📘 রউফুর রহীম 📄 আট. দুষ্কর্মী ইয়াহুদিদের সাথে কথোপকথন, একটি ভুনা বকরি

📄 আট. দুষ্কর্মী ইয়াহুদিদের সাথে কথোপকথন, একটি ভুনা বকরি


আবু হুরাইরা বলেন, 'খাইবার বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূলকে একটি বিষমাখা ভুনা বকরি হাদিয়া দেওয়া হয়। আল্লাহর রাসূল নির্দেশ দিলেন, এখানকার সব ইয়াহুদিকে আমার সামনে হাজির করো।' ইয়াহুদিরা সমবেত হলে আল্লাহর রাসূল তাদেরকে বললেন, 'আমি তোমাদের কাছে কিছু জানতে চাইব, তোমরা আমাকে সত্য বলবে।'

তারা বলল, জি আবুল কাসিম, আমরা সত্যই বলব।
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?'
'আমাদের পিতা অমুক।'
'উঁহু, তোমরা মিথ্যা বলেছ, তোমাদের পিতা তো অমুক ব্যক্তি!'
'জি, আপনি সত্য বলেছেন।'
'আমি আবারও বলছি, আমি কিছু জানতে চাইব, তোমরা সত্য বলবে।'
‘জি, আবুল কাসিম। তা ছাড়া আমরা মিথ্যা বললে আপনি ধরতে পারবেন, যেমন বাবার ব্যাপারে ধরেছেন।’
'আচ্ছা, তা হলে বলো, কারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'
'আমরা সেখানে অল্প কিছুদিন থাকব, তারপর আমাদের মুক্তি দেওয়া হবে।'
'তোমরা এ ব্যাপারে ধোঁকার আবর্তে পড়ে আছো। আল্লাহর কসম, তোমাদের কখনোই মুক্তি দেওয়া হবে না।'
'তোমাদেরকে এখন একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সত্যি বলবে।'
'জি, সত্যি বলব।'
'তোমাদেরকে এ কাজে কে প্ররোচিত করেছে?'
'আমাদের ইচ্ছা ছিল, আপনি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকলে আমরা শান্তি পাব, আর আসলেই আপনি নবি হয়ে থাকলে এই বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।'

বুলুগুল আমানির রচয়িতা বিষমাখা বকরির ব্যাপারে বলেছেন, 'ইয়াহূদি নারী সালাম বিন মিশকামের স্ত্রী যাইনাব বিনতুল হারিস এই বকরি নবিজিকে হাদিয়া দেয়। সে আগে জেনে নিয়েছে আল্লাহর রাসূল বকরির কোন অংশ বেশি পছন্দ করেন। রানের কথা জানতে পেরে এ অংশে বিষের পরিমাণ বেশি দিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল রানের অংশ নিয়ে কেবল চিবিয়েছিলেন, গিলে ফেলেননি; কিন্তু তাঁর সাথে খাবারে শরিক হওয়া বিশর ইবনুল বারা একটি মাত্র লোকমা খাওয়ার পরই মৃত্যুবরণ করেন।'

উরওয়া মাগাযিতে উল্লেখ করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল রানের একটা অংশ নিয়ে কেবল মুখে দিয়েছেন। ওদিকে মাংস খাওয়া শুরু করেছিলেন বিশর। নবিজি একটু চেখে দেখেই উপস্থিত সাহাবিদের বললেন, 'তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও। বকরির গোশত আমাকে বলে দিচ্ছে এখানে বিষ মাখানো হয়েছে।' নবিজির কথা শুনে বিশর ইবনুল বারা বললেন, 'সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, আমার লোকমাতেও এটা আমি বুঝতে পেরেছি; কিন্তু আপনার সামনে খাবার নষ্ট করতে মন চাচ্ছিল না, তাই ফেলে দিইনি। আর আপনার খাবারে শরিক থাকার পর এই জীবনে আর কোনো চাওয়া আমার বাকি নেই। তা ছাড়া আমি ভেবেছিলাম, খাবারে বিষ থাকলে আপনি অবশ্যই ফেলে দেবেন।'

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের কাছে মহিলাকে গ্রেফতার করে আনা হলে সে দায় স্বীকার করে বলল, 'আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছি।' নবিজি বললেন, কিন্তু আমাকে হত্যার ক্ষমতা আল্লাহ তোমাকে দেননি' সাহাবিরা মহিলাকে হত্যার অনুমতি চাইলে নবিজি বারণ করেন। তাকে কোনো প্রকার শাস্তিও দেওয়া হয়নি। এদিকে নবিজি দ্রুত আক্রান্ত সাহাবিদের চিকিৎসার জন্য গ্রীবাসন্ধিতে হিজামার নির্দেশ দেন। তারপরও কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছিলেন।'

খাবারে বিষ প্রয়োগকারী এই নারীকে হত্যা করা হয়েছিল কিনা, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। বিশুদ্ধমত হলো, বিশর-এর মৃত্যুর পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। একটি ঐতিহাসিক সত্য হলো, ইয়াহুদি নারীর মেশানো বিষ ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী। ফলে বিশর ইবনুল বারা দ্রুতই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন; আর আল্লাহর রাসূলের ওফাতের সময় এই বিষের ব্যথা তাঁকে ভীষণভাবে ভুগিয়েছে। আয়িশা বলেন, 'আল্লাহর রাসূল মৃত্যুশয্যায় বলতেন, আয়িশা, আমি এখনো খাইবারের সেই বিষের যন্ত্রণা অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, এই বিষের কারণে আমার কণ্ঠনালি বুঝি ছিঁড়ে যাবে।'

টিকাঃ
[৪৩২] বুখারি, ৩১৬৯ আহমাদ, ২/৪৫১
[৪৩৩] বুখারি, ৩১৬৯;
[৪৩৪] দেখুন, বুলুগুল আমানি ফি হাশিয়াতিল ফাতহির রাব্বানী, ২১/১২৩
[৪৩৫] মুসলিম, ২১৯০
[৪৩৬] দেখুন, উরওয়া ইবনু যুবাইর সংকলিত 'আল্লাহর রাসূলের মাগাযি, পৃ. ১৯৮
[৪৩৭] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩৩৬
[৪৩৮] বুখারি, ৪৪২৮

📘 রউফুর রহীম 📄 নয়. মাক্কা থেকে হাজ্জাজ বিন আলাত সালামির সমূহ সম্পদ নিয়ে আসা

📄 নয়. মাক্কা থেকে হাজ্জাজ বিন আলাত সালামির সমূহ সম্পদ নিয়ে আসা


আনাস ইবনু মালিক বলেন, 'খাইবার বিজয়ের পর হাজ্জাজ বিন আলাত আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মাক্কায় আমার পরিবার ও বেশ কিছু মাল-সামানা আছে। এ ক্ষেত্রে আমি আপনার ব্যাপারে কিছু বলে তাদের কাছে চিঠি লিখতে চাই।' আল্লাহর রাসূল তাকে ইচ্ছে মতো কথা বলার অনুমতি দেন।

হাজ্জাজ স্ত্রীর কাছে এসে বলল, 'তোমার কাছে যা-কিছু আছে, নিয়ে এসো। ইয়াহুদিরা মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের থেকে যে সম্পদ লাভ করেছে, আমি খাইবারে গিয়ে তা কিনতে চাচ্ছি। আর শোনো, যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হয়েছে, ইয়াহুদিরা ওদের সমস্ত সম্পদ লুট করেছে।' মক্কায় হাজ্জাজের কথা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। মিথ্যে পরাজয়ের খবর শুনে মক্কার মুসলিমদের মনে বিষণ্ণতা ছেয়ে গেলেও মুশরিকদের মাঝে আনন্দ ও খুশি দেখা দেয়।

আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের কাছেও পৌঁছে যায় এ খবর। তিনি কী এক কারণে তখন দাঁড়াতে পারছিলেন না। খবরটা শুনে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। মা'মার বলেন, 'উসমান জাযারি মিকসামের সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করে বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছেলে কুসামের হাত ধরে উঠে বসলেন আব্বাস। কুসাম বাবাকে বুকের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখেন। এ সময় আব্বাস বলছিলেন,
'পুত্র কুসামকে আমি ভীষণ ভালোবাসি/তাকে রাখি মুহাম্মাদের সাথে সাদৃশ্যে যিনি অনুগ্রহশীল রবের প্রেরিত নবি/তাঁর প্রতি অনাগ্রহী ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য।

সাবিত বিন আনাস বলেন, 'আব্বাস তার এক গোলামকে হাজ্জাজের কাছে প্রেরণ করে বলেন, 'তোমাকে তো ভালো মনে করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাদেরকে এসব কী শোনাচ্ছ? তোমার আনীত সংবাদে তো আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেননি।'

হাজ্জাজ বিন আলাত আগত গোলামকে বলল, 'আবুল ফজলকে আমার সালাম জানাবে। তাকে বলবে, তিনি যেন আমার সাথে কোনো নির্জন ঘরে বসার ব্যবস্থা করেন। কেননা, আমার আনীত প্রকৃত সংবাদ শুনে তিনি অবশ্যই খুশি হবেন।'
গোলাম ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, 'ওহে আবুল ফজল, সুসংবাদ গ্রহণ করুন।' গোলামের মুখে এইটুকু শুনেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তিনি লাফিয়ে ওঠেন। গোলামের কপালে চুমু খান। গোলাম হাজ্জাজ বিন আলাতের কথা প্রকাশ করার পর আব্বাস তাকে আজাদ করে দেন।'

এক সুযোগে হাজ্জাজ বিন আলাত আব্বাসের কাছে নির্জনে এসে বললেন, 'খুশির খবর শুনুন। আল্লাহর রাসূল খাইবার জয় করেছেন, লাভ করেছেন প্রচুর পরিমাণ গানীমাতের সম্পদ। তাদের সম্পদে আল্লাহর অংশও নির্ধারিত হয়েছে। ওদিকে আল্লাহর রাসূল সাফিয়্যাকে নিজের জন্য পছন্দ করেছেন। তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে আগে আজাদ করেছিলেন। আর আমি এখানে এসেছি আমার সম্পদ নেওয়ার জন্য। নবিজির কাছে যা ইচ্ছা বলার অনুমতি চাওয়ার পর তিনি অনুমতি দিয়েছেন। ওহে আবুল ফজল, অন্তত তিনদিন পর্যন্ত আমার ভেতরের খবর গোপন রাখবেন। তারপর যা ইচ্ছা বলতে পারবেন আপনি।'

হাজ্জাজের স্ত্রী নিজের কাছে থাকা সমস্ত অলংকার ও সামানপত্র জমা করে। সরল মনেই দিয়ে দেয় স্বামীকে। ঠিক তিনদিন পরের কথা। আব্বাস হাজ্জাজ বিন আলাতের স্ত্রীর কাছে এলেন। কুশলাদি বিনিময়ের পর বললেন, 'তোমার স্বামীর কী খবর?'
স্ত্রী বলল, 'উনি অমুক দিন এসেছিলেন, আবার চলেও গেছেন। আরেকটা কথা হলো, আল্লাহ আপনাকে লজ্জিত করবেন না। তবে আপনি যা শুনেছেন, সে কারণে আমরা বেশ কষ্ট পেয়েছি।'

আব্বাস বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ, আল্লাহ আমাকে লজ্জিত করবেন না। আর আলহামদুলিল্লাহ, মাদীনায় আমার অপছন্দের কিছুই ঘটেনি। আসল খবর শোনো, আল্লাহর রাসূলের হাতে আল্লাহ খাইবারে বিজয় দান করেছেন। সেখানে আল্লাহর অংশ নির্ধারিত হয়েছে। সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াইকে নবিজি নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। স্বামীর কাছে তোমার কোনো কাজ থাকলে তার কাছে যেতে পার।'

হাজ্জারের স্ত্রী বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে সত্যবাদীই মনে করি।' আব্বাস বললেন, হ্যাঁ আমি সত্য বলেছি।' এরপর আব্বাস সেখান থেকে চলে এসে কুরাইশের একটি আসরে উপস্থিত হন। তিনি পাশ অতিক্রমের সময় ওরা টিটকারি করে বলছিল, 'ওহে আবুল ফজল, আশা করি আপনি শুধু কল্যাণই লাভ করবেন।' তিনি কুরাইশদের বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, কল্যাণ ছাড়া আমি কিছু আশাও করি না। হাজ্জাজ বিন আলাত আমাকে বলেছে, আল্লাহর রাসূল খাইবার জয় করেছেন, সেখানে আল্লাহর অংশ আরোপিত হচ্ছে, সবিশেষ সাফিয়্যাকে নবিজি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ কথা আমি আগে বলিনি; কারণ, হাজ্জাজ আমাকে প্রকৃত বিষয়টা তিনদিন পর্যন্ত গোপন রাখবার অনুরোধ জানিয়েছিল। আর সে মূলত এসেছিল তার সম্পদ নেওয়ার জন্য। নিজের কাজ সেরে তোমাদের বোকা বানিয়ে চলেও গেছে।'

এভাবে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের মানসিক যন্ত্রণা চাপিয়ে দিলেন মুশরিকদের ওপর। আনন্দের দ্যুতিতে উজ্জ্বল হলো মুমিনদের চেহারা, বিষাদের কালো ছায়া নামল মুশরিকদের জীবনে।

হাজ্জাজ বিন আলাতের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, ক্ষেত্র বিশেষে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে মিথ্যা বলা জায়েয, যদি এতে অন্যের অনিষ্ট জড়িয়ে না থাকে। এবং যদি এটাও পরিষ্কার থাকে যে, মিথ্যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারবে। হাজ্জাজ বিন আলাত এ কাজটাই করেছেন। কারও কোনো ক্ষতি না করে মাক্কা থেকে নিজ সম্পদ নিয়ে মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়েছেন, এ ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। আর প্রাথমিকভাবে মাক্কার মুসলিমরা যে দুশ্চিন্তা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন, পরে সত্যের মাধ্যমে অর্জিত কল্যাণের তুলনায় তা সহজই বিবেচিত হবে। শেষে তো তাদের মাঝে উচ্ছ্বাসের ফল্গুধারা নেমেই এসেছিল। প্রকৃত সংবাদ শোনবার পর তাদের ঈমান হয়েছিল আগের চেয়েও মজুত, দৃঢ়। বলতে পারি, হাজ্জাজ বিন আলাতের মিথ্যার মাধ্যমে এ কল্যাণগুলোই অর্জিত হয়েছে।

টিকাঃ
[৪৩৯] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৪৫৯
[৪৪০] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, পৃ. ৪৩৯
[৪৪১] আহমাদ, ৩/১৩৮-১৩৯; বাযযার, ১৮১৬; আবু ইয়া'লা, ৩৪৭৯

📘 রউফুর রহীম 📄 দশ. খাইবার অভিযান সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধিবিধান

📄 দশ. খাইবার অভিযান সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধিবিধান


১. গৃহপালিত গাধার গোশত হারামের বিধান
খাইবার যুদ্ধের সময় রাসূল ﷺ ও ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।'

২. গর্ভবতী বন্দিনীর সাথে সহবাস হারাম
খাইবার প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসে ঈমান রাখে, সে যেন তার পানি অন্যের ক্ষেতে সিঞ্চন না করে।'

৩. গর্ভবতী নয় এমন দাসী লাভ করলে ঋতুস্রাবের আগে তার সাথে সহবাস হারাম করা হয়
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য হালাল নয় রেহেম-মুক্ততার আগে বন্দিনী নারীর সাথে সহবাস করা।'
রেহেম-মুক্ততা স্পষ্ট হবে শুধু এক হায়েজ থেকে পবিত্র হলেই। এ মহিলার জন্য ইদ্দত আবশ্যক নয়। যদিও সে কাফির স্বামীর স্ত্রী ছিল, চাই সে মারা যাক কিংবা না যাক। কেননা, ইদ্দত হলো মৃত স্বামীর জন্য শোক পালন, আর কাফিরের ক্ষেত্রে এর কোনো বিধান নেই।

৪. অবশিষ্ট সুদও হারাম করা হয়
আবু সাঈদ খুদরি ও আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহর রাসূল এক ব্যক্তিকে খাইবারে কাজে নিযুক্ত করেন। তিনি একবার নবিজির কাছে উন্নতমানের খেজুর নিয়ে আসেন। নবিজি বললেন, 'খাইবারের সব খেজুরই কি এমন?' সাহাবি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সব খেজুর এমন নয়। অন্য খেজুর দুই কিংবা তিন সেরের বিনিময়ে আমরা এই খেজুর একসের নিয়ে থাকি।' নবিজি বললেন, এমন আর করবে না। অন্য জাতের সব খেজুর আগে দিরহামের বিনিময়ে বেচে দেবে। তারপর সেই দিরহাম দিয়ে এমন উন্নত জাতের খেজুর কিনবে।'
একই শ্রেণির বস্তু কমবেশি করে লেনদেন করাকে বলে 'রিবাল ফাদলি।' যেমন—এক সের খেজুর কিনল দুই সেরের বিনিময়ে। এখানে অতিরিক্ত যা দেওয়া হচ্ছে, সেটাই সুদ। বিবৃত বর্ণনা অনুযায়ী এটা হারাম। কেননা, নবিজি এ থেকে নিষেধ করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন, 'অধিকারে থাকা খেজুর বিক্রি করে দিয়ে এর মূল্য দিয়ে যেন অন্য খেজুর ক্রয় করে।

৫. স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, খাঁটি রূপার বিনিময়ে রূপা বেচাকেনা হারাম
উবাদা ইবনু সামিত বলেন, 'খাইবার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নিষেধ করেছেন, আমরা যেন খাঁটি সোনার বিনিময়ে সোনা বেচাকেনা না করি। এমনিভাবে রুপার বিনিময়ে রুপা। নবিজি বলেছেন, 'তোমরা রুপার বিনিময়ে সোনা, কিংবা খাঁটি সোনার বিনিময়ে রুপা বেচাকেনা করতে পারো।'
এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রুপার বিনিময়ে রুপা বেচাকেনা করতে চাইলে নিরেট সমান সমান হতে হবে। কোনো প্রকার কমবেশি হওয়া যাবে না; কিন্তু যখন সোনারুপার মাঝে বেচাকেনা হবে, তখন একই ধরনের ও সমপরিমাণ হওয়া শর্ত থাকবে না। (কারণ, সোনারুপা দুটি আলাদা দুই জিনিস।)'

৬. পারস্পরিক চুক্তিতে চাষাবাদ বৈধ হওয়া
আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবারের ভূমি ইয়াহুদিদের দায়িত্বে এই শর্তে দেন যে, তারা এখানে কাজ করবে, চাষ করবে; আর উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক তারা পাবে।'
কয়েকজন গবেষক এই প্রশ্ন করে বসেছেন যে, ব্যবসার এই বিধান কেন শরিআতসিদ্ধ হলো, আর এতে হিকমতই-বা কী?
শাইখ মুহাম্মাদ আবু যুহরা এর উত্তরে বলেন, 'সম্পদ বিনিময়ের প্রচলনের ক্ষেত্রে খাইবার বিজয় ছিল সম্পূর্ণ নতুন বিজয়। সংগত কারণেই পারস্পরিক চাষাবাদের শরিআতসিদ্ধতা কাম্য ছিল। যা ইয়াসরিবে ইতঃপূর্বে ছিল না।

৭. ঘোড়ার গোশত খাওয়া হালাল হওয়া
জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবার যুদ্ধে গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম করার পর ঘোড়ার গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে অবকাশ রাখেন।'

৮. মুতআ বিবাহ হারাম হওয়া
'আলি ইবনু আবি তালিব বলেন, 'খাইবার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নারীদের সাথে মুতআ বিয়ে ও গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

৯. খাইবার যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ
উমাইয়া বিনতু আবিস সাল্‌ত বনু গিফার গোত্রের এক নারী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'বনু গিফারের কিছু নারীর সাথে আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে দেখা করতে এলাম। সঙ্গিনী নারীরা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সাধ্যমতো মুসলিমদের সাহায্য ও আঘাতপ্রাপ্তদের সেবা করার জন্য আপনার এই সফরে অংশী হতে চাচ্ছি।' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আল্লাহ বারাকাহ দান করুন, তোমরা যোগ দিতে পারো।'

আমরা নবিজির সাথে সফরে বের হলাম। খাইবারের পথে ঊষালগ্নে আল্লাহর রাসূল এক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন। আমি বাহন থেকে নামার পর নিচের কাপড়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখতে পেলাম। বিচলিত হইনি। বুঝতে পেরেছি এ আমার ঋতুস্রাবের রক্ত এবং জীবনে এই প্রথম। আমি উটের সাথে মিশে থাকছিলাম। ভীষণ সংকুচিত লাগছিল আমাকে। আল্লাহর রাসূল আমার আড়ষ্টভাব ও কাপড়ে রক্তের দাগ দেখে বললেন, 'কী ব্যাপার, মনে হয় ঋতুস্রাব এসেছে?' বললাম, 'জি।'

নবিজি বললেন, 'দেখো নিজেকে স্বাভাবিক রেখে একটা কাজ করো। একপাত্র পানি নিয়ে তাতে কিছু লবণ দাও। তারপর এই পানি দিয়ে স্রাবের রক্ত ধুয়ে ফেলে বাহনে ফিরে যাও।' এরপর দাপুটে সময় কাটে মুসলিমদের। আল্লাহ তাআলা খাইবারে বিজয় দান করেন। নবিজি আমাদের জন্য ফাই-এর একটি অংশ নির্ধারিত রাখেন। তিনি সেখান থেকে একটি মালা নিয়ে নিজ হাতে আমার গলায় পরিয়ে দেন। এখনো তা শোভা পাচ্ছে আমার গলায়। আল্লাহর কসম, আমি এটিকে কখনো আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করিনি।'

এই মালা গলায় নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি অসিয়ত করেছিলেন, এই মালা-সহই তাকে যেন সমাধিত করা হয়। জীবনে একটি অভ্যস্ততায় তিনি এগিয়েছেন। (রাসূলের শেখানো পন্থায়) লবণ ব্যবহার না করলে তিনি ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হতেন না। মৃত্যুর আগে তিনি এও অসিয়ত করেছিলেন, তার গোসলের পানিতেও যেন লবণ দেওয়া হয়।'

মুসলিমদের সাথে জিহাদে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক তরুণীর সামনে এ এক চির জীবন্ত দৃষ্টান্ত। আল্লাহর রাসূলের জীবনজুড়ে এভাবে ছিল উম্মাহর জন্য অবারিত শিক্ষার সম্ভার, জীবনের নিরাপত্তায় ও যুদ্ধের সংক্ষুব্ধতায়। তিনি ছিলেন স্পষ্ট বিশ্বাসে উদ্ভাসিত, দাসত্বের মহিমায় উজ্জ্বল, যেন তিনিও অংশী হয়েছিলেন প্রত্যেকের জীবনে।'

টিকাঃ
[৪৪২] দেখুন, যাদুল মাআদ, ১২২-১২৩। বুখারি, ৪২১৮; মুসলিম, ৫৬১
[৪৪৩] আবু দাউদ, ২১৫৮; তিরমিযি, ১১৩১; তাবাকাত, ২/১১৩
[৪৪৪] আহমাদ, ৪/১০৮; আবু দাউদ, ২১৫৮
[৪৪৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১৩৪
[৪৪৬] প্রাগুক্ত
[৪৪৭] দেখুন, সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ৩২১
[৪৪৮] দেখুন, খাতামুন নাবিয়্যীন, ২/১১০৪
[৪৪৯] বুখারি, ৫৫২৩; মুসলিম, ১৯৪১
[৪৫০] বুখারি, ৫৫২৩; মুসলিম, ১৪০৭
[৪৫১] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/২০৫
[৪৫২] আহমাদ, ৬/৩৮০; বাইহাকি ফিল কুবরা, ২/৪০৭; ইবনু সাআদ, ৮/২১৪
[৪৫৩] দেখুন, গাযবান রচিত ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৫৩৪

📘 রউফুর রহীম 📄 রাজাবাদশাদের কাছে চিঠি প্রেরণ

📄 রাজাবাদশাদের কাছে চিঠি প্রেরণ


এক. হুদাইবিয়া সন্ধির ফলে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ
আল্লাহর রাসূল কুরাইশের সাথে হুদাইবিয়ায় শান্তিচুক্তি স্থাপন করেন। এরপর সময়ের দাবি অনুযায়ী হিজাজের উত্তরে খাইবারে বসবাসরত ইয়াহুদিদের দমন ও ওয়াদিয়ে কুরা, তাইমা-সহ ফাদাক অঞ্চলের জনপদগুলোকে ইসলামের নেতৃত্বাধীন করে নেন। সময়োপযোগী এই পদক্ষেপগুলোর পর ইসলামের সামনে আরব উপদ্বীপের সর্বপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার অবারিত সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হয়। আসলে শুধু আরব উপদ্বীপই নয়; বরং এর সীমানা ছাড়িয়ে রোম-পারস্যের সীমানায় পৌঁছে যায় ইসলামের আহ্বান।

হিজাজের সীমানা ও আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের বিস্তৃতিে আল্লাহর রাসূল চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করেননি। বিভিন্ন রাজাবাদশার কাছে বেশ কয়েকজন দূত পাঠিয়ে নবিজি এই পরিকল্পনা কাজে পরিণত করার দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইসলাম ও আরব ইতিহাসে এটিকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা, এর মাধ্যমে নবিজি গোটা আরব উপদ্বীপকে ইসলামের এক পতাকার নিয়ন্ত্রণে এনেছেন।

বিভিন্ন মিত্রগোত্র ও রাজাবাদশার কাছে দাওয়াতের এই নববি পন্থা আমাদের সামনে মাধ্যম গ্রহণের আবশ্যকীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। আমরা দেখি গোত্রসমূহের আমীর ও বাদশাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত প্রেরণে আল্লাহর রাসূল ﷺ এক অভিনব পন্থা নির্বাচন করেছেন। সেটা হলো ইসলামের দা'ওয়াহ সংবলিত চিঠি প্রেরণ। এই পন্থা অবলম্বনের ফলে অনেকের ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামের প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশে যথেষ্ট প্রভাব দৃশ্যত হয়েছে। আবার এই দা'ওয়ার উদ্যোগের পরেই ইসলামের দাওয়াহ ও ইসলামি রাষ্ট্র মাদীনার ক্ষেত্রে অনেকের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। নববি এই পন্থা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, সামরিক যে ফলাফল প্রকাশমান হয়েছে, পর্যায়ক্রমে আমরা তা তুলে ধরবার প্রয়াস পাব। এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিঠি প্রেরণের ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করছি।

১. দিহইয়া কালবিকে দূত নির্ধারণ করে আল্লাহর রাসূল রোমের বাদশা হিরাকলের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। হুদাইবিয়া শান্তিচুক্তি চলাকালীন ঘটনা এটি। প্রেরিত চিঠির বিবরণ ছিল নিম্নরূপ—
'পরম করুণাময় অতি দায়লু আল্লাহর নামে শুরু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের বাদশা হিরাকলের প্রতি। হিদায়াতের অনুসারী ব্যক্তির প্রতি সালাম। পর কথা, আমি তোমাকে ইসলামের দিকে ডাকছি। ইসলাম গ্রহণ করো, নিরাপত্তা লাভ করবে। তুমি ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর মুখ ফিরিয়ে নিলে প্রজাদের গুনাহের ভার তোমার ওপর বর্তাবে। 'বলুন, 'হে আহলে কিতাবগণ, একটি বিষয়ের দিকে এসো—যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান—যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করব না, তাঁর সাথে কোনো শরিক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তা হলে বলে দাও যে, সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।' (সূরা ইমরান: ৬৪)

হিরাকল আল্লাহর রাসূলের চিঠি গ্রহণ করে সূক্ষ্মভাবে ভেবে দেখেন। একটি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ হাদীসে হিরাকল ও আবু সুফিয়ানের মধ্যকার পারস্পরিক আলোচনা বিবৃত হয়েছে। শেষে তিনি আবু সুফিয়ানকে বলেন, 'তোমার বর্ণনা সত্য হলে তিনি একজন প্রেরিত নবি। আমি জানতাম তিনি আসবেন; কিন্তু এটা ধারণা করিনি যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে হবেন। আমি যদি জানতাম আমি তাঁর কাছে যেতে পারব, তা হলে তাঁর সাক্ষাৎ আমার জন্য সৌভাগ্যের হতো। আমি তাঁর কাছে থাকলে তাঁর পদযুগল ধুয়ে দিতাম।'

২. আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা সাহমি-কে দূত বানিয়ে আল্লাহর রাসূল পারস্যের বাদশা কিসরার কাছে চিঠি পাঠান। বাহরাইনের গভর্নরের কাছে এই চিঠি হস্তান্তর করতে বলেছিলেন। বাহরাইনের গভর্নর কিসরার কাছে তা পৌঁছে দেয়। কিসরা চিঠি পাঠ করে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। আল্লাহর রাসূল এ খবর জানতে পেরে বদ-দুআ করেন, আল্লাহ যেন তার দেশকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেন। তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী কিসরাকে দেওয়া চিঠির ভাষ্য ছিল এমন—
‘পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের বাদশা কিসরার প্রতি। সালাম তাদের প্রতি যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহা নেই এবং আমি সকল মানুষের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রাসূল, যেন আমি জীবিতদেরকে সতর্ক করতে পারি। ইসলাম মেনে নাও, নিরাপত্তা পাবে, অস্বীকার করলে অগ্নিপূজকদের পাপের ভার তোমায় বহন করতে হবে।'

৩. আল্লাহর রাসূল বাদশা নাজ্জাশির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন আমর বিন উমাইয়া দামরিকে দূত বানিয়ে। নবিজি সে চিঠিতে লিখেছিলেন,
'পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাবাশার বাদশা নাজ্জাশির প্রতি। ইসলাম গ্রহণ করো। আমি তোমার কাছে সেই আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহা নেই। তিনি মহাবিশ্বের অধিপতি, অতি পবিত্র, শান্তিদাতা, বিশ্বাসী ও মহামহিম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি ঈসা ইবনু মারইয়াম আল্লাহর দেওয়া রূহ, তার সেই কালিমা, যা তিনি পবিত্র নারী মারইয়ামের গর্ভে প্রেরণ করেছেন। এ থেকেই তিনি ঈসাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, ফলে তিনি সৃষ্ট হয়েছেন তার রূহ ও ফুঁকের সাহায্যে, যেমন আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন নিজ হাতে। আমি তোমাকে সেই আল্লাহর দিকে ডাকছি যিনি এক, যাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও ডাকছি আল্লাহর আনুগত্যের দিকে। তুমি আমার অনুসরণ করবে এবং আমার আনীত বিষয়ের প্রতি ঈমান আনবে। কেননা, আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি তোমাকে তোমার প্রজাদেরকে এক আল্লাহর দিকে ডাকছি। আমি তোমার কাছে আমার বার্তা পৌঁছে দিয়ে প্রকাশ করেছি হিতাকাঙ্ক্ষিতা। কাজেই আমার উপদেশ গ্রহণ করো। আর হিদায়াত অনুসারীদের প্রতি সালাম।”

৪. মিশরের বাদশা মুকাওকিসের কাছে আল্লাহর রাসূল চিঠি পাঠিয়েছিলেন কিনা, বিশুদ্ধ সূত্রে তা পাওয়া যায় না। তবে চিঠি পাঠানোর ব্যাপারটা নাকচ করার মতো কোনো বর্ণনারও ইঙ্গিত নেই। আবার বিশুদ্ধ বর্ণনায় এই ইতিহাসের ক্ষেত্রে আপত্তির কথাও নেই। গঠনগত দিক থেকে হয়তো বর্ণনাটি শুদ্ধ; কিন্তু শারঈ রাজনৈতিক দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না।

মুহাম্মাদ বিন সাআদ তার তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল হাতিব ইবনু আবি বালতাআ-কে বার্তাবাহক বানিয়ে ইসকানদারিয়ার বাদশা মুকাওকিসের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠির জবাবে মুকাওকিস ইতিবাচক কথাই ব্যক্ত করেছে। এসেছিল ইসলামের খুব কাছাকাছি। তবে ইসলাম গ্রহণ করতে পারেনি। দূতের কাছে আল্লাহর রাসূলের জন্য বেশ কয়েকটি হাদিয়া দেয়। তাতে মারিয়া কিবতিয়াও ছিলেন। মুকাওকিসের উত্তর পেয়ে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'খবিসরা তার রাজ্যটাকে বেষ্টন করে আছে; এবং তার রাজত্ব বেশিদিন টিকবে না'।

৫. দামেশকের গভর্নর মুনজির ইবনুল হারিস গাসসানির কাছেও আল্লাহর রাসূল ইসলামের বার্তা লিখে চিঠি প্রেরণ করেন। বার্তাবাহক ছিলেন বনু আসাদ বিন খুযাইমার ভাই শুজা ইবনু ওয়াহাব। হুদাইবিয়া থেকে আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের নিয়ে ফিরছিলেন, তখনকার কথা এটি। নবিজি চিঠিতে লিখেছিলেন,
'হিদায়াতের অনুসারী ও ঈমানদার ব্যক্তির প্রতি সালাম। আমি তোমাকে ডাকছি, তুমি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, যাঁর কোনো শরিক নেই। এর ফলে তোমার রাজত্ব টিকে থাকবে'।

৬. হুদাইবিয়া থেকে ফেরার পথে নবিজি হাওজা ইবনু 'আলি আলা হানাফির কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। দূত ছিলেন সালীত বিন আমর আমিরি। হাওজা হানাফি চিঠি পড়ে আল্লাহর রাসূলকে এই শর্ত দেয় যে, নেতৃত্বে তারও অংশ থাকতে হবে। নবিজি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন'।

৭. হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসার পর আল্লাহর রাসূল বাহরাইনের গভর্নর মুনজির ইবনু সাওয়া আল আবদির কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। বার্তাবাহক ছিলেন আবুল আলা হাযরমি। ইতিহাস-গ্রন্থগুলোতে আছে, বাহরাইনের আমীর মুনজির আবদি আল্লাহর রাসূলের চিঠিতে সাড়া দিয়ে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন, সাথে বাহরাইনের সবাই। আর ইয়াহুদি ও অগ্নিপূজকরা তাদের জনপদের নিরাপত্তায় আলা হাযরমি ও মুনজির আবদির সাথে কর আদায়ের ভিত্তিতে সন্ধিচুক্তি করে।
আবু উবাইদ কাসিম বিন সালাম উরওয়া ইবনু যুবাইর থেকে মুনজির আবদীর উদ্দেশ্যে প্রেরিত চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। তাতে আছে,
'তোমার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি তোমার সামনে সেই আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহা নেই। পর কথা, যে ব্যক্তি আমাদের মতো সালাত পড়বে, আমাদের কিবলার অভিমুখী হবে, আমাদের জবাইকৃত পশু খাবে, সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হবে। অগ্নিপূজকদের মধ্যে যারা এই আহ্বান গ্রহণ করবে, সে নিরাপদ, আর অস্বীকার করলে জিযিয়া বা কর আবশ্যক হবে।'

অষ্টম হিজরির জিলকদ মাসে আল্লাহর রাসূল আমর ইবনুল 'আস-কে দূত নির্ধারণ করে ওমানের আযদিদের কাছে প্রেরণ করেন। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, 'আল্লাহর নবি ও রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে ওমানের রাজবর্গ আসবাজিয়্যীনদের প্রতি। তারা যদি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহর নবির অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, মুসলিমদের মতো কুরবানি করে, তাহলে তারা নিরাপদ। মুসলিমদের সকল অধিকার তারা লাভ করবে। তবে বাইতুন নারের সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। খেজুরের ওশর সাদাকাহ ও ফসলের ওশরের অর্ধেক। মুসলিমদের দায়িত্ব তাদের সাহায্য করা ও কল্যাণকামী হওয়া। আর তারা যেখানে ইচ্ছা ভ্রমণ করতে পারবে।'

টিকাঃ
[৪৫৪] দেখুন, ড, মুহাম্মাদ উকাইলি রচিত, 'আস সাফারাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১৫
[৪৫৫] দেখুন, সাঈদ মাহজার রচিত, আল আলাকাতুল খারিজিয়্যাহ লিদ দা'ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১১২
[৪৫৬] দেখন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩২৪
[৪৫৭] বুখারি, ৪৫৫৩; মুসলিম, ১৭৭৩
[৪৫৮] দেখুন, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনইয়া, ৩/৩৪১
[৪৫৯] তারিখে তাবারি, ২/৬৫৪-৬৫৫
[৪৬০] দেখুন, যাইলাঈ রচিত, নাসবুর রা-য়াহ, ৪/৪২১
[৪৬১] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৪৬
[৪৬২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৪৬
[৪৬৩] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ২/৪৫৯
[৪৬৪] তাবাকাতুল কুবরা, ১/ ২৬০-২৬১
[৪৬৫] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫/ ৩৪০
[৪৬৬] তারিখে তাবারি, ২/৬৫২
[৪৬৭] দেখুন, যাইলাঈ রচিত, নাসবুর রা-য়াহ, ৪/৪২৪
[৪৬৮] দেখুন, যাইলাঈ রচিত, নাসবুর রা-য়াহ, ৪/৪২৫
[৪৬৯] দেখুন, কলকশান্দি রচিত, সুবহুল আ'লা, ৬/৩২৮
[৪৭০] আবু উবাইদ ফি কিতাবিল আমওয়াল, পৃ. ৩০
[৪৭১] দেখুন, কলকশান্দি রচিত, সুবহুল আ'লা, ৬/৩৭৬
[৪৭২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৪৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px