📘 রউফুর রহীম 📄 দশ. খাইবার অভিযান সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধিবিধান

📄 দশ. খাইবার অভিযান সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধিবিধান


১. গৃহপালিত গাধার গোশত হারামের বিধান
খাইবার যুদ্ধের সময় রাসূল ﷺ ও ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।'

২. গর্ভবতী বন্দিনীর সাথে সহবাস হারাম
খাইবার প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসে ঈমান রাখে, সে যেন তার পানি অন্যের ক্ষেতে সিঞ্চন না করে।'

৩. গর্ভবতী নয় এমন দাসী লাভ করলে ঋতুস্রাবের আগে তার সাথে সহবাস হারাম করা হয়
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য হালাল নয় রেহেম-মুক্ততার আগে বন্দিনী নারীর সাথে সহবাস করা।'
রেহেম-মুক্ততা স্পষ্ট হবে শুধু এক হায়েজ থেকে পবিত্র হলেই। এ মহিলার জন্য ইদ্দত আবশ্যক নয়। যদিও সে কাফির স্বামীর স্ত্রী ছিল, চাই সে মারা যাক কিংবা না যাক। কেননা, ইদ্দত হলো মৃত স্বামীর জন্য শোক পালন, আর কাফিরের ক্ষেত্রে এর কোনো বিধান নেই।

৪. অবশিষ্ট সুদও হারাম করা হয়
আবু সাঈদ খুদরি ও আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহর রাসূল এক ব্যক্তিকে খাইবারে কাজে নিযুক্ত করেন। তিনি একবার নবিজির কাছে উন্নতমানের খেজুর নিয়ে আসেন। নবিজি বললেন, 'খাইবারের সব খেজুরই কি এমন?' সাহাবি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সব খেজুর এমন নয়। অন্য খেজুর দুই কিংবা তিন সেরের বিনিময়ে আমরা এই খেজুর একসের নিয়ে থাকি।' নবিজি বললেন, এমন আর করবে না। অন্য জাতের সব খেজুর আগে দিরহামের বিনিময়ে বেচে দেবে। তারপর সেই দিরহাম দিয়ে এমন উন্নত জাতের খেজুর কিনবে।'
একই শ্রেণির বস্তু কমবেশি করে লেনদেন করাকে বলে 'রিবাল ফাদলি।' যেমন—এক সের খেজুর কিনল দুই সেরের বিনিময়ে। এখানে অতিরিক্ত যা দেওয়া হচ্ছে, সেটাই সুদ। বিবৃত বর্ণনা অনুযায়ী এটা হারাম। কেননা, নবিজি এ থেকে নিষেধ করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন, 'অধিকারে থাকা খেজুর বিক্রি করে দিয়ে এর মূল্য দিয়ে যেন অন্য খেজুর ক্রয় করে।

৫. স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, খাঁটি রূপার বিনিময়ে রূপা বেচাকেনা হারাম
উবাদা ইবনু সামিত বলেন, 'খাইবার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নিষেধ করেছেন, আমরা যেন খাঁটি সোনার বিনিময়ে সোনা বেচাকেনা না করি। এমনিভাবে রুপার বিনিময়ে রুপা। নবিজি বলেছেন, 'তোমরা রুপার বিনিময়ে সোনা, কিংবা খাঁটি সোনার বিনিময়ে রুপা বেচাকেনা করতে পারো।'
এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রুপার বিনিময়ে রুপা বেচাকেনা করতে চাইলে নিরেট সমান সমান হতে হবে। কোনো প্রকার কমবেশি হওয়া যাবে না; কিন্তু যখন সোনারুপার মাঝে বেচাকেনা হবে, তখন একই ধরনের ও সমপরিমাণ হওয়া শর্ত থাকবে না। (কারণ, সোনারুপা দুটি আলাদা দুই জিনিস।)'

৬. পারস্পরিক চুক্তিতে চাষাবাদ বৈধ হওয়া
আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবারের ভূমি ইয়াহুদিদের দায়িত্বে এই শর্তে দেন যে, তারা এখানে কাজ করবে, চাষ করবে; আর উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক তারা পাবে।'
কয়েকজন গবেষক এই প্রশ্ন করে বসেছেন যে, ব্যবসার এই বিধান কেন শরিআতসিদ্ধ হলো, আর এতে হিকমতই-বা কী?
শাইখ মুহাম্মাদ আবু যুহরা এর উত্তরে বলেন, 'সম্পদ বিনিময়ের প্রচলনের ক্ষেত্রে খাইবার বিজয় ছিল সম্পূর্ণ নতুন বিজয়। সংগত কারণেই পারস্পরিক চাষাবাদের শরিআতসিদ্ধতা কাম্য ছিল। যা ইয়াসরিবে ইতঃপূর্বে ছিল না।

৭. ঘোড়ার গোশত খাওয়া হালাল হওয়া
জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবার যুদ্ধে গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম করার পর ঘোড়ার গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে অবকাশ রাখেন।'

৮. মুতআ বিবাহ হারাম হওয়া
'আলি ইবনু আবি তালিব বলেন, 'খাইবার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নারীদের সাথে মুতআ বিয়ে ও গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

৯. খাইবার যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ
উমাইয়া বিনতু আবিস সাল্‌ত বনু গিফার গোত্রের এক নারী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'বনু গিফারের কিছু নারীর সাথে আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে দেখা করতে এলাম। সঙ্গিনী নারীরা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সাধ্যমতো মুসলিমদের সাহায্য ও আঘাতপ্রাপ্তদের সেবা করার জন্য আপনার এই সফরে অংশী হতে চাচ্ছি।' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আল্লাহ বারাকাহ দান করুন, তোমরা যোগ দিতে পারো।'

আমরা নবিজির সাথে সফরে বের হলাম। খাইবারের পথে ঊষালগ্নে আল্লাহর রাসূল এক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন। আমি বাহন থেকে নামার পর নিচের কাপড়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখতে পেলাম। বিচলিত হইনি। বুঝতে পেরেছি এ আমার ঋতুস্রাবের রক্ত এবং জীবনে এই প্রথম। আমি উটের সাথে মিশে থাকছিলাম। ভীষণ সংকুচিত লাগছিল আমাকে। আল্লাহর রাসূল আমার আড়ষ্টভাব ও কাপড়ে রক্তের দাগ দেখে বললেন, 'কী ব্যাপার, মনে হয় ঋতুস্রাব এসেছে?' বললাম, 'জি।'

নবিজি বললেন, 'দেখো নিজেকে স্বাভাবিক রেখে একটা কাজ করো। একপাত্র পানি নিয়ে তাতে কিছু লবণ দাও। তারপর এই পানি দিয়ে স্রাবের রক্ত ধুয়ে ফেলে বাহনে ফিরে যাও।' এরপর দাপুটে সময় কাটে মুসলিমদের। আল্লাহ তাআলা খাইবারে বিজয় দান করেন। নবিজি আমাদের জন্য ফাই-এর একটি অংশ নির্ধারিত রাখেন। তিনি সেখান থেকে একটি মালা নিয়ে নিজ হাতে আমার গলায় পরিয়ে দেন। এখনো তা শোভা পাচ্ছে আমার গলায়। আল্লাহর কসম, আমি এটিকে কখনো আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করিনি।'

এই মালা গলায় নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি অসিয়ত করেছিলেন, এই মালা-সহই তাকে যেন সমাধিত করা হয়। জীবনে একটি অভ্যস্ততায় তিনি এগিয়েছেন। (রাসূলের শেখানো পন্থায়) লবণ ব্যবহার না করলে তিনি ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হতেন না। মৃত্যুর আগে তিনি এও অসিয়ত করেছিলেন, তার গোসলের পানিতেও যেন লবণ দেওয়া হয়।'

মুসলিমদের সাথে জিহাদে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক তরুণীর সামনে এ এক চির জীবন্ত দৃষ্টান্ত। আল্লাহর রাসূলের জীবনজুড়ে এভাবে ছিল উম্মাহর জন্য অবারিত শিক্ষার সম্ভার, জীবনের নিরাপত্তায় ও যুদ্ধের সংক্ষুব্ধতায়। তিনি ছিলেন স্পষ্ট বিশ্বাসে উদ্ভাসিত, দাসত্বের মহিমায় উজ্জ্বল, যেন তিনিও অংশী হয়েছিলেন প্রত্যেকের জীবনে।'

টিকাঃ
[৪৪২] দেখুন, যাদুল মাআদ, ১২২-১২৩। বুখারি, ৪২১৮; মুসলিম, ৫৬১
[৪৪৩] আবু দাউদ, ২১৫৮; তিরমিযি, ১১৩১; তাবাকাত, ২/১১৩
[৪৪৪] আহমাদ, ৪/১০৮; আবু দাউদ, ২১৫৮
[৪৪৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১৩৪
[৪৪৬] প্রাগুক্ত
[৪৪৭] দেখুন, সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ৩২১
[৪৪৮] দেখুন, খাতামুন নাবিয়্যীন, ২/১১০৪
[৪৪৯] বুখারি, ৫৫২৩; মুসলিম, ১৯৪১
[৪৫০] বুখারি, ৫৫২৩; মুসলিম, ১৪০৭
[৪৫১] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/২০৫
[৪৫২] আহমাদ, ৬/৩৮০; বাইহাকি ফিল কুবরা, ২/৪০৭; ইবনু সাআদ, ৮/২১৪
[৪৫৩] দেখুন, গাযবান রচিত ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৫৩৪

📘 রউফুর রহীম 📄 রাজাবাদশাদের কাছে চিঠি প্রেরণ

📄 রাজাবাদশাদের কাছে চিঠি প্রেরণ


এক. হুদাইবিয়া সন্ধির ফলে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ
আল্লাহর রাসূল কুরাইশের সাথে হুদাইবিয়ায় শান্তিচুক্তি স্থাপন করেন। এরপর সময়ের দাবি অনুযায়ী হিজাজের উত্তরে খাইবারে বসবাসরত ইয়াহুদিদের দমন ও ওয়াদিয়ে কুরা, তাইমা-সহ ফাদাক অঞ্চলের জনপদগুলোকে ইসলামের নেতৃত্বাধীন করে নেন। সময়োপযোগী এই পদক্ষেপগুলোর পর ইসলামের সামনে আরব উপদ্বীপের সর্বপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার অবারিত সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হয়। আসলে শুধু আরব উপদ্বীপই নয়; বরং এর সীমানা ছাড়িয়ে রোম-পারস্যের সীমানায় পৌঁছে যায় ইসলামের আহ্বান।

হিজাজের সীমানা ও আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের বিস্তৃতিে আল্লাহর রাসূল চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করেননি। বিভিন্ন রাজাবাদশার কাছে বেশ কয়েকজন দূত পাঠিয়ে নবিজি এই পরিকল্পনা কাজে পরিণত করার দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইসলাম ও আরব ইতিহাসে এটিকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা, এর মাধ্যমে নবিজি গোটা আরব উপদ্বীপকে ইসলামের এক পতাকার নিয়ন্ত্রণে এনেছেন।

বিভিন্ন মিত্রগোত্র ও রাজাবাদশার কাছে দাওয়াতের এই নববি পন্থা আমাদের সামনে মাধ্যম গ্রহণের আবশ্যকীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। আমরা দেখি গোত্রসমূহের আমীর ও বাদশাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত প্রেরণে আল্লাহর রাসূল ﷺ এক অভিনব পন্থা নির্বাচন করেছেন। সেটা হলো ইসলামের দা'ওয়াহ সংবলিত চিঠি প্রেরণ। এই পন্থা অবলম্বনের ফলে অনেকের ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামের প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশে যথেষ্ট প্রভাব দৃশ্যত হয়েছে। আবার এই দা'ওয়ার উদ্যোগের পরেই ইসলামের দাওয়াহ ও ইসলামি রাষ্ট্র মাদীনার ক্ষেত্রে অনেকের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। নববি এই পন্থা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, সামরিক যে ফলাফল প্রকাশমান হয়েছে, পর্যায়ক্রমে আমরা তা তুলে ধরবার প্রয়াস পাব। এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিঠি প্রেরণের ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করছি।

১. দিহইয়া কালবিকে দূত নির্ধারণ করে আল্লাহর রাসূল রোমের বাদশা হিরাকলের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। হুদাইবিয়া শান্তিচুক্তি চলাকালীন ঘটনা এটি। প্রেরিত চিঠির বিবরণ ছিল নিম্নরূপ—
'পরম করুণাময় অতি দায়লু আল্লাহর নামে শুরু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের বাদশা হিরাকলের প্রতি। হিদায়াতের অনুসারী ব্যক্তির প্রতি সালাম। পর কথা, আমি তোমাকে ইসলামের দিকে ডাকছি। ইসলাম গ্রহণ করো, নিরাপত্তা লাভ করবে। তুমি ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর মুখ ফিরিয়ে নিলে প্রজাদের গুনাহের ভার তোমার ওপর বর্তাবে। 'বলুন, 'হে আহলে কিতাবগণ, একটি বিষয়ের দিকে এসো—যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান—যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করব না, তাঁর সাথে কোনো শরিক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তা হলে বলে দাও যে, সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।' (সূরা ইমরান: ৬৪)

হিরাকল আল্লাহর রাসূলের চিঠি গ্রহণ করে সূক্ষ্মভাবে ভেবে দেখেন। একটি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ হাদীসে হিরাকল ও আবু সুফিয়ানের মধ্যকার পারস্পরিক আলোচনা বিবৃত হয়েছে। শেষে তিনি আবু সুফিয়ানকে বলেন, 'তোমার বর্ণনা সত্য হলে তিনি একজন প্রেরিত নবি। আমি জানতাম তিনি আসবেন; কিন্তু এটা ধারণা করিনি যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে হবেন। আমি যদি জানতাম আমি তাঁর কাছে যেতে পারব, তা হলে তাঁর সাক্ষাৎ আমার জন্য সৌভাগ্যের হতো। আমি তাঁর কাছে থাকলে তাঁর পদযুগল ধুয়ে দিতাম।'

২. আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা সাহমি-কে দূত বানিয়ে আল্লাহর রাসূল পারস্যের বাদশা কিসরার কাছে চিঠি পাঠান। বাহরাইনের গভর্নরের কাছে এই চিঠি হস্তান্তর করতে বলেছিলেন। বাহরাইনের গভর্নর কিসরার কাছে তা পৌঁছে দেয়। কিসরা চিঠি পাঠ করে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। আল্লাহর রাসূল এ খবর জানতে পেরে বদ-দুআ করেন, আল্লাহ যেন তার দেশকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেন। তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী কিসরাকে দেওয়া চিঠির ভাষ্য ছিল এমন—
‘পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের বাদশা কিসরার প্রতি। সালাম তাদের প্রতি যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহা নেই এবং আমি সকল মানুষের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রাসূল, যেন আমি জীবিতদেরকে সতর্ক করতে পারি। ইসলাম মেনে নাও, নিরাপত্তা পাবে, অস্বীকার করলে অগ্নিপূজকদের পাপের ভার তোমায় বহন করতে হবে।'

৩. আল্লাহর রাসূল বাদশা নাজ্জাশির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন আমর বিন উমাইয়া দামরিকে দূত বানিয়ে। নবিজি সে চিঠিতে লিখেছিলেন,
'পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাবাশার বাদশা নাজ্জাশির প্রতি। ইসলাম গ্রহণ করো। আমি তোমার কাছে সেই আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহা নেই। তিনি মহাবিশ্বের অধিপতি, অতি পবিত্র, শান্তিদাতা, বিশ্বাসী ও মহামহিম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি ঈসা ইবনু মারইয়াম আল্লাহর দেওয়া রূহ, তার সেই কালিমা, যা তিনি পবিত্র নারী মারইয়ামের গর্ভে প্রেরণ করেছেন। এ থেকেই তিনি ঈসাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, ফলে তিনি সৃষ্ট হয়েছেন তার রূহ ও ফুঁকের সাহায্যে, যেমন আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন নিজ হাতে। আমি তোমাকে সেই আল্লাহর দিকে ডাকছি যিনি এক, যাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও ডাকছি আল্লাহর আনুগত্যের দিকে। তুমি আমার অনুসরণ করবে এবং আমার আনীত বিষয়ের প্রতি ঈমান আনবে। কেননা, আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি তোমাকে তোমার প্রজাদেরকে এক আল্লাহর দিকে ডাকছি। আমি তোমার কাছে আমার বার্তা পৌঁছে দিয়ে প্রকাশ করেছি হিতাকাঙ্ক্ষিতা। কাজেই আমার উপদেশ গ্রহণ করো। আর হিদায়াত অনুসারীদের প্রতি সালাম।”

৪. মিশরের বাদশা মুকাওকিসের কাছে আল্লাহর রাসূল চিঠি পাঠিয়েছিলেন কিনা, বিশুদ্ধ সূত্রে তা পাওয়া যায় না। তবে চিঠি পাঠানোর ব্যাপারটা নাকচ করার মতো কোনো বর্ণনারও ইঙ্গিত নেই। আবার বিশুদ্ধ বর্ণনায় এই ইতিহাসের ক্ষেত্রে আপত্তির কথাও নেই। গঠনগত দিক থেকে হয়তো বর্ণনাটি শুদ্ধ; কিন্তু শারঈ রাজনৈতিক দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না।

মুহাম্মাদ বিন সাআদ তার তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল হাতিব ইবনু আবি বালতাআ-কে বার্তাবাহক বানিয়ে ইসকানদারিয়ার বাদশা মুকাওকিসের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠির জবাবে মুকাওকিস ইতিবাচক কথাই ব্যক্ত করেছে। এসেছিল ইসলামের খুব কাছাকাছি। তবে ইসলাম গ্রহণ করতে পারেনি। দূতের কাছে আল্লাহর রাসূলের জন্য বেশ কয়েকটি হাদিয়া দেয়। তাতে মারিয়া কিবতিয়াও ছিলেন। মুকাওকিসের উত্তর পেয়ে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'খবিসরা তার রাজ্যটাকে বেষ্টন করে আছে; এবং তার রাজত্ব বেশিদিন টিকবে না'।

৫. দামেশকের গভর্নর মুনজির ইবনুল হারিস গাসসানির কাছেও আল্লাহর রাসূল ইসলামের বার্তা লিখে চিঠি প্রেরণ করেন। বার্তাবাহক ছিলেন বনু আসাদ বিন খুযাইমার ভাই শুজা ইবনু ওয়াহাব। হুদাইবিয়া থেকে আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের নিয়ে ফিরছিলেন, তখনকার কথা এটি। নবিজি চিঠিতে লিখেছিলেন,
'হিদায়াতের অনুসারী ও ঈমানদার ব্যক্তির প্রতি সালাম। আমি তোমাকে ডাকছি, তুমি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, যাঁর কোনো শরিক নেই। এর ফলে তোমার রাজত্ব টিকে থাকবে'।

৬. হুদাইবিয়া থেকে ফেরার পথে নবিজি হাওজা ইবনু 'আলি আলা হানাফির কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। দূত ছিলেন সালীত বিন আমর আমিরি। হাওজা হানাফি চিঠি পড়ে আল্লাহর রাসূলকে এই শর্ত দেয় যে, নেতৃত্বে তারও অংশ থাকতে হবে। নবিজি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন'।

৭. হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসার পর আল্লাহর রাসূল বাহরাইনের গভর্নর মুনজির ইবনু সাওয়া আল আবদির কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। বার্তাবাহক ছিলেন আবুল আলা হাযরমি। ইতিহাস-গ্রন্থগুলোতে আছে, বাহরাইনের আমীর মুনজির আবদি আল্লাহর রাসূলের চিঠিতে সাড়া দিয়ে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন, সাথে বাহরাইনের সবাই। আর ইয়াহুদি ও অগ্নিপূজকরা তাদের জনপদের নিরাপত্তায় আলা হাযরমি ও মুনজির আবদির সাথে কর আদায়ের ভিত্তিতে সন্ধিচুক্তি করে।
আবু উবাইদ কাসিম বিন সালাম উরওয়া ইবনু যুবাইর থেকে মুনজির আবদীর উদ্দেশ্যে প্রেরিত চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। তাতে আছে,
'তোমার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি তোমার সামনে সেই আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহা নেই। পর কথা, যে ব্যক্তি আমাদের মতো সালাত পড়বে, আমাদের কিবলার অভিমুখী হবে, আমাদের জবাইকৃত পশু খাবে, সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হবে। অগ্নিপূজকদের মধ্যে যারা এই আহ্বান গ্রহণ করবে, সে নিরাপদ, আর অস্বীকার করলে জিযিয়া বা কর আবশ্যক হবে।'

অষ্টম হিজরির জিলকদ মাসে আল্লাহর রাসূল আমর ইবনুল 'আস-কে দূত নির্ধারণ করে ওমানের আযদিদের কাছে প্রেরণ করেন। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, 'আল্লাহর নবি ও রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে ওমানের রাজবর্গ আসবাজিয়্যীনদের প্রতি। তারা যদি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহর নবির অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, মুসলিমদের মতো কুরবানি করে, তাহলে তারা নিরাপদ। মুসলিমদের সকল অধিকার তারা লাভ করবে। তবে বাইতুন নারের সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। খেজুরের ওশর সাদাকাহ ও ফসলের ওশরের অর্ধেক। মুসলিমদের দায়িত্ব তাদের সাহায্য করা ও কল্যাণকামী হওয়া। আর তারা যেখানে ইচ্ছা ভ্রমণ করতে পারবে।'

টিকাঃ
[৪৫৪] দেখুন, ড, মুহাম্মাদ উকাইলি রচিত, 'আস সাফারাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১৫
[৪৫৫] দেখুন, সাঈদ মাহজার রচিত, আল আলাকাতুল খারিজিয়্যাহ লিদ দা'ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১১২
[৪৫৬] দেখন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩২৪
[৪৫৭] বুখারি, ৪৫৫৩; মুসলিম, ১৭৭৩
[৪৫৮] দেখুন, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনইয়া, ৩/৩৪১
[৪৫৯] তারিখে তাবারি, ২/৬৫৪-৬৫৫
[৪৬০] দেখুন, যাইলাঈ রচিত, নাসবুর রা-য়াহ, ৪/৪২১
[৪৬১] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৪৬
[৪৬২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৪৬
[৪৬৩] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ২/৪৫৯
[৪৬৪] তাবাকাতুল কুবরা, ১/ ২৬০-২৬১
[৪৬৫] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫/ ৩৪০
[৪৬৬] তারিখে তাবারি, ২/৬৫২
[৪৬৭] দেখুন, যাইলাঈ রচিত, নাসবুর রা-য়াহ, ৪/৪২৪
[৪৬৮] দেখুন, যাইলাঈ রচিত, নাসবুর রা-য়াহ, ৪/৪২৫
[৪৬৯] দেখুন, কলকশান্দি রচিত, সুবহুল আ'লা, ৬/৩২৮
[৪৭০] আবু উবাইদ ফি কিতাবিল আমওয়াল, পৃ. ৩০
[৪৭১] দেখুন, কলকশান্দি রচিত, সুবহুল আ'লা, ৬/৩৭৬
[৪৭২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৪৮

📘 রউফুর রহীম 📄 উমরাতুল কাযা

📄 উমরাতুল কাযা


৭ম হিজরির জিলকদ মাস। কুরাইশের সাথে হুদাইবিয়া সন্ধির শর্ত অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল ﷺ উমরাতুল কাযা আদায়ের জন্য মাদীনা থেকে মাক্কার উদ্দেশে রওনা করেন। নারী ও শিশুরা ব্যতীত মুসলিমদের সংখ্যা ছিল দুই হাজার। খাইবারে শাহাদাত বরণ ও মৃত্যুবরণকারী সাহাবিরা ছাড়া হুদাইবিয়ায় অংশ নেওয়া কোনো সাহাবি উমরাতুল কাযা থেকে বিরত থাকেননি।

আল্লাহর রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম মাদীনা থেকে মাক্কা অভিমুখে রওনা করেন এক গাম্ভীর্যের আবহে জনপদ ও উত্তপ্ত মরুর বুকে কাঁপন তুলে। মাক্কা মাদীনার মধ্যবর্তী যেকোনো পথ দিয়ে অতিক্রমের সময় পার্শ্ববর্তী জনপদের অধিবাসীরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে এই অপার বিস্ময়ে অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখছিল। সকল সাহাবি ছিলেন ইহরামের শুভ্র পোশাকে আবৃত, উচ্চকিত আওয়াজে পাঠ করছিলেন তালবিয়া,
লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাক।'
দলে দলে তারা কুরবানির পশুগুলো হাঁকিয়ে নিচ্ছিলেন। ইতঃপূর্বে এমন মোহন দৃশ্য আর কারও দৃষ্টিগোচর হয়নি।

এক. কুরাইশি প্রতারণা থেকে সতর্ক অবস্থান

শুধু তরবারিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল। সম্ভাব্য সকল দুর্ঘটনা ও আকস্মিক হামলা প্রতিহত করতেই এই ব্যবস্থা। বিশেষত মুশরিকদের ওপর ভরসা রাখা যায় না, চুক্তি কিংবা অঙ্গীকার ভঙ্গে তাদের বেশ কুখ্যাতি রয়েছে।

আল্লাহর রাসূল সংঘবদ্ধ সাহাবিদের নিয়ে পথ চলছেন, সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র। উমরা অভিমুখী এই কাফেলার শুরুতে আছে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার নেতৃত্বে দুইশো সাহাবির অশ্বারোহী বাহিনী। এ খবর পেয়ে কুরাইশের লোকেরা একটি দলের সাথে মুকরিয বিন হাম্সকে আল্লাহর রাসূলের কাছে পাঠিয়ে দেয়। মাররুয যাহরানের বাতনে ইয়াজুজে এসে ওরা মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়। সরাসরি নবিজির কাছে এসে বলল, 'ইয়া মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, সামান্যতম প্রতারণার কথা আমরা আপনার ব্যাপারে জানি না। আপনার কওমের মাঝে হারাম সীমানায় এই অস্ত্র নিয়েই কি প্রবেশ করবেন? অথচ আমি শর্ত দিয়েছিলাম, প্রতিশ্রুতির বাইরে আপনি প্রবেশ করবেন না। শুধু তরবারি কোষবদ্ধ রেখে হারাম শরীফে ঢোকা যাবে।'

আল্লাহর রাসূল বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা এভাবেই হারামে ঢুকব।' মুকরিয তার সাথিদের নিয়ে দ্রুত মাক্কায় ফিরে আসে। নেতাদের উদ্দেশ্যে বলে, 'মুহাম্মাদ সামগ্রিক অস্ত্র নিয়ে ঢুকবেন না এবং তিনি কৃত শর্তের ওপর বহাল আছেন।'

আল্লাহর রাসূল হারাম সীমানার খুব কাছে অস্ত্র রাখেন, এখানে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার নেতৃত্বে দুইশো সাহাবিকে রাখেন প্রহরায়। যেন তারা এখানে থেকে সবদিকে দৃষ্টি রেখে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে ও প্রয়োজনে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারেন।

নবিজি কুরাইশের মুশরিকদের গাদ্দারি ও খিয়ানাত থেকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদবোধ করতে পারছিলেন না। ওদের প্রবৃত্তি নিরস্ত্র মুসলিমদের ওপর হামলায় প্ররোচিত করতে পারে—এজন্যই আল্লাহর রাসূল নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন, সতর্ক অবস্থানে থেকেছেন, আবার কুরাইশকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করে উম্মাহকে শিক্ষা দিয়েছেন শত্রু থেকে যেন উদাসীন না হয়। সাহাবিদের একটি দলকে অস্ত্রের দায়িত্বে রেখে জানিয়েছেন, মুসলিমরা আসন্ন প্রতিটি পদক্ষেপে যেন গভীর দৃষ্টি রাখে, দীনের সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদাতের মর্ম বাস্তবায়নে যেন অনুপ্রাণিত হয়।

টিকাঃ
[২৪১] দেখুন, ইমাম নববীর আল মাজমু' গ্রন্থ; ৭/৭৮
[২৪২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৩৪
[২৪৩] দেখুন, 'নবীজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের বর্ণনা', ২/৪৯০,
[২৪৪] দেখুন নদভী রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৭৩
[২৪৫] দেখুন, মুহাম্মাদ কালআজি রচিত 'কিরাআতুন সিয়াসিয়্যাহ লিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২১৩, ২১৪
[২৪৬] দেখুন মারবিয়্যাতুল হুদাইবিয়্যাহ, পৃ. ৫৫
[২৪৭] দেখুন হাকামী রচিত মারবিয়্যাতু গাযওয়াতিল হুদাইবিয়্যাহ, পৃ. ৫৮, ৫৯
[২৪৮] দেখুন, ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৯৭৪
[২৪৯] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৩০৯
[২৫০] দেখুন, তারিখে তাবারি, ২/৬২২
[২৫১] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়‍্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮৯
[২৫২] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮৯
[২৫৩] দেখুন, শাইখ আদনান নাহভী রচিত 'মালামিহুশ শূরা ফিদ দা'ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬০
[২৫৪] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৩৮
[২৫৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া, পৃ. ৩৯
[২৫৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৭৪
[২৫৭] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৮] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৯] ফাতহুল বারি, ৪/৭০৮
[২৬০] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৬১] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৩
[২৬২] ফাতহুল বারি, ৬/৬১
[২৬৩] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৭
[২৬৪] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৫
[২৬৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৫
[২৬৬] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪০
[২৬৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৬৭
[২৬৮] প্রাগুক্ত পৃ. ৬৮
[২৬৯] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১৩১, ১৩২
[২৭০] দেখুন ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৫৯৮
[২৭১] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১৪৫
[২৭২] আস সীরাতুন নাবাবিয়‍্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়‍্যাহ, পৃ. ৪৮৮
[২৭৩] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১০৮
[২৭৪] ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৫] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১১১
[২৭৬] দেখুন, আবকারিয়্যাতু মুহাম্মাদ, পৃ. ৪৯
[২৭৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৩
[২৭৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৯] যাদুল মাআদ, ৩/ ২৯০ সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/ ৩৪৪
[২৮০] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪৪
[২৮১] যাদুল মাআদ, ৩/২৯০
[২৮২] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৫
[২৮৩] যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৮৪] তাফসিরে ইবনে কাসীর, ৪/ ১৯২
[২৮৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়াহ, পৃ. ৪৮৬
[২৮৬] প্রাগুক্ত,
[২৮৭] প্রাগুক্ত
[২৮৮] প্রাগুক্ত
[২৮৯] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৯০] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৪০৪
[২৯১] বুখারি, ৩৬৯৮, তিরমিযি, ৩৭০৬
[২৯২] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮২
[২৯৩] দেখুন, নাসির হাসান রচিত, 'আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ ফিস সাহাবা, ১/২০৫
[২৯৪] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ২১৪
[২৯৫] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ৪/ ২১৬
[২৯৬] দেখুন, আত তারিখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারি, পৃ. ৩৩৯, ৩৪০
[২৯৭] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০২, ৬০৪, ৬০৫
[২৯৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬১০
[২৯৯] দেখুন, আল মুস্তাফাদ মিন কিসাসিল কুরআন লিদ দা’ওয়াহ ওয়াদ দুআ ২/৩৪২
[৩০০] দেখুন, মুহাম্মাদ আদদীক রচিত, আল মুআহাদাত ফিশ শারীআতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়াল কানুনিদ দাওলা' পৃ. ২৭০, ২৭১
[৩০১] প্রাগুক্ত
[৩০২] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩০৬
[৩০৩] প্রাগুক্ত
[৩০৪] দেখুন, মুহাম্মাদ আদদীক রচিত, আল মুআহাদাত ফিশ শারীআতিল ইসলামিয়্যাহ পৃ. ২৭২
[৩০৫] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ২৮০
[৩০৬] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ১৯৯-২০০
[৩০৭] দেখুন, আল মুআহাদাত ফিশ শারীআতিল ইসলামিয়্যাহ পৃ. ২৭৩
[৩০৮] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪৭
[৩০৯] সাদিক উরজুন রচিত মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, ৪/২৭৫

📘 রউফুর রহীম 📄 যা-তুস সালাসিল অভিযান

📄 যা-তুস সালাসিল অভিযান


মুসলিম বাহিনী মুতা থেকে ফিরে আসার মাত্র কয়েকদিন পরের কথা। যা-তুস সালাসিলে অভিযানের জন্য নবিজি আমর ইবনুল আ'সের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। উদ্দেশ্য কুদাআর লোকদের শায়েস্তা করা, যারা মুতা যুদ্ধে রোমান সৈন্যদের সাথে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এরা সমবেত হয়ে মূলত মাদীনার নিকটবর্তী হতে চাচ্ছিল।

আমর ইবনুল আ'স তিনশো মুহাজির ও আনসার সাহাবির একটি বাহিনী নিয়ে কুদাআহ জনপদের কাছাকাছি চলে আসেন। শত্রুদের সেনা সমাবেশের কাছে এসে জানতে পারেন, এরা প্রচুর সৈন্য সমবেত করেছে। ফলে তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। দ্রুততম সময়ে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর নেতৃত্বে তার সাহায্যে নতুন বাহিনী চলে আসে।

কাফিররা মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধ শুরু করে। আমর ইবনুল আ'স কুদাআর জনপদের একদম গভীরে প্রবেশ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পরাজিত মুখে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। সিরিয়া প্রান্তে আবার ইসলামের দাপট ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন আমর। মুসলিমদের মিত্র গোত্রগুলোর মাঝেও ফিরে আসে আগের মনোবল। অন্যান্য অনেক গোত্র মুসলিমদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে প্রবেশ করে, ইসলাম গ্রহণ করে বনু আব্বাস, বনু মুররা ও বনু যিবইয়ানের বহু সংখ্যক মানুষ। এমনইভাবে বনু ফাযারাহ ও তাদের গোত্রপতি উয়াইনাহ ইবনু হিস্স্স মুসলিমদের সাথে মৈত্রীচুক্তি সম্পন্ন করে। তার অনুসরণে আরও যুক্ত হয় বনু সালীম ও বনু আশজা। বনু সালীমের প্রধান ছিলেন আব্বাস ইবনু মিরদাস। এভাবে উত্তর আরবের শহরগুলোতে মুসলিম জাতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যদিও সবগুলো শহরে তখনো ইসলামি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

যা কিছু শিক্ষণীয়:

১. আমর ইবনুল আ'সের ইখলাস বা একনিষ্ঠতা
আমর ইবনুল আ'স বলেন, 'আল্লাহর রাসূল আমার কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন, 'অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে আমার কাছে এসো।' আমি এসে দেখি তিনি ওযু করছেন। আমার আগমন টের পেয়ে তিনি চোখ তুলে তাকালেন। মৃদু হেসে বললেন, 'আমি তোমাকে একটি অভিযানে প্রেরণ করতে চাচ্ছি। তুমি নিরাপদ থাকবে, লাভ করবে গানীমাত। আর আল্লাহ তো তোমাকে সম্পদের বেশ আগ্রহও দিয়েছেন!'
আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি সম্পদের জন্য ইসলাম গ্রহণ করিনি, ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়েই আমি ইসলাম মেনে নিয়েছি। আমি চেয়েছি, যেন আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে থাকতে পারি।' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আমর, উপযুক্ত ব্যক্তি নির্ভেজাল সম্পদ পেলে এতে অসুবিধা নেই।'
এখানে আমরা আমর ইবনুল আ'স-এর সত্যনিষ্ঠ মজবুত ঈমান ও ইখলাসের পরিচয় পাই। তার স্পষ্টকথা—তার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল ইসলাম ও আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্য লাভ। ওদিকে আল্লাহর রাসূলও তাকে স্পষ্ট করে বলেছেন, 'হালাল সম্পদ নিয়ামাত, যখন তা উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে চলে আসে। কেননা, উপযুক্ত ব্যক্তি এই সম্পদ দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টির ইচ্ছা করে, ব্যয় করে কল্যাণের পথে এবং প্রয়োজন পূরণ করে নিজের ও পরিবারের।'

২. একতাই বল
বিবৃত হয়েছে, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর নেতৃত্বে আমর ইবনুল আ'সের সাহায্যে নবিজি একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সালাতের সময় হলে আবু উবাইদা আগ বাড়িয়ে আমরের ইমামতি করতে চান। আমর তাকে বাধা দিয়ে বলেন, 'তুমি এসেছ আমার সাহায্যে, কাজেই তুমি এখানে ইমামতি করতে পারো না। আমিই এই বাহিনীর আমীর, আল্লাহর রাসূল তোমাকে আমার সাহায্যে পাঠিয়েছেন।'
মুহাজির সাহাবিরা বললেন, 'না, এমনটা নয়। আপনি আপনার সাথিদের আমীর, আর তিনি তার সাথিদের আমীর।' আমর বললেন, 'উঁহু, তোমরা বরং আমার সাহায্যে এসেছ।'
আবু উবাইদা ছিলেন বিচক্ষণ—নরম স্বভাবের মানুষ। তিনি দেখলেন এখানে মতভেদ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই তিনি আমরকে বললেন, 'আমর নিশ্চিন্ত থাকো, মনে রেখো, আল্লাহর রাসূল আমার কাছ থেকে সর্বশেষ যে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন তা হলো, তিনি বলেছেন, 'তোমার সাথির সাথে গিয়ে মিলিত হলে একে-অপরের কথা মেনে নেবে, অনৈক্য সৃষ্টি করবে না।' আল্লাহর কসম, তুমি আমার কথা না মানলেও আমি তোমার আনুগত্য করব।' এরপর আমর ইবনুল আ'স সাহাবিদের নিয়ে সালাত আদায় করেন।
আবু উবাইদা খেয়াল করেছেন, এই যা-তুস সালাসিল অভিযানে মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি হলে তা ব্যর্থতা টেনে আনবে, শত্রুরা বিজয়ী হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুততম সময়ে তিনি অনৈক্যের মূল উপড়ে ফেলে, নমনীয় হয়ে নিজেকে আমর ইবনুল আ'সের নেতৃত্বে সঁপে দিয়েছেন, আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ পালনার্থে দ্বিমত করেননি।

৩. শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে আমর ইবনুল আ'সের পরিকল্পনা
এই অভিযানে মুসলিম বাহিনীর মাঝে ঐক্য বজায় রাখা ও শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে আমর-এর সামরিক প্রতিভার প্রতিফলন ঘটেছে। কয়েকভাবে প্রোজ্জ্বল হয়েছে তার পরিকল্পনা।
ক. তিনি রাতের আঁধারে চলতেন, দিনের আলোতে আত্মগোপন করে থাকতেন। তিনি তার বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন, নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছবার আগেই হয়তো শত্রুরা মুসলিমদের খবর জেনে ফেলতে পারে, যদ্দরুণ তারা দ্রুত প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে। তাই তার কাছে সংগত মনে হয়েছে রাতের বেলা ভ্রমণ করে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা। এভাবে শক্তি অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দুটি জিনিস বাস্তবায়িত হয়েছে।
- শত্রুদের কাছে তাদের আগমন গোপন থেকেছে, ফলে শক্তিতে ফাটল সৃষ্টি হয়নি।
- গরমের তীব্রতা থেকে বাহিনীকে রক্ষার ফলে তাদের উদ্যম অমলীন ছিল, ফলে শত্রুর মুখোমুখি হয়েও তারা ছিলেন পূর্ণ শক্তিতে বলীয়ান।

খ. তিনি আগুন জ্বালাতে দেননি। বিশেষ প্রয়োজনে মুসলিম বাহিনীর অনেকেই আমরের কাছে আগুন জ্বালানোর অনুমতি চাইলে তিনি বারণ করেন। তার গভীর সামরিক চিন্তা এ কাজে বাধা দিয়েছে। তিনি আশঙ্কা করেছেন—এতে কল্যাণের চেয়ে অনিষ্টই বেশি হতে পারে। আলো ছড়িয়ে পড়লে মুসলিমদের স্বল্পতা শত্রুরা টের পেত, ফলে পরিকল্পনার আগেই তারা আক্রমণ করে বসতে পারে।
এই গভীর চিন্তা তার মনে প্রোথিত হয়েছিল। এমনকি আবু বাকরও যখন এ প্রসঙ্গে কথা বলেন, তখন তিনি বলেছেন, 'বাহিনীর যে কেউ আগুন জ্বালালে আমি তা নিভিয়ে ফেলব।'
মাদীনায় ফিরে আসার পর আল্লাহর রাসূলের কাছে এ আলোচনা উত্থাপন করা হয়। আল্লাহর রাসূল এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি তাদেরকে আগুন জ্বালাতে নিষেধ করেছি; কারণ, আমাদের আগুন দেখলে আমাদের সৈন্য-স্বল্পতা শত্রুরা টের পেত।' আল্লাহর রাসূল ﷺ তার এ কাজ সমর্থন করেন।

গ. পিছু ধাওয়াতে বাধা দেওয়া। মুসলিমরা শত্রুদেরকে পরাজিত করার পর অবশিষ্টদেরও পিছু ধাওয়া করতে চান; কিন্তু বাহিনীর প্রধান তাদেরকে এ কাজে বাধা দেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বৃহৎ অনিষ্ট থেকে সবাইকে রক্ষা করা। কেননা, মুসলিম বাহিনী বিপদের আবর্তেও পড়তে পারত। আমর ইবনুল আ'সের এই দূরদর্শী চিন্তা আল্লাহর রাসূলের মনঃপূত হয়েছে। নবিজির প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, 'আমি তাদের পিছু ধাওয়া করা অপছন্দ করেছি, হতে পারত, পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে তারা সাহায্য পেত! আর আমরা সম্মুখীন হতাম নতুন বিপদের। আল্লাহর রাসূল তার প্রাজ্ঞচিত সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। কেননা, এতে বাস্তবায়িত হয়েছে বাহিনীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা।

৪. আমর ইবনুল আ'সের ফিকহি উদ্ভাবন
আমর ইবনুল আ'স বলেন, 'যা-তুস সালাসিল যুদ্ধের এক শীতার্ত রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার ভয় হলো, এই কনকনে শীতে গোসল করলে মারাই যাব। তাই তায়াম্মুম করে সাহাবিদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করি। মাদীনায় ফিরে আমার নামে নবিজির কাছে নালিশ করা হয়। নবিজি আমাকে বললেন, 'কী ব্যাপার আমর? তুমি সাথিদের নিয়ে জুনুবি (নাপাক) অবস্থায় নামাজ পড়েছ!' আমি গোসল না করার কারণ উল্লেখ করে বললাম, 'আর আমি আল্লাহর একথাও শুনেছি, 'তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহশীল।' আমার কথা শেষে আল্লাহর রাসূল শুধু হাসলেন, কিছু বললেন না।'
এই গল্প থেকে কিছু বিধান উদ্ভাবিত হয়:
ক. পানি থাকলেও জুনুবি ব্যক্তির জন্য তায়াম্মুম গোসলের কাজ দেবে, যদি সে পানি ব্যবহার তার জন্য ক্ষতির কারণ মনে করে। আমর ইবনুল আ'স পানি থাকা সত্ত্বেও তায়াম্মুম করেছেন, সাথিদের নিয়ে সালাত আদায় করেছেন। আর নবিজিও তার কাজ সমর্থন করেছেন।
খ. আল্লাহর রাসূলের যুগেও ইজতিহাদ জায়েয ছিল। আমর ইবনুল আ'স যে রাতে অপবিত্র হয়েছিলেন, সে ভোরে গোসলের পরিবর্তে ইজতিহাদ করে তায়াম্মুম করে সাথিদের নিয়ে সালাত আদায় করেছেন। তার ইজতিহাদের ভিত্তি ছিল এই আয়াত, 'তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহশীল'। (সূরা নিসা: ২৯) আল্লাহর রাসূল তার ইজতিহাদ অস্বীকার করেননি; বরং তিনি দুটি বিষয়ের সমর্থন করেছেন। এক, ইজতিহাদের বৈধতা। দুই, ইজতিহাদের শুদ্ধতা।
গ. তায়াম্মুমের একটি বৈধ কারণ হলো পানি ব্যবহারে অক্ষম হওয়া—যদিও পানি থাকে, যেমন: পানি যদি প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়।
ঘ. তায়াম্মুমকারী ব্যক্তি ওযুকারীদের ইমাম হতে পারবে। আমর ইবনুল আ'স তায়াম্মুম করে ইমামতি করেছেন—পাঁচশো সাহাবির। তারা সবাই ওযু করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল এটাও সমর্থন করেছেন।
ঙ. আমর ইবনুল আ'সের ইজতিহাদ তার ফিকহি যোগ্যতা ও বুদ্ধির পূর্ণতা এবং দলিল থেকে বিধান উদ্ভাবনে সূক্ষ্মদৃষ্টির পরিচয় বহন করে। অধিকন্তু, আমরা সীরাহ থেকে যা লাভ করি তা হলো, আমর দ্রুততম সময়ে কুরআনের আয়াত সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, এমনকি বিধানও নিরূপণ করেছেন, অথচ তার ইসলাম গ্রহণের বয়স তখন মাত্র চার মাস।

৫. উত্তর আরবে অভিযান প্রেরণের ফলাফল
হুদাইবিয়া সন্ধির পরপরই মুসলিম সামরিক বাহিনী উত্তর আরব অভিযানে মনোযোগী হয়। আরব উপদ্বীপের পশ্চিমেও অভিযান পরিচালিত হয়েছে। প্রসারিত হয়েছে মুসলিমদের দাপট। শুধু মাক্কা মুকাররামা সন্ধির ছায়ায় নিরাপদ ছিল। আল্লাহর রাসূলের প্রেরিত অভিযানের ফলে অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে আরব উপদ্বীপের উত্তর প্রদেশে। মুসলিম সেনাবাহিনী পৌঁছে গেছে রোমান সাম্রাজ্যের সীমানায়। এভাবে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা নিরাপদ হয়েছে, প্রসারিত হয়েছে প্রতাপ, দূর হয়েছে মাদীনায় গুপ্ত হামলার আশঙ্কা।

আল্লাহর বাহিনীর সকল সেনাকে আমরা স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায়। যারা অর্জন করেছিলেন উন্নত চরিত্র, চিন্তাশীলতা, সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সূক্ষ্ম দর্শন। সামনে হুদাইবিয়ার আলোচনায় আমরা ইতিহাসের স্রোতে ভেসে ভেসে মিশে যাব তাদের নির্মল জীবন প্রবাহে।

টিকাঃ
[৫২৯] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৭/১৩০
[৫৩০] দেখুন, উরওয়া ইবনু যুবাইর সংকলিত 'আল্লাহর রাসূলের মাগাযি, পৃ. ২০৭
[৫৩১] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ২০৯
[৫৩২] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৫০৯
[৫৩৩] প্রাগুক্ত
[৫৩৪] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়‍্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৫৪০
[৫৩৫] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৫০৯
[৫৩৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ২১০
[৫৩৭] সালিহ আহমাদ শামি, 'মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ' পৃ. ৩৮১
[৫৩৮] 'মিন মুআইয়‍্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৮১
[৫৩৯] আল মুজতামাউল মুদনা পৃ. ১৭০
[৫৪০] ড, আব্দুল লতীফ হামযা রচিত, 'আল ই'লাম ফি সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৭৩
[৫৪১] দেখুন, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি, পৃ. ৩৩৭
[২৪০] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ১৮৯-১৯২

ফন্ট সাইজ
15px
17px