান্তে আবার ইসলামের দাপট ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন আমর। মুসলিমদের মিত্র গোত্রগুলোর মাঝেও ফিরে আসে আগের মনোবল। অন্যান্য অনেক গোত্র মুসলিমদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে প্রবেশ করে, ইসলাম গ্রহণ করে বনু আব্বাস, বনু মুররা ও বনু যিবইয়ানের বহু সংখ্যক মানুষ। এমনইভাবে বনু ফাযারাহ ও তাদের গোত্রপতি উয়াইনাহ ইবনু হিস্স্স মুসলিমদের সাথে মৈত্রীচুক্তি সম্পন্ন করে। তার অনুসরণে আরও যুক্ত হয় বনু সালীম ও বনু আশজা। বনু সালীমের প্রধান ছিলেন আব্বাস ইবনু মিরদাস। এভাবে উত্তর আরবের শহরগুলোতে মুসলিম জাতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যদিও সবগুলো শহরে তখনো ইসলামি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যা কিছু শিক্ষণীয়:
১. আমর ইবনুল আ'সের ইখলাস বা একনিষ্ঠতা
আমর ইবনুল আ'স বলেন, 'আল্লাহর রাসূল আমার কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন, 'অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে আমার কাছে এসো।' আমি এসে দেখি তিনি ওযু করছেন। আমার আগমন টের পেয়ে তিনি চোখ তুলে তাকালেন। মৃদু হেসে বললেন, 'আমি তোমাকে একটি অভিযানে প্রেরণ করতে চাচ্ছি। তুমি নিরাপদ থাকবে, লাভ করবে গানীমাত। আর আল্লাহ তো তোমাকে সম্পদের বেশ আগ্রহও দিয়েছেন!'
আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি সম্পদের জন্য ইসলাম গ্রহণ করিনি, ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়েই আমি ইসলাম মেনে নিয়েছি। আমি চেয়েছি, যেন আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে থাকতে পারি।' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আমর, উপযুক্ত ব্যক্তি নির্ভেজাল সম্পদ পেলে এতে অসুবিধা নেই।'
এখানে আমরা আমর ইবনুল আ'স-এর সত্যনিষ্ঠ মজবুত ঈমান ও ইখলাসের পরিচয় পাই। তার স্পষ্টকথা—তার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল ইসলাম ও আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্য লাভ। ওদিকে আল্লাহর রাসূলও তাকে স্পষ্ট করে বলেছেন, 'হালাল সম্পদ নিয়ামাত, যখন তা উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে চলে আসে। কেননা, উপযুক্ত ব্যক্তি এই সম্পদ দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টির ইচ্ছা করে, ব্যয় করে কল্যাণের পথে এবং প্রয়োজন পূরণ করে নিজের ও পরিবারের।'
২. একতাই বল
বিবৃত হয়েছে, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর নেতৃত্বে আমর ইবনুল আ'সের সাহায্যে নবিজি একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সালাতের সময় হলে আবু উবাইদা আগ বাড়িয়ে আমরের ইমামতি করতে চান। আমর তাকে বাধা দিয়ে বলেন, 'তুমি এসেছ আমার সাহায্যে, কাজেই তুমি এখানে ইমামতি করতে পারো না। আমিই এই বাহিনীর আমীর, আল্লাহর রাসূল তোমাকে আমার সাহায্যে পাঠিয়েছেন।'
মুহাজির সাহাবিরা বললেন, 'না, এমনটা নয়। আপনি আপনার সাথিদের আমীর, আর তিনি তার সাথিদের আমীর।' আমর বললেন, 'উঁহু, তোমরা বরং আমার সাহায্যে এসেছ।'
আবু উবাইদা ছিলেন বিচক্ষণ—নরম স্বভাবের মানুষ। তিনি দেখলেন এখানে মতভেদ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই তিনি আমরকে বললেন, 'আমর নিশ্চিন্ত থাকো, মনে রেখো, আল্লাহর রাসূল আমার কাছ থেকে সর্বশেষ যে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন তা হলো, তিনি বলেছেন, 'তোমার সাথির সাথে গিয়ে মিলিত হলে একে-অপরের কথা মেনে নেবে, অনৈক্য সৃষ্টি করবে না।' আল্লাহর কসম, তুমি আমার কথা না মানলেও আমি তোমার আনুগত্য করব।' এরপর আমর ইবনুল আ'স সাহাবিদের নিয়ে সালাত আদায় করেন।
আবু উবাইদা খেয়াল করেছেন, এই যা-তুস সালাসিল অভিযানে মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি হলে তা ব্যর্থতা টেনে আনবে, শত্রুরা বিজয়ী হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুততম সময়ে তিনি অনৈক্যের মূল উপড়ে ফেলে, নমনীয় হয়ে নিজেকে আমর ইবনুল আ'সের নেতৃত্বে সঁপে দিয়েছেন, আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ পালনার্থে দ্বিমত করেননি।
৩. শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে আমর ইবনুল আ'সের পরিকল্পনা
এই অভিযানে মুসলিম বাহিনীর মাঝে ঐক্য বজায় রাখা ও শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে আমর-এর সামরিক প্রতিভার প্রতিফলন ঘটেছে। কয়েকভাবে প্রোজ্জ্বল হয়েছে তার পরিকল্পনা।
ক. তিনি রাতের আঁধারে চলতেন, দিনের আলোতে আত্মগোপন করে থাকতেন। তিনি তার বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন, নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছবার আগেই হয়তো শত্রুরা মুসলিমদের খবর জেনে ফেলতে পারে, যদ্দরুণ তারা দ্রুত প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে। তাই তার কাছে সংগত মনে হয়েছে রাতের বেলা ভ্রমণ করে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা। এভাবে শক্তি অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দুটি জিনিস বাস্তবায়িত হয়েছে।
- শত্রুদের কাছে তাদের আগমন গোপন থেকেছে, ফলে শক্তিতে ফাটল সৃষ্টি হয়নি।
- গরমের তীব্রতা থেকে বাহিনীকে রক্ষার ফলে তাদের উদ্যম অমলীন ছিল, ফলে শত্রুর মুখোমুখি হয়েও তারা ছিলেন পূর্ণ শক্তিতে বলীয়ান।
খ. তিনি আগুন জ্বালাতে দেননি। বিশেষ প্রয়োজনে মুসলিম বাহিনীর অনেকেই আমরের কাছে আগুন জ্বালানোর অনুমতি চাইলে তিনি বারণ করেন। তার গভীর সামরিক চিন্তা এ কাজে বাধা দিয়েছে। তিনি আশঙ্কা করেছেন—এতে কল্যাণের চেয়ে অনিষ্টই বেশি হতে পারে। আলো ছড়িয়ে পড়লে মুসলিমদের স্বল্পতা শত্রুরা টের পেত, ফলে পরিকল্পনার আগেই তারা আক্রমণ করে বসতে পারে।
এই গভীর চিন্তা তার মনে প্রোথিত হয়েছিল। এমনকি আবু বাকরও যখন এ প্রসঙ্গে কথা বলেন, তখন তিনি বলেছেন, 'বাহিনীর যে কেউ আগুন জ্বালালে আমি তা নিভিয়ে ফেলব।'
মাদীনায় ফিরে আসার পর আল্লাহর রাসূলের কাছে এ আলোচনা উত্থাপন করা হয়। আল্লাহর রাসূল এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি তাদেরকে আগুন জ্বালাতে নিষেধ করেছি; কারণ, আমাদের আগুন দেখলে আমাদের সৈন্য-স্বল্পতা শত্রুরা টের পেত।' আল্লাহর রাসূল ﷺ তার এ কাজ সমর্থন করেন।
গ. পিছু ধাওয়াতে বাধা দেওয়া। মুসলিমরা শত্রুদেরকে পরাজিত করার পর অবশিষ্টদেরও পিছু ধাওয়া করতে চান; কিন্তু বাহিনীর প্রধান তাদেরকে এ কাজে বাধা দেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বৃহৎ অনিষ্ট থেকে সবাইকে রক্ষা করা। কেননা, মুসলিম বাহিনী বিপদের আবর্তেও পড়তে পারত। আমর ইবনুল আ'সের এই দূরদর্শী চিন্তা আল্লাহর রাসূলের মনঃপূত হয়েছে। নবিজির প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, 'আমি তাদের পিছু ধাওয়া করা অপছন্দ করেছি, হতে পারত, পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে তারা সাহায্য পেত! আর আমরা সম্মুখীন হতাম নতুন বিপদের। আল্লাহর রাসূল তার প্রাজ্ঞচিত সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। কেননা, এতে বাস্তবায়িত হয়েছে বাহিনীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা।
৪. আমর ইবনুল আ'সের ফিকহি উদ্ভাবন
আমর ইবনুল আ'স বলেন, 'যা-তুস সালাসিল যুদ্ধের এক শীতার্ত রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার ভয় হলো, এই কনকনে শীতে গোসল করলে মারাই যাব। তাই তায়াম্মুম করে সাহাবিদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করি। মাদীনায় ফিরে আমার নামে নবিজির কাছে নালিশ করা হয়। নবিজি আমাকে বললেন, 'কী ব্যাপার আমর? তুমি সাথিদের নিয়ে জুনুবি (নাপাক) অবস্থায় নামাজ পড়েছ!' আমি গোসল না করার কারণ উল্লেখ করে বললাম, 'আর আমি আল্লাহর একথাও শুনেছি, 'তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহশীল।' আমার কথা শেষে আল্লাহর রাসূল শুধু হাসলেন, কিছু বললেন না।'
এই গল্প থেকে কিছু বিধান উদ্ভাবিত হয়:
ক. পানি থাকলেও জুনুবি ব্যক্তির জন্য তায়াম্মুম গোসলের কাজ দেবে, যদি সে পানি ব্যবহার তার জন্য ক্ষতির কারণ মনে করে। আমর ইবনুল আ'স পানি থাকা সত্ত্বেও তায়াম্মুম করেছেন, সাথিদের নিয়ে সালাত আদায় করেছেন। আর নবিজিও তার কাজ সমর্থন করেছেন।
খ. আল্লাহর রাসূলের যুগেও ইজতিহাদ জায়েয ছিল। আমর ইবনুল আ'স যে রাতে অপবিত্র হয়েছিলেন, সে ভোরে গোসলের পরিবর্তে ইজতিহাদ করে তায়াম্মুম করে সাথিদের নিয়ে সালাত আদায় করেছেন। তার ইজতিহাদের ভিত্তি ছিল এই আয়াত, 'তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহশীল'। (সূরা নিসা: ২৯) আল্লাহর রাসূল তার ইজতিহাদ অস্বীকার করেননি; বরং তিনি দুটি বিষয়ের সমর্থন করেছেন। এক, ইজতিহাদের বৈধতা। দুই, ইজতিহাদের শুদ্ধতা।
গ. তায়াম্মুমের একটি বৈধ কারণ হলো পানি ব্যবহারে অক্ষম হওয়া—যদিও পানি থাকে, যেমন: পানি যদি প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়।
ঘ. তায়াম্মুমকারী ব্যক্তি ওযুকারীদের ইমাম হতে পারবে। আমর ইবনুল আ'স তায়াম্মুম করে ইমামতি করেছেন—পাঁচশো সাহাবির। তারা সবাই ওযু করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল এটাও সমর্থন করেছেন।
ঙ. আমর ইবনুল আ'সের ইজতিহাদ তার ফিকহি যোগ্যতা ও বুদ্ধির পূর্ণতা এবং দলিল থেকে বিধান উদ্ভাবনে সূক্ষ্মদৃষ্টির পরিচয় বহন করে। অধিকন্তু, আমরা সীরাহ থেকে যা লাভ করি তা হলো, আমর দ্রুততম সময়ে কুরআনের আয়াত সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, এমনকি বিধানও নিরূপণ করেছেন, অথচ তার ইসলাম গ্রহণের বয়স তখন মাত্র চার মাস।
৫. উত্তর আরবে অভিযান প্রেরণের ফলাফল
হুদাইবিয়া সন্ধির পরপরই মুসলিম সামরিক বাহিনী উত্তর আরব অভিযানে মনোযোগী হয়। আরব উপদ্বীপের পশ্চিমেও অভিযান পরিচালিত হয়েছে। প্রসারিত হয়েছে মুসলিমদের দাপট। শুধু মাক্কা মুকাররামা সন্ধির ছায়ায় নিরাপদ ছিল। আল্লাহর রাসূলের প্রেরিত অভিযানের ফলে অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে আরব উপদ্বীপের উত্তর প্রদেশে। মুসলিম সেনাবাহিনী পৌঁছে গেছে রোমান সাম্রাজ্যের সীমানায়। এভাবে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা নিরাপদ হয়েছে, প্রসারিত হয়েছে প্রতাপ, দূর হয়েছে মাদীনায় গুপ্ত হামলার আশঙ্কা।
আল্লাহর বাহিনীর সকল সেনাকে আমরা স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায়। যারা অর্জন করেছিলেন উন্নত চরিত্র, চিন্তাশীলতা, সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সূক্ষ্ম দর্শন। সামনে হুদাইবিয়ার আলোচনায় আমরা ইতিহাসের স্রোতে ভেসে ভেসে মিশে যাব তাদের নির্মল জীবন প্রবাহে।
টিকাঃ
[৫২৯] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৭/১৩০
[৫৩০] দেখুন, উরওয়া ইবনু যুবাইর সংকলিত 'আল্লাহর রাসূলের মাগাযি, পৃ. ২০৭
[৫৩১] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ২০৯
[৫৩২] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৫০৯
[৫৩৩] প্রাগুক্ত
[৫৩৪] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৫৪০
[৫৩৫] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৫০৯
[৫৩৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ২১০
[৫৩৭] সালিহ আহমাদ শামি, 'মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ' পৃ. ৩৮১
[৫৩৮] 'মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৮১
[৫৩৯] আল মুজতামাউল মুদনা পৃ. ১৭০
[৫৪০] ড, আব্দুল লতীফ হামযা রচিত, 'আল ই'লাম ফি সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৭৩
[৫৪১] দেখুন, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি, পৃ. ৩৩৭
[২৪০] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ১৮৯-১৯২